📄 নসম বা রহিতকরণের হাকীকত
নসখ বা রহিতকরণের হাকীকত :
নসখ-এর আভিধানিক অর্থ হলো, নিশ্চিহ্ন করা, বিলুপ্ত করা এবং দূরীভূত করা। আর এর পারিভাষিক সংজ্ঞা হলো- رفع الحكم الشرعي بدليل شرعي 'কোনো শরঈ দলীল দ্বারা কোনো শরঈ হুকুমকে তুলে নেওয়া।'
অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা'আলা কখনো কখনো কোনো যুগের চাহিদা অনুপাতে একটি শরঈ হুকুম জারী করেন। অতঃপর অন্য এক যুগে এসে স্বীয় প্রজ্ঞার দৃষ্টিতে ওই হুকুমকে বিলুপ্ত করে এর স্থলে নতুন আরেকটি হুকুম জারী করেন। হুকুম পরিবর্তনের এই বিষয়কে “নসখ” বলা হয়। এভাবে পূর্বের যে হুকুমকে বিলুপ্ত করা হয় সেটাকে "মানসূখ” এবং যে নতুন হুকুম প্রদান করা হয় সেটাকে "নাসিখ” বলা হয়।
📄 প্রামাণিক ও যৌক্তিকভাবে নসখের স্বীকৃতি
ইহুদীদের ধারণা হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'আলার আহকাম ও বিধানের মধ্যে "নসখ” রহিতকরণ হতে পারে না। কারণ তাদের ধারণা মতে যদি 'নসখ'কে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে এ কথা আবশ্যক হয়ে পড়বে যে, (নাউযুবিল্লাহ) মহান আল্লাহও নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ফেলেন। তারা এ কথা বলে বুঝাতে চায় যে, যদি মহান আল্লাহ পাকের বিধি-বিধানে নাসিখ ও মানসূখকে মেনে নিতে হয় তাহলে এর অর্থ হলো, মহান আল্লাহ তা'আলা প্রথমে একটি বিধানকে সমীচীন মনে করেছিলেন; পরবর্তীতে (নাঊযুবিল্লাহ) নিজের ভুল প্রকাশ পাওয়ায় সেটাকে ফেরত নিয়েছেন! পরিভাষায় এটাকে "বুদা" অযোগ্য বলা হয়।
কিন্তু ইহুদীদের এই অভিযোগ একেবারেই হালকা ও স্থূল দৃষ্টির উপর ভিত্তিশীল। কেননা একটু চিন্তা করলেই এর বাতুলতা স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা "নসখ”-এর অর্থ সিদ্ধান্তের পরিবর্তন নয়। বরং প্রত্যেক যুগে অবস্থার চাহিদা অনুযায়ী বিধি-বিধান প্রদান করতে হয়। আর মানসূখ (রহিতকৃত)-কে ভুল সাব্যস্ত করা নাসিখ (রহিতকারী)-এর কাজ নয়। বরং তার কাজ হলো, সে পূর্ববর্তী বিধান প্রয়োগের সময়-সীমা নির্ধারণ করে দেয় এবং এ কথা বলে দেয় যে, পূর্বের বিধানটি যতদিন পর্যন্ত চালু ছিল, ততদিনের জন্য সেটাই সমীচীন ছিল। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তনের ভিত্তিতে নতুন একটি বিধানের প্রয়োজন। যে ব্যক্তিই সুস্থ মস্তিষ্ক নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করবে, সে এ সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে পারবে না যে, এ ধরনের পরিবর্তন সম্পূর্ণরূপে হেকমতে এলাহীর দাবী মাফিক এবং এটাকে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই দোষ বলা যাবে না। কেননা ওই ব্যক্তি যোগ্য হাকিম বা ডাক্তার নয়, যে রোগীকে সর্বাবস্থায় একই ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন। বরং প্রকৃত ডাক্তার তো তিনিই, যিনি রোগী ও রোগের পরিবর্তনের প্রতি গভীর দৃষ্টি রেখে তদানুযায়ী ব্যবস্থাপত্রে পরিবর্তন করেন।
আর এই বিষয়টা শুধু শরঈ বিধি-বিধানের সাথেই বিশেষিত নয়। বরং জগতের সকল কর্মশালা এই নিয়ম-নীতিতেই চলছে। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাঁর পরিপূর্ণ প্রজ্ঞাবলে ঋতুগুলোর মধ্যে পরিবর্তন করতে থাকেন। কখনো শীত, কখনো গ্রীষ্ম, কখনো শরৎ, কখনো বসন্ত, কখনো বর্ষা আবার কখনো অনাবৃষ্টি আবার কখনো অতিবৃষ্টি। এ সকল পরিবর্তন মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার সুপরিপক্ক প্রজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। এখন যদি কোনো ব্যক্তি এগুলোকে "বুদা" বলে এর উপর এই অভিযোগ করতে শুরু করে যে, (নাঊযুবিল্লাহ) এতে আল্লাহ তা'আলার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এসে যায় যে, তিনি এক কালে শীতকে পছন্দ করেছিলেন, পরবর্তীতে ভুল ধরা পড়ায় তিনি গ্রীষ্মকে শীতের স্থলাভিষিক্ত করে দিয়েছেন! তাহলে তাকে আহাম্মক বা নির্বোধ বলা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? শরঈ বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে নসখেরও অবস্থানটাও ঠিক তদ্রূপ যে, এটাকে "বুদা” সাব্যস্ত করে দোষ মনে করা চরম পর্যায়ের অদূরদর্শিতা এবং বাস্তবতা থেকে অন্ধ হয়ে যাওয়ার নামান্তর।
এখানে বলাবাহুল্য যে, আর এই নসখ শুধু উম্মতে মুহাম্মাদীয়ারই বিশেষত্ব নয়। বরং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের শরীয়তেও নাসিখ-মানসূখের এই ধারা প্রচলিত ছিল। যার বহু উদাহরণ বর্তমান বাইবেলে পাওয়া যায়। যেমন, বাইবেলে রয়েছে 'হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর শরীয়তে দুই বোনকে একই সাথে বিবাহ বন্ধনে রাখা বৈধ ছিল এবং স্বয়ং হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর দু'জন স্ত্রী লাইয়্যা এবং রাহিল পরস্পর সহোদরা বোন ছিলেন। কিন্তু হযরত মূসা (আ.)-এর শরীয়তে এসে এটাকে অবৈধ করে দেওয়া হয়েছে। হযরত নূহ (আ.)-এর শরীয়তে বিচরণকারী সকল প্রাণীই হালাল ছিল। কিন্তু হযরত মূসা (আ.)-এর শরীয়তে এসে অনেক প্রাণীই হারাম করে দেওয়া হয়েছে। হযরত মূসা (আ.)-এর শরীয়তে তালাকের সাধারণ অনুমতি ছিল। পক্ষান্তরে হযরত ঈসা (আ.)-এর শরীয়তে ব্যভিচারের অপরাধ ব্যতীত অন্য কোনো অপরাধে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অনুমতি ছিল না। মোটকথা, বাইবেলের নতুন ও পুরাতন অঙ্গীকারনামায় এ রকম বিশটি উদাহরণ পাওয়া যায়, যেগুলোতে নতুন হুকুম দ্বারা পুরাতন কোনো হুকুমকে মানসূখ (রহিত) করা হয়েছে।
টিকাঃ
২২৪. বাইবেল: জন্ম শীর্ষক অধ্যায়: ২৯/৩০-৩২
২২৫. আহবার: ১৮/১৮
২২৬. বাইবেল: জন্ম শীর্ষক অধ্যায়: ৯/৩
২২৭. আহবার: ১১/৭ এবং ইসতেসনা: ১৪/৭
২২৮. ইসতেসনা: ২৪/-২
২২৯. ইনজিল মাত্তা: ১৯/১৫
📄 নখসের ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামাদের পরিভাষাগত পার্থক্য
নসখের ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামাদের পরিভাষাগত পার্থক্য :
“নসখ” শব্দটির ব্যবহারের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে পরিভাষাগত কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। যা জেনে নেওয়া জরুরী।
মুতাকাদ্দিমীন বা পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের পরিভাষায় "নসখ” ছিল বিস্তৃত অর্থ বহনকারী একটি শব্দ। এর মধ্যে এমন কতগুলো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল, পরবর্তী উলামায়ে কেরামের পরিভাষায় যেগুলোকে নসখ বলা হয় না। যেমন, পূর্ববর্তীদের পরিভাষায় 'আম'-এর 'তাখসীস' তথা ব্যাপকত্বের বিশেষত্ব এবং 'মুতলক'-এর 'তাকঈদ' তথা সাধারণের নির্ধারণও নসখের অর্থের মধ্যে শামিল ছিল।
যদি এক আয়াতে ব্যাপকত্ব বাচক শব্দের প্রয়োগ থাকে আর অন্য আয়াতে এটাকে বিশেষ কোনো প্রক্রিয়ায় বিশেষত্ব দান করা হয়, তাহলে পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম প্রথমটাকে মানসূখ এবং দ্বিতীয়টাকে নাসিখ বলে আখ্যায়িত করতেন। যার উদ্দেশ্য হতো এটা যে, প্রথম হুকুমটি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বরং উদ্দেশ্য হতো এটা যে, প্রথম আয়াতের ব্যাপকত্ব দ্বিতীয় আয়াত বিলুপ্ত করে দিয়েছে। যেমন, পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
وَلاَ تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ
'অর্থাৎ মুশরিক নারীকে বিবাহ করো না, যতক্ষণ না সে ঈমান আনে।' এ আয়াতে "মুশরিক নারী" শব্দটি আম বা ব্যাপক। এ আয়াত দ্বারা বাহ্যিকভাবে বুঝে আসে যে, যে কোনো মুশরিক নারীকেই বিবাহ করা হারাম। চাই সে মূর্তিপূজারী হোক কিংবা আহলে কিতাব হোক। কিন্তু অন্য এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ
'অর্থাৎ আর আহলে কিতাবের মধ্য হতে সতী-সাধ্বী নারীরা (তোমাদের জন্য হালাল)।'
এর দ্বারা বুঝা যায় যে, প্রথম আয়াতে ব্যবহৃত "মুশরিক নারী" শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল, ওই সকল নারী যারা আহলে কিতাব নয়। কাজেই এই দ্বিতীয় আয়াতটি প্রথম আয়াতের ব্যাপকত্বের মাঝে বিশেষত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে এবং এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, ওই শব্দগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য বিশেষ ধরনের মুশরিক নারীরা। পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম এটাকেও নসখ বলতেন এবং প্রথম আয়াতকে মানসূখ এবং দ্বিতীয় আয়াতকে নাসিখ বলে আখ্যায়িত করতেন। পক্ষান্তরে পরবর্তী উলামায়ে কেরামের নিকট নসখের অর্থ এত ব্যাপক নয়। তাঁরা শুধু ওই প্রকারকেই নসখ বলে থাকেন, যেখানে পূর্বের হুকুমকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। শুধু 'আম'-এর 'তাখসীস' এবং 'মুতলক'-এর 'তাকঈদ' কে তাঁরা নসখ বলেন না। তাই উপরোল্লিখিত উদাহরণে পরবর্তী উলামায়ে কেরাম বলেন, এতে নসখ হয়নি। কেননা মূল হুকুম (মুশরিক নারীদের বিবাহের নিষেধাজ্ঞা) এখনও বহাল রয়েছে। পার্থক্য শুধু এটুকু হয়েছে যে, দ্বিতীয় আয়াত দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, প্রথম আয়াতের ভাব এত ব্যাপক ছিল না যে, এর মধ্যে আহলে কিতাব নারীরাও শামিল হয়ে যাবে। বরং তা আহলে কিতাব ব্যতীত অন্যান্য নারীদের সাথে বিশেষিত ছিল।
পারিভাষিক এই পার্থক্যের কারণে পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরামের নিকট পবিত্র কুরআনুল কারীমে মানসূখ আয়াতের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। সাধারণ একটু পার্থক্যের কারণে তাঁরা এক আয়াতকে মানসূখ এবং অন্য আয়াতকে নাসিখ আখ্যায়িত করতেন। কিন্তু পরবর্তী উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে মানসূখ আয়াতের সংখ্যা খুবই কম।
টিকাঃ
২৩০. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: আল-ইতকান: ২/২২
📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমে 'নসখ'-এর আলোচনা
পবিত্র কুরআনুল কারীমে 'নসখ'-এর আলোচনা :
এ ব্যাপারে উম্মতের কোনো সদস্যের মতানৈক্য আছে বলে আমাদের জানা নেই যে, শরঈ বিধি-বিধানে নসখের ধারাবাহিকতা পূর্ববর্তী উম্মতদের যুগ থেকেই চলে আসছে এবং উম্মতে মুহাম্মাদিয়্যার শরীয়তেও অনেক হুকুম মানসূখ হয়েছে। যেমন, প্রথম নির্দেশ ছিল যে, বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে হবে। পরবর্তীতে এই নির্দেশ মানসূখ করে কা'বা শরীফের দিকে মুখ করে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে মুসলমানদের মধ্যে কারো মতানৈক্য নেই।
তবে এ ব্যাপারে কিছুটা মতানৈক্য রয়েছে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমে নসখ হয়েছে কি-না? অন্য শব্দে এ মাসআলা এভাবে আলোচনা করা হয়েছে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমে কি এমন কোনো আয়াত বিদ্যমান আছে, যার হুকুম মানসূখ হয়ে গেছে তবে তার তেলাওয়াত এখনও চালু আছে? জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের রায় হলো, পবিত্র কুরআনুল কারীমে এ ধরনের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে, যার হুকুম মানসূখ হয়ে গেছে।
কিন্তু এক্ষেত্রে মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের মধ্য হতে আবু মুসলিম ইস্পাহানির বক্তব্য হলো, পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো আয়াত মানসূখ হয়নি। বরং সমস্ত আয়াতের উপর এখনো আমল করা ওয়াজিব। সেই আবু মুসলিম ইস্পাহানির অনুসরণ করে অন্যান্য ব্যক্তিবর্গও এই রায় ব্যক্ত করেছেন। আমাদের যুগের অনেক প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গও এই রায়ের প্রবক্তা। এ সকল ব্যক্তিবর্গ নসখের আয়াতসমূহের এমন ব্যাখ্যা করেন যে, যাতে নসখ স্বীকার করতে না হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো যে, এ অবস্থানটা দলীল-প্রমাণের দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল এবং তা মেনে নেওয়ার ফলে কুরআনের কিছু আয়াতের তাফসীরে এমন টানা-হেঁচড়ার প্রয়োজন পড়ে যা তাফসীরের মূলনীতির একেবারেই পরিপন্থী।
যে সকল ব্যক্তি পবিত্র কুরআনুল কারীমে নসখের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না প্রকৃত পক্ষে তাদের অন্তরে এ কথা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, নসখ একটি দোষের বিষয়, যা থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীম মুক্ত হওয়া উচিত। অথচ ইতোপূর্বে আপনি দেখেছেন যে, নসখকে দোষ হিসেবে ধারণা করা কত বড় দুর্বল চিন্তার পরিচায়ক। তারপর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে, আবু মুসলিম ইস্পাহানি ও তাঁর অনুসারীরা সাধারণত ইহুদী-নাসারাদের মতো অস্বীকার করে না যে, আল্লাহ তা'আলার অনেক বিধানে নসখ হয়েছে। বরং তারা শুধু এ টুকু বলে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমে নসখ নেই। নসখ যদি দোষের বিষয়ই হয়ে থাকে, তাহলে কুরআন বহির্ভূত আহকামের ক্ষেত্রে কিভাবে এ দোষের সৃষ্টি হলো? যখন সেগুলোও মহান আল্লাহ তা'আলারই আহকাম।
আর এটা যদি কোনো দোষের বিষয় না হয়ে থাকে, তাহলে যে বিষয় কুরআন বহির্ভূত আহকামে দোষের ছিল না সেটা কুরআনী আহকামের ক্ষেত্রে কি করে দোষ হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়? বলা হয়, এটা হেকমতে এলাহীর বিপরীত মনে হয় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো আয়াত শুধু বরকতের উদ্দেশ্যে তেলাওয়াত করার জন্য বাকি রাখা হবে এবং এর উপর আমলের ধারাবাহিকতা বিলুপ্ত করা হয়ে গেছে।
আর কেন এটাকে হেকমতে এলাহীর বিপরীত দাঁড় করানো হলো? অথচ পবিত্র কুরআনুল কারীমে 'হুকুম মানসূখ ও তেলাওয়াত বাকি' বিশিষ্ট আয়াতের মধ্যে অনেক কল্যাণও নিহিত থাকতে পারে। যেমন, এর দ্বারা শরঈ বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিকভাবে অবতীর্ণ হবার রহস্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠে এবং মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন মানুষকে স্বীয় আহকামের অনুসারী করার ক্ষেত্রে যে প্রজ্ঞাপূর্ণ হেকমত অবলম্বন করেছেন তাও জানা যায়। অনুরূপভাবে এর দ্বারা শরঈ আহকামের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় এবং এটাও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুসলমানদের উপর কখন কি হুকুম জারী করা হয়েছিল। স্বয়ং মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমের কয়েক স্থানে পূর্ববর্তী উম্মতদের ওই সকল আহকামকে উল্লেখ করেছেন, যেগুলো উম্মতে মুহাম্মাদিয়্যার শরীয়তে মানসূখ হয়ে গিয়েছে। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وَعَلَى الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرٍ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَوْ مَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ
'যারা ইয়াহূদী হয়েছে তাদের জন্য আমি যাবতীয় তীক্ষ্ণধার নখযুক্ত পশু হারাম করেছিলাম আর তাদের জন্য গরু-ছাগলের চর্বিও হারাম করেছিলাম, এগুলোর পিঠের কিংবা নাড়িভুঁড়ির বা হাড়ের সাথে লেগে থাকা চর্বি ছাড়া।'
এ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, দৃষ্টান্ত ও উপদেশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ তা'আলা এখানে একটি মানসূখ হুকুমের উল্লেখ করেছেন। যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমে কিছু রহিত হুকুমের আয়াতের তেলাওয়াত এ উদ্দেশ্যেই বাকি রাখা হয়, তাহলে এতে কোন বিষয়টা হেকমতে এলাহীর বিপরীত গিয়ে দাঁড়াল? উপরন্তু এ দাবী কে করতে পারে যে, সে মহান আল্লাহ পাকের সমস্ত হেকমত সম্পর্কে অবগত আছে? অথবা সে পবিত্র কুরআনুল কারীমের প্রত্যেকটি আয়াতের ব্যাপারে জানে যে, তা অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যে কি কি হেকমত ছিল? যদি কোনো ব্যক্তির এ দাবী সঠিক না হয়- আর বাস্তবেই তা সঠিক হবার নয়, তাহলে মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো কাজের ব্যাপারে শুধু এ ভিত্তিতে কিভাবে অস্বীকার করা যাবে যে, এর হেকমত আমরা জানতে পারিনি? যখন ওই কাজের বাস্তবায়ন শরঈ দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।
কাজেই বাস্তব কথা এটাই যে, যারা পবিত্র কুরআনুল কারীমে নসখের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না, তাদের ভিত্তিটি একেবারে ভুল, যার উপর তারা নিজেদের চিন্তাধারার প্রাসাদ দাঁড় করিয়েছে। তারা পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো কোনো আয়াতকে অনেক দূরবর্তী অর্থ দ্বারা এ জন্য সাজিয়েছে যে, তাদের দৃষ্টিতে "নসখ” একটি দোষ। যা থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে মুক্ত দেখা এবং দেখানোই ছিল তাদের অভিপ্রায়। যদি তাদের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নসখ কোনো দোষের বিষয় নয়; বরং ইহা হেকমতে এলাহীর বাস্তব দাবী, তাহলে তারা এ ধরনের আয়াতের তাফসীর তাই করবে, যা সাধারণভাবে করা হয়। কেননা প্রকাশ্য ও সচরাচর তাফসীর এটাই। পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
مَا نَنسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِّنْهَا أَوْ مِثْلِهَا أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মতো আনয়ন করি। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।'
যে ব্যক্তিই কোনো পক্ষপাতিত্ব ব্যতীত মুক্ত মস্তিষ্কে এ আয়াত পাঠ করবে, সে অবশ্যই এই আয়াত থেকে এ ফলাফল বের করতে সক্ষম হবে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের মধ্যে নসখের ধারাবাহিকতা স্বয়ং পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্ণনা অনুযায়ীই চালু ছিল। পক্ষান্তরে আবু মুসলিম ইস্পাহানি ও তার অনুসারীরা বুঝে বা না বুঝে 'নসখ'কে একটা দোষ বলে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে তা থেকে মুক্ত সাব্যস্ত করতে চায়। তারা উল্লিখিত আয়াতের দূরবর্তী জটিল ব্যাখ্যা করে থাকে। যেমন তারা বলে যে, এই আয়াতে একটি কাল্পনিক অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কাল্পনিকভাবে আমি যদি কোনো আয়াতকে মানসূখ করি, তাহলে এর চেয়ে উত্তম বা সমমানের আয়াত নাযিল করি। এর দ্বারা বাস্তবেই কোনো আয়াতকে মানসূখ করা আবশ্যক হয় না। এর উপমা এমন যেমন এক পবিত্র আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
قُلْ إِن كَانَ لِلرَّحْمَنِ وَلَدٌ فَأَنَا أَوَّلُ الْعَابِدِينَ
'যদি রহমান (আল্লাহর)-এর সন্তান থাকতো, তবে আমি প্রথম তাঁর ইবাদতকারী হতাম।'
নসখ অস্বীকারকারীরা বলে যে, এ আয়াতে যেমনিভাবে কাল্পনিক একটা অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, এর দ্বারা আবশ্যক নয় যে, বাস্তবেই মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো সন্তান আছে। অনুরূপভাবে উল্লিখিত আয়াতেও একটি কাল্পনিক দিক উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। যা বাস্তবায়িত হওয়ার আবশ্যকতা নেই। কিন্তু উল্লিখিত আয়াতের এই বিশ্লেষণ দূর-দূরান্তের মনগড়া জটিল ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি মর্যাদা রাখে না। কারণ যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াতে কখনো নসখ না-ই হওয়ারই ছিল, তবে কাল্পনিকভাবেই এর উল্লেখ করা মহান আল্লাহ তা'আলার কি প্রয়োজন ছিল? পবিত্র কুরআনুল কারীমের শান কখনো এমন হতে পারে না যে, যা কখনো বাস্তবে উপস্থাপিত হবার নয়, বিনা কারণে কাল্পনিকভাবে উল্লেখ করে সেটার উপর হুকুম লাগানো হবে।
বাকি থাকল (إن كان للرحمن ولدا الخ) "যদি রহমানের কোনো সন্তান থাকত..." আয়াতের কথা। এই আয়াতের মাঝে আর নসখের আয়াতের মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো সন্তান জন্ম হওয়া এক অসম্ভব বিষয় (নাঊযুবিল্লাহ)। কাজেই এ আয়াতের পাঠক সাথে সাথেই বুঝে নেয় যে, এ কথাটি শুধুমাত্র কাল্পনিক বা কথার কথা হিসেবে বলা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হলো, যদি কথার কথা মহান আল্লাহ তা'আলার কোনো সন্তান থাকতো, তাহলে আমি সবার আগে তার ইবাদত করতাম। কিন্তু যখন তাঁর কোনো সন্তান হতে পারে না, তাহলে তিনি ব্যতীত আর কারো কোনো ইবাদত করার প্রশ্নই উঠে না। পক্ষান্তরে নসখের বাস্তবতা স্বয়ং আবু মুসলিম ইস্পাহানির নিকটও যুক্তিগ্রাহ্যভাবে অসম্ভব নয়। কাজেই নসখকে কাল্পনিক বিষয় সাব্যস্ত করার কোনো অর্থ হতে পারে না। আর এ কথাটি উল্লিখিত আয়াতের শানে নুযূল দ্বারা আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, কতিপয় কাফের রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর এই অভিযোগ উত্থাপন করল যে, আপনি আপনার অনুসারীদেরকে প্রথমে একটি কাজের নির্দেশ দেন, তারপর আবার সেটা থেকে নতুন নির্দেশ নিয়ে আসেন কেন? এর জবাবে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, এই আয়াতে নসখকে স্বীকার করে নিয়ে তার হেকমত বর্ণনা করা হয়েছে। নসখকে অস্বীকার করা হয়নি।
টিকাঃ
২৩১. জামালুদ্দীন কাসেমী: "তাফসীরে কাসেমী": ১/৩২
২৩২. মাওলানা আবদুস সামাদ রহমানি রচিত "কুরআনে মুহকাম" পৃ: ১২০, মজলিসে মাআরিফুল কুরুন, দেওবন্দ: ১৩৮৬ হিজরী।
২৩৩. সূরা আনআম : ১৪৬
২৩৪. মাওলানা আবদুস সামাদ রহমানী রচিত "কুরআনে মুহকাম" পৃ: ২১, মজলিসে মাআরিফুল কুরআন, দেওবন্দ: ১৩৮৬ হিজরী।
২৩৫. সূরা যুখরুফ: ৮১
২৩৬. মাওলানা আবদুস সামাদ রহমানী রচিত "কুরআনে মুহকাম" পৃঃ ২১, মজলিসে মাআরিফুল কুরআন, দেওবন্দ: ১৩৮৬ হিজরী।
২৩৭. আল্লামা আলুসী (রহ.) রচিত "রুহুল মাআনী": ১/৩৫১