📘 উলুমুল কুরআন 📄 এ পরিচ্ছেদের সারাংশ

📄 এ পরিচ্ছেদের সারাংশ


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে 'কুরআন সংরক্ষণ বিষয়ক সন্দেহ এবং তার জবাব' শিরোনামে প্রাচ্যপন্ডিতদের থেকে আসা অভিযোগগুলো খন্ডন করেছেন। এ অধ্যায়টি প্রাচ্যবিদদের কোরআন সংরক্ষণ সম্পর্কিত বিভিন্ন ভুল বিশ্লেষিত বিষয়, অবান্তর এবং বানোয়াট সকল প্রশ্নের জবাবদান নিয়ে আলোচিত হয়েছে। এতে প্রাচ্যবিদদের গোয়ার্তুমি, হঠকারিতা ইত্যাদির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে মোট ১১টি প্রশ্ন উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর দ্বারা তারা কোরআন অসংরক্ষিত ছিল বলে দাবি করে থাকে।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 প্রাথমিক যুগের কিছু আয়াত সংরক্ষিত নেই

📄 প্রাথমিক যুগের কিছু আয়াত সংরক্ষিত নেই


প্রথম অভিযোগ : প্রসিদ্ধ প্রাচ্য বিশারদ পন্ডিত এফ. বুহল (Buhl) এই দাবী করেছেন যে, নবী কারীম (সা.)-এর রেসালাত যুগের শুরুদিকে পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করা হতো না। বরং তা সংরক্ষণের পুরো ভিত্তি ছিল রাসূলে আকরাম (সা.) ও তাঁর সাহাবাদের স্মৃতিশক্তির উপর। তাই এটা অবশ্যই সম্ভব যে প্রাথমিক যুগের কুরআনের আয়াতগুলো সংরক্ষিত রয়নি। এই দাবীর স্বপক্ষে নিম্নোক্ত দু'টি আয়াতকে পেশ করেছেন-
( سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ) 'আমি আপনাকে পাঠ করাতে থাকব, ফলে আপনি ভুলবেন না। তবে আল্লাহ যা চান তা ব্যতীত।'
مَا نَنسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِّنْهَا أَوْ مِثْلِهَا .. 'আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তখন এর চেয়েও উত্তম বা এর সম-মানের আয়াত নিয়ে আসি।'

কিন্তু যে ব্যক্তিই পবিত্র কুরআনুল কারীম ও এর তাফসীরের ব্যাপারে সামান্যতম জ্ঞান রাখেন, তিনি এই অভিযোগের অসারতা অনুভব করতে সক্ষম হবেন। কেননা এ দু'টি আয়াতে পবিত্র কুরআনুল কারীমের মানসূখ [রহিত] আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। প্রথম আয়াতের শানে নুযূল হলো, যখন হযরত জিবরাঈল (আ.) পবিত্র কুরআনুল কারীমের কিছু আয়াত নিয়ে উপস্থিত হতেন, তখন রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেগুলো ভুলে যাবার আশঙ্কায় বার বার পুনঃচর্চা করতেন। এতে তাঁর কঠোর পরিশ্রম হতো। এ আয়াতে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অভয়বাণী দেওয়া হয়েছে যে, তা আত্মস্থ করার জন্য আপনার এত কষ্ট সাধনের প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ তা'আলা নিজেই পবিত্র কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। কাজেই রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওই আয়াতগুলো ভুলতে পারেন না। কিন্তু এর উপর প্রশ্ন হতে পারে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের কিছু আয়াত তো পরবর্তীতে মানসূখ হয়ে যাওয়ার কারণে স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্যই (إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ) (তবে আল্লাহ যা চান)-শব্দ কয়টি বর্ধিত করা হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে, যখন মহান আল্লাহ তা'আলা কোনো আয়াতকে মানসূখ করবেন, তখনই কেবল ওই আয়াতটি তাঁর স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হতে পারবে, অন্যথায় নয়।

অনুরূপভাবে দ্বিতীয় আয়াতেও বেশির চেয়ে বেশি এতটুকু বর্ণনা করা হয়েছে যে, কিছু আয়াত মানসূখ হয়ে যাওয়ার ভিত্তিতে রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতি থেকে শুধু রহিত সেই আয়াতটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, অন্যান্য আয়াত নয়। সুতরাং, উপরোক্ত আয়াত দু'টি থেকে বেশির চেয়ে বেশি যা সাব্যস্ত হয় তা হলো, কতক আয়াতকে যখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানসূখ (রহিত) করে দিলেন, তখন সেগুলোর লিখিত অক্ষরগুলোকে তো বিলুপ্ত করার নির্দেশ দেওয়াই হয়েছে, সাথে সাথে ওই আয়াতগুলোকে মানুষের স্মৃতি থেকেও বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় অরহিত আয়াতগুলোর ব্যাপারে তো সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, রাসূলে আকরাম কখনো সেগুলোকে ভুলতে পারবেন না। এ থেকে অবশেষে এই ফল কিভাবে বেরিয়ে আসল যে, যে আয়াতগুলো রহিত হয়নি সেগুলো ভুলে যাবারও কোনো সম্ভাবনা রয়েছে?

উল্লেখিত উপরোক্ত আয়াত দু'টি দ্বারা এ কথার দলীল দেওয়া যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে পবিত্র কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধ করা হতো না—এটি একটি অকাট্য ভিত্তিহীন ও অসার দলীল। আমরা পূর্বে বলে এসেছি যে, হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সাহাবায়ে কেরামের নিকট পবিত্র কুরআন মাজীদের আয়াতসমূহ লিপিবদ্ধ থাকার কথা মুসতানাদ বা গ্রহণযোগ্য সনদসূত্রে প্রমাণিত আছে। সুতরাং প্রথম আয়াতে শুধু নসিয়ান (বিস্মৃত) হওয়ার কথা উল্লেখ করে এ কথা বুঝানো হয়নি যে, ওই সময় পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ অবস্থায় ছিল না। বরং আসল কথা হচ্ছে এখানে শুধু নসিয়ান-এর আলোচনাই চলে আসছিল। তাই এখানে লিখিত আয়াতগুলোকে নসখ করার কথা উল্লেখ করা হলে তা হবে অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিক। আর এ কারণেই দ্বিতীয় আয়াতটিতেও যেহেতু নসখই হচ্ছে আলোচনার বিষয়, তাই এতে "নসখ” (লিখিত আয়াতকে বিলুপ্ত করা) এবং নসিয়ান (বিস্মৃত করা) উভয়টার উল্লেখ করা হয়েছে। "নসখ”-এর আভিধানিক অর্থ হলো, দূরীভূত করা এবং বিলুপ্ত করা। অতএব, এই শব্দটিই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম লিখিত অবস্থায় বিদ্যমান ছিল এবং এর কতক আয়াতকে মানসূখ হওয়ার ভিত্তিতে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো যে, এই আয়াত যা পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ থাকার উপর সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করছে, সেটাকেই ওই বুহল (Buhl) কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ না থাকার উপর দলীল হিসেবে উপস্থাপন করছেন!

টিকাঃ
৩১৩. Buhl: Encyclopedia of Islam P. 1067. V. 3 QURAN.
৩১৪. সূরা আলা: ৬-৭
৩১৫. সূরা বাকারা: ১০৬
৩১৬. তাফসীরে কুরতুবী: ২০/১৮

📘 উলুমুল কুরআন 📄 প্রথম অভিযোগ : একদা একটি আয়াত রাসূল (সা.)-এর স্মরণ ছিল না

📄 প্রথম অভিযোগ : একদা একটি আয়াত রাসূল (সা.)-এর স্মরণ ছিল না


দ্বিতীয় অভিযোগ : প্রাচ্য পন্ডিত ডি. এস. মারগোলিয়থ সহীহ বুখারী ও মুসলিমের একটি হাদীসের উপর ভিত্তি করে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণকে সংশয়পূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত আছে যে, এক রাতে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মসজিদে এক সাহাবীকে কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করতে শুনে বললেন- رحمه الله, لقد أذكرني كذا وكذا آية انسيتها 'অর্থাৎ আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন, সে আমাকে এমন একটি আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যা আমি ভুলে গিয়েছিলাম।'

এ বর্ণনাটি উল্লেখ করে মারগোলিয়থ বুঝাতে চান যে, যদি কোনো এক সময়ে রাসূলে খোদা (সা.)-এর একটি আয়াত বিস্মৃত হওয়া সম্ভব হয়, তাহলে (নাঊযুবিল্লাহ) অন্য আয়াতও বিস্মৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি এ বর্ণনা দ্বারা সম্ভবত এটাও সাব্যস্ত করতে চান যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ ছিল না। যদি লিপিবদ্ধ থাকতো, তাহলে তিনি এ আয়াতটি ভুলতেন না।

কিন্তু এই অভিযোগটি এতই অসার ও ভিত্তিহীন যে, সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন একজন ব্যক্তিও এটাকে মেনে নিবে না। কেননা উপরোক্ত ঘটনার বাস্তবতা কেবল এতটুকুই যে, অধিকাংশ সময় কোনো একটি বিষয় মানুষের স্মরণে তো থাকে, কিন্তু দীর্ঘ সময় নিয়ে এর আলোচনা না হওয়ার কারণে এর প্রতি খেয়াল যায় না। তাই তা স্মৃতিতে উপস্থিত থাকে না। যখনই কোনো ব্যক্তি এর আলোচনা করে সঙ্গে সঙ্গেই তা স্মৃতিভান্ডারে সতেজ হয়ে উঠে। প্রকৃতপক্ষে এটাকে ভুল বলা হয় না। বরং সাম্পয়িকভাবে তা খেয়াল থেকে বের হয়ে যায়। নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বেলায় তা-ই ঘটেছিল।

তাই এ ধরনের ঘটনার উপর ভিত্তি করে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি নসিয়ান (বিস্মৃত) হওয়ার সম্বন্ধ করা চরম পর্যায়ের বে-ইনসাফী। যার উদ্দেশ্য গোঁড়ামী ছাড়া আর কিছু নয়। বরং মিষ্টার মারগোলিয়থ যদি গভীর ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখতেন, তাহলে তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন যে, এই ঘটনা থেকে এ বিষয়টি সাব্যস্ত হয় যে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআন মাজীদ সংরক্ষণের এমন এক অসাধারণ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, যার কোনো অংশ হারিয়ে যাবার সম্ভাবনাই নেই। কারণ এ ঘটনা থেকে যদি কোনো হাকীকত সাব্যস্ত হয় তাহলে তা হলো এই যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের এক একটি আয়াত এত অসংখ্য মানুষের আত্মস্থ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, যদি ঘটনাক্রমে কখনো কোনো আয়াত সাময়িকভাবে রাসূলে কারীম (সা.)-এর স্মৃতিভান্ডারে উপস্থিত না থাকে, তাহলেও তা অরক্ষিত বা নষ্ট হয়ে যাবার দূরবর্তী কোনো আশঙ্কাও নাই।

এখানে কথা উঠতে পারে যে, এ ঘটনা থেকে জানা যায় যে, 'কুরআনুল কারীম লিখিত আকারে বিদ্যমান ছিল না।' এ কথাটি প্রথম কথার চেয়ে অধিক ভিত্তিহীন ও হাস্যকর। আমরা আরয করেছি যে, এ ঘটনার মূল বিষয় হচ্ছে, একটি আয়াত ঘটনাক্রমে সাময়িকভাবে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর স্মৃতিভান্ডারে উপস্থিত ছিল না। যা একজন সাহাবীর তেলাওয়াতের সাথে সাথেই তাঁর স্মৃতিতে সতেজ হয়ে উঠে। এর দ্বারা কিভাবে এটা সাব্যস্ত হয় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ অবস্থায় ছিল না? এই প্রাচ্য পন্ডিতজী কি মনে করেন যে, যা একবার লিপিবদ্ধ করে নেওয়া হয়, তা আর এক মুহূর্তের জন্যও স্মৃতিভান্ডার থেকে অনুপস্থিত হতে পারে না? আর জগদ্বাসীর তো এ কথা জানাই আছে যে, রাসূলে খোদা (সা.) ছিলেন উম্মী। অর্থাৎ, তিনি লিখতে ও পড়তে জানতেন না। তাই পবিত্র কুরআন মাজীদকে স্মরণ রাখার জন্য লিপিবদ্ধকরণের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্কই ছিল না। অতএব, উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ না থাকার উপর ওই ব্যক্তিই দলীল-প্রমাণ পেশ করতে পারে, যে নিজের উপর ইনসাফ ও নিরপেক্ষতার সকল দরজা রুদ্ধ করে দিয়েছে।

টিকাঃ
৩১৭. Margoliouth, D. S. Encyclopedia of Religion and Ethics P. 543.
৩১৮. সহীহ বুখারী: ২/৭৫৩, সহীহ মুসলিম: ১/২৬৭

📘 উলুমুল কুরআন 📄 দ্বিতীয় অভিযোগ : সূরা নিসা'য় সূরা আনআমের উদ্ধৃতি

📄 দ্বিতীয় অভিযোগ : সূরা নিসা'য় সূরা আনআমের উদ্ধৃতি


তৃতীয় অভিযোগ : প্রফেসর মারগোলিয়থ পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ না থাকার উপর আর একটি আজব ও আশ্চর্যকর দলীল পেশ করেছেন। তা হলো, সূরা নিসার আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ 'এবং নিশ্চয়ই তিনি গ্রন্থের মাধ্যমে তোমাদের আদেশ করছেন যে, তোমরা যখন আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি অবিশ্বাস করা এবং তাঁর প্রতি উপহাস করা হচ্ছে শ্রবণ কর তখন তাদের সাথে (বৈঠকে) উপবেশন করো না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কথার আলোচনা করে;'। এই আয়াতটি মাদানী। আর এতে সূরা আনআমের নিম্নোক্ত মাক্কী আয়াতটির উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে- وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ 'আর যখন আপনি তাদেরকে দেখবেন, যারা আমার আয়াতসমূহের ব্যাপারে উপহাসমূলক সমালোচনায় রত আছে, আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন, যতক্ষণ না তারা অন্য কথাবার্তায় লিপ্ত হয়।'

প্রথম আয়াতে দ্বিতীয় আয়াতের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উভয় আয়াতের শব্দমালা ভিন্ন ভিন্ন। মারগোলিয়থ এটা থেকে এ ফলাফল বের করেছেন যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ ছিল না। যদি লিপিবদ্ধই থাকতো, তাহলে প্রথম আয়াতে অবিকল ওই শব্দগুলোই থাকতো যা দ্বিতীয় আয়াতে উল্লেখ আছে। শব্দের এই ভিন্নতার কারণে বুঝা যায় যে, প্রথম আয়াত অবতীর্ণ হবার সময় দ্বিতীয় আয়াতের শব্দাবলী (নাঊযুবিলাহ) সংরক্ষিত ছিল না।

কিন্তু মারগোলিয়থের উপস্থাপিত এ দলীলটি এতই স্পষ্ট ভ্রান্ত যে, এর জবাব দিতেও লজ্জা লাগে। প্রশ্ন হলো, যদি সূরা নিসা অবতীর্ণ হবার সময় সূরা আনআমের উল্লিখিত আয়াতের শব্দমালা (নাঊযুবিল্লাহ) সংরক্ষিত না-ই থেকে থাকে তাহলে পরবর্তীতে তা কিভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমে লিপিবদ্ধ করা হলো? যদি সূরা আনআমের মূল শব্দমালা সংরক্ষিত না থাকত তাহলে নিয়ম-নীতির দাবী তো ছিল এটাই যে পরবর্তীতে লিখিত সূরা আনআমেও অবিকল ওই শব্দমালা লিপিবদ্ধ করা, যা সূরা নিসা'য় উল্লেখ রয়েছে। এ উভয় আয়াতের শব্দগত পার্থক্য প্রকৃতপক্ষে এ কথাই প্রমাণ করে যে, উভয় আয়াতের শব্দমালা সর্বদাই পুরোপুরিভাবে সংরক্ষিত ও অবিকৃত ছিল এবং তাতে কারো কেয়াস এবং ধারণার কোনো অবকাশ বাকি ছিল না। কারণ পবিত্র কুরআনুল কারীমের লিপিবদ্ধকরণ যদি কেয়াস ও ধারণা দ্বারাই হতো, তাহলে উভয় আয়াতের শব্দমালার মাঝে কোনো পার্থক্য না হওয়াটাই সমীচীন ছিল।

আসল কথা হলো, প্রত্যেক ভাষার বাক-পদ্ধতিতে যখন কোনো প্রাক্তন আলোচনার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়, তখন তা দু'ভাবে দেওয়া হয়ে থাকে। কখনো প্রাক্তন আলোচনাকে অবিকল শব্দমালা দ্বারা পুনরাবৃত্তি করা হয় (Direct Narration)। আবার কখনো অবিকল শব্দমালার পুনরাবৃত্তি না করে শুধুমাত্র মূল আলোচনার ভাবার্থকে অন্যান্য শব্দমালা দ্বারা বর্ণনা করে দেওয়া হয় (Indirect Narration)। এই দুই প্রকারের মধ্যে সাহিত্যের রীতি অনুযায়ী দ্বিতীয় প্রকারটিই অধিক সমাদৃত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মূল আলোচনার ভাবার্থকে অন্য শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। সূরা নিসা'তেও এই দ্বিতীয় প্রকারটিই অবলম্বন করা হয়েছে। এর আরেকটি কারণ এও হতে পারে যে, কুরআনুল কারীমের প্রত্যেকটি সূরার নিজ নিজ বাক্য-গঠনে পৃথক পৃথক শৈলীর অবলম্বন পরিলক্ষিত হয়। কাজেই যদি কোনো একটি সূরার বাক্যগুলোর মাঝে অন্য সূরার কোনো বাক্যকে অবিকল জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে আয়াতের ধারাবাহিকতা (Sequence)-এর মাঝে ফাটল সৃষ্টি হয় এবং বাক্যের প্রবাহ (Flow) স্থির থাকে না। তাই যে ব্যক্তির সামান্যতমও সাহিত্য প্রীতি রয়েছে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, যদি সূরা নিসা'র উল্লিখিত আয়াতে সূরা আনআমের শব্দমালা হুবহু নকল করে দেওয়া হয়, তাহলে ইবারতের গাঁথুনী এবং ছন্দ বিনষ্ট হবে।

এতদ্ব্যতীত সূরা আনআম—যার উল্লিখিত আয়াতের ব্যাপারে মারগোলিয়থের দাবী হলো যে, তা লিপিবদ্ধ ছিল না, সম্পূর্ণতা একসাথেই অবতীর্ণ হয়েছে: وَهُدَى كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ مُّصَدِّقُ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ 'আর এই (কুরআন) এমন একটি কিতাব, যা আমি নাযিল করেছি, বরকতময়, যা তার পূর্বে (অবতীর্ণ) গ্রন্থসমূহ (তাওরাত, ইনজীল ইত্যাদি)-এর সত্যায়নকারী।' এ আয়াতে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে বুঝানোর জন্য “কিতাব” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যদি সূরা আনআম অবতীর্ণ হওয়ার সময় পর্যন্ত পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ না থাকতো, তাহলে সেটাকে "কিতাব” বলার অর্থ কি?

টিকাঃ
৩১৯. সূরা নিসা: ১৪০
৩২০. সূরা আনআম: ৬৮
৩২১. ইনসাইক্লোপিডিয়া: ১০/৫৪২
৩২২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/১২২
৩২৩. সূরা আনআম: ৯২

ফন্ট সাইজ
15px
17px