📄 প্রথম অভিযোগ
প্রথম অভিযোগ : এর উপর প্রথম অভিযোগ করা হয়েছে যে, এ বক্তব্যে মতানৈক্য ও বিভিন্নতার যতগুলো প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে তার বেশির ভাগই "সরফী" এবং "নাহভী" (শব্দ-প্রকরণ ও বাক্য-প্রকরণ)-এর প্রকারভেদের উপর ভিত্তিশীল। অথচ প্রিয় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই হাদীস বর্ণনা করেছেন তখন সরফ-নাহুর এই বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা ও প্রকারভেদ প্রচলিত ছিল না। ওই সময় অধিকাংশ মানুষ লেখা-পড়াও জানত না। এমতাবস্থায় বিভিন্নতার এই প্রকারগুলোকে "সাত হরফ" হিসেবে ধরে নেওয়াটা মুশকিল বলে মনে হয়।
হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই আপত্তি উদ্ধৃত করার পর এর জবাব দিয়েছেন এভাবে- وَلَا يَلْزَمُ مِنْ ذَلِكَ تَوْهِينُ مَا ذَهَبَ إِلَيْهِ ابْنُ قُتَيْبَةَ لِاحْتِمَالِ أَنْ يَكُونَ الِانْحِصَارُ الْمَذْكُورُ فِي ذَلِكَ وَقَعَ اتِّفَاقًا وَإِنَّمَا اطُّلِعَ عَلَيْهِ بِالِاسْتِقْرَاءِ وَفِي ذَلِكَ مِنَ الْحِكْمَةِ الْبَالِغَةِ مَا لَا يَخْفَى 'অর্থাৎ এর দ্বারা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যের দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়াটা অপরিহার্য নয়। কেননা হতে পারে এটা কোনো ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে। আর অনুসন্ধানের মাধ্যমে এর পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। আর এর মাঝে যে পরিপূর্ণ হেকমত লুকায়িত আছে তা গোপন নয়।'
আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞান অনুযায়ী এই জবাবের সারাংশ হচ্ছে, এ কথাটি ঠিক যে, নববী যুগে এই পরিভাষাগুলো প্রচলিত ছিল না। আর হয়তো এ কারণেই রাসূলে কারীম (সা.)-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেননি। তবে এটা তো পরিষ্কার যে, এই বৈষয়িক পরিভাষাগুলো যে ভাবার্থ থেকে আহরিত, সেই ভাবার্থ তো ওই যুগেও বিদ্যমান ছিল। আর যদি রাসূলে আকরাম (সা.) সেসব ভাবার্থের প্রতি লক্ষ্য করে বিভিন্নতার প্রকারসমূহকে "সাত”-এর মাঝে সীমাবদ্ধ করেন তাতে আশ্চর্যের কি আছে? হ্যাঁ, ওই যুগে যদি বিভিন্নতার সাত প্রকার বিস্তারিত বর্ণনা করা হতো তাহলে হয়তো তা সাধারণ মানুষের উপলব্ধি ঊর্ধ্বে হয়ে যেত। তাই রাসূলে খোদা (সা.) তখন বিস্তারিত বর্ণনা না করে শুধু এতটুকু বলেছেন যে, বিভিন্নতার এ প্রকারগুলো সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে যখন এ পরিভাষাগুলো প্রচলিত হয়ে গেল তখন উলামায়ে কেরাম পরিপূর্ণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিভিন্নতার এ প্রকারগুলোকে পারিভাষিক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করেছেন। আর এটা আমরা আগেই বলেছি, বিশেষ কোনো ব্যক্তির অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলা মুশকিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু যখন বিভিন্ন লোকের অনুসন্ধান এটা প্রমাণ করে যে, বিভিন্নতার প্রকার মোট সাত প্রকার, তখন এ কথা নিশ্চয়তার নিকটবর্তী হয়ে যায় যে, "সাত হরফ" দ্বারা রাসূলে আকরাম (সা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল "বিভিন্নতার সাত প্রকার।” চাই এর বিস্তারিত বর্ণনা ওই রকম না হোক, যা পরবর্তীতে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে যখন "সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যুক্তিগ্রাহ্য অন্য কোনো প্রকার পাওয়া না যায়।
টিকাঃ
১৭৬. ফাতহুল বারী: ৯/২৪
📄 দ্বিতীয় অভিযোগ
দ্বিতীয় অভিযোগ : এই প্রধান্য (অগ্রাধিকার প্রাপ্ত) বক্তব্যের প্রতি দ্বিতীয় অভিযোগ এ হতে পারে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম তো সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে উম্মত যাতে সহজ-সাধ্যভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। আর এই সহজতা আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুসারে তো বোধগম্য হয়। কেননা আরবে বিভিন্ন গোত্রের লোক ছিল। আর এক গোত্রের জন্য অন্য গোত্রের ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত ছিল অত্যন্ত মুশকিল। কিন্তু ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম রাযী (রহ.) এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ তো শুধু কুরাইশী ভাষার সাথেই সম্পৃক্ত। এতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় না যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম যখন এক ভাষাতেই নাযিল করা উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে এতে ক্বেরাতের বিভিন্নতা অবশিষ্ট রাখার প্রয়োজনটা কি ছিল?
📄 সাত হরফ দ্বারা কি সহজবোধ্যতা তৈরি হলো?
এই অভিযোগের ভিত্তি হলো এ কথার উপর যে, নবী কারীম (সা.) কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত হরফের যে সহজতা উম্মতের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, এতে আরবের গোত্রভিত্তিক ভাষার ভিন্নতা তাঁর দৃষ্টির সামনে ছিল। এ কথার উপর ভিত্তি করেই হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) "সাত হরফ” দ্বারা আরবের "সাত ভাষা”-এর অর্থ করেছেন। অথচ এটা এমন একটা কথা যার সমর্থন কোনো হাদীস দ্বারা পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে এক হাদীসে, নবী কারীম (সা.) সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতা প্রার্থনা করার সময় তাঁর লক্ষ্যবস্তু কি ছিল? ইমাম তিরমিযী (রহ.) সহীহ সনদ সূত্রে হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন- 'এক মৃত পাথরের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে নবী কারীম, (সা.)-এর সাক্ষাত হলো। তখন তিনি জিবরাঈল (আ.) কে বললেন, আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে- অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে- শিশু-কিশোররা। তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি তাদেরকে নির্দেশ দিন, তারা যেন সাত হরফে কুরআন পাঠ করে।'
তিরমিযী শরীফেরই অপর এক রেওয়ায়েতে এমন শব্দ এসেছে যে, রাসূলে আকরাম (সা.) জিবরাঈল (আ.) কে বলেছেন- "অর্থাৎ আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে- অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে- শিশু-কিশোররা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ও বালক-বালিকা। যারা কখনো কোনো কিতাব পড়েনি।"
উল্লেখিত হাদীসের শব্দমালা সুস্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, উম্মতের জন্য সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে নবী কারীম (সা.)-এর সামনে এ কথা ছিল যে, তিনি এক নিরক্ষর জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। যার মধ্যে সব ধরনের লোক রয়েছে। যদি পবিত্র কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের জন্য শুধু একটা পদ্ধতিই নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তাহলে উম্মত মুশকিলে পড়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি কয়েকটি পন্থা রাখা হয়, তাহলে এটা সম্ভব যে কোনো লোক এক পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে সক্ষম না হলে অন্য পদ্ধতিতে সে তেলাওয়াত করবে। এমনিভাবে তার নামায এবং তেলাওয়াতের ইবাদত বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। কেননা অনেক সময় এমন হয় যে, বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা লোক বা অপড়ুয়া লোকদের যবানে একটি শব্দ আদায় করা কষ্টকর হয় এবং তাদের জন্য যের-যবরের সাধারণ পার্থক্যও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যই তিনি এই সহজতা কামনা করেছেন। যেমন, কোনো ব্যক্তি মা'রূফের সীগা আদায় করতে পারে না, তখন এর স্থলে অন্য ক্বেরাত অনুযায়ী মাজহুলের সীগা আদায় করে নিবে। অথবা কারো জন্য একবচন শব্দ আদায় করতে কষ্ট হয়, তখন সে ওই আয়াতকেই বহুবচন শব্দ দ্বারা আদায় করবে। কারো জন্য সুর-ভঙ্গিমার কোন পদ্ধতি কষ্টকর হয়, তখন সে ভিন্নটা অবলম্বন করবে। এভাবে সমগ্র কুরআনে তার জন্য সাত প্রকারের সহজতা লাভ হয়ে যাবে।
আপনি হয়তো উপরোল্লিখিত হাদীসে লক্ষ্য করে থাকবেন যে, নবী কারীম (সা.) সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার সময় এ কথা বলেননি যে, "আমি যে জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছি তারা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত এবং তাদের প্রত্যেকের ভাষা আলাদা আলাদা। এ জন্য পবিত্র কুরআনুল কারীমকে বিভিন্ন ভাষায় পড়ার অনুমতি দেওয়া হোক।" বরং এর উল্টো গোত্রভিত্তিক বিভিন্নতা থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি বয়সের তারতম্য এবং তাদের নিরক্ষর হবার বিষয়টার উপর জোর দিয়েছেন। এ বক্তব্য দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতার মধ্যে মূলভিত্তি গোত্রসমূহের ভাষাভিত্তিক ছিল না। বরং উম্মত অপড়ুয়া হওয়ার উপর লক্ষ্য রেখে তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ সহজ-সাধ্যতা প্রদান করাই ছিল উদ্দেশ্য। যার দ্বারা উম্মতের সকল সদস্য উপকৃত হতে পারে।
টিকাঃ
১৭৭. আন্-নশরু ফী ক্বেরআতিল আশর: ১/২০
১৭৮. তিরমিযী: ২/১৩৮, কুরআন মহল, করাচী।
📄 তৃতীয় অভিযোগ
তৃতীয় অভিযোগ : এই প্রধান্য (অগ্রাধিকার প্রাপ্ত) বক্তব্যের প্রতি তৃতীয় অভিযোগ এই হতে পারে যে, ক্বেরাতের বিভিন্নতার যে সাতটি প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে, চাই সেটা ইমাম মালেক (রহ.)-এর বর্ণনা হোক অথবা আবুল ফযল রাযী (রহ.)-এর বক্তব্য হোক কিংবা আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী আবুত তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত হোক, সর্বাবস্থায় এখানে কেয়াস ও অনুমানের একটি অবকাশ থেকেই যায়। এ কারণেই তাঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্নতার এই সাত প্রকারের বিস্তারিত বর্ণনা পৃথক পৃথকভাবে দিয়েছেন। কাজেই এগুলোর ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিভাবে বলা যেতে পারে যে, নবীয়ে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল?
এর জবাব হচ্ছে, "সাত হরফ"-এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কোনো হাদীস বা সাহাবীর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় না। তাই এই অধ্যায়ে যত বর্ণনা রয়েছে, সবগুলোর ভাবার্থগুলো একত্রিত করে এর থেকে বিশেষ ফলাফল বের করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ বক্তব্যটি বিশুদ্ধ হওয়ার অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয়। কারণ এর উপর মৌলিক কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয় না। বর্ণনাগুলোকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখার পর আমাদের কাছে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত যে, হাদীসে বর্ণিত "সাত হরফ” দ্বারা ক্বেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। তবে রয়ে গেল ওই প্রকারগুলো নির্ধারণ ও নিরূপণ করার বিষয়টি। আর এ ব্যাপারে তো আমরা আগেই বলে এসেছি যে, এটা জানার জন্য গভীর অনুসন্ধানের বিকল্প কোনো পথ নেই। ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)-এর অনুসন্ধান আমাদের কাছে অবশ্যই সকল গুণাগুণসম্বলিত বলে মনে হয়। এতদসত্ত্বেও আমরা নিশ্চিতভাবে কারো অনুসন্ধানকেই বলি না যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু এর দ্বারা এ মৌলিক হাকীকত প্রশ্নবিদ্ধ হয় না যে, "সাত হরফ” দ্বারা নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উদ্দেশ্য ছিল ক্বেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকার। যেগুলোর বিশদ বর্ণনার নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করার না আমাদের কাছে কোনো পথ আছে আর না এর কোনো দরকার আছে।