📄 তৃতীয় অভিযোগ : ইমাম বুখারী (রহ.)-এর উপর মারগোলিয়থের একটি অপবাদ
চতুর্থ অভিযোগ : পবিত্র কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রাচ্যবিদ মারগোলিয়থ চতুর্থ অভিযোগ উপস্থাপন করে বলেন- “ইমাম বুখারী (রহ.) বলেছেন, إِلَّا أَنْ تَصِلُوا مَا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ مِنَ الْقَرَابَةِ এ বাক্যটি ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু ব্যাখ্যাকারীগণ বলেছেন, এ বাক্যটি পবিত্র কুরআনুল কারীমে পাওয়া যায় না। তাই তিনি এটাকে ৪২নং সূরা (শুরা)-এর ২৩নং আয়াত—إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى—এর ব্যাখ্যা হিসেবে সাব্যস্ত করেন।”
কিন্তু আমরা পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়ে আবেদন করছি যে, এ কথাগুলোর মাধ্যমে মারগোলিয়থের মতো জগদ্বিখ্যাত একজন প্রাচ্যবিদ ইমাম বুখারী (রহ.)-এর প্রতি এমন লজ্জাকর অপবাদ আরোপ করেছেন, উগ্রবাদী কপটতা বা আক্ষেপময় মূর্খতা ছাড়া যার কোনো ব্যাখ্যা করা যায় না। ওই উক্তির মাধ্যমে মারগোলিয়থ এই প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা চালিয়েছেন যে, ইমাম বুখারী (রহ.) এমন একটি আয়াতকে কুরআনের অংশ সাব্যস্ত করেছেন, যা কুরআনে বিদ্যমান নেই। অথচ যে কেউ বুখারী শরীফ খুলতেই দেখতে পাবে যে, ইমাম বুখারী (রহ.) আয়াতের অবিকল ওই শব্দগুলোই উদ্ধৃত করেছেন, যা কুরআন মাজীদে রয়েছে। আর ওই ব্যাখ্যাটি তিনি আয়াতের তাফসীর করার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.)-এর পুরো ইবারত হলো নিম্নরূপ- بَابُ قَوْلِهِ : (إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى) حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ ..... عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا : أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ قَوْلِهِ : (إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى) فَقَالَ سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ : قُرْبَى آلِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: عَجِلْتَ إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ بَطْنٌ مِنْ قُرَيْشٍ إِلَّا كَانَ لَهُ فِيهِمْ قَرَابَةٌ، فَقَالَ: إِلَّا أَنْ تَصِلُوا مَا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ مِنَ الْقَرَابَةِ ..
লক্ষ্য করুন যে, এখানে ইমাম বুখারী (রহ.) এ অধ্যায়ের শিরোনামে আয়াতের ওই বাক্যটি উদ্ধৃত করেছেন, কুরআন মাজীদে যা বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-কে তাফসীর জিজ্ঞাসা করা হলে জবাবে তিনি এই বাক্যটি বলেন। কিন্তু মিষ্টার মারগোলিয়থ বেপরোয়া গোঁয়ার্তুমির সাথে বলেন যে, ইমাম বুখারী (রহ.) এ বাক্যটিকে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ বলে মানেন। এর দ্বারা আপনারা আঁচ করতে পারেন যে, গবেষণা ও ইনসাফের এই দাবীদার পবিত্র কুরআন মাজীদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামীর কেমন স্থায়ী ব্যাধিতে লিপ্ত রয়েছেন? (তার মতো ব্যক্তিদের ব্যাপারেই পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে)- فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا।
টিকাঃ
৩২৪. ইনসাইক্লোপিডিয়া: ১০/৫৪৩
📄 চতুর্থ অভিযোগ : হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছ থেকে কিছু আয়াত হারিয়ে গিয়েছিল
পঞ্চম অভিযোগ : মারগোলিয়থের পঞ্চম অভিযোগ হচ্ছে, মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছ থেকে কিছু আয়াত হারিয়ে গিয়েছিল। মারগোলিয়থ যে বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা হলো নিম্নরূপ: عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ لَقَدْ أُنْزِلَتْ آيَةُ الرَّجُمِ وَرَضَعَاتُ الْكَبِيرِ عَشْرًا فَكَانَتْ فِي وَرَقَةٍ تَحْتَ سَرِيرٍ فِي بَيْتِي فَلَمَّا اشْتَكَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَشَاغَلْنَا بِأَمْرِهِ وَدَخَلَتْ دُوَيْبَةٌ لَنَا فَأَكَلَتْهَا 'অর্থাৎ নবী কারীম (সা.)-এর সহধর্মিনী হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রজম অর্থাৎ ব্যভিচারী ব্যক্তিকে পাথর মেরে হত্যা করা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির দশবার দুধ পান করা সংক্রান্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল। এ আয়াতগুলো আমার ঘরের খাটের নিচে একটি কাগজে লিপিবদ্ধ ছিল। যখন রাসূলে আকরাম (সা.) (মৃত্যু পূর্ববর্তী) অসুস্থতায় পড়ে গেলেন, তখন আমরা তাঁর সেবা-শুশ্রূষায় নিয়োজিত হয়ে গেলাম। আমাদের একটি পোষাপ্রাণী ছিল। সেটা এসে ওই কাগজটিকে খেয়ে ফেলল।'
আসল বাস্তবতা হলো যে, উপরোক্ত বর্ণনায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) যেসব আয়াতের কথা উল্লেখ করেছেন, উম্মতের সর্বসম্মতিক্রমে এই আয়াতগুলোর তেলাওয়াত রহিত হয়ে গিয়েছিল। স্বয়ং হযরত আয়েশা (রা.) ও এই আয়াতগুলোর তেলাওয়াত রহিত হওয়ার প্রবক্তা। সুতরাং তিনি যদি আয়াতগুলোকে কোনো কাগজে লিপিবদ্ধ করেই থাকেন, তা একটি স্মারকের সংরক্ষণ বৈ কিছুই ছিল না। অন্যথায় যদি এই আয়াতগুলো হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট কুরআন মাজীদের অংশই হতো, তাহলে কমপক্ষে তা তাঁর তো মুখস্থ থাকতো এবং তিনি তা পবিত্র কুরআনুল কারীমের অনুলিপিগুলোতে লিপিবদ্ধ করে নিতেন। কিন্তু তিনি গোটা জীবনে কখনো এ ধরনের চেষ্টা করেননি। এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, স্বয়ং হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট এ আয়াতগুলো শুধুমাত্র এক ইলমী স্মারকের মর্যাদা রাখতো। পবিত্র কুরআনুল কারীমের অন্যান্য আয়াতের ন্যায় মাসহাফে লিপিবদ্ধ করার জন্য এ ক্ষেত্রে তাঁর কোনো গুরুত্ব ছিল না। অতএব, এ ঘটনা দ্বারা পবিত্র কুরআন মাজীদের সংরক্ষণের উপর কোনো ধরনের অভিযোগ-আপত্তি তথা ওজর পেশ করা যায় না।
টিকাঃ
৩২৫. ইনসাইক্লোপিডিয়া: ১০/৫৪৩
৩২৬. মুসনাদে আহমদ: ৬/২৬৯
📄 পঞ্চম অভিযোগ : নববী যুগে হাফেযদের সংখ্যা
ষষ্ঠ অভিযোগ : হযরত কাতাদাহ্ (রহ.)-এর একটি বর্ণনার উপর ভিত্তি করে কোনো কোনো ব্যক্তি পবিত্র কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের ব্যাপারে সংশয়ে পড়ে যান। সহীহ বুখারীতে বর্ণনাটি নিম্নোক্ত শব্দমালা দ্বারা বর্ণিত হয়েছে- قُلْتُ لِأَنَسِ بْنِ مَالِكٍ مَنْ جَمَعَ الْقُرْآنَ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ ؟ ؟ قَالَ أَرْبَعَةٌ كُلُّهُمْ مِنَ الأَنْصَارِ: أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ وَمُعَادُ بْنُ جَبَلٍ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ وَرَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ "আমি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূল (সা.)-এর যুগে কারা আল কুরআন সংকলন করেছেন? তিনি বললেন, চারজন। তাঁরা সবাই ছিলেন আনসারী। ১. হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.)। ২. হযরত মুআয ইবনে جাবাল (রা.)। ৩. হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)। ৪. হযরত আবু যায়েদ (রা.)।"
এই বর্ণনা দ্বারা কোনো কোনো ব্যক্তি এ ধারণা করেন যে, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমের হাফেয এই চারজনই ছিলেন। অথচ এ ধারণা সঠিক নয়। আমরা পূর্বে ওই সকল সাহাবায়ে কেরামের সম্মানিত নাম উল্লেখ করে এসেছি, যাঁরা রাসূলে খোদা (সা.)-এর যুগেই কুরআন মাজীদের হিফয করে নিয়েছিলেন। কাজেই হযরত আনাস (রা.)-এর বর্ণিত উপরোক্ত বর্ণনার উদ্দেশ্য কখনো এটা নয় যে, সমস্ত সাহাবায়ে কেরামের মাঝে এই চারজন ব্যতীত আর কোনো হাফেযে কুরআন ছিলেন না। বরং উপরোক্ত বর্ণনায় “কুরআনুল কারীমের সংকলন" করার শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই শব্দের সঠিক ভাবার্থ হচ্ছে কুরআনুল কারীমকে লিপিবদ্ধ করা। হযরত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশ্য হলো, এই চারজন সেই মহান ব্যক্তি যাঁদের নিকট রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগেই পবিত্র কুরআনুল কারীম সম্পূর্ণরূপে লিপিবদ্ধ ছিল।
এতদ্ব্যতীত হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) তাবারী শরীফের একটি বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ওই উক্তির পূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন যে, একবার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে পরস্পর গর্ব ও অহঙ্কারের আলোচনা চলছিল। আউস গোত্রের লোকেরা নিজ গোত্রের এমন কয়েকজন ব্যক্তির নাম গণনা করলেন, ইসলামে যাদের বিশেষ মর্যাদা লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছে। এর প্রতি উত্তরে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা (যাদের মধ্যে হযরত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও শামিল ছিলেন), বললেন, আমাদের মধ্যে এমন চারজন ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা সমগ্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করেছিলেন। অতএব, উপরোক্ত বর্ণনার উদ্দেশ্য এটাও হতে পারে যে, আউস ও খাযরাজের গোত্রের মাঝে কুরআনুল কারীমকে সংকলনকারী ব্যক্তি ছিলেন এই চারজন।
টিকাঃ
৩২৭. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: ফাতহুল বারী: ৯/৪১-৪২
📄 ষষ্ঠ অভিযোগ : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং মু'আওয়াযাতাইন
সপ্তম অভিযোগ : কোনো কোনো লোক মুসনাদে আহমদের ওই বর্ণনাটিকে অভিযোগের দলীল হিসেবে অনেক বেশী পেশ করে থাকেন, যার মধ্যে বলা হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মু'আওয়াযাতাইন (সূরা ফালাক এবং সূরা নাস)-কে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে মানতেন না।
অথচ এ ঘটনাটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। প্রকৃত ঘটনা হলো, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও গোটা উম্মতের ন্যায় সূরায়ে ফালাক এবং সূরা নাসকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে সাব্যস্ত করতেন। যেসব বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, তিনি এ সূরা দু'টিকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে মানতেন না, সেগুলো সঠিক নয়। এর প্রমাণ হলো এই যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে যেসব মুতাওয়াতির ক্বেরাত বর্ণিত আছে, সেগুলোতে সূরা ফালাক ও সূরা নাস ও সন্নিবেশিত আছে। "দশ ক্বেরাতের” মধ্য হতে হযরত আসেম (রহ.)-এর ক্বেরাত হযরত আবু আবদুর রহমান সুলামী (রহ.), হযরত যর ইবনে হুবাইশ (রহ.) এবং হযরত আবু আমর আশ-শাইবানী (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে। আর এঁরা তিনজনই নিজেদের ক্বেরাত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেন। অনুরূপভাবে হযরত হামযাহ (রহ.)-এর ক্বেরাত ও অন্যান্যদের ক্বেরাতও শেষ পর্যন্ত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর নিকট গিয়ে সমাপ্ত হয়। আর এ কথার উপর সমস্ত উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে যে, দশ ক্বেরাতের সবগুলোর সনদ পৃথিবীর সবচেয়ে অধিক শক্তিশালী এবং বিশুদ্ধ এবং বংশ পরম্পরায় তাওয়াতুরের সাথে বর্ণিত হয়ে আসছে। আর বিধিবদ্ধ নিয়ম হলো যদি কোনো “খবরে ওয়াহিদ” মুতাওয়াতির ক্বেরাতের বিপরীত হয়ে যায় তাহলে নিশ্চিতভাবে তা বর্জনীয়।
এর উপর ভিত্তি করেই অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেম ও মুহাদ্দিসগণ এসব বর্ণনাকে দুর্বল, মাউযু অথবা কমপক্ষে অগ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দিকে এই ভ্রান্ত মাযহাবের সম্বন্ধ করে। ঐ সকল মুহাক্কিক আলেম ও মুহাদ্দিসগণের মধ্যে শায়খুল ইসলাম আল্লামা নববী (রহ.), আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.), ইমাম রাযী (রহ.), কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী (রহ.), আল্লামা বাহরুল উলূম (রহ.) এবং শেষ যুগের প্রসিদ্ধ মুহাক্কিক আলেম আল্লামা জাহেদ কাউসারী (রহ.) ও শামিল রয়েছেন।
একথার উপর সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে যে, হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এবং আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামী (রহ.) স্পষ্ট করে বলেছেন যে, উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর সকল রাবী সিকাহ্ বা নির্ভরযোগ্য। কাজেই কিভাবে বলা যেতে পারে যে, এ বর্ণনাগুলো সহীহ নয়? কিন্তু যারা হাদীস শাস্ত্রের জ্ঞান রাখেন, তাঁদের কাছে এ কথাটি অস্পষ্ট নয় যে, শুধু বর্ণনাকারীর সিকাহ্ (নির্ভরযোগ্য) হওয়াই কোনো বর্ণনা সহীহ হবার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং তার মধ্যে অস্পষ্ট কোনো কারণ (علত) না পাওয়া যাওয়াও আবশ্যক। হাফেয ইবনুস সালাহ তাঁর 'মুকাদ্দিমা'য় লিখেন—"হাদীসে মুআলাল এমন হাদীসকে বলা হয়, যার মধ্যে এমন কোনো علت পাওয়া যায়, যা ওই হাদীসের বিশুদ্ধতাকে অভিযুক্ত করে দেয়। অথচ বাহ্যিক দৃষ্টিতে হাদীসটিকে বিশুদ্ধ নির্ভেজাল বলে মনে হয়।"
অতএব, যেসব বর্ণনায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর প্রতি এ বক্তব্যের সম্বন্ধ করা হয়েছে যে, তিনি সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে মানতেন না, আল্লামা নববী (রহ.) ও আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) প্রমুখ ওই বর্ণনাগুলোর রাবী সিকাহ হওয়া সত্ত্বেও নিম্নোক্ত তিনটি কারণে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেননি:
১. এই বর্ণনাগুলো মা'লূল (معلول)। এতে সবচেয়ে বড় ইল্লত হলো এই যে, তা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ওই সকল ক্বেরাতের বিপরীত, যা মুতাওয়াতির সূত্রে তাঁর কাছ থেকে বর্ণিত আছে।
২. মুসনাদে আহমদের সেই বর্ণনা যার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ স্পষ্ট বক্তব্য বর্ণনা করা হয়েছে যে সূরা দু'টি কুরআনুল কারীমের অংশ নয়—এ বাক্যটি শুধু আবদুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ নাখঈ (রহ.) থেকে বর্ণিত। অন্য কেউ তাঁর এই বাক্য বর্ণনা করেননি। কাজেই এটি "শায" এবং মুহাদ্দিসগণের নীতিমালা অনুযায়ী "হাদীসে শায" গ্রহণযোগ্য হয় না।
৩. যদি কথার কথা ওই বর্ণনাগুলোকে সহীহ হিসেবে মেনেও নেওয়া হয়, তবু তো সেগুলো “খবরে ওয়াহিদ” মাত্র। আর এ কথার উপর উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে যে, যে খবরে ওয়াহিদ মুতাওয়াতির ও অকাট্যভাবে বর্ণিত হাদীসের বিপরীত হয় তা গ্রহণযোগ্য হয় না।
এখন শুধু একটি প্রশ্নই থেকে যায় যে, যদি এ বর্ণনাগুলো বিশুদ্ধই না হয় তাহলে এই নির্ভরযোগ্য রাবীগণ এমন ভিত্তিহীন কথাগুলো কেন বর্ণনা করলেন? এর জবাব হলো, ওই বর্ণনাগুলোর হাকীকত এ হতে পারে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে মানতেন। কিন্তু কোনো কারণবশতঃ সূরা দু'টিকে তিনি নিজের মাসহাফে লিপিবদ্ধ করেননি। এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কোনো রাবী এ ধারণা করে বসেছেন যে, তিনি সূরা দু'টিকে কুরআনের অংশ হিসেবে মানেন না। অথচ বাস্তব ঘটনা ছিল শুধু এতটুকু যে, তিনি সূরা দু'টিকে কুরআনুল কারীমের অংশ মানা সত্ত্বেও স্বীয় মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করেননি। লিপিবদ্ধ না করার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন, আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) বলেছেন যে, তিনি সূরা দু'টিকে এ জন্য লিপিবদ্ধ করেননি যে, এগুলো ভুলে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা ছিল না। কারণ প্রত্যেক মুসলমানেরই সাধারণত এগুলো মুখস্থ থাকে। উল্লেখিত বক্তব্যের সমর্থন এ কথা দ্বারা হয় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজের মাসহাফে "সূরা ফাতেহা”ও লিপিবদ্ধ করেননি।
টিকাঃ
৩২৮. Watt: W. Montgomery; Bell's Introduction to the Quran P. 46
৩২৯. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/১৫৬
৩৩০. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/১৬৬
৩৩১. ফয়যুল বারী: ১/২৬২
৩৩২. দেখুন: "আল-ইতকান": ১/৮১, আল-মুহালা: ১/১৩, ফাওয়াতিহুর রহমূত শরহে মুআলামুস সুবৃত: ২/১২, মাকালাতুল কাউসারী: পৃ: ১৬।
৩৩৩. ফাতহুল বারী: ৮/৩-৬, মাজমাউয যাওয়াইদ [হাইসামী]: ৭/১৪৯
৩৩৪. মুকাদ্দামায়ে ফাতহুল মুলহিম: ১/৫৪
৩৩৫. মাজমাউয যাওয়াইদ: ৭/১৪৯, আল-ফাতহুর রাব্বানী: ১/১/৩৫১-৩৫২
৩৩৬. মাকালাতে কাউসারী: পৃ: ১৬
৩৩৭. তাফসীরে কুরতুবী: ১/১১৪-১১৫