📘 উলুমুল কুরআন 📄 এ বক্তব্যের উপর আরোপিত সম্ভাব্য কিছু প্রশ্ন ও সেগুলোর জবাব

📄 এ বক্তব্যের উপর আরোপিত সম্ভাব্য কিছু প্রশ্ন ও সেগুলোর জবাব


প্রশ্ন : যদি হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোকেই অবশিষ্ট রাখেন, তাহলে তাঁর সেই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কীর্তি কোন্টি ছিল যার জন্য তাঁকে "জামিউল কুরআন” বা কুরআনের সংকলক বলা হয়?
এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে যে: যদিও অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণের পবিত্র কুরআনুল কারীম মুখস্থ ছিল, তথাপিও হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত পবিত্র কুরআনুল কারীমের মানদণ্ড মূলক কপি ছিল একটিই, যা হযরত আবু বকর (রা.) সংকলন করেছিলেন। তা আবার মাসহাফের আকৃতিতে ছিল না। বরং প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক সহীফায় লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সাহাবী ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ সহীফা পৃথক পৃথকভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এগুলোতে না ছিল রুসমেখতের মধ্যে কোনো মিল, সূরাগুলোর বিন্যাসের মধ্যে কোনো মিল আর না ছিল সাত হরফের মধ্যে কোনো সমন্বয়।
বরং প্রত্যেকেই রাসূলে আকরাম (সা.) থেকে যে হরফ অনুযায়ী কুরআন শিখেছিলেন, সেটাকেই নিজের মতো করে লিখে নিয়েছিলেন। বিধায় কোনো মাসহাফে একটি আয়াত এক হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল, পক্ষান্তরে অপর মাসহাফে অন্য কোনো হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল। যতদিন পর্যন্ত নববী যুগ নিকটবর্তী ছিল এবং মুসলমানদের সম্পর্ক ইসলামের মারকায বা পবিত্র মদীনার সাথে মজবুত সম্পর্ক ছিল, ততদিন পর্যন্ত মাসহাফ সমূহের এই মতানৈক্যের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি এ জন্য সাধিত হয়নি যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আসল ভিত্তিটা মাসহাফের পরিবর্তে মুখস্থ শক্তির উপর ছিল। আর অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামই এ ব্যাপারে ওয়াকিফহাল ছিলেন যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু যখন ইসলাম দূর-দূরান্তের রাষ্ট্রসমূহে ছড়িয়ে পড়ল এবং নতুন নতুন লোক ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল তখন তারা শুধু একটি পদ্ধতিতেই কুরআন শিখল। আর এ কথাটির প্রচার তাদের মাঝে ব্যাপকতা লাভ করেনি যে, কুরআন সাত হরফে নাযিল হয়েছে। তাদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হতে লাগল। কোনো কোনো ব্যক্তি নিজের ক্বেরাতকে সঠিক এবং অন্যদের ক্বেরাতকে ভুল মনে করতে লাগল। অপর দিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত মাসহাফগুলোও হরফ ও রসমেখতের দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের ছিল এবং সেগুলোতে সাত হরফকে একত্রিত করার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। এ কারণে এমন কোনো মানদণ্ড মূলক কপিও বিদ্যমান ছিল না, যার মাধ্যমে সেসব মতানৈক্যের নিরসন সম্ভব ছিল।

এমতাবস্থায় হযরত উসমান (রা.) অনুভব করলেন যে, যদি এ অবস্থা চলতে থাকে এবং ব্যক্তিগত মাসহাফগুলো বিলুপ্ত করে পবিত্র কুরআনুল কারীমের মানদণ্ড মূলক একটি কপি ইসলামী বিশ্বে প্রেরণ না করা হয়, তাহলে বিরাট ফেতনা মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাই তিনি নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেন:
১. পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাতটি মানদণ্ড মূলক কপি প্রস্তুত করান এবং সেগুলোকে বিভিন্ন শহরে প্রেরণ করেন।
২. ওই মাসহাফগুলোর রুসমেখত (লিখন পদ্ধতি) এমনভাবে রাখেন যাতে সাত হরফের সবগুলো এতে নিবিষ্ট হতে পারে। যেমন, এ মাসহাফগুলো নুকতা ও হরকতশূন্য ছিল। যেগুলোকে প্রত্যেক হরফের অনুকরণে পাঠ করা যেত।
৩. ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত প্রাপ্য সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে দাফন করে দেন।
৪. ভবিষ্যতে যত মাসহাফ লিপিবদ্ধ করা হবে, তা যাতে ওই সাত হরফের অনুকরণে হয়, এ আইন বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হলো।
৫. হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত সহীফাগুলোতে পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন আকারে সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত উসমান (রা.) সূরাগুলোকে বিন্যাস করে একই মাসহাফের আকৃতি দান করালেন।

এক্ষেত্রে হযরত উসমান (রা.)-এর সকল পদক্ষেপ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা ইসলামী বিশ্বে রুসমেখত ও সূরাগুলোর বিন্যাসের দিক থেকে সবগুলো মাসহাফ এক রকম হয়ে যায়। আর এগুলোতে সাত হরফ এমনভাবে একত্রিত হয়ে যায় যে, পরবর্তীতে কোনো ব্যক্তির জন্য কোনো ক্বেরাতকে অস্বীকার করার বা কোনো অশুদ্ধ ক্বেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি না থাকে। কখনো যদি কোনো ক্বেরাতের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দেয়, তাহলে মাসহাফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে যাতে অতি সহজেই তা নিরসন করা সম্ভব।

হযরত আলী (রা.)-এর একটি বক্তব্য দ্বারা এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যায়, যা ইমাম ইবনে আবী দাউদ (রহ.) কিতাবুল মাসাহিফ-এ বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন- قال على بن ابى طالب رضى الله عنه لا تقولوا فى عثمان الا خيرا فوالله ما فعل الذي فعل في المصاحف الا عن ملا منا فقال: ما تقولون في هذه القراءاة ؟ فقد بلغنى ان بعضهم يقول: إن قراءتي خير من قراءتك. وهذا يكاد أن يكون كفرا، قلنا: فما ترى؟ قال: أرى أن نجمع الناس على مصحف واحد فلا تكون فرقة، ولا يكون اختلاف. قلنا: فنعم ما رأيت 'অর্থাৎ হযরত আলী (রা.) বলেন, তোমরা হযরত উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে ভালো ব্যতীত কোনো সমালোচনা করো না। আল্লাহর শপথ! তিনি মাসহাফের ব্যাপারে যা কিছু করেছেন, তা আমাদের সকলের উপস্থিতিতেই করেছেন। তিনি আমাদের নিকট পরামর্শ চেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই ক্বেরাতের ব্যাপারে তোমাদের রায় কি? কারণ আমি জানতে পেরেছি যে কোনো কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে বলছে যে, “আমার ক্বেরাত তোমার ক্বেরাতের চেয়ে উত্তম।” অথচ এটা এমন কথা যা কুফরীর নিকট পৌঁছে যায়। তখন আমরা বললাম, এ ক্ষেত্রে আপনার রায় কি? তিনি বললেন, আমার রায় হচ্ছে, আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব। যাতে কোনো পার্থক্য ও মতানৈক্য বাকি না থাকে। আমরা বললাম, আপনি খুবই চমৎকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।'

এই হাদীসটি হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফ সংক্রান্ত কাজের ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি হাদীস। এতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, হযরত উসমান (রা.) "আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব” বলে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে, আমরা এমন একটি মাসহাফ প্রস্তুত করতে চাই, যা গোটা ইসলামী বিশ্বের জন্য এক ও অভিন্ন রকম হবে এবং এর মাধ্যমে পারস্পরিক মতানৈক্যের অবসান ঘটবে। এরপর কোনো বিশুদ্ধ ক্বেরাতকে অস্বীকার করার এবং রহিত বলার বা অপ্রচলিত ক্বেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ অবশিষ্ট থাকবে না।

অনুরূপ ইবনে আশতাহ (রহ.) হযরত আনাস (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেন- 'অর্থাৎ হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি শিশু ও শিক্ষকরা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত উসমান (রা.)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে থাকতেই (বিশুদ্ধ ক্বেরাতকে) অস্বীকার করছ এবং তাতে ভুল করছ! তাহলে যারা আমার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করছে, তারা তো আরো বেশি মিথ্যারোপ ও ভুল করতে থাকবে। সুতরাং হে মুহাম্মাদের সাথীবৃন্দ! তোমরা একত্রিত হও এবং মানুষের জন্য এমন একটি অনুলিপি প্রস্তুত কর, মানুষ যার অনুসরণ করতে পারে।'
এ বক্তব্য দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো হরফ বিলুপ্ত করা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর তো এ ব্যাপারে আক্ষেপ ছিল যে, কোনো কোনো লোক বিশুদ্ধ ক্বেরাতকে অস্বীকার করছে। আর কেউ কেউ অশুদ্ধ ক্বেরাতের চর্চার উপর জোর দিচ্ছে। তাই তিনি মানদণ্ড মূলক একটি কপি প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। যা গোটা ইসলাম জগতের জন্য এক ও অভিন্ন রকম হবে।

টিকাঃ
২০৬. "কিতাবুল মাসাহিফ" পৃ: ২২, ফাতহুল বারী: ৯/১৫ ইবনে আবী দাউদ (রহ.)
২০৭. আল-ইতকান: ১/৬১
২০৮. বহু উলামায়ে কেরাম হযরত উসমান (রা.)-এর এ পদক্ষেপের এই ব্যাখ্যাই করেছেন। দেখুন, আল্লামা ইবনে হাম (রহ.) রচিত "الفصل في الملل والأهواء والنحل" এর ২য় খণ্ডে ৭৭নং পৃষ্ঠা, মাওলানা আবদুল হক হক্কানী (রহ.) রচিত "আল-বয়ান ফী উলূমিল কুরআন" এর দ্বিতীয় অধ্যায় দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, পৃঃ ৬২ এবং মানাহিলুল ইরফান: ১/২৪৮-২৫৬।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য

📄 কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য


প্রকাশ থাকে যে, সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী যখন হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে কুরআনের মাসহাফ বিন্যাস দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের একটি দল নির্বাচন করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেছিলেন- إذ اختلفتم انتم وزيد بن ثابت فى شئ من القرآن فاكتبوه بلسان قريش فإنما نزل بلسانهم 'যখন তোমাদের এবং যায়েদ ইবনে সাবেতের মাঝে কুরআনের কোনো অংশে মতানৈক্য হবে তখন তোমরা সেটাকে কুরাইশের ভাষা অনুযায়ী লিখবে। কেননা কুরআন তাদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।'
হযরত উসমান (রা.) যদি সাত হরফের সবগুলোই অবশিষ্ট রাখতেন, তাহলে তাঁর এ নির্দেশের উদ্দেশ্য কি? এর জবাব হচ্ছে: প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রা.)-এর ওই বাক্য, যা দ্বারা হাফেয ইবনে জারীরসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বুঝে নিয়েছেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে মাসহাফে শুধু এক কুরাইশী হরফকে অবশিষ্ট রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যদি হযরত উসমান (রা.)-এর এ বাক্যটির উপর গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে এ কথা বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা এই উদ্দেশ্য নেওয়া সঠিক নয় যে, তিনি বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং সবগুলো রেওয়ায়েতের প্রতি সামগ্রিকভাবে তাকালে বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রুসমেখতের দিক থেকে কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তাহলে যেন কুরাইশী ভাষার রুসমেখত গ্রহণ করা হয়। এর প্রমাণ হলো, হযরত উসমান (রা.)-এর নির্দেশনার পর সাহাবায়ে কেরামের দলটি যখন পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন তখন সমগ্র কুরআনুল কারীমের শুধু একটি স্থানে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য হয়। ইমাম যুহরী (রহ.) এভাবে উল্লেখ করেছেন- فاختلفوا يومئذ في التابوت والتابوه فقال النفر القرشيون التابوت وقال زيد بن ثابت التابوة فرفع اختلافهم الى عثمان فقال: اكتبوه التابوت فإنه بلسان قریش نزل ‘অতঃপর التابوت এবং التابوه শব্দের মধ্যে এসে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হলো। কুরাইশী সাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটাকে (দীর্ঘ তা) দ্বারা লিখা হোক। আর যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বললেন, (গোল তা দ্বারা) التابوه লিখা হোক। পরে তাঁদের এই মতানৈক্য হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন التابوت লিখ। কেননা কুরআন কুরাইশী ভাষায় নাযিল হয়েছে।'
অতএব, এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত এবং কুরাইশী সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রুসমেখত-এর মতানৈক্য; ভাষাগত মতানৈক্য নয়।

টিকাঃ
২০৯. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী সহ]: ৯/১৬
২১০. কানযুল উম্মাল: ১/২৮২ হাদীস নং ৪৭৮৩

📘 উলুমুল কুরআন 📄 মুরাদিফ সমার্থকবোধক শব্দ দ্বারা তেলাওয়াতের মাসআলা

📄 মুরাদিফ সমার্থকবোধক শব্দ দ্বারা তেলাওয়াতের মাসআলা


প্রকাশ থাকে যে, হযরত আবু বাকরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সাত হরফের মতানৈক্যের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা দেখে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, এই সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। কেননা তিনি বলেন- فَقَالَ : يَا مُحَمَّدُ ، اقْرَأَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ ‘হযরত জিবরাঈল (আ.) (রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, হে মুহাম্মাদ কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) (রাসূল (সা.)-কে বললেন, এর সাথে আরও (হরফ) সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাত হরফ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল। হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, এর প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تَعَالَ (আস)-কে أَقْبِلْ هَلُمَّ إِسْرَعْ ও عَجِّلْ শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।'

এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, সাত হরফের মতানৈক্য মূলত সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যই ছিল। অর্থাৎ এক হরফের ভিত্তিতে কোনো এক শব্দকে গ্রহণ করা হয়েছে। আবার অন্য হরফের ভিত্তিতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য আরেকটি শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ মাসহাফে উসমানীর মধ্যে যেসব ক্বেরাত সংকলিত হয়েছে, সেগুলোর মাঝে সমার্থবোধকের এই মতানৈক্য খুবই স্বল্প। ওই ক্বেরাতগুলোর মাঝে অধিকাংশই হরকত (কারক চিহ্ন), সীগা (শব্দরূপ), পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এবং উচ্চারণের মতবিরোধ সংঘটিত হয়েছে।

জবাব : সাত হরফের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা যে বক্তব্যটি গ্রহণ করেছি, এতে ক্বেরাতগুলোর মাঝে সাত প্রকারের মতপার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে। ওই প্রকারগুলোর মাঝে একটি প্রকার হলো, 'বদল' তথা সমার্থবোধক শব্দের মাধ্যমে পরিবর্তন করে পড়ার মতানৈক্য। হযরত আবু বাকরা (রা.) এখানে সাত হরফের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। বরং এর একটি উদাহরণ দিয়েছেন মাত্র। তাই মতানৈক্যের একটি মাত্র প্রকার অর্থাৎ শব্দের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।

ক্বেরাতের বিভিন্নতার এই প্রকারটি অর্থাৎ শব্দের বিভিন্নতা ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনেক বেশি ছিল। যেহেতু গোটা আরববাসী কুরাইশী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। তাই শুরুতে তাদেরকে এ সহজতা বেশি থেকে বেশি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা নবী কারীম (সা.) থেকে শ্রবণকৃত পরিবর্তনশীল শব্দগুচ্ছ থেকে যে কোনো একটি শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করবে। তাই প্রথমে প্রথমে অধিকতর এমন ছিল যে, এক ক্বেরাতের মাঝে এক শব্দ এবং অন্য ক্বেরাতের মাঝে এর সমার্থবোধক অন্য শব্দ রয়েছে।

কিন্তু যখন মানুষ কুরআনের ভাষার সাথে পুরোপুরি পরিচিত হয়ে উঠল, তখন ক্বেরাতের বিভিন্নতার এই প্রকারকে ধীরে ধীরে হ্রাস করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাসূলে কারীম (সা.) যখন মৃত্যুর পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সর্বশেষ দাওর (عرضه اخيرة) করলেন, তখন এর মধ্যে এ ধরনের মতানৈক্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো।
হযরত উসমান (রা.) নিজের মাসহাফে সে সকল সমার্থবোধক শব্দ সংকলন করেননি, যা নবী কারীম (সা.)-এর আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ সেগুলোর অবস্থান ছিল তেলাওয়াত রহিত হওয়া আয়াতসমূহের ন্যায়। অবশ্য ক্বেরাতের যে মতানৈক্য আরযায়ে আখীরায় অবশিষ্ট ছিল, হযরত ওসমান (রা.) সেগুলোকে হুবহু বহাল রেখেছেন। অতএব, হযরত আবু বাকরা (রা.) হরফের বিভিন্নতার যে প্রকারটিকে উল্লিখিত হাদীসে উদাহরণ স্বরূপ পেশ করেছেন, তা ওই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত যার অধিকাংশ আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই তা মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি এবং বর্তমান ক্বেরাতগুলোও সেগুলোকে শামিল করেনি।

টিকাঃ
২১১. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)

📘 উলুমুল কুরআন 📄 উপরোল্লিখিত ফলাফলটি তিনটি ভূমিকা থেকে আহরিত হয়

📄 উপরোল্লিখিত ফলাফলটি তিনটি ভূমিকা থেকে আহরিত হয়


১. আরযায়ে আখীরা (হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কুরআনের শেষ দাওর)-এর সময় পবিত্র কুরআনুল কারীমের বহু ক্বেরাত রহিত করা হয়েছিল।
২. হযরত উসমান (রা.) মাসহাফে উসমানীকে আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন।
৩. হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফে সমার্থবোধক শব্দের ওই মতানৈক্য বিদ্যমান নেই যা হযরত আবু বাকরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন।

তৃতীয় ভূমিকাটি তো একেবারে স্পষ্ট। আর দ্বিতীয় ভূমিকার প্রমাণপঞ্জি আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। যার মধ্যে সর্বাধিক স্পষ্ট দলীল হচ্ছে হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর এই ইরশাদ যে, “হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমাদেরকে যে ক্বেরাতের উপর সমবেত করেছেন, তা ছিল আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।”

এখন বাকি থেকে যায় প্রথম ভূমিকাটি। আর তা হলো, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক ক্বেরাত রহিত হয়ে গিয়েছিল। এর প্রমাণ হচ্ছে মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এই ইরশাদ-
ولا شك ان القرآن نسخ منه وغير فيه فى العرضة الأخيرة فقد صح النص بذلك عن غير واحد من الصحابة وروينا باسناد صحيح عن زرابن حبيش قال قال لى ابن عباس أى القراءتين تقرا ؟ قلت الاخيرة قال فأن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعرض القرآن على جبريل عليه السلام كل عام مرة قال فعرض عليه القرآن فى العام الذي قبض فيه النبي صلى الله عليه وسلم مرتين فشهد عبد الله يعنى ابن مسعود ما نسخ منه و مابدل.
'অর্থাৎ এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আরযায়ে আখীরার সময় পবিত্র কুরআনুল কারীম থেকে অনেক কিছু রহিত হয়ে গেছে এবং এতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কেননা একাধিক সাহাবী থেকে এর স্পষ্টতা উদ্ধৃত রয়েছে। আমাদের কাছে সহীহ সনদসূত্রে হযরত যর ইবনে হুবাইশ (আ.)-এর এ বক্তব্য পৌঁছেছে যে, ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোন ক্বেরাত পাঠ কর? আমি বললাম, শেষ ক্বেরাত। তিনি বললেন, প্রতি বছর রাসূলে খোদা (সা.) হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে ক্বেরাত শোনাতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেছেন, সে বছর তিনি দুই বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে শুনিয়েছেন। ওই সময় যা কিছু রহিত হয়েছে এবং যা পরিবর্তন হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার সাক্ষী ছিলেন।'

এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক ক্বেরাত স্বয়ং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে রহিত করে দেওয়া হয়। হযরত আবু বাকরা (রা.) সমার্থবোধক শব্দের যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন, নিশ্চিত এর অধিকাংশই ওই সময় রহিত হয়ে গেছে। কেননা হযরত উসমান (রা.) আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন। এর মধ্যে সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্য খুবই শায বা বিরল।

টিকাঃ
২১২. কানযুল উম্মাল: ১/২৮৬ হাদীস নং ৪৮৪; আন-নশরু ফী কিরআতিল আশ্র: ১/৩২, হাফেয ইবনে হাযার (রহ.)-ও বিভিন্ন মুহাদ্দিসীনের বরাত দিয়ে এ বিষয়ে একাধিক রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। (ফাতহুল বারী: ৯/৩৬)

ফন্ট সাইজ
15px
17px