📄 ষষ্ঠ অভিযোগ : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং মু'আওয়াযাতাইন
সপ্তম অভিযোগ : কোনো কোনো লোক মুসনাদে আহমদের ওই বর্ণনাটিকে অভিযোগের দলীল হিসেবে অনেক বেশী পেশ করে থাকেন, যার মধ্যে বলা হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মু'আওয়াযাতাইন (সূরা ফালাক এবং সূরা নাস)-কে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে মানতেন না।
অথচ এ ঘটনাটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। প্রকৃত ঘটনা হলো, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও গোটা উম্মতের ন্যায় সূরায়ে ফালাক এবং সূরা নাসকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে সাব্যস্ত করতেন। যেসব বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, তিনি এ সূরা দু'টিকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে মানতেন না, সেগুলো সঠিক নয়। এর প্রমাণ হলো এই যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে যেসব মুতাওয়াতির ক্বেরাত বর্ণিত আছে, সেগুলোতে সূরা ফালাক ও সূরা নাস ও সন্নিবেশিত আছে। "দশ ক্বেরাতের” মধ্য হতে হযরত আসেম (রহ.)-এর ক্বেরাত হযরত আবু আবদুর রহমান সুলামী (রহ.), হযরত যর ইবনে হুবাইশ (রহ.) এবং হযরত আবু আমর আশ-শাইবানী (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে। আর এঁরা তিনজনই নিজেদের ক্বেরাত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেন। অনুরূপভাবে হযরত হামযাহ (রহ.)-এর ক্বেরাত ও অন্যান্যদের ক্বেরাতও শেষ পর্যন্ত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর নিকট গিয়ে সমাপ্ত হয়। আর এ কথার উপর সমস্ত উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে যে, দশ ক্বেরাতের সবগুলোর সনদ পৃথিবীর সবচেয়ে অধিক শক্তিশালী এবং বিশুদ্ধ এবং বংশ পরম্পরায় তাওয়াতুরের সাথে বর্ণিত হয়ে আসছে। আর বিধিবদ্ধ নিয়ম হলো যদি কোনো “খবরে ওয়াহিদ” মুতাওয়াতির ক্বেরাতের বিপরীত হয়ে যায় তাহলে নিশ্চিতভাবে তা বর্জনীয়।
এর উপর ভিত্তি করেই অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেম ও মুহাদ্দিসগণ এসব বর্ণনাকে দুর্বল, মাউযু অথবা কমপক্ষে অগ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দিকে এই ভ্রান্ত মাযহাবের সম্বন্ধ করে। ঐ সকল মুহাক্কিক আলেম ও মুহাদ্দিসগণের মধ্যে শায়খুল ইসলাম আল্লামা নববী (রহ.), আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.), ইমাম রাযী (রহ.), কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী (রহ.), আল্লামা বাহরুল উলূম (রহ.) এবং শেষ যুগের প্রসিদ্ধ মুহাক্কিক আলেম আল্লামা জাহেদ কাউসারী (রহ.) ও শামিল রয়েছেন।
একথার উপর সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে যে, হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এবং আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামী (রহ.) স্পষ্ট করে বলেছেন যে, উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর সকল রাবী সিকাহ্ বা নির্ভরযোগ্য। কাজেই কিভাবে বলা যেতে পারে যে, এ বর্ণনাগুলো সহীহ নয়? কিন্তু যারা হাদীস শাস্ত্রের জ্ঞান রাখেন, তাঁদের কাছে এ কথাটি অস্পষ্ট নয় যে, শুধু বর্ণনাকারীর সিকাহ্ (নির্ভরযোগ্য) হওয়াই কোনো বর্ণনা সহীহ হবার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং তার মধ্যে অস্পষ্ট কোনো কারণ (علত) না পাওয়া যাওয়াও আবশ্যক। হাফেয ইবনুস সালাহ তাঁর 'মুকাদ্দিমা'য় লিখেন—"হাদীসে মুআলাল এমন হাদীসকে বলা হয়, যার মধ্যে এমন কোনো علت পাওয়া যায়, যা ওই হাদীসের বিশুদ্ধতাকে অভিযুক্ত করে দেয়। অথচ বাহ্যিক দৃষ্টিতে হাদীসটিকে বিশুদ্ধ নির্ভেজাল বলে মনে হয়।"
অতএব, যেসব বর্ণনায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর প্রতি এ বক্তব্যের সম্বন্ধ করা হয়েছে যে, তিনি সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে মানতেন না, আল্লামা নববী (রহ.) ও আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) প্রমুখ ওই বর্ণনাগুলোর রাবী সিকাহ হওয়া সত্ত্বেও নিম্নোক্ত তিনটি কারণে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেননি:
১. এই বর্ণনাগুলো মা'লূল (معلول)। এতে সবচেয়ে বড় ইল্লত হলো এই যে, তা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ওই সকল ক্বেরাতের বিপরীত, যা মুতাওয়াতির সূত্রে তাঁর কাছ থেকে বর্ণিত আছে।
২. মুসনাদে আহমদের সেই বর্ণনা যার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ স্পষ্ট বক্তব্য বর্ণনা করা হয়েছে যে সূরা দু'টি কুরআনুল কারীমের অংশ নয়—এ বাক্যটি শুধু আবদুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ নাখঈ (রহ.) থেকে বর্ণিত। অন্য কেউ তাঁর এই বাক্য বর্ণনা করেননি। কাজেই এটি "শায" এবং মুহাদ্দিসগণের নীতিমালা অনুযায়ী "হাদীসে শায" গ্রহণযোগ্য হয় না।
৩. যদি কথার কথা ওই বর্ণনাগুলোকে সহীহ হিসেবে মেনেও নেওয়া হয়, তবু তো সেগুলো “খবরে ওয়াহিদ” মাত্র। আর এ কথার উপর উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে যে, যে খবরে ওয়াহিদ মুতাওয়াতির ও অকাট্যভাবে বর্ণিত হাদীসের বিপরীত হয় তা গ্রহণযোগ্য হয় না।
এখন শুধু একটি প্রশ্নই থেকে যায় যে, যদি এ বর্ণনাগুলো বিশুদ্ধই না হয় তাহলে এই নির্ভরযোগ্য রাবীগণ এমন ভিত্তিহীন কথাগুলো কেন বর্ণনা করলেন? এর জবাব হলো, ওই বর্ণনাগুলোর হাকীকত এ হতে পারে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে মানতেন। কিন্তু কোনো কারণবশতঃ সূরা দু'টিকে তিনি নিজের মাসহাফে লিপিবদ্ধ করেননি। এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কোনো রাবী এ ধারণা করে বসেছেন যে, তিনি সূরা দু'টিকে কুরআনের অংশ হিসেবে মানেন না। অথচ বাস্তব ঘটনা ছিল শুধু এতটুকু যে, তিনি সূরা দু'টিকে কুরআনুল কারীমের অংশ মানা সত্ত্বেও স্বীয় মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করেননি। লিপিবদ্ধ না করার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন, আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) বলেছেন যে, তিনি সূরা দু'টিকে এ জন্য লিপিবদ্ধ করেননি যে, এগুলো ভুলে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা ছিল না। কারণ প্রত্যেক মুসলমানেরই সাধারণত এগুলো মুখস্থ থাকে। উল্লেখিত বক্তব্যের সমর্থন এ কথা দ্বারা হয় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজের মাসহাফে "সূরা ফাতেহা”ও লিপিবদ্ধ করেননি।
টিকাঃ
৩২৮. Watt: W. Montgomery; Bell's Introduction to the Quran P. 46
৩২৯. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/১৫৬
৩৩০. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/১৬৬
৩৩১. ফয়যুল বারী: ১/২৬২
৩৩২. দেখুন: "আল-ইতকান": ১/৮১, আল-মুহালা: ১/১৩, ফাওয়াতিহুর রহমূত শরহে মুআলামুস সুবৃত: ২/১২, মাকালাতুল কাউসারী: পৃ: ১৬।
৩৩৩. ফাতহুল বারী: ৮/৩-৬, মাজমাউয যাওয়াইদ [হাইসামী]: ৭/১৪৯
৩৩৪. মুকাদ্দামায়ে ফাতহুল মুলহিম: ১/৫৪
৩৩৫. মাজমাউয যাওয়াইদ: ৭/১৪৯, আল-ফাতহুর রাব্বানী: ১/১/৩৫১-৩৫২
৩৩৬. মাকালাতে কাউসারী: পৃ: ১৬
৩৩৭. তাফসীরে কুরতুবী: ১/১১৪-১১৫
📄 সপ্তম অভিযোগ : সিদ্দীকি খেলাফত আমলে কুরআন সংকলন
অষ্টম অভিযোগ : কোনো কোনো প্রাচ্য বিশারদ পন্ডিত হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত আমলে পবিত্র কুরআনুল কারীম সংকলনের ঘটনাকে বিশুদ্ধ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত কালে সরকারী ব্যবস্থাপনায় পবিত্র কুরআন সংকলনের কোনো চেষ্টা করা হয়নি। সরকারী ব্যবস্থাপনায় সর্বপ্রথম এ দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন হযরত উসমান (রা.)। তাঁরা দাবী করেছেন যে, হযরত উসমান (রা.) হযরত হাফসা (রা.)-এর নিকট সংরক্ষিত কুরআনের যে কপিটি দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন, তা ছিল হযরত হাফসা (রা.)-এর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত একটি কপি। প্রফেসর মন্টেগোমেরী ওয়াট এসব অভিযোগের সারকথা তুলে ধরেছেন।
তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের উদ্দীপক এই ছিল যে, ইয়ামামার যুদ্ধে হাফেয ও ক্বারীদের বিরাট একটি দল শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ উদ্দীপনা সঠিক বলে মনে হয় না। কেননা ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারীদের নামের তালিকায় এমন লোকদের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য ছিল, যারা কুরআনের হাফেয ছিলেন। কারণ শহীদদের অধিকাংশই ছিলেন নও মুসলিম।
কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে, তাদের এই অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন ও অনর্থক। সর্বপ্রথম ফ্রেডরিক শালে (Friedrich Schwally) এ অভিযোগটি উত্থাপন করেছিল। প্রকৃত ঘটনা হলো এই যে, ইয়ামামার যুদ্ধে মদীনার অধিবাসী মুহাজির ও আনসারদের সংখ্যা ছিল ৩৬০ জন। তবে তাঁদের মধ্য হতে ৫৮ জন মুহাজির ও আনসারের নাম হাফেয ইবনে কাসীর (রহ.) উল্লেখ করেছেন। ওই ৫৮ জনের মধ্য হতে একজন ছিলেন হযরত সালেম মাওলা আবী হুযাইফা (রা.)। যিনি হাফেয ও ক্বারী হিসেবে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে অনন্য মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন হযরত আবু হুযাইফা (রা.)। তৃতীয় সাহাবী ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনুল খাত্তাব (রা.)। চতুর্থ সাহাবী ছিলেন হযরত সাবিত ইবনে কায়েস ইবনে শাম্মাছ (রা.), যিনি কাতেবে ওহী ছিলেন। আরো একজন বুযুর্গ ছিলেন হযরত আব্বাদ ইবনে বিশর (রা.)। অনুরূপভাবে হযরত তোফায়েল ইবনে আমর দাওসী (রা.) ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত ইয়াযীদ ইবনে সাবেত (রা.), হযরত কায়েস ইবনুল হারেস (রা.), হযরত আয়েয ইবনে মায়েয (রা.), হযরত সায়েব ইবনে আউয়াম (রা.), হযরত সায়েব ইবনে উসমান (রা.) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম শহীদদের এই তালিকায় শামিল রয়েছেন।
উপরোল্লিখিত সাহাবায়ে কেরাম ব্যতীত ১৮ জন মুহাজির এবং আনুমানিক ২০ জন আনসার সাহাবী এমন ছিলেন, যাঁরা বদর যুদ্ধ সংঘটিত হবার পূর্বেই মুসলমান হয়েছিলেন। এ তালিকা শুধু সে সকল শহীদানের, যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু ফ্রেডরিক শালে, জর্জ বেল এবং মন্টেগোম্রী ওয়াটের দৃষ্টিতে শহীদানের এই তালিকায় কোনো হাফেয-ক্বারী তো নেই-ই; বরং তারা সবাইকে "নও মুসলিম" (Recent Converts) আখ্যা দিয়ে নিজেদের গবেষণার প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছেন। অথচ বাস্তব অবস্থা এমন পরিবেশে ছিল যেখানে হযরত ওমর (রা.)-এর অন্তরে কুরআন সংকলনের বাসনা জাগ্রত হওয়া অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ছিল।
বুখারী শরীফের উক্ত বর্ণনার উপর মন্টেগোমরী ওয়াটের দ্বিতীয় অভিযোগ হলো, “হযরত আবু বকর (রা.) যদি সরকারী ব্যবস্থাপনায় কুরআনের কোনো কপি প্রস্তুত করেই থাকতেন, তাহলে তা একটি "দলীল" হবার মর্যাদা পেত। অথচ ওই যুগের বর্ণনাগুলোতে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।” কিন্তু এই অভিযোগের অসারতা বর্ণনারও অপেক্ষা রাখে না। কেননা ওই কপিটি “দলীল" হিসেবে সাব্যস্ত করার জন্য এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে যে, যখন হযরত উসমান (রা.) পবিত্র কুরআনুল কারীমের অনুলিপি তৈরি করে প্রেরণের ইচ্ছা করেন, তখন সর্বপ্রথম তিনি হযরত হাফসা (রা.)-এর কাছ থেকে ওই কপিটিই চেয়েছিলেন, যা হযরত আবু বকর (রা.) প্রস্তুত করেছিলেন।
টিকাঃ
৩৩৮. Watt, Bell's Introduction to the Quran 40, 42.
৩৩৯. Watt, Bell's Introduction to the Quran 40, 42.
৩৪০. তারিখে তাবারী: ২/৫১৬
৩৪১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ: ৬/৩৪০
৩৪২. ইবনে আবদুল বার রচিত "আল-ইসতেআব" ২/৬৮-৬৯
৩৪৩. হাফেয ইবনে হাযার রচিত "আল-ইসাবাহ": ৪/৪৩
৩৪৪. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়াহ: ৬/৩৩৬
৩৪৫. ইবনুল কায়্যিম রচিত "যাদুল মাআদ": ১/৩০
৩৪৬. "আল-ইসাবাহ": ২/২৫৫, "আল-ইসতেআব" ২/৪৪৪-৪৪৬
৩৪৭. "আল-ইসাবাহ": ২/২১৭
৩৪৮. এ তালিকা বিস্তারিতভাবে জানার জন্য দেখুন: "আল-কামেল" [ইবনে আসীর]: ২/১৪০, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ: ৬/৩৪০
📄 অষ্টম অভিযোগ : সিদ্দীকী খেলাফত যুগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কুরআন লিপিবদ্ধ করা হয়ন
নবম অভিযোগ : প্রাচ্য পন্ডিতদের মধ্য হতে নলডিকে ও অর্থার জিফেরী প্রমুখ এ দাবী করেছেন যে, রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে সমগ্র কুরআন লিপিবদ্ধ করা হয়নি। বরং এর মাত্র কিছু অংশ লিখা হয়েছিল। নিজেদের দাবীর স্বপক্ষে তারা সহীহ বুখারীর ওই হাদীসকে পেশ করে, যার মধ্যে বর্ণনা করা হয়েছে যে, “ইয়ামামার যুদ্ধের পর হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কুরআন সংকলনের পরামর্শ দিলেন এবং এর কারণ হিসেবে বললেন যে, যদি হাফেয সাহাবায়ে কেরামগণ এভাবে শহীদ হতে থাকেন, তাহলে পবিত্র কুরআনুল কারীমের বিরাট একটি অংশ হারিয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে।” অর্থার জিফেরী লিখেন-“এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, আশঙ্কার কারণ ছিল ওই হাফেযদের শহীদ হয়ে যাওয়া। যদি নববী যুগেই সম্পূর্ণ কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করে রাখা হতো, তাহলে এই আশঙ্কার কোনো অর্থই ছিল না।”
কিন্তু প্রথমতঃ এ কথাটি অত্যন্ত বিস্ময়কর যে, অন্যান্য প্রাচ্য বুদ্ধিজীবীদের ন্যায় অর্থার জিফেরীও সহীহ বুখারীর এ হাদীসকে মানতে অস্বীকার করেছেন, যার দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সরকারী ব্যবস্থাপনায় কুরআনের অনুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন। অথচ এই হাদীস দ্বারাই পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ না থাকার উপর দলীল দিয়ে থাকেন! মনে রাখা প্রয়োজন যে, হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল, তাতে যুগপৎভাবে স্মৃতিতে রক্ষিত এবং লিখিতভাবে রক্ষিত—এ উভয় মাধ্যমকেই কাজে লাগানো হয়েছিল। তাই ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আয়াত লিপিবদ্ধ করা হতো না, যতক্ষণ পর্যন্ত উপস্থিত সকল মাধ্যম দ্বারা তা কুরআনের অংশ হিসেবে সাব্যস্ত না হতো। এই সতর্কতামূলক পদ্ধতি অবলম্বন করা তখনই সম্ভব হয়েছে, যখন কুরআনের আয়াতগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষিত হওয়া ছাড়াও হাফেযদের বিরাট একটি দল বিদ্যমান ছিল।
সুতরাং হযরত ওমর (রা.)-এর আশঙ্কার কারণ এটাই ছিল যে, যদি কুরআনের হাফেযগণ এভাবে শহীদ হতে থাকেন এবং কুরআন সংকলনের কাজে বিলম্ব হতে থাকে, তাহলে আবার এমন যেন না হয় যে, পবিত্র কুরআন মাজীদের তাওয়াতুর বন্ধ হয়ে যায় এবং লিখিত পান্ডুলিপির সত্যায়ন মুতাওয়াতির হাফেয সাহাবায়ে কেরামগণ দ্বারা করা না যায়। অতএব, হযরত ওমর (রা.)-এর আশঙ্কাবোধ দ্বারা এ দলীল দেওয়া একেবারেই অবান্তর যে, ওই সময় পর্যন্ত সম্পূর্ণ কুরআন কোথাও লিপিবদ্ধ অবস্থায় বিদ্যমান ছিল না।
টিকাঃ
৩৪৯. ইবনে আবী দাউদ রচিত আরবী ভূমিকা সম্বলিত “কিতাবুল মাসাহিফ” অর্থার জিফেরী, পৃ: ৫.
৩৫০. Arthur Jeffery; Materials for the History of the text of the quran, Leiden 1937 p.6
📄 নবম অভিযোগ : বিভিন্ন ধরনের ক্বরাত অস্তিত্ব লাভ করল কিভাবে
দশম সংশয় : প্রাচ্য বিশারদ পন্ডিতগণের বিরাট একটি দল এ ব্যাপারে বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা পেশ করে থাকেন। যেমন নোলডিকে, গোল্ডযিহার এবং অর্থার জিফেরী প্রমুখ লিখেন যে, ক্বেরাতের বিভিন্নতা মূলত গতানুগতিক ছিল না। বরং এর কারণ ছিল হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক রচিত কুরআনের নুকতা ও হরকত না থাকা। অথচ তাদের এই দাবী একেবারেই ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, মাসহাফে উসমানীর নুকতা ও হরকতমুক্ত হওয়াটা ক্বেরাতের বিভিন্নতা সৃষ্টি হওয়ার কারণ নয়। বরং মাসাহিফে উসমানীকে জেনে বুঝে এ জন্য নুকতা ও হরকতমুক্ত রাখা হয়েছিল যেন রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে যতগুলো ক্বেরাত প্রমাণিত আছে, এ লিখন পদ্ধতিতে সে সবগুলোর সংকুলান হয়ে যায়।
ইতঃপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, প্রত্যেক যুগেই পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো ক্বেরাত গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত বাধ্যতামূলক মনে করা হয়েছে:
১. মাসহাফে উসমানীর রুসমেখত বা লিখন পদ্ধতিতে এর সংকুলান হওয়া।
২. আরবী ভাষার রীতি অনুযায়ী হওয়া।
৩. রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ সনদসূত্রে সাব্যস্ত হওয়া।
বিভিন্ন ধরনের ক্বেরাতের অস্তিত্ব লাভের কারণ যদি শুধু "উসমানী লিখন পদ্ধতি"ই হতো, তাহলে ওই লিখন পদ্ধতিতে সংকুলান হয়, এমন সকল ক্বেরাতকেই সঠিক বলে মেনে নেওয়া হতো। আর তা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তৃতীয় শর্তটি আরোপ করা হতো না। উসমানী লিখন পদ্ধতিতে একই শব্দকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পাঠ করার অবকাশ থাকলেও, যেগুলো রাসূল (সা.) থেকে প্রমাণিত ছিল না, সেগুলো গ্রহণ করা হয়নি। যেমন সূরা বাকারায় (وَلَا يُقْبَلُ) এর স্থলে অন্য ক্বেরাত অনুযায়ী (وَلَا تَقْبَلُ) পড়া যায়। কিন্তু অন্য এক স্থানে (لَا يُنْفِعُهَا) শব্দটি উসমানী পদ্ধতিতে (لَا يَنْفَعُهَا) পড়ার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও কেউ তা গ্রহণ করেননি, কারণ নবী কারীম (সা.) থেকে তা প্রমাণিত নয়।
একইভাবে উসমানী মাসহাফ থেকে নিজের ইজতেহাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কেরাত আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছিলেন আবু বকর ইবনে মুকসিম। যখন তিনি তাঁর এই বিভ্রান্তিকর মতবাদ পেশ করেন, তখন সমগ্র ইসলামী বিশ্ব তার তীব্র প্রতিবাদ করে। তৎকালীন খলীফা তাঁকে তাওবা করতে বাধ্য করেন। এ ঘটনা থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ক্বেরাতের বিভিন্নতা রুসমেখতের কারণে অস্তিত্ব লাভ করেনি; বরং রাসূলে আকরাম (সা.) থেকে সাব্যস্ত থাকার কারণেই সেগুলোর অস্তিত্ব।
টিকাঃ
৩৫১. দেখুনঃ গোল্ডযিহার রচিত "মাযাহিবুত তাফসীরিল ইসলামী" আরবী অনুবাদ : ড. আবদুল হালীম নাজ্জার : পৃ: ৮, অর্থার জিফেরী রচিত "কিতাবুল মাসাহিফ" এর ভূমিকা : পৃ: ৭।
৩৫২. আলামা তাহের কুরদী রচিত "তারীখুল কুরআন" পৃ: ১২৮-১২৯।