📄 এতে "নাসিখ ও মানসুখ" শিরোনামে “নসখ” রহিতকরণের
এতে "নাসিখ ও মানসুখ" শিরোনামে “নসখ” রহিতকরণের
📄 নাসিখ ও মানসুখ বা রহিত ও রহিতকারী
প্রকাশ থাকে যে, উলূমুল কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, নাসিখ ও মানসূখ। এ আলোচনা বড়ই শক্তিশালী ও দীর্ঘ। তবে এখানে তার বিস্তারিত সকল বিষয় আলোচনার পরিবর্তে তৎসংশ্লিষ্ট শুধু মৌলিক বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হচ্ছে।
📄 নসম বা রহিতকরণের হাকীকত
নসখ বা রহিতকরণের হাকীকত :
নসখ-এর আভিধানিক অর্থ হলো, নিশ্চিহ্ন করা, বিলুপ্ত করা এবং দূরীভূত করা। আর এর পারিভাষিক সংজ্ঞা হলো- رفع الحكم الشرعي بدليل شرعي 'কোনো শরঈ দলীল দ্বারা কোনো শরঈ হুকুমকে তুলে নেওয়া।'
অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা'আলা কখনো কখনো কোনো যুগের চাহিদা অনুপাতে একটি শরঈ হুকুম জারী করেন। অতঃপর অন্য এক যুগে এসে স্বীয় প্রজ্ঞার দৃষ্টিতে ওই হুকুমকে বিলুপ্ত করে এর স্থলে নতুন আরেকটি হুকুম জারী করেন। হুকুম পরিবর্তনের এই বিষয়কে “নসখ” বলা হয়। এভাবে পূর্বের যে হুকুমকে বিলুপ্ত করা হয় সেটাকে "মানসূখ” এবং যে নতুন হুকুম প্রদান করা হয় সেটাকে "নাসিখ” বলা হয়।
📄 প্রামাণিক ও যৌক্তিকভাবে নসখের স্বীকৃতি
ইহুদীদের ধারণা হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা'আলার আহকাম ও বিধানের মধ্যে "নসখ” রহিতকরণ হতে পারে না। কারণ তাদের ধারণা মতে যদি 'নসখ'কে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে এ কথা আবশ্যক হয়ে পড়বে যে, (নাউযুবিল্লাহ) মহান আল্লাহও নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ফেলেন। তারা এ কথা বলে বুঝাতে চায় যে, যদি মহান আল্লাহ পাকের বিধি-বিধানে নাসিখ ও মানসূখকে মেনে নিতে হয় তাহলে এর অর্থ হলো, মহান আল্লাহ তা'আলা প্রথমে একটি বিধানকে সমীচীন মনে করেছিলেন; পরবর্তীতে (নাঊযুবিল্লাহ) নিজের ভুল প্রকাশ পাওয়ায় সেটাকে ফেরত নিয়েছেন! পরিভাষায় এটাকে "বুদা" অযোগ্য বলা হয়।
কিন্তু ইহুদীদের এই অভিযোগ একেবারেই হালকা ও স্থূল দৃষ্টির উপর ভিত্তিশীল। কেননা একটু চিন্তা করলেই এর বাতুলতা স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা "নসখ”-এর অর্থ সিদ্ধান্তের পরিবর্তন নয়। বরং প্রত্যেক যুগে অবস্থার চাহিদা অনুযায়ী বিধি-বিধান প্রদান করতে হয়। আর মানসূখ (রহিতকৃত)-কে ভুল সাব্যস্ত করা নাসিখ (রহিতকারী)-এর কাজ নয়। বরং তার কাজ হলো, সে পূর্ববর্তী বিধান প্রয়োগের সময়-সীমা নির্ধারণ করে দেয় এবং এ কথা বলে দেয় যে, পূর্বের বিধানটি যতদিন পর্যন্ত চালু ছিল, ততদিনের জন্য সেটাই সমীচীন ছিল। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তনের ভিত্তিতে নতুন একটি বিধানের প্রয়োজন। যে ব্যক্তিই সুস্থ মস্তিষ্ক নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করবে, সে এ সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে পারবে না যে, এ ধরনের পরিবর্তন সম্পূর্ণরূপে হেকমতে এলাহীর দাবী মাফিক এবং এটাকে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই দোষ বলা যাবে না। কেননা ওই ব্যক্তি যোগ্য হাকিম বা ডাক্তার নয়, যে রোগীকে সর্বাবস্থায় একই ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন। বরং প্রকৃত ডাক্তার তো তিনিই, যিনি রোগী ও রোগের পরিবর্তনের প্রতি গভীর দৃষ্টি রেখে তদানুযায়ী ব্যবস্থাপত্রে পরিবর্তন করেন।
আর এই বিষয়টা শুধু শরঈ বিধি-বিধানের সাথেই বিশেষিত নয়। বরং জগতের সকল কর্মশালা এই নিয়ম-নীতিতেই চলছে। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাঁর পরিপূর্ণ প্রজ্ঞাবলে ঋতুগুলোর মধ্যে পরিবর্তন করতে থাকেন। কখনো শীত, কখনো গ্রীষ্ম, কখনো শরৎ, কখনো বসন্ত, কখনো বর্ষা আবার কখনো অনাবৃষ্টি আবার কখনো অতিবৃষ্টি। এ সকল পরিবর্তন মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার সুপরিপক্ক প্রজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। এখন যদি কোনো ব্যক্তি এগুলোকে "বুদা" বলে এর উপর এই অভিযোগ করতে শুরু করে যে, (নাঊযুবিল্লাহ) এতে আল্লাহ তা'আলার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এসে যায় যে, তিনি এক কালে শীতকে পছন্দ করেছিলেন, পরবর্তীতে ভুল ধরা পড়ায় তিনি গ্রীষ্মকে শীতের স্থলাভিষিক্ত করে দিয়েছেন! তাহলে তাকে আহাম্মক বা নির্বোধ বলা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? শরঈ বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে নসখেরও অবস্থানটাও ঠিক তদ্রূপ যে, এটাকে "বুদা” সাব্যস্ত করে দোষ মনে করা চরম পর্যায়ের অদূরদর্শিতা এবং বাস্তবতা থেকে অন্ধ হয়ে যাওয়ার নামান্তর।
এখানে বলাবাহুল্য যে, আর এই নসখ শুধু উম্মতে মুহাম্মাদীয়ারই বিশেষত্ব নয়। বরং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের শরীয়তেও নাসিখ-মানসূখের এই ধারা প্রচলিত ছিল। যার বহু উদাহরণ বর্তমান বাইবেলে পাওয়া যায়। যেমন, বাইবেলে রয়েছে 'হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর শরীয়তে দুই বোনকে একই সাথে বিবাহ বন্ধনে রাখা বৈধ ছিল এবং স্বয়ং হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর দু'জন স্ত্রী লাইয়্যা এবং রাহিল পরস্পর সহোদরা বোন ছিলেন। কিন্তু হযরত মূসা (আ.)-এর শরীয়তে এসে এটাকে অবৈধ করে দেওয়া হয়েছে। হযরত নূহ (আ.)-এর শরীয়তে বিচরণকারী সকল প্রাণীই হালাল ছিল। কিন্তু হযরত মূসা (আ.)-এর শরীয়তে এসে অনেক প্রাণীই হারাম করে দেওয়া হয়েছে। হযরত মূসা (আ.)-এর শরীয়তে তালাকের সাধারণ অনুমতি ছিল। পক্ষান্তরে হযরত ঈসা (আ.)-এর শরীয়তে ব্যভিচারের অপরাধ ব্যতীত অন্য কোনো অপরাধে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অনুমতি ছিল না। মোটকথা, বাইবেলের নতুন ও পুরাতন অঙ্গীকারনামায় এ রকম বিশটি উদাহরণ পাওয়া যায়, যেগুলোতে নতুন হুকুম দ্বারা পুরাতন কোনো হুকুমকে মানসূখ (রহিত) করা হয়েছে।
টিকাঃ
২২৪. বাইবেল: জন্ম শীর্ষক অধ্যায়: ২৯/৩০-৩২
২২৫. আহবার: ১৮/১৮
২২৬. বাইবেল: জন্ম শীর্ষক অধ্যায়: ৯/৩
২২৭. আহবার: ১১/৭ এবং ইসতেসনা: ১৪/৭
২২৮. ইসতেসনা: ২৪/-২
২২৯. ইনজিল মাত্তা: ১৯/১৫