📄 দ্বিতীয় অভিযোগ : সূরা নিসা'য় সূরা আনআমের উদ্ধৃতি
তৃতীয় অভিযোগ : প্রফেসর মারগোলিয়থ পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ না থাকার উপর আর একটি আজব ও আশ্চর্যকর দলীল পেশ করেছেন। তা হলো, সূরা নিসার আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ 'এবং নিশ্চয়ই তিনি গ্রন্থের মাধ্যমে তোমাদের আদেশ করছেন যে, তোমরা যখন আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি অবিশ্বাস করা এবং তাঁর প্রতি উপহাস করা হচ্ছে শ্রবণ কর তখন তাদের সাথে (বৈঠকে) উপবেশন করো না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কথার আলোচনা করে;'। এই আয়াতটি মাদানী। আর এতে সূরা আনআমের নিম্নোক্ত মাক্কী আয়াতটির উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে- وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ 'আর যখন আপনি তাদেরকে দেখবেন, যারা আমার আয়াতসমূহের ব্যাপারে উপহাসমূলক সমালোচনায় রত আছে, আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন, যতক্ষণ না তারা অন্য কথাবার্তায় লিপ্ত হয়।'
প্রথম আয়াতে দ্বিতীয় আয়াতের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উভয় আয়াতের শব্দমালা ভিন্ন ভিন্ন। মারগোলিয়থ এটা থেকে এ ফলাফল বের করেছেন যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ ছিল না। যদি লিপিবদ্ধই থাকতো, তাহলে প্রথম আয়াতে অবিকল ওই শব্দগুলোই থাকতো যা দ্বিতীয় আয়াতে উল্লেখ আছে। শব্দের এই ভিন্নতার কারণে বুঝা যায় যে, প্রথম আয়াত অবতীর্ণ হবার সময় দ্বিতীয় আয়াতের শব্দাবলী (নাঊযুবিলাহ) সংরক্ষিত ছিল না।
কিন্তু মারগোলিয়থের উপস্থাপিত এ দলীলটি এতই স্পষ্ট ভ্রান্ত যে, এর জবাব দিতেও লজ্জা লাগে। প্রশ্ন হলো, যদি সূরা নিসা অবতীর্ণ হবার সময় সূরা আনআমের উল্লিখিত আয়াতের শব্দমালা (নাঊযুবিল্লাহ) সংরক্ষিত না-ই থেকে থাকে তাহলে পরবর্তীতে তা কিভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমে লিপিবদ্ধ করা হলো? যদি সূরা আনআমের মূল শব্দমালা সংরক্ষিত না থাকত তাহলে নিয়ম-নীতির দাবী তো ছিল এটাই যে পরবর্তীতে লিখিত সূরা আনআমেও অবিকল ওই শব্দমালা লিপিবদ্ধ করা, যা সূরা নিসা'য় উল্লেখ রয়েছে। এ উভয় আয়াতের শব্দগত পার্থক্য প্রকৃতপক্ষে এ কথাই প্রমাণ করে যে, উভয় আয়াতের শব্দমালা সর্বদাই পুরোপুরিভাবে সংরক্ষিত ও অবিকৃত ছিল এবং তাতে কারো কেয়াস এবং ধারণার কোনো অবকাশ বাকি ছিল না। কারণ পবিত্র কুরআনুল কারীমের লিপিবদ্ধকরণ যদি কেয়াস ও ধারণা দ্বারাই হতো, তাহলে উভয় আয়াতের শব্দমালার মাঝে কোনো পার্থক্য না হওয়াটাই সমীচীন ছিল।
আসল কথা হলো, প্রত্যেক ভাষার বাক-পদ্ধতিতে যখন কোনো প্রাক্তন আলোচনার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়, তখন তা দু'ভাবে দেওয়া হয়ে থাকে। কখনো প্রাক্তন আলোচনাকে অবিকল শব্দমালা দ্বারা পুনরাবৃত্তি করা হয় (Direct Narration)। আবার কখনো অবিকল শব্দমালার পুনরাবৃত্তি না করে শুধুমাত্র মূল আলোচনার ভাবার্থকে অন্যান্য শব্দমালা দ্বারা বর্ণনা করে দেওয়া হয় (Indirect Narration)। এই দুই প্রকারের মধ্যে সাহিত্যের রীতি অনুযায়ী দ্বিতীয় প্রকারটিই অধিক সমাদৃত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মূল আলোচনার ভাবার্থকে অন্য শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। সূরা নিসা'তেও এই দ্বিতীয় প্রকারটিই অবলম্বন করা হয়েছে। এর আরেকটি কারণ এও হতে পারে যে, কুরআনুল কারীমের প্রত্যেকটি সূরার নিজ নিজ বাক্য-গঠনে পৃথক পৃথক শৈলীর অবলম্বন পরিলক্ষিত হয়। কাজেই যদি কোনো একটি সূরার বাক্যগুলোর মাঝে অন্য সূরার কোনো বাক্যকে অবিকল জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে আয়াতের ধারাবাহিকতা (Sequence)-এর মাঝে ফাটল সৃষ্টি হয় এবং বাক্যের প্রবাহ (Flow) স্থির থাকে না। তাই যে ব্যক্তির সামান্যতমও সাহিত্য প্রীতি রয়েছে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, যদি সূরা নিসা'র উল্লিখিত আয়াতে সূরা আনআমের শব্দমালা হুবহু নকল করে দেওয়া হয়, তাহলে ইবারতের গাঁথুনী এবং ছন্দ বিনষ্ট হবে।
এতদ্ব্যতীত সূরা আনআম—যার উল্লিখিত আয়াতের ব্যাপারে মারগোলিয়থের দাবী হলো যে, তা লিপিবদ্ধ ছিল না, সম্পূর্ণতা একসাথেই অবতীর্ণ হয়েছে: وَهُدَى كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ مُّصَدِّقُ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ 'আর এই (কুরআন) এমন একটি কিতাব, যা আমি নাযিল করেছি, বরকতময়, যা তার পূর্বে (অবতীর্ণ) গ্রন্থসমূহ (তাওরাত, ইনজীল ইত্যাদি)-এর সত্যায়নকারী।' এ আয়াতে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে বুঝানোর জন্য “কিতাব” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যদি সূরা আনআম অবতীর্ণ হওয়ার সময় পর্যন্ত পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ না থাকতো, তাহলে সেটাকে "কিতাব” বলার অর্থ কি?
টিকাঃ
৩১৯. সূরা নিসা: ১৪০
৩২০. সূরা আনআম: ৬৮
৩২১. ইনসাইক্লোপিডিয়া: ১০/৫৪২
৩২২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/১২২
৩২৩. সূরা আনআম: ৯২
📄 তৃতীয় অভিযোগ : ইমাম বুখারী (রহ.)-এর উপর মারগোলিয়থের একটি অপবাদ
চতুর্থ অভিযোগ : পবিত্র কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রাচ্যবিদ মারগোলিয়থ চতুর্থ অভিযোগ উপস্থাপন করে বলেন- “ইমাম বুখারী (রহ.) বলেছেন, إِلَّا أَنْ تَصِلُوا مَا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ مِنَ الْقَرَابَةِ এ বাক্যটি ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু ব্যাখ্যাকারীগণ বলেছেন, এ বাক্যটি পবিত্র কুরআনুল কারীমে পাওয়া যায় না। তাই তিনি এটাকে ৪২নং সূরা (শুরা)-এর ২৩নং আয়াত—إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى—এর ব্যাখ্যা হিসেবে সাব্যস্ত করেন।”
কিন্তু আমরা পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়ে আবেদন করছি যে, এ কথাগুলোর মাধ্যমে মারগোলিয়থের মতো জগদ্বিখ্যাত একজন প্রাচ্যবিদ ইমাম বুখারী (রহ.)-এর প্রতি এমন লজ্জাকর অপবাদ আরোপ করেছেন, উগ্রবাদী কপটতা বা আক্ষেপময় মূর্খতা ছাড়া যার কোনো ব্যাখ্যা করা যায় না। ওই উক্তির মাধ্যমে মারগোলিয়থ এই প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা চালিয়েছেন যে, ইমাম বুখারী (রহ.) এমন একটি আয়াতকে কুরআনের অংশ সাব্যস্ত করেছেন, যা কুরআনে বিদ্যমান নেই। অথচ যে কেউ বুখারী শরীফ খুলতেই দেখতে পাবে যে, ইমাম বুখারী (রহ.) আয়াতের অবিকল ওই শব্দগুলোই উদ্ধৃত করেছেন, যা কুরআন মাজীদে রয়েছে। আর ওই ব্যাখ্যাটি তিনি আয়াতের তাফসীর করার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.)-এর পুরো ইবারত হলো নিম্নরূপ- بَابُ قَوْلِهِ : (إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى) حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ ..... عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا : أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ قَوْلِهِ : (إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى) فَقَالَ سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ : قُرْبَى آلِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: عَجِلْتَ إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ بَطْنٌ مِنْ قُرَيْشٍ إِلَّا كَانَ لَهُ فِيهِمْ قَرَابَةٌ، فَقَالَ: إِلَّا أَنْ تَصِلُوا مَا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ مِنَ الْقَرَابَةِ ..
লক্ষ্য করুন যে, এখানে ইমাম বুখারী (রহ.) এ অধ্যায়ের শিরোনামে আয়াতের ওই বাক্যটি উদ্ধৃত করেছেন, কুরআন মাজীদে যা বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-কে তাফসীর জিজ্ঞাসা করা হলে জবাবে তিনি এই বাক্যটি বলেন। কিন্তু মিষ্টার মারগোলিয়থ বেপরোয়া গোঁয়ার্তুমির সাথে বলেন যে, ইমাম বুখারী (রহ.) এ বাক্যটিকে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ বলে মানেন। এর দ্বারা আপনারা আঁচ করতে পারেন যে, গবেষণা ও ইনসাফের এই দাবীদার পবিত্র কুরআন মাজীদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামীর কেমন স্থায়ী ব্যাধিতে লিপ্ত রয়েছেন? (তার মতো ব্যক্তিদের ব্যাপারেই পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে)- فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا।
টিকাঃ
৩২৪. ইনসাইক্লোপিডিয়া: ১০/৫৪৩
📄 চতুর্থ অভিযোগ : হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছ থেকে কিছু আয়াত হারিয়ে গিয়েছিল
পঞ্চম অভিযোগ : মারগোলিয়থের পঞ্চম অভিযোগ হচ্ছে, মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছ থেকে কিছু আয়াত হারিয়ে গিয়েছিল। মারগোলিয়থ যে বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা হলো নিম্নরূপ: عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ لَقَدْ أُنْزِلَتْ آيَةُ الرَّجُمِ وَرَضَعَاتُ الْكَبِيرِ عَشْرًا فَكَانَتْ فِي وَرَقَةٍ تَحْتَ سَرِيرٍ فِي بَيْتِي فَلَمَّا اشْتَكَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَشَاغَلْنَا بِأَمْرِهِ وَدَخَلَتْ دُوَيْبَةٌ لَنَا فَأَكَلَتْهَا 'অর্থাৎ নবী কারীম (সা.)-এর সহধর্মিনী হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রজম অর্থাৎ ব্যভিচারী ব্যক্তিকে পাথর মেরে হত্যা করা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির দশবার দুধ পান করা সংক্রান্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল। এ আয়াতগুলো আমার ঘরের খাটের নিচে একটি কাগজে লিপিবদ্ধ ছিল। যখন রাসূলে আকরাম (সা.) (মৃত্যু পূর্ববর্তী) অসুস্থতায় পড়ে গেলেন, তখন আমরা তাঁর সেবা-শুশ্রূষায় নিয়োজিত হয়ে গেলাম। আমাদের একটি পোষাপ্রাণী ছিল। সেটা এসে ওই কাগজটিকে খেয়ে ফেলল।'
আসল বাস্তবতা হলো যে, উপরোক্ত বর্ণনায় উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) যেসব আয়াতের কথা উল্লেখ করেছেন, উম্মতের সর্বসম্মতিক্রমে এই আয়াতগুলোর তেলাওয়াত রহিত হয়ে গিয়েছিল। স্বয়ং হযরত আয়েশা (রা.) ও এই আয়াতগুলোর তেলাওয়াত রহিত হওয়ার প্রবক্তা। সুতরাং তিনি যদি আয়াতগুলোকে কোনো কাগজে লিপিবদ্ধ করেই থাকেন, তা একটি স্মারকের সংরক্ষণ বৈ কিছুই ছিল না। অন্যথায় যদি এই আয়াতগুলো হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট কুরআন মাজীদের অংশই হতো, তাহলে কমপক্ষে তা তাঁর তো মুখস্থ থাকতো এবং তিনি তা পবিত্র কুরআনুল কারীমের অনুলিপিগুলোতে লিপিবদ্ধ করে নিতেন। কিন্তু তিনি গোটা জীবনে কখনো এ ধরনের চেষ্টা করেননি। এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, স্বয়ং হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট এ আয়াতগুলো শুধুমাত্র এক ইলমী স্মারকের মর্যাদা রাখতো। পবিত্র কুরআনুল কারীমের অন্যান্য আয়াতের ন্যায় মাসহাফে লিপিবদ্ধ করার জন্য এ ক্ষেত্রে তাঁর কোনো গুরুত্ব ছিল না। অতএব, এ ঘটনা দ্বারা পবিত্র কুরআন মাজীদের সংরক্ষণের উপর কোনো ধরনের অভিযোগ-আপত্তি তথা ওজর পেশ করা যায় না।
টিকাঃ
৩২৫. ইনসাইক্লোপিডিয়া: ১০/৫৪৩
৩২৬. মুসনাদে আহমদ: ৬/২৬৯
📄 পঞ্চম অভিযোগ : নববী যুগে হাফেযদের সংখ্যা
ষষ্ঠ অভিযোগ : হযরত কাতাদাহ্ (রহ.)-এর একটি বর্ণনার উপর ভিত্তি করে কোনো কোনো ব্যক্তি পবিত্র কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের ব্যাপারে সংশয়ে পড়ে যান। সহীহ বুখারীতে বর্ণনাটি নিম্নোক্ত শব্দমালা দ্বারা বর্ণিত হয়েছে- قُلْتُ لِأَنَسِ بْنِ مَالِكٍ مَنْ جَمَعَ الْقُرْآنَ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ ؟ ؟ قَالَ أَرْبَعَةٌ كُلُّهُمْ مِنَ الأَنْصَارِ: أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ وَمُعَادُ بْنُ جَبَلٍ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ وَرَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ "আমি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূল (সা.)-এর যুগে কারা আল কুরআন সংকলন করেছেন? তিনি বললেন, চারজন। তাঁরা সবাই ছিলেন আনসারী। ১. হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.)। ২. হযরত মুআয ইবনে جাবাল (রা.)। ৩. হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)। ৪. হযরত আবু যায়েদ (রা.)।"
এই বর্ণনা দ্বারা কোনো কোনো ব্যক্তি এ ধারণা করেন যে, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমের হাফেয এই চারজনই ছিলেন। অথচ এ ধারণা সঠিক নয়। আমরা পূর্বে ওই সকল সাহাবায়ে কেরামের সম্মানিত নাম উল্লেখ করে এসেছি, যাঁরা রাসূলে খোদা (সা.)-এর যুগেই কুরআন মাজীদের হিফয করে নিয়েছিলেন। কাজেই হযরত আনাস (রা.)-এর বর্ণিত উপরোক্ত বর্ণনার উদ্দেশ্য কখনো এটা নয় যে, সমস্ত সাহাবায়ে কেরামের মাঝে এই চারজন ব্যতীত আর কোনো হাফেযে কুরআন ছিলেন না। বরং উপরোক্ত বর্ণনায় “কুরআনুল কারীমের সংকলন" করার শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই শব্দের সঠিক ভাবার্থ হচ্ছে কুরআনুল কারীমকে লিপিবদ্ধ করা। হযরত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্দেশ্য হলো, এই চারজন সেই মহান ব্যক্তি যাঁদের নিকট রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগেই পবিত্র কুরআনুল কারীম সম্পূর্ণরূপে লিপিবদ্ধ ছিল।
এতদ্ব্যতীত হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) তাবারী শরীফের একটি বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ওই উক্তির পূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন যে, একবার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে পরস্পর গর্ব ও অহঙ্কারের আলোচনা চলছিল। আউস গোত্রের লোকেরা নিজ গোত্রের এমন কয়েকজন ব্যক্তির নাম গণনা করলেন, ইসলামে যাদের বিশেষ মর্যাদা লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছে। এর প্রতি উত্তরে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা (যাদের মধ্যে হযরত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও শামিল ছিলেন), বললেন, আমাদের মধ্যে এমন চারজন ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা সমগ্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করেছিলেন। অতএব, উপরোক্ত বর্ণনার উদ্দেশ্য এটাও হতে পারে যে, আউস ও খাযরাজের গোত্রের মাঝে কুরআনুল কারীমকে সংকলনকারী ব্যক্তি ছিলেন এই চারজন।
টিকাঃ
৩২৭. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: ফাতহুল বারী: ৯/৪১-৪২