📘 উলুমুল কুরআন 📄 গবেষণার ফলাফল

📄 গবেষণার ফলাফল


“সাত হরফ”-এর বিতর্ক অনুমানের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। বিধায় অবশেষে এ থেকে অর্জিত ফলাফলের সারাংশ সংক্ষিপ্তাকারে উপস্থাপন করা সমীচীন মনে করছি। যেন মনে রাখতে সহজ হয়।

১. উম্মতের আসানী-সাধ্যের জন্য নবী কারীম (সা.) মহান আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করেন যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতকে যেন শুধু একটি পদ্ধতিকেই সীমাবদ্ধ রাখা না হয়। বরং বিভিন্ন পদ্ধতিতে যেন তেলাওয়াতের অনুমতি প্রদান করা হয়। এর প্রেক্ষিতেই সাত হরফের উপর পবিত্র কুরআন নাযিল করা হয়েছে।
২. সাত হরফে নাযিল হবার সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য হলো, এর ক্বেরাতের মধ্যে সাত প্রকারের বিভিন্নতা রাখা হয়েছে। যার আওতায় অনেকগুলো ক্বেরাত অস্তিত্বে এসেছিল।
৩. প্রথম দিকে মতানৈক্যের সাত প্রকারের মধ্যে শব্দমালা ও সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যের প্রকারটি বেশ ব্যাপক ছিল। অর্থাৎ এমনটি অধিকতর হতো যে, এক ক্বেরাতে এক শব্দ আর অন্য ক্বেরাতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য একটি শব্দ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আরববাসী কুরআনের ভাষার সাথে পরিচিত হতে লাগল, তখন মতানৈক্যের এই প্রকারটিও হ্রাস পেয়ে গেল। এমনকি রাসূলে কারীম (সা.) যখন মৃত্যুর পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সর্বশেষ দাওর (عرضه اخيرة) করলেন, তখন এর মধ্যে এ ধরনের মতানৈক্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো। বেশির চেয়ে বেশি শব্দরূপ, পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, একবচন, বহুবচন, মারূফ (কর্তৃবাচ্য), মাজহুল (কর্মবাচ্য) এবং সুর-ভঙ্গিমার মতানৈক্য বাকি থাকল।
৪. আরযায়ে আখীরার সময় যে সব মতানৈক্য অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে মাসহাফে এমনভাবে সংকলন করেছিলেন যে, সেগুলোকে নুকতা (বিন্দু) ও হরকত (কারক চিহ্ন) থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। এর ফলে এতে ক্বেরাতের অধিকাংশ মতানৈক্যের সংকুলান হয়ে গেছে। আর যেসব ক্বেরাতের এভাবে এক মাসহাফে সংকুলান হয়নি, সেগুলোকে অন্য মাসহাফে প্রকাশ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই উসমানী মাসহাফে কোথাও কোথাও এক-এক, দুই-দুই শব্দের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।
৫. হযরত উসমান (রা.) এভাবে সাতটি মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়েছেন এবং সেগুলোতে সূরাগুলোরও বিন্যাস দিয়েছেন। যখন হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফগুলোতে সূরার কোনো বিন্যাস ছিল না। সাথে সাথে পবিত্র কুরআনুল কারীমের জন্য একটি রুসমেখতও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর যেসব মাসহাফ এই বিন্যাস ও রুসমেখতের বিপরীত ছিল সেগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছেন।
৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের তরতীব উসমানী মাসহাফের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তিনি যেহেতু তাঁর বিন্যাসকে বাকি রাখতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি তাঁর মাসহাফকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার জন্য হযরত উসমান (রা.)-এর হাতে সোপর্দ করেননি।

টিকাঃ
২২২. মুসনাদে আহমদের মধ্যে কেবল একটি বর্ণনা এমন পাওয়া যায়, যা দ্বারা বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর উপরই আপত্তি করেছিলেন। (ফাতহুর রাব্বানী: ১৮/৩৬) কিন্তু এটা এক মাজহুল তথা অপরিচিত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত বলে নির্ভরযোগ্য নয়।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 সাত হরফের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণার অবসান

📄 সাত হরফের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণার অবসান


অবশেষে আরেকটি মৌলিক ভুল ধারণার অবসান ঘটানো জরুরী। আর সেটা হলো, "সাত হরফ”-এর উপরোক্ত আলোচনার পাঠক স্বাভাবিকভাবেই এ সন্দেহ ও সংশয়ে পড়তে পারে যে, মহান আল্লাহর সংরক্ষণে কুরআনুল কারীমের ন্যায় মহাগ্রন্থ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের সামান্যতম পরিবর্তন ব্যতিরেকে সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। তারপরও মুসলমানদের মাঝে সাত হরফ নিয়ে এত বড় মতানৈক্য সৃষ্টি হলো কি করে?

কিন্তু সাত হরফের আলোচনায় আমরা পেছনে যেসব মতামত ও বক্তব্য উল্লেখ করেছি, যদি গভীর দৃষ্টিতে সেগুলোকে অধ্যয়ন করা হয়, তাহলে অতি সহজেই এসব সন্দেহ ও সংশয়ের অপনোদন হয়ে যায়। যে ব্যক্তিই এই মতানৈক্যের হাকীকত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার কাছে এ কথাটা একেবারেই সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ সকল মতানৈক্য শুধুমাত্র যুক্তি-তর্ক ও চিন্তা-প্রসূত। বাস্তব ক্ষেত্রে কুরআনের সত্যতা ও বাস্তবতা এবং কুরআন সংরক্ষিত থাকার উপর এই মতানৈক্যের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না। কারণ এ কথার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, বর্তমানে আমাদের নিকট যে আকৃতিতে পবিত্র কুরআনুল কারীম বিদ্যমান আছে, তা তাওয়াতুর বা বিশ্বস্ততার ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট চলে আসছে।

এতে সামান্য কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এ কথার উপরও সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের যতগুলো ক্বেরাত তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সবগুলোই সহীহ। এগুলোর প্রত্যেকটি অনুযায়ীই পবিত্র কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা যায়। আবার এ কথার উপরও উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মুতাওয়াতির ক্বেরাত ব্যতীত অপ্রচলিত ও বিরল যত ক্বেরাত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ কথাও সর্বসম্মত যে, আরযায়ে আখীরা অথবা তারও পূর্বে যে সকল ক্বেরাতকে রহিত করা হয়েছে, স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো পবিত্র কুরআনের অংশ হতে পারেনি।

এ কথাও সবার নিকট সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাত হরফের মধ্যে যে মতানৈক্য ছিল, তা ছিল শুধু শব্দগত। কিন্তু অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সবগুলো হরফ ছিল অভিন্ন। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের এক ক্বেরাত বা এক হরফ অনুযায়ী কুরআন পাঠ করে, তাহলে কুরআনের বিষয়বস্তু তার অর্জিত হয়ে যাবে এবং কুরআনের দিক-নির্দেশনা অর্জন করার জন্য অন্য কোনো হরফ জানার প্রয়োজন পড়বে না।

এর মাঝেও সামান্য কোনো মতানৈক্য নেই যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, তা পরিপূর্ণ সতর্কতা, হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য এবং গোটা মুসলিম উম্মাহ'র সত্যায়নের সাথে করেছিলেন। আর তাতে পবিত্র কুরআনুল কারীম ঠিক সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যেভাবে নবী কারীম (সা.)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এতে কোনো একজন মানুষেরও মতপার্থক্য হয়নি।

অতএব, যে মতানৈক্যের কথা পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে করা হয়েছে, তা শুধু এ ব্যাপারে যে, হাদীসে "সাত হরফ" দ্বারা উদ্দেশ্য কি ছিল? বর্তমানে যত মুতাওয়াতির ক্বেরাত বিদ্যমান রয়েছে, তা কি সাত হরফের উপর সন্নিবিষ্ট নাকি এক হরফের উপর? তা একটা যুক্তিগত ও দার্শনিক মতপার্থক্য মাত্র। যার দ্বারা জ্ঞানগত কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। তাই এর দ্বারা এ ধারণা করা একদম ভুল হবে যে, এসব মতানৈক্যের কারণে (নাঊযুবিল্লাহ) পবিত্র কুরআনুল কারীম বিতর্কিত হয়ে গেছে! এর উপমা কিছুটা এমন যে, একটি গ্রন্থের ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর মানুষ ঐক্যমত পোষণ করে যে, এটা অমুক গ্রন্থকারের রচিত। ওই গ্রন্থকারের প্রতি এই গ্রন্থের সম্বন্ধ করা নির্ভরযোগ্য। এবং তিনি স্বয়ং ছাপিয়ে সেটার সত্যায়নও করলেন যে, এটা আমার রচিত গ্রন্থ এবং এ কপির আদলে এটা কেয়ামত পর্যন্ত ছাপানো যেতে পারে। পরবর্তীতে মানুষের মাঝে এ মতানৈক্য সৃষ্টি হলো যে, ছাপানোর পূর্বে গ্রন্থকার তার পান্ডুলিপিতে শব্দগত কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন কিনা? নাকি প্রথমে যেমন ছিল তেমনি ভাবে সেটাকে প্রকাশ করেছেন? এটা স্পষ্ট যে, শুধু এতটুকু দার্শনিক মতপার্থক্যের উপর ভিত্তি করে উহার হাকীকত বিতর্কিত হতে পারে না, যার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছে। অর্থাৎ এটা ওই গ্রন্থ যা গ্রন্থকার নিজেই ছাপিয়েছেন এবং নিজের দিকে এর সম্বন্ধ করেছেন। আর কেয়ামত পর্যন্ত এটাকে প্রকাশ করার অনুমতিও প্রদান করেছেন। ঠিক তদ্রূপ গোটা উম্মত যখন এ কথার উপর একমত যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমকে মাসহাফে উসমানীতে হুবহু সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এর সকল মুতাওয়াতির ক্বেরাত বিশুদ্ধ ও মহান আল্লাহ পাকের তরফ থেকে নাযিলকৃত, তখন এই হাকীকত ওই সব দার্শনিক মতপার্থক্যের ভিত্তিতে বিতর্কিত হতে পারে না, যা সাত হরফের ব্যাখ্যায় উত্থাপিত হয়েছে।

টিকাঃ
২২৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মাসহাফকে বাকি রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মাসহাফে উসমানীর কোনো কথার উপর তিনি বিন্দুমাত্রও দ্বিমত পোষণ করেননি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px