📄 তৃতীয় ধাপ : তেলাওয়াত সহজীকরণের পদক্ষেপ
হযরত উসমান (রা.) কর্তৃক "মাসহাফ” তৈরির মহান কাজ সম্পন্ন করার পর সমস্ত উম্মত এ কথার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, তাঁর অনুসৃত লিখন পদ্ধতি ব্যতীত পবিত্র কুরআন মাজীদ অন্য কোনো পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করা জায়েয নেই। কিন্তু উসমানী মাসহাফে নুকতা এবং হরকত না থাকায় অনারবদের জন্য তা তেলাওয়াত করা বেশ কষ্টকর ছিল। তাই পরবর্তীতে এই মাসহাফে নুকতা ও হরকত সংযোজন করার ব্যবস্থা করা হয়।
নুকতা: প্রাচীন আরবদের মাঝে হরফে নুকতা সংযোজনের রীতি প্রচলিত ছিল না। কুরআনুল কারীমে সর্বপ্রথম কে নুকতার প্রচলন করেছিলেন? এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে এ কাজ সর্বপ্রথম আবুল আসওয়াদ দুআইলী (রহ.) আঞ্জাম দেন। কারো মতে তিনি এ কাজ হযরত আলী (রা.)-এর নির্দেশে করেছিলেন। আবার কেউ বলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এ কাজটি হাসান বসরী (রহ.), ইয়াহইয়া ইবনে ইয়া'মার (রহ.) ও নসর ইবনে আসেম লাইসী (রহ.)-এর মাধ্যমে আঞ্জাম দিয়েছেন। তবে নুকতার উদ্ভাবন অনেক পূর্বেই হয়েছিল, কিন্তু বিশেষ কল্যাণার্থে প্রথম দিকে কুরআন মাজীদকে নুকতামুক্ত রাখা হয়েছিল।
হরকত: নুকতার ন্যায় প্রথম অবস্থায় পবিত্র কুরআন মাজীদে হরকত তথা যের, যবর ও পেশও ছিল না। সর্বপ্রথম আবুল আসওয়াদ দুআইলী (রহ.) হরকত আবিষ্কার করেন। তবে তাঁর আবিষ্কৃত হরকতগুলো বর্তমানের ন্যায় ছিল না। পরবর্তীতে খলীল ইবনে আহমদ (রহ.) হামযা ও তাশদীদের চিহ্ন তৈরি করেন। এরপর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ উদ্যোগী হয়ে প্রচলিত যের, যবর ও পেশ নির্ধারণ করেন।
মনযীল: হযরত সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণের অভ্যাস ছিল যে, তাঁরা প্রতি সপ্তাহে এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করতেন। এ উদ্দেশ্যে তাঁরা দৈনন্দিন তেলাওয়াতের একটা পরিমাণ নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। যেটাকে “হিযব” বা “মনযীল” বলা হয়। এভাবে সমগ্র কুরআন মাজীদকে মোট সাতটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল।
পারা: বর্তমানে পবিত্র কুরআন মাজীদ ত্রিশটি পারায় বিভক্ত। এই পারার বিভক্তি অর্থ ও বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং শিশুদের পড়ানোর সুবিধার্থে ত্রিশটি খণ্ডে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
আখমাস ও আ'শার: প্রথম যুগের পবিত্র কুরআনুল কারীমের কপিগুলোতে প্রতি পাঁচ আয়াতের পর (خمس বা সংক্ষেপে خ) এবং প্রতি দশ আয়াতের পর (عشر অথবা সংক্ষেপে ع) লিখে দেওয়া হতো। এ চিহ্নগুলো সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
রুকু: পরবর্তীকালে রুকু'র চিহ্নের (ع) ব্যবহার প্রচলিত হয়েছে। আলোচিত বিষয়বস্তুর অনুসরণে এ চিহ্নটি নির্ধারণ করা হয়েছে। মাশায়েখগণ পবিত্র কুরআনুল কারীমকে ৫৪০টি রুকু'তে বিভক্ত করেছেন যেন তারাবীর সালাতে সাতাশতম রাতে কুরআন খতম হয়।
ওয়াক্ফ বা যতিচিহ্ন: তেলাওয়াত ও তাজভীদের সহজতার জন্য কুরআনের বিভিন্ন বাক্যের উপর এমন কিছু যতিচিহ্ন লিখে দেওয়া হয়েছে, যা দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে ওয়াকফ করা (শ্বাস নেওয়া) কেমন? এই চিহ্নগুলোর অধিকাংশ সর্বপ্রথম আল্লামা আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে তাইফুর সাজাওয়ান্দী (রহ.) সংযোজন করেন। যেমন- ط (ওয়াকফে মুতলাক), ج (ওয়াকফে জায়েয), ز (ওয়াকফে মুজাওওয়ায), ص (ওয়াকফে মুরাখখাস), م (ওয়াকফে লাযেম) এবং لا (ওয়াকফ না করা উত্তম)। এছাড়াও مع (মু'আনাকা), সাকতাহ ও ওয়াকফাহ্ চিহ্নগুলোও ব্যবহৃত হয়।
টিকাঃ
২৮২. আল্লামা কালকাশিন্দী রচিত "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৪
২৮৩. আল-বুরহানফী উলূমিল কুরআন: ১/২৫০, আল-ইতকান: ২/১৭১
২৮৪. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৫
২৮৫. আল-বুরহান: পৃ. ২৫০-২৫১
২৮৬. আল-ইতকান: ২/১৭১
২৮৭. তাফসীরে কুরতবী: ১/৬৩, তারিখুল কুরআন: পৃ: ১৮১
২৮৮. "সুবহুল আ'শা" ৩/১২
২৮৯. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৩
২৯০. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৫
২৯১. তাফসীরে কুরতুবী: ১/৬৩
২৯২. “সুবহুল আ'শা” ৩/১৬০, তারীখুল কুরআন: পৃঃ ১৮০
২৯৩. আল-ইতকান: ২/১৭১
২৯৪. আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন: ১/২৫০
২৯৫. তারীখুল কুরআন: পৃঃ ৮১
২৯৬. মানাহিলুল ইরফান: ১/৪০৩
২৯৭. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৪৯৭
২৯৮. তারীখুল কুরআন: ৮১
২৯৯. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি: ১/৯৪
৩০০. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৫৫
৩০১. "আল-মানহুল ফিকরিয়্যাহ" পৃঃ ৬৩
৩০২. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৩১
৩০৩. প্রাগুক্ত: পৃ: ২৩৩
৩০৪. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৩৭
📄 পারা
বর্তমানে পবিত্র কুরআন মাজীদ ত্রিশটি পারায় বিভক্ত। এই পারার বিভক্তি অর্থ ও বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং শিশুদের পড়ানোর সুবিধার্থে ত্রিশটি খন্ডে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তাই তো দেখা যায় কখনো কখনো আলোচনা শেষ হবার আগেই পারা শেষ হয়ে যায়। কে কুরআনুল কারীমকে ত্রিশটি খন্ডে বিভক্ত করেছেন? নিশ্চিতভাবে এ কথা বলা মুশকিল। কারো কারো মতে হযরত উসমান (রাযিআল্লাহু আনহু) মাসহাফ লিপিবদ্ধ করানোর সময় ত্রিশটি খন্ডে পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাই তাঁর যুগ থেকেই ত্রিশ পারার এই প্রচলন হয়ে আসছে। কিন্তু মুতাকাদ্দীমীন পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের বিশাল গ্রন্থ ভান্ডারে এর কোনো দলীল-প্রমাণ (লেখকের) দৃষ্টিগোচর হয়নি। অবশ্য আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) লিখেছেন যে, কুরআনের ত্রিশ পারা বহু আগ থেকে প্রসিদ্ধির সাথে চলে আসছে এবং মাদরাসাসমূহের কুরআনের কপিতে এর রেওয়াজ রয়েছে। এমনটাই মনে হয় যে, ত্রিশ পারার এ বিভক্তি সাহাবায়ে কেরামের যুগের পর শিক্ষাদানের সুবিধার্থে করা হয়েছে। (মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাই এই ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো অবগত।)
টিকাঃ
২৯৫. তারীখুল কুরআন: পৃঃ ৮১
📄 আখমাস ও আশার
প্রথম যুগের পবিত্র কুরআনুল কারীমের কপিগুলোতে আরো কিছু চিহ্নের প্রচলন ছিল। আর তা হলো, প্রতি পাঁচ আয়াতের পর (خمس বা সংক্ষেপে خ) এবং প্রতি দশ আয়াতের পর (عشر অথবা সংক্ষেপে ع) লিখে দেওয়া হতো। প্রথম প্রকারের চিহ্নগুলোকে اخماس (আখমাস) এবং দ্বিতীয় প্রকার চিহ্নগুলোকে اعشار (আ'শার) বলা হতো। কিন্তু এ দু'টি বর্ণনার কোনোটিকেই সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামের যুগেই "আশর"-এর চিহ্ন থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে- عن مسروق عن عبد الله انه كره التعشير في المصحف 'মাসরূক (রহ.) বলেন, হযরত আবদুল্লাহ মাসউদ (রাযিআল্লাহু আনহু) মাসহাফের মধ্যে "আ'শার" চিহ্নের ব্যবহারকে মাকরূহ মনে করতেন।' এ থেকে বুঝা যায় যে "আ'শার” চিহ্নের ব্যবহার সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
টিকাঃ
২৯৬. মানাহিলুল ইরফান: ১/৪০৩
২৯৭. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৪৯৭
📄 রুকু চিহ্ন
পরবর্তীতে আরো একটি চিহ্নের ব্যবহার প্রচলিত হয়েছে এবং আজ পর্যন্ত তা চালু আছে। আর সেটা হলো, রুকু'র চিহ্ন। আলোচিত বিষয়বস্তুর অনুসরণে এ চিহ্নটি নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ যেখানে একটা প্রসঙ্গ শেষ হয়েছে সেখানে পৃষ্ঠার পাশে রুকু'র চিহ্নের জন্য ع অক্ষর লিখে দেওয়া হয়েছে। এই চিহ্নটি কে চালু করেছেন এবং কার আমল থেকে চালু হয়েছে? অধমের অনুসন্ধান সত্ত্বেও নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে পারিনি। কারো কারো মত হলো, এই রুকু'র চিহ্নের নির্ধারণও হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগ থেকেই হয়েছিল। কিন্তু অধম কোনো রেওয়ায়েতের মাধ্যমে এর প্রমাণ পাইনি। কিন্তু এ কথা প্রায় নিশ্চিত যে, এই চিহ্নের উদ্দেশ্য আয়াতের এমন একটা পরিমাণ নির্ধারণ করা, যা এক (নামাযের) রাকাতে পড়া হয়। আর এটাকে এ জন্যই "রুকু” বলা হয় যে, নামাযে এখানে এসে রুকু করা হয়। যেমন, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরিতে এসেছে-
أن المشايخ رحمهم الله تعالى جَعَلُوا القرآن على خمسمائة وأربعين ركوعا وأعلموا ذلك في المصاحف حتى يحصل الختم فى ليلة السابع والعشرين
'অর্থাৎ মাশায়েখগণ পবিত্র কুরআনুল কারীমকে ৫৪০টি রুকু'তে বিভক্ত করেছেন এবং কুরআনের কপিতে তাঁরা এর জন্য আলামত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেন (তারাবীর সালাত) সাতাশতম রাতে কুরআন খতম হয়ে যায়।'
টিকাঃ
২৯৮. তারীখুল কুরআন: ৮১
২৯৯. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি: ১/৯৪