📄 সাত হরফের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণার অবসান
অবশেষে আরেকটি মৌলিক ভুল ধারণার অবসান ঘটানো জরুরী। আর সেটা হলো, "সাত হরফ”-এর উপরোক্ত আলোচনার পাঠক স্বাভাবিকভাবেই এ সন্দেহ ও সংশয়ে পড়তে পারে যে, মহান আল্লাহর সংরক্ষণে কুরআনুল কারীমের ন্যায় মহাগ্রন্থ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের সামান্যতম পরিবর্তন ব্যতিরেকে সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। তারপরও মুসলমানদের মাঝে সাত হরফ নিয়ে এত বড় মতানৈক্য সৃষ্টি হলো কি করে?
কিন্তু সাত হরফের আলোচনায় আমরা পেছনে যেসব মতামত ও বক্তব্য উল্লেখ করেছি, যদি গভীর দৃষ্টিতে সেগুলোকে অধ্যয়ন করা হয়, তাহলে অতি সহজেই এসব সন্দেহ ও সংশয়ের অপনোদন হয়ে যায়। যে ব্যক্তিই এই মতানৈক্যের হাকীকত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার কাছে এ কথাটা একেবারেই সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ সকল মতানৈক্য শুধুমাত্র যুক্তি-তর্ক ও চিন্তা-প্রসূত। বাস্তব ক্ষেত্রে কুরআনের সত্যতা ও বাস্তবতা এবং কুরআন সংরক্ষিত থাকার উপর এই মতানৈক্যের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না। কারণ এ কথার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, বর্তমানে আমাদের নিকট যে আকৃতিতে পবিত্র কুরআনুল কারীম বিদ্যমান আছে, তা তাওয়াতুর বা বিশ্বস্ততার ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট চলে আসছে।
এতে সামান্য কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এ কথার উপরও সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের যতগুলো ক্বেরাত তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সবগুলোই সহীহ। এগুলোর প্রত্যেকটি অনুযায়ীই পবিত্র কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা যায়। আবার এ কথার উপরও উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মুতাওয়াতির ক্বেরাত ব্যতীত অপ্রচলিত ও বিরল যত ক্বেরাত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ কথাও সর্বসম্মত যে, আরযায়ে আখীরা অথবা তারও পূর্বে যে সকল ক্বেরাতকে রহিত করা হয়েছে, স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো পবিত্র কুরআনের অংশ হতে পারেনি।
এ কথাও সবার নিকট সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাত হরফের মধ্যে যে মতানৈক্য ছিল, তা ছিল শুধু শব্দগত। কিন্তু অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সবগুলো হরফ ছিল অভিন্ন। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের এক ক্বেরাত বা এক হরফ অনুযায়ী কুরআন পাঠ করে, তাহলে কুরআনের বিষয়বস্তু তার অর্জিত হয়ে যাবে এবং কুরআনের দিক-নির্দেশনা অর্জন করার জন্য অন্য কোনো হরফ জানার প্রয়োজন পড়বে না।
এর মাঝেও সামান্য কোনো মতানৈক্য নেই যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, তা পরিপূর্ণ সতর্কতা, হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য এবং গোটা মুসলিম উম্মাহ'র সত্যায়নের সাথে করেছিলেন। আর তাতে পবিত্র কুরআনুল কারীম ঠিক সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যেভাবে নবী কারীম (সা.)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এতে কোনো একজন মানুষেরও মতপার্থক্য হয়নি।
অতএব, যে মতানৈক্যের কথা পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে করা হয়েছে, তা শুধু এ ব্যাপারে যে, হাদীসে "সাত হরফ" দ্বারা উদ্দেশ্য কি ছিল? বর্তমানে যত মুতাওয়াতির ক্বেরাত বিদ্যমান রয়েছে, তা কি সাত হরফের উপর সন্নিবিষ্ট নাকি এক হরফের উপর? তা একটা যুক্তিগত ও দার্শনিক মতপার্থক্য মাত্র। যার দ্বারা জ্ঞানগত কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। তাই এর দ্বারা এ ধারণা করা একদম ভুল হবে যে, এসব মতানৈক্যের কারণে (নাঊযুবিল্লাহ) পবিত্র কুরআনুল কারীম বিতর্কিত হয়ে গেছে! এর উপমা কিছুটা এমন যে, একটি গ্রন্থের ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর মানুষ ঐক্যমত পোষণ করে যে, এটা অমুক গ্রন্থকারের রচিত। ওই গ্রন্থকারের প্রতি এই গ্রন্থের সম্বন্ধ করা নির্ভরযোগ্য। এবং তিনি স্বয়ং ছাপিয়ে সেটার সত্যায়নও করলেন যে, এটা আমার রচিত গ্রন্থ এবং এ কপির আদলে এটা কেয়ামত পর্যন্ত ছাপানো যেতে পারে। পরবর্তীতে মানুষের মাঝে এ মতানৈক্য সৃষ্টি হলো যে, ছাপানোর পূর্বে গ্রন্থকার তার পান্ডুলিপিতে শব্দগত কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন কিনা? নাকি প্রথমে যেমন ছিল তেমনি ভাবে সেটাকে প্রকাশ করেছেন? এটা স্পষ্ট যে, শুধু এতটুকু দার্শনিক মতপার্থক্যের উপর ভিত্তি করে উহার হাকীকত বিতর্কিত হতে পারে না, যার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছে। অর্থাৎ এটা ওই গ্রন্থ যা গ্রন্থকার নিজেই ছাপিয়েছেন এবং নিজের দিকে এর সম্বন্ধ করেছেন। আর কেয়ামত পর্যন্ত এটাকে প্রকাশ করার অনুমতিও প্রদান করেছেন। ঠিক তদ্রূপ গোটা উম্মত যখন এ কথার উপর একমত যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমকে মাসহাফে উসমানীতে হুবহু সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এর সকল মুতাওয়াতির ক্বেরাত বিশুদ্ধ ও মহান আল্লাহ পাকের তরফ থেকে নাযিলকৃত, তখন এই হাকীকত ওই সব দার্শনিক মতপার্থক্যের ভিত্তিতে বিতর্কিত হতে পারে না, যা সাত হরফের ব্যাখ্যায় উত্থাপিত হয়েছে।
টিকাঃ
২২৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মাসহাফকে বাকি রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মাসহাফে উসমানীর কোনো কথার উপর তিনি বিন্দুমাত্রও দ্বিমত পোষণ করেননি।