📄 এই মতামতের প্রবক্তা যারা
প্রকাশ থাকে যে, ইলমে ক্বেরাতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিখ্যাত ইমাম, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হাফেয ইবনে কাছীর (রহ.)-এর শাগরিদ এবং হাফেয ইবনে হাযার (রহ.)-এর উস্তাদ, হাফেয আবুল খায়ের মুহাম্মদ ইবনুল জাযারী (রহ.) (মৃত্যু : ৮৩৩ হিজরী) স্বীয় গ্রন্থ "আন-নশরু ফী কিরাতিল আশ্র"-এ লিখেন-
وأما كون المصاحف العثمانية مشتملة على جميع الأحرف السبعة ، فإن هذه مسألة كبيرة اختلف العلماء فيها : فذهب جماعات من الفقهاء والقراء والمتكلمين إلى أن المصاحف العثمانية مشتملة على جميع الأحرف السبعة ، وبنوا ذلك على أنه لا يجوز على الأمة أن تهمل نقل شيء من الحروف السبعة التي نزل القرآن بها ، وقد أجمع الصحابة على نقل المصاحف العثمانية من الصحف التي كتبها أبو بكر وعمر وإرسال كل مصحف منها إلى مصر من أمصار المسلمين وأجمعوا على ترك ما سوى ذلك . قال هؤلاء : ولا يجوز أن ينهى عن القراءة ببعض الأحرف السبعة ولا أن يجمعوا على ترك شيء من القرآن .
وذهب جماهير العلماء من السلف والخلف وأئمة المسلمين إلى أن هذه المصاحف العثمانية مشتملة على ما يحتمله رسمها من الأحرف السبعة فقط جامعة للعرضة الأخيرة التي عرضها النبي صلى الله عليه وسلم على جبرائيل عليه السلام متضمنة لها لم تترك حرفا.
(قلت) : وهذا القول هو الذي يظهر صوابه ; لأن الأحاديث الصحيحة والآثار المشهورة المستفيضة تدل عليه وتشهد له
'অর্থাৎ হযরত উসমান (রা.) যে মুসহাফ (পবিত্র কুরআনের কপি) প্রস্তুত করেছিলেন, তাতে সাত হরফ শামিল ছিল কি-না, তা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। উলামায়ে কেরাম এতে মতবিরোধ করেছেন। ফুকাহা, ক্বারী এবং কালাম শাস্ত্রবিদদের একটি দলের মতামত হলো, সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর মাঝে শামিল রয়েছে। এ কথার ভিত্তি এর উপর যে, উম্মতের জন্য এটা বৈধ নয় যে, তারা ওই সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটি হরফকে বর্ণনা করা ছেড়ে দিবে, যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছে। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বসম্মতিতে উসমানী মাসহাফকে ওই সকল সহীফা থেকেই সংকলন করেছিলেন, যা হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেগুলোর প্রত্যেকটি কপি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়েছিল এবং সেগুলো ব্যতীত যত সহীফা ছিল, সবগুলো পরিহার করার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছিলেন। তাঁরা বলেন, না সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটির ক্বেরাতকে পরিহার করা জায়েয হবে আর না সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়ার উপর ঐক্যমত পোষণ করবেন। আর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশের মত এটাই যে, মাসহাফে উসমানী ওই সকল হরফকে নিয়ে শামিল, যা এর রসমেখতের মাঝে সন্নিবেশিত হয়েছে। আর নবী কারীম (সা.) সর্বশেষ যখন হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে পবিত্র কুরআনুল কারীমের দাওর করেছিলেন, এর সমস্ত শব্দ এ মাসহাফে সন্নিবেশিত হয়ে গেছে। সেগুলোর কোনো হরফই সেই মাসহাফ থেকে বাদ পড়েনি। আমার ধারণা, এটাই সে বক্তব্য যার বিশুদ্ধতা সুস্পষ্ট। কেননা বিশুদ্ধ হাদীসগুলো এবং প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতগুলো এর বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে এবং এর সাক্ষ্য প্রদান করে।'
আল্লামা বদরুদ্দীন আল-আইনী (রহ.) বর্ণনা করেন-
واختلف الاصوليون هل يقرأ اليوم على سبعة أحرف فمنعه الطبرى و غيره و قال انما يجوز بحرف واحد اليوم وهو حرف زيد ونحى اليه القاضى ابوبكر. وقال ابو الحسن الاشعرى اجمع المسلمون على انه لا يجوز خطر ما وسعه الله تعالى من القراءة بالاحرف التي انزلها الله تعالى ولا يسوغ للامة ان تمنع ما يطلقه الله تعالى، بل هي موجود في قراءتنا مفرقة في القرآن غير معلومة فيجوز على هذا وبه قال القاضى ان يقرأن بكل ما نقله اهل التواتر من غير تمييز حرف من حرف فيحفظ حرف نافع بحرف الكسائي وحمزة ولا حرج في ذلك.
'অর্থাৎ বর্তমানে পবিত্র কুরআনুল কারীম সাত হরফের উপর পাঠ করা যাবে কিনা, এ ব্যাপারে উসূলী তথা নীতি নির্ধারক উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) ও কতক উলামায়ে কেরাম তা অস্বীকার করে বলেন, বর্তমানে শুধু এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করা জায়েয। আর তা হচ্ছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর হরফ। কাযী আবু বকর রাযী (রহ.) এ মতের দিকেই ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.) বলেন, মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যেসব হরফের উপর কুরআন অবতীর্ণ করে সহজ-সাধ্য করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই। আর মহান আল্লাহ তা'আলা যে জিনিসের অনুমতি প্রদান করেছেন, সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার উম্মতের অধিকার নেই। বরং বাস্তবতা তো হলো এই যে, সাত হরফের সবগুলোই আমাদের প্রচলিত ক্বেরাতের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে এবং পবিত্র কুরআনুল কারীমের মাঝে বিচ্ছিন্ন ও অনির্দিষ্টভাবে শামিল আছে। এ হিসেবে সে হরফগুলোর ক্বেরাত আজও জায়েয আছে। আর এটাই কাযী সাহেবের মত। যত হরফ তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত আছে সেগুলোর প্রত্যেকটিই পড়া জায়েয। নাফে (রহ.)-এর ক্বেরাতকে কেসাই এবং হামযা (রহ.)-এর ক্বেরাতের সাথে মিলিয়ে যদি আত্মস্থ করা হয়, তাতে কোনো অসুবিধা নেই।'
আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) কাযী আবু বকর (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন-
والسابع اختاره القاضي ابوبكر ، وقال : الصحيح ان هذه الاحرف السبعة ظهرت و استفاضت عن رسول الله صلى عليه وسلم وضبطها عنه الائمة واثبتها عثمان والصحابة في المصحف
'অর্থাৎ সপ্তম বক্তব্যটি কাযী আবু বকর গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাত হরফের সবগুলোই নবী কারীম (সা.) থেকে প্রসিদ্ধির সাথে বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে কেরাম এগুলোকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এগুলোকে তাঁদের মাসহাফে বিদ্যমান রেখেছেন।'
আল্লামা ইবনে হাম (রহ.) ও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার বক্তব্যটি একেবারেই ভুল। হযরত উসমান (রা.) যদি এমন করতেও চাইতেন তবুও সক্ষম হতেন না। কারণ মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে এ সাত হরফের হাফেযে ভরপুর ছিল। তিনি লিখেন-
وامأقول من قال ابطل الاحرف الستة فقد كذب من قال ذلك فعل عثمان ذلك اواراده الخرج عن الإسلام ولها مطل ساعة بل الاحرف السبعة كلها عندنا قائمة كما كانت مثبوتة في القرات المشهورة المأثورة
'অর্থাৎ আর যারা বলেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন, তারা একেবারেই ভুল বলেছেন। যদি হযরত উসমান (রা.) এমনটি করতেন বা এর ইচ্ছা করতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতেন। বরং বাস্তবতা হলো, সাত হরফের সবগুলোই অবিকল আমাদের নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং মাশহুর ক্বেরাতের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।'
মুয়াত্তা ইমাম মালেকে'র বিখ্যাত ভাষ্যকার, আল্লামা আবুল ওলীদ বাজি মালেকী (রহ.) (মৃত্যু ৪৯৪ হি.) “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা "সাত ক্বেরাত", দ্বারা করার পর লিখেন-
فان قيل هل تقولون ان جميع هذه السبعة الاحرف ثابتة في المصحف فأن القراءة بجميعها جائزة قيل لهم كذلك نقول والدليل على صحة ذلك قوله عز وجل { إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ } ، ولا يصح انفصال الذكر المنزل من قراءته فيمكن حفظه دونها وهما يدل على صحة ماذاهبنا اليه ان ظاهر قول النبي صلى الله عليه وسلم يدل على ان القرآن انزل على سبعة احرف تيسرا على من اراد قراءته ليقرأ كل رجل منهم بما تيسر عليه وبما هو اخف على طبعه واقرب الى لغته لما يلحق من المشقة بذلك المألوف من العادة في النطق ونحن اليوم مع عجمة السنتنا وبعدنا عن فصاحة العرب احوج.
'এখানে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, "আপনাদের বক্তব্য কি এ রকম যে, এই সাত হরফ কি আজও মাসহাফে বিদ্যমান আছে? তাইতো আপনাদের মত অনুযায়ী সবগুলোর ক্বেরাত জায়েয।" তখন আমরা বলব, হ্যাঁ আমাদের বক্তব্য এটাই। আর এটা বিশুদ্ধ হওয়ার দলীল হলো, মহান আল্লাহ তা'আলার বাণী {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} (নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষণকারী)। আর পবিত্র কুরআনুল কারীমাকে তার ক্বেরাত থেকে এভাবে পৃথক করা যাবে না যে, কুরআন তো সংরক্ষিত রয়েছে আর তার ক্বেরাত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের বক্তব্যের বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে আরো এটি দলীল হলো এই যে, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর হাদীস সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, পবিত্র কুরআনকে সাত হরফের উপর নাযিল করা হয়েছে, যাতে তেলাওয়াতকারীর জন্য সহজ হয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তি ওই পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে পারে যে পদ্ধতি তার জন্য সহজ হয়। তার স্বভাব-রুচির দিক থেকে অধিক সহজ হয় এবং ভাষার দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী হয়। কেননা, কথোপকথনের মধ্যে যা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, তা বর্জন করা খুবই কঠিন। বর্তমান যুগে আমরা অনারবী এবং আরবী ভাষার পাণ্ডিত্য থেকে দূরে থাকার কারণে এ সহজতার প্রতি আমরা অধিক মুখাপেক্ষী।'
ইমাম গাযালী (রহ.) তাঁর স্বীয় উসূলে ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-মুসতাসফা”-এ পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেন- ما نقل الينا بين دفتي المصحف على الاحرف السبعة المشهورة نقلا متواترا. 'অর্থাৎ মাসহাফের পার্শ্বদ্বয়ের মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ সাত হরফের উপর ধারাবাহিক সূত্র পরাম্পরায় যা আমাদের পর্যন্ত বর্ণিত হয়ে এসেছে (তাই কুরআন)।' এর দ্বারা পরিষ্কার স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইমাম গাযালী (রহ.) ও আজ পর্যন্ত সাত হরফ বাকি থাকার প্রবক্তা।
আর মোল্লা আলী কারী (রহ.) (মৃত্যু: ১০১৪) লিখেন- وكأنه عليه الصلوة والسلام كشف له ان القراءة المتواترة تستقر في امته على سبع وهي الموجودة الآن المتفق على تواترها والجمهور على ان ما فوقها شاذ لا يحل القراءة به 'অর্থাৎ এমনও মনে হয় যেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপর বিষয়টা উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল যে, তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত ক্বেরাতগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁর উম্মতের মাঝে সাত হরফের উপরই বাকি থেকে যাবে। আর তাইতো আজ এগুলোই বিদ্যমান আছে এবং সবাই এগুলোর তাওয়াতুরের ব্যাপারে একমত। জমহুর উলামায়ে কেরামের মত হলো, এগুলো ব্যতীত আর যত ক্বেরাত আছে তা (প্রায়) শায বা অপ্রচলিত এবং সেগুলোর তেলাওয়াত জায়েয নাই।'
হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি “সাত হরফ”-এর মাঝে 'সাত' সংখ্যাটি আধিক্যের অর্থের জন্য প্রয়োগ করেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-"হাদীসের মধ্যে 'সাত' শব্দটি সংখ্যাধিক্যের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝানোর জন্য নয়। 'দশ' ক্বেরাতের উপর আইম্মায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং দশ ক্বেরাতের প্রত্যেকটির জন্য দু'জন করে বর্ণনাকারী রয়েছেন। একজন অপর জনের সাথে মতবিরোধ করেন। ফলে ক্বেরাতের সংখ্যা বিশ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়।”
যাই হোক, শেষ জামানায় দ্বীনি ইলমের ইমাম, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক এবং হাফেযে হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষায় মাসআলাটির স্বরূপ এমনভাবে উন্মোচন করেছেন যে, এটাকে শেষ হরফ বলা উচিত। এখানে আমরা তাঁর পুরো তাহকীক ও গবেষণাটি হুবহু উপস্থাপন করছি-
واعلم انهم اتفقوا على انه ليس المراد من سبعة احرف القراءة السبعة المشهورة بأن يكون كل حرف منها قراءة من تلك القراءات. اعنى انه لا انطباق بين القراءات السبع والاحرف السبعة كما يذهب إليه الوهم بالنظر الى لفظ السبع فى الموضعين . بل بين تلك الاحرف والقراءة عموم وخصوص وجهي، كيف، وان القراءات لا تنحصر في السبعة. كما صرح ابن الجزري في رسالة النشر فى قراءة العشر. وانما اشتهرت السبعة على الالسنة لانها التي جمعها الشاطبي ثم اعلم ان بعضهم فهم ان بين تلك الاحرف تغايرا من كل وجه، بحيث لا ربط بينها وليس كذلك. بل قد يكون الفرق بالمجرد والمزيد واخرى الابواب، ومرة باعتبار الصيغ من الغائب والحاضر. وطورا بتحقيق الهمزة وتسهيلها فكل هذه التغييرات يسيرة كانت او كثيرة حرف براسه وغلط من فهم ان هذه الاحرف متغايرة كلها بحيث يتعذر اجتماعها اما انه كيف عدد السبعة فتوجه اليه ابن الجزري وحقق ان التصرفات كلها ترجع القسطلاني والذرقاني بقى الكلام في ان تلك الاحرف كلها موجودة اورفع بعضها وبقى البعض فأعلم ان ماقراه جبرئيل عليه السلام في العرضة الاخيرة على النبي صلى الله عليه وسلم كله ثابت في مصحف عثمان. ولما لم يتعين معنى الاحرف عند ابن جرير ذهب الى رفع الاحرف الست منها وبقى واحد فقط.
'অর্থাৎ জেনে রাখুন, সমস্ত উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, সাত হরফ দ্বারা প্রসিদ্ধ সাত ক্বেরাত উদ্দেশ্য নয় এবং এমনও নয় যে, প্রত্যেক হরফ ওই সাত ক্বেরাতের মধ্য হতে একটি ক্বেরাত। ফলকথা, সাত ক্বেরাত ও সাত হরফ এক কথা নয়। যা প্রথম দৃষ্টিতে সাত হরফ দ্বারা এমন ধারণা জন্ম নেয়। বরং সাত হরফ ও সাত ক্বেরাতের মাঝে عموم وخصوص من وجه এর সম্পর্ক। আর ক্বেরাত যখন সাত সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তখন উভয়টা এক হতে পারে কি করে? যেমন, আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) "আন্-নশরু ফী কিরাআতিল আশর" কিতাবে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে "সাত ক্বেরাত" শব্দটি মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করার কারণ হলো, আল্লামা শাত্বেরী (রহ.) এই সাত প্রকার ক্বেরাতকে গ্রন্থনা করেছেন। অতঃপর এ কথাটাও মনে রাখবেন যে, কোনো কোনো লোক মনে করে যে, সাত হরফের মাঝে পরস্পর সম্পূর্ণ “বিপরীতমুখী" সম্পর্ক, যে একটির সাথে অপরটির কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং কখনো কখনো দুই হরফের মাঝে একবচন ও বহুবচনের মধ্যে পার্থক্য হয়ে থাকে। আবার কখনো ব্যাকরণগত বিষয়ে। আবার কখনো গায়েব (নাম পুরুষ) ও হাযের (মধ্যম পুরুষ)-এর শব্দের পার্থক্য হয়ে থাকে। কখনো শুধু হামযাকে বাকি রাখার ও সেটাকে তাসহীল করার পার্থক্য হয়। ব্যস, এ সকল পরিবর্তন চাই সাধারণ হোক কিংবা বড় বড়, সবই স্বতন্ত্র একটি হরফ। আর যারা এ কথা মনে করেন যে, এ হরফগুলোর মাঝে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সম্পর্ক এবং এগুলোকে এক শব্দে একত্রিত করা সম্ভব নয়, তারা ভুল করেছেন। বাকি থাকল এ কথা যে, হাদীসে "সাত" সংখ্যাটি দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি তাহকীক বর্ণনা করেছেন যে, এ সমস্ত পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাত প্রকার। এ মাসআলায় 'কাসতালানী' (রহ.) ও 'যুরকানী' (রহ.)-(এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ) দেখে নিন। এখন বাকি থাকল শুধু এ কথা যে, এ সকল হরফ এখন আছে নাকি কিছু হরফ বিলুপ্ত করা হয়েছে আর কিছু হরফ অবশিষ্ট আছে? সুতরাং এটা জেনে নিন যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) পবিত্র কুরআনুল কারীমের عرضه اخيره সময় যতগুলো হরফ পাঠ করেছিলেন, তার সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বিদ্যমান রয়েছে। যেহেতু ইবনে জারীর (রহ.)-এর নিকট হরফের অর্থ সুস্পষ্ট নয় তাই তিনি এ মাযহাব গ্রহণ করেছেন যে, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করা হয়েছে আর এক হরফ অবশিষ্ট রয়েছে।'
অনুরূপভাবে মিসরের পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ গবেষক আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) [মৃত্যু ১৩৭১ হিজরী] লিখেন-
والاول رأى القائلين بأن الاحرف السبعة كانت في مبدأ الامر ثم نسخت العرضة الاخيرة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم فلم يبق الا حرف واحد ورأى القائلين بأن عثمان رضى الله عنه جمع الناس على حرف واحد ومنع من الستة الباقية لمصلحة، واليه نحا ابن جرير وهيبه ناس فتابعوه لكن هذا راى خطير قام ابن حزم بأشد النكير عليه في الفصل وفي الاحكام وله الحق في ذلك. والثانى راى القائلين بأن هي الاحرف السبعة المحفوظة كما هي في العرضة الاخيرة. الخ
'অর্থাৎ প্রথম মতটি (বর্তমান ক্বেরাত এক হরফেরই বিভিন্ন রূপ) সেসব মনীষীর, যারা বলেন- সাত হরফ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল। অতঃপর আরযায়ে আখীরার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই তা রহিত হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু একটিই অবশিষ্ট রয়েছে। এই মতটি সেসব ব্যক্তিদেরও যারা বলেন, হযরত উসমান (রা.) সমস্ত মানুষকে এক হরফের উপর একত্রিত করেছিলেন এবং বিশেষ কল্যাণার্থে বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেছিলেন। হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর মতও এটাই এবং এ ক্ষেত্রে বহু লোক তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়ে তাঁর পিছু ধরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা খুবই স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক রায়। আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) "আল-ফছল” এবং “আল-আহকাম”-এ এর কঠোরভাবে বিরোধিতা করেছেন, যা তাঁর অধিকার ছিল। দ্বিতীয় মত হচ্ছে (বর্তমান ক্বেরাতই সাত হরফ) সেসব ব্যক্তিদের, যারা বলেন- এগুলোই সেই সাত হরফ আরযায়ে আখীরা থেকে যা সংরক্ষিত হয়ে আসছে।'
টিকাঃ
১৮৬. আন্-নশরু ফী কিরাতিল আশ্র: ১/৩১
১৮৭. সম্ভবত এখানে কাযী ইয়াযকে বুঝানো হয়েছে।
১৮৮. উমদাতুল কারী [কিতাবুল খুসূমাত]: ১২/২৫৮, বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: আন্-নশরু ফী কিরাতিল আশর: ১/১৮-১৯।
১৮৯. সম্ভবত কাযী আবু বকর বাকিলানী (রহ.) উদ্দেশ্য। কারণ এই ইবারতই ইমাম নববী (রহ.) কাযী বাকিলানী (রহ.)-এর নামে উদ্ধৃত করেছেন।
১৯০. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন: ১/২২৩
১৯১. আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.)-এর এ উক্তি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন বলা হবে যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন (নাউযুবিল্লাহ)। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি মতে তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেননি। বরং সেগুলোর কেরাতকে বর্জন করেছেন মাত্র। তাই যদিও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি সঠিক, কিন্তু এত কঠোর ভাষার উপযোগী নন।
১৯২. আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল: ২/৭৭-৭৮
১৯৩. আল-মুনতাকা শরহে মুয়াত্তা: ১/৩৪৭
১৯৪. আল-মুসতাসফা: ১/৬৫
১৯৫. মিরকাতুল মাফাতীহ: ৫/১৬
১৯৬. আন্-নশরু ফী কিরাআতিল আশর: ১/৩৩
১৯৭. আল-মুসাফফা: পৃঃ ১৮৭
১৯৮. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাত ক্বেরাতের মধ্যে কোনো কোনো ক্বেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সমস্ত মুতাওয়াতির ক্বেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। আবার কোনো কোনো ক্বেরাত এমন আছে যা সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন, সাত কারীদের বিরল ক্বেরাতসমূহ অথবা মতানৈক্যমুক্ত ক্বেরাতসমূহ। আবার সাত হরফের কোনো কোনো মতভেদ এমন আছে যা সাত ক্বেরাতের মধ্যে শামিল নয়। যেমন, ইমাম ইয়াকুব (রহ.), ইমাম আবু যাফর (রহ.) ও খালাফ (রহ.)-এর মুতাওয়াতির ক্বেরাতসমূহ। এগুলো যদিও সাত হরফের মধ্য হতে; কিন্তু প্রসিদ্ধ সাত ক্বেরাতের মধ্য হতে নয়। মুহাম্মদ তাকী।
২০০. মাকালাতুল কাউসারী : পৃ: ২০-২১
২০১. মানাহিলুল ইরফান: ১/১৫১
📄 এ বক্তব্যের দলীলসমূহ
এখানে ঐ সকল দলীল উপস্থাপন করছি, যেগুলো দ্বারা এ বক্তব্যটি শক্তিশালী হবে অবশ্যই। এর কিছু দলীল তো উপরোক্ত বক্তব্যগুলোতে এসে গেছে। অতিরিক্ত কিছু দলীল নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
১. পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াত- { إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ } (অর্থাৎ নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি আর আমিই তার সংরক্ষণকারী)। সুস্পষ্টভাবে এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনের যে সকল আয়াত স্বয়ং আল্লাহ পাক রহিত করেননি সেগুলো কেয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। অপর দিকে সে সকল হাদীস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, কুরআনের সাত হরফ মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল। তাই উল্লিখিত আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফ কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকা।
২. আর হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফ দ্বারা কুরআন প্রস্তুত করে থাকেন, তাহলে স্পষ্ট করে কোথাও তার কোনো প্রমাণ অবশ্যই পাওয়া যাওয়া উচিত ছিল। অথচ এর কোনো প্রমাণ তো পাওয়া যায়ই না; বরং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে জানা যায় যে, মাসহাফে উসমানীর মাঝে সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। যেমন, রেওয়ায়েতে সুস্পষ্টভাবে এ কথা উল্লেখ আছে যে, হযরত উসমান (রা.) স্বীয় মাসহাফ হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফের অনুকরণে লিপিবদ্ধ করেছিলেন এবং লিপিবদ্ধ করার উভয় কপিকে মিলানোও হয়েছিল। এ ব্যাপারে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন- ( فعرضت المصحف عليها فلم يختلفا في شئ 'আমি ওই সহীফাগুলো দ্বারা মাসহাফকে মিলিয়ে দেখেছি, উভয়ের মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য (বেশ-কম) ছিল না। এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও স্বীকার করেন যে, হযরত আবু বকর (রা.)-এর জামানায় সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। তাই হযরত আবু বকর (রা.)-এর সহীফাগুলোতে নিশ্চিতভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমকে সাত হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্তই করে দিয়ে থাকেন তাহলে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর এ কথা কিভাবে সঠিক হতে পারে যে, "উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য বা কম-বেশি ছিল না।"?
৩. আল্লামা ইবনুল আম্বারী (রহ.) “কিতাবুল মাসাহিফ"-এ প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন- قراءتنا التى جمع الناس عثمان عليها هي العرضة الأخرى 'আমাদের ওই ক্বেরাত, যার উপর হযরত উসমান (রা.) মানুষকে একত্রিত করেছেন, সেটা ছিল "আরযায়ে আখীরা"-এর ক্বেরাত।'
হযরত উবায়দা (রহ.)-এর এ বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, আরযায়ে আখীরা (হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল (সা.)-এর কুরআনের শেষ দাওর)-এর সময় যে হরফগুলো বাকি ছিল, হযরত উসমান (রা.) ওই হরফের কোনোটিই ছাড়েননি।
৪. প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) থেকে আল্লামা ইবনে সা'দ (রহ.) এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন- كان جبريل يعرض القرآن على النبي صلى الله عليه وسلم كل عام مرة في رمضان فلما كان العام الذي توفى فيه عرضه عليه مرتين قال محمد فأنا أرجوان تكون قراءتنا العرضة الأخيرة 'অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রতি বছর একবার রমযান মাসে নবী কারীম (সা.)-এর সামনে কুরআন উপস্থাপন করতেন। যখন নবী কারীম (সা.)-এর ইন্তেকালের বছর উপনীত হলো, তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) দু'বার কুরআন উপস্থাপন করেছেন। (মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন,) আমি আশাবাদী যে, আমাদের বর্তমান ক্বেরাত ওই আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।'
৫. হযরত আমের শা'বী (রহ.) ছিলেন প্রসিদ্ধ একজন তাবেঈ। যিনি সাতশত সাহাবায়ে কেরাম থেকে ইলম ইস্তেফাদা অর্জন করেছেন। আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) তাঁর থেকে এ ধরনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। উল্লিখিত ব্যক্তিত্রয় ছিলেন তাবেঈ এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগের অত্যন্ত নিকটবর্তী ব্যক্তি। তাই এ ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মর্যাদা রাখে।
৬. সারকথা সমগ্র হাদীসের ভান্ডারে আমরা কোনো একটি রেওয়ায়েতও এমন পাইনি, যা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে দু'ধরনের মতানৈক্য ছিল। এক. সাত হরফের মতানৈক্য। দুই. ক্বেরাতের মতানৈক্য। এর পরিবর্তে বহু রেওয়ায়েত দ্বারা এ কথা জানা যায় যে, উভয়টি অভিন্ন বিষয়। কেননা, একই ধরনের মতানৈক্যের উপর একই সময়ে “ক্বেরাতের মতানৈক্য" ও "হরফের মতানৈক্য” শব্দ দু'টি প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) বলেন- 'একদা আমি মসজিদে ছিলাম। এক ব্যক্তি প্রবেশ করে নামায আদায় করতে লাগল। সে এমন এক ক্বেরাত পাঠ করল, যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হলো। অতঃপর অপর এক ব্যক্তি এসে মসজিদে প্রবেশ করল। সে প্রথম ব্যক্তির ক্বেরাত ব্যতীত অন্য এক ধরনের ক্বেরাত পাঠ করল। আমরা যখন নামায সমাপ্ত করলাম তখন সবাই মিলে নবী কারীম (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। আমি আরয করলাম যে, এ ব্যক্তি এমন এক ক্বেরাত পাঠ করেছে, যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় আরেক ব্যক্তি এসে প্রথম ব্যক্তির ক্বেরাতের চেয়ে ভিন্ন আরেক ধরনের ক্বেরাত পাঠ করল। তখন রাসূলে খোদা (সা.) উভয়কে পড়ার নির্দেশ দিলেন। তারা উভয়ে পাঠ করার পর নবী কারীম (সা.) উভয়ের ক্বেরাতকে সুন্দর হয়েছে বলে মন্তব্য করলেন। এতে আমার অন্তরে মিথ্যাচারিতার এমন এমন ওয়াসওয়াসা আসতে লাগল, জাহেলী যুগেও যা আমার খেয়ালে আসতো না। নবী কারীম (সা.) যখন আমার এ অবস্থা দেখলেন, তখন তিনি আমার বক্ষে (মৃদু) আঘাত করলেন। এতে আমি ঘামে স্নাত হয়ে গেলাম এবং ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় আমি এমন অনুভব করলাম, আমি যেন মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাকে দেখছি। এরপর তিনি আমাকে বললেন, হে উবাই! আমার পালনকর্তা আমার নিকট পয়গাম পাঠিয়েছেন যে, আমি কুরআনকে এক হরফে পাঠ করব। প্রতি উত্তরে আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। অতঃপর মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন দ্বিতীয় বারের জন্য পয়গাম পাঠালেন যে, আমি কুরআনকে দুই হরফের উপর পাঠ করব। এর উত্তরেও আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। তখন মহান আল্লাহ তা'আলা তৃতীয়বার পয়গাম পাঠালেন যে, আমি যেন এটাকে সাত হরফের উপর পাঠ করি।'
অপর এক রেওয়ায়েতে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) উভয় ব্যক্তির তেলাওয়াতের মতানৈক্যকে বারবার ক্বেরাতের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। আর এটাকেই রাসূলে আকরাম (সা.) সাত হরফের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নববী যুগে ক্বেরাতের মতানৈক্য ও হরফের মতানৈক্যকে এক ও অভিন্ন বিষয় বুঝা হতো। উপরন্তু এর বিপরীত এমন কোনো দলীল-প্রমাণ নেই, যা উভয়টার পৃথক হবার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, উভয়টা এক ও অভিন্ন বিষয়। আর ক্বেরাত যখন সংরক্ষিত হওয়ার বিষয়টি তাওয়াতুর ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত, তখন এর দ্বারা বুঝা যায় যে, সাত হরফও আজও সংরক্ষিত।
টিকাঃ
২০২. মুশকিলুল আছার: ৪/১৯৩
২০৩. কানযুল উম্মাল: ১ম খণ্ড, হাদীস নং ৪৮৪
২০৪. ইবনে সা'দ রচিত আত-তবকাতুল কুবরা: ২/১৯৫
২০৫. সহীহ মুসলিম: ১/২৭৩
📄 এ বক্তব্যের উপর আরোপিত সম্ভাব্য কিছু প্রশ্ন ও সেগুলোর জবাব
প্রশ্ন : যদি হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোকেই অবশিষ্ট রাখেন, তাহলে তাঁর সেই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কীর্তি কোন্টি ছিল যার জন্য তাঁকে "জামিউল কুরআন” বা কুরআনের সংকলক বলা হয়?
এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে যে: যদিও অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণের পবিত্র কুরআনুল কারীম মুখস্থ ছিল, তথাপিও হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত পবিত্র কুরআনুল কারীমের মানদণ্ড মূলক কপি ছিল একটিই, যা হযরত আবু বকর (রা.) সংকলন করেছিলেন। তা আবার মাসহাফের আকৃতিতে ছিল না। বরং প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক সহীফায় লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সাহাবী ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ সহীফা পৃথক পৃথকভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এগুলোতে না ছিল রুসমেখতের মধ্যে কোনো মিল, সূরাগুলোর বিন্যাসের মধ্যে কোনো মিল আর না ছিল সাত হরফের মধ্যে কোনো সমন্বয়।
বরং প্রত্যেকেই রাসূলে আকরাম (সা.) থেকে যে হরফ অনুযায়ী কুরআন শিখেছিলেন, সেটাকেই নিজের মতো করে লিখে নিয়েছিলেন। বিধায় কোনো মাসহাফে একটি আয়াত এক হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল, পক্ষান্তরে অপর মাসহাফে অন্য কোনো হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল। যতদিন পর্যন্ত নববী যুগ নিকটবর্তী ছিল এবং মুসলমানদের সম্পর্ক ইসলামের মারকায বা পবিত্র মদীনার সাথে মজবুত সম্পর্ক ছিল, ততদিন পর্যন্ত মাসহাফ সমূহের এই মতানৈক্যের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি এ জন্য সাধিত হয়নি যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আসল ভিত্তিটা মাসহাফের পরিবর্তে মুখস্থ শক্তির উপর ছিল। আর অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামই এ ব্যাপারে ওয়াকিফহাল ছিলেন যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু যখন ইসলাম দূর-দূরান্তের রাষ্ট্রসমূহে ছড়িয়ে পড়ল এবং নতুন নতুন লোক ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল তখন তারা শুধু একটি পদ্ধতিতেই কুরআন শিখল। আর এ কথাটির প্রচার তাদের মাঝে ব্যাপকতা লাভ করেনি যে, কুরআন সাত হরফে নাযিল হয়েছে। তাদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হতে লাগল। কোনো কোনো ব্যক্তি নিজের ক্বেরাতকে সঠিক এবং অন্যদের ক্বেরাতকে ভুল মনে করতে লাগল। অপর দিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত মাসহাফগুলোও হরফ ও রসমেখতের দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের ছিল এবং সেগুলোতে সাত হরফকে একত্রিত করার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। এ কারণে এমন কোনো মানদণ্ড মূলক কপিও বিদ্যমান ছিল না, যার মাধ্যমে সেসব মতানৈক্যের নিরসন সম্ভব ছিল।
এমতাবস্থায় হযরত উসমান (রা.) অনুভব করলেন যে, যদি এ অবস্থা চলতে থাকে এবং ব্যক্তিগত মাসহাফগুলো বিলুপ্ত করে পবিত্র কুরআনুল কারীমের মানদণ্ড মূলক একটি কপি ইসলামী বিশ্বে প্রেরণ না করা হয়, তাহলে বিরাট ফেতনা মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাই তিনি নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেন:
১. পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাতটি মানদণ্ড মূলক কপি প্রস্তুত করান এবং সেগুলোকে বিভিন্ন শহরে প্রেরণ করেন।
২. ওই মাসহাফগুলোর রুসমেখত (লিখন পদ্ধতি) এমনভাবে রাখেন যাতে সাত হরফের সবগুলো এতে নিবিষ্ট হতে পারে। যেমন, এ মাসহাফগুলো নুকতা ও হরকতশূন্য ছিল। যেগুলোকে প্রত্যেক হরফের অনুকরণে পাঠ করা যেত।
৩. ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত প্রাপ্য সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে দাফন করে দেন।
৪. ভবিষ্যতে যত মাসহাফ লিপিবদ্ধ করা হবে, তা যাতে ওই সাত হরফের অনুকরণে হয়, এ আইন বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হলো।
৫. হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত সহীফাগুলোতে পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন আকারে সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত উসমান (রা.) সূরাগুলোকে বিন্যাস করে একই মাসহাফের আকৃতি দান করালেন।
এক্ষেত্রে হযরত উসমান (রা.)-এর সকল পদক্ষেপ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা ইসলামী বিশ্বে রুসমেখত ও সূরাগুলোর বিন্যাসের দিক থেকে সবগুলো মাসহাফ এক রকম হয়ে যায়। আর এগুলোতে সাত হরফ এমনভাবে একত্রিত হয়ে যায় যে, পরবর্তীতে কোনো ব্যক্তির জন্য কোনো ক্বেরাতকে অস্বীকার করার বা কোনো অশুদ্ধ ক্বেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি না থাকে। কখনো যদি কোনো ক্বেরাতের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দেয়, তাহলে মাসহাফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে যাতে অতি সহজেই তা নিরসন করা সম্ভব।
হযরত আলী (রা.)-এর একটি বক্তব্য দ্বারা এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যায়, যা ইমাম ইবনে আবী দাউদ (রহ.) কিতাবুল মাসাহিফ-এ বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন- قال على بن ابى طالب رضى الله عنه لا تقولوا فى عثمان الا خيرا فوالله ما فعل الذي فعل في المصاحف الا عن ملا منا فقال: ما تقولون في هذه القراءاة ؟ فقد بلغنى ان بعضهم يقول: إن قراءتي خير من قراءتك. وهذا يكاد أن يكون كفرا، قلنا: فما ترى؟ قال: أرى أن نجمع الناس على مصحف واحد فلا تكون فرقة، ولا يكون اختلاف. قلنا: فنعم ما رأيت 'অর্থাৎ হযরত আলী (রা.) বলেন, তোমরা হযরত উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে ভালো ব্যতীত কোনো সমালোচনা করো না। আল্লাহর শপথ! তিনি মাসহাফের ব্যাপারে যা কিছু করেছেন, তা আমাদের সকলের উপস্থিতিতেই করেছেন। তিনি আমাদের নিকট পরামর্শ চেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই ক্বেরাতের ব্যাপারে তোমাদের রায় কি? কারণ আমি জানতে পেরেছি যে কোনো কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে বলছে যে, “আমার ক্বেরাত তোমার ক্বেরাতের চেয়ে উত্তম।” অথচ এটা এমন কথা যা কুফরীর নিকট পৌঁছে যায়। তখন আমরা বললাম, এ ক্ষেত্রে আপনার রায় কি? তিনি বললেন, আমার রায় হচ্ছে, আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব। যাতে কোনো পার্থক্য ও মতানৈক্য বাকি না থাকে। আমরা বললাম, আপনি খুবই চমৎকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।'
এই হাদীসটি হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফ সংক্রান্ত কাজের ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি হাদীস। এতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, হযরত উসমান (রা.) "আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব” বলে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে, আমরা এমন একটি মাসহাফ প্রস্তুত করতে চাই, যা গোটা ইসলামী বিশ্বের জন্য এক ও অভিন্ন রকম হবে এবং এর মাধ্যমে পারস্পরিক মতানৈক্যের অবসান ঘটবে। এরপর কোনো বিশুদ্ধ ক্বেরাতকে অস্বীকার করার এবং রহিত বলার বা অপ্রচলিত ক্বেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ অবশিষ্ট থাকবে না।
অনুরূপ ইবনে আশতাহ (রহ.) হযরত আনাস (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেন- 'অর্থাৎ হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি শিশু ও শিক্ষকরা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত উসমান (রা.)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে থাকতেই (বিশুদ্ধ ক্বেরাতকে) অস্বীকার করছ এবং তাতে ভুল করছ! তাহলে যারা আমার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করছে, তারা তো আরো বেশি মিথ্যারোপ ও ভুল করতে থাকবে। সুতরাং হে মুহাম্মাদের সাথীবৃন্দ! তোমরা একত্রিত হও এবং মানুষের জন্য এমন একটি অনুলিপি প্রস্তুত কর, মানুষ যার অনুসরণ করতে পারে।'
এ বক্তব্য দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো হরফ বিলুপ্ত করা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর তো এ ব্যাপারে আক্ষেপ ছিল যে, কোনো কোনো লোক বিশুদ্ধ ক্বেরাতকে অস্বীকার করছে। আর কেউ কেউ অশুদ্ধ ক্বেরাতের চর্চার উপর জোর দিচ্ছে। তাই তিনি মানদণ্ড মূলক একটি কপি প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। যা গোটা ইসলাম জগতের জন্য এক ও অভিন্ন রকম হবে।
টিকাঃ
২০৬. "কিতাবুল মাসাহিফ" পৃ: ২২, ফাতহুল বারী: ৯/১৫ ইবনে আবী দাউদ (রহ.)
২০৭. আল-ইতকান: ১/৬১
২০৮. বহু উলামায়ে কেরাম হযরত উসমান (রা.)-এর এ পদক্ষেপের এই ব্যাখ্যাই করেছেন। দেখুন, আল্লামা ইবনে হাম (রহ.) রচিত "الفصل في الملل والأهواء والنحل" এর ২য় খণ্ডে ৭৭নং পৃষ্ঠা, মাওলানা আবদুল হক হক্কানী (রহ.) রচিত "আল-বয়ান ফী উলূমিল কুরআন" এর দ্বিতীয় অধ্যায় দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, পৃঃ ৬২ এবং মানাহিলুল ইরফান: ১/২৪৮-২৫৬।
📄 কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য
প্রকাশ থাকে যে, সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী যখন হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে কুরআনের মাসহাফ বিন্যাস দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের একটি দল নির্বাচন করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেছিলেন- إذ اختلفتم انتم وزيد بن ثابت فى شئ من القرآن فاكتبوه بلسان قريش فإنما نزل بلسانهم 'যখন তোমাদের এবং যায়েদ ইবনে সাবেতের মাঝে কুরআনের কোনো অংশে মতানৈক্য হবে তখন তোমরা সেটাকে কুরাইশের ভাষা অনুযায়ী লিখবে। কেননা কুরআন তাদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।'
হযরত উসমান (রা.) যদি সাত হরফের সবগুলোই অবশিষ্ট রাখতেন, তাহলে তাঁর এ নির্দেশের উদ্দেশ্য কি? এর জবাব হচ্ছে: প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রা.)-এর ওই বাক্য, যা দ্বারা হাফেয ইবনে জারীরসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বুঝে নিয়েছেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে মাসহাফে শুধু এক কুরাইশী হরফকে অবশিষ্ট রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যদি হযরত উসমান (রা.)-এর এ বাক্যটির উপর গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে এ কথা বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা এই উদ্দেশ্য নেওয়া সঠিক নয় যে, তিনি বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং সবগুলো রেওয়ায়েতের প্রতি সামগ্রিকভাবে তাকালে বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রুসমেখতের দিক থেকে কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তাহলে যেন কুরাইশী ভাষার রুসমেখত গ্রহণ করা হয়। এর প্রমাণ হলো, হযরত উসমান (রা.)-এর নির্দেশনার পর সাহাবায়ে কেরামের দলটি যখন পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন তখন সমগ্র কুরআনুল কারীমের শুধু একটি স্থানে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য হয়। ইমাম যুহরী (রহ.) এভাবে উল্লেখ করেছেন- فاختلفوا يومئذ في التابوت والتابوه فقال النفر القرشيون التابوت وقال زيد بن ثابت التابوة فرفع اختلافهم الى عثمان فقال: اكتبوه التابوت فإنه بلسان قریش نزل ‘অতঃপর التابوت এবং التابوه শব্দের মধ্যে এসে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হলো। কুরাইশী সাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটাকে (দীর্ঘ তা) দ্বারা লিখা হোক। আর যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বললেন, (গোল তা দ্বারা) التابوه লিখা হোক। পরে তাঁদের এই মতানৈক্য হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন التابوت লিখ। কেননা কুরআন কুরাইশী ভাষায় নাযিল হয়েছে।'
অতএব, এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত এবং কুরাইশী সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রুসমেখত-এর মতানৈক্য; ভাষাগত মতানৈক্য নয়।
টিকাঃ
২০৯. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী সহ]: ৯/১৬
২১০. কানযুল উম্মাল: ১/২৮২ হাদীস নং ৪৭৮৩