📄 পুনঃ অবতরণ ও এর তাৎপর্য
কখনো কখনো এমন হয় যে, একই আয়াত একাধিকবার অবতীর্ণ হয়েছে। আর প্রতিবারেই এর অবতরণ নতুন নতুন কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে হয়েছে। এখন একজন বর্ণনাকারী এক অবতরণের ঘটনা বর্ণনা করে দিয়েছেন। আবার অন্য একজন আরেক অবতরণের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এতে বাহ্যিকভাবে বৈপরীত্য মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এ দুই বর্ণনার মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ দু'টি ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়াতটি দু'বার অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন, ইমাম বুখারী (রহ.) ও ইমাম মুসলিম (রহ.) উদ্ধৃত করেছেন যে, যখন নবী কারীম (সা.)-এর প্রিয় চাচা আবু তালেব মৃত্যু শয্যায় শায়িত, তখন নবী কারীম রাসূলুল্লাহ (সা.) তার কাছে গিয়ে বললেন, চাচাজান! আপনি 'লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে দিন। তারপর আমি মহান আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনার জন্য সুপারিশ করব। তখন সেখানে আবু জাহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়্যাও উপস্থিত ছিল। তারা আবু তালেবকে ঈমানের প্রতি ঝুঁকতে দেখে সাথে সাথে বলে উঠল, "তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছ?” এরপর তারা দু'জন এ কথাটি বারবার আওড়াতে থাকল। এমনকি এক পর্যায়ে আবু তালেব বলে উঠল, "আমি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরই আছি।” রাসূলে কারীম (সা.) বললেন, আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করতে থাকব, যতক্ষণ না আমাকে এ থেকে বারণ না করা হবে। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়- مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ 'নবী এবং মুমিনদের জন্য এই এখতেয়ার নেই যে, তাঁরা মুশরিকদের জন্য মাগফিরাত কামনা করবে।' অন্যদিকে ইমাম তিরমিযী (রহ.) হযরত আলী থেকে 'হাসান' সনদের সাথে বর্ণনা করেন যে, আমি এক ব্যক্তিকে তার মুশরিক পিতা-মাতার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে শুনলাম। আমি তাকে বললাম, তোমার পিতা-মাতা তো মুশরিক ছিল। কিভাবে তুমি তাদের জন্য দুআ করছ? সে জবাবে বলল, হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তো নিজের পিতার জন্য দু'আ করেছিলেন। অথচ তাঁর পিতা ছিল একজন মুশরিক। আমি এ কথা রাসূলে কারীম (সা.)-এর নিকট উল্লেখ করলাম। তখন এই আয়াত নাযিল হয়েছে। তৃতীয়তঃ ইমাম হাকেম প্রমুখ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী কারীম (সা.) একদিন কবরস্থানে তাশরীফ নিয়ে আসলেন। একটি কবরের পাশে এসে অনেকক্ষণ পর্যন্ত দুআ করলেন এবং কান্না করলেন। তারপর বললেন, যে কবরের পাশে আমি বসে ছিলাম তা ছিল আমার আম্মাজানের কবর। আমি আমার পালনকর্তার কাছে তাঁর জন্য দুআ করার অনুমতি প্রার্থনা করলাম, কিন্তু অনুমতি পাওয়া গেল না। তখন এই আয়াত নাযিল হলো- مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا। এখানে তিনটি ঘটনার সবটিকেই একই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন- উপরোক্ত তিনটি ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়াতটি পৃথক পৃথকভাবে তিনবার নাযিল হয়।
এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, যখন একটি আয়াত একবার নাযিল হয়েছে এবং সেটাকে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে আর রাসূলে আকরাম (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামেরও তা আত্মস্থ হয়ে গেছে তাহলে দ্বিতীয় বার আবার এবং তৃতীয় বার আবার তা নাযিল করার ফায়দা কি? হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) এ প্রশ্নের চমৎকার একটি জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, تَكْرَارُ النُّزُوْلِ "তাকরারে নুযূল" বা পুনঃ অবতরণের উপরোল্লিখিত ক্ষেত্রসমূহে মূলতঃ অবতরণ একবারই হয়েছে। কিন্তু যে ঘটনা প্রসঙ্গে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন সে ধরনেরই আরেকটি ঘটনা ঘটে তখন ওই আয়াতটি নবী কারীম (সা.)-এর পবিত্র অন্তরে দ্বিতীয়বার আবার ঢেলে দেওয়া হয়। যার উদ্দেশ্য এই হয়ে থাকে যে, এই ঘটনায়ও ওই আয়াত দ্বারা দিক-নির্দেশনা পাওয়া যাবে। অন্তরের মধ্যে এই আয়াতটা পুনঃ উপস্থিত হওয়াটা যেহেতু মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে তাই এটা ওই وَحْيٌ قَلْبِيٌّ "অন্তকরণ" যা ওহীরই একটি প্রকার। এভাবে নাযিল হওয়াটাকে মুফাসসিরীনে কেরাম "নুযূলে মুকাররার" বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। যতবার তা মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে অন্তরে ঢেলে দেওয়া হয়েছে, ততবারই তা অবতীর্ণ হয়েছে বলে ধরা হয়। শানে নুযূলের রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে যেসব বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় উপরোল্লিখিত মূলনীতিগুলোর অনুসরণে সাধারণত সহজেই তা বিদূরিত হয়ে যায়। আর এই মূলনীতিগুলো আত্মস্থ থাকলে রেওয়ায়েতের মতানৈক্যের ক্ষেত্রে মুশকিল দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবতারণা হয় না।
টিকাঃ
১৪৯. উক্ত উদাহরণটি "আল-ইতকান": ১/৩৪ থেকে উদ্ধৃত। কিন্তু এটা তখনই প্রযোজ্য হবে যখন তিনটি রেওয়ায়েতকেই সঠিক বলে ধরে নেওয়া হবে। অন্যথায় তৃতীয় রেওয়ায়েতটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে কথাবার্তা রয়েছে। যেমন, হাফেয যাহাবী (রহ.) এ ব্যাপারে লিখেন, قلت ايوب بن ہانی ضعفه این معین [আমি বলছি, ইবনে মাঈন আইউব ইবনে হানীকে দুর্বল হিসেবে গণ্য করেছেন।] (মুসতাদরাক: ২/৩৩৬) আইউব ইবনে হানী সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) জারাহ্ ও তা'দীল বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মতামত উদ্ধৃত করেছেন। (তাহযীবুত তাহযীব: ১/৪১৪) তাই এই রেওয়ায়েতকে যেমন বানোয়াট বলা যায় না আবার তেমনি এর উপর আকীদা সংক্রান্ত কোনো মাসআলার ভিত্তিও রচনা করা যায় না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশাল একটি দল বহু দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে বলেন যে, রাসূলে কারীম (সা.)-এর পিতা-মাতা মিল্লাতে ইবরাহীমির উপর ইন্তেকাল করার ভিত্তিতে তাঁরা মুমিন ছিলেন। স্বয়ং আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) এ বিষয়ে স্বতন্ত্র একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন।
১৫০. আল ফাউযুল কাবীর: পৃঃ ২২