📄 শানে নুযূল এবং আহকামের উমুম ও খুসুস
পবিত্র কুরআনুল কারীমের যে সকল আয়াত কোনো শানে নুযূল বা ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে, সেগুলো উমূম-খুসূস বা ব্যাপকত্ব ও বিশেষত্বের দিক থেকে ৪ প্রকার।
১. ওই সকল আয়াত যেগুলোতে নির্দিষ্টভাবে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আয়াতের বিষয়বস্তু ওই ব্যক্তির সাথেই সংশ্লিষ্ট। এ সব আয়াতের ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম একমত যে, ওই আয়াতের বিষয়বস্তু সেই বিশেষ ব্যক্তির সাথেই সীমিত থাকবে। অন্য কোনো ব্যক্তি এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। যেমন- পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, 'ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দু'হাত (تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ) এই আয়াতের শানে নুযূল একেবারে প্রসিদ্ধ যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশের লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন তখন আবু লাহাব বলেছিল- تَبَّاً لَكَ أَلِهَذَا دَعَوْتَنَا 'ধ্বংস হোক তোমার, এ জন্যই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছ?' এর উপর ভিত্তি করে এই আয়াত নাযিল হয়েছে। এতে বিশেষভাবে আবু লাহাবের নাম নিয়ে তার ধ্বংসের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ ধমকি ও ধ্বংস তার জন্যই প্রযোজ্য হবে।
২. ওই সকল আয়াত যেগুলোতে বিশেষ কোনো ব্যক্তি, সম্প্রদায় কিংবা কোনো বস্তুর নাম উল্লেখ না করে বরং তার কিছু গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে এবং সে গুণাবলীর উপর কোনো হুকুম লাগানো হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য দলীল, প্রমাণ দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত আছে যে, এর দ্বারা অমুক নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায় কিংবা নির্দিষ্ট বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। এ ধরনের আয়াতের ব্যাপারেও উলামায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেন যে, এ আয়াতের বিষয়বস্তু বা হুকুম বিশেষভাবে শুধু ওই ব্যক্তি বা সম্প্রদায় কিংবা বস্তুর সাথেই নির্দিষ্ট থাকবে, যা কুরআনের উদ্দেশ্য। অন্য কেউ এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। চাই এসব গুণাবলী তার মাঝেও পাওয়া যায়। যেমন সূরা 'লাইল'-এ ইরশাদ হয়েছে- وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى الَّذِي يُؤْتِي مَا لَهُ يَتَزَكَّى 'অর্থাৎ তা থেকে দূরে রাখা হবে এমন ব্যক্তিকে যে আল্লাহকে খুব বেশি ভয় করে, যে পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশে নিজের ধন-সম্পদ দান করে'।
সমস্ত উলামায়ে কেরাম এই ব্যাপারে একমত যে, এই আয়াত হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। যিনি দরিদ্র দাস-দাসীদের ক্রয় করে মুক্ত করে দিতেন। এখানে যদিও হযরত আবু বকরের নাম উল্লেখ নেই। তবে গুণাবলী তাঁরই বর্ণনা করা হয়েছে। আর হাদীসের বর্ণনা থেকেও প্রমাণিত যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হযরত আবু বকর (রা.)। কাজেই এই আয়াতের ফযীলত প্রাপ্ত একমাত্র তিনিই। অন্য কেউ তাতে শরীক নেই। এ জন্য ইমাম রাযি (রহ.) এই আয়াতের মাধ্যমে দলীল পেশ করেন যে, আম্বিয়ায়ে কেরামের পরে হযরত আবু বকর (রা.) সমগ্র মানব জাতির মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান। কেননা, এই আয়াতে তাঁকে الْأَتْقَى (অধিকতর মুত্তাকী) বলা হয়েছে।
অন্য এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে- إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ 'তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন।' সর্বোপরি এখানে হযরত আবু বকরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এতদসত্ত্বেও সমস্ত মুফাসসিরীন এই আয়াতকে বিশেষ করে তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট করেছেন। কারণ এখানে ব্যাপকতা থেকে ব্যক্তি বিশেষের প্রতি নির্দিষ্ট করার পক্ষে দু'টি দলীল রয়েছে। একটি হলো أَتْقَاكُمْ শব্দের আলিফ-লামটি আহ্দী। অর্থাৎ শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। দ্বিতীয় দলীল হলো, হাদীসের বর্ণনা তাঁকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। অতএব, যদি অন্য কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাহে নিজের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে তার বিনিময়ে সে যত সওয়াবের অধিকারীই হোক না কেন, উল্লিখিত আয়াতে বর্ণিত মর্যাদার অধিকারী সে কখনো হতে পারবে না।
৩. ওই সকল আয়াত যা বিশেষ কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে। তবে এর শব্দগুলো আম বা ব্যাপক। আয়াতের বাহ্যিক শব্দাবলী কিংবা বহিরাগত কোনো দলীলের মাধ্যমে এটা জানা যায় যে, আয়াতের হুকুম শুধু এ ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এ জাতীয় সকল ঘটনার ক্ষেত্রেই এই হুকুম প্রযোজ্য। এ প্রকারের আয়াতের ব্যাপারেও সকল উলামা একমত যে, এ ক্ষেত্রে আয়াতের হুকুম তার শব্দগুলোর অনুগামী হয়ে ব্যাপকত্ব লাভ করবে। এর হুকুম শুধু শানে নুযূলের ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যেমন, সূরা 'মুজাদালাহ'-এর প্রাথমিক আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে এ কথা সাব্যস্ত আছে যে, হযরত খাওলা (রা.)-এর ব্যাপারে তা নাযিল হয়েছিল। তাঁর স্বামী তাঁকে বলেছিল (أنت علي كظهر أمي) (তুমি আমার উপর আমার মায়ের পিঠের মতো)। কিন্তু আয়াতে যে শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে হুকুম বর্ণনা করা হয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে এ কথার বর্ণনা দেয় যে, এ হুকুম শুধু খাওলা (রা.)-এর স্বামীর জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং প্রত্যেক ওই ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য যে তার স্ত্রীর সাথে 'যিহার' করবে অর্থাৎ উপরেল্লিখিত শব্দগুলো বলবে। (এ সমস্ত লোকদের উপর ওয়াজিব হলো, তারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সহবাসের পূর্বেই একটি গোলাম আযাদ করবে অথবা ষাটটি রোযা রাখবে কিংবা ষাটজন মিসকীনকে আহার করাবে।)
৪. ওই সকল আয়াত যা বিশেষ কোনো ঘটনা প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। কিন্তু তার শব্দমালা ব্যবহার করা হয়েছে আম বা ব্যাপক। আর আয়াত বা বহিরাগত কোনো দলীলের মাধ্যমে এটা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না যে, এই আয়াতের হুকুম বা বিষয়বস্তু এ আয়াতের সাথেই নির্দিষ্ট নাকি এ ধরনের প্রত্যেক ঘটনার সাথে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য? এ ধরনের আয়াতের ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের মাঝে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। কারো কারো বক্তব্য হলো, এ ক্ষেত্রে আয়াতকে শুধু তার শানে নুযূলের সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ রাখা হবে। কিন্তু জমহুর উলামা ও ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত এর বিপরীত। তাঁদের বক্তব্য হলো, এ ক্ষেত্রে শানে নুযুলের বিশেষ ঘটনার পরিবর্তে শব্দমালা উমুম বা ব্যাপকত্ব ধর্তব্য হবে এবং আয়াতের শব্দমালার ব্যাপকতা যেসব ক্ষেত্রকে শামিল করবে, সেসব ক্ষেত্রকে ও আয়াতের হুকুমটি প্রযোজ্য হবে। এই মূলনীতির জন্যই উসূলে ফিকাহ ও উসূলে তাফসীর বিশারদদের নিকট এ কথাটি খুবই প্রসিদ্ধ আছে-
العبرة لعموم اللفظ لا بخصوص السبب 'শব্দের ব্যাপকতাই ধর্তব্য, শানে নুযুলের নির্দিষ্ট ঘটনা নয়।'
কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এই মতপার্থক্য আপন আপন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। অন্যথায় কার্যক্ষেত্রে এর বিশেষ কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। কারণ যারা কুরআনের আয়াতকে তার শানে নুযূলের ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ রাখেন, কার্যক্ষেত্রে তাঁরাও এই আয়াতের হুকুমকে এ ধরনের অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে থাকেন। তবে পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, জমহুর উলামায়ে কেরামের মতানুযায়ী হুকুমের উৎস হচ্ছে, ওই আয়াত। আর এরা অন্য কোনো শরঈ দলীল যেমন- হাদীস, ইজমা বা কেয়াসকে হুকুমের উৎস হিসেবে নিরূপণ করেছেন।
পরিষ্কারভাবে বুঝার জন্য একটি উদাহরণ দেখুন। সূরা বাকারায় বর্ণিত হয়েছে-
وَإِن كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ 'যদি সে (ঋণ গ্রহণকারী) দরিদ্র হয়, তবে স্বচ্ছল অবস্থা আসা পর্যন্ত অবকাশ দিবে।'
এই আয়াতের শানে নুযূল হলো, বনু আমর ইবনে উমাইরের কাছ থেকে বনু মুগীরা কিছু ঋণ গ্রহণ করেছিল। যখন শরীয়তে সুদ হারাম হয়ে গেল, তখন বনূ আমর বনূ মুগীরাকে বলল, আমরা সুদ তো বর্জন করেছি, তবে আসল ঋণ ফেরত দাও। তখন বনূ মুগীরা বলল, এ মুহূর্তে আমরা চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত। তাই আমাদেরকে কিছু অবকাশ দাও। বনূ আমর অবকাশ দিতে সম্মত হলো না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।
এই আয়াতের বিধান এখন সর্বসম্মতিক্রমে আম বা ব্যাপক। প্রত্যেক ঋণদাতার জন্য উত্তম হলো, ঋণগ্রহীতাকে অসচ্ছল দেখলে সচ্ছলতা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিবে। তবে পার্থক্য এতটুকু যে, জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে হুকুমের এই ব্যাপকতা এ আয়াত থেকেই সাব্যস্ত হয়েছে। আর যারা আয়াতকে শানে নুযূলের ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ রাখেন তারা বলেন, আয়াতের বিধান তো শুধু বনূ আমরের জন্য ছিল। তবে অন্যান্য মুসলমানদের জন্য এ হুকুম ওই সকল হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়েছে, যেগুলোতে ঋণদাতাকে অবকাশ দেওয়ার ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, কার্যত এ মতবিরোধের মধ্যে বিশেষ কোনো ফলাফল পরিলক্ষিত হয় না।
টিকাঃ
১২১. সূরা লাহাব: ১
১২২. আসবাবুন নুযূল : পৃঃ ২৬১
১২৩. সূরা লাইল: ১৭-১৮
১২৪. প্রাগুক্ত: পৃ: ২৫৫
১২৫. সূরা হুযুরাত: ১৩
১২৬. এ প্রকারের আরো বিশদ বর্ণনা ও উদাহরণের জন্য দেখুন, "আল-ইতকান" ১/৩০
১২৭. আসবাবুন নুযূল: পৃঃ ২৩১
১২৮. সূরা বাকারা: ২৮০
১২৯. আসবাবুন নুযূল: ৫১
১৩০. এখানে এই মাসআলাটির সারকথা অত্যন্ত সংক্ষেপে পেশ করা হলো। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আল্লামা যারকাশী (রহ.) রচিত "আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন" ১/২৪, আল-ইতকান: ১/৩০, মানাহিলুল ইরফান: ১/১১৮-১২৭।
📄 শানে নুযূল ও বর্ণনার বিভিন্নতা
পবিত্র কুরআনুল কারীমের তাফসীরের ক্ষেত্রে শানে নুযূলের ধারাবাহিকতায় অনেক বড় একটি সমস্যা হলো এই যে, একই আয়াতের শানে নুযূল একাধিক ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। যে ব্যক্তি তাফসীরের মূলনীতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নয়, সে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও বিভিন্ন প্রকার সংশয় ও সন্দেহে নিপতিত হয়ে যায়। তাই এখানে বর্ণনার বিভিন্নতার হাকীকত সম্পর্কে জেনে নেওয়া অপরিহার্য। উসূলে তাফসীর ও উসূলে ফিকাহ-এর বিশেষজ্ঞগণ এ ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা বর্ণনা করেছেন। এখানে সেগুলোর সারাংশ পেশ করা হচ্ছে।
১. সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ এবং তাবেঈন (রহ.)-গণের অভ্যাস ছিল যে, তাঁরা কোনো আয়াতের তাফসীরের ক্ষেত্রে نَزَلَتِ الْآيَةُ فِي كَذَا (এ আয়াত অমুক মাসআলা বা অমুক ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে) শব্দগুলো ব্যবহার করতেন। এই শব্দগুলো দ্বারা বাহ্যিকভাবে এ ধোঁকার সম্ভাবনা দেখা দেয় যে, এর দ্বারা তাঁরা আয়াতের শানে নুযূল বর্ণনা করছেন। অথচ এর দ্বারা সব সময় শানে নুযূল বর্ণনা করা তাঁদের উদ্দেশ্য হয় না। বরং অধিকাংশ সময় এর দ্বারা তাঁদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে যে, অমুক মাসআলা বা অমুক বিষয়টি এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সূরা নিসায় মহান আল্লাহ পাক ইবলীসের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন-
وَلَأُمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ
'আর আমি তাদেরকে (মানুষকে) নির্দেশ প্রদান করব। ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করে দিবে।'
এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) এবং ইকরিমা (রা.) সহ অন্যান্যদের থেকে বর্ণিত আছে যে, আয়াতটি খাসী (অন্ডকোষ বের করে ফেলা) হওয়ার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে কেউ অন্ড-কোষ ছেঁটে খাসী হয়ে গেছে এবং ওই ঘটনাটি এই আয়াতের শানে নুযূল হয়েছে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, 'খাসী হওয়া' ওই সকল শয়তানী কর্মকান্ডের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোকে শয়তান (আল্লাহসৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন) করার দ্বারা ব্যক্ত করেছে। অন্যথায় এই আয়াতের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, "আল্লাহ সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন" কেবল খাসী হওয়ার মধ্যেই সীমিত। বরং এর আরো অনেক প্রকার হতে পারে। যেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা তাফসীরের কিতাবসমূহে বর্ণিত আছে। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ এবং তাবেঈন (রহ.)-গণের বর্ণনাশৈলী দ্বারা শানে নুযূলের ক্ষেত্রে দু'টি মূলনীতি স্পষ্ট হয়ে যায়।
(ক) যদি কোনো একটি আয়াতের তাফসীরে ভিন্ন ভিন্ন দু'টি বর্ণনা থাকে এবং উভয় বর্ণনায় (نَزَلَتِ الْآيَةُ فِي كَذَا) শব্দমালা ব্যবহার করা হয়, তবে বর্ণনা দু'টিতে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের কথা উল্লেখ থাকে, তাহলে বাস্তবে এই দুই বর্ণনার মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই। বরং নিজ নিজ স্থানে উভয় বর্ণনাই সঠিক। কারণ উভয় বর্ণনার মধ্য হতে কোনোটি দ্বারা এই উদ্দেশ্য হয় না যে, এ ব্যাপারটি আয়াতের শানে নুযূল। বরং উদ্দেশ্য হলো এ কথা বুঝানো যে, এ বিষয়টি আয়াতের মর্মার্থ ও হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন নিজের নেক বান্দাদের আলোচনা করতে গিয়ে পবিত্র কুরআন মাজীদে বলেছেন- تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ 'তাঁদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে পৃথক থাকে।' এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, যে সকল সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়টা নফল পড়ে কাটাতেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে এই আয়াত নাযিল হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় তাঁর থেকেই বর্ণিত আছে যে, এই আয়াত ওই সকল সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে, যারা ইশার নামাযের অপেক্ষায় জাগ্রত থাকতেন। আবার কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরামের মতে এই আয়াত তাহাজ্জুদগুজার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে। এখন বাহ্যিকভাবে এই মতানৈক্য শানে নুযূলের মতানৈক্য বলে মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলো আয়াতের বিভিন্ন উদ্দেশ্য। আর এ সবগুলো নেক আমল আয়াতের মর্মার্থের মধ্যে শামিল।
(খ) দ্বিতীয় মূলনীতি হলো, যদি কোনো একটি আয়াতের তাফসীরে দু'টি বর্ণনা পাওয়া যায়, একটির মধ্যে نَزَلَتِ الْآيَةُ فِي كَذَا শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় বর্ণনায় সরাসরি কোনো ঘটনাকে আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলে শানে নুযূলের জন্য এখানে দ্বিতীয় বর্ণনাটিই নির্ভরশীল। আর প্রথম বর্ণনা যেহেতু সরাসরি শানে নুযূলের মর্মার্থের অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই সেটাকে বর্ণনাকারীর নিজের ইজতেহাদ বা গবেষণা হিসেবে প্রযোজ্য হবে। যেমন, পবিত্র কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে- نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ 'তোমাদের স্ত্রী তোমাদের ফসলক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা যেভাবে চাও তোমাদের ফসলক্ষেত্রে গমন কর।' এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী (রহ.) ইবনে ওমর (রা.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃতি করে বলেন- أُنْزِلَتْ فِي إِتْيَانِ النِّسَاءِ فِي أَدْبَارِهِنَّ (স্ত্রীর সাথে পশ্চাৎপথে সহবাস করার ব্যাপারে এই আয়াত নাযিল হয়েছে)। অথচ হযরত জাবের (রা.) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু)-সহ প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ সুস্পষ্টভাবে এর শানে নুযূল বর্ণনা করেন এই যে, ইহুদীদের ধারণা ছিল, 'যদি পশ্চাৎ দিক থেকে সম্মুখের অংশেই স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হয় তাহলে সন্তান বিকলাঙ্গ হয়।' তাদের এই ভ্রান্ত ধারণাকে নির্মূলের উদ্দেশে এই আয়াত নাযিল হয়েছে। আর এই আয়াত এটা স্পষ্ট করে দিল যে, সহবাসের স্থান ওই একটাই। অর্থাৎ সম্মুখের অংশ, যে পথ দিয়ে সন্তান জন্ম নেয়। তবে পথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। উপরোক্ত দু'টি বর্ণনার মাঝে যেহেতু হযরত জাবের (রা.) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট, তাই এটাই অগ্রাধিকার পাবে। পক্ষান্তরে হযরত ইবনে ওমর (রা.)-এর বক্তব্যকে তাঁর ইজতেহাদ ও গবেষণা বলে গণ্য করা হবে। আর মূলত এই আয়াতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, এই আয়াতের আলোকে পশ্চাৎ পথ দিয়ে সহবাস জায়েয। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এই আয়াতের আলোকে নারীদের সাথে সমকামিতা হারাম প্রমাণিত হয়।
২. শানে নুযূল নির্ধারণ করার দ্বিতীয় মূলনীতি হচ্ছে, যদি দু'টি বর্ণনার মধ্য হতে একটি বর্ণনার সনদ সহীহ হয় আর দ্বিতীয় বর্ণনার সনদ দুর্বল বা অসম্পূর্ণ হয়, তাহলে সহীহ সনদ সম্বলিত বর্ণনাটি গ্রহণ করে দুর্বল সনদ সম্বলিত বর্ণনাটি বর্জন করতে হবে। যেমন, সূরা দোহা'র প্রাথমিক আয়াতগুলো- وَالضُّحَى (1) وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَى (2) مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى (3) 'সকালের উজ্জ্বল আলোর শপথ, রাতের শপথ যখন তা হয় শান্ত-নিঝুম, তোমার প্রতিপালক তোমাকে কক্ষনো পরিত্যাগ করেননি, আর তিনি অসন্তুষ্টও নন।'
এই আয়াতের শানে নুযূলে ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহ.) হযরত জুনদুব (রা.)-এর এই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন যে, একবার শারীরিক কোনো কষ্টের কারণে নবী কারীম (সা.) এক বা দু'রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়তে পারেননি। এতে এক কাফের মহিলা এই অপবাদ দিল যে, (নাউযুবিল্লাহ) 'মনে হচ্ছে তোমার শয়তান তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে।' এ ঘটনা প্রসঙ্গে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে। অপর দিকে ইমাম তবারানী (রহ.) ও ইবনে আবী শাইবা (রহ.) হাফস ইবনে মাইসারা (রহ.)-এর খালা হযরত খাওলা (রা.) থেকে এই রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, একবার একটি কুকুর ছানা নবী কারীম (সা.)-এর ঘরে এসে খাটের নিচে বসে গেল এবং ওখানেই সেটা মরে গেল। এ ঘটনার পর চার দিন পর্যন্ত তাঁর প্রতি কোনো ওহী নাযিল হয়নি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসূলের ঘরে এমন কি ঘটনা ঘটল যে, জিবরাঈল আমার নিকট আসছে না? আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার উচিত ঝাড়ু দিয়ে ঘরটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। আমি যখন ঝাড়ু দিয়ে খাটের নিচ পরিষ্কার করছিলাম তখনই ঝাড়ুর আঘাতে কুকুর ছানাটি বেরিয়ে এল। এ ঘটনা প্রসঙ্গে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে। তবে এই দ্বিতীয় বর্ণনাটি সনদের বিচারে সহীহ নয়। যেমন, হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) বলেন, 'এর সনদে কোনো কোনো বর্ণনাকারী মাজহুল (অপরিচিত)। কাজেই গ্রহণযোগ্য শানে নুযূল সেটাই, যা সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে।
৩. কখনো কখনো শানে নুযুলের ব্যাপারে বর্ণিত দু'টি বর্ণনার উভয়টিই সনদের দিক থেকে বিশুদ্ধ হয়ে থাকে। তবে একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দেওয়ার কোনো কারণ বিদ্যমান থাকে। যেমন, একটির সনদ অপরটির তুলনায় অধিক শক্তিশালী। অথবা একটি রেওয়ায়েতের বর্ণনাকারী এমন যে ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত ছিল। আর অন্য রেওয়ায়েতের বর্ণনাকারী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না। এ ক্ষেত্রে ওই রেওয়ায়েতকেই গ্রহণ করা হবে যে রেওয়ায়েতের পক্ষে অগ্রাধিকারের কারণ পাওয়া যাবে। এ প্রকারের উদাহরণ হলো সূরা 'ইসরা'র নিম্নোক্ত আয়াত- وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا (85) 'তোমাকে তারা রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল, 'রূহ হচ্ছে আমার প্রতিপালকের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত (একটি হুকুম)। এ সম্পর্কে তোমাকে অতি সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।'
এই আয়াতের শানে নুযূলের ক্ষেত্রে ইমাম বুখারী (রহ.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি মদীনা তাইয়্যেবায় রাসূলে কারীম (সা.)-এর সাথে যাচ্ছিলাম। তিনি খেজুর গাছের একটি ডালে ভর দিয়ে চলছিলেন। চলার এক পর্যায়ে আমরা ইহুদীদের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। তখন তারা পরস্পর বলছিল, আমাদের উচিত তাঁকে অর্থাৎ, নবী কারীম (সা.)-কে কিছু প্রশ্ন করা। এভাবে তারা এসে নবী কারীম (সা.)-কে বলল, আমাদেরকে "রূহ” সম্পর্কে অবগত করুন। এতে তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ পর মাথা মুবারক তুললেন। আমি বুঝতে পারলাম যে, তাঁর প্রতি ওহী নাযিল হচ্ছে। তারপর তিনি তেলাওয়াত করলেন- قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي। ইমাম তিরমিযী (রহ.) হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে অপর একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, একবার মক্কার কুরাইশরা ইহুদীদেরকে বলল, আমাদেরকে এমন একটি বিষয় বলে দিন যা আমরা তাঁকে [রাসূল (সা.)] কে জিজ্ঞেস করবো। তখন ইহুদীরা বলল, তাঁকে গিয়ে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন কর। এ প্রসঙ্গে আয়াতটি নাযিল হয়েছে। প্রথম রেওয়ায়েতটি থেকে জানা যায় যে, আয়াতটি পবিত্র মদীনা নগরীতে নাযিল হয়েছে। আর দ্বিতীয় রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায় যে, আয়াতটি মক্কা নগরীতে নাযিল হয়েছে। সনদের দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় রেওয়ায়েতই বিশুদ্ধ। কিন্তু প্রথম রেওয়ায়েতে অগ্রাধিকারের এই কারণ বিদ্যমান রয়েছে যে, বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজে সশরীরে ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন। পক্ষান্তরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর রেওয়ায়েত থেকে এটা বুঝা যায় না যে, তিনি স্বয়ং এ ঘটনার সময়ে উপস্থিত ছিলেন। কাজেই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর রেওয়ায়েতই অগ্রাধিকার পাবে।
৪. কখনো কখনো একই আয়াতের একাধিক শানে নুযূলও থাকে। অর্থাৎ পরপর এক জাতীয় কয়েকটি ঘটনা সংঘটিত হবার পর আয়াত নাযিল হয়। এখন কোনো বর্ণনাকারী এই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে একটি ঘটনাকে উল্লেখ করেন। আবার অন্য বর্ণনাকারী অন্য কোনো ঘটনা উল্লেখ করেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এগুলোর মাঝে বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ, উভয় ঘটনাই আয়াতের শানে নুযূল। যেমন, সূরা 'নূর'-এ লে'আনের আয়াতের ব্যাপারে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে ইমাম বুখারী (রহ.) রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যে, হেলাল ইবনে উমাইয়্যা (রা.) নবী কারীম (সা.)-এর দরবারে এসে নিজের স্ত্রীর উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করেন। এ প্রসঙ্গে এই আয়াত নাযিল হয়- وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمُ الخ. অপর দিকে ইমাম বুখারী (রহ.)-ই হযরত সাহল ইবনে সা'দ থেকে অন্য একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যে, হযরত উওয়াইমির (রা.) রাসূলে আকরাম (সা.)-কে এ প্রশ্ন করিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে অপর কোনো ব্যক্তির সাথে সঙ্গম অবস্থায় দেখতে পায় এবং সে তাকে হত্যা করে, তাহলে কি তার কাছ থেকে পূর্ণ কেসাস বা বদলা নেওয়া হবে? এ ধরনের ব্যক্তিকে কি করা উচিত? এর উত্তরে নবী কারীম (সা.) বললেন, তোমাদের ব্যাপারে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর এই আয়াতটিই তিনি তেলাওয়াত করে শুনিয়ে দিলেন। তৃতীয় আরেকটি রেওয়ায়েত 'মুসনাদে বায্যার'-এ হযরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এ ধরনের প্রশ্ন-উত্তর হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)-এর মাঝে হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আয়াতটি নাযিল হয়েছে। প্রকৃত কথা হচ্ছে, এই তিনটি ঘটনাই আয়াত অবতীর্ণ হবার পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। তাই এর প্রত্যেকটিকেই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে ধরা যায়।
৫. আবার কখনো কখনো এর বিপরীত এ রকম হয়ে থাকে যে, ঘটনা একটিই ঘটে থাকে, কিন্তু এর আওতায় কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হয়ে থাকে। এখন একজন বর্ণনাকারী এই ঘটনাকে উল্লেখ করে বলেন যে, এ ঘটনা প্রসঙ্গে অমুক আয়াতটি নাযিল হয়েছে। আবার অন্য এক বর্ণনাকারী এই ঘটনাটি বর্ণনা করে অন্য এক আয়াত উদ্ধৃত করেন। এর দ্বারা বাহ্যিকভাবে বর্ণনা দু'টিতে বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো বৈপরীত্য নেই। এ প্রকারের উদাহরণ হলো, ইমাম তিরমিযী (রহ.) ও ইমাম হাকেম (রহ.) হযরত উম্মে সালামা (রা.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন যে, আমি একবার নবী কারীম (সা.)-এর নিকট আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! হিজরত ইত্যাদি প্রসঙ্গে নারীদের কোনো আলোচনা আমি কুরআনে কারীমে দেখতে পাই না। তখন এই আয়াত নাযিল হয়েছে- فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى 'তখন তাদের প্রতিপালক তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বললেন, তোমাদের মধ্যে পুরুষ হোক কিংবা নারীই হোক কোন কর্মীরই কর্মফল আমি নষ্ট করি না।' আবার হাকেম (রহ.) উম্মে সালামা (রা.) থেকেই রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, আমি নবী কারীম (সা.)-এর নিকট আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! পবিত্র কুরআনুল কারীমে কেবল পুরুষদেরই আলোচনা করা হয়েছে। নারীদের কোনো আলোচনা নেই। তখন এ প্রসঙ্গে إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ আয়াতটি নাযিল হয় এবং এটাও নাযিল হয়- أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى।
টিকাঃ
১৩১. ইবনে তাইমিয়া: মুকাদ্দামাহ ফী উসুলিস তাফসীর, পৃ: ৯।
১৩২. সূরা নিসা: ১১৯
১৩৩. সুয়ূতী: আদ দুররুল মানসুর: ২/২২৩
১৩৪. সূরা সাজদা: ১৬
১৩৫. তাফসীরে জামেউল বয়ান : ২১/৫৭-৫৮ ইবনে জারীর
১৩৬. সূরা বাকারা : ২২৩
১৩৭. আসবাবুন নুযূল : পৃঃ ৪০-৪১
১৩৮. আল-ইতকান : ১/৩২
১৩৯. মানাহিলুল ইরফান: ১/১০৮
১৪০. সূরা দুহা: ১-৩
১৪১. আল-ইতকান: ১/৩৩
১৪২. সূরা ইসরা: ৮৫
১৪৩. আল-ইতকান: ১/৩৪
১৪৪. সূরা নূর, আয়াত নং-৬
১৪৫. আল-ইতকান: ১/৩৪
১৪৬. সূরা আলে-ইমরান: ১৯৫
১৪৭. এখানে সূরা আহযাবের ৩৫ নং আয়াত। এখানে অনেক নেক আমলের কথা আলোচনা করতে গিয়ে আলাদা আলাদাভাবে পুরুষ ও নারীর নাম উল্লেখ করেছেন।
১৪৮. আল-ইতকান: ১/৩৫
📄 পুনঃ অবতরণ ও এর তাৎপর্য
কখনো কখনো এমন হয় যে, একই আয়াত একাধিকবার অবতীর্ণ হয়েছে। আর প্রতিবারেই এর অবতরণ নতুন নতুন কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে হয়েছে। এখন একজন বর্ণনাকারী এক অবতরণের ঘটনা বর্ণনা করে দিয়েছেন। আবার অন্য একজন আরেক অবতরণের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এতে বাহ্যিকভাবে বৈপরীত্য মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এ দুই বর্ণনার মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ দু'টি ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়াতটি দু'বার অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন, ইমাম বুখারী (রহ.) ও ইমাম মুসলিম (রহ.) উদ্ধৃত করেছেন যে, যখন নবী কারীম (সা.)-এর প্রিয় চাচা আবু তালেব মৃত্যু শয্যায় শায়িত, তখন নবী কারীম রাসূলুল্লাহ (সা.) তার কাছে গিয়ে বললেন, চাচাজান! আপনি 'লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে দিন। তারপর আমি মহান আল্লাহ তা'আলার নিকট আপনার জন্য সুপারিশ করব। তখন সেখানে আবু জাহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়্যাও উপস্থিত ছিল। তারা আবু তালেবকে ঈমানের প্রতি ঝুঁকতে দেখে সাথে সাথে বলে উঠল, "তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছ?” এরপর তারা দু'জন এ কথাটি বারবার আওড়াতে থাকল। এমনকি এক পর্যায়ে আবু তালেব বলে উঠল, "আমি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরই আছি।” রাসূলে কারীম (সা.) বললেন, আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করতে থাকব, যতক্ষণ না আমাকে এ থেকে বারণ না করা হবে। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়- مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ 'নবী এবং মুমিনদের জন্য এই এখতেয়ার নেই যে, তাঁরা মুশরিকদের জন্য মাগফিরাত কামনা করবে।' অন্যদিকে ইমাম তিরমিযী (রহ.) হযরত আলী থেকে 'হাসান' সনদের সাথে বর্ণনা করেন যে, আমি এক ব্যক্তিকে তার মুশরিক পিতা-মাতার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে শুনলাম। আমি তাকে বললাম, তোমার পিতা-মাতা তো মুশরিক ছিল। কিভাবে তুমি তাদের জন্য দুআ করছ? সে জবাবে বলল, হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তো নিজের পিতার জন্য দু'আ করেছিলেন। অথচ তাঁর পিতা ছিল একজন মুশরিক। আমি এ কথা রাসূলে কারীম (সা.)-এর নিকট উল্লেখ করলাম। তখন এই আয়াত নাযিল হয়েছে। তৃতীয়তঃ ইমাম হাকেম প্রমুখ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী কারীম (সা.) একদিন কবরস্থানে তাশরীফ নিয়ে আসলেন। একটি কবরের পাশে এসে অনেকক্ষণ পর্যন্ত দুআ করলেন এবং কান্না করলেন। তারপর বললেন, যে কবরের পাশে আমি বসে ছিলাম তা ছিল আমার আম্মাজানের কবর। আমি আমার পালনকর্তার কাছে তাঁর জন্য দুআ করার অনুমতি প্রার্থনা করলাম, কিন্তু অনুমতি পাওয়া গেল না। তখন এই আয়াত নাযিল হলো- مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا। এখানে তিনটি ঘটনার সবটিকেই একই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন- উপরোক্ত তিনটি ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়াতটি পৃথক পৃথকভাবে তিনবার নাযিল হয়।
এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, যখন একটি আয়াত একবার নাযিল হয়েছে এবং সেটাকে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে আর রাসূলে আকরাম (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামেরও তা আত্মস্থ হয়ে গেছে তাহলে দ্বিতীয় বার আবার এবং তৃতীয় বার আবার তা নাযিল করার ফায়দা কি? হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) এ প্রশ্নের চমৎকার একটি জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, تَكْرَارُ النُّزُوْلِ "তাকরারে নুযূল" বা পুনঃ অবতরণের উপরোল্লিখিত ক্ষেত্রসমূহে মূলতঃ অবতরণ একবারই হয়েছে। কিন্তু যে ঘটনা প্রসঙ্গে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন সে ধরনেরই আরেকটি ঘটনা ঘটে তখন ওই আয়াতটি নবী কারীম (সা.)-এর পবিত্র অন্তরে দ্বিতীয়বার আবার ঢেলে দেওয়া হয়। যার উদ্দেশ্য এই হয়ে থাকে যে, এই ঘটনায়ও ওই আয়াত দ্বারা দিক-নির্দেশনা পাওয়া যাবে। অন্তরের মধ্যে এই আয়াতটা পুনঃ উপস্থিত হওয়াটা যেহেতু মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে তাই এটা ওই وَحْيٌ قَلْبِيٌّ "অন্তকরণ" যা ওহীরই একটি প্রকার। এভাবে নাযিল হওয়াটাকে মুফাসসিরীনে কেরাম "নুযূলে মুকাররার" বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। যতবার তা মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে অন্তরে ঢেলে দেওয়া হয়েছে, ততবারই তা অবতীর্ণ হয়েছে বলে ধরা হয়। শানে নুযূলের রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে যেসব বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় উপরোল্লিখিত মূলনীতিগুলোর অনুসরণে সাধারণত সহজেই তা বিদূরিত হয়ে যায়। আর এই মূলনীতিগুলো আত্মস্থ থাকলে রেওয়ায়েতের মতানৈক্যের ক্ষেত্রে মুশকিল দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবতারণা হয় না।
টিকাঃ
১৪৯. উক্ত উদাহরণটি "আল-ইতকান": ১/৩৪ থেকে উদ্ধৃত। কিন্তু এটা তখনই প্রযোজ্য হবে যখন তিনটি রেওয়ায়েতকেই সঠিক বলে ধরে নেওয়া হবে। অন্যথায় তৃতীয় রেওয়ায়েতটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে কথাবার্তা রয়েছে। যেমন, হাফেয যাহাবী (রহ.) এ ব্যাপারে লিখেন, قلت ايوب بن ہانی ضعفه این معین [আমি বলছি, ইবনে মাঈন আইউব ইবনে হানীকে দুর্বল হিসেবে গণ্য করেছেন।] (মুসতাদরাক: ২/৩৩৬) আইউব ইবনে হানী সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) জারাহ্ ও তা'দীল বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মতামত উদ্ধৃত করেছেন। (তাহযীবুত তাহযীব: ১/৪১৪) তাই এই রেওয়ায়েতকে যেমন বানোয়াট বলা যায় না আবার তেমনি এর উপর আকীদা সংক্রান্ত কোনো মাসআলার ভিত্তিও রচনা করা যায় না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশাল একটি দল বহু দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে বলেন যে, রাসূলে কারীম (সা.)-এর পিতা-মাতা মিল্লাতে ইবরাহীমির উপর ইন্তেকাল করার ভিত্তিতে তাঁরা মুমিন ছিলেন। স্বয়ং আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) এ বিষয়ে স্বতন্ত্র একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন।
১৫০. আল ফাউযুল কাবীর: পৃঃ ২২