📄 পবিত্র কুরআনে কারীমে মানসুখ আয়াতের সংখ্যা
পবিত্র কুরআনে কারীমে মানসুখ আয়াতের সংখ্যা :
আমরা ইতিপূর্বে বলে এসেছি যে, মুতাকাদ্দেমীন পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের পরিভাষায় নসখের অর্থ বেশ ব্যাপক ছিল। তাই তাঁরা মানসূখ আয়াতের সংখ্যা অনেক বেশি সাব্যস্ত করেন। কিন্তু আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) মুতাআখখেরীন পরবর্তী উলামায়ে কেরামের পরিভাষা অনুযায়ী লিখেন যে, সমগ্র কুরআনে মাত্র উনিশটি আয়াত মানসূখ।
অতঃপর শেষ জামানায় এসে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ওই উনিশটি আয়াতের মাঝে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে শুধুমাত্র পাঁচটির মধ্যে নসখকে স্বীকার করেছেন। আর বাকি আয়াতগুলোর মধ্যে ওই সকল তাফসীরকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যেগুলো অনুযায়ী আয়াতগুলোকে মানসূখ হিসেবে মেনে নিতে হয় না। সেগুলোর প্রত্যেকটি আয়াতের মধ্যেই হযরত শাহ সাহেবের ব্যাখ্যা অত্যন্ত যুক্তি ও বিবেকগ্রাহ্য। অবশ্য কোনো কোনো ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মতানৈক্যও করা যেতে পারে। যাই হোক, তাঁর স্বীকৃত আয়াত পাঁচটি হচ্ছে-
১. সূরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে-
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ
'তোমাদেরকে নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে যে, যখন তোমাদের কারও সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং সেই ব্যক্তি কিছু সম্পত্তি ছেড়ে যায়, তবে সে ব্যক্তি যেন সঙ্গতভাবে ওয়াসীয়াত করে যায় পিতা-মাতা ও নিকট সম্পর্কীয়দের জন্য, মুত্তাকীদের জন্য এটা একটা কর্তব্য।'
মীরাস বা উত্তরাধিকার সম্পদ সংক্রান্ত বিধান নাযিল হবার পূর্বে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল এবং এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয করা হয়েছিল যে, সে মৃত্যুর পূর্বে নিজের পরিত্যক্ত সম্পদের ব্যাপারে অসীয়ত করে যাবে, তার পিতা-মাতা বা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের কতটুকু করে সম্পদ বণ্টন করে দেওয়া হবে? পরবর্তীতে মীরাসের আয়াত অর্থাৎ- يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ আয়াতটি অসীয়তের আয়াতকে মানসূখ করে দিয়েছে। আর স্বয়ং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন প্রত্যেক আত্মীয়-স্বজনের মাঝে পরিত্যক্ত সম্পদ বণ্টনের জন্য মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এখন আর মৃত্যুর পূর্বে কোনো ব্যক্তির উপর অসীয়ত করা ফরয হয়নি।
২. সূরা আনফালে বর্ণিত হয়েছে-
إِن يَكُن مِّنكُم عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ ۚ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّائَةٌ يَغْلِبُوا أَلْفًا مِّنَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَفْقَهُونَ
‘তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দু'শ জনের উপর জয়ী হবে এবং তোমাদের মধ্যে (ঐরূপ) একশ' জন থাকলে তারা একহাজার কাফিরের উপর বিজয়ী হবে। কেননা তারা হচ্ছে এমন লোক যারা (ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে) কোন বোধ রাখে না।'
এ আয়াতটি যদিও বাহ্যিকভাবে একটি খবর। কিন্তু অর্থগত দিক থেকে তা একটি নির্দেশ। আর তা হলো, মুসলমানদের জন্য দশগুণ শত্রুর বিরুদ্ধে মুকাবিলা করা থেকে পলায়ন করা জায়েয নেই। এ আয়াতকে পরবর্তী আয়াত দ্বারা মানসূখ করা হয়েছে-
الآن خَفَّفَ اللهُ عَنكُمْ وَعَلِمَ أَنَّ فِيكُمْ ضَعْفًا ۚ فَإِن يَكُن مِّنكُم مِّائَةٌ صَابِرَةٌ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ وَإِن يَكُن مِّنكُمْ أَلْفٌ يَغْلِبُوا أَلْفَيْنِ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
'(তবে) এখন আল্লাহ তোমাদের দায়িত্বভার কমিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তো জানেন যে তোমাদের ভিতর দুর্বলতা রয়ে গেছে, কাজেই তোমাদের মাঝে যদি একশ' জন ধৈর্যশীল হয় তবে তারা দু'শ জনের উপর বিজয়ী হবে। আর যদি তোমাদের মাঝে এক হাজার (ঐ রকম) লোক পাওয়া যায় তাহলে তারা আল্লাহর হুকুমে দু'হাজার লোকের উপর জয়ী হবে। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে (আছেন)।'
এ আয়াত পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুমকে সহজ-সাধ্য করে দিয়েছে এবং দশগুণ শত্রুর পরিবর্তে দ্বিগুণ শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, এ সীমা অতিক্রম করে পলায়ন করা জায়েয নেই।
৩. হযরত শাহ সাহেব (রহ.) কর্তৃক মানসূখ আয়াতের তৃতীয়টি হচ্ছে সূরা আহযাবের নিম্নোক্ত আয়াত-
لَّا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِن بَعْدُ وَلَا أَن تَبَدَّلَ بِهِنَّ مِنْ أَزْوَاجٍ وَلَوْ أَعْجَبَكَ حُسْنُهُنَّ
'এরপর আপনার জন্য (এদের অতিরিক্ত) অন্য স্ত্রী গ্রহণ হালাল নয় এবং আপনার (বর্তমান) স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয়, যদিও অন্যদের সৌন্দর্য আপনাকে বিমোহিত করে।'
এ আয়াতে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে অতিরিক্ত বিবাহ করতে নিষেধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এ হুকুম মানসূখ করে দেওয়া হয়েছে। আর এ আয়াতের নাসিখ (মানসূখকারী) সেই আয়াত, যা পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্তমান ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী এই আয়াতের পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। আয়াতটি হলো-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ اللَّاتِي آتَيْتَ أُجُورَهُنَّ
'হে নবী (সা.)! আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীগণকে যাদের মোহরানা তুমি প্রদান করেছ; ।'
হযরত শাহ সাহেব (রহ.) এবং অন্যান্যদের বক্তব্য হলো, এ আয়াতের মাধ্যমে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে গেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যে, এ আয়াতে নসখ হওয়াটা নিশ্চিত নয়। বরং এ আয়াতের ওই তাফসীরও অত্যন্ত লৌকিকতা হীন ও সাদামাটা যা হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ এই দু'টি আয়াতও নিজেদের বর্তমান তারতীব বা ক্রমধারা অনুযায়ীই অবতীর্ণ হয়েছে। يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ আয়াতে মহান আল্লাহ তা'আলা বিশেষ কিছু নারীর কথা উল্লেখ করেছেন যে, তাদের সাথে আপনার বিবাহ হালাল। এরপর তার পরবর্তী আয়াত لَّا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِن بَعْدُ এ বলা হয়েছে যে, এরা ব্যতীত অন্য নারীরা আপনার জন্য হালাল নয়।
৪. হযরত শাহ সাহেব (রহ.) কর্তৃক মানসূখ আয়াতের চতুর্থটি হচ্ছে সূরা মুজাদালাহ'র নিম্নোক্ত আয়াত-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَةً ۚ ذَلِكَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَأَطْهَرُ فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"অর্থাৎ হে মু'মিনগণ! তোমরা যখন রসূলের সঙ্গে গোপনে কথা বল, তখন গোপনে কথা বলার আগে সদাক্বাহ দাও, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম ও অতি পবিত্র পন্থা। আর যদি সদাক্বাহ জোগাড় করতে না পার, তাহলে আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।"
এই আয়াতটি পরবর্তী আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। আয়াতটি হলো-
أَأَشْفَقْتُمْ أَن تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَজْوَاكُمْ صَدَقَاتٍ فَإِذْ لَمْ تَفْعَلُوا وَتَابَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ
'অর্থাৎ তোমরা কি ভয় পেয়ে গেলে যে, তোমাদেরকে (নবীর সঙ্গে) গোপনে কথাবার্তা বলার আগে সদাক্বাহ দিতে হবে? তোমরা যদি তা না কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন, কাজেই তোমরা নামায কায়িম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর।'
এভাবে একান্তভাবে কানে কানে কথা বলার পূর্বে সদকা করার হুকুম রহিত করা হয়েছে।
৫. মানসূখ আয়াতের পঞ্চমটি হচ্ছে সূরা মুজ্জাম্মিলের নিম্নোক্ত আয়াত-
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ (1) قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا (2) نِصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِিলًا (3)
'হে চাদর আবৃত! (রাসূল (সা.)-কে বুঝানো হয়েছে) রাতে (তাহাজ্জুদ সালাতে) দাঁড়ান কিছু অংশ ছাড়া। রাতের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম।'
এ আয়াতে রাতের কমপক্ষে অর্ধাংশ তাহাজ্জুদ সালাতে কাটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে পরের আয়াত দ্বারা এতে সহজতা সৃষ্টি করে পূর্বের হুকুমকে রহিত করা হয়েছে। সেই আয়াতটি হলো-
عَلِمَ أَن لَّن تُحْصُوهُ فَتَابَ عَلَيْكُمْ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّরَ مِنَ الْقُرْآنِ
'তিনি [আল্লাহ তা'আলা] জানেন যে, তোমরা তা করতে সক্ষম হবে না। তাই তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন। অতএব, তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকুই পড়।'
হযরত শাহ সাহেব (রহ.)-এর তাহকীক অনুযায়ী তাহাজ্জুদের হুকুম প্রথমেও ওয়াজিব ছিল না। তবে এর উপর প্রথমে খুব গুরুত্ব ছিল এবং এর সময়ও ছিল বেশ প্রশস্ত। পরবর্তীতে এর গুরুত্বও হ্রাস পেয়েছে এবং সময়েরও তেমন পাবন্দি হয়নি।
এই সেই পাঁচ আয়াত, হযরত শাহ সাহেব (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী যা রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকাশ থাকে যে, এই পাঁচটি উদাহরণ শুধু ওই ক্ষেত্রে, যার নাসিখ ও মানসূখ উভয়টা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বিদ্যমান। এগুলো ব্যতীত সর্বসম্মত মত অনুযায়ী পবিত্র কুরআনুল কারীমে এমন কিছু উদাহরণ রয়েছে, যেগুলোর নাসিখ পবিত্র কুরআনুল কারীমে রয়েছে, কিন্তু মানসূখ কুরআনে নেই। উদাহরণস্বরূপ, কেবলা পরিবর্তনের আয়াত।
টিকাঃ
২৩৮. আল-ইতকান: ২/২২
২৩৯. সূরা বাকারা: ১৮০
২৪০. সূরা আনফাল: ৬৫
২৪১. সূরা আনফাল: ৬৬
২৪২. সূরা আহযাব: ৫২
২৪৩. সূরা আহযাব: ৫০
২৪৪. তাফসীরে ইবনে জারীর।
২৪৫. সূরা মুজাদালাহ্: ১২
২৪৬. সূরা মুজাদালাহ: ১৩
২৪৭. সূরা মুজ্জাম্মিল: ১-৩
২৪৮. সূরা মুজ্জাম্মিল: ২০
📄 আলোচনার ফলাফল
আলোচনার ফলাফল :
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা মূলত আমাদের উদ্দেশ্য এ কথা বলা যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াতে নসখ পাওয়া যাওয়া (নাউযুবিল্লাহ) কোনো দোষ নয়। যা থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে মুক্ত দেখানোর চেষ্টা করা হবে। বরং তা মহান আল্লাহ তা'আলার হেকমতের চাহিদা। অতএব, কোনো আয়াতের কোনো তাফসীরকে শুধু এ ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয় যে, এ তাফসীর অনুযায়ী কুরআনে নসখ আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। বরং তাফসীরের মূলনীতি অনুযায়ী অগ্রাধিকার প্রাপ্ত তাফসীরকে গ্রহণ করার মধ্যে দোষের কিছু নেই। চাই তাতে আয়াতকে মানসূখ সাব্যস্ত করতে হোক না কেন?
আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাই ভালো জানেন।