📄 প্রথম ধাপ : হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে পবিত্র কুরআন জমা করণের
যেহেতু নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমের যতগুলো কপি লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, সেগুলোর অবস্থা ছিল এমন যে, হয়তো বিভিন্ন বস্তুর উপর লিপিবদ্ধ ছিল। কোনো আয়াত চামড়ার উপর, কোনো আয়াত গাছের পাতায় আবার কোনো আয়াত হাড়ের উপর। অধিকাংশ ই ছিল অসম্পূর্ণ কপি। কোনো সাহাবীর কাছে একটি সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। কারো কাছে পাঁচ-দশটি সূরা। কারো কাছে শুধু কয়েকটি আয়াত। আবার কোনো কোনো সাহাবীর কাছে আয়াতের সাথে তার তাফসীর বাক্য ও লিপিবদ্ধ ছিল।
এপ্রেক্ষিতে হযরত আবু বকর (রা.) নিজের খেলাফত কালে পবিত্র কুরআনুল কারীমের এই বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে একত্রিত করে তা সংরক্ষণ করাটাকে অত্যন্ত জরুরী মনে করলেন। হযরত আবু বকর (রা.) যেসব অবস্থার প্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং যেভাবে তা সম্পন্ন করে ছিলেন, সে সম্পর্কে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বর্ণনা করেন যে, ইমামামাহ্'র যুদ্ধের পর পরই একদিন হযরত আবু বকর (রা.) আমাকে জরুরীভাবে তলব করলেন। (আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলাম হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) উপস্থিত ছিলেন।) হযরত আবু বকর (রা.) আমাকে বললেন, “হযরত ওমর এইমাত্র এসে আমাকে সংবাদ দিলেন যে, ইয়ামামাহ্'র যুদ্ধে হাফেযে কুরআনদের বিরাট একটি দল শহীদ হয়ে গেছেন। আর এভাবে যদি হাফেযগণ শহীদ হতে থাকেন, তাহলে আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, পবিত্র আল-কুরআনের বিরাট একটি অংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই আমার মত হলো, আপনি আপনার নির্দেশ প্রদান করে কুরআনুল কারীমকে সংকলন করার কাজ আরম্ভ করে দিন।”
আমি হযরত ওমরকে বললাম, যে কাজ রাসূলে খোদা (সা.) নিজে করেননি, তা আমরা কিভাবে করতে পারি? হযরত ওমর (রা.) উত্তর দিলেন, মহান আল্লাহর কসম! এ কাজ অনেক উত্তমই হবে। এভাবে হযরত ওমর আমাকে বারবার তাগিদ দিতে থাকলেন। এমনকি আমার অন্তরও এ দিকে ঝুঁকে পড়ল। এবং আমিও হযরত ওমরের সাথে একমত হয়ে গেলাম। অতঃপর হযরত আবু বকর (রা.) আমাকে বললেন, "তুমি একজন নওজোয়ান এবং সমঝদার মানুষ। তোমার ব্যাপারে আমার কোনো বিরূপ ধারণা নেই। তুমি নবী কারীম (সা.)-এর নিকট ওহী লিপিবদ্ধ করতে। অতএব, তুমি কুরআনুল কারীমের আয়াতসমূহকে তালাশ করে সেগুলোকে একত্রে জমা কর।"
হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, মহান আল্লাহর কসম! যদি তাঁরা আমাকে একটি পাহাড় স্থানান্তর করার নির্দেশ দিতেন, তবুও বোধ হয় তা আমার কাছে এত কঠিন মনে হতো না, যত কঠিন মনে হতে লাগল কুরআন সংকলনের কাজটি। আমি তাঁকে বললাম, আপনি ওই কাজ কি করে করতে চাচ্ছেন, যে কাজ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) করেননি? হযরত আবু বকর (রা.) উত্তরে আমাকে বললেন, মহান আল্লাহর শপথ! এ কাজ উত্তম-ই উত্তম হবে। বার বার তিনি আমাকে একই কথা বলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমার হৃদয়কেও এ রায়ের প্রতি উন্মুক্ত করে দিলেন, যার প্রতি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)-এর হৃদয়কে। এভাবে আমি কুরআনের আয়াত তালাশ করতে শুরু করলাম। খেজুরের ডাল, পাথরের গা এবং মানুষের বক্ষ থেকে কুরআন সংকলন করলাম।
এখানে কুরআন জমা করার ক্ষেত্রে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর কার্যক্রম সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়ার দরকার। তিনি একই সময়ে স্মৃতি থেকে, হাফেযদের দল থেকে এবং নববী যুগে লিখিত কপি- এই সবগুলো পদ্ধতি দ্বারা কাজ করেছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আয়াত প্রণীত সহীফায় স্থান দিতেন না, যতক্ষণ সেটার লিখিত ও মৌখিকভাবে মুতাওয়াতির হবার প্রমাণ তিনি না পেতেন। যখন কোনো ব্যক্তি তাঁর কাছে পবিত্র কুরআনুল কারীমের লিখিত কোনো আয়াত নিয়ে আসতেন, তখন তিনি নিম্নোক্ত চারটি পদ্ধতি অবলম্বন করে সেগুলোর সত্যায়ন করতেন।
১. সর্বপ্রথম তিনি তাঁর স্মৃতিতে রক্ষিত কুরআনের সাথে মিলিয়ে তা পরিমাপ করতেন।
২. হযরত ওমর (রা.) ও হাফেয ছিলেন। যখন কোনো ব্যক্তি কোনো আয়াত নিয়ে উপস্থিত হতো, তখন তাঁরা উভয়ে যৌথভাবে সেটাকে সংগ্রহ করতেন। কাজেই হযরত যায়েদ (রা.) ছাড়াও হযরত ওমর (রা.) ও নিজের স্মৃতির সাথে মিলিয়ে সেটার সত্যায়ন করতেন।
৩. লিখিত কোনো আয়াত ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করা হতো না, যতক্ষণ না দু'জন বিশ্বস্ত সাক্ষী এ মর্মে সাক্ষ্য দিত যে, এ আয়াত রাসূলে খোদা (সা.)-এর সামনে লিখা হয়েছিল।
৪. অতপর এই লিখিত আয়াতগুলোকে বিভিন্ন সাহাবা কর্তৃক প্রস্তুতকৃত পান্ডুলিপির সাথে তুলনা করা হতো।
পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে অধিক থেকে অধিকতর সতর্কতাই ছিল এই কর্মপদ্ধতি অবলম্বনের একমাত্র উদ্দেশ্য। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এই নযীরবিহীন সতর্কতার সাথে কুরআনের আয়াতগুলোকে একত্রিত করে ধারাবাহিকভাবে সেগুলোকে কাগজের কপিতে লিপিবদ্ধ করে দেন। কিন্তু প্রত্যেকটি সূরা যেহেতু পৃথক পৃথক করে লিখা হয়েছিল, তাই তা একাধিক সহীফা সম্বলিত ছিল। আর এই কপির বৈশিষ্ট্য ছিল নিম্নরূপ:
(১) এই কপিতে কুরআনের আয়াতগুলো নবী কারীম (সা.)-এর নির্দেশিত তারতীব বা ধারাবাহিকতা অনুযায়ী বিন্যস্ত ছিল; কিন্তু সূরাগুলোর ধারাবাহিকভাবে সাজানো ছিল না।
(২) এই কপিতে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাত হরফই বিদ্যমান ছিল।
(৩) এই কপিগুলো হিরী লিপির অনুকরণে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।
(৪) এই কপিতে শুধু ওই সকল আয়াতগুলো সংকলন করা হয়েছিল যেগুলোর তেলাওয়াত রহিত হয়নি।
(৫) এই কপি লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা উম্মতের সামগ্রিক সত্যায়নের সাথে একটি কপি বিন্যস্ত হয়ে যায়।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কর্তৃক সংকলিত এই কপিটি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর নিকটেই সংরক্ষিত ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর হযরত ওমর (রা.) তা সংরক্ষণ করেন। তাঁর শাহাদাতের পর তাঁর ওসীয়ত অনুযায়ী সেগুলোকে উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর নিকট সোপর্দ করে দেওয়া হয়। অতঃপর মারওয়ান ইবনে হাকাম তাঁর শাসনামলে হযরত হাফসা (রা.)-এর কাছ থেকে এগুলো তলব করলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত হযরত হাফসা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর মারওয়ান তা চেয়ে নেয় এবং সেগুলোকে এ চিন্তা থেকেই আগুনে পুড়িয়ে দেন যে, তখন হযরত উসমান (রা.) কর্তৃক সূরার তারতীব অনুসারে লিখন পদ্ধতিসহ সংকলিত কুরআনুল কারীমের সর্বসম্মত বিশুদ্ধতম কপি প্রস্তুত হয়ে চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
টিকাঃ
২৬৩. সহীহ বুখারী ফাতহুল বারী সহ: ৬/৮-১১
২৬৪. ফাতহুল বারী : ৯/১১
২৬৫. প্রাগুক্ত
২৬৬. আল-ইতকান: ১/৬০
২৬৭. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন: ১/২৩৮
২৬৮. আল-ইতকান: ১/৬০
২৬৯. আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন: ১/২৩৪-২৩৫
২৭০. আল-ইতকান: ১/৬০
২৭১. আল-ইতকান: ১/৬০
২৭২. মানাহিলুল ইরফান: ১/২৪৬-২৪৭
২৭৩. তারীখুল কুরআন: পৃঃ ৪৩
২৭৪. ফাতহুল বারী: ৯/১২-১৩
২৭৫. প্রাগুক্ত: পৃ: ১৬
📄 দ্বিতীয় ধাপ : হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলন
যখন হযরত উসমান (রা.) খলীফা নির্বাচিত হলেন, ইসলাম তখন আরবের গণ্ডি ছাড়িয়ে রোম ও ইরানের দূর-দূরান্তের এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে বিভিন্ন ক্বেরাত অনুযায়ী পবিত্র কুরআন মাজীদের তেলাওয়াত শিক্ষা করেছিলেন। তাই প্রত্যেক সাহাবীই নিজ নিজ শাগরিদদেরকে ওই ক্বেরাত অনুযায়ীই কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। যখন ক্বেরাতের এই বিভিন্নতা দূর-দূরান্তের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল, তখন এ নিয়ে লোকদের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ আরম্ভ হলো। কোনো কোনো লোক নিজেদের ক্বেরাতকে শুদ্ধ এবং অন্যদের ক্বেরাতকে ভুল আখ্যায়িত করতে শুরু করল।
হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) আর্মেনিয়া ও আযারবাইজান অঞ্চলে জিহাদের আমলে রত থাকাকালীন লক্ষ্য করলেন যে, লোকদের মাঝে পবিত্র কুরআন মাজীদের ক্বেরাত নিয়ে মতভেদ চলছে। তিনি মদীনায় ফিরে এসে সোজা হযরত উসমান (রা.)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এই উম্মত আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে ইহুদী-নাসারাদের ন্যায় মতভেদে লিপ্ত হবার আগেই আপনি এর সুষ্ঠু সমাধানের ব্যবস্থা করুন। সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, আমরা গোটা উম্মতকে একটি মাসহাফের উপর একত্রিত করে দেব। এই উদ্দেশ্যে হযরত উসমান (রা.) উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর কাছে এ বলে পয়গাম পাঠালেন যে, আপনার নিকট হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে সংকলিত যে কপিগুলো রয়েছে সেগুলো আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। আমরা সেগুলোকে নতুন কপিতে নকল করে আপনার কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেব।
হযরত উসমান (রা.) চারজন সাহাবীর সমন্বয়ে একটি দল গঠন করলেন, যা হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.), হযরত সাঈদ ইবনুল আস (রা.) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে হারেস ইবনে হিশাম (রা.)-কে নিয়ে গঠিত ছিল। হযরত উসমান (রা.) তাঁদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, যখন কুরআনের কোনো অংশে তোমাদের মাঝে এবং যায়েদের মাঝে কোনো মতানৈক্য দেখা দিবে, তখন সেটাকে কুরাইশদের ভাষা অনুযায়ী লিখবে। কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁরা নিম্নোক্ত কাজগুলো আঞ্জাম দেন:
১. হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে যে কপি সংকলন করা হয়েছিল তাতে সূরাগুলোর ধারাবাহিকতা ছিল না। তাঁরা ওই সবগুলো সূরা বিন্যাস দিয়ে একই কপিতে সন্নিবেশ করেছিলেন।
২. পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াতগুলো এমনভাবে লিখা হয়েছিল যে, এগুলোর রুসমেখত বা লিখন পদ্ধতিতে সবগুলো মুতাওয়াতির ক্বেরাতের স্থান পেয়েছে। এ কারণেই সেগুলোর উপর নুকতা বা হরকত কোনোটাই লাগানো হয়নি।
৩. তাঁরা এর একাধিক কপি তৈরি করলেন (প্রসিদ্ধ মতে ৫টি, কারো মতে ৭টি)। সেগুলোকে মক্কা, সিরিয়া, ইয়ামান, বাহরাইন, বসরা এবং কূফায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর একটি কপি মদীনায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
৪. তাঁরা হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগের পাণ্ডুলিপির সাথে সাহাবায়ে কেরামের নিকট থাকা অন্যান্য পাণ্ডুলিপিও দ্বিতীয় বার তলব করে মিলিয়ে দেখেন। এই সময় সূরা আহযাবের একটি আয়াত (مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ) পৃথকভাবে লেখা একমাত্র হযরত আবু খুযাইমা (রা.)-এর নিকট পাওয়া যায়।
৫. পবিত্র কুরআনুল কারীমের নির্ভরযোগ্য কয়েকটি কপি প্রস্তুত করার পর হযরত উসমান (রা.) সকল বিক্ষিপ্ত কপিগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন, যাতে রুসমেখত ও সূরাসমূহের ধারাবাহিকতার দিক থেকে সবগুলো কপি এক রকম হয়ে যায়। হযরত আলী (রা.) বলেন- "তোমরা হযরত উসমানের সম্পর্কে ভালো কিছু ছাড়া বলো না। কেননা মহান আল্লাহর শপথ! তিনি মাসহাফ তৈরির ক্ষেত্রে যা করেছেন, তা আমাদের সকলের উপস্থিতিতে ও পরামর্শ ক্রমে করেছেন।"
টিকাঃ
২৭৬. ফাতহুল বারী: ৯/১৩-১৫
২৭৭. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৯
২৭৮. মানাহিলুল ইরফান: ১/২৫৩-২৫৪
২৭৯. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী]: ৯/১৭
২৮০. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী]: ৯/১৭
২৮১. ফাতহুল বারী [ইবনে আবী দাউদের বরাতে]: ৯/১৫
📄 তৃতীয় ধাপ : তেলাওয়াত সহজীকরণের পদক্ষেপ
হযরত উসমান (রা.) কর্তৃক "মাসহাফ” তৈরির মহান কাজ সম্পন্ন করার পর সমস্ত উম্মত এ কথার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, তাঁর অনুসৃত লিখন পদ্ধতি ব্যতীত পবিত্র কুরআন মাজীদ অন্য কোনো পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধ করা জায়েয নেই। কিন্তু উসমানী মাসহাফে নুকতা এবং হরকত না থাকায় অনারবদের জন্য তা তেলাওয়াত করা বেশ কষ্টকর ছিল। তাই পরবর্তীতে এই মাসহাফে নুকতা ও হরকত সংযোজন করার ব্যবস্থা করা হয়।
নুকতা: প্রাচীন আরবদের মাঝে হরফে নুকতা সংযোজনের রীতি প্রচলিত ছিল না। কুরআনুল কারীমে সর্বপ্রথম কে নুকতার প্রচলন করেছিলেন? এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে এ কাজ সর্বপ্রথম আবুল আসওয়াদ দুআইলী (রহ.) আঞ্জাম দেন। কারো মতে তিনি এ কাজ হযরত আলী (রা.)-এর নির্দেশে করেছিলেন। আবার কেউ বলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এ কাজটি হাসান বসরী (রহ.), ইয়াহইয়া ইবনে ইয়া'মার (রহ.) ও নসর ইবনে আসেম লাইসী (রহ.)-এর মাধ্যমে আঞ্জাম দিয়েছেন। তবে নুকতার উদ্ভাবন অনেক পূর্বেই হয়েছিল, কিন্তু বিশেষ কল্যাণার্থে প্রথম দিকে কুরআন মাজীদকে নুকতামুক্ত রাখা হয়েছিল।
হরকত: নুকতার ন্যায় প্রথম অবস্থায় পবিত্র কুরআন মাজীদে হরকত তথা যের, যবর ও পেশও ছিল না। সর্বপ্রথম আবুল আসওয়াদ দুআইলী (রহ.) হরকত আবিষ্কার করেন। তবে তাঁর আবিষ্কৃত হরকতগুলো বর্তমানের ন্যায় ছিল না। পরবর্তীতে খলীল ইবনে আহমদ (রহ.) হামযা ও তাশদীদের চিহ্ন তৈরি করেন। এরপর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ উদ্যোগী হয়ে প্রচলিত যের, যবর ও পেশ নির্ধারণ করেন।
মনযীল: হযরত সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণের অভ্যাস ছিল যে, তাঁরা প্রতি সপ্তাহে এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করতেন। এ উদ্দেশ্যে তাঁরা দৈনন্দিন তেলাওয়াতের একটা পরিমাণ নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। যেটাকে “হিযব” বা “মনযীল” বলা হয়। এভাবে সমগ্র কুরআন মাজীদকে মোট সাতটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল।
পারা: বর্তমানে পবিত্র কুরআন মাজীদ ত্রিশটি পারায় বিভক্ত। এই পারার বিভক্তি অর্থ ও বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং শিশুদের পড়ানোর সুবিধার্থে ত্রিশটি খণ্ডে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
আখমাস ও আ'শার: প্রথম যুগের পবিত্র কুরআনুল কারীমের কপিগুলোতে প্রতি পাঁচ আয়াতের পর (خمس বা সংক্ষেপে خ) এবং প্রতি দশ আয়াতের পর (عشر অথবা সংক্ষেপে ع) লিখে দেওয়া হতো। এ চিহ্নগুলো সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
রুকু: পরবর্তীকালে রুকু'র চিহ্নের (ع) ব্যবহার প্রচলিত হয়েছে। আলোচিত বিষয়বস্তুর অনুসরণে এ চিহ্নটি নির্ধারণ করা হয়েছে। মাশায়েখগণ পবিত্র কুরআনুল কারীমকে ৫৪০টি রুকু'তে বিভক্ত করেছেন যেন তারাবীর সালাতে সাতাশতম রাতে কুরআন খতম হয়।
ওয়াক্ফ বা যতিচিহ্ন: তেলাওয়াত ও তাজভীদের সহজতার জন্য কুরআনের বিভিন্ন বাক্যের উপর এমন কিছু যতিচিহ্ন লিখে দেওয়া হয়েছে, যা দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে ওয়াকফ করা (শ্বাস নেওয়া) কেমন? এই চিহ্নগুলোর অধিকাংশ সর্বপ্রথম আল্লামা আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে তাইফুর সাজাওয়ান্দী (রহ.) সংযোজন করেন। যেমন- ط (ওয়াকফে মুতলাক), ج (ওয়াকফে জায়েয), ز (ওয়াকফে মুজাওওয়ায), ص (ওয়াকফে মুরাখখাস), م (ওয়াকফে লাযেম) এবং لا (ওয়াকফ না করা উত্তম)। এছাড়াও مع (মু'আনাকা), সাকতাহ ও ওয়াকফাহ্ চিহ্নগুলোও ব্যবহৃত হয়।
টিকাঃ
২৮২. আল্লামা কালকাশিন্দী রচিত "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৪
২৮৩. আল-বুরহানফী উলূমিল কুরআন: ১/২৫০, আল-ইতকান: ২/১৭১
২৮৪. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৫
২৮৫. আল-বুরহান: পৃ. ২৫০-২৫১
২৮৬. আল-ইতকান: ২/১৭১
২৮৭. তাফসীরে কুরতবী: ১/৬৩, তারিখুল কুরআন: পৃ: ১৮১
২৮৮. "সুবহুল আ'শা" ৩/১২
২৮৯. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৩
২৯০. "সুবহুল আ'শা" ৩/১৫৫
২৯১. তাফসীরে কুরতুবী: ১/৬৩
২৯২. “সুবহুল আ'শা” ৩/১৬০, তারীখুল কুরআন: পৃঃ ১৮০
২৯৩. আল-ইতকান: ২/১৭১
২৯৪. আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন: ১/২৫০
২৯৫. তারীখুল কুরআন: পৃঃ ৮১
২৯৬. মানাহিলুল ইরফান: ১/৪০৩
২৯৭. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৪৯৭
২৯৮. তারীখুল কুরআন: ৮১
২৯৯. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি: ১/৯৪
৩০০. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৫৫
৩০১. "আল-মানহুল ফিকরিয়্যাহ" পৃঃ ৬৩
৩০২. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৩১
৩০৩. প্রাগুক্ত: পৃ: ২৩৩
৩০৪. আন্-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/২৩৭
📄 পারা
বর্তমানে পবিত্র কুরআন মাজীদ ত্রিশটি পারায় বিভক্ত। এই পারার বিভক্তি অর্থ ও বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং শিশুদের পড়ানোর সুবিধার্থে ত্রিশটি খন্ডে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তাই তো দেখা যায় কখনো কখনো আলোচনা শেষ হবার আগেই পারা শেষ হয়ে যায়। কে কুরআনুল কারীমকে ত্রিশটি খন্ডে বিভক্ত করেছেন? নিশ্চিতভাবে এ কথা বলা মুশকিল। কারো কারো মতে হযরত উসমান (রাযিআল্লাহু আনহু) মাসহাফ লিপিবদ্ধ করানোর সময় ত্রিশটি খন্ডে পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাই তাঁর যুগ থেকেই ত্রিশ পারার এই প্রচলন হয়ে আসছে। কিন্তু মুতাকাদ্দীমীন পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের বিশাল গ্রন্থ ভান্ডারে এর কোনো দলীল-প্রমাণ (লেখকের) দৃষ্টিগোচর হয়নি। অবশ্য আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) লিখেছেন যে, কুরআনের ত্রিশ পারা বহু আগ থেকে প্রসিদ্ধির সাথে চলে আসছে এবং মাদরাসাসমূহের কুরআনের কপিতে এর রেওয়াজ রয়েছে। এমনটাই মনে হয় যে, ত্রিশ পারার এ বিভক্তি সাহাবায়ে কেরামের যুগের পর শিক্ষাদানের সুবিধার্থে করা হয়েছে। (মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাই এই ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো অবগত।)
টিকাঃ
২৯৫. তারীখুল কুরআন: পৃঃ ৮১