📘 উলুমুল কুরআন 📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমে 'নসখ'-এর আলোচনা

📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমে 'নসখ'-এর আলোচনা


পবিত্র কুরআনুল কারীমে 'নসখ'-এর আলোচনা :

এ ব্যাপারে উম্মতের কোনো সদস্যের মতানৈক্য আছে বলে আমাদের জানা নেই যে, শরঈ বিধি-বিধানে নসখের ধারাবাহিকতা পূর্ববর্তী উম্মতদের যুগ থেকেই চলে আসছে এবং উম্মতে মুহাম্মাদিয়্যার শরীয়তেও অনেক হুকুম মানসূখ হয়েছে। যেমন, প্রথম নির্দেশ ছিল যে, বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে হবে। পরবর্তীতে এই নির্দেশ মানসূখ করে কা'বা শরীফের দিকে মুখ করে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে মুসলমানদের মধ্যে কারো মতানৈক্য নেই।

তবে এ ব্যাপারে কিছুটা মতানৈক্য রয়েছে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমে নসখ হয়েছে কি-না? অন্য শব্দে এ মাসআলা এভাবে আলোচনা করা হয়েছে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমে কি এমন কোনো আয়াত বিদ্যমান আছে, যার হুকুম মানসূখ হয়ে গেছে তবে তার তেলাওয়াত এখনও চালু আছে? জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের রায় হলো, পবিত্র কুরআনুল কারীমে এ ধরনের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে, যার হুকুম মানসূখ হয়ে গেছে।

কিন্তু এক্ষেত্রে মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের মধ্য হতে আবু মুসলিম ইস্পাহানির বক্তব্য হলো, পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো আয়াত মানসূখ হয়নি। বরং সমস্ত আয়াতের উপর এখনো আমল করা ওয়াজিব। সেই আবু মুসলিম ইস্পাহানির অনুসরণ করে অন্যান্য ব্যক্তিবর্গও এই রায় ব্যক্ত করেছেন। আমাদের যুগের অনেক প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গও এই রায়ের প্রবক্তা। এ সকল ব্যক্তিবর্গ নসখের আয়াতসমূহের এমন ব্যাখ্যা করেন যে, যাতে নসখ স্বীকার করতে না হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো যে, এ অবস্থানটা দলীল-প্রমাণের দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল এবং তা মেনে নেওয়ার ফলে কুরআনের কিছু আয়াতের তাফসীরে এমন টানা-হেঁচড়ার প্রয়োজন পড়ে যা তাফসীরের মূলনীতির একেবারেই পরিপন্থী।

যে সকল ব্যক্তি পবিত্র কুরআনুল কারীমে নসখের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না প্রকৃত পক্ষে তাদের অন্তরে এ কথা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, নসখ একটি দোষের বিষয়, যা থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীম মুক্ত হওয়া উচিত। অথচ ইতোপূর্বে আপনি দেখেছেন যে, নসখকে দোষ হিসেবে ধারণা করা কত বড় দুর্বল চিন্তার পরিচায়ক। তারপর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে, আবু মুসলিম ইস্পাহানি ও তাঁর অনুসারীরা সাধারণত ইহুদী-নাসারাদের মতো অস্বীকার করে না যে, আল্লাহ তা'আলার অনেক বিধানে নসখ হয়েছে। বরং তারা শুধু এ টুকু বলে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমে নসখ নেই। নসখ যদি দোষের বিষয়ই হয়ে থাকে, তাহলে কুরআন বহির্ভূত আহকামের ক্ষেত্রে কিভাবে এ দোষের সৃষ্টি হলো? যখন সেগুলোও মহান আল্লাহ তা'আলারই আহকাম।

আর এটা যদি কোনো দোষের বিষয় না হয়ে থাকে, তাহলে যে বিষয় কুরআন বহির্ভূত আহকামে দোষের ছিল না সেটা কুরআনী আহকামের ক্ষেত্রে কি করে দোষ হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়? বলা হয়, এটা হেকমতে এলাহীর বিপরীত মনে হয় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো আয়াত শুধু বরকতের উদ্দেশ্যে তেলাওয়াত করার জন্য বাকি রাখা হবে এবং এর উপর আমলের ধারাবাহিকতা বিলুপ্ত করা হয়ে গেছে।

আর কেন এটাকে হেকমতে এলাহীর বিপরীত দাঁড় করানো হলো? অথচ পবিত্র কুরআনুল কারীমে 'হুকুম মানসূখ ও তেলাওয়াত বাকি' বিশিষ্ট আয়াতের মধ্যে অনেক কল্যাণও নিহিত থাকতে পারে। যেমন, এর দ্বারা শরঈ বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিকভাবে অবতীর্ণ হবার রহস্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠে এবং মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন মানুষকে স্বীয় আহকামের অনুসারী করার ক্ষেত্রে যে প্রজ্ঞাপূর্ণ হেকমত অবলম্বন করেছেন তাও জানা যায়। অনুরূপভাবে এর দ্বারা শরঈ আহকামের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় এবং এটাও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুসলমানদের উপর কখন কি হুকুম জারী করা হয়েছিল। স্বয়ং মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমের কয়েক স্থানে পূর্ববর্তী উম্মতদের ওই সকল আহকামকে উল্লেখ করেছেন, যেগুলো উম্মতে মুহাম্মাদিয়্যার শরীয়তে মানসূখ হয়ে গিয়েছে। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وَعَلَى الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرٍ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَوْ مَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ
'যারা ইয়াহূদী হয়েছে তাদের জন্য আমি যাবতীয় তীক্ষ্ণধার নখযুক্ত পশু হারাম করেছিলাম আর তাদের জন্য গরু-ছাগলের চর্বিও হারাম করেছিলাম, এগুলোর পিঠের কিংবা নাড়িভুঁড়ির বা হাড়ের সাথে লেগে থাকা চর্বি ছাড়া।'

এ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, দৃষ্টান্ত ও উপদেশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ তা'আলা এখানে একটি মানসূখ হুকুমের উল্লেখ করেছেন। যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমে কিছু রহিত হুকুমের আয়াতের তেলাওয়াত এ উদ্দেশ্যেই বাকি রাখা হয়, তাহলে এতে কোন বিষয়টা হেকমতে এলাহীর বিপরীত গিয়ে দাঁড়াল? উপরন্তু এ দাবী কে করতে পারে যে, সে মহান আল্লাহ পাকের সমস্ত হেকমত সম্পর্কে অবগত আছে? অথবা সে পবিত্র কুরআনুল কারীমের প্রত্যেকটি আয়াতের ব্যাপারে জানে যে, তা অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যে কি কি হেকমত ছিল? যদি কোনো ব্যক্তির এ দাবী সঠিক না হয়- আর বাস্তবেই তা সঠিক হবার নয়, তাহলে মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো কাজের ব্যাপারে শুধু এ ভিত্তিতে কিভাবে অস্বীকার করা যাবে যে, এর হেকমত আমরা জানতে পারিনি? যখন ওই কাজের বাস্তবায়ন শরঈ দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।

কাজেই বাস্তব কথা এটাই যে, যারা পবিত্র কুরআনুল কারীমে নসখের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না, তাদের ভিত্তিটি একেবারে ভুল, যার উপর তারা নিজেদের চিন্তাধারার প্রাসাদ দাঁড় করিয়েছে। তারা পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো কোনো আয়াতকে অনেক দূরবর্তী অর্থ দ্বারা এ জন্য সাজিয়েছে যে, তাদের দৃষ্টিতে "নসখ” একটি দোষ। যা থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে মুক্ত দেখা এবং দেখানোই ছিল তাদের অভিপ্রায়। যদি তাদের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নসখ কোনো দোষের বিষয় নয়; বরং ইহা হেকমতে এলাহীর বাস্তব দাবী, তাহলে তারা এ ধরনের আয়াতের তাফসীর তাই করবে, যা সাধারণভাবে করা হয়। কেননা প্রকাশ্য ও সচরাচর তাফসীর এটাই। পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
مَا نَنسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِّنْهَا أَوْ مِثْلِهَا أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মতো আনয়ন করি। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।'

যে ব্যক্তিই কোনো পক্ষপাতিত্ব ব্যতীত মুক্ত মস্তিষ্কে এ আয়াত পাঠ করবে, সে অবশ্যই এই আয়াত থেকে এ ফলাফল বের করতে সক্ষম হবে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের মধ্যে নসখের ধারাবাহিকতা স্বয়ং পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্ণনা অনুযায়ীই চালু ছিল। পক্ষান্তরে আবু মুসলিম ইস্পাহানি ও তার অনুসারীরা বুঝে বা না বুঝে 'নসখ'কে একটা দোষ বলে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে তা থেকে মুক্ত সাব্যস্ত করতে চায়। তারা উল্লিখিত আয়াতের দূরবর্তী জটিল ব্যাখ্যা করে থাকে। যেমন তারা বলে যে, এই আয়াতে একটি কাল্পনিক অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কাল্পনিকভাবে আমি যদি কোনো আয়াতকে মানসূখ করি, তাহলে এর চেয়ে উত্তম বা সমমানের আয়াত নাযিল করি। এর দ্বারা বাস্তবেই কোনো আয়াতকে মানসূখ করা আবশ্যক হয় না। এর উপমা এমন যেমন এক পবিত্র আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
قُلْ إِن كَانَ لِلرَّحْمَنِ وَلَدٌ فَأَنَا أَوَّلُ الْعَابِدِينَ
'যদি রহমান (আল্লাহর)-এর সন্তান থাকতো, তবে আমি প্রথম তাঁর ইবাদতকারী হতাম।'

নসখ অস্বীকারকারীরা বলে যে, এ আয়াতে যেমনিভাবে কাল্পনিক একটা অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, এর দ্বারা আবশ্যক নয় যে, বাস্তবেই মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো সন্তান আছে। অনুরূপভাবে উল্লিখিত আয়াতেও একটি কাল্পনিক দিক উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। যা বাস্তবায়িত হওয়ার আবশ্যকতা নেই। কিন্তু উল্লিখিত আয়াতের এই বিশ্লেষণ দূর-দূরান্তের মনগড়া জটিল ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি মর্যাদা রাখে না। কারণ যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াতে কখনো নসখ না-ই হওয়ারই ছিল, তবে কাল্পনিকভাবেই এর উল্লেখ করা মহান আল্লাহ তা'আলার কি প্রয়োজন ছিল? পবিত্র কুরআনুল কারীমের শান কখনো এমন হতে পারে না যে, যা কখনো বাস্তবে উপস্থাপিত হবার নয়, বিনা কারণে কাল্পনিকভাবে উল্লেখ করে সেটার উপর হুকুম লাগানো হবে।
বাকি থাকল (إن كان للرحمن ولدا الخ) "যদি রহমানের কোনো সন্তান থাকত..." আয়াতের কথা। এই আয়াতের মাঝে আর নসখের আয়াতের মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো সন্তান জন্ম হওয়া এক অসম্ভব বিষয় (নাঊযুবিল্লাহ)। কাজেই এ আয়াতের পাঠক সাথে সাথেই বুঝে নেয় যে, এ কথাটি শুধুমাত্র কাল্পনিক বা কথার কথা হিসেবে বলা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হলো, যদি কথার কথা মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো সন্তান থাকতো, তাহলে আমি সবার আগে তার ইবাদত করতাম। কিন্তু যখন তাঁর কোনো সন্তান হতে পারে না, তাহলে তিনি ব্যতীত আর কারো কোনো ইবাদত করার প্রশ্নই উঠে না। পক্ষান্তরে নসখের বাস্তবতা স্বয়ং আবু মুসলিম ইস্পাহানির নিকটও যুক্তিগ্রাহ্যভাবে অসম্ভব নয়। কাজেই নসখকে কাল্পনিক বিষয় সাব্যস্ত করার কোনো অর্থ হতে পারে না। আর এ কথাটি উল্লিখিত আয়াতের শানে নুযূল দ্বারা আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, কতিপয় কাফের রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর এই অভিযোগ উত্থাপন করল যে, আপনি আপনার অনুসারীদেরকে প্রথমে একটি কাজের নির্দেশ দেন, তারপর আবার সেটা থেকে নতুন নির্দেশ নিয়ে আসেন কেন? এর জবাবে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, এই আয়াতে নসখকে স্বীকার করে নিয়ে তার হেকমত বর্ণনা করা হয়েছে। নসখকে অস্বীকার করা হয়নি।

টিকাঃ
২৩১. জামালুদ্দীন কাসেমী: "তাফসীরে কাসেমী": ১/৩২
২৩২. মাওলানা আবদুস সামাদ রহমানি রচিত "কুরআনে মুহকাম" পৃ: ১২০, মজলিসে মাআরিফুল কুরুন, দেওবন্দ: ১৩৮৬ হিজরী।
২৩৩. সূরা আনআম : ১৪৬
২৩৪. মাওলানা আবদুস সামাদ রহমানী রচিত "কুরআনে মুহকাম" পৃ: ২১, মজলিসে মাআরিফুল কুরআন, দেওবন্দ: ১৩৮৬ হিজরী।
২৩৫. সূরা যুখরুফ: ৮১
২৩৬. মাওলানা আবদুস সামাদ রহমানী রচিত "কুরআনে মুহকাম" পৃঃ ২১, মজলিসে মাআরিফুল কুরআন, দেওবন্দ: ১৩৮৬ হিজরী।
২৩৭. আল্লামা আলুসী (রহ.) রচিত "রুহুল মাআনী": ১/৩৫১

📘 উলুমুল কুরআন 📄 পবিত্র কুরআনে কারীমে মানসুখ আয়াতের সংখ্যা

📄 পবিত্র কুরআনে কারীমে মানসুখ আয়াতের সংখ্যা


পবিত্র কুরআনে কারীমে মানসুখ আয়াতের সংখ্যা :

আমরা ইতিপূর্বে বলে এসেছি যে, মুতাকাদ্দেমীন পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের পরিভাষায় নসখের অর্থ বেশ ব্যাপক ছিল। তাই তাঁরা মানসূখ আয়াতের সংখ্যা অনেক বেশি সাব্যস্ত করেন। কিন্তু আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) মুতাআখখেরীন পরবর্তী উলামায়ে কেরামের পরিভাষা অনুযায়ী লিখেন যে, সমগ্র কুরআনে মাত্র উনিশটি আয়াত মানসূখ।

অতঃপর শেষ জামানায় এসে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ওই উনিশটি আয়াতের মাঝে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে শুধুমাত্র পাঁচটির মধ্যে নসখকে স্বীকার করেছেন। আর বাকি আয়াতগুলোর মধ্যে ওই সকল তাফসীরকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যেগুলো অনুযায়ী আয়াতগুলোকে মানসূখ হিসেবে মেনে নিতে হয় না। সেগুলোর প্রত্যেকটি আয়াতের মধ্যেই হযরত শাহ সাহেবের ব্যাখ্যা অত্যন্ত যুক্তি ও বিবেকগ্রাহ্য। অবশ্য কোনো কোনো ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মতানৈক্যও করা যেতে পারে। যাই হোক, তাঁর স্বীকৃত আয়াত পাঁচটি হচ্ছে-

১. সূরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে-
كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ
'তোমাদেরকে নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে যে, যখন তোমাদের কারও সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং সেই ব্যক্তি কিছু সম্পত্তি ছেড়ে যায়, তবে সে ব্যক্তি যেন সঙ্গতভাবে ওয়াসীয়াত করে যায় পিতা-মাতা ও নিকট সম্পর্কীয়দের জন্য, মুত্তাকীদের জন্য এটা একটা কর্তব্য।'
মীরাস বা উত্তরাধিকার সম্পদ সংক্রান্ত বিধান নাযিল হবার পূর্বে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল এবং এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয করা হয়েছিল যে, সে মৃত্যুর পূর্বে নিজের পরিত্যক্ত সম্পদের ব্যাপারে অসীয়ত করে যাবে, তার পিতা-মাতা বা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের কতটুকু করে সম্পদ বণ্টন করে দেওয়া হবে? পরবর্তীতে মীরাসের আয়াত অর্থাৎ- يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ আয়াতটি অসীয়তের আয়াতকে মানসূখ করে দিয়েছে। আর স্বয়ং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন প্রত্যেক আত্মীয়-স্বজনের মাঝে পরিত্যক্ত সম্পদ বণ্টনের জন্য মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এখন আর মৃত্যুর পূর্বে কোনো ব্যক্তির উপর অসীয়ত করা ফরয হয়নি।

২. সূরা আনফালে বর্ণিত হয়েছে-
إِن يَكُن مِّنكُم عِشْرُونَ صَابِرُونَ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ ۚ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّائَةٌ يَغْلِبُوا أَلْفًا مِّنَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَفْقَهُونَ
‘তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দু'শ জনের উপর জয়ী হবে এবং তোমাদের মধ্যে (ঐরূপ) একশ' জন থাকলে তারা একহাজার কাফিরের উপর বিজয়ী হবে। কেননা তারা হচ্ছে এমন লোক যারা (ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে) কোন বোধ রাখে না।'
এ আয়াতটি যদিও বাহ্যিকভাবে একটি খবর। কিন্তু অর্থগত দিক থেকে তা একটি নির্দেশ। আর তা হলো, মুসলমানদের জন্য দশগুণ শত্রুর বিরুদ্ধে মুকাবিলা করা থেকে পলায়ন করা জায়েয নেই। এ আয়াতকে পরবর্তী আয়াত দ্বারা মানসূখ করা হয়েছে-
الآن خَفَّفَ اللهُ عَنكُمْ وَعَلِمَ أَنَّ فِيكُمْ ضَعْفًا ۚ فَإِن يَكُن مِّنكُم مِّائَةٌ صَابِرَةٌ يَغْلِبُوا مِائَتَيْنِ وَإِن يَكُن مِّنكُمْ أَلْفٌ يَغْلِبُوا أَلْفَيْنِ بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
'(তবে) এখন আল্লাহ তোমাদের দায়িত্বভার কমিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তো জানেন যে তোমাদের ভিতর দুর্বলতা রয়ে গেছে, কাজেই তোমাদের মাঝে যদি একশ' জন ধৈর্যশীল হয় তবে তারা দু'শ জনের উপর বিজয়ী হবে। আর যদি তোমাদের মাঝে এক হাজার (ঐ রকম) লোক পাওয়া যায় তাহলে তারা আল্লাহর হুকুমে দু'হাজার লোকের উপর জয়ী হবে। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে (আছেন)।'
এ আয়াত পূর্ববর্তী আয়াতের হুকুমকে সহজ-সাধ্য করে দিয়েছে এবং দশগুণ শত্রুর পরিবর্তে দ্বিগুণ শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, এ সীমা অতিক্রম করে পলায়ন করা জায়েয নেই।

৩. হযরত শাহ সাহেব (রহ.) কর্তৃক মানসূখ আয়াতের তৃতীয়টি হচ্ছে সূরা আহযাবের নিম্নোক্ত আয়াত-
لَّا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِن بَعْدُ وَلَا أَن تَبَدَّلَ بِهِنَّ مِنْ أَزْوَاجٍ وَلَوْ أَعْجَبَكَ حُسْنُهُنَّ
'এরপর আপনার জন্য (এদের অতিরিক্ত) অন্য স্ত্রী গ্রহণ হালাল নয় এবং আপনার (বর্তমান) স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয়, যদিও অন্যদের সৌন্দর্য আপনাকে বিমোহিত করে।'
এ আয়াতে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে অতিরিক্ত বিবাহ করতে নিষেধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এ হুকুম মানসূখ করে দেওয়া হয়েছে। আর এ আয়াতের নাসিখ (মানসূখকারী) সেই আয়াত, যা পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্তমান ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী এই আয়াতের পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। আয়াতটি হলো-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ اللَّاتِي آتَيْتَ أُجُورَهُنَّ
'হে নবী (সা.)! আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীগণকে যাদের মোহরানা তুমি প্রদান করেছ; ।'
হযরত শাহ সাহেব (রহ.) এবং অন্যান্যদের বক্তব্য হলো, এ আয়াতের মাধ্যমে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে গেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যে, এ আয়াতে নসখ হওয়াটা নিশ্চিত নয়। বরং এ আয়াতের ওই তাফসীরও অত্যন্ত লৌকিকতা হীন ও সাদামাটা যা হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ এই দু'টি আয়াতও নিজেদের বর্তমান তারতীব বা ক্রমধারা অনুযায়ীই অবতীর্ণ হয়েছে। يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَحْلَلْنَا لَكَ أَزْوَاجَكَ আয়াতে মহান আল্লাহ তা'আলা বিশেষ কিছু নারীর কথা উল্লেখ করেছেন যে, তাদের সাথে আপনার বিবাহ হালাল। এরপর তার পরবর্তী আয়াত لَّا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِن بَعْدُ এ বলা হয়েছে যে, এরা ব্যতীত অন্য নারীরা আপনার জন্য হালাল নয়।

৪. হযরত শাহ সাহেব (রহ.) কর্তৃক মানসূখ আয়াতের চতুর্থটি হচ্ছে সূরা মুজাদালাহ'র নিম্নোক্ত আয়াত-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَاجَيْتُمُ الرَّسُولَ فَقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَةً ۚ ذَلِكَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَأَطْهَرُ فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"অর্থাৎ হে মু'মিনগণ! তোমরা যখন রসূলের সঙ্গে গোপনে কথা বল, তখন গোপনে কথা বলার আগে সদাক্বাহ দাও, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম ও অতি পবিত্র পন্থা। আর যদি সদাক্বাহ জোগাড় করতে না পার, তাহলে আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।"
এই আয়াতটি পরবর্তী আয়াত দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। আয়াতটি হলো-
أَأَشْفَقْتُمْ أَن تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَজْوَاكُمْ صَدَقَاتٍ فَإِذْ لَمْ تَفْعَلُوا وَتَابَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ
'অর্থাৎ তোমরা কি ভয় পেয়ে গেলে যে, তোমাদেরকে (নবীর সঙ্গে) গোপনে কথাবার্তা বলার আগে সদাক্বাহ দিতে হবে? তোমরা যদি তা না কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন, কাজেই তোমরা নামায কায়িম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর।'
এভাবে একান্তভাবে কানে কানে কথা বলার পূর্বে সদকা করার হুকুম রহিত করা হয়েছে।

৫. মানসূখ আয়াতের পঞ্চমটি হচ্ছে সূরা মুজ্জাম্মিলের নিম্নোক্ত আয়াত-
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ (1) قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا (2) نِصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِিলًا (3)
'হে চাদর আবৃত! (রাসূল (সা.)-কে বুঝানো হয়েছে) রাতে (তাহাজ্জুদ সালাতে) দাঁড়ান কিছু অংশ ছাড়া। রাতের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম।'
এ আয়াতে রাতের কমপক্ষে অর্ধাংশ তাহাজ্জুদ সালাতে কাটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে পরের আয়াত দ্বারা এতে সহজতা সৃষ্টি করে পূর্বের হুকুমকে রহিত করা হয়েছে। সেই আয়াতটি হলো-
عَلِمَ أَن لَّن تُحْصُوهُ فَتَابَ عَلَيْكُمْ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّরَ مِنَ الْقُرْآنِ
'তিনি [আল্লাহ তা'আলা] জানেন যে, তোমরা তা করতে সক্ষম হবে না। তাই তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন। অতএব, তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকুই পড়।'
হযরত শাহ সাহেব (রহ.)-এর তাহকীক অনুযায়ী তাহাজ্জুদের হুকুম প্রথমেও ওয়াজিব ছিল না। তবে এর উপর প্রথমে খুব গুরুত্ব ছিল এবং এর সময়ও ছিল বেশ প্রশস্ত। পরবর্তীতে এর গুরুত্বও হ্রাস পেয়েছে এবং সময়েরও তেমন পাবন্দি হয়নি।
এই সেই পাঁচ আয়াত, হযরত শাহ সাহেব (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী যা রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকাশ থাকে যে, এই পাঁচটি উদাহরণ শুধু ওই ক্ষেত্রে, যার নাসিখ ও মানসূখ উভয়টা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বিদ্যমান। এগুলো ব্যতীত সর্বসম্মত মত অনুযায়ী পবিত্র কুরআনুল কারীমে এমন কিছু উদাহরণ রয়েছে, যেগুলোর নাসিখ পবিত্র কুরআনুল কারীমে রয়েছে, কিন্তু মানসূখ কুরআনে নেই। উদাহরণস্বরূপ, কেবলা পরিবর্তনের আয়াত।

টিকাঃ
২৩৮. আল-ইতকান: ২/২২
২৩৯. সূরা বাকারা: ১৮০
২৪০. সূরা আনফাল: ৬৫
২৪১. সূরা আনফাল: ৬৬
২৪২. সূরা আহযাব: ৫২
২৪৩. সূরা আহযাব: ৫০
২৪৪. তাফসীরে ইবনে জারীর।
২৪৫. সূরা মুজাদালাহ্: ১২
২৪৬. সূরা মুজাদালাহ: ১৩
২৪৭. সূরা মুজ্জাম্মিল: ১-৩
২৪৮. সূরা মুজ্জাম্মিল: ২০

📘 উলুমুল কুরআন 📄 আলোচনার ফলাফল

📄 আলোচনার ফলাফল


আলোচনার ফলাফল :

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা মূলত আমাদের উদ্দেশ্য এ কথা বলা যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াতে নসখ পাওয়া যাওয়া (নাউযুবিল্লাহ) কোনো দোষ নয়। যা থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে মুক্ত দেখানোর চেষ্টা করা হবে। বরং তা মহান আল্লাহ তা'আলার হেকমতের চাহিদা। অতএব, কোনো আয়াতের কোনো তাফসীরকে শুধু এ ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয় যে, এ তাফসীর অনুযায়ী কুরআনে নসখ আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। বরং তাফসীরের মূলনীতি অনুযায়ী অগ্রাধিকার প্রাপ্ত তাফসীরকে গ্রহণ করার মধ্যে দোষের কিছু নেই। চাই তাতে আয়াতকে মানসূখ সাব্যস্ত করতে হোক না কেন?
আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাই ভালো জানেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px