📄 "সাত হরফ"-এর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা
লেখক বলেন আমার দৃষ্টিতে পবিত্র কুরআনুল কারীমের "সাত হরফ”-এর সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হলো, যা হাদীসে "হরফের বিভিন্নতা” দ্বারা “ক্বেরাতের বিভিন্নতা"কে বুঝানো হয়েছে। আর "সাত হরফ" দ্বারা "ক্বেরাতের বিভিন্নতার" সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো ক্বেরাতগুলো যদিও সাতের চেয়ে বেশি, কিন্তু ওই ক্বেরাতগুলোর মাঝে যে মতানৈক্য পাওয়া যায় তা সাত প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আমাদের ইলম অনুযায়ী এই মত ও বক্তব্য মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মাঝে সর্বপ্রথম ইমাম মালেক (রহ.)-এর নিকট পাওয়া যায়। বিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন, আল্লামা নিযামুদ্দীন কিম্মী নিশাপুরী (রহ.) স্বীয় তাফসীর "গারায়িবুল কুরআন"-এ লিখেন, "আহরুফে সাবআ”-এর ব্যাপারে ইমাম মালেক (রহ.)-এর এ মাযহাব উদ্ধৃত আছে যে, এর দ্বারা ক্বেরাতের নিম্নলিখিত সাত প্রকারের বিভিন্নতা ও মতানৈক্যকে বুঝানো হয়েছে।
১. একবচন ও বহুবচনের মতানৈক্য। এক ক্বেরাতে শব্দটি একবচন ব্যবহৃত হয়েছে আবার অন্য ক্বেরাতে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ এবং كَلِمَاتُ رَبِّكَ
২. পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা। এক ক্বেরাতে পুংলিঙ্গ এবং অন্য ক্বেরাতে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- لَا يُقْبَلُ এবং لَا تُقْبَلُ
৩. এ'রাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্নের বিভিন্নতা। কোনো ক্বেরাতে যের আবার কোনো ক্বেরাতে যবর থাকে। যেমন- هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ এবং غَيْرِ اللَّهِ
৪. 'সরফী অবস্থা' বা শব্দ-প্রকরণ শাস্ত্রের বিভিন্নতা। যেমন, এক ক্বেরাতে يَعْرِشُونَ এবং অন্য ক্বেরাতে يُعَرِّشُونَ
৫. 'নাহভী হরফ' বা অব্যয় পদের বিভিন্নতা। যেমন, এক ক্বেরাতে لَكِنَّ الشَّيَاطِينَ এবং অন্য ক্বেরাতে لَكِنِ الشَّيَاطِينُ
৬. হরফ পরিবর্তনশীল শব্দের বিভিন্নতা। যেমন, تَعْلَمُونَ ও يَعْلَمُونَ এবং نُنْشِزُهَا ও تَنْشُرُهَا
৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যেমন, তাখফীফ (জযম দিয়ে পড়া), তাফখীম (শেষ অক্ষর ছেড়ে দেওয়া), ইমালা (যের ও যবরের মধ্যবর্তী উচ্চারণ করা), মদ্দ (দীর্ঘস্বর করা) কসর (হ্রস্ব স্বর করা), ইজহার (স্পষ্ট করা), ইদগাম (মিলিয়ে পড়া) ইত্যাদি।
অতঃপর আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.), কাযী আবু বকর আত-তাইয়্যেব বাকিলানী (রহ.) এবং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এই মতকে গ্রহণ করেছেন। ক্বেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এই মত পেশ করার পূর্বে লিখেন- "আমি এই হাদীসের ব্যাপারে অসংখ্য প্রশ্নে জর্জরিত ছিলাম। ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় এর উপর গভীর চিন্তা-গবেষণায় লিপ্ত ছিলাম। এমনকি মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আমার জন্য এর এমন ব্যাখ্যা বিকশিত করে দিয়েছেন, যা সঠিক ও নির্ভুল হবে ইনশাআল্লাহ।”
এপ্রসঙ্গে সকল উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, হাদীসে বর্ণিত "সাত হরফ" দ্বারা ক্বেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সেই ক্বেরাতগুলোর প্রকারসমূহ নির্ধারণ করতে গিয়ে তাঁদের বক্তব্যের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। এর কারণ হলো, প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তা অনুযায়ী সেই ক্বেরাত বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়েছেন। এর মধ্যে যার অনুসন্ধান সবচেয়ে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং পূর্ণাঙ্গ ও সর্বগুণে গুণান্বিত তিনি হলেন, ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)। তিনি বলেন, ক্বেরাতের বিভিন্নতা (নিম্নোক্ত) সাত প্রকারেই সীমাবদ্ধ।
১. নাম বা বিশেষ্য শব্দসমূহের বিভিন্নতা। একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন এবং পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। (এর উদাহরণ দেই- وَتَمَّতْ كَلِمَتُ رَبِّكَ যা অন্য ক্বেরাতে তَمَّتْ كَلِمَاتُ رَبِّكَ বলা হয়েছে।)
২. ফেয়েল বা ক্রিয়াপদের পার্থক্য ও বিভিন্নতা। কোনো ক্বেরাতে মাদী (অতীতকাল বাচক ক্রিয়া), কোনোটিতে মুযারি' (বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল বাচক ক্রিয়া) আবার কোনোটিতে আমর (নির্দেশ বাচক ক্রিয়া) ব্যবহৃত হয়েছে। (এর উদাহরণ হলো, এক ক্বেরাতে رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا অন্য ক্বেরাতে এর স্থলে রয়েছে- رَبَّنَا بَعِّدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا)
৩. এ'রাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্নের বিভিন্নতা। বিভিন্ন ক্বেরাতে বিভিন্ন কারক চিহ্ন বা হরকত বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। (এর উদাহরণ হলো, لَا يُضَارُّ كَاتِبٌ ও لَا يُضَارَّ كَاتِبٌ এবং ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ ও ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدِ)
৪. শব্দের কম-বেশি হওয়ার বিভিন্নতা। এক ক্বেরাতে কোনো শব্দ কম আছে। আর অন্য ক্বেরাতে বেশি আছে। (যেমন, এক ক্বেরাতে وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنثَى আছে। আর অন্য ক্বেরাতে وَالذَّكَرَ وَالْأُنثَى আছে। এখানে وَمَا خَلَقَ শব্দের উল্লেখ নেই। অনুরূপভাবে এক ক্বেরাতে تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ আছে। আর অন্য ক্বেরাতে تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ আছে)।
৫. তাব্দীম-তা'খীর বা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শব্দের বিভিন্নতা। এক ক্বেরাতে কোনো শব্দকে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার অন্য ক্বেরাতে সেটাকে পরে উল্লেখ করা হয়েছে। (যেমন, وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْحَقِّ بِالْمَوْتِ এবং وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ)
৬. বদল বা শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতা। এক ক্বেরাতে এক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য ক্বেরাতে তার স্থলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। (যেমন, تُنْشِرُهَا এবং نَنْشُرُهَا । অনুরূপভাবে فَتَبَيَّنُوا এবং تَتَثَبَّتُوا আর طَلْحٍ এবং طَلْعٍ।
৭. উচ্চারণের সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যার মধ্যে তাফখীম, তারকীক, ইমালা, কসর, মদ্দ, হাম্য, ইজহার ও ইত্যাদির বিভিন্নতা শামিল রয়েছে। (যেমন, مُوسَى শব্দটিকে এক ক্বেরাতে ইমালা করে مُوْسَى এর ন্যায় পড়া হয়। আবার অন্য ক্বেরাতে ইমালা ব্যতীত।)
আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং কাযী আবু তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত বিভিন্নতার কারণগুলোও এ বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তবে ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)-এর অনুসন্ধান এ জন্য এত বেশি সমৃদ্ধ বলে মনে হয় যে, এতে কোনো প্রকারের মতানৈক্য ও বিভিন্নতা বাদ পড়েনি। পক্ষান্তরে বাকি তিনজন গবেষকের বর্ণিত কারণগুলোর মধ্যে শেষ প্রকার অর্থাৎ সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা বর্ণনা করা হয়নি। আর ইমাম মালেক (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত বিভিন্নতার মধ্যে সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতার বর্ণনা তো করা হয়েছে, কিন্তু শব্দের কম-বেশি, পূর্ববর্তী-পরবর্তী এবং শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতার বিষয়গুলো পুরোপুরি ফুটে উঠেনি।
এর বিপরীত ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.) অনুসন্ধান ও গবেষণায় এ সকল প্রকার বিভিন্নতা ও মতানৈক্য সুস্পষ্টভাবে গ্রন্থিত হয়েছে। বিদগ্ধ গবেষক ইবনুল জাযারী (রহ.) যিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত চিন্তা-গবেষণা করার পর 'সাত হরফ'কে ক্বেরাতের সাত প্রকারের বিভিন্নতার উপর প্রয়োগ করেছেন, তিনিও ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)-এর বক্তব্য বড় সম্মানের সাথে উদ্ধৃত করেছেন এবং এর উপর কোনো প্রকার অভিযোগ-আপত্তি উত্থাপন করেননি। বরং তাঁর আলোচনার সমষ্টি থেকে বুঝা যায় যে, ইমাম আবুল ফযল (রহ.)-এর অনুসন্ধান তাঁর নিজের অনুসন্ধানের চেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।
এতদ্ব্যতীত হাফেয ইবনে হাযার আসকালানী (রহ.)-এর বক্তব্য থেকেও অনুভূত হয় যে, তিনি উক্ত তিনটি বক্তব্যের মাঝে ইমাম রাযী (রহ.)-এর অনুসন্ধান ও বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা তিনি আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন- هَذَا وَجْهٌ حَسَنٌ (এটা সর্বোত্তম ব্যাখ্যা)। অতঃপর ইমাম আবুল ফযল (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত সাত প্রকার সম্পর্কে লিখেন- "আমার ধারণা, তিনি (ইমাম আবুল ফযল রাযী) ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে সুসজ্জিত করেছেন।"
শেষ যুগে শায়েখ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.) ও তাঁর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট দলীল-প্রমাণাদি পেশ করেছেন। যা হোক, অনুসন্ধানের প্রকারের মাঝে মতানৈক্য আছে ঠিক; তবে ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী বাকিল্লানী (রহ.) সকলেই এ কথার উপর এক মত যে, হাদীসে বর্ণিত "সাত হরফ" দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ক্বেরাতের ওই বিভিন্নতা যা সাত প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে আমার দৃষ্টিতে "সাত হরফ”-এর এই ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে উত্তম। হাদীসের মর্মার্থ এটাই বুঝে আসে যে, কুরআনুল কারীমের শব্দগুলো বিভিন্নভাবে পড়া যেতে পারে। আর এই বিভিন্ন পদ্ধতিগুলো ধরন হিসেবে সাত প্রকার।
টিকাঃ
১৬৯. 'গারায়েবুল কুরআন ওয়া রাগায়েবুল ফুরকান': টীকা ইবনে জারীর: ১/২১ মিসর। নিশাপুরী
১৭০. ফাতহুল বারী: ১/২৫-২৬, ইতকান: ১/৪৭ এবং তাফসীরে কুরতুবী ১/৪৫।
১৭১. আন্ নশরু ফী কিরাতিল আশর: ১/২৬
১৭২. ফাতহুল বারী: ৯/২৪
১৭৩. আন্ নশরু ফী কিরাতিল আশর: ১/২৭-২৮
১৭৪. ফাতহুল বারী: ৯/২৪
১৭৫. মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন: ১/১৫৪-১৫৬
📄 এই বক্তব্যটির অগ্রাধিকারের কারণসমূহ
"সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হাদীস, তাফসীর ও উলুমুল কুরআনের কিতাবসমূহে যতগুলো ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হয়েছে, আমাদের দৃষ্টিতে সেগুলোর মধ্যে এ বক্তব্যটি (সাত হরফ দ্বারা ক্বেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো) সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত, নির্ভরযোগ্য এবং মেনে নেওয়ার মতো। তার কারণগুলো নিয়ে আলোকপাত করা হলো:
১. এ বক্তব্য অনুযায়ী "হরফ" এবং "ক্বেরাত" পৃথক পৃথক দু'টি বিষয় সাব্যস্ত করার প্রয়োজন পড়ে না। আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.) ও ইমাম তহাভী (রহ.)-এর বক্তব্যসমূহে একটি যৌথ সমস্যা রয়েছে যে, এতে এ কথা মেনে নিতে হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের মাঝে দু'ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। একটি হলো, হরফের মতানৈক্য। আরেকটি হলো, ক্বেরাতের মতানৈক্য। হরফের মতানৈক্য তো এখন বিলুপ্ত আর ক্বেরাতের মতানৈক্য এখনো বহাল রয়েছে। অথচ হাদীসের এত বিশাল ভান্ডারে এমন একটি দুর্বল হাদীসও পাওয়া যায় না, যার দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত হয় যে, “হরফ” এবং "ক্বেরাত” দু'টি পৃথক পৃথক বিষয়। হাদীসের ভান্ডারে শুধুমাত্র হরফের মতানৈক্যের কথা পাওয়া যায়। আর এর জন্য ই অধিকহারে "ক্বেরাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। "ক্বেরাত” যদি ওই "হরফগুলো” থেকে পৃথক হতো, তাহলে কোনো না কোনো হাদীসে এর প্রতি অবশ্যই ইঙ্গিত থাকত। পরিশেষে এ কথার কোন্ যুক্তি আছে যে, "হরফ”-এর মতানৈক্য সংক্রান্ত হাদীসটি প্রায় তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় এসে পৌঁছেছে, অথচ “ক্বেরাত”-এর পৃথক আলোচনা একটি হাদীসেও নেই? অতএব, নিজের ধারণা-প্রসূত কেয়াস দ্বারা এ কথা কিভাবে বলে দেওয়া সম্ভব যে, হরফের মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছাড়াও পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দাবলীর মাঝে আরেক প্রকার ভিন্নতা ছিল? উপরোল্লিখিত (ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)-এর) বক্তব্যে এই সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। কারণ এতে “হরফ” এবং “ক্বেরাত”কে অভিন্ন প্রকার সাব্যস্ত করা হয়েছে।
২. আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এ কথা স্বীকার করতে হয় যে, সাত হরফের মধ্য হতে ছয় হরফ রহিত বা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। একমাত্র কুরাইশী হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। (বর্তমান ক্বেরাত ওই কুরাইশী হরফের আদায়গত বিভিন্নতা)। এ বক্তব্যের দুর্বলতাগুলো আমরা সামনে বর্ণনা করবো। উপরোল্লিখিত শেষ বক্তব্যটিতে (অর্থাৎ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যটিতে) এসব নিন্দনীয় বিষয় নেই, কেননা এ বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফের সবগুলো আজও অবশিষ্ট ও সংরক্ষিত আছে।
৩. এই (অগ্রাধিকার প্রাপ্ত) বক্তব্য অনুযায়ী কোনো প্রকার তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে "সাত হরফ"-এর সঠিক অর্থ অবিকৃত থাকে। পক্ষান্তরে অন্যান্য বক্তব্যের মাঝে হয়তো "হরফ"-এর অর্থের মধ্যে নতুবা "সাত" সংখ্যার মধ্যে তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা করতে হয়।
৪. "সাত হরফ"-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যত উলামায়ে কেরামের বক্তব্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান এবং নববী যুগের নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম মালেক (রহ.)। আর আল্লামা নিশাপুরী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী তিনিও এই বক্তব্যেরই প্রবক্তা।
৫. আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) উভয়ে ছিলেন ইলমে ক্বেরাতে সর্বজনস্বীকৃত ইমাম। আর তাঁরা উভয়েই এই বক্তব্যের প্রবক্তা। মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর বক্তব্য তো পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, তিনি ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় ধরে চিন্তা-গবেষণা করার পর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।
📄 “হরফে সাব’আ” এখনো সংরক্ষিত নাকি পরিত্যক্ত?
سبعة احرف বা সাত হরফের অর্থ নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এ সাত হরফ এখনো অবশিষ্ট আছে নাকি নেই? এ বিষয়ে মুতাক্কাদিমীন বা পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে তিনটি মতামত বা বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।
১. প্রথম বক্তব্য হচ্ছে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) এবং তাঁর অনুসারীদের। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করে এসেছি যে, তাঁদের নিকট সাত হরফ দ্বারা আরবের গোত্রভিত্তিক সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। এ কথার উপর ভিত্তি করেই তিনি বলেন যে, হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত পবিত্র কুরআনুল কারীম সাত হরফে পড়া হতো। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে যখন ইসলাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করল, তখন এ সাত হরফের তাৎপর্য সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে মানুষের মধ্যে বাক-বিতন্ডা শুরু হতে লাগল। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা বিভিন্ন হরফে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করতো এবং একে অন্যের তেলাওয়াতকে ভুল আখ্যায়িত করত।
এ ফেতনাকে নির্মূল করার জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণের পরামর্শে গোটা উম্মতকে শুধু এক হরফ তথা কুরাইশী ভাষা অনুযায়ী কুরআন তেলাওয়াতের নিমিত্তে সাতটি মাসহাফ সুবিন্যস্ত করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। আর বাকি সব মাসহাফকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। যেন আর কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হতে না পারে। সুতরাং এখন কেবল কুরাইশী ভাষার হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। আর অবশিষ্ট ছয় হরফ সংরক্ষিত রয়নি। আর ক্বেরাতের যে মতানৈক্য আজ পর্যন্ত চলে আসছে, সেগুলো সেই কুরাইশী এক হরফ আদায়ের বিভিন্ন পদ্ধতি মাত্র।
টিকাঃ
১৮২. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫
📄 হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর চিন্তাধারা ও এর নিন্দনীয় খারাপী দিকগুলো
এখানে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) যেহেতু নিজের চিন্তা ও মতকে স্বীয় তাফসীর গ্রন্থের ভূমিকায় অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, তাই তাঁর এ বক্তব্য অত্যাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আজকাল সাত হরফের ব্যাখ্যা সাধারণত এর আলোকেই করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমগণ এ মতকে গ্রহণই করেননি; বরং অত্যন্ত কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ এ বক্তব্যে এমন কিছু সমস্যা দাঁড়ায়, যার কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় না।
এ মতের উপর সর্বপ্রথম তো ওই আপত্তি আরোপিত হয়, যার আলোচনা আমরা আগেই করে এসেছি যে, এতে "হরফ” এবং “ক্বেরাত” দু'টিকে পৃথক পৃথক বিষয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ কোনো হাদীস দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায় না।
২. দ্বিতীয় আপত্তি: এই হয় যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এক দিকে তো এটা মেনে নেন যে, সাত হরফের সবকটিই আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত। আবার অন্য দিকে বলেন, হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে বিলুপ্ত করে দেন! অথচ এ কথা মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই হরফগুলোকেই একে বারে বিলুপ্ত করার জন্য একমত হয়ে গেলেন, উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'আর জবাবে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যা নাযিল করেছিলেন!? অথচ সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা ঐক্যমত নিঃসন্দেহে দ্বীনের অকাট্য দলীল, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জন্য এটা সম্ভাব্য ব্যাপার বরে মনে হয় না যে, যে বিষয় কুরআন হওয়ার ব্যাপারটা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক পরম্পরায় সাব্যস্ত হয়েছে, তাঁরা সেটাকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার জন্য ঐক্যমত পোষণ করবেন!
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এই আপত্তির জবাব এভাবে দিয়েছেন যে, 'প্রকৃতপক্ষে উম্মতকে পবিত্র কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সাথে সাথে এ এখতেয়ারও দেওয়া হয়েছিল যে, তারা সাত হরফের যে কোনো একটিকে বেছে নিতে পারবে। তাইতো উম্মত সেই এখতেয়ার দ্বারা উপকৃত হয়ে সার্বজনীন কল্যাণার্থে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে পরিত্যাগ করেছেন, আর এক হরফের সংরক্ষণের উপর একমত হয়েছেন। এ পদক্ষেপ দ্বারা ওই হরফগুলোকে রহিত করা এবং সেগুলোর তেলাওয়াতকে হারাম করে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না। বরং উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের জন্য সার্বজনীন এক হরফকে নির্বাচন করা।'
কিন্তু এ জবাবটিও এ জন্য দুর্বল বলে মনে হয় যে, প্রকৃত অবস্থা যদি এটাই হয়ে থাকে তাহলে এটা কি সমীচীন ছিল না যে, উম্মত নিজেদের আমলের জন্য এক হরফকে বেছে নিত আর বাকি ছয় হরফকে চিরতরের জন্য বিলুপ্ত করার পরিবর্তে কোনো এক স্থানে তা সংরক্ষণ করে রাখতো? যেন সে হরফগুলোর অস্তিত্ব একেবারেই খতম হয়ে না যায়। পবিত্র কুরআনে কারীমে বর্ণিত রয়েছে- إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ 'নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক।'
যখন সাত হরফের সবগুলোই কুরআন ছিল তখন এই আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফও কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনো ব্যক্তি যদি এগুলোর তেলাওয়াতকে ছেড়েও দিতে চায়, তবু তা একেবারে বিলুপ্ত হতে পারে না। আল্লামা হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এর উপমা দিতে গিয়ে একটি মাসআলা পেশ করেছেন যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম মিথ্যা শপথের কাফফারা ক্ষেত্রে মানুষকে তিনটি এখতেয়ার দিয়েছে। চাইলে সে একজন দাসকে মুক্ত করতে পারবে, চাইলে দশজন মিসকীনকে আহার করাতে পারবে আর চাইলে দশজন মিসকীনকে বস্ত্র দিতে পারবে। এখন যদি উম্মত বাকি দু'টি প্রকারকে নাজায়েয না করে নিজেদের আমলের জন্য একটিকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে তা তার জন্য বৈধ। ঠিক তদ্রূপ উম্মত সাত হরফের মধ্য হতে একটি হরফকে সার্বজনীনভাবে বেছে নিয়েছে।
কিন্তু এই উপমা পেশ করা এ জন্য সঠিক নয় যে, উম্মত যদি শপথের কাফ্ফারার ক্ষেত্রে তিন প্রকারের যে কোনো একটি প্রকারকে এমনভাবে গ্রহণ করে যে, বাকি দু'টি প্রকারকে নাজায়েয তো বলে না; কিন্তু কার্যত সেগুলোর অস্তিত্ব একেবারেই বিলুপ্ত থেকে যায় এবং লোকদের কেবল এ টুকু জানা থাকে যে, শপথের কাফ্ফারার আরো দু'টি প্রকার ছিল যেগুলোর আমলকে উম্মত পরিহার করেছে। কিন্তু সে প্রকারগুলো কি ছিল? তা জানে এমন লোকও বাকি না থাকে, তাহলে অবশ্যই উম্মতের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
অতঃপর এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, বাকি ছয় হরফকে পরিহার করার কি প্রয়োজন দেখা দিল? হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) বলেছেন যে, এই হরফগুলোর মতানৈক্যের কারণে মুসলমানদের মাঝে প্রচণ্ড ঝগড়া বাঁধতো। এ জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণের পরামর্শে সকল হরফের মাঝে সমন্বয় সাধন করে সেটাকে এক হরফে রূপান্তরিত করাকে সমীচীন বলে মনে করলেন। কিন্তু এটাও এমন এক কথা যেটাকে মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল। হরফের বিভিন্নতার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের মতবিরোধ তো স্বয়ং নবী কারীম (সা.)-এর যুগেও ছিল। হাদীসের ভান্ডারে এ ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত আছে যে, এক সাহাবী অপর সাহাবীকে ভিন্নভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তাঁদের পরস্পরে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে যেত।
এমনকি সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত ওমর (রা.) তো হযরত হিশাম (রা.)-এর গলায় চাদর পেঁচিয়ে তাঁকে রাসূলে খোদা (সা.)-এর দরবারে নিয়ে এসেছিলেন। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) বলেন, হরফের এই মতবিরোধের কথা শোনে আমার অন্তরে অনেক বেশি সন্দেহ সৃষ্টি হতে লাগল। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নবী কারীম (সা.) সাত হরফকে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে সে হরফগুলোর অনুমোদনের ব্যাপারে সম্মতি জানালেন। আর এতে কোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটেনি। সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে এটা অসম্ভব যে, তাঁরা এই 'উসওয়ায়ে হাসানা' বা উত্তম আদর্শের উপর আমল করার পরিবর্তে ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
তারপর আশ্চর্যের কথা হলো, আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম মতবিরোধের ভয়ে ছয় হরফকে তো বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু ক্বেরাতগুলোকে (যা তাঁর বক্তব্য মতে হরফ থেকে আলাদা বিষয়) হুবহু বাকি রেখেছেন! যা আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিভিন্ন হরফের উপর কুরআন তেলাওয়াত জারী রাখার ক্ষেত্রে যে মতবিরোধ ও মতানৈক্যের আশঙ্কা ছিল, ক্বেরাতের বিভিন্নতার মাঝে কি সেই আশঙ্কাটা ছিল না? যখন ওই ক্বেরাতগুলোর আলোকে কখনো কখনো এক একটি হরফকে বিশটি পদ্ধতিতে পড়া যায়।
যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্য এটাই হয়ে থাকে যে, মুসলমানদের মাঝে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা হবে এবং সবাই এক পদ্ধতিতে কুরআন তেলাওয়াত করবে, তাহলে ক্বেরাতের বিভিন্নতাকে অবশেষে কেন বিলুপ্ত করা হলো না? যখন ক্বেরাতের মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের বিক্ষিপ্ততাকে বাধা দেওয়া যেত এবং মুসলমানদেরকে এটা বুঝানো যেত যে, এই সবগুলো পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করা জায়েয, তাহলে এই শিক্ষাটাই কেন সাত হরফের ক্ষেত্রে ফেতনার কারণরূপে উপলব্ধি হলো? প্রকৃত কথা হচ্ছে, হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.)-এর বক্তব্যে "সাত হরফ" এবং "ক্বেরাত”-এর ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এমন বিস্ময়কর দু'টি আমলী সম্বন্ধ করতে হয়, যার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ বুঝে আসে না।
উপরন্তু হযরত উসমান ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণের প্রতি এত বড় পদক্ষেপের সম্বন্ধ কোনো সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে নয়। বরং সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দের কেয়াসনির্ভর ব্যাখ্যার মাধ্যমে করা হয়েছে। যে সকল রেওয়ায়েতে হযরত উসমান-এর কুরআন সংকলনের কথা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে এ কথার উল্লেখ নেই যে, তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং এর বিপরীত অনেক দলীল বিদ্যমান রয়েছে, যেগুলোর বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে। এখন কোনো সুস্পষ্ট ও সহীহ রেওয়ায়েত ব্যতীত এ কথা কিভাবে বলা সম্ভব হতে পারে যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই ছয় হরফকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন, যা নবী কারীম (সা.)-এর বার বার আবেদনের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল?
আসল কথা হচ্ছে, যে সকল সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ পবিত্র কুরআনুল কারীমের সংকলন ও বিন্যাসের মহান কাজে শুধু এ জন্যই গবেষণা করেছেন যে, প্রিয় নবী কারীম (সা.) এ কাজ করে যাননি। যারা পবিত্র কুরআনুল কারীমের এক একটি শব্দ সংরক্ষণের জন্য নিজেদের পুরো জীবন ব্যয় করেছেন এবং যারা রহিত তেলাওয়াতের আয়াতগুলোও সংরক্ষণ করে উম্মতের নিকট পৌঁছিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে এ কাজ হওয়াটা খুবই দূরবর্তী ব্যাপার যে, তাঁরা সবাই ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার জন্য এভাবে একমত হয়ে যাবেন যে, আজ সেই হরফগুলোর কোনো নাম ও নিশানাও বাকি থাকবে না।
যে সকল আয়াতের তেলাওয়াত রহিত হয়ে গিয়েছিল, সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকেও কমপক্ষে ঐতিহাসিক ভিত্তিতে অবশিষ্ট রেখে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন। তাহলে কি সেই কারণ যে, ওই "হরফগুলো” যেগুলোর ব্যাপারে হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও স্বীকার করেছেন যে, তা রহিত হয়নি- বরং কোনো কল্যাণার্থে ক্বেরাত ও লিপিমালাকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো একটি উদাহরণ কোনো দুর্বল রেওয়ায়েতেও সংরক্ষিত হতে পারেনি!
এ কারণেই অধিকাংশ মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর এই ব্যক্তিগত বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
টিকাঃ
১৮০. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫