📄 আখমাস ও আশার
প্রথম যুগের পবিত্র কুরআনুল কারীমের কপিগুলোতে আরো কিছু চিহ্নের প্রচলন ছিল। আর তা হলো, প্রতি পাঁচ আয়াতের পর (خمس বা সংক্ষেপে خ) এবং প্রতি দশ আয়াতের পর (عشر অথবা সংক্ষেপে ع) লিখে দেওয়া হতো। প্রথম প্রকারের চিহ্নগুলোকে اخماس (আখমাস) এবং দ্বিতীয় প্রকার চিহ্নগুলোকে اعشار (আ'শার) বলা হতো। কিন্তু এ দু'টি বর্ণনার কোনোটিকেই সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামের যুগেই "আশর"-এর চিহ্ন থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে- عن مسروق عن عبد الله انه كره التعشير في المصحف 'মাসরূক (রহ.) বলেন, হযরত আবদুল্লাহ মাসউদ (রাযিআল্লাহু আনহু) মাসহাফের মধ্যে "আ'শার" চিহ্নের ব্যবহারকে মাকরূহ মনে করতেন।' এ থেকে বুঝা যায় যে "আ'শার” চিহ্নের ব্যবহার সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
টিকাঃ
২৯৬. মানাহিলুল ইরফান: ১/৪০৩
২৯৭. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৪৯৭
📄 রুকু চিহ্ন
পরবর্তীতে আরো একটি চিহ্নের ব্যবহার প্রচলিত হয়েছে এবং আজ পর্যন্ত তা চালু আছে। আর সেটা হলো, রুকু'র চিহ্ন। আলোচিত বিষয়বস্তুর অনুসরণে এ চিহ্নটি নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ যেখানে একটা প্রসঙ্গ শেষ হয়েছে সেখানে পৃষ্ঠার পাশে রুকু'র চিহ্নের জন্য ع অক্ষর লিখে দেওয়া হয়েছে। এই চিহ্নটি কে চালু করেছেন এবং কার আমল থেকে চালু হয়েছে? অধমের অনুসন্ধান সত্ত্বেও নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে পারিনি। কারো কারো মত হলো, এই রুকু'র চিহ্নের নির্ধারণও হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগ থেকেই হয়েছিল। কিন্তু অধম কোনো রেওয়ায়েতের মাধ্যমে এর প্রমাণ পাইনি। কিন্তু এ কথা প্রায় নিশ্চিত যে, এই চিহ্নের উদ্দেশ্য আয়াতের এমন একটা পরিমাণ নির্ধারণ করা, যা এক (নামাযের) রাকাতে পড়া হয়। আর এটাকে এ জন্যই "রুকু” বলা হয় যে, নামাযে এখানে এসে রুকু করা হয়। যেমন, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরিতে এসেছে-
أن المشايخ رحمهم الله تعالى جَعَلُوا القرآن على خمسمائة وأربعين ركوعا وأعلموا ذلك في المصاحف حتى يحصل الختم فى ليلة السابع والعشرين
'অর্থাৎ মাশায়েখগণ পবিত্র কুরআনুল কারীমকে ৫৪০টি রুকু'তে বিভক্ত করেছেন এবং কুরআনের কপিতে তাঁরা এর জন্য আলামত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেন (তারাবীর সালাত) সাতাশতম রাতে কুরআন খতম হয়ে যায়।'
টিকাঃ
২৯৮. তারীখুল কুরআন: ৮১
২৯৯. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি: ১/৯৪
📄 ওয়াক্ফ বা যতিচিহ্ন সমূহ
তেলাওয়াত ও তাজভীদের সহজতার জন্য আরো একটি উপকারী কাজ করা হয়েছে যে, কুরআনের বিভিন্ন বাক্যের উপর এমন কিছু যতিচিহ্ন লিখে দেওয়া হয়েছে, যা দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে ওয়াকফ করা (শ্বাস নেওয়া) কেমন? এই চিহ্নগুলোকে "রুমূযে আওক্বাফ” বলা হয়। যেগুলোর উদ্দেশ্য হলো, যখন একজন অনারবী ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত করবে, সেও যেন সঠিক স্থানে ওয়াকফ করতে পারে এবং ভুল জায়গায় ওয়াকফ করার কারণে অর্থের মধ্যে কোনো বিকৃতি না ঘটে। এই চিহ্নগুলোর অধিকাংশ সর্বপ্রথম আল্লামা আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে তাইফুর সাজাওয়ান্দী (রহ.) সংযোজন করেন। ওই চিহ্নগুলোর বিবরণ নিম্নে দেওয়া হলো:
ط = এই চিহ্নটি “ওয়াকফে মুতলাক"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে এসে কথা পূর্ণ হয়ে গেছে। তাই এখানে থামাটা উত্তম।
ج = "ওয়াকফে জায়েয”-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে থামা জায়েয।
ز = এটি "ওয়াকফে মুজাওওয়ায"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এখানে থামা জায়েয; তবে না থামাটাই উত্তম।
ص = এটি "ওয়াকফে মুরাখখাস"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এখানে কথা তো পুরো হয়নি; তবে বাক্য যেহেতু দীর্ঘ হয়ে গেছে, তাই শ্বাস নেওয়ার জন্য অন্য স্থানে থামার পরিবর্তে এখানেই থামা উচিত।
م = এটি “ওয়াকফে লাযেম"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে যদি থামা না হয়, তাহলে আয়াতের অর্থের মধ্যে মারাত্মক ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এখানে থামাটাই অধিক উত্তম। কোনো কোনো ব্যক্তি এটাকে "ওয়াকফে ওয়াজিব" ও বলে থাকেন। তবে এর দ্বারা উদ্দেশ্য ফেকহী ওয়াজিব নয় যে, এখানে না থামলে গোনাহ হবে। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে, সকল ওয়াকফের মধ্যে এখানে থামাটাই সর্বোত্তম।
لا = এটি لا تقف (লা তাকিফ)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে থামবে না। তবে থামা একেবারেই নাজায়েয এমনটা নয়। বরং এ চিহ্নবিশিষ্ট এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে থামতে কোনো অসুবিধা নেই এবং এর পরবর্তী আয়াত থেকে তেলাওয়াত করা যেতে পারে। তবে এখানে থামলে, (পরের শব্দ থেকে শুরু না করে বরং) পুনরায় আগের আয়াতের সাথে মিলিয়ে পড়াটাই উত্তম।
উপরোক্ত যতিচিহ্নগুলোর ব্যাপারে তো নিশ্চিত করে বলা যায় যে, আল্লামা সাজাওয়ান্দী (রহ.) এগুলোর প্রবর্তক। কিন্ত এগুলো ছাড়াও পবিত্র কুরআনুল কারীমে আরো কিছু চিহ্ন ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সেগুলো নিম্নরূপ-
مع = এটা "মু'আনাকা” শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই চিহ্নটি ওই স্থানে লেখা হয় যেখানে একই আয়াতের দুই ধরনের তাফসীর হতে পারে। এক তাফসীর অনুযায়ী এখানে বাক্য শেষ এবং অন্য তাফসীর অনুযায়ী পরবর্তী চিহ্নে বাক্য শেষ হওয়াকে বুঝায়। কাজেই দুই স্থানের যে কোনো এক স্থানেই থামা যেতে পারে। তবে এক স্থানে থামার পর দ্বিতীয় স্থানে থামা ঠিক নয়। এই চিহ্নটির আরো একটি নাম হলো, “মুকাবিলা”। এই চিহ্নের সর্বপ্রথম প্রচলন করেন ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)।
সাকতাহ = এটা "সেকতা"-এর চিহ্ন। এর উদ্দেশ্য হলো, এখানে থামতে হবে। তবে শ্বাস ছাড়তে পারবে না; বরং চালু রাখতে হবে। এটা সাধারণত এমন স্থানে ব্যবহার করা হয় যেখানে না থেমে, বরং পরবর্তী শব্দের সাথে মিলিয়ে পড়তে গেলে অর্থের ক্ষেত্রে ভুল বুঝার সম্ভাবনা থাকে।
ওয়াকফাহ্ = এ চিহ্নযুক্ত স্থানে সেকতার চাইতে একটু বেশি সময় ধরে থামতে হবে। কিন্তু শ্বাস এখানেও জারী রাখতে হবে।
ق = قيل عليه الواقف এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কারো মতে এখানে থামা যাবে আর কারো মতে থামা যাবে না।
قف = এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, থেমে যাও। এটি এমন স্থানে ব্যবহার করা হয় যেখানে তেলাওয়াতকারীর এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, এখানে থামা যাবে না।
صلى = الوصل اولى এর সংক্ষিপ্ত রূপ। যার অর্থ হচ্ছে, পূর্বাপর মিলিয়ে পড়া উত্তম।
صل = এটা قد يوصل এর সংক্ষিপ্ত রূপ। অর্থাৎ এখানে কেউ কেউ থামার কথা বলেন আর কেউ কেউ মিলিয়ে পড়াকে পছন্দ করেন।
এই যতিচিহ্নগুলো খুবই প্রসিদ্ধ। কিন্তু ইহা এখনও জানা যায়নি যে, কে এগুলোর বর্ণনাকারী?
টিকাঃ
৩০০. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৫৫
৩০১. এই চারটি চিহ্নের ব্যাখ্যার জন্য দেখুন: "আল-মানহুল ফিকরিয়্যাহ [মোল্লা আলী কারী] পৃঃ ৬৩
৩০২. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৩১
৩০৩. প্রাগুক্ত: পৃ: ২৩৩
৩০৪. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৩৭
📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমের মুদ্রণ
যতদিন পর্যন্ত প্রেস বা ছাপাখানা আবিষ্কার হয়নি ততদিন পর্যন্ত পবিত্র কুরআন মাজীদের সকল কপি হাতে লেখা হতো। প্রত্যেক যুগে লেখকদের এমন একটি দল বিদ্যমান ছিলেন, কুরআন লেখা ছাড়া যাদের আর কোনো ধ্যান-জ্ঞান ছিল না। পবিত্র কুরআনুল কারীমের অক্ষরগুলোকে সুন্দর ও সৌন্দর্য মণ্ডিত করে লেখার জন্য মুসলমানরা যে সাধনার সাক্ষর রেখেছেন এবং এ মহা গ্রন্থের সাথে অন্তরঙ্গ ভালোবাসার পরিচয় দিয়েছেন এর বিস্তারিত ও চিত্তাকর্ষক ইতিহাস রয়েছে। যার জন্য একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থের প্রয়োজন। এখানে বিস্তারিত আলোচনার স্থান নেই।
অতঃপর যখন ছাপাখানা আবিষ্কার হলো, তখন সর্বপ্রথম জার্মানীর হামবুর্গ শহরে ১১১৩ হিজরীতে পবিত্র কুরআনুল কারীম ছাপানো হয়। যার একটি কপি এখনো মিসরের 'দারুল কুতুব'-এ সংরক্ষিত রয়েছে। এরপর বহু প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতগণ কুরআনুল কারীমের কপি মুদ্রণ করেন। কিন্তু তাদের মুদ্রিত কুরআনুল কারীমের এই কপিগুলো মুসলিম বিশ্বে মোটেও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে সক্ষম হয়নি। পরবর্তীতে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম মাওলায়ে উসমান রাশিয়ার 'সেন্ট পিটার্সবার্গ' শহরে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে কুরআনুল কারীমের একটি কপি মুদ্রণ করে। অনুরূপভাবে 'কাযান' শহরেও একটি কপি ছাপানো হয়। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ইরানের 'তেহরানে' কুরআনুল কারীমকে পাথরের উপর ছাপানো হয়। অতঃপর এ মুদ্রিত কপি গোটা বিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
টিকাঃ
৩০৫. কুরআন মুদ্রণের ইতিহাস জানার জন্য দেখুন: কুরদী (রহ.) রচিত "তারীখুল কুরআন" পৃ: ১৮৬, সবহী সালেহ রচিত "উলূমুল কুরআন" পৃ: ১৪২