📄 এ পরিচ্ছেদের সারাংশ
এ পরিচ্ছেদের শুরুতেই তার বিষয়বস্তু চিহ্নিত করেছেন, যার বিবরণ হচ্ছে, ১। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ এবং তার পরবর্তী যুগে কীভাবে কুরআনুল কারীম সংরক্ষণ করা হয়েছে! ২। তা কীভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে! ৩। এই চেষ্টা-প্রচেষ্টা কতটি ধাপ অতিক্রম করেছে! ৪। আলোচিত বিষয়ে নাস্তিক এবং অমুসলিমদের পক্ষ থেকে আগত সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টিকারী অপচেষ্টার জবাব প্রদান।
অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহর যুগ থেকে কোরআন সংরক্ষণ-পদ্ধতি নিয়ে পর্যায়-পর্যায়ভাবে আলোচনায় ব্রতী হন। প্রথম পর্যায়ঃ রাসূলুল্লাহর যুগে কোরআন সংরক্ষণ-পদ্ধতি। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম পদ্ধতি ছিল আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর অন্তরে তা খোদাইকৃত রূপে বসে যাওয়া, যার ওয়াদা স্বয়ং রাব্বে কারীমই দিয়েছিলেন। পাশাপাশি আহলে আরব সাহাবায়ে কেরামও তা মুখস্থ করে নিত যত্নসহকারে। হাফেজে কোরআন সাহাবায়ে কেরামের ভাল রকমের একটি ফিরিস্তি উল্লেখ করেন এর সাথে। উল্লেখ্য, তৎকালীন যুগে এটিই ছিল বাণী সংরক্ষণের সর্বনিভরযোগ্য পদ্ধতি। দ্বিতীয় পদ্ধতি ছিল লিপিবদ্ধকরণ। লিপিবদ্ধকারী সাহাবায়ে কেরামের নাম চল্লিশ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে এতে।
দ্বিতীয় পর্যায়ঃ হযরত আবূ বকর (রাযি.)-এর যুগে সংরক্ষণ পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহর যুগে কোরআন যদিও লিপিবদ্ধ আকারেও সংরক্ষিত ছিল, কিন্তু তা ছিল বিক্ষিপ্তাকারে। গাছের পাতায়, চামড়ার উপর, কারও কাছে পাঁচটি আয়াত, কারও কাছে দশটি, আবার কোনো সাহাবীর কাছে আয়াতের সাথে তাফসীরও লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু তিনি স্বীয় যুগে বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে একত্রিত আকারে রূপ দেন। এ অনুচ্ছেদে সংকলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট, হযরত আবু বকর ও উমরের পরামর্শ, প্রথমদিকে হযরত উমরের বিরোধিতা, খলীফাতুল মুসলিমিনের আবেগঘণ বক্তব্য ও হযরত উমরের "শরহে ছদর", হযরত যায়েদের নিকট লিপিবদ্ধকরণের দায়িত্ব হস্তান্তর, তার মনোভাব, লিপিবদ্ধকরণ-পদ্ধতি ও সতর্কতা; ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি উক্ত মাসহাফের মূলকপিগুলোর বৈশিষ্ট্যসমূহের ব্যাপারেও আলোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয় পর্যায়ঃ হযরত উসমানের যুগ। এ যুগে উম্মতের সহজতা এবং ঐক্যবদ্ধতার জন্যে কোরআনের উপর ব্যাপক খেদমত আঞ্জাম দেয়া হয়। কেননা ইসলাম দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ায় কোরআনের কেরাআতের সহজতার ব্যাপারে সকলেই অবগত না থাকায় একে অন্যের সাথে মতভেদ ও দোষারোপ করা শুরু হয়েছিল। এ আলোচনায় কোরআন সংকলনের কারণসহ পূর্ণ ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ সংকলনের নিম্নোক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ্য, ১। হযরত আবু বকর কর্তৃক সংকলিত মাসহাফ একত্রিত হলেও সূরার বিন্যাস ছিল না। এতে সূরাগুলোর বিন্যাস দেয়া হয়। ২। এতে "রুসমে খত" লিখনপদ্ধতি সবগুলো স্থান পেয়েছে। যে কারণে তাতে নুকতা, বা হরকত কোনোটিই দেয়া হয়নি। ৩। হযরত আবূ বকরের সংকলন একটি কপিতে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা ৫, বা ৭টি সংকলনে উন্নিত হয় এবং তার একেকটি করে কপি বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়, ইত্যাদি।
চতুর্থ পর্যায়ঃ তেলায়াত সহজীকরণের পদক্ষেপ। হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর "মাসহাফ" এর উপর সকল উম্মত ঐক্যমত পোষণ করেছে। এ লিখনপদ্ধতি ব্যতীত অন্য কোনো পদ্ধতিতে কোরআন লিপিবদ্ধ করা এখন আর জায়েজ নয়। কিন্তু উসমানী মাসহাফ অনারবদের জন্য অতি কঠিন এবং পড়তে কষ্টকর ছিল। কেননা তাতে নুকতা এবং হরকত ছিল না। এ জটিলতা নিরসনকল্পে পরবর্তীতে কোরআনে নিম্নোক্ত খেদমত আঞ্জাম দেয়া হয়, যথাঃ ১। নুকতা সংযোজন। এর প্রচলনকারী কে, সে ব্যাপারে আবুল আসাদ দুআইলী, হযরত আলী, যিয়াদ বিন আবী সুফিয়ান, আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ প্রমুখের নাম ইখতিলাফসহ বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়াও পর্যায়ক্রমিকভাবে ২। হরকত, ৩। মনযীল, ৪। পারা, ৫। আখমাস ও আ'শার, ৬। রুকু, ৭। ওয়াকফ, বা যতিচিহ্ন। এসমস্ত বিষয়ের প্রকৃতি, ব্যবহার, উদ্ভাবক ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
পঞ্চম পর্যায়ঃ কোরআনুল কারীমের মুদ্রণ। এতে সর্বপ্রথম ছাপা কারখানায় কোরআন কারীম মুদ্রিত হওয়ার ইতিহাস সংকলিত হয়েছে। এরপর ছাপাখানা আবিষ্কার হওয়ার পর সর্বপ্রথম জার্মানীর হামবুর্গ থেকে ১১১৩ হিজরীতে কোরআন ছাপা হয়। পরবর্তীতে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম মাওলায়ে উসমান রাশিয়ার 'সেন্ট পিটার্সবার্গ' শহরে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে কুরআনুল কারীমের একটি কপি মুদ্রণ করে। এছাড়াও এতে ইলমে কেরাতের উৎপত্তি, কেরাত গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য ৩টি শর্ত, প্রসিদ্ধ ক্বারীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
📄 রাসূলে কারীম (সা.)-এর যুগে পবিত্র কুরআন সংরক্ষণ
পবিত্র কুরআনুল কারীম যেহেতু একসাথে পুরোটা অবতীর্ণ হয়নি; বরং প্রয়োজন ও বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়েছে, তাই নববী যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া আল্লাহ তা'আলা অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের মুকাবিলায় পবিত্র কুরআনুল কারীমাকে এ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, এ গ্রন্থকে কাগজ-কলমের চেয়ে কুরআনের হাফেযদের বক্ষের মাধ্যমে বেশি সংরক্ষণ করেছেন। যেমন, সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে লক্ষ্য করে বলেছেন- ( مُنْزِل عَلَيْكَ كِتَابًا لَا يَغْسِلُهُ الْمَاءُ ) 'অর্থাৎ আমি আপনার উপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করব, পানি যাকে ধুয়ে নিতে পারবে না।'
অর্থাৎ সাধারণত পৃথিবীর গ্রন্থসমূহের অবস্থা তো হলো যে, দুনিয়াবী বিপদ-মুসীবত ও দুর্যোগের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। তাইতো তাওরাত, ইনজিল ও অন্যান্য আসমানী গ্রন্থসমূহ এভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমকে এমনভাবে বক্ষে বক্ষে সংরক্ষণ করে দেওয়া হবে যে, তা বিনষ্ট হয়ে যাবার কোনো আশঙ্কা থাকবে না। এ জন্যই ইসলামের প্রাথমিক যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে সংরক্ষণ করার জন্য মুখস্থ করার প্রতি অধিক জোর দেওয়া হতো। প্রথম প্রথম যখন ওহী নাযিল হতো, তখনই তিনি এর শব্দগুলোকে বার বার উচ্চারণ করতেন, যেন তা ভালোভাবে মুখস্থ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে-
(لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ (16 إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ )
'(এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার সময় আল্লাহর রাসূল তা মুখস্থ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে আল্লাহ অভয় দিয়ে বললেন) তুমি অতিদ্রুত ওহী আয়ত্ত করার জন্য তোমার জিভ নাড়াবে না। এর সংরক্ষণ ও পড়ানোর দায়িত্ব আমারই।'
এ আয়াতে সুস্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমকে স্মরণ রাখার জন্য ওহী অবতীর্ণ হবার সময় রাসূলে খোদা (সা.)-এর দ্রুত বার বার শব্দ উচ্চারণের কোনো প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তাঁর মধ্যে এমন স্মৃতিশক্তি সৃষ্টি করে দিবেন যে, একবার ওহী অবতীর্ণ হবার পর তিনি আর সেটাকে ভুলতে পারবেন না। বাস্তবে হয়েছেও এমন যে, একদিকে তাঁর উপর ওহী নাযিল হতো আর অপর দিকে তা তাঁর আত্মস্থ হয়ে যেত। এভাবে নবী কারীম (সা.)-এর বক্ষ মোবারক পবিত্র কুরআনুল কারীমের এমন সুরক্ষিত ভান্ডারে পরিণত হয়েছিল, যার মধ্যে সামান্যতম ভুল-ভ্রান্তি, সংযোজন-বিয়োজন বা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের সম্ভাবনাও ছিল না। উপরন্তু আরো অধিক সাবধানতার খাতিরে তিনি প্রতি বছর পবিত্র রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করে শোনাতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন সে বছর হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দুইবার কুরআনুল কারীমের দাওর করেন।
অতঃপর নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে শুধু পবিত্র কুরআনুল কারীমের অর্থই শিক্ষা দিতেন না; বরং তাঁদেরকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দও আত্মস্থ করাতেন। স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামেরও কুরআন শেখা ও তা আত্মস্থ করার প্রতি এতই আগ্রহ ছিল যে, প্রত্যেকেই এ ব্যাপারে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টায় থাকতেন। কোনো কোনো নারী সাহাবী নিজেদের শুধু এটাই মোহরানা হিসেবে দাবী করেছেন যে, স্বামীরা তাঁদেরকে কুরআনের শিক্ষা দিবেন। শত শত সাহাবায়ে কেরাম নিজেকে সব রকম ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে নিজের গোটা জীবন এ কাজের জন্যই ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। তাঁরা শুধু পবিত্র কুরআনুল কারীমকে আত্মস্থই করেননি; বরং রাতের বেলাও সালাতে তা বার বার পাঠ করতেন। হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা.) বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি মক্কা মুকাররমা থেকে হিজরত করে মদীনায় চলে আসতেন, তখন রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে আমাদের আনসারী সাহাবায়ে কেরামের মধ্য হতে কোনো একজনের দায়িত্বে দিয়ে দিতেন, যেন তিনি তাকে কুরআন শিক্ষা দেন। মসজিদে নববীতে কুরআন শিক্ষাকারী ও শিক্ষাদানকারীদের আওয়াজ এত বেড়ে গিয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে এ নির্দেশ প্রদান করতে হয় যে, প্রত্যেকে যেন আরো আস্তে আওয়াজ করে। যেন কোনো ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়।
আরবরা তাদের বিস্ময়কর স্মরণশক্তির জন্য গোটা দুনিয়ায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। শত শত বছর গোমরাহীর অন্ধকারে দিশেহারা থাকার পর পবিত্র কুরআনুল কারীমের সেই হেদায়েতের বাতিঘর তাঁরা লাভ করেছিলেন, যেটাকে তাঁরা নিজেদের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মূলধন মনে করতেন। তাই সেটাকে আত্মস্থ করার জন্য তাঁরা কত রকম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপই না গ্রহণ করেছেন! যার ফলে অল্প কয়েক দিনে সামান্য কিছু দিনের ব্যবধানেই সাহাবায়ে কেরামের বিশাল একটি দল তৈরি হয়ে গেল, পবিত্র কুরআনুল কারীম যাদের টাটকা মুখস্থ ছিল। বিভিন্ন রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, হাফেযে কুরআনের ওই দলে হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত তালহা (রা.), হযরত সা'দ (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.), হযরত সালিম মাওলা আবী হুযাইফা (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হযরত আমর ইবনুল আস (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.), হযরত মুআবিয়া (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনুস সায়েব (রা.), হযরত আয়েশা (রা.), হযরত হাফসা (রা.), হযরত উম্মে সালামা (রা.), হযরত উম্মে ওয়ারাকাহ (রা.), হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.), হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা.), হযরত আবু হালীমা মুআয (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.), হযরত আবু দারদা (রা.), হযরত মুজাম্মাহ ইবনে জারিআহ (রা.), হযরত মাসলামা ইবনে মুখাল্লাদ (রা.), হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.), হযরত উকবা ইবনে আমের (রা.), হযরত তামীমে দারী (রা.), হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) এবং হযরত আবু যায়েদ (রা.)-এর ন্যায় ব্যক্তিগণ শামিল ছিলেন।
এগুলো তো শুধু ওই সকল সাহাবায়ে কেরামের সম্মানিত নাম, যাদের নাম "হাফেযে কুরআন" হিসেবে রেওয়ায়েতে সংরক্ষিত হয়েছে। নতুবা এ ধরনের অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম রয়েছেন, যারা সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। এর প্রমাণ এ কথা থেকে বুঝা যায় যে, নবী কারীম (সা.) কখনো কখনো একটি গোত্রের জন্য সত্তরজন করে কুরআনের প্রশিক্ষক সাহাবী কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেছেন। যেমন, গাযওয়ায়ে বি'রে মাঊনা'র সময় সত্তরজন ক্বারী সাহাবীর শহীদ হওয়ার কথা রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে। রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইয়ামামাহ্'র যুদ্ধেও প্রায় এই পরিমাণ সংখ্যক হাফেয সাহাবী (রা.)-গণ শাহাদাত বরণ করেন।
মোটকথা, ইসলামের প্রাথমিক যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে সংরক্ষণের জন্য বুনিয়াদী পদ্ধতি এটাই অবলম্বন করা হয়েছিল যে, অধিক থেকে অধিক কুরআনুল কারীম মুখস্থ করিয়ে দেওয়া হয়। ওই অবস্থার প্রেক্ষিতে এটাই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ ও ভরসাপযোগী। আর যেহেতু মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আরববাসীদের স্মৃতিশক্তিতে এমন প্রখরতা দান করেছিলেন যে, এক এক জন ব্যক্তি হাজার হাজার কবিতার মুখস্থকারী ছিল। তাই পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তিকেই কাজে লাগানো হয়েছে এবং এর মাধ্যমেই পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াত ও সূরাগুলো আরবের ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছে। যার ফলে কত দ্রুত পবিত্র কুরআনুল কারীমের প্রচার ও প্রসার লাভ হয়েছে নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে তা অনুমান করা যায়। হযরত ওমর ইবনে সালামাহ (রা.) নববী যুগে খুবই অল্প বয়সী সাহাবী ছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিল একটি ঝর্ণার পাশে। যেখানে পথিক মুসাফিররা আরাম-বিশ্রাম করতো। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন না। কিন্তু যাতায়াতকারী মুসাফিরদের কাছ থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াত ও সূরা শুনে শুনে মুসলমান হবার পূর্বেই পবিত্র কুরআনুল কারীমের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
টিকাঃ
২৪৯. ইবনুল জাযারী কর্তৃক রচিত "আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর": ১/৬
২৫০. সূরা কেয়ামাহ: ১৬-১৭
২০৫. সহীহ বুখারী ফাতহুল বারীসহ : ৯/৩৬
২০৬. মানাহিলুল ইরফান: ১/২৩৪
২৫১. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর: ১/৬, আল-ইতকান: ১/৩-৪ ও তারিখুল কুরআন: পৃঃ ৬০
২৫২. উমদাতুল কারী: ২০/১৬-১৭
২৫৩. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন: ১/২৪১-২৪৩
📄 নববী যুগে কুরআন শরীফ লিপিবদ্ধকরণ
পবিত্র কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের মূল ভিত্তি যদিও মুখস্থের উপর ছিল, তথাপি মুখস্থ করানোর সাথে সাথে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধ করার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। লিপিবদ্ধ করার পদ্ধতি সম্পর্কে কাতেব বর্গের প্রধান হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) নিজের এক হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেন- "আমি নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্য ওহী লিপিবদ্ধ করতাম। যখন তাঁর উপর ওহী নাযিল হতো, তখন তাঁর দেহ মোবারক প্রচুর ঘর্মাক্ত হয়ে যেত। যখন এ অবস্থা শেষ হয়ে যেত তখন আমি দুম্বার চওড়া হাড় কিংবা এর সাদৃশ্য লিখনীযোগ্য কোনো বস্তু নিয়ে হাজির হতাম। আমি লিখতে থাকতাম আর তিনি লিখাতে থাকতেন। লেখা সমাপ্ত হলে তিনি বলতেন, “পড়”। আমি তাঁকে পড়ে শুনাতাম। আমি কোনো ভুল-ত্রুটি করলে তিনি তা সংশোধন করে দিতেন। তারপর সেটাকে মানুষের সামনে নিয়ে আসতাম।"
প্রকাশ থাকে ওহী লিপিবদ্ধ করার এ কাজ শুধু একা হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর উপরই সোপর্দ ছিল না; বরং তিনি আরো অনেক সাহাবীকে এ মহান কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। ওহী লিপিবদ্ধকারীদের সংখ্যা চল্লিশ পর্যন্ত শুমার করা হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গ হলেন, হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.), হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবী সারাহ (রা.), হযরত যুবাইর ইবনে আউয়াম (রা.), হযরত খালেদ ইবনে সাঈদ ইবনুল আস (রা.), হযরত আবান ইবনে সাঈদ ইবনুল আস (রা.), হযরত হানযালা ইবনুর রুবী' (রা.), হযরত মুআইকিব ইবনে আবী ফাতেমা (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম আয যাত্রী (রা.), হযরত শুরাহবীল ইবনে হাসানah (রা.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.), হযরত আমের ইবনে ফুহাইরা (রা.), হযরত আমর ইবনুল আস (রা.), হযরত সাবেত ইবনে কায়েস ইবনে শাম্মাস (রা.), হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা (রা.), হযরত খালেদ ইবনে ওলীদ (রা.), হযরত মুআবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান (রা.) এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)।
হযরত উসমান (রা.) বলেন, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর এই নিয়ম ছিল যে, যখনই পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো অংশ নাযিল হতো, তখন তিনি ওহী লেখকদের এ নির্দেশনা প্রদান করতেন যে, এটাকে অমুক সূরার অমুক আয়াতের পরে লিখ। সুতরাং এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী লিখা হতো। তখনকার যুগে যেহেতু আরব দেশে কাগজ দুষ্প্রাপ্য ছিল, তাই কুরআনের আয়াত অধিকতর পাথরের গায়ে, চামড়ার কাগজে, খেজুরের ডালায়, বাঁশের চটিতে, গাছের পাতায় এবং পশুর হাড়ে লিখা হতো। অবশ্য কখনো কখনো কাগজের টুকরোও ব্যবহার করা হয়েছে।
এভাবে নববী যুগে নবী কারীম (সা.)-এর তত্ত্বাবধানে পবিত্র কুরআনুল কারীমের একটি কপি লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। যদিও তখন গ্রন্থাকারে ছিল না; বরং পৃথক পৃথক কাগজে লিপিবদ্ধ ছিল। এর সাথে সাথে কোনো কোনো সাহাবী নিজের মুখস্থ রাখার জন্য পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো কোনো আয়াত নিজের কাছে লিখে রাখতেন। আর এই ধারাবাহিকতা ইসলামের একেবারে প্রাথমিক অবস্থা থেকে চালু ছিল। যার প্রমাণ নিম্নের ঘটনা থেকে পাওয়া যায়। ঘটনাটি হলো, হযরত ওমর (রা.)-এর বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব (রা.) এবং ভগ্নিপতি হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.) হযরত ওমর (রা.)-এর পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত ওমর (রা.) তাঁদের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ পেয়ে রাগান্বিত হয়ে যখন তাঁদের ঘরে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি সেখানে কুরআনের একটি সহীফা বা পান্ডুলিপি পেলেন। যার মধ্যে সূরা 'ত্বহা'র আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ ছিল।
এছাড়াও একাধিক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, অনেক সাহাবায়ে কেরাম ব্যক্তিগতভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সম্পূর্ণ বা অসম্পূর্ণ কপি লিপিবদ্ধ করে নিজের সংরক্ষণে রেখে দিয়েছিলেন। যেমন সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে- 'রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরআনকে নিয়ে শত্রুর ভূমিতে সফর করতে নিষেধ করেছেন।' অনুরূপভাবে মু'জামুল আওসাতেও একটি রেওয়ায়েত এসেছে। রাসূলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন- 'কোনো ব্যক্তি যদি কুরআনের কপি না দেখে তেলাওয়াত করে তাহলে তার সওয়াব এক হাজার। আর যে দেখে তেলাওয়াত করে তার সওয়াব দুই হাজার।' উপরোক্ত দুটি রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, নববী যুগ থেকেই সাহাবায়ে কেরামের নিকট কুরআনের পান্ডুলিপি বিদ্যমান ছিল।
টিকাঃ
২৫৪. তবারাণী রচিত "মু'জামুল আওসাত"
২৫৫. "উলূমুল কুরআন" পৃ: ১০১, সবহী সালেহ রচিত
২৫৬. ফাতহুল বারী ৯/১৮
২৫৭. ইবনুল কায়্যিম রচিত "যাদুল মাআদ" ১/৩০।
২৫৮. মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ, আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান ও হাকেমের উদ্ধৃতিসহ "ফাতহুল বারী": ৯/১৮
২৫৯. ফাতহুল বারী: ৯/১১, উমদাতুল কারী: ২০/১৭
২৬০. সূনানে দারাকুতনী: ১/১২৩, মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৯/৬১, সীরাতে ইবনে হিশাম।
২৬১. সহীহ বুখারী: কিতাবুল জিহাদ: ১/৪১৯-৪২০
২৬২. মাজমাউয যাওয়াইদ: ৭/১৬৫
📄 প্রথম ধাপ : হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে পবিত্র কুরআন জমা করণের
যেহেতু নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমের যতগুলো কপি লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, সেগুলোর অবস্থা ছিল এমন যে, হয়তো বিভিন্ন বস্তুর উপর লিপিবদ্ধ ছিল। কোনো আয়াত চামড়ার উপর, কোনো আয়াত গাছের পাতায় আবার কোনো আয়াত হাড়ের উপর। অধিকাংশ ই ছিল অসম্পূর্ণ কপি। কোনো সাহাবীর কাছে একটি সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। কারো কাছে পাঁচ-দশটি সূরা। কারো কাছে শুধু কয়েকটি আয়াত। আবার কোনো কোনো সাহাবীর কাছে আয়াতের সাথে তার তাফসীর বাক্য ও লিপিবদ্ধ ছিল।
এপ্রেক্ষিতে হযরত আবু বকর (রা.) নিজের খেলাফত কালে পবিত্র কুরআনুল কারীমের এই বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে একত্রিত করে তা সংরক্ষণ করাটাকে অত্যন্ত জরুরী মনে করলেন। হযরত আবু বকর (রা.) যেসব অবস্থার প্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং যেভাবে তা সম্পন্ন করে ছিলেন, সে সম্পর্কে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বর্ণনা করেন যে, ইমামামাহ্'র যুদ্ধের পর পরই একদিন হযরত আবু বকর (রা.) আমাকে জরুরীভাবে তলব করলেন। (আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলাম হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) উপস্থিত ছিলেন।) হযরত আবু বকর (রা.) আমাকে বললেন, “হযরত ওমর এইমাত্র এসে আমাকে সংবাদ দিলেন যে, ইয়ামামাহ্'র যুদ্ধে হাফেযে কুরআনদের বিরাট একটি দল শহীদ হয়ে গেছেন। আর এভাবে যদি হাফেযগণ শহীদ হতে থাকেন, তাহলে আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, পবিত্র আল-কুরআনের বিরাট একটি অংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই আমার মত হলো, আপনি আপনার নির্দেশ প্রদান করে কুরআনুল কারীমকে সংকলন করার কাজ আরম্ভ করে দিন।”
আমি হযরত ওমরকে বললাম, যে কাজ রাসূলে খোদা (সা.) নিজে করেননি, তা আমরা কিভাবে করতে পারি? হযরত ওমর (রা.) উত্তর দিলেন, মহান আল্লাহর কসম! এ কাজ অনেক উত্তমই হবে। এভাবে হযরত ওমর আমাকে বারবার তাগিদ দিতে থাকলেন। এমনকি আমার অন্তরও এ দিকে ঝুঁকে পড়ল। এবং আমিও হযরত ওমরের সাথে একমত হয়ে গেলাম। অতঃপর হযরত আবু বকর (রা.) আমাকে বললেন, "তুমি একজন নওজোয়ান এবং সমঝদার মানুষ। তোমার ব্যাপারে আমার কোনো বিরূপ ধারণা নেই। তুমি নবী কারীম (সা.)-এর নিকট ওহী লিপিবদ্ধ করতে। অতএব, তুমি কুরআনুল কারীমের আয়াতসমূহকে তালাশ করে সেগুলোকে একত্রে জমা কর।"
হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, মহান আল্লাহর কসম! যদি তাঁরা আমাকে একটি পাহাড় স্থানান্তর করার নির্দেশ দিতেন, তবুও বোধ হয় তা আমার কাছে এত কঠিন মনে হতো না, যত কঠিন মনে হতে লাগল কুরআন সংকলনের কাজটি। আমি তাঁকে বললাম, আপনি ওই কাজ কি করে করতে চাচ্ছেন, যে কাজ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) করেননি? হযরত আবু বকর (রা.) উত্তরে আমাকে বললেন, মহান আল্লাহর শপথ! এ কাজ উত্তম-ই উত্তম হবে। বার বার তিনি আমাকে একই কথা বলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমার হৃদয়কেও এ রায়ের প্রতি উন্মুক্ত করে দিলেন, যার প্রতি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)-এর হৃদয়কে। এভাবে আমি কুরআনের আয়াত তালাশ করতে শুরু করলাম। খেজুরের ডাল, পাথরের গা এবং মানুষের বক্ষ থেকে কুরআন সংকলন করলাম।
এখানে কুরআন জমা করার ক্ষেত্রে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর কার্যক্রম সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়ার দরকার। তিনি একই সময়ে স্মৃতি থেকে, হাফেযদের দল থেকে এবং নববী যুগে লিখিত কপি- এই সবগুলো পদ্ধতি দ্বারা কাজ করেছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আয়াত প্রণীত সহীফায় স্থান দিতেন না, যতক্ষণ সেটার লিখিত ও মৌখিকভাবে মুতাওয়াতির হবার প্রমাণ তিনি না পেতেন। যখন কোনো ব্যক্তি তাঁর কাছে পবিত্র কুরআনুল কারীমের লিখিত কোনো আয়াত নিয়ে আসতেন, তখন তিনি নিম্নোক্ত চারটি পদ্ধতি অবলম্বন করে সেগুলোর সত্যায়ন করতেন।
১. সর্বপ্রথম তিনি তাঁর স্মৃতিতে রক্ষিত কুরআনের সাথে মিলিয়ে তা পরিমাপ করতেন।
২. হযরত ওমর (রা.) ও হাফেয ছিলেন। যখন কোনো ব্যক্তি কোনো আয়াত নিয়ে উপস্থিত হতো, তখন তাঁরা উভয়ে যৌথভাবে সেটাকে সংগ্রহ করতেন। কাজেই হযরত যায়েদ (রা.) ছাড়াও হযরত ওমর (রা.) ও নিজের স্মৃতির সাথে মিলিয়ে সেটার সত্যায়ন করতেন।
৩. লিখিত কোনো আয়াত ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করা হতো না, যতক্ষণ না দু'জন বিশ্বস্ত সাক্ষী এ মর্মে সাক্ষ্য দিত যে, এ আয়াত রাসূলে খোদা (সা.)-এর সামনে লিখা হয়েছিল।
৪. অতপর এই লিখিত আয়াতগুলোকে বিভিন্ন সাহাবা কর্তৃক প্রস্তুতকৃত পান্ডুলিপির সাথে তুলনা করা হতো।
পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে অধিক থেকে অধিকতর সতর্কতাই ছিল এই কর্মপদ্ধতি অবলম্বনের একমাত্র উদ্দেশ্য। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এই নযীরবিহীন সতর্কতার সাথে কুরআনের আয়াতগুলোকে একত্রিত করে ধারাবাহিকভাবে সেগুলোকে কাগজের কপিতে লিপিবদ্ধ করে দেন। কিন্তু প্রত্যেকটি সূরা যেহেতু পৃথক পৃথক করে লিখা হয়েছিল, তাই তা একাধিক সহীফা সম্বলিত ছিল। আর এই কপির বৈশিষ্ট্য ছিল নিম্নরূপ:
(১) এই কপিতে কুরআনের আয়াতগুলো নবী কারীম (সা.)-এর নির্দেশিত তারতীব বা ধারাবাহিকতা অনুযায়ী বিন্যস্ত ছিল; কিন্তু সূরাগুলোর ধারাবাহিকভাবে সাজানো ছিল না।
(২) এই কপিতে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাত হরফই বিদ্যমান ছিল।
(৩) এই কপিগুলো হিরী লিপির অনুকরণে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।
(৪) এই কপিতে শুধু ওই সকল আয়াতগুলো সংকলন করা হয়েছিল যেগুলোর তেলাওয়াত রহিত হয়নি।
(৫) এই কপি লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা উম্মতের সামগ্রিক সত্যায়নের সাথে একটি কপি বিন্যস্ত হয়ে যায়।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কর্তৃক সংকলিত এই কপিটি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর নিকটেই সংরক্ষিত ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর হযরত ওমর (রা.) তা সংরক্ষণ করেন। তাঁর শাহাদাতের পর তাঁর ওসীয়ত অনুযায়ী সেগুলোকে উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর নিকট সোপর্দ করে দেওয়া হয়। অতঃপর মারওয়ান ইবনে হাকাম তাঁর শাসনামলে হযরত হাফসা (রা.)-এর কাছ থেকে এগুলো তলব করলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত হযরত হাফসা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর মারওয়ান তা চেয়ে নেয় এবং সেগুলোকে এ চিন্তা থেকেই আগুনে পুড়িয়ে দেন যে, তখন হযরত উসমান (রা.) কর্তৃক সূরার তারতীব অনুসারে লিখন পদ্ধতিসহ সংকলিত কুরআনুল কারীমের সর্বসম্মত বিশুদ্ধতম কপি প্রস্তুত হয়ে চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
টিকাঃ
২৬৩. সহীহ বুখারী ফাতহুল বারী সহ: ৬/৮-১১
২৬৪. ফাতহুল বারী : ৯/১১
২৬৫. প্রাগুক্ত
২৬৬. আল-ইতকান: ১/৬০
২৬৭. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন: ১/২৩৮
২৬৮. আল-ইতকান: ১/৬০
২৬৯. আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন: ১/২৩৪-২৩৫
২৭০. আল-ইতকান: ১/৬০
২৭১. আল-ইতকান: ১/৬০
২৭২. মানাহিলুল ইরফান: ১/২৪৬-২৪৭
২৭৩. তারীখুল কুরআন: পৃঃ ৪৩
২৭৪. ফাতহুল বারী: ৯/১২-১৩
২৭৫. প্রাগুক্ত: পৃ: ১৬