📄 ওয়াক্ফ বা যতিচিহ্ন সমূহ
তেলাওয়াত ও তাজভীদের সহজতার জন্য আরো একটি উপকারী কাজ করা হয়েছে যে, কুরআনের বিভিন্ন বাক্যের উপর এমন কিছু যতিচিহ্ন লিখে দেওয়া হয়েছে, যা দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে ওয়াকফ করা (শ্বাস নেওয়া) কেমন? এই চিহ্নগুলোকে "রুমূযে আওক্বাফ” বলা হয়। যেগুলোর উদ্দেশ্য হলো, যখন একজন অনারবী ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত করবে, সেও যেন সঠিক স্থানে ওয়াকফ করতে পারে এবং ভুল জায়গায় ওয়াকফ করার কারণে অর্থের মধ্যে কোনো বিকৃতি না ঘটে। এই চিহ্নগুলোর অধিকাংশ সর্বপ্রথম আল্লামা আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে তাইফুর সাজাওয়ান্দী (রহ.) সংযোজন করেন। ওই চিহ্নগুলোর বিবরণ নিম্নে দেওয়া হলো:
ط = এই চিহ্নটি “ওয়াকফে মুতলাক"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে এসে কথা পূর্ণ হয়ে গেছে। তাই এখানে থামাটা উত্তম।
ج = "ওয়াকফে জায়েয”-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে থামা জায়েয।
ز = এটি "ওয়াকফে মুজাওওয়ায"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এখানে থামা জায়েয; তবে না থামাটাই উত্তম।
ص = এটি "ওয়াকফে মুরাখখাস"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এখানে কথা তো পুরো হয়নি; তবে বাক্য যেহেতু দীর্ঘ হয়ে গেছে, তাই শ্বাস নেওয়ার জন্য অন্য স্থানে থামার পরিবর্তে এখানেই থামা উচিত।
م = এটি “ওয়াকফে লাযেম"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে যদি থামা না হয়, তাহলে আয়াতের অর্থের মধ্যে মারাত্মক ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এখানে থামাটাই অধিক উত্তম। কোনো কোনো ব্যক্তি এটাকে "ওয়াকফে ওয়াজিব" ও বলে থাকেন। তবে এর দ্বারা উদ্দেশ্য ফেকহী ওয়াজিব নয় যে, এখানে না থামলে গোনাহ হবে। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে, সকল ওয়াকফের মধ্যে এখানে থামাটাই সর্বোত্তম।
لا = এটি لا تقف (লা তাকিফ)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে থামবে না। তবে থামা একেবারেই নাজায়েয এমনটা নয়। বরং এ চিহ্নবিশিষ্ট এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে থামতে কোনো অসুবিধা নেই এবং এর পরবর্তী আয়াত থেকে তেলাওয়াত করা যেতে পারে। তবে এখানে থামলে, (পরের শব্দ থেকে শুরু না করে বরং) পুনরায় আগের আয়াতের সাথে মিলিয়ে পড়াটাই উত্তম।
উপরোক্ত যতিচিহ্নগুলোর ব্যাপারে তো নিশ্চিত করে বলা যায় যে, আল্লামা সাজাওয়ান্দী (রহ.) এগুলোর প্রবর্তক। কিন্ত এগুলো ছাড়াও পবিত্র কুরআনুল কারীমে আরো কিছু চিহ্ন ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সেগুলো নিম্নরূপ-
مع = এটা "মু'আনাকা” শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই চিহ্নটি ওই স্থানে লেখা হয় যেখানে একই আয়াতের দুই ধরনের তাফসীর হতে পারে। এক তাফসীর অনুযায়ী এখানে বাক্য শেষ এবং অন্য তাফসীর অনুযায়ী পরবর্তী চিহ্নে বাক্য শেষ হওয়াকে বুঝায়। কাজেই দুই স্থানের যে কোনো এক স্থানেই থামা যেতে পারে। তবে এক স্থানে থামার পর দ্বিতীয় স্থানে থামা ঠিক নয়। এই চিহ্নটির আরো একটি নাম হলো, “মুকাবিলা”। এই চিহ্নের সর্বপ্রথম প্রচলন করেন ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)।
সাকতাহ = এটা "সেকতা"-এর চিহ্ন। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে থামতে হবে। তবে শ্বাস ছাড়তে পারবে না; বরং চালু রাখতে হবে। এটা সাধারণত এমন স্থানে ব্যবহার করা হয় যেখানে না থেমে, বরং পরবর্তী শব্দের সাথে মিলিয়ে পড়তে গেলে অর্থের ক্ষেত্রে ভুল বুঝার সম্ভাবনা থাকে।
ওয়াকফাহ্ = এ চিহ্নযুক্ত স্থানে সেকতার চাইতে একটু বেশি সময় ধরে থামতে হবে। কিন্তু শ্বাস এখানেও জারী রাখতে হবে।
ق = قيل عليه الواقف এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কারো মতে এখানে থামা যাবে আর কারো মতে থামা যাবে না।
قف = এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, থেমে যাও। এটি এমন স্থানে ব্যবহার করা হয় যেখানে তেলাওয়াতকারীর এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, এখানে থামা যাবে না।
صلى = الوصل اولى এর সংক্ষিপ্ত রূপ। যার অর্থ হচ্ছে, পূর্বাপর মিলিয়ে পড়া উত্তম।
صل = এটা قد يوصل এর সংক্ষিপ্ত রূপ। অর্থাৎ এখানে কেউ কেউ থামার কথা বলেন আর কেউ কেউ মিলিয়ে পড়াকে পছন্দ করেন।
এই যতিচিহ্নগুলো খুবই প্রসিদ্ধ। কিন্তু ইহা এখনও জানা যায়নি যে, কে এগুলোর বর্ণনাকারী?
টিকাঃ
৩০০. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৫৫
৩০১. এই চারটি চিহ্নের ব্যাখ্যার জন্য দেখুন: "আল-মানহুল ফিকরিয়্যাহ [মোল্লা আলী কারী] পৃঃ ৬৩
৩০২. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৩১
৩০৩. প্রাগুক্ত: পৃ: ২৩৩
৩০৪. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৩৭
📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমের মুদ্রণ
যতদিন পর্যন্ত প্রেস বা ছাপাখানা আবিষ্কার হয়নি ততদিন পর্যন্ত পবিত্র কুরআন মাজীদের সকল কপি হাতে লেখা হতো। প্রত্যেক যুগে লেখকদের এমন একটি দল বিদ্যমান ছিলেন, কুরআন লেখা ছাড়া যাদের আর কোনো ধ্যান-জ্ঞান ছিল না। পবিত্র কুরআনুল কারীমের অক্ষরগুলোকে সুন্দর ও সৌন্দর্য মণ্ডিত করে লেখার জন্য মুসলমানরা যে সাধনার সাক্ষর রেখেছেন এবং এ মহা গ্রন্থের সাথে অন্তরঙ্গ ভালোবাসার পরিচয় দিয়েছেন এর বিস্তারিত ও চিত্তাকর্ষক ইতিহাস রয়েছে। যার জন্য একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থের প্রয়োজন। এখানে বিস্তারিত আলোচনার স্থান নেই।
অতঃপর যখন ছাপাখানা আবিষ্কার হলো, তখন সর্বপ্রথম জার্মানীর হামবুর্গ শহরে ১১১৩ হিজরীতে পবিত্র কুরআনুল কারীম ছাপানো হয়। যার একটি কপি এখনো মিসরের 'দারুল কুতুব'-এ সংরক্ষিত রয়েছে। এরপর বহু প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতগণ কুরআনুল কারীমের কপি মুদ্রণ করেন। কিন্তু তাদের মুদ্রিত কুরআনুল কারীমের এই কপিগুলো মুসলিম বিশ্বে মোটেও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে সক্ষম হয়নি। পরবর্তীতে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম মাওলায়ে উসমান রাশিয়ার 'সেন্ট পিটার্সবার্গ' শহরে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে কুরআনুল কারীমের একটি কপি মুদ্রণ করে। অনুরূপভাবে 'কাযান' শহরেও একটি কপি ছাপানো হয়। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ইরানের 'তেহরানে' কুরআনুল কারীমকে পাথরের উপর ছাপানো হয়। অতঃপর এ মুদ্রিত কপি গোটা বিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
টিকাঃ
৩০৫. কুরআন মুদ্রণের ইতিহাস জানার জন্য দেখুন: কুরদী (রহ.) রচিত "তারীখুল কুরআন" পৃ: ১৮৬, সবহী সালেহ রচিত "উলূমুল কুরআন" পৃ: ১৪২
📄 পঞ্চম ধাপ : কেরাতগুলো ও সেগুলোর সংকলন
প্রকাশ থাকে যে, পূর্বে "সাত হরফ”-এর আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, তেলাওয়াতের সহজ-সাধ্যের জন্য মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন মাজীদকে একাধিক ক্বেরাতের উপর অবতীর্ণ করেছেন। ক্বেরাতের এই বিভিন্নতার কারণে আয়াতের সামগ্রিক অর্থের মধ্যে তো কোনো পরিবর্তন সৃষ্টি হয় না। কিন্তু তেলাওয়াত ও উচ্চারণ করার ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যার কারণে বহু মানুষের জন্য তেলাওয়াত করা সহজ হয়ে গেছে। মুসলিম উম্মাহ প্রত্যেক যুগেই পবিত্র কুরআনুল কারীমের এই ক্বেরাতগুলোকে সংরক্ষণ করে আসছেন এবং এ লক্ষ্যে তারা নযীরবিহীন খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।
আমরা আগেই উল্লেখ করে এসেছি যে, পবিত্র কুরআন মাজীদের প্রচার ও প্রসারের মূল মাধ্যম লিখনীর পরিবর্তে স্মৃতিশক্তি, নকল ও রেওয়ায়েতের উপরই ছিল। ওদিকে এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, মাসহাফে উসমানীকে নুকতা ও হরকত থেকে মুক্ত রাখা হয়েছিল। যেন এতে সর্বজনস্বীকৃত সবগুলো ক্বেরাতের সংকুলান হয়ে যায়। তাই তো হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যখন এই মাসহাফ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেছেন, তখন তিনি এগুলোর সাথে এমন ক্বারী সাহেবগণকে প্রেরণ করেছেন, যারা এগুলোর তেলাওয়াত শিক্ষা দিতে পারবেন। ক্বারী সাহেবগণ যখন বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেছেন, তখন তাঁরা নিজ নিজ ক্বেরাত অনুযায়ী মানুষদেরকে পবিত্র কুরআনুল কারীম শিক্ষা দিয়েছেন।
আর এভাবেই বিভিন্ন ক্বেরাতগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো মনীষী পবিত্র কুরআনুল কারীমের এই বিভিন্ন প্রকারগুলো নিজে শিখতে এবং অন্যদেরকে শিখানোর পেছনে নিজের গোটা জীবনকে ওয়াক্ফ করে দিয়েছিলেন এবং দিচ্ছেন। আর এভাবেই "ইলমে ক্বেরাত”-এর গোড়া পত্তন হয়ে যায় এবং প্রত্যেক অঞ্চলের মানুষ এই ইলমে যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য ক্বেরাতের ইমাম বা ক্বেরাত বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হতে শুরু করেছেন।
আবার কেউ শুধু একটি ক্বেরাত, কেউ দুটি, কেউ তিনটি, কেউ সাতটি, আবার কেউ তার চেয়ে অধিক ক্বেরাত নিজের স্মৃতিভান্ডারে সংরক্ষণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে সর্বজনস্বীকৃত একটি নীতিমালা ছিল এবং সব জায়গায় সে অনুযায়ীই কার্যক্রম চলতো। আর সেটা হলো, শুধুমাত্র ওই ক্বেরাতটিই পবিত্র কুরআনুল কারীমের ক্বেরাত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে, যার মধ্যে নিম্নোক্ত তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে।
১. উসমানী মাসহাফের লিখন পদ্ধতিতে এর অবকাশ থাকা।
২. আরবী সরফ (শব্দ-প্রকরণ) ও নাহু (বাক্য-প্রকরণ) অনুযায়ী হওয়া।
৩. সহীহ সনদসূত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হওয়া এবং ক্বেরাতের ইমামগণের নিকট প্রসিদ্ধ হওয়া।
যে ক্বেরাতে এই তিনটি শর্তের মধ্য হতে কোনো একটি শর্ত অনুপস্থিত থাকত সেটাকে কুরআনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হতো না। এভাবে মুতাওয়াতির ক্বেরাতসমূহের বিরাট একটি সংখ্যা বংশ পরম্পরায় স্থানান্তরিত হয়ে আসতে থাকে। সহজ-সাধ্যের জন্য এমনও হয়েছে যে, একই ইমাম একটি অথবা কয়েকটি ক্বেরাত গ্রহণ করে সেগুলোর শিক্ষা দান করতে শুরু করেন। ফলে সেই ক্বেরাতটি ওই ইমামের নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করে। তারপর উলামায়ে কেরাম সেই ক্বেরাতগুলো সংকলন করার নিমিত্তে গ্রন্থ রচনা করতে শুরু করেন। অতঃপর আল্লামা আবু বকর আহমদ ইবনে মূসা ইবনে আব্বাস ইবনে মুজাহিদ (রহ.) (মৃত্যু: ৩২৪ হিজরী) একটি কিতাব রচনা করেন। যার মধ্যে শুধু সাতজন ক্বারীর ক্বেরাত স্থান পেয়েছিল। তাঁর এই গ্রন্থ এমনভাবে ক্বেরাতগুলো অনেক প্রসিদ্ধি লাভ করে। বরং কেউ কেউ এ ধারণাও করতে লাগল যে, বিশুদ্ধ ও মুতাওয়াতির ক্বেরাতগুলোই। অন্যান্য ক্বারীদের ক্বেরাতগুলো বিশুদ্ধ ও মুতাওয়াতির নয়। অথচ বাস্তবতা হলো এই যে, আল্লামা ইবনে মুজাহিদ (রহ.) শুধু ঘটনাচক্রে এ ক্বেরাতগুলোকে সংকলন করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য কক্ষনো এটা ছিল না যে, এগুলো ছাড়া অন্যান্য ক্বেরাতগুলো ভুল ও অগ্রহণযোগ্য। আল্লামা ইবনে মুজাহিদ (রহ.)-এর এ রচনাকর্ম দ্বারা আরো একটি ভুল ধারণার সৃষ্টি হয় যে, কেউ কেউ "সাত হরফ" দ্বারা ইবনে মুজাহিদ সংকলিত সাত ক্বেরাতকে বুঝানো হয়েছে বলে ধারণা করতে শুরু করে। অথচ "সাত হরফ"-এর বিশুদ্ধ ও সঠিক ব্যাখ্যা সেটাই, যা পেছনে স্বতন্ত্র একটি শিরোনামের অধীনে আলোচিত হয়েছে।
আমাদের যুগের প্রসিদ্ধ প্রাচ্যবিদ পণ্ডিত মোনটেগম্রী ওয়াট (Montgomery Watt) নিজের শিক্ষক বেল (Bell)-এর অনুকরণ করতে গিয়ে আল্লামা ইবনে মুজাহিদ (রহ.)-এর বক্তব্যের যে ভুল ব্যাখ্যা করেছেন, সে দিকে একটু ইঙ্গিত করা সমীচীন মনে করছি। বাস্তবতা হলো, ওয়াট (Watt)-এর একটি কথাও সঠিক নয়। আমরা আগেই বলে এসেছি যে, ওই যুগে বিভিন্ন আলেম ও ক্বারীগণ নিজ নিজ সুবিধার জন্য কয়েকটি করে ক্বেরাত একই গ্রন্থে সংকলন করে রেখেছিলেন। মুহাক্কিক আলেমগণ এ ধারণাকে সর্বদা প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। ইলমে ক্বেরাতের নির্ভরযোগ্য সর্বজনস্বীকৃত এবং 'মুহাক্কিক' উপাধিতে ভূষিত আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) তাঁর গ্রন্থসমূহে এ ধারণাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এবং আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ক্বেরাতের বহু ইমামের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। যার মধ্যে এ কথা সুস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, ইবনে মুজাহিদ (রহ.) শুধু সাত মাসহাফের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে সাতটি ক্বেরাত সংকলন করেছেন। অন্যথায় অন্যান্য ক্বেরাতগুলো ভুল অথবা অনির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। এখানে বাকি রইল ইবনে মুকসিম (রহ.) ও ইবনে শিনবৃষ (রহ.)-এর কথা। মূলত উলামায়ে কেরাম তাঁদের যে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার কারণ এই ছিল না যে, তাঁরা এই সাত ক্বেরাত ব্যতীত অন্যান্য ক্বেরাতকে বিশুদ্ধ মনে করেন না কেন? বরং তার কারণ ছিল এই যে, সমস্ত উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেন যে, কারো ক্বেরাত বিশুদ্ধরূপে গণ্য করার জন্য তাতে তিনটি বিষয় পাওয়া যাওয়া আবশ্যক (উপরে উল্লিখিত ৩টি শর্ত)। ইবনে মুকসিম (রহ.)-এর বক্তব্য ছিল, ক্বেরাতকে বিশুদ্ধরূপে গণ্য করার জন্য শুধু প্রথম দু'টি শর্তই যথেষ্ট। আর ইবনে শিনবৃষ তাঁর বিপরীত বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি কোনো ক্বেরাত বিশুদ্ধ সনদসূত্রে বর্ণিত হয়, তাহলে সেটা মাসহাফে উসমানীর লিখন পদ্ধতি অনুযায়ী না হলেও গ্রহণ করা যাবে। এর ভিত্তিতেই উম্মাহ'র সকল আলেম তাঁদের দু'জনকে প্রতিহত করেছেন। অবশেষে তাঁরা উভয়ই জামহুর উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন।
টিকাঃ
৩০৬. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/৩৪
৩০৭. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/১৬, ১/৭৮-৭৯
৩০৮. Watt: W. Montgomery; Bell's Introduction to the Quran P. P. 48, 49.
৩০৯. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/৩৫-৩৬
৩১০. ফাতহুল বারী: ৯/২৫-২৭, আল-ইতকান ১/৮২-৮৩
৩১১. ইবনে মুকসিম (রহ.)-এর পুরো নাম হলো, আবু বকর মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ইবনে ইয়াকুব এবং ইবনে শিনবৃষ (রহ.)-এর পুরো নাম হলো, মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আইউব।