📘 উলুমুল কুরআন 📄 কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য

📄 কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য


প্রকাশ থাকে যে, সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী যখন হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে কুরআনের মাসহাফ বিন্যাস দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের একটি দল নির্বাচন করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেছিলেন- إذ اختلفتم انتم وزيد بن ثابت فى شئ من القرآن فاكتبوه بلسان قريش فإنما نزل بلسانهم 'যখন তোমাদের এবং যায়েদ ইবনে সাবেতের মাঝে কুরআনের কোনো অংশে মতানৈক্য হবে তখন তোমরা সেটাকে কুরাইশের ভাষা অনুযায়ী লিখবে। কেননা কুরআন তাদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।'
হযরত উসমান (রা.) যদি সাত হরফের সবগুলোই অবশিষ্ট রাখতেন, তাহলে তাঁর এ নির্দেশের উদ্দেশ্য কি? এর জবাব হচ্ছে: প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রা.)-এর ওই বাক্য, যা দ্বারা হাফেয ইবনে জারীরসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বুঝে নিয়েছেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে মাসহাফে শুধু এক কুরাইশী হরফকে অবশিষ্ট রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যদি হযরত উসমান (রা.)-এর এ বাক্যটির উপর গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে এ কথা বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা এই উদ্দেশ্য নেওয়া সঠিক নয় যে, তিনি বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং সবগুলো রেওয়ায়েতের প্রতি সামগ্রিকভাবে তাকালে বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রুসমেখতের দিক থেকে কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তাহলে যেন কুরাইশী ভাষার রুসমেখত গ্রহণ করা হয়। এর প্রমাণ হলো, হযরত উসমান (রা.)-এর নির্দেশনার পর সাহাবায়ে কেরামের দলটি যখন পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন তখন সমগ্র কুরআনুল কারীমের শুধু একটি স্থানে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য হয়। ইমাম যুহরী (রহ.) এভাবে উল্লেখ করেছেন- فاختلفوا يومئذ في التابوت والتابوه فقال النفر القرشيون التابوت وقال زيد بن ثابت التابوة فرفع اختلافهم الى عثمان فقال: اكتبوه التابوت فإنه بلسان قریش نزل ‘অতঃপর التابوت এবং التابوه শব্দের মধ্যে এসে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হলো। কুরাইশী সাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটাকে (দীর্ঘ তা) দ্বারা লিখা হোক। আর যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বললেন, (গোল তা দ্বারা) التابوه লিখা হোক। পরে তাঁদের এই মতানৈক্য হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন التابوت লিখ। কেননা কুরআন কুরাইশী ভাষায় নাযিল হয়েছে।'
অতএব, এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত এবং কুরাইশী সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রুসমেখত-এর মতানৈক্য; ভাষাগত মতানৈক্য নয়।

টিকাঃ
২০৯. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী সহ]: ৯/১৬
২১০. কানযুল উম্মাল: ১/২৮২ হাদীস নং ৪৭৮৩

📘 উলুমুল কুরআন 📄 মুরাদিফ সমার্থকবোধক শব্দ দ্বারা তেলাওয়াতের মাসআলা

📄 মুরাদিফ সমার্থকবোধক শব্দ দ্বারা তেলাওয়াতের মাসআলা


প্রকাশ থাকে যে, হযরত আবু বাকরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সাত হরফের মতানৈক্যের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা দেখে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, এই সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। কেননা তিনি বলেন- فَقَالَ : يَا مُحَمَّدُ ، اقْرَأَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ ‘হযরত জিবরাঈল (আ.) (রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, হে মুহাম্মাদ কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) (রাসূল (সা.)-কে বললেন, এর সাথে আরও (হরফ) সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাত হরফ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল। হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, এর প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تَعَالَ (আস)-কে أَقْبِلْ هَلُمَّ إِسْرَعْ ও عَجِّلْ শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।'

এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, সাত হরফের মতানৈক্য মূলত সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যই ছিল। অর্থাৎ এক হরফের ভিত্তিতে কোনো এক শব্দকে গ্রহণ করা হয়েছে। আবার অন্য হরফের ভিত্তিতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য আরেকটি শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ মাসহাফে উসমানীর মধ্যে যেসব ক্বেরাত সংকলিত হয়েছে, সেগুলোর মাঝে সমার্থবোধকের এই মতানৈক্য খুবই স্বল্প। ওই ক্বেরাতগুলোর মাঝে অধিকাংশই হরকত (কারক চিহ্ন), সীগা (শব্দরূপ), পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এবং উচ্চারণের মতবিরোধ সংঘটিত হয়েছে।

জবাব : সাত হরফের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা যে বক্তব্যটি গ্রহণ করেছি, এতে ক্বেরাতগুলোর মাঝে সাত প্রকারের মতপার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে। ওই প্রকারগুলোর মাঝে একটি প্রকার হলো, 'বদল' তথা সমার্থবোধক শব্দের মাধ্যমে পরিবর্তন করে পড়ার মতানৈক্য। হযরত আবু বাকরা (রা.) এখানে সাত হরফের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। বরং এর একটি উদাহরণ দিয়েছেন মাত্র। তাই মতানৈক্যের একটি মাত্র প্রকার অর্থাৎ শব্দের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।

ক্বেরাতের বিভিন্নতার এই প্রকারটি অর্থাৎ শব্দের বিভিন্নতা ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনেক বেশি ছিল। যেহেতু গোটা আরববাসী কুরাইশী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। তাই শুরুতে তাদেরকে এ সহজতা বেশি থেকে বেশি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা নবী কারীম (সা.) থেকে শ্রবণকৃত পরিবর্তনশীল শব্দগুচ্ছ থেকে যে কোনো একটি শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করবে। তাই প্রথমে প্রথমে অধিকতর এমন ছিল যে, এক ক্বেরাতের মাঝে এক শব্দ এবং অন্য ক্বেরাতের মাঝে এর সমার্থবোধক অন্য শব্দ রয়েছে।

কিন্তু যখন মানুষ কুরআনের ভাষার সাথে পুরোপুরি পরিচিত হয়ে উঠল, তখন ক্বেরাতের বিভিন্নতার এই প্রকারকে ধীরে ধীরে হ্রাস করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাসূলে কারীম (সা.) যখন মৃত্যুর পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সর্বশেষ দাওর (عرضه اخيرة) করলেন, তখন এর মধ্যে এ ধরনের মতানৈক্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো।
হযরত উসমান (রা.) নিজের মাসহাফে সে সকল সমার্থবোধক শব্দ সংকলন করেননি, যা নবী কারীম (সা.)-এর আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ সেগুলোর অবস্থান ছিল তেলাওয়াত রহিত হওয়া আয়াতসমূহের ন্যায়। অবশ্য ক্বেরাতের যে মতানৈক্য আরযায়ে আখীরায় অবশিষ্ট ছিল, হযরত ওসমান (রা.) সেগুলোকে হুবহু বহাল রেখেছেন। অতএব, হযরত আবু বাকরা (রা.) হরফের বিভিন্নতার যে প্রকারটিকে উল্লিখিত হাদীসে উদাহরণ স্বরূপ পেশ করেছেন, তা ওই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত যার অধিকাংশ আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই তা মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি এবং বর্তমান ক্বেরাতগুলোও সেগুলোকে শামিল করেনি।

টিকাঃ
২১১. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)

📘 উলুমুল কুরআন 📄 উপরোল্লিখিত ফলাফলটি তিনটি ভূমিকা থেকে আহরিত হয়

📄 উপরোল্লিখিত ফলাফলটি তিনটি ভূমিকা থেকে আহরিত হয়


১. আরযায়ে আখীরা (হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কুরআনের শেষ দাওর)-এর সময় পবিত্র কুরআনুল কারীমের বহু ক্বেরাত রহিত করা হয়েছিল।
২. হযরত উসমান (রা.) মাসহাফে উসমানীকে আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন।
৩. হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফে সমার্থবোধক শব্দের ওই মতানৈক্য বিদ্যমান নেই যা হযরত আবু বাকরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন।

তৃতীয় ভূমিকাটি তো একেবারে স্পষ্ট। আর দ্বিতীয় ভূমিকার প্রমাণপঞ্জি আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। যার মধ্যে সর্বাধিক স্পষ্ট দলীল হচ্ছে হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর এই ইরশাদ যে, “হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমাদেরকে যে ক্বেরাতের উপর সমবেত করেছেন, তা ছিল আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।”

এখন বাকি থেকে যায় প্রথম ভূমিকাটি। আর তা হলো, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক ক্বেরাত রহিত হয়ে গিয়েছিল। এর প্রমাণ হচ্ছে মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এই ইরশাদ-
ولا شك ان القرآن نسخ منه وغير فيه فى العرضة الأخيرة فقد صح النص بذلك عن غير واحد من الصحابة وروينا باسناد صحيح عن زرابن حبيش قال قال لى ابن عباس أى القراءتين تقرا ؟ قلت الاخيرة قال فأن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعرض القرآن على جبريل عليه السلام كل عام مرة قال فعرض عليه القرآن فى العام الذي قبض فيه النبي صلى الله عليه وسلم مرتين فشهد عبد الله يعنى ابن مسعود ما نسخ منه و مابدل.
'অর্থাৎ এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আরযায়ে আখীরার সময় পবিত্র কুরআনুল কারীম থেকে অনেক কিছু রহিত হয়ে গেছে এবং এতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কেননা একাধিক সাহাবী থেকে এর স্পষ্টতা উদ্ধৃত রয়েছে। আমাদের কাছে সহীহ সনদসূত্রে হযরত যর ইবনে হুবাইশ (আ.)-এর এ বক্তব্য পৌঁছেছে যে, ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোন ক্বেরাত পাঠ কর? আমি বললাম, শেষ ক্বেরাত। তিনি বললেন, প্রতি বছর রাসূলে খোদা (সা.) হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে ক্বেরাত শোনাতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেছেন, সে বছর তিনি দুই বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে শুনিয়েছেন। ওই সময় যা কিছু রহিত হয়েছে এবং যা পরিবর্তন হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার সাক্ষী ছিলেন।'

এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক ক্বেরাত স্বয়ং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে রহিত করে দেওয়া হয়। হযরত আবু বাকরা (রা.) সমার্থবোধক শব্দের যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন, নিশ্চিত এর অধিকাংশই ওই সময় রহিত হয়ে গেছে। কেননা হযরত উসমান (রা.) আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন। এর মধ্যে সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্য খুবই শায বা বিরল।

টিকাঃ
২১২. কানযুল উম্মাল: ১/২৮৬ হাদীস নং ৪৮৪; আন-নশরু ফী কিরআতিল আশ্র: ১/৩২, হাফেয ইবনে হাযার (রহ.)-ও বিভিন্ন মুহাদ্দিসীনের বরাত দিয়ে এ বিষয়ে একাধিক রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। (ফাতহুল বারী: ৯/৩৬)

📘 উলুমুল কুরআন 📄 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও তাঁর মুসহাফ

📄 হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও তাঁর মুসহাফ


উপরোক্ত পর্যালোচনার উপর চতুর্থ প্রশ্ন এ হতে পারে যে, একাধিক রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সহীফাটিও আগুনে পোড়াননি। যদি হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত না করে থাকেন, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এ আপত্তির কারণটা কি ছিল?

এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে: প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দু'টি অভিযোগ ছিল। প্রথমটি হলো, পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার মহান কাজে তাঁকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো না? দ্বিতীয়টি হলো, অন্যান্য মাসহাফগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হলো কেন?

সুনানে তিরমিযীর এক বর্ণনায় ইমাম যুহরী (রহ.) প্রথম অভিযোগের আলোচনা করেছেন। যার সারাংশ হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এ অভিযোগ ছিল যে, কুরআন লিপিবদ্ধ করার মহান কাজ তাঁর দায়িত্বে কেন অর্পণ করা হলো না? যখন তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তুলনায় অধিক সময় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহচর্যে থেকে ধন্য হয়েছেন। হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এ অভিযোগটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর জবাব ছিল যে, তিনি এ মহান কাজটি পবিত্র মদীনায় আরম্ভ করেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন কুফায় অবস্থান করছিলেন। আর হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর অপেক্ষায় থেকে এ মহান কাজটিকে আর বিলম্বিত করতে চাচ্ছিলেন না। উপরন্তু তিনি হযরত আবু বাকরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উপরই এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। তাই হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সমীচীন মনে করলেন যে, কুরআনের সংকলন এবং বিন্যাসের এ কাজটিও তাঁদের হাতে সমাধা হোক।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল এই যে, হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নতুন মাসহাফ প্রস্তুত করার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর তিনি তাঁর মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে বুঝানোর জন্য তাঁর নিকট গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বললেন- والله لا ادفعه اليهم اقرانی رسول الله صلى الله عليه وسلم بضع وسبعين سورة ثم ادفعه اليهم والله لا ادفعه اليهم. 'অর্থাৎ আল্লাহর শপথ! আমি এই মাসহাফ তাঁর নিকট সোপর্দ করবো না। আমাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্তরের চেয়ে অধিক সূরা শিক্ষা দিয়েছেন। এরপরও আমি এই মাসহাফ তাঁকে দিয়ে দেব? মহান আল্লাহর শপথ! আমি এটা তাঁকে দেব না।'

যারা কুফায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর অনুকরণে ব্যক্তিগতভাবে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁদেরকেও এ উৎসাহ দিলেন যে, তারা যেন তাদের মাসহাফ সোপর্দ না করে। হযরত খুমাইর ইবনে মালিক (রহ.) বলেন- مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَغُلَّ مُصْحَفَهُ فَلْيَغُلَهُ فَإِنَّهُ مَنْ غَلَّ شَيْئًا جَاءَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ . ثُمَّ قَالَ: لَقَدْ قَرَأْتُ مِنْ فَمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعِينَ سُورَةً أَفَأَتْرُكُ مَا أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ ! 'অর্থাৎ মাসহাফগুলোর মাঝে পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলো। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) (মানুষকে) বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা নিজের মাসহাফকে লুকাতে সক্ষম হও, তারা লুকিয়ে রাখ। অতঃপর তিনি বললেন, আমি নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র যবান থেকে সত্তরটি সূরা শিখেছি। আমি কি ওই বিষয় ছেড়ে দেব, যা আমি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র জবান থেকে অর্জন করেছি।'

এখানে এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাসহাফটি উসমানী মাসহাফ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল এবং তিনি সেটাকে সংরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কোন বিষয়গুলো উসমানী মাসহাফ থেকে ভিন্নতর ছিল? সহীহ রেওয়ায়েতগুলোতে এর কোনো স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, তাঁর মাসহাফের মৌলিক পার্থক্য ছিল সূরার বিন্যাস। আর এ কথা আগেও বলা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যেসব সহীফায় কুরআন সংকলন করেছিলেন, সেগুলোতে সূরাগুলো পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ ছিল এবং সেগুলোতে কোনো বিন্যাস ছিল না। আর হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যে কুরআন সংকলন করেছিলেন, তাতে সূরাগুলো একটি বিশেষ বিন্যাস অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ইমাম হাকেম (রহ.) লিখেন- أنه جمع القرآن لم يكن مرة واحدة فقد جمع بعضه بحضرة رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم جمع بعضه بحضرة ابى بكر الصديق والجمع الثالث هو فى ترتيب السورة كان فى خلافة امير المؤمنين عثمان بن عفان رضى الله تعالى عنهم اجمعين. 'কুরআন সংকলনের কাজ একবারেই সমাপ্ত হয়নি। বরং পবিত্র কুরআনুল কারীমের কিছু অংশ স্বয়ং নবী কারীম (সা.)-এর উপস্থিতিতেই সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর যুগে আরো কিছু সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর কুরআন সংকলনের তৃতীয় পর্যায়ে সূরাগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। যা ছিল আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাদিয়াল্লাহু)-এর শাসনামলে।'

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাজিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাসহাফখানা হযরত উসমান (রাজিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাসহাফের সাথে বিন্যাসের দিক থেকে অনেকভাবে পার্থক্য ছিল। যেমন, এতে সূরা নিসা ছিল আগে আর সূরা আলে-ইমরান ছিল তার পরে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাজিয়াল্লাহু আনহু) সম্ভবত এই বিন্যাস অনুযায়ীই নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছ থেকে কুরআন শিখেছিলেন। তাই এই বিন্যাস অনুযায়ী কুরআনকে রাখাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনা দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। ইরাকের জনৈক অধিবাসী একদিন উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট আসলো এবং বললো- 'হে উম্মুল মু'মিনীন! আমাকে আপনার মাসহাফটি দেখান। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কেন? লোকটি বলল, আমি (আমার) কুরআনের মাসহাফটি এর অনুকরণে বিন্যস্ত করবো। কেননা তা (আমাদের এলাকায়) অবিন্যস্ত অবস্থায়ই পড়া হয়। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কুরআনে যে অংশই আগে তুমি পড় না কেন, তা তোমার জন্য কোনো অসুবিধা হবে না।'

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) লিখেন, এই ইরাকী ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাজিয়াল্লাহু আনহু)-এর ক্বেরাতের অনুসারী ছিলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যেহেতু নিজের মাসহাফে পরিবর্তন করেননি এবং তা বিলুপ্তও করেননি, তাই এর বিন্যাস উসমানী মাসহাফের বিন্যাসের চেয়ে ভিন্নতর ছিল। আর এ কথা তো স্পষ্ট যে, উসমানী মাসহাফের বিন্যাস অন্যান্য মাসহাফের বিন্যাসের তুলনায় অধিক সমীচীন ছিল। তাই এই ইরাকী লোকটি নিজের মাসহাফকে উসমানী মাসহাফের তুলনায় তারতিবের ভিন্নতা বলে আখ্যা দিয়েছেন।

এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু)-এর মাসহাফে মৌলিক কিছু পার্থক্য ছিল, সূরাগুলোর বিন্যাস। এ ছাড়া রুসমেখতের পার্থক্যও থাকতে পারে এবং এতে এমন রুসমেখত অবলম্বন করা হয়েছে, যার মধ্যে উসমানী মাসহাফের ন্যায় সকল ক্বেরাতের জন্য অবকাশ থাকে না। অন্যথায় যদি হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী বলা হয় যে, হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফের উপর পবিত্র কুরআন লিপিবদ্ধ করেছিলেন আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু)-এর মাসহাফ সেই পরিত্যক্ত হরফের কোনো একটির উপর লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, তাহলে নিম্নোক্ত অভিযোগগুলো আরোপিত হয়।

১. সহীহ বুখারীর উল্লিখিত হাদীসে জনৈকী ইরাকী ব্যক্তি শুধু সূরার বিন্যাসের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। নতুবা যদি হরফের পার্থক্যও হতো, তাহলে তা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হতো।
২. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও অন্যান্যদের বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যদি এ কথা সঠিক হয়, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু) ও হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু)-এর মাসহাফের মাঝে কোনো পার্থক্য না থাকাই উচিত ছিল। কারণ এ বক্তব্য অনুযায়ী হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু) সবাইকে কুরাইশী হরফের উপর সমবেত করে সে অনুযায়ী মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়ে ছিলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু)-ও কুরাইশী ছিলেন।
৩. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও তাঁর অনুসারীগণ ছয় হরফ বিলুপ্ত করার স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় দলীল হিসেবে اجماع الصحابة (সাহাবায়ে কেরামের ইজমা)কে পেশ করেছেন। কিন্তু যদি হযরত ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু) অন্য কোনো হরফের উপর পাঠ করে থাকেন এবং এর লিখনকেও জায়েয মনে করে থাকেন, তাহলে এই ইজমা বা ঐক্যমত সংঘটিত হলো কি করে? যে ইজমার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু)-এর ন্যায় বিজ্ঞ ফকীহ সাহাবী শামিল নেই। এটাকে ইজমা বলার যুক্তি কোথায়? কেউ কেউ এই দাবী করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর রায়কে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো রেওয়ায়েত পাওয়া যায় না।

হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) লিখেন- 'ইবনে আবী দাউদ (রহ.) "ইবনে মাসউদ (রা.)-এর পরবর্তীতে হযরত উসমানের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া" শিরোনামে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় লিখেছেন। তবে তিনি এই অধ্যায়ের অধীনে এমন কোনো সুস্পষ্ট রেওয়ায়েত উল্লেখ করতে পারেননি, যা এই শিরোনামের খাপ খায়।'

হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) সহ অন্যান্যদের বক্তব্যের উপর আরোপিত এ অভিযোগগুলোর কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। কাজেই এটাই বিশুদ্ধ কথা যে, হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বাকি রেখেছেন। আর হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল না যে, ছয় হরফকে কেন বিলুপ্ত করা হয়েছে? কারণ বাস্তবে এটা ঘটেই ছিল না। বরং তাঁর অভিযোগটা ছিল এই যে, যে মাসহাফগুলো আগে থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল এবং যেগুলোর বিন্যাস ও রুসমেখত উসমানী মাসহাফ অনুযায়ী ছিল না, সেগুলো সঠিক হওয়া সত্ত্বেও নষ্ট করা হচ্ছে কেন?

টিকাঃ
২১৪. ফাতহুল বারী : ৯/১৬
২১৫. মুসতাদরাক হাকেম: ২/২২৮, হাকেম (রহ.) বলেন, এটা সহীহ সনদবিশিষ্ট হাদীস। আল্লামা যাহাবী (রহ.) তা সত্যায়ন করেছেন।
২১৬. আল-ফাতহুর রব্বানী: ১৮/৩৫
২১৭. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৯
২১৮. আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ইবনে আশতা (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস নকল করেছেন। মাসহাফে উসমানীর সাথে যার প্রচুর গড়মিল রয়েছে। (আল- ইতকান : ১/৬৬)
২১৯. সহীহ বুখারী: কুরআন সংকলন অধ্যায়।
২২০. ফাতহুল বারী: ৯/৩২
২২১. ফাতহুল বারী: ৯/৪০

ফন্ট সাইজ
15px
17px