📘 উলুমুল কুরআন 📄 সাত হরফের মর্মার্থ

📄 সাত হরফের মর্মার্থ


পূর্বের হাদীসে সর্ব প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, সাত হরফে কুরআন নাযিল হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য কি? এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত ও চিন্তাধারার কঠিন মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এমনকি আল্লামা ইবনে আরাবী (রহ.) এ ব্যাপারে পঁয়ত্রিশটি মতামত একত্রিত করেছেন। সেগুলোর মধ্য হতে কিছু প্রসিদ্ধ ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মতামত এখানে পেশ করা হলো-
১. এপ্রসঙ্গে কেউ কেউ মনে করেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সুপ্রসিদ্ধ সাতজন ক্বারীগণের সাত ক্বেরাত। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল ও ভ্রান্ত। কেননা, তাওয়াতুর বা নিরবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় সাব্যস্ত ক্বেরাতসমূহ শুধু 'সাত ক্বেরাতে'র মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আরো বহু ক্বেরাত তাওয়াতুর সূত্রে সাব্যস্ত আছে। এ সাত ক্বেরাত তো শুধু এ কারণেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, আল্লামা ইবনে মুজাহিদ (রহ.) একটি গ্রন্থে ওই সাতজন কারীর ক্বেরাতকে একত্রিত করেছেন। এর দ্বারা তাঁর না এই উদ্দেশ্য ছিল যে, ক্বেরাতকে সাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা আর না তিনি ওই সাত হরফের ব্যাখ্যা এই 'সাত ক্বেরাত' দ্বারা করেছেন।
২. উপরোক্ত আলোচনা ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম এই খেয়াল ব্যক্ত করেছেন যে, 'হরফ' দ্বারা সকল কেরাতকে বুঝানো হয়েছে। তবে 'সাত' শব্দ দ্বারা বিশেষ করে 'সাত সংখ্যা'কেই বুঝানো হয়নি। বরং এর দ্বারা সংখ্যার আধিক্য বুঝানো হয়েছে। আরবী ভাষায় 'সাত' শব্দটি অধিকাংশ সময় কোনো বস্তুর শুধু সংখ্যাধিক্য বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানেও হাদীসের উদ্দেশ্য এই নয় যে, কুরআনুল কারীম শুধু সাত হরফের উপরই নাযিল হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য হলো, কুরআনুল কারীম বহু পদ্ধতিতে নাযিল হয়েছে। মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মধ্য হতে কাযি আয়ায (রহ.)-এর অভিমত এটাই। আর শেষ যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ও এই মতের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। কিন্তু উক্ত মতটি এ জন্য সঠিক বলে মনে হয় না যে, বুখারী ও মুসলিম-এর এক হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই বাণী বর্ণিত আছে যে- أَقْرَأَنِي جِبْرِيلُ عَلَى حَرْفٍ, فَرَاجَعْتُهُ فَلَمْ أَزَلْ أَسْتَزِيدُهُ فَيَزِيدُنِي حَتَّى انْتَهَى إِلَى سَبْعَةِ أَحْرُف 'জিবরাঈল আমাকে এক হরফের উপর কুরআনুল কারীম আবৃত্তি করিয়েছেন। ফলে আমি তার শরণাপন্ন হলাম এবং আমি হরফ বৃদ্ধির আবেদন করলাম। তিনি বৃদ্ধি করতে থাকলেন। এমনকি তা সাত হরফে গিয়ে পৌঁছেছে।'
এর বিস্তারিত আলোচনা সহীহ মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) থেকে এভাবে বর্ণিত আছে যে, প্রিয় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বনু গিফারের কূপের কাছে ছিলেন- অতঃপর নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট জিবরাঈল (আ.) আসলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার (গোটা) উম্মত যেন এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) দ্বিতীয়বার তাঁর নিকট আসলেন। বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার (গোটা) উম্মত যেন দুই হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। আবার তৃতীয়বার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার (গোটা) উম্মত যেন তিন হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত সক্ষম হবে না। চতুর্থবার আবার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার (গোটা) উম্মত যেন সাত হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। অতঃপর তারা যে হরফের উপরই পাঠ করবে, তাদের ক্বেরাত সঠিক হবে।'
এই রেওয়ায়েতগুলোর পূর্বাপর বর্ণনাভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে বলছে যে, এখানে 'সাত' শব্দটি দ্বারা সংখ্যাধিক্য বুঝানো হয়নি; বরং নির্দিষ্ট করে 'সাত' সংখ্যাটিকেই বুঝানো হয়েছে। তাই এই হাদীসগুলোর আলোকে উপরোক্ত মতটি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। এমনকি জমহুর উলামায়ে কেরামও এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
৩. আবার অন্যান্য উলামায়ে কেরাম, যেমন হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) সহ আরো অনেকে বলেছেন যে, উল্লিখিত হাদীসে সাত হরফ দ্বারা আরব জাতির গোত্রগত সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু আরব জাতি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল এবং প্রত্যেক গোত্রের ভাষা আরবী হওয়া সত্ত্বেও অন্য গোত্রের সাথে ভাষার সামান্য গরমিল ছিল। আর এই গরমিলটা এমন, যেমন জাতীয় একটি ভাষায় আঞ্চলিকতার কারণে তারতম্য সৃষ্টি হয়। তাই মহান আল্লাহ পাক ওই বিভিন্ন গোত্রের সহজ-সাধ্যের জন্য পবিত্র কুরআনুল কারীমকে সাত ভাষায় নাযিল করেছেন। যেন প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ গোত্রীয় ভাষায় পাঠ করতে পারে। অতঃপর ইমাম আবু হাতেম সাজিসতানী (রহ.) ওই গোত্রগুলোর নামও নির্ধারণ করেছেন এবং বলেছেন যে, কুরআনুল কারীম এই সাত গোত্রের সাত ভাষা অনুযায়ী নাযিল হয়েছে। গোত্র সাতটি হচ্ছে- (১) কুরাইশ। (২) হুযাইল। (৩) তাইমুর-রুবাব। (৪) আজদ। (৫) রবী'আ। (৬) হাওয়াজিন। (৭) সা'দ বিন বকর। আর হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) কারো কারো থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করে উপরোক্ত গোত্রগুলোর স্থলে নিম্নোক্ত গোত্রগুলো উল্লেখ করেছেন- (১) হুযাইল। (২) কেনানা। (৩) কায়েস। (৪) যব্বা। (৫) তাইমুর রুবাব। (৬) আসাদ ইবনে খুযাইমাহ। (৭) কুরাইশ।
তথাপিও বহু মুহাক্কিক আলেম যেমন, হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.), আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ও আল্লামা ইবনে জাযারীসহ আরো অনেকে উক্ত মতটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রথমতঃ এ জন্য যে, আরবের গোত্র তো অনেকগুলো ছিল। এর মধ্য হতে শুধু এ সাতটিকেই বেছে নেওয়ার হেতু কি? দ্বিতীয়তঃ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে পবিত্র কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত নিয়ে একসময় মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। যার বিস্তারিত বর্ণনা সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। অথচ তাঁরা উভয়েই ছিলেন কুরাইশ বংশের। আর নবী কারীম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁদের উভয়ের ক্বেরাতকে সত্যায়ন করেছেন এবং পবিত্র কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদি সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাতটি গোত্রের ভাষাকেই বুঝানো হতো, তাহলে হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে মতবিরোধের কোনো কারণই থাকতে পারে না। কারণ উভয়ই তো কুরাইশী ছিলেন।
যদিও আল্লামা আলুসী (রহ.) এর জবাব দিয়েছেন যে, 'হতে পারে তাঁদের দু'জনের মধ্য হতে যে কোনো একজনকে রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কুরাইশ ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় কুরআন পড়িয়েছেন।' তবে এই জবাবটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ বিভিন্ন ভাষায় কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে, প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা যেন নিজ ভাষা অনুযায়ী সহজ-সাধ্যভাবে পড়তে পারে। তাই এ বিষয়টা রিসালাতের হেকমত থেকে অনেক দূরবর্তী মনে হয় যে, এক কুরাইশীকে অন্য ভাষায় পবিত্র কুরআনুল কারীম পড়ানো হয়েছে।
এতদ্ব্যতীত ইমাম তাহাভী (রহ.) এর উপর আপত্তি করেন যে, যদি এটা মেনে নেওয়া হয় যে, সাত হরফ দ্বারা সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে তাহলে তা ওই আয়াতের বিপরীত হয়ে দাঁড়াবে যাতে বলা হয়েছে- وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ 'আমি যখনই কোনো রাসূল প্রেরণ করি, তখন তাঁর সম্প্রদায়ের ভাষায়ই প্রেরণ করি।' আর এ কথা তো সবারই জানা যে, রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কুরাইশী ছিলেন। তাই এ কথা সুস্পষ্ট যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম শুধু কুরাইশী ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।
ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর এ মতামতের সমর্থন এভাবেও হয় যে, যে সময়ে হযরত উসমান (রা.) দ্বিতীয়বার কুরআনুল কারীম সংকলনের ইচ্ছা করলেন এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাতকে কুরআনের কপি তৈরির নির্দেশ দিলেন, তখন তাঁদেরকে তিনি এই নির্দেশনা দিয়েছিলেন- إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنتُمْ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ، فَإِنَّ مَنْ نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ 'পবিত্র কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে যখন যায়েদ ইবনে সাবেত এবং তোমাদের মাঝে পরস্পর কোনো মতানৈক্য দেখা দিবে, তখন তোমরা কুরাইশদের ভাষায় লিখবে। কেননা কুরআন তাদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।'
দেখুন এখানে হযরত উসমান (রা.) সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, কুরআন শুধু কুরাইশদের ভাষায়ই অবতীর্ণ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, কুরআন যখন কুরাইশদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে, তাহলে এই 'মতানৈক্য' সৃষ্টি হবার উদ্দেশ্য কি? এর বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।
এতদ্ব্যতীত এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, "সাত হরফ" এবং "সাত ক্বেরাত” দুটো পৃথক পৃথক বিষয়। ক্বেরাতের মতানৈক্য, যা আজও বিদ্যমান সেটা শুধু এক হরফ অর্থাৎ কুরাইশদের ভাষায়ই। আর বাকি হরফগুলো হয়তো রহিত হয়েছে অথবা কল্যাণের জন্য মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে অন্যান্য আপত্তি ছাড়াও একটি আপত্তি এই হয় যে, গোটা হাদীসের ভান্ডারে কোথাও এ কথার প্রমাণ মিলে না যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতে দুই ধরনের মতানৈক্য ছিল। একটি হচ্ছে "সাত হরফ" আরেকটি হচ্ছে "ক্বেরাত।” বরং হাদীসের ভান্ডারে যেখানেই পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দগত কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে শুধু "আহরুফ” (হরফ সমূহের)-এর মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথকভাবে "ক্বেরাতের” কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এসব কারণের ভিত্তিতে এ মতামতটিও অত্যন্ত দুর্বল বলে মনে হয়।
৪. চতুর্থমত হলো, ইমাম তহাভী (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনুল কারীম তো শুধু কুরাইশদের ভাষাতে অবতীর্ণ হয়েছিল। তবে যেহেতু আরববাসী বিভিন্ন এলাকা ও গোত্রে বিভক্ত ছিল তাই প্রত্যেকের জন্য এই একটি মাত্র ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত করা বেশ কঠিন ছিল। তাই ইসলামের শুরু লগ্নে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষা অনুযায়ী সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করতে পারবে। এমনকি যেসব লোকের জন্য কুরআনুল কারীমের মূল শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করা মুশকিল ছিল তাদের জন্য স্বয়ং নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সমার্থবোধক শব্দ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যেগুলো দ্বারা তারা তেলাওয়াত করতে পারে। আর এই সমার্থবোধক শব্দগুলো কুরাইশদের ভাষা ও অন্যদের ভাষা থেকে চয়ন করা হয়েছিল। আর এগুলো এমন ছিল যে, تَعَالَ এর স্থলে اَقْبِل অথবা حَلُمَّ কিংবা يَا أَدْنُ পড়া হতো। সবগুলোর অর্থ একই থাকতো। কিন্তু এই অনুমতি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল, যখন সমস্ত আরববাসী কুরআনী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। অতঃপর ধীরে ধীরে যখন কুরআনী ভাষার পরিধি বৃদ্ধি পেল তখন আরববাসী সে ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল এবং তাদের জন্য কুরআনের মূল ভাষায় তেলাওয়াত করা সহজ হয়ে গেল। ওই সময়ে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে পবিত্র কুরআনুল কারীমের আখেরী দাওর করেন, যেটাকে 'عرضه اخيره' বলা হয়। তখনই সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করার অনুমতি বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। কেবল ওই পদ্ধতিই বাকি থাকে, যার উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল।
এ মত অনুযায়ী “সাত হরফ” বিশিষ্ট হাদীসটি ওই যুগের সাথে সম্পৃক্ত, যখন তেলাওয়াতের মধ্যে সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি ছিল। আর এটার উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম “সাত হরফে” অবতীর্ণ হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম এমন প্রশস্ততার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে যে, নির্দিষ্ট একটা জামানা পর্যন্ত তা সাত হরফে পাঠ করা যেত। আবার "সাত হরফ” দ্বারাও এ উদ্দেশ্য নয় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের প্রত্যেক শব্দের সাতটি সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি আছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, বেশির থেকে বেশি যতগুলো সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা যায়, সেগুলোর সংখ্যা হচ্ছে, “সাত”। আবার সে অনুমতির অর্থ এটাও ছিল না যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মর্জি মতো শব্দ প্রয়োগ করবে। বরং পরিবর্তিত শব্দগুলোও স্বয়ং নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। আর তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে এমনভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, যা তার জন্য সহজ-সাধ্য ছিল। সুতরাং শুধু ওই সকল সমার্থবোধক শব্দের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যা নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত ছিল।

টিকাঃ
১৫৪. যারকাশী: আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন: ১/২১২
১৫৫. আওজাযুল মাসালিক: ২/৩৫৬ সাহারানপুর।
১৫৬. মুসাফফা শরহে মুয়াত্তা: ১/১৮৭ দিল্লী ১২৯৩ হিজরী।
১৫৭. মানাহিলুল ইরফান: ১/১৩৩।
১৫৮. মানাহিলুল ইরফান: ১/১৩৩
১৫৯. তাফসীরে ইবনে জারীর ১/১৫
১৬০. ফাতহুল বারী: ৯/২২, রুহুল মাআনী: ১/২১
১৬১. আন নশরু ফিল কিরআতিল আশ্র: ১/২৫ ফাতহুল বারী: ৯/২৩
১৬২. রুহুল মাআনী: ১/২১
১৬৩. আত্ তাহাভী: মুশকিলুল আসার: ৪/১৮৫-১৮৬
১৬৪. সহীহ বুখারী: (কুরআন সংকলন অধ্যায়)
১৬৫. মুশকিলুল আসার [তহাভী]: ৪/১৮৬-১৯১।
১৬৬. ফাতহুল বারী: ৯/২২-২৩

📘 উলুমুল কুরআন 📄 "সাত হরফ"-এর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা

📄 "সাত হরফ"-এর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা


লেখক বলেন আমার দৃষ্টিতে পবিত্র কুরআনুল কারীমের "সাত হরফ”-এর সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হলো, যা হাদীসে "হরফের বিভিন্নতা” দ্বারা “ক্বেরাতের বিভিন্নতা"কে বুঝানো হয়েছে। আর "সাত হরফ" দ্বারা "ক্বেরাতের বিভিন্নতার" সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো ক্বেরাতগুলো যদিও সাতের চেয়ে বেশি, কিন্তু ওই ক্বেরাতগুলোর মাঝে যে মতানৈক্য পাওয়া যায় তা সাত প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আমাদের ইলম অনুযায়ী এই মত ও বক্তব্য মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মাঝে সর্বপ্রথম ইমাম মালেক (রহ.)-এর নিকট পাওয়া যায়। বিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন, আল্লামা নিযামুদ্দীন কিম্মী নিশাপুরী (রহ.) স্বীয় তাফসীর "গারায়িবুল কুরআন"-এ লিখেন, "আহরুফে সাবআ”-এর ব্যাপারে ইমাম মালেক (রহ.)-এর এ মাযহাব উদ্ধৃত আছে যে, এর দ্বারা ক্বেরাতের নিম্নলিখিত সাত প্রকারের বিভিন্নতা ও মতানৈক্যকে বুঝানো হয়েছে।
১. একবচন ও বহুবচনের মতানৈক্য। এক ক্বেরাতে শব্দটি একবচন ব্যবহৃত হয়েছে আবার অন্য ক্বেরাতে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ এবং كَلِمَاتُ رَبِّكَ
২. পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা। এক ক্বেরাতে পুংলিঙ্গ এবং অন্য ক্বেরাতে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- لَا يُقْبَلُ এবং لَا تُقْبَلُ
৩. এ'রাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্নের বিভিন্নতা। কোনো ক্বেরাতে যের আবার কোনো ক্বেরাতে যবর থাকে। যেমন- هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ এবং غَيْرِ اللَّهِ
৪. 'সরফী অবস্থা' বা শব্দ-প্রকরণ শাস্ত্রের বিভিন্নতা। যেমন, এক ক্বেরাতে يَعْرِشُونَ এবং অন্য ক্বেরাতে يُعَرِّشُونَ
৫. 'নাহভী হরফ' বা অব্যয় পদের বিভিন্নতা। যেমন, এক ক্বেরাতে لَكِنَّ الشَّيَاطِينَ এবং অন্য ক্বেরাতে لَكِنِ الشَّيَاطِينُ
৬. হরফ পরিবর্তনশীল শব্দের বিভিন্নতা। যেমন, تَعْلَمُونَ ও يَعْلَمُونَ এবং نُنْشِزُهَا ও تَنْشُرُهَا
৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যেমন, তাখফীফ (জযম দিয়ে পড়া), তাফখীম (শেষ অক্ষর ছেড়ে দেওয়া), ইমালা (যের ও যবরের মধ্যবর্তী উচ্চারণ করা), মদ্দ (দীর্ঘস্বর করা) কসর (হ্রস্ব স্বর করা), ইজহার (স্পষ্ট করা), ইদগাম (মিলিয়ে পড়া) ইত্যাদি।
অতঃপর আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.), কাযী আবু বকর আত-তাইয়্যেব বাকিলানী (রহ.) এবং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এই মতকে গ্রহণ করেছেন। ক্বেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এই মত পেশ করার পূর্বে লিখেন- "আমি এই হাদীসের ব্যাপারে অসংখ্য প্রশ্নে জর্জরিত ছিলাম। ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় এর উপর গভীর চিন্তা-গবেষণায় লিপ্ত ছিলাম। এমনকি মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আমার জন্য এর এমন ব্যাখ্যা বিকশিত করে দিয়েছেন, যা সঠিক ও নির্ভুল হবে ইনশাআল্লাহ।”
এপ্রসঙ্গে সকল উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, হাদীসে বর্ণিত "সাত হরফ" দ্বারা ক্বেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সেই ক্বেরাতগুলোর প্রকারসমূহ নির্ধারণ করতে গিয়ে তাঁদের বক্তব্যের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। এর কারণ হলো, প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তা অনুযায়ী সেই ক্বেরাত বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়েছেন। এর মধ্যে যার অনুসন্ধান সবচেয়ে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং পূর্ণাঙ্গ ও সর্বগুণে গুণান্বিত তিনি হলেন, ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)। তিনি বলেন, ক্বেরাতের বিভিন্নতা (নিম্নোক্ত) সাত প্রকারেই সীমাবদ্ধ।
১. নাম বা বিশেষ্য শব্দসমূহের বিভিন্নতা। একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন এবং পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। (এর উদাহরণ দেই- وَتَمَّতْ كَلِمَتُ رَبِّكَ যা অন্য ক্বেরাতে তَمَّتْ كَلِمَاتُ رَبِّكَ বলা হয়েছে।)
২. ফেয়েল বা ক্রিয়াপদের পার্থক্য ও বিভিন্নতা। কোনো ক্বেরাতে মাদী (অতীতকাল বাচক ক্রিয়া), কোনোটিতে মুযারি' (বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল বাচক ক্রিয়া) আবার কোনোটিতে আমর (নির্দেশ বাচক ক্রিয়া) ব্যবহৃত হয়েছে। (এর উদাহরণ হলো, এক ক্বেরাতে رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا অন্য ক্বেরাতে এর স্থলে রয়েছে- رَبَّنَا بَعِّدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا)
৩. এ'রাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্নের বিভিন্নতা। বিভিন্ন ক্বেরাতে বিভিন্ন কারক চিহ্ন বা হরকত বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। (এর উদাহরণ হলো, لَا يُضَارُّ كَاتِبٌ ও لَا يُضَارَّ كَاتِبٌ এবং ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ ও ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدِ)
৪. শব্দের কম-বেশি হওয়ার বিভিন্নতা। এক ক্বেরাতে কোনো শব্দ কম আছে। আর অন্য ক্বেরাতে বেশি আছে। (যেমন, এক ক্বেরাতে وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنثَى আছে। আর অন্য ক্বেরাতে وَالذَّكَرَ وَالْأُنثَى আছে। এখানে وَمَا خَلَقَ শব্দের উল্লেখ নেই। অনুরূপভাবে এক ক্বেরাতে تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ আছে। আর অন্য ক্বেরাতে تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ আছে)।
৫. তাব্দীম-তা'খীর বা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শব্দের বিভিন্নতা। এক ক্বেরাতে কোনো শব্দকে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার অন্য ক্বেরাতে সেটাকে পরে উল্লেখ করা হয়েছে। (যেমন, وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْحَقِّ بِالْمَوْتِ এবং وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ)
৬. বদল বা শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতা। এক ক্বেরাতে এক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য ক্বেরাতে তার স্থলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। (যেমন, تُنْشِرُهَا এবং نَنْشُرُهَا । অনুরূপভাবে فَتَبَيَّنُوا এবং تَتَثَبَّتُوا আর طَلْحٍ এবং طَلْعٍ।
৭. উচ্চারণের সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যার মধ্যে তাফখীম, তারকীক, ইমালা, কসর, মদ্দ, হাম্য, ইজহার ও ইত্যাদির বিভিন্নতা শামিল রয়েছে। (যেমন, مُوسَى শব্দটিকে এক ক্বেরাতে ইমালা করে مُوْسَى এর ন্যায় পড়া হয়। আবার অন্য ক্বেরাতে ইমালা ব্যতীত।)

আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং কাযী আবু তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত বিভিন্নতার কারণগুলোও এ বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তবে ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)-এর অনুসন্ধান এ জন্য এত বেশি সমৃদ্ধ বলে মনে হয় যে, এতে কোনো প্রকারের মতানৈক্য ও বিভিন্নতা বাদ পড়েনি। পক্ষান্তরে বাকি তিনজন গবেষকের বর্ণিত কারণগুলোর মধ্যে শেষ প্রকার অর্থাৎ সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা বর্ণনা করা হয়নি। আর ইমাম মালেক (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত বিভিন্নতার মধ্যে সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতার বর্ণনা তো করা হয়েছে, কিন্তু শব্দের কম-বেশি, পূর্ববর্তী-পরবর্তী এবং শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতার বিষয়গুলো পুরোপুরি ফুটে উঠেনি।
এর বিপরীত ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.) অনুসন্ধান ও গবেষণায় এ সকল প্রকার বিভিন্নতা ও মতানৈক্য সুস্পষ্টভাবে গ্রন্থিত হয়েছে। বিদগ্ধ গবেষক ইবনুল জাযারী (রহ.) যিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত চিন্তা-গবেষণা করার পর 'সাত হরফ'কে ক্বেরাতের সাত প্রকারের বিভিন্নতার উপর প্রয়োগ করেছেন, তিনিও ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)-এর বক্তব্য বড় সম্মানের সাথে উদ্ধৃত করেছেন এবং এর উপর কোনো প্রকার অভিযোগ-আপত্তি উত্থাপন করেননি। বরং তাঁর আলোচনার সমষ্টি থেকে বুঝা যায় যে, ইমাম আবুল ফযল (রহ.)-এর অনুসন্ধান তাঁর নিজের অনুসন্ধানের চেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।
এতদ্ব্যতীত হাফেয ইবনে হাযার আসকালানী (রহ.)-এর বক্তব্য থেকেও অনুভূত হয় যে, তিনি উক্ত তিনটি বক্তব্যের মাঝে ইমাম রাযী (রহ.)-এর অনুসন্ধান ও বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা তিনি আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন- هَذَا وَجْهٌ حَسَنٌ (এটা সর্বোত্তম ব্যাখ্যা)। অতঃপর ইমাম আবুল ফযল (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত সাত প্রকার সম্পর্কে লিখেন- "আমার ধারণা, তিনি (ইমাম আবুল ফযল রাযী) ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে সুসজ্জিত করেছেন।"
শেষ যুগে শায়েখ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.) ও তাঁর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট দলীল-প্রমাণাদি পেশ করেছেন। যা হোক, অনুসন্ধানের প্রকারের মাঝে মতানৈক্য আছে ঠিক; তবে ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী বাকিল্লানী (রহ.) সকলেই এ কথার উপর এক মত যে, হাদীসে বর্ণিত "সাত হরফ" দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ক্বেরাতের ওই বিভিন্নতা যা সাত প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে আমার দৃষ্টিতে "সাত হরফ”-এর এই ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে উত্তম। হাদীসের মর্মার্থ এটাই বুঝে আসে যে, কুরআনুল কারীমের শব্দগুলো বিভিন্নভাবে পড়া যেতে পারে। আর এই বিভিন্ন পদ্ধতিগুলো ধরন হিসেবে সাত প্রকার।

টিকাঃ
১৬৯. 'গারায়েবুল কুরআন ওয়া রাগায়েবুল ফুরকান': টীকা ইবনে জারীর: ১/২১ মিসর। নিশাপুরী
১৭০. ফাতহুল বারী: ১/২৫-২৬, ইতকান: ১/৪৭ এবং তাফসীরে কুরতুবী ১/৪৫।
১৭১. আন্ নশরু ফী কিরাতিল আশর: ১/২৬
১৭২. ফাতহুল বারী: ৯/২৪
১৭৩. আন্ নশরু ফী কিরাতিল আশর: ১/২৭-২৮
১৭৪. ফাতহুল বারী: ৯/২৪
১৭৫. মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন: ১/১৫৪-১৫৬

📘 উলুমুল কুরআন 📄 এই বক্তব্যটির অগ্রাধিকারের কারণসমূহ

📄 এই বক্তব্যটির অগ্রাধিকারের কারণসমূহ


"সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হাদীস, তাফসীর ও উলুমুল কুরআনের কিতাবসমূহে যতগুলো ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হয়েছে, আমাদের দৃষ্টিতে সেগুলোর মধ্যে এ বক্তব্যটি (সাত হরফ দ্বারা ক্বেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো) সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত, নির্ভরযোগ্য এবং মেনে নেওয়ার মতো। তার কারণগুলো নিয়ে আলোকপাত করা হলো:
১. এ বক্তব্য অনুযায়ী "হরফ" এবং "ক্বেরাত" পৃথক পৃথক দু'টি বিষয় সাব্যস্ত করার প্রয়োজন পড়ে না। আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.) ও ইমাম তহাভী (রহ.)-এর বক্তব্যসমূহে একটি যৌথ সমস্যা রয়েছে যে, এতে এ কথা মেনে নিতে হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের মাঝে দু'ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। একটি হলো, হরফের মতানৈক্য। আরেকটি হলো, ক্বেরাতের মতানৈক্য। হরফের মতানৈক্য তো এখন বিলুপ্ত আর ক্বেরাতের মতানৈক্য এখনো বহাল রয়েছে। অথচ হাদীসের এত বিশাল ভান্ডারে এমন একটি দুর্বল হাদীসও পাওয়া যায় না, যার দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত হয় যে, “হরফ” এবং "ক্বেরাত” দু'টি পৃথক পৃথক বিষয়। হাদীসের ভান্ডারে শুধুমাত্র হরফের মতানৈক্যের কথা পাওয়া যায়। আর এর জন্য ই অধিকহারে "ক্বেরাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। "ক্বেরাত” যদি ওই "হরফগুলো” থেকে পৃথক হতো, তাহলে কোনো না কোনো হাদীসে এর প্রতি অবশ্যই ইঙ্গিত থাকত। পরিশেষে এ কথার কোন্ যুক্তি আছে যে, "হরফ”-এর মতানৈক্য সংক্রান্ত হাদীসটি প্রায় তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় এসে পৌঁছেছে, অথচ “ক্বেরাত”-এর পৃথক আলোচনা একটি হাদীসেও নেই? অতএব, নিজের ধারণা-প্রসূত কেয়াস দ্বারা এ কথা কিভাবে বলে দেওয়া সম্ভব যে, হরফের মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছাড়াও পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দাবলীর মাঝে আরেক প্রকার ভিন্নতা ছিল? উপরোল্লিখিত (ইমাম আবুল ফযল রাযী (রহ.)-এর) বক্তব্যে এই সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। কারণ এতে “হরফ” এবং “ক্বেরাত”কে অভিন্ন প্রকার সাব্যস্ত করা হয়েছে।
২. আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এ কথা স্বীকার করতে হয় যে, সাত হরফের মধ্য হতে ছয় হরফ রহিত বা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। একমাত্র কুরাইশী হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। (বর্তমান ক্বেরাত ওই কুরাইশী হরফের আদায়গত বিভিন্নতা)। এ বক্তব্যের দুর্বলতাগুলো আমরা সামনে বর্ণনা করবো। উপরোল্লিখিত শেষ বক্তব্যটিতে (অর্থাৎ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যটিতে) এসব নিন্দনীয় বিষয় নেই, কেননা এ বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফের সবগুলো আজও অবশিষ্ট ও সংরক্ষিত আছে।
৩. এই (অগ্রাধিকার প্রাপ্ত) বক্তব্য অনুযায়ী কোনো প্রকার তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে "সাত হরফ"-এর সঠিক অর্থ অবিকৃত থাকে। পক্ষান্তরে অন্যান্য বক্তব্যের মাঝে হয়তো "হরফ"-এর অর্থের মধ্যে নতুবা "সাত" সংখ্যার মধ্যে তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা করতে হয়।
৪. "সাত হরফ"-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যত উলামায়ে কেরামের বক্তব্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান এবং নববী যুগের নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম মালেক (রহ.)। আর আল্লামা নিশাপুরী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী তিনিও এই বক্তব্যেরই প্রবক্তা।
৫. আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) উভয়ে ছিলেন ইলমে ক্বেরাতে সর্বজনস্বীকৃত ইমাম। আর তাঁরা উভয়েই এই বক্তব্যের প্রবক্তা। মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর বক্তব্য তো পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, তিনি ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় ধরে চিন্তা-গবেষণা করার পর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 “হরফে সাব’আ” এখনো সংরক্ষিত নাকি পরিত্যক্ত?

📄 “হরফে সাব’আ” এখনো সংরক্ষিত নাকি পরিত্যক্ত?


سبعة احرف বা সাত হরফের অর্থ নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এ সাত হরফ এখনো অবশিষ্ট আছে নাকি নেই? এ বিষয়ে মুতাক্কাদিমীন বা পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে তিনটি মতামত বা বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।

১. প্রথম বক্তব্য হচ্ছে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) এবং তাঁর অনুসারীদের। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করে এসেছি যে, তাঁদের নিকট সাত হরফ দ্বারা আরবের গোত্রভিত্তিক সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। এ কথার উপর ভিত্তি করেই তিনি বলেন যে, হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত পবিত্র কুরআনুল কারীম সাত হরফে পড়া হতো। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে যখন ইসলাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করল, তখন এ সাত হরফের তাৎপর্য সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে মানুষের মধ্যে বাক-বিতন্ডা শুরু হতে লাগল। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা বিভিন্ন হরফে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করতো এবং একে অন্যের তেলাওয়াতকে ভুল আখ্যায়িত করত।

এ ফেতনাকে নির্মূল করার জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণের পরামর্শে গোটা উম্মতকে শুধু এক হরফ তথা কুরাইশী ভাষা অনুযায়ী কুরআন তেলাওয়াতের নিমিত্তে সাতটি মাসহাফ সুবিন্যস্ত করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। আর বাকি সব মাসহাফকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। যেন আর কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হতে না পারে। সুতরাং এখন কেবল কুরাইশী ভাষার হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। আর অবশিষ্ট ছয় হরফ সংরক্ষিত রয়নি। আর ক্বেরাতের যে মতানৈক্য আজ পর্যন্ত চলে আসছে, সেগুলো সেই কুরাইশী এক হরফ আদায়ের বিভিন্ন পদ্ধতি মাত্র।

টিকাঃ
১৮২. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px