📄 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও তাঁর মুসহাফ
উপরোক্ত পর্যালোচনার উপর চতুর্থ প্রশ্ন এ হতে পারে যে, একাধিক রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সহীফাটিও আগুনে পোড়াননি। যদি হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত না করে থাকেন, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এ আপত্তির কারণটা কি ছিল?
এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে: প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দু'টি অভিযোগ ছিল। প্রথমটি হলো, পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার মহান কাজে তাঁকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো না? দ্বিতীয়টি হলো, অন্যান্য মাসহাফগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হলো কেন?
সুনানে তিরমিযীর এক বর্ণনায় ইমাম যুহরী (রহ.) প্রথম অভিযোগের আলোচনা করেছেন। যার সারাংশ হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এ অভিযোগ ছিল যে, কুরআন লিপিবদ্ধ করার মহান কাজ তাঁর দায়িত্বে কেন অর্পণ করা হলো না? যখন তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তুলনায় অধিক সময় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহচর্যে থেকে ধন্য হয়েছেন। হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এ অভিযোগটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর জবাব ছিল যে, তিনি এ মহান কাজটি পবিত্র মদীনায় আরম্ভ করেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন কুফায় অবস্থান করছিলেন। আর হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর অপেক্ষায় থেকে এ মহান কাজটিকে আর বিলম্বিত করতে চাচ্ছিলেন না। উপরন্তু তিনি হযরত আবু বাকরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উপরই এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। তাই হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সমীচীন মনে করলেন যে, কুরআনের সংকলন এবং বিন্যাসের এ কাজটিও তাঁদের হাতে সমাধা হোক।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল এই যে, হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নতুন মাসহাফ প্রস্তুত করার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর তিনি তাঁর মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে বুঝানোর জন্য তাঁর নিকট গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বললেন- والله لا ادفعه اليهم اقرانی رسول الله صلى الله عليه وسلم بضع وسبعين سورة ثم ادفعه اليهم والله لا ادفعه اليهم. 'অর্থাৎ আল্লাহর শপথ! আমি এই মাসহাফ তাঁর নিকট সোপর্দ করবো না। আমাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্তরের চেয়ে অধিক সূরা শিক্ষা দিয়েছেন। এরপরও আমি এই মাসহাফ তাঁকে দিয়ে দেব? মহান আল্লাহর শপথ! আমি এটা তাঁকে দেব না।'
যারা কুফায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর অনুকরণে ব্যক্তিগতভাবে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁদেরকেও এ উৎসাহ দিলেন যে, তারা যেন তাদের মাসহাফ সোপর্দ না করে। হযরত খুমাইর ইবনে মালিক (রহ.) বলেন- مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَغُلَّ مُصْحَفَهُ فَلْيَغُلَهُ فَإِنَّهُ مَنْ غَلَّ شَيْئًا جَاءَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ . ثُمَّ قَالَ: لَقَدْ قَرَأْتُ مِنْ فَمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعِينَ سُورَةً أَفَأَتْرُكُ مَا أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ ! 'অর্থাৎ মাসহাফগুলোর মাঝে পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলো। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) (মানুষকে) বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা নিজের মাসহাফকে লুকাতে সক্ষম হও, তারা লুকিয়ে রাখ। অতঃপর তিনি বললেন, আমি নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র যবান থেকে সত্তরটি সূরা শিখেছি। আমি কি ওই বিষয় ছেড়ে দেব, যা আমি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র জবান থেকে অর্জন করেছি।'
এখানে এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাসহাফটি উসমানী মাসহাফ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল এবং তিনি সেটাকে সংরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কোন বিষয়গুলো উসমানী মাসহাফ থেকে ভিন্নতর ছিল? সহীহ রেওয়ায়েতগুলোতে এর কোনো স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, তাঁর মাসহাফের মৌলিক পার্থক্য ছিল সূরার বিন্যাস। আর এ কথা আগেও বলা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যেসব সহীফায় কুরআন সংকলন করেছিলেন, সেগুলোতে সূরাগুলো পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ ছিল এবং সেগুলোতে কোনো বিন্যাস ছিল না। আর হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যে কুরআন সংকলন করেছিলেন, তাতে সূরাগুলো একটি বিশেষ বিন্যাস অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ইমাম হাকেম (রহ.) লিখেন- أنه جمع القرآن لم يكن مرة واحدة فقد جمع بعضه بحضرة رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم جمع بعضه بحضرة ابى بكر الصديق والجمع الثالث هو فى ترتيب السورة كان فى خلافة امير المؤمنين عثمان بن عفان رضى الله تعالى عنهم اجمعين. 'কুরআন সংকলনের কাজ একবারেই সমাপ্ত হয়নি। বরং পবিত্র কুরআনুল কারীমের কিছু অংশ স্বয়ং নবী কারীম (সা.)-এর উপস্থিতিতেই সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর যুগে আরো কিছু সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর কুরআন সংকলনের তৃতীয় পর্যায়ে সূরাগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। যা ছিল আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাদিয়াল্লাহু)-এর শাসনামলে।'
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাজিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাসহাফখানা হযরত উসমান (রাজিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাসহাফের সাথে বিন্যাসের দিক থেকে অনেকভাবে পার্থক্য ছিল। যেমন, এতে সূরা নিসা ছিল আগে আর সূরা আলে-ইমরান ছিল তার পরে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাজিয়াল্লাহু আনহু) সম্ভবত এই বিন্যাস অনুযায়ীই নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে কুরআন শিখেছিলেন। তাই এই বিন্যাস অনুযায়ী কুরআনকে রাখাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনা দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। ইরাকের জনৈক অধিবাসী একদিন উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট আসলো এবং বললো- 'হে উম্মুল মু'মিনীন! আমাকে আপনার মাসহাফটি দেখান। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কেন? লোকটি বলল, আমি (আমার) কুরআনের মাসহাফটি এর অনুকরণে বিন্যস্ত করবো। কেননা তা (আমাদের এলাকায়) অবিন্যস্ত অবস্থায়ই পড়া হয়। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কুরআনে যে অংশই আগে তুমি পড় না কেন, তা তোমার জন্য কোনো অসুবিধা হবে না।'
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) লিখেন, এই ইরাকী ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাজিয়াল্লাহু আনহু)-এর ক্বেরাতের অনুসারী ছিলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যেহেতু নিজের মাসহাফে পরিবর্তন করেননি এবং তা বিলুপ্তও করেননি, তাই এর বিন্যাস উসমানী মাসহাফের বিন্যাসের চেয়ে ভিন্নতর ছিল। আর এ কথা তো স্পষ্ট যে, উসমানী মাসহাফের বিন্যাস অন্যান্য মাসহাফের বিন্যাসের তুলনায় অধিক সমীচীন ছিল। তাই এই ইরাকী লোকটি নিজের মাসহাফকে উসমানী মাসহাফের তুলনায় তারতিবের ভিন্নতা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু)-এর মাসহাফে মৌলিক কিছু পার্থক্য ছিল, সূরাগুলোর বিন্যাস। এ ছাড়া রুসমেখতের পার্থক্যও থাকতে পারে এবং এতে এমন রুসমেখত অবলম্বন করা হয়েছে, যার মধ্যে উসমানী মাসহাফের ন্যায় সকল ক্বেরাতের জন্য অবকাশ থাকে না। অন্যথায় যদি হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী বলা হয় যে, হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফের উপর পবিত্র কুরআন লিপিবদ্ধ করেছিলেন আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু)-এর মাসহাফ সেই পরিত্যক্ত হরফের কোনো একটির উপর লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, তাহলে নিম্নোক্ত অভিযোগগুলো আরোপিত হয়।
১. সহীহ বুখারীর উল্লিখিত হাদীসে জনৈকী ইরাকী ব্যক্তি শুধু সূরার বিন্যাসের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। নতুবা যদি হরফের পার্থক্যও হতো, তাহলে তা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হতো।
২. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও অন্যান্যদের বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যদি এ কথা সঠিক হয়, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু) ও হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু)-এর মাসহাফের মাঝে কোনো পার্থক্য না থাকাই উচিত ছিল। কারণ এ বক্তব্য অনুযায়ী হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু) সবাইকে কুরাইশী হরফের উপর সমবেত করে সে অনুযায়ী মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়ে ছিলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু)-ও কুরাইশী ছিলেন।
৩. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও তাঁর অনুসারীগণ ছয় হরফ বিলুপ্ত করার স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় দলীল হিসেবে اجماع الصحابة (সাহাবায়ে কেরামের ইজমা)কে পেশ করেছেন। কিন্তু যদি হযরত ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু) অন্য কোনো হরফের উপর পাঠ করে থাকেন এবং এর লিখনকেও জায়েয মনে করে থাকেন, তাহলে এই ইজমা বা ঐক্যমত সংঘটিত হলো কি করে? যে ইজমার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু)-এর ন্যায় বিজ্ঞ ফকীহ সাহাবী শামিল নেই। এটাকে ইজমা বলার যুক্তি কোথায়? কেউ কেউ এই দাবী করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর রায়কে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো রেওয়ায়েত পাওয়া যায় না।
হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) লিখেন- 'ইবনে আবী দাউদ (রহ.) "ইবনে মাসউদ (রা.)-এর পরবর্তীতে হযরত উসমানের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া" শিরোনামে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় লিখেছেন। তবে তিনি এই অধ্যায়ের অধীনে এমন কোনো সুস্পষ্ট রেওয়ায়েত উল্লেখ করতে পারেননি, যা এই শিরোনামের খাপ খায়।'
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) সহ অন্যান্যদের বক্তব্যের উপর আরোপিত এ অভিযোগগুলোর কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। কাজেই এটাই বিশুদ্ধ কথা যে, হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বাকি রেখেছেন। আর হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল না যে, ছয় হরফকে কেন বিলুপ্ত করা হয়েছে? কারণ বাস্তবে এটা ঘটেই ছিল না। বরং তাঁর অভিযোগটা ছিল এই যে, যে মাসহাফগুলো আগে থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল এবং যেগুলোর বিন্যাস ও রুসমেখত উসমানী মাসহাফ অনুযায়ী ছিল না, সেগুলো সঠিক হওয়া সত্ত্বেও নষ্ট করা হচ্ছে কেন?
টিকাঃ
২১৪. ফাতহুল বারী : ৯/১৬
২১৫. মুসতাদরাক হাকেম: ২/২২৮, হাকেম (রহ.) বলেন, এটা সহীহ সনদবিশিষ্ট হাদীস। আল্লামা যাহাবী (রহ.) তা সত্যায়ন করেছেন।
২১৬. আল-ফাতহুর রব্বানী: ১৮/৩৫
২১৭. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৯
২১৮. আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ইবনে আশতা (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস নকল করেছেন। মাসহাফে উসমানীর সাথে যার প্রচুর গড়মিল রয়েছে। (আল- ইতকান : ১/৬৬)
২১৯. সহীহ বুখারী: কুরআন সংকলন অধ্যায়।
২২০. ফাতহুল বারী: ৯/৩২
২২১. ফাতহুল বারী: ৯/৪০
📄 গবেষণার ফলাফল
“সাত হরফ”-এর বিতর্ক অনুমানের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। বিধায় অবশেষে এ থেকে অর্জিত ফলাফলের সারাংশ সংক্ষিপ্তাকারে উপস্থাপন করা সমীচীন মনে করছি। যেন মনে রাখতে সহজ হয়।
১. উম্মতের আসানী-সাধ্যের জন্য নবী কারীম (সা.) মহান আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করেন যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতকে যেন শুধু একটি পদ্ধতিকেই সীমাবদ্ধ রাখা না হয়। বরং বিভিন্ন পদ্ধতিতে যেন তেলাওয়াতের অনুমতি প্রদান করা হয়। এর প্রেক্ষিতেই সাত হরফের উপর পবিত্র কুরআন নাযিল করা হয়েছে।
২. সাত হরফে নাযিল হবার সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য হলো, এর ক্বেরাতের মধ্যে সাত প্রকারের বিভিন্নতা রাখা হয়েছে। যার আওতায় অনেকগুলো ক্বেরাত অস্তিত্বে এসেছিল।
৩. প্রথম দিকে মতানৈক্যের সাত প্রকারের মধ্যে শব্দমালা ও সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যের প্রকারটি বেশ ব্যাপক ছিল। অর্থাৎ এমনটি অধিকতর হতো যে, এক ক্বেরাতে এক শব্দ আর অন্য ক্বেরাতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য একটি শব্দ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আরববাসী কুরআনের ভাষার সাথে পরিচিত হতে লাগল, তখন মতানৈক্যের এই প্রকারটিও হ্রাস পেয়ে গেল। এমনকি রাসূলে কারীম (সা.) যখন মৃত্যুর পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সর্বশেষ দাওর (عرضه اخيرة) করলেন, তখন এর মধ্যে এ ধরনের মতানৈক্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো। বেশির চেয়ে বেশি শব্দরূপ, পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, একবচন, বহুবচন, মারূফ (কর্তৃবাচ্য), মাজহুল (কর্মবাচ্য) এবং সুর-ভঙ্গিমার মতানৈক্য বাকি থাকল।
৪. আরযায়ে আখীরার সময় যে সব মতানৈক্য অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে মাসহাফে এমনভাবে সংকলন করেছিলেন যে, সেগুলোকে নুকতা (বিন্দু) ও হরকত (কারক চিহ্ন) থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। এর ফলে এতে ক্বেরাতের অধিকাংশ মতানৈক্যের সংকুলান হয়ে গেছে। আর যেসব ক্বেরাতের এভাবে এক মাসহাফে সংকুলান হয়নি, সেগুলোকে অন্য মাসহাফে প্রকাশ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই উসমানী মাসহাফে কোথাও কোথাও এক-এক, দুই-দুই শব্দের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।
৫. হযরত উসমান (রা.) এভাবে সাতটি মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়েছেন এবং সেগুলোতে সূরাগুলোরও বিন্যাস দিয়েছেন। যখন হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফগুলোতে সূরার কোনো বিন্যাস ছিল না। সাথে সাথে পবিত্র কুরআনুল কারীমের জন্য একটি রুসমেখতও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর যেসব মাসহাফ এই বিন্যাস ও রুসমেখতের বিপরীত ছিল সেগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছেন।
৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের তরতীব উসমানী মাসহাফের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তিনি যেহেতু তাঁর বিন্যাসকে বাকি রাখতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি তাঁর মাসহাফকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার জন্য হযরত উসমান (রা.)-এর হাতে সোপর্দ করেননি।
টিকাঃ
২২২. মুসনাদে আহমদের মধ্যে কেবল একটি বর্ণনা এমন পাওয়া যায়, যা দ্বারা বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর উপরই আপত্তি করেছিলেন। (ফাতহুর রাব্বানী: ১৮/৩৬) কিন্তু এটা এক মাজহুল তথা অপরিচিত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত বলে নির্ভরযোগ্য নয়।
📄 সাত হরফের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণার অবসান
অবশেষে আরেকটি মৌলিক ভুল ধারণার অবসান ঘটানো জরুরী। আর সেটা হলো, "সাত হরফ”-এর উপরোক্ত আলোচনার পাঠক স্বাভাবিকভাবেই এ সন্দেহ ও সংশয়ে পড়তে পারে যে, মহান আল্লাহর সংরক্ষণে কুরআনুল কারীমের ন্যায় মহাগ্রন্থ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের সামান্যতম পরিবর্তন ব্যতিরেকে সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। তারপরও মুসলমানদের মাঝে সাত হরফ নিয়ে এত বড় মতানৈক্য সৃষ্টি হলো কি করে?
কিন্তু সাত হরফের আলোচনায় আমরা পেছনে যেসব মতামত ও বক্তব্য উল্লেখ করেছি, যদি গভীর দৃষ্টিতে সেগুলোকে অধ্যয়ন করা হয়, তাহলে অতি সহজেই এসব সন্দেহ ও সংশয়ের অপনোদন হয়ে যায়। যে ব্যক্তিই এই মতানৈক্যের হাকীকত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার কাছে এ কথাটা একেবারেই সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ সকল মতানৈক্য শুধুমাত্র যুক্তি-তর্ক ও চিন্তা-প্রসূত। বাস্তব ক্ষেত্রে কুরআনের সত্যতা ও বাস্তবতা এবং কুরআন সংরক্ষিত থাকার উপর এই মতানৈক্যের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না। কারণ এ কথার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, বর্তমানে আমাদের নিকট যে আকৃতিতে পবিত্র কুরআনুল কারীম বিদ্যমান আছে, তা তাওয়াতুর বা বিশ্বস্ততার ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট চলে আসছে।
এতে সামান্য কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এ কথার উপরও সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের যতগুলো ক্বেরাত তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সবগুলোই সহীহ। এগুলোর প্রত্যেকটি অনুযায়ীই পবিত্র কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা যায়। আবার এ কথার উপরও উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মুতাওয়াতির ক্বেরাত ব্যতীত অপ্রচলিত ও বিরল যত ক্বেরাত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ কথাও সর্বসম্মত যে, আরযায়ে আখীরা অথবা তারও পূর্বে যে সকল ক্বেরাতকে রহিত করা হয়েছে, স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো পবিত্র কুরআনের অংশ হতে পারেনি।
এ কথাও সবার নিকট সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাত হরফের মধ্যে যে মতানৈক্য ছিল, তা ছিল শুধু শব্দগত। কিন্তু অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সবগুলো হরফ ছিল অভিন্ন। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের এক ক্বেরাত বা এক হরফ অনুযায়ী কুরআন পাঠ করে, তাহলে কুরআনের বিষয়বস্তু তার অর্জিত হয়ে যাবে এবং কুরআনের দিক-নির্দেশনা অর্জন করার জন্য অন্য কোনো হরফ জানার প্রয়োজন পড়বে না।
এর মাঝেও সামান্য কোনো মতানৈক্য নেই যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, তা পরিপূর্ণ সতর্কতা, হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য এবং গোটা মুসলিম উম্মাহ'র সত্যায়নের সাথে করেছিলেন। আর তাতে পবিত্র কুরআনুল কারীম ঠিক সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যেভাবে নবী কারীম (সা.)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এতে কোনো একজন মানুষেরও মতপার্থক্য হয়নি।
অতএব, যে মতানৈক্যের কথা পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে করা হয়েছে, তা শুধু এ ব্যাপারে যে, হাদীসে "সাত হরফ" দ্বারা উদ্দেশ্য কি ছিল? বর্তমানে যত মুতাওয়াতির ক্বেরাত বিদ্যমান রয়েছে, তা কি সাত হরফের উপর সন্নিবিষ্ট নাকি এক হরফের উপর? তা একটা যুক্তিগত ও দার্শনিক মতপার্থক্য মাত্র। যার দ্বারা জ্ঞানগত কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। তাই এর দ্বারা এ ধারণা করা একদম ভুল হবে যে, এসব মতানৈক্যের কারণে (নাঊযুবিল্লাহ) পবিত্র কুরআনুল কারীম বিতর্কিত হয়ে গেছে! এর উপমা কিছুটা এমন যে, একটি গ্রন্থের ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর মানুষ ঐক্যমত পোষণ করে যে, এটা অমুক গ্রন্থকারের রচিত। ওই গ্রন্থকারের প্রতি এই গ্রন্থের সম্বন্ধ করা নির্ভরযোগ্য। এবং তিনি স্বয়ং ছাপিয়ে সেটার সত্যায়নও করলেন যে, এটা আমার রচিত গ্রন্থ এবং এ কপির আদলে এটা কেয়ামত পর্যন্ত ছাপানো যেতে পারে। পরবর্তীতে মানুষের মাঝে এ মতানৈক্য সৃষ্টি হলো যে, ছাপানোর পূর্বে গ্রন্থকার তার পান্ডুলিপিতে শব্দগত কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন কিনা? নাকি প্রথমে যেমন ছিল তেমনি ভাবে সেটাকে প্রকাশ করেছেন? এটা স্পষ্ট যে, শুধু এতটুকু দার্শনিক মতপার্থক্যের উপর ভিত্তি করে উহার হাকীকত বিতর্কিত হতে পারে না, যার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছে। অর্থাৎ এটা ওই গ্রন্থ যা গ্রন্থকার নিজেই ছাপিয়েছেন এবং নিজের দিকে এর সম্বন্ধ করেছেন। আর কেয়ামত পর্যন্ত এটাকে প্রকাশ করার অনুমতিও প্রদান করেছেন। ঠিক তদ্রূপ গোটা উম্মত যখন এ কথার উপর একমত যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমকে মাসহাফে উসমানীতে হুবহু সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এর সকল মুতাওয়াতির ক্বেরাত বিশুদ্ধ ও মহান আল্লাহ পাকের তরফ থেকে নাযিলকৃত, তখন এই হাকীকত ওই সব দার্শনিক মতপার্থক্যের ভিত্তিতে বিতর্কিত হতে পারে না, যা সাত হরফের ব্যাখ্যায় উত্থাপিত হয়েছে।
টিকাঃ
২২৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মাসহাফকে বাকি রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মাসহাফে উসমানীর কোনো কথার উপর তিনি বিন্দুমাত্রও দ্বিমত পোষণ করেননি।