📄 হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর চিন্তাধারা ও এর নিন্দনীয় খারাপী দিকগুলো
এখানে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) যেহেতু নিজের চিন্তা ও মতকে স্বীয় তাফসীর গ্রন্থের ভূমিকায় অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, তাই তাঁর এ বক্তব্য অত্যাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আজকাল সাত হরফের ব্যাখ্যা সাধারণত এর আলোকেই করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমগণ এ মতকে গ্রহণই করেননি; বরং অত্যন্ত কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ এ বক্তব্যে এমন কিছু সমস্যা দাঁড়ায়, যার কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় না।
এ মতের উপর সর্বপ্রথম তো ওই আপত্তি আরোপিত হয়, যার আলোচনা আমরা আগেই করে এসেছি যে, এতে "হরফ” এবং “ক্বেরাত” দু'টিকে পৃথক পৃথক বিষয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ কোনো হাদীস দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায় না।
২. দ্বিতীয় আপত্তি: এই হয় যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এক দিকে তো এটা মেনে নেন যে, সাত হরফের সবকটিই আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত। আবার অন্য দিকে বলেন, হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে বিলুপ্ত করে দেন! অথচ এ কথা মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই হরফগুলোকেই একে বারে বিলুপ্ত করার জন্য একমত হয়ে গেলেন, উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'আর জবাবে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যা নাযিল করেছিলেন!? অথচ সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা ঐক্যমত নিঃসন্দেহে দ্বীনের অকাট্য দলীল, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জন্য এটা সম্ভাব্য ব্যাপার বরে মনে হয় না যে, যে বিষয় কুরআন হওয়ার ব্যাপারটা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক পরম্পরায় সাব্যস্ত হয়েছে, তাঁরা সেটাকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার জন্য ঐক্যমত পোষণ করবেন!
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এই আপত্তির জবাব এভাবে দিয়েছেন যে, 'প্রকৃতপক্ষে উম্মতকে পবিত্র কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সাথে সাথে এ এখতেয়ারও দেওয়া হয়েছিল যে, তারা সাত হরফের যে কোনো একটিকে বেছে নিতে পারবে। তাইতো উম্মত সেই এখতেয়ার দ্বারা উপকৃত হয়ে সার্বজনীন কল্যাণার্থে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে পরিত্যাগ করেছেন, আর এক হরফের সংরক্ষণের উপর একমত হয়েছেন। এ পদক্ষেপ দ্বারা ওই হরফগুলোকে রহিত করা এবং সেগুলোর তেলাওয়াতকে হারাম করে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না। বরং উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের জন্য সার্বজনীন এক হরফকে নির্বাচন করা।'
কিন্তু এ জবাবটিও এ জন্য দুর্বল বলে মনে হয় যে, প্রকৃত অবস্থা যদি এটাই হয়ে থাকে তাহলে এটা কি সমীচীন ছিল না যে, উম্মত নিজেদের আমলের জন্য এক হরফকে বেছে নিত আর বাকি ছয় হরফকে চিরতরের জন্য বিলুপ্ত করার পরিবর্তে কোনো এক স্থানে তা সংরক্ষণ করে রাখতো? যেন সে হরফগুলোর অস্তিত্ব একেবারেই খতম হয়ে না যায়। পবিত্র কুরআনে কারীমে বর্ণিত রয়েছে- إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ 'নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক।'
যখন সাত হরফের সবগুলোই কুরআন ছিল তখন এই আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফও কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনো ব্যক্তি যদি এগুলোর তেলাওয়াতকে ছেড়েও দিতে চায়, তবু তা একেবারে বিলুপ্ত হতে পারে না। আল্লামা হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এর উপমা দিতে গিয়ে একটি মাসআলা পেশ করেছেন যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম মিথ্যা শপথের কাফফারা ক্ষেত্রে মানুষকে তিনটি এখতেয়ার দিয়েছে। চাইলে সে একজন দাসকে মুক্ত করতে পারবে, চাইলে দশজন মিসকীনকে আহার করাতে পারবে আর চাইলে দশজন মিসকীনকে বস্ত্র দিতে পারবে। এখন যদি উম্মত বাকি দু'টি প্রকারকে নাজায়েয না করে নিজেদের আমলের জন্য একটিকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে তা তার জন্য বৈধ। ঠিক তদ্রূপ উম্মত সাত হরফের মধ্য হতে একটি হরফকে সার্বজনীনভাবে বেছে নিয়েছে।
কিন্তু এই উপমা পেশ করা এ জন্য সঠিক নয় যে, উম্মত যদি শপথের কাফ্ফারার ক্ষেত্রে তিন প্রকারের যে কোনো একটি প্রকারকে এমনভাবে গ্রহণ করে যে, বাকি দু'টি প্রকারকে নাজায়েয তো বলে না; কিন্তু কার্যত সেগুলোর অস্তিত্ব একেবারেই বিলুপ্ত থেকে যায় এবং লোকদের কেবল এ টুকু জানা থাকে যে, শপথের কাফ্ফারার আরো দু'টি প্রকার ছিল যেগুলোর আমলকে উম্মত পরিহার করেছে। কিন্তু সে প্রকারগুলো কি ছিল? তা জানে এমন লোকও বাকি না থাকে, তাহলে অবশ্যই উম্মতের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
অতঃপর এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, বাকি ছয় হরফকে পরিহার করার কি প্রয়োজন দেখা দিল? হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) বলেছেন যে, এই হরফগুলোর মতানৈক্যের কারণে মুসলমানদের মাঝে প্রচণ্ড ঝগড়া বাঁধতো। এ জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণের পরামর্শে সকল হরফের মাঝে সমন্বয় সাধন করে সেটাকে এক হরফে রূপান্তরিত করাকে সমীচীন বলে মনে করলেন। কিন্তু এটাও এমন এক কথা যেটাকে মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল। হরফের বিভিন্নতার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের মতবিরোধ তো স্বয়ং নবী কারীম (সা.)-এর যুগেও ছিল। হাদীসের ভান্ডারে এ ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত আছে যে, এক সাহাবী অপর সাহাবীকে ভিন্নভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তাঁদের পরস্পরে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে যেত।
এমনকি সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত ওমর (রা.) তো হযরত হিশাম (রা.)-এর গলায় চাদর পেঁচিয়ে তাঁকে রাসূলে খোদা (সা.)-এর দরবারে নিয়ে এসেছিলেন। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) বলেন, হরফের এই মতবিরোধের কথা শোনে আমার অন্তরে অনেক বেশি সন্দেহ সৃষ্টি হতে লাগল। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নবী কারীম (সা.) সাত হরফকে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে সে হরফগুলোর অনুমোদনের ব্যাপারে সম্মতি জানালেন। আর এতে কোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটেনি। সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে এটা অসম্ভব যে, তাঁরা এই 'উসওয়ায়ে হাসানা' বা উত্তম আদর্শের উপর আমল করার পরিবর্তে ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
তারপর আশ্চর্যের কথা হলো, আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম মতবিরোধের ভয়ে ছয় হরফকে তো বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু ক্বেরাতগুলোকে (যা তাঁর বক্তব্য মতে হরফ থেকে আলাদা বিষয়) হুবহু বাকি রেখেছেন! যা আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিভিন্ন হরফের উপর কুরআন তেলাওয়াত জারী রাখার ক্ষেত্রে যে মতবিরোধ ও মতানৈক্যের আশঙ্কা ছিল, ক্বেরাতের বিভিন্নতার মাঝে কি সেই আশঙ্কাটা ছিল না? যখন ওই ক্বেরাতগুলোর আলোকে কখনো কখনো এক একটি হরফকে বিশটি পদ্ধতিতে পড়া যায়।
যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্য এটাই হয়ে থাকে যে, মুসলমানদের মাঝে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা হবে এবং সবাই এক পদ্ধতিতে কুরআন তেলাওয়াত করবে, তাহলে ক্বেরাতের বিভিন্নতাকে অবশেষে কেন বিলুপ্ত করা হলো না? যখন ক্বেরাতের মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের বিক্ষিপ্ততাকে বাধা দেওয়া যেত এবং মুসলমানদেরকে এটা বুঝানো যেত যে, এই সবগুলো পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করা জায়েয, তাহলে এই শিক্ষাটাই কেন সাত হরফের ক্ষেত্রে ফেতনার কারণরূপে উপলব্ধি হলো? প্রকৃত কথা হচ্ছে, হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.)-এর বক্তব্যে "সাত হরফ" এবং "ক্বেরাত”-এর ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এমন বিস্ময়কর দু'টি আমলী সম্বন্ধ করতে হয়, যার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ বুঝে আসে না।
উপরন্তু হযরত উসমান ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণের প্রতি এত বড় পদক্ষেপের সম্বন্ধ কোনো সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে নয়। বরং সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দের কেয়াসনির্ভর ব্যাখ্যার মাধ্যমে করা হয়েছে। যে সকল রেওয়ায়েতে হযরত উসমান-এর কুরআন সংকলনের কথা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে এ কথার উল্লেখ নেই যে, তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং এর বিপরীত অনেক দলীল বিদ্যমান রয়েছে, যেগুলোর বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে। এখন কোনো সুস্পষ্ট ও সহীহ রেওয়ায়েত ব্যতীত এ কথা কিভাবে বলা সম্ভব হতে পারে যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই ছয় হরফকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন, যা নবী কারীম (সা.)-এর বার বার আবেদনের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল?
আসল কথা হচ্ছে, যে সকল সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংকলন ও বিন্যাসের মহান কাজে শুধু এ জন্যই গবেষণা করেছেন যে, প্রিয় নবী কারীম (সা.) এ কাজ করে যাননি। যারা পবিত্র কুরআনুল কারীমের এক একটি শব্দ সংরক্ষণের জন্য নিজেদের পুরো জীবন ব্যয় করেছেন এবং যারা রহিত তেলাওয়াতের আয়াতগুলোও সংরক্ষণ করে উম্মতের নিকট পৌঁছিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে এ কাজ হওয়াটা খুবই দূরবর্তী ব্যাপার যে, তাঁরা সবাই ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার জন্য এভাবে একমত হয়ে যাবেন যে, আজ সেই হরফগুলোর কোনো নাম ও নিশানাও বাকি থাকবে না।
যে সকল আয়াতের তেলাওয়াত রহিত হয়ে গিয়েছিল, সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকেও কমপক্ষে ঐতিহাসিক ভিত্তিতে অবশিষ্ট রেখে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন। তাহলে কি সেই কারণ যে, ওই "হরফগুলো” যেগুলোর ব্যাপারে হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও স্বীকার করেছেন যে, তা রহিত হয়নি- বরং কোনো কল্যাণার্থে ক্বেরাত ও লিপিমালাকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো একটি উদাহরণ কোনো দুর্বল রেওয়ায়েতেও সংরক্ষিত হতে পারেনি!
এ কারণেই অধিকাংশ মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর এই ব্যক্তিগত বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
টিকাঃ
১৮০. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫
📄 ইমাম তহাবী (রহ.)-এর মতামত
সাত হরফের ব্যাপারে ইমাম তহাভী (রহ.) দ্বিতীয় মতটি গ্রহণ করেছেন। পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর মত অনুযায়ী পবিত্র কুরআনুল কারীম তো শুধু এক কুরাইশী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তবে উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য এ অনুমতি প্রদান করা হয়েছে যে, তারা পবিত্র কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত পর্যন্ত সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে পারবে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলোও স্বয়ং নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এই অনুমতি প্রদানকেই হাদীসে পবিত্র কুরআনুল কারীম "সাত হরফ” এর উপর নাযিল হয়েছে বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এই অনুমতি ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগে। পরবর্তীতে মানুষ যখন কুরআনের ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন স্বয়ং নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগেই সেই অনুমতি রহিত হয়ে গেল। মৃত্যুর পূর্বে যখন শেষ বারের মতো তিনি হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অনুশীলন করেন, তখন সমার্থবোধক শব্দগুলো রহিত হয়ে গেল। এখন শুধু সেই হরফগুলোই অবশিষ্ট রয়েছে, যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল। অর্থাৎ কুরাইশী হরফ। আর বাকি ছয় হরফ রহিত হয়ে গেছে।
আল্লামা হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যের তুলনায় এই বক্তব্যটি এ দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম যে, এতে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি রহিত করার সম্বন্ধ করা হয়নি যে, তাঁরা ছয় হরফকে রহিত করেছেন। বরং রহিত হবার সম্বন্ধ স্বয়ং নববী যুগের দিকে করা হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের উপরও একটি প্রশ্ন আরোপিত হয় যে, এই বক্তব্য অনুযায়ী ছয় হরফ মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও হযরত হিশাম (রা.)-এর মাঝে যে মতবিরোধ হয়েছিল, সে ক্ষেত্রে হযরত হিশাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে 'সূরা ফুরকান' নিজ পদ্ধতি অনুযায়ী পাঠ করলেন। রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা শুনে বললেন- هَكَذَا أُنْزِلَتْ (এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে)। এরপর হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও নিজের পদ্ধতি অনুযায়ী তেলাওয়াত করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা শুনেও বললেন- هَكَذَا أُنْزِلَتْ (অর্থাৎ এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে)। এই শব্দমালা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, উভয় পদ্ধতিটিই মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের তরফ থেকে নাযিলকৃত ছিল।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, যা পূর্বে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বক্তব্যেও ক্বেরাতের অবস্থানগত মর্যাদা ফুটে উঠেনি যে, তা সাত হরফের মধ্যে শামিল কি-না? যদি শামিল থাকে, তাহলে ছয় হরফের মতো এ ক্ষেত্রেও বলতে হবে যে, (নাঊযুবিল্লাহ) এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ এ কথা ইজমায়ে উম্মতের পরিপন্থী। আর যদি শামিল না থাকে তাহলে ক্বেরাতের পৃথক অস্তিত্বের উপর কোনো দলীল নেই। কাজেই এ বক্তব্যের উপরও আত্মপ্রশান্তি লাভ হয় না।
টিকাঃ
১৮৪. সহীহ বুখারী, কিতাবুল খুছুমাত- উমদাতুল কারী, পৃষ্ঠা: ২৫৮ খণ্ড ১২ মিশর।
১৮৫. সহীহ বুখারী, উমদাতুল কারী সহ: ১২/২৫৮
📄 সর্বোত্তম বক্তব্য
তৃতীয় বক্তব্য হলো সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণ করার মতো। আর তাহলো সাত হরফ দ্বারা যেহেতু ক্বেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে [যার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে), তাই এই সাত হরফ আজও পুরোপুরি সংরক্ষিত ও অবশিষ্ট আছে এবং এগুলোর তেলাওয়াতও করা হয়। অবশ্য এতটুকু পার্থক্য রয়েছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ক্বেরাতসমূহের বিভিন্নতার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি এবং তাতে সমার্থবোধক শব্দের আধিক্য ছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল, যারা কুরআনের ভাষায় তেলাওয়াত করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়নি, তাদেরকে বেশি থেকে বেশি সহজতার অবকাশ দেওয়া।
পরবর্তীতে যখন আরবের লোকেরা কুরআনের ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন সমার্থবোধক শব্দের বহু মতানৈক্য বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সর্বশেষ বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দাওর করেন (যাকে হাদীসে আরযায়ে আখীরা বলা হয়) সে সময় অনেক ক্বেরাতই রহিত করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যতগুলো ক্বেরাত সে সময় অবশিষ্ট ছিল, তার সবগুলোই আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে এবং এগুলোরই তেলাওয়াত করা হয়।
"সাত হরফ”-এর জটিল আলোচনার মধ্যে এটা সেই কণ্টকমুক্ত পথ যার উপর হাদীসের সবগুলো রেওয়ায়েত আপন আপন স্থানে সঠিক হয়ে যায়। এবং সেগুলোর মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধ বাকি থাকে না। আর না থাকে যুক্তিগ্রাহ্য কোনো আপত্তি।
📄 এই মতামতের প্রবক্তা যারা
প্রকাশ থাকে যে, ইলমে ক্বেরাতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিখ্যাত ইমাম, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হাফেয ইবনে কাছীর (রহ.)-এর শাগরিদ এবং হাফেয ইবনে হাযার (রহ.)-এর উস্তাদ, হাফেয আবুল খায়ের মুহাম্মদ ইবনুল জাযারী (রহ.) (মৃত্যু : ৮৩৩ হিজরী) স্বীয় গ্রন্থ "আন-নশরু ফী কিরাতিল আশ্র"-এ লিখেন-
وأما كون المصاحف العثمانية مشتملة على جميع الأحرف السبعة ، فإن هذه مسألة كبيرة اختلف العلماء فيها : فذهب جماعات من الفقهاء والقراء والمتكلمين إلى أن المصاحف العثمانية مشتملة على جميع الأحرف السبعة ، وبنوا ذلك على أنه لا يجوز على الأمة أن تهمل نقل شيء من الحروف السبعة التي نزل القرآن بها ، وقد أجمع الصحابة على نقل المصاحف العثمانية من الصحف التي كتبها أبو بكر وعمر وإرسال كل مصحف منها إلى مصر من أمصار المسلمين وأجمعوا على ترك ما سوى ذلك . قال هؤلاء : ولا يجوز أن ينهى عن القراءة ببعض الأحرف السبعة ولا أن يجمعوا على ترك شيء من القرآن .
وذهب جماهير العلماء من السلف والخلف وأئمة المسلمين إلى أن هذه المصاحف العثمانية مشتملة على ما يحتمله رسمها من الأحرف السبعة فقط جامعة للعرضة الأخيرة التي عرضها النبي صلى الله عليه وسلم على جبرائيل عليه السلام متضمنة لها لم تترك حرفا.
(قلت) : وهذا القول هو الذي يظهر صوابه ; لأن الأحاديث الصحيحة والآثار المشهورة المستفيضة تدل عليه وتشهد له
'অর্থাৎ হযরত উসমান (রা.) যে মুসহাফ (পবিত্র কুরআনের কপি) প্রস্তুত করেছিলেন, তাতে সাত হরফ শামিল ছিল কি-না, তা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। উলামায়ে কেরাম এতে মতবিরোধ করেছেন। ফুকাহা, ক্বারী এবং কালাম শাস্ত্রবিদদের একটি দলের মতামত হলো, সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর মাঝে শামিল রয়েছে। এ কথার ভিত্তি এর উপর যে, উম্মতের জন্য এটা বৈধ নয় যে, তারা ওই সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটি হরফকে বর্ণনা করা ছেড়ে দিবে, যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছে। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বসম্মতিতে উসমানী মাসহাফকে ওই সকল সহীফা থেকেই সংকলন করেছিলেন, যা হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেগুলোর প্রত্যেকটি কপি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়েছিল এবং সেগুলো ব্যতীত যত সহীফা ছিল, সবগুলো পরিহার করার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছিলেন। তাঁরা বলেন, না সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটির ক্বেরাতকে পরিহার করা জায়েয হবে আর না সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়ার উপর ঐক্যমত পোষণ করবেন। আর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশের মত এটাই যে, মাসহাফে উসমানী ওই সকল হরফকে নিয়ে শামিল, যা এর রসমেখতের মাঝে সন্নিবেশিত হয়েছে। আর নবী কারীম (সা.) সর্বশেষ যখন হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে পবিত্র কুরআনুল কারীমের দাওর করেছিলেন, এর সমস্ত শব্দ এ মাসহাফে সন্নিবেশিত হয়ে গেছে। সেগুলোর কোনো হরফই সেই মাসহাফ থেকে বাদ পড়েনি। আমার ধারণা, এটাই সে বক্তব্য যার বিশুদ্ধতা সুস্পষ্ট। কেননা বিশুদ্ধ হাদীসগুলো এবং প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতগুলো এর বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে এবং এর সাক্ষ্য প্রদান করে।'
আল্লামা বদরুদ্দীন আল-আইনী (রহ.) বর্ণনা করেন-
واختلف الاصوليون هل يقرأ اليوم على سبعة أحرف فمنعه الطبرى و غيره و قال انما يجوز بحرف واحد اليوم وهو حرف زيد ونحى اليه القاضى ابوبكر. وقال ابو الحسن الاشعرى اجمع المسلمون على انه لا يجوز خطر ما وسعه الله تعالى من القراءة بالاحرف التي انزلها الله تعالى ولا يسوغ للامة ان تمنع ما يطلقه الله تعالى، بل هي موجود في قراءتنا مفرقة في القرآن غير معلومة فيجوز على هذا وبه قال القاضى ان يقرأن بكل ما نقله اهل التواتر من غير تمييز حرف من حرف فيحفظ حرف نافع بحرف الكسائي وحمزة ولا حرج في ذلك.
'অর্থাৎ বর্তমানে পবিত্র কুরআনুল কারীম সাত হরফের উপর পাঠ করা যাবে কিনা, এ ব্যাপারে উসূলী তথা নীতি নির্ধারক উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) ও কতক উলামায়ে কেরাম তা অস্বীকার করে বলেন, বর্তমানে শুধু এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করা জায়েয। আর তা হচ্ছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর হরফ। কাযী আবু বকর রাযী (রহ.) এ মতের দিকেই ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.) বলেন, মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যেসব হরফের উপর কুরআন অবতীর্ণ করে সহজ-সাধ্য করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই। আর মহান আল্লাহ তা'আলা যে জিনিসের অনুমতি প্রদান করেছেন, সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার উম্মতের অধিকার নেই। বরং বাস্তবতা তো হলো এই যে, সাত হরফের সবগুলোই আমাদের প্রচলিত ক্বেরাতের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে এবং পবিত্র কুরআনুল কারীমের মাঝে বিচ্ছিন্ন ও অনির্দিষ্টভাবে শামিল আছে। এ হিসেবে সে হরফগুলোর ক্বেরাত আজও জায়েয আছে। আর এটাই কাযী সাহেবের মত। যত হরফ তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত আছে সেগুলোর প্রত্যেকটিই পড়া জায়েয। নাফে (রহ.)-এর ক্বেরাতকে কেসাই এবং হামযা (রহ.)-এর ক্বেরাতের সাথে মিলিয়ে যদি আত্মস্থ করা হয়, তাতে কোনো অসুবিধা নেই।'
আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) কাযী আবু বকর (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন-
والسابع اختاره القاضي ابوبكر ، وقال : الصحيح ان هذه الاحرف السبعة ظهرت و استفاضت عن رسول الله صلى عليه وسلم وضبطها عنه الائمة واثبتها عثمان والصحابة في المصحف
'অর্থাৎ সপ্তম বক্তব্যটি কাযী আবু বকর গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাত হরফের সবগুলোই নবী কারীম (সা.) থেকে প্রসিদ্ধির সাথে বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে কেরাম এগুলোকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এগুলোকে তাঁদের মাসহাফে বিদ্যমান রেখেছেন।'
আল্লামা ইবনে হাম (রহ.) ও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার বক্তব্যটি একেবারেই ভুল। হযরত উসমান (রা.) যদি এমন করতেও চাইতেন তবুও সক্ষম হতেন না। কারণ মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে এ সাত হরফের হাফেযে ভরপুর ছিল। তিনি লিখেন-
وامأقول من قال ابطل الاحرف الستة فقد كذب من قال ذلك فعل عثمان ذلك اواراده الخرج عن الإسلام ولها مطل ساعة بل الاحرف السبعة كلها عندنا قائمة كما كانت مثبوتة في القرات المشهورة المأثورة
'অর্থাৎ আর যারা বলেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন, তারা একেবারেই ভুল বলেছেন। যদি হযরত উসমান (রা.) এমনটি করতেন বা এর ইচ্ছা করতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতেন। বরং বাস্তবতা হলো, সাত হরফের সবগুলোই অবিকল আমাদের নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং মাশহুর ক্বেরাতের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।'
মুয়াত্তা ইমাম মালেকে'র বিখ্যাত ভাষ্যকার, আল্লামা আবুল ওলীদ বাজি মালেকী (রহ.) (মৃত্যু ৪৯৪ হি.) “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা "সাত ক্বেরাত", দ্বারা করার পর লিখেন-
فان قيل هل تقولون ان جميع هذه السبعة الاحرف ثابتة في المصحف فأن القراءة بجميعها جائزة قيل لهم كذلك نقول والدليل على صحة ذلك قوله عز وجل { إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ } ، ولا يصح انفصال الذكر المنزل من قراءته فيمكن حفظه دونها وهما يدل على صحة ماذاهبنا اليه ان ظاهر قول النبي صلى الله عليه وسلم يدل على ان القرآن انزل على سبعة احرف تيسرا على من اراد قراءته ليقرأ كل رجل منهم بما تيسر عليه وبما هو اخف على طبعه واقرب الى لغته لما يلحق من المشقة بذلك المألوف من العادة في النطق ونحن اليوم مع عجمة السنتنا وبعدنا عن فصاحة العرب احوج.
'এখানে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, "আপনাদের বক্তব্য কি এ রকম যে, এই সাত হরফ কি আজও মাসহাফে বিদ্যমান আছে? তাইতো আপনাদের মত অনুযায়ী সবগুলোর ক্বেরাত জায়েয।" তখন আমরা বলব, হ্যাঁ আমাদের বক্তব্য এটাই। আর এটা বিশুদ্ধ হওয়ার দলীল হলো, মহান আল্লাহ তা'আলার বাণী {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} (নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষণকারী)। আর পবিত্র কুরআনুল কারীমাকে তার ক্বেরাত থেকে এভাবে পৃথক করা যাবে না যে, কুরআন তো সংরক্ষিত রয়েছে আর তার ক্বেরাত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের বক্তব্যের বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে আরো এটি দলীল হলো এই যে, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর হাদীস সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, পবিত্র কুরআনকে সাত হরফের উপর নাযিল করা হয়েছে, যাতে তেলাওয়াতকারীর জন্য সহজ হয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তি ওই পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে পারে যে পদ্ধতি তার জন্য সহজ হয়। তার স্বভাব-রুচির দিক থেকে অধিক সহজ হয় এবং ভাষার দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী হয়। কেননা, কথোপকথনের মধ্যে যা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, তা বর্জন করা খুবই কঠিন। বর্তমান যুগে আমরা অনারবী এবং আরবী ভাষার পাণ্ডিত্য থেকে দূরে থাকার কারণে এ সহজতার প্রতি আমরা অধিক মুখাপেক্ষী।'
ইমাম গাযালী (রহ.) তাঁর স্বীয় উসূলে ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-মুসতাসফা”-এ পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেন- ما نقل الينا بين دفتي المصحف على الاحرف السبعة المشهورة نقلا متواترا. 'অর্থাৎ মাসহাফের পার্শ্বদ্বয়ের মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ সাত হরফের উপর ধারাবাহিক সূত্র পরাম্পরায় যা আমাদের পর্যন্ত বর্ণিত হয়ে এসেছে (তাই কুরআন)।' এর দ্বারা পরিষ্কার স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইমাম গাযালী (রহ.) ও আজ পর্যন্ত সাত হরফ বাকি থাকার প্রবক্তা।
আর মোল্লা আলী কারী (রহ.) (মৃত্যু: ১০১৪) লিখেন- وكأنه عليه الصلوة والسلام كشف له ان القراءة المتواترة تستقر في امته على سبع وهي الموجودة الآن المتفق على تواترها والجمهور على ان ما فوقها شاذ لا يحل القراءة به 'অর্থাৎ এমনও মনে হয় যেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপর বিষয়টা উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল যে, তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত ক্বেরাতগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁর উম্মতের মাঝে সাত হরফের উপরই বাকি থেকে যাবে। আর তাইতো আজ এগুলোই বিদ্যমান আছে এবং সবাই এগুলোর তাওয়াতুরের ব্যাপারে একমত। জমহুর উলামায়ে কেরামের মত হলো, এগুলো ব্যতীত আর যত ক্বেরাত আছে তা (প্রায়) শায বা অপ্রচলিত এবং সেগুলোর তেলাওয়াত জায়েয নাই।'
হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি “সাত হরফ”-এর মাঝে 'সাত' সংখ্যাটি আধিক্যের অর্থের জন্য প্রয়োগ করেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-"হাদীসের মধ্যে 'সাত' শব্দটি সংখ্যাধিক্যের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝানোর জন্য নয়। 'দশ' ক্বেরাতের উপর আইম্মায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং দশ ক্বেরাতের প্রত্যেকটির জন্য দু'জন করে বর্ণনাকারী রয়েছেন। একজন অপর জনের সাথে মতবিরোধ করেন। ফলে ক্বেরাতের সংখ্যা বিশ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়।”
যাই হোক, শেষ জামানায় দ্বীনি ইলমের ইমাম, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক এবং হাফেযে হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষায় মাসআলাটির স্বরূপ এমনভাবে উন্মোচন করেছেন যে, এটাকে শেষ হরফ বলা উচিত। এখানে আমরা তাঁর পুরো তাহকীক ও গবেষণাটি হুবহু উপস্থাপন করছি-
واعلم انهم اتفقوا على انه ليس المراد من سبعة احرف القراءة السبعة المشهورة بأن يكون كل حرف منها قراءة من تلك القراءات. اعنى انه لا انطباق بين القراءات السبع والاحرف السبعة كما يذهب إليه الوهم بالنظر الى لفظ السبع فى الموضعين . بل بين تلك الاحرف والقراءة عموم وخصوص وجهي، كيف، وان القراءات لا تنحصر في السبعة. كما صرح ابن الجزري في رسالة النشر فى قراءة العشر. وانما اشتهرت السبعة على الالسنة لانها التي جمعها الشاطبي ثم اعلم ان بعضهم فهم ان بين تلك الاحرف تغايرا من كل وجه، بحيث لا ربط بينها وليس كذلك. بل قد يكون الفرق بالمجرد والمزيد واخرى الابواب، ومرة باعتبار الصيغ من الغائب والحاضر. وطورا بتحقيق الهمزة وتسهيلها فكل هذه التغييرات يسيرة كانت او كثيرة حرف براسه وغلط من فهم ان هذه الاحرف متغايرة كلها بحيث يتعذر اجتماعها اما انه كيف عدد السبعة فتوجه اليه ابن الجزري وحقق ان التصرفات كلها ترجع القسطلاني والذرقاني بقى الكلام في ان تلك الاحرف كلها موجودة اورفع بعضها وبقى البعض فأعلم ان ماقراه جبرئيل عليه السلام في العرضة الاخيرة على النبي صلى الله عليه وسلم كله ثابت في مصحف عثمان. ولما لم يتعين معنى الاحرف عند ابن جرير ذهب الى رفع الاحرف الست منها وبقى واحد فقط.
'অর্থাৎ জেনে রাখুন, সমস্ত উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, সাত হরফ দ্বারা প্রসিদ্ধ সাত ক্বেরাত উদ্দেশ্য নয় এবং এমনও নয় যে, প্রত্যেক হরফ ওই সাত ক্বেরাতের মধ্য হতে একটি ক্বেরাত। ফলকথা, সাত ক্বেরাত ও সাত হরফ এক কথা নয়। যা প্রথম দৃষ্টিতে সাত হরফ দ্বারা এমন ধারণা জন্ম নেয়। বরং সাত হরফ ও সাত ক্বেরাতের মাঝে عموم وخصوص من وجه এর সম্পর্ক। আর ক্বেরাত যখন সাত সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তখন উভয়টা এক হতে পারে কি করে? যেমন, আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) "আন্-নশরু ফী কিরাআতিল আশর" কিতাবে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে "সাত ক্বেরাত" শব্দটি মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করার কারণ হলো, আল্লামা শাত্বেরী (রহ.) এই সাত প্রকার ক্বেরাতকে গ্রন্থনা করেছেন। অতঃপর এ কথাটাও মনে রাখবেন যে, কোনো কোনো লোক মনে করে যে, সাত হরফের মাঝে পরস্পর সম্পূর্ণ “বিপরীতমুখী" সম্পর্ক, যে একটির সাথে অপরটির কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং কখনো কখনো দুই হরফের মাঝে একবচন ও বহুবচনের মধ্যে পার্থক্য হয়ে থাকে। আবার কখনো ব্যাকরণগত বিষয়ে। আবার কখনো গায়েব (নাম পুরুষ) ও হাযের (মধ্যম পুরুষ)-এর শব্দের পার্থক্য হয়ে থাকে। কখনো শুধু হামযাকে বাকি রাখার ও সেটাকে তাসহীল করার পার্থক্য হয়। ব্যস, এ সকল পরিবর্তন চাই সাধারণ হোক কিংবা বড় বড়, সবই স্বতন্ত্র একটি হরফ। আর যারা এ কথা মনে করেন যে, এ হরফগুলোর মাঝে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সম্পর্ক এবং এগুলোকে এক শব্দে একত্রিত করা সম্ভব নয়, তারা ভুল করেছেন। বাকি থাকল এ কথা যে, হাদীসে "সাত" সংখ্যাটি দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি তাহকীক বর্ণনা করেছেন যে, এ সমস্ত পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাত প্রকার। এ মাসআলায় 'কাসতালানী' (রহ.) ও 'যুরকানী' (রহ.)-(এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ) দেখে নিন। এখন বাকি থাকল শুধু এ কথা যে, এ সকল হরফ এখন আছে নাকি কিছু হরফ বিলুপ্ত করা হয়েছে আর কিছু হরফ অবশিষ্ট আছে? সুতরাং এটা জেনে নিন যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) পবিত্র কুরআনুল কারীমের عرضه اخيره সময় যতগুলো হরফ পাঠ করেছিলেন, তার সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বিদ্যমান রয়েছে। যেহেতু ইবনে জারীর (রহ.)-এর নিকট হরফের অর্থ সুস্পষ্ট নয় তাই তিনি এ মাযহাব গ্রহণ করেছেন যে, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করা হয়েছে আর এক হরফ অবশিষ্ট রয়েছে।'
অনুরূপভাবে মিসরের পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ গবেষক আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) [মৃত্যু ১৩৭১ হিজরী] লিখেন-
والاول رأى القائلين بأن الاحرف السبعة كانت في مبدأ الامر ثم نسخت العرضة الاخيرة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم فلم يبق الا حرف واحد ورأى القائلين بأن عثمان رضى الله عنه جمع الناس على حرف واحد ومنع من الستة الباقية لمصلحة، واليه نحا ابن جرير وهيبه ناس فتابعوه لكن هذا راى خطير قام ابن حزم بأشد النكير عليه في الفصل وفي الاحكام وله الحق في ذلك. والثانى راى القائلين بأن هي الاحرف السبعة المحفوظة كما هي في العرضة الاخيرة. الخ
'অর্থাৎ প্রথম মতটি (বর্তমান ক্বেরাত এক হরফেরই বিভিন্ন রূপ) সেসব মনীষীর, যারা বলেন- সাত হরফ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল। অতঃপর আরযায়ে আখীরার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই তা রহিত হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু একটিই অবশিষ্ট রয়েছে। এই মতটি সেসব ব্যক্তিদেরও যারা বলেন, হযরত উসমান (রা.) সমস্ত মানুষকে এক হরফের উপর একত্রিত করেছিলেন এবং বিশেষ কল্যাণার্থে বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেছিলেন। হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর মতও এটাই এবং এ ক্ষেত্রে বহু লোক তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়ে তাঁর পিছু ধরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা খুবই স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক রায়। আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) "আল-ফছল” এবং “আল-আহকাম”-এ এর কঠোরভাবে বিরোধিতা করেছেন, যা তাঁর অধিকার ছিল। দ্বিতীয় মত হচ্ছে (বর্তমান ক্বেরাতই সাত হরফ) সেসব ব্যক্তিদের, যারা বলেন- এগুলোই সেই সাত হরফ আরযায়ে আখীরা থেকে যা সংরক্ষিত হয়ে আসছে।'
টিকাঃ
১৮৬. আন্-নশরু ফী কিরাতিল আশ্র: ১/৩১
১৮৭. সম্ভবত এখানে কাযী ইয়াযকে বুঝানো হয়েছে।
১৮৮. উমদাতুল কারী [কিতাবুল খুসূমাত]: ১২/২৫৮, বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: আন্-নশরু ফী কিরাতিল আশর: ১/১৮-১৯।
১৮৯. সম্ভবত কাযী আবু বকর বাকিলানী (রহ.) উদ্দেশ্য। কারণ এই ইবারতই ইমাম নববী (রহ.) কাযী বাকিলানী (রহ.)-এর নামে উদ্ধৃত করেছেন।
১৯০. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন: ১/২২৩
১৯১. আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.)-এর এ উক্তি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন বলা হবে যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন (নাউযুবিল্লাহ)। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি মতে তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেননি। বরং সেগুলোর কেরাতকে বর্জন করেছেন মাত্র। তাই যদিও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি সঠিক, কিন্তু এত কঠোর ভাষার উপযোগী নন।
১৯২. আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল: ২/৭৭-৭৮
১৯৩. আল-মুনতাকা শরহে মুয়াত্তা: ১/৩৪৭
১৯৪. আল-মুসতাসফা: ১/৬৫
১৯৫. মিরকাতুল মাফাতীহ: ৫/১৬
১৯৬. আন্-নশরু ফী কিরাআতিল আশর: ১/৩৩
১৯৭. আল-মুসাফফা: পৃঃ ১৮৭
১৯৮. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাত ক্বেরাতের মধ্যে কোনো কোনো ক্বেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সমস্ত মুতাওয়াতির ক্বেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। আবার কোনো কোনো ক্বেরাত এমন আছে যা সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন, সাত কারীদের বিরল ক্বেরাতসমূহ অথবা মতানৈক্যমুক্ত ক্বেরাতসমূহ। আবার সাত হরফের কোনো কোনো মতভেদ এমন আছে যা সাত ক্বেরাতের মধ্যে শামিল নয়। যেমন, ইমাম ইয়াকুব (রহ.), ইমাম আবু যাফর (রহ.) ও খালাফ (রহ.)-এর মুতাওয়াতির ক্বেরাতসমূহ। এগুলো যদিও সাত হরফের মধ্য হতে; কিন্তু প্রসিদ্ধ সাত ক্বেরাতের মধ্য হতে নয়। মুহাম্মদ তাকী।
২০০. মাকালাতুল কাউসারী : পৃ: ২০-২১
২০১. মানাহিলুল ইরফান: ১/১৫১