📘 উলুমুল কুরআন 📄 নুকতা

📄 নুকতা


তৎকালীন প্রাচীন আরবদের মাঝে হরফে নুকতা সংযোজনের রীতি প্রচলিত ছিল না। বরং লেখকরা নুকতাবিহীন খালি হরফ লিখার উপরই অভ্যস্ত ছিলেন। আর পাঠকরাও এ পদ্ধতির সাথে এতই অভ্যস্ত ছিলেন যে, নুকতাবিহীন হরফ পড়তে তাদের সামান্যতম কষ্টও হতো না। বাক্যের আগের ও পরের অবস্থা দ্বারাই এক জাতীয় হরফগুলোর মাঝে সহজেই পার্থক্য হয়ে যেত। বরং অনেক সময় হরফে নুকতা লাগানোকে দোষ হিসেবে দেখা হতো। ঐতিহাসিক মাদায়িনী (রহ.) এক আরব সাহিত্যিকের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন-
كثرة النقط في الكتاب سوء ظن بالكمتوب اليه
'অর্থাৎ লিখনীতে অত্যাধিক নুকতার ব্যবহার, প্রেরিত পাঠকের প্রতি কু-ধারণার নামান্তর।'

সঙ্গত কারণে মাসহাফে উসমানীও নুকতাশূন্য ছিল এবং সাধারণ প্রচলন ছাড়াও এর বড় একটি উদ্দেশ্য এটাও ছিল যে, এ লিখন পদ্ধতিতে সকল মুতাওয়াতির ক্বেরাতগুলোর সংকুলান হয়ে যাওয়া। কিন্তু পরবর্তীতে অনারব ও কম পড়ুয়া মুসলমানদের সহজতার জন্য পবিত্র কুরআনুল কারীমে নুকতার সংযোজন করা হয়। কুরআনুল কারীমে সর্বপ্রথম কে নুকতার প্রচলন করে ছিলেন? এ ব্যাপারে রেওয়ায়েতগুলোর মধ্যে বিভিন্ন মতবিরোধ রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে এ কাজ সর্বপ্রথম আবুল আসাদ দুআইলী (রহ.) আঞ্জাম দেন। কোনো বর্ণনা মতে তিনি এ কাজ হযরত আলী (রা.)-এর নির্দেশে করেছিলেন। আর কেউ কেউ বলেন, কুফার গভর্ণর যিয়াদ ইবনে আবী সুফিয়ান তাঁকে দিয়ে করিয়ে ছিলেন। আবার কোনো কোনো বর্ণনা মতে, তিনি আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নির্দেশে এ কাজ সম্পাদন করেছেন। এবং এক বর্ণনায় এটাও এসেছে যে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এ কাজটি হাসান বসরী (রহ.), ইয়াহইয়া ইবনে ইয়া'মার (রহ.) ও নসর ইবনে আসেম লাইসী (রহ.)-এর মাধ্যমে আঞ্জাম দিয়েছেন।

আবার কেউ কেউ এ মত প্রকাশ করেছেন যে, যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআন মাজীদের নুকতা সংযোজন করেন, তিনিই নুকতার উদ্ভাবক। এর পূর্বে নুকতা সম্পর্কে কোনো কল্পনা ছিল না। কিন্তু আল্লামা কালকাশিন্দী (রহ.) (যিনি রুসমেখত এবং ইনশা শাস্ত্রের বিখ্যাত আলেম) এ মতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন যে, অনেক পূর্বেই নুকতার উদ্ভাবন হয়েছিল। এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী আরবী লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবক ছিলেন, বুলান গোত্রের মুরামুর ইবনে মুররাহ, আসলাম ইবনে সিদরা এবং আমের ইবনে জাদারাহ। মুরামুর আরবী অক্ষরের আকৃতি উদ্ভাবন করেন। আসলাম সংযুক্ত ও পৃথক অক্ষর লিখার পদ্ধতি নির্ধারণ করেন। আর আমের নুকতা তৈরি করেন।

অন্য আরেকটি বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় যে, হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দাদা আবু সুফিয়ান ইবনে উমাইয়াহ সর্বপ্রথম নুকতার ব্যবহার করেন। তিনি হায়রাহ্-এর বাসিন্দাদের কাছ থেকে তা শিখেছেন। আর হায়রাহ'র বাসিন্দারা শিখেছে আম্বারবাসীদের থেকে। অতএব, বুঝা গেল যে, নুকতার উদ্ভাবন তো অনেক পূর্বেই হয়েছিল। কিন্তু একাধিক বিশেষ কল্যাণার্থে পবিত্র কুরআন মাজীদকে নুকতামুক্ত রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে যারাই পবিত্র কুরআনুল কারীমে নুকতা সংযোজন করেছেন, তিনি নুকতার উদ্ভাবক নন। বরং তিনি শুধু সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআন মাজীদে নুকতার ব্যবহার করেছেন।

টিকাঃ
২৮২. আল্লামা কালকাশিন্দী রচিত "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৪
২৮৩. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন: ১/২৫০, আল-ইতকান: ২/১৭১
২৮৪. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৫
২৮৫. আল-বুরহান: পৃ. ২৫০-২৫১
২৮৬. আল-ইতকান: ২/১৭১
২৮৭. তাফসীরে কুরতুবী: ১/৬৩, তারিখুল কুরআন: পৃ: ১৮১
২৮৮. "সুবহুল আ'শা" ৩/১২
২৮৯. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৩
২৯০. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৫

📘 উলুমুল কুরআন 📄 হরকত

📄 হরকত


অনুরূপভাবে নুকতার ন্যায় প্রথম অবস্থায় পবিত্র কুরআন মাজীদে হরকত তথা যের, যবর ও পেশও ছিল না। সবার আগে কে হরকত লাগিয়েছেন? এ ক্ষেত্রেও রয়েছে যথেষ্ট মতপার্থক্য। কারো কারো মতে আবুল আসওয়াদ দুআইলী (রহ.) এ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। আর কারো কারো মত হলো, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এ কাজ ইয়াহইয়া ইবনে ইয়া'মার (রহ.) এবং নসর ইবনে আসেম লাইলী (রহ.)-কে দিয়ে করিয়েছে।

উল্লেখিত সবগুলো রেওয়ায়েত সামনে রাখলে এমনটি বুঝে আসে যে, পবিত্র কুরআন মাজীদের জন্য সর্বপ্রথম আবুল আসওয়াদ দুআইলী (রহ.)-ই হরকত আবিষ্কার করেন। তবে তাঁর আবিষ্কৃত হরকতগুলো আজকের প্রচলিত হরকতের ন্যায় ছিল না। বরং যবর দিতে হলে হরফের উপর একটি নুকতা (.....) এবং যের দিতে হলে হরফের নিচে একটি নুকতা (.....) আর পেশ উচ্চারণ করার জন্য হরফের সামনে একটি নুকতা (.....) ও তানভীনের জন্য দু'টি নুকতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে খলীল ইবনে আহমদ (রহ.) হামযা ও তাশদীদের চিহ্ন তৈরি করেন। এরপর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ উদ্যোগী হয়ে ইয়াহইয়া ইবনে ইয়া'মার (রহ.), নসর ইবনে আসেম (রহ.) এবং হাসান বসরী (রহ.)-কে একই সময়ে পবিত্র কুরআন মাজীদে নুকতা ও হরকত সংযোজন করার আদেশ করেন। এ পর্যায়ে হরকতগুলোকে আরো স্পষ্ট ও সহজসাধ্য করার নিমিত্ত পূর্ব উদ্ভাবিত নুকতার পরিবর্তে বর্তমান প্রচলিত যের, যবর ও পেশ নির্ধারণ করা হয়। যেন হরফের মূল নুকতার সাথে হরকতের নুকতার সংমিশ্রণ না হয়ে যায়। (মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাই সবচেয়ে ভালো অবগত।)

টিকাঃ
২৯১. তাফসীরে কুরতুবী: ১/৬৩
২৯২. “সুবহুল আ'শা” ৩/১৬০, তারীখুল কুরআন: পৃঃ ১৮০
২৯৩. আল-ইতকান: ২/১৭১

📘 উলুমুল কুরআন 📄 মনযীল

📄 মনযীল


হযরত সাহাবায়ে কেরাম (রহ.) ও তাবেঈগণের (রহ.) অভ্যাস ছিল যে, তাঁরা প্রতি সপ্তাহে এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করতেন। এ উদ্দেশ্যে তাঁরা দৈনন্দিন তেলাওয়াতের একটা পরিমাণ নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। যেটাকে “হিযব” বা “মনযীল” বলা হয়। এভাবে সমগ্র কুরআন মাজীদকে মোট সাতটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। হযরত আউস ইবনে হুযাইফা (রহ.) বলেন, আমি একজন সাহাবীকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কতটি মনযীলে কুরআন খতম করেন? তিনি উত্তরে বললেন, প্রথম মনযীলে তিনটি সূরা, দ্বিতীয় মনযীলে পাঁচটি সূরা, তৃতীয় মনযীলে সাতটি সূরা, চতুর্থ মনযীলে নয়টি সূরা, পঞ্চম মনযীলে এগারটি সূরা, ষষ্ঠ মনযীলে তেরটি সূরা এবং শেষ মনযীলে সূরা ক্বাফ থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সবগুলো সূরা সন্নিবিষ্ট হয়েছে।

টিকাঃ
২৯৪. আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন: ১/২৫০

ফন্ট সাইজ
15px
17px