📄 শানে নুযূলের গুরুত্ব ও উপকারিতা
ইলমে দ্বীনে অপরিপক্ক কিছু কিছু লোক শানে নুযূলের তাৎপর্য ও উপকারিতাকে অস্বীকার করতে গিয়ে বলে, 'পবিত্র কুরআনুল কারীম নিজেই এত স্পষ্ট ও উদ্ভাসিত যে, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য শানে নুযূল সম্পর্কে জানার কোনো প্রয়োজন নেই।' কিন্তু তাদের ধারণা একবারেই ভুল ও ভ্রান্ত। পবিত্র কুরআনুল কারীমের তাফসীরের জন্য শানে নুযূল সম্পর্কিত জ্ঞানার্জন এক আবশ্যকীয় শর্তের মর্যাদা রাখে। এর উপকারিতাও সীমাহীন ও অসংখ্য। নিম্নে সেগুলোর কয়েকটি আলোকপাত করা হচ্ছে-
১. আল্লামা যারকাশী (রহ.) বলেন, শানে নুযূল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রথম উপকারিতা হচ্ছে, এর দ্বারা আহকামের হেকমত তথা নিগূঢ় রহস্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যায় এবং এটা জানা যায় যে, মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু এই হুকুমটি কোন প্রেক্ষাপটে এবং কেন নাযিল করেছেন। যেমন, সূরা নিসায় বিবৃত হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَى
'হে মুমিনগণ! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না।' যদি শানে নুযুলের রেওয়ায়েত সামনে না থাকে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের সুস্পষ্ট প্রমাণ দ্বারা যখন মদ পান করা সম্পূর্ণ হারাম তখন এ কথা বলার কি প্রয়োজন আছে যে, ' তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকট যেয়ো না।'? এ প্রশ্নের জবাব কেবল শানে নুযূল থেকেই পাওয়া যাবে। এই আয়াতের শানে নুযুলের ব্যাপারে হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, মদপান করা হারাম হবার পূর্বে একবার হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) কয়েকজন সাহাবাকে নিমন্ত্রণ করলেন। সেখানে আহারান্তে মদ পান করা হলো। এমতাবস্থায় নামাযের সময় উপস্থিত হলো। তখন একজন সাহাবী নামাযের ইমামতি করলেন। নেশাগ্রস্ততার কারণে নামাযে কুরআন তেলাওয়াতে ভুল হয়ে গেল। এই প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করেই উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছে।
২. অনেক সময় শানে নুযূল ব্যতিরেকে আয়াতের সঠিক মর্ম উপলব্ধি করাই সম্ভবপর হয় না। যদি শানে নুযূল সামনে না থাকে তাহলে মানুষ আয়াতের সম্পূর্ণ ভুল অর্থ বুঝে নিতে পারে। কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
(১) সূরা বাকারায় মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَلِلَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ
'আর পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা যে দিকেই মুখ ফিরাও, সে দিকেই আল্লাহর চেহারা।' যদি এই আয়াতের শানে নুযূল সামনে না থাকে, তাহলে বাহ্যিকভাবে এর দ্বারা বুঝা যায় যে, নামাযে বিশেষ কোনো এক দিকে মুখ ফিরানো আবশ্যক নয়। পশ্চিম-পূর্ব সবই আল্লাহ তাআলার মালিকানায়। আর তিনি সবদিকেই আছেন। তাই যে দিকেই মুখ ফিরাবে নামায আদায় হয়ে যাবে। অথচ যুক্তিগতভাবেই এই ধারণাটি ভুল। স্বয়ং কুরআনই অন্য স্থানে কাবা শরীফের দিকে মুখ করার আবশ্যকতা বর্ণনা করেছে। এসকল জট একমাত্র শানে নুযূলের মাধ্যমেই খুলে থাকে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যখন মুসলমানদের কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে কাবা শরীফের দিকে পরিবর্তিত হলো, তখন ইহুদীরা এই প্রশ্ন তুলল যে, 'এ পরিবর্তনের হেতু কি?' তাদের এই প্রশ্নের জবাবেই উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছে। আয়াতের সারমর্ম হলো, সব দিকই মহান আল্লাহ তা'আলারই গড়া। আর আল্লাহ সব দিকেই আছেন। তাই তিনি যে দিকেই মুখ করতে নির্দেশ দিবেন সে দিকে মুখ ফিরানো ওয়াজিব। এখানে কেয়াস-অনুমান ও সংশয়-সন্দেহের দখল দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
(২) এ ভাবে সূরা মায়েদার এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে-
لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا إِذَا مَا اتَّقُوا وَآمَنُوا
'যারা ঈমান আনে আর সৎকর্ম করে তারা পূর্বে যা খেয়েছে তারা জন্য তাদের উপর কোন পাপ নেই যদি তারা (হারাম থেকে) বিরত থাকে, আর ঈমান আনে ও সৎকাজ করে,' যদি এই আয়াতের বাহ্যিক শব্দের দিকে লক্ষ্য করা হয় তাহলে এ কথা বলা যাবে যে, মুসলমানদের জন্য কোনো বস্তুই খাওয়া বা পান করা হারাম নয়। যদি অন্তরে ঈমান ও আল্লাহর ভয় থাকে এবং সৎকর্মশীল হয় তাহলে মানুষ যা চায় তাই পানাহার করতে পারবে। আর যেহেতু এই আয়াত মদ্যপান হারাম হবার পরপরই এসেছে তাই কেউ এ কথাও বলতে পারে যে, এ আয়াত ঈমানদার ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের জন্য (নাউযুবিল্লাহ) মদ্যপানের অনুমতিও প্রদান করেছে। আর এটা শুধু সন্দেহ বা সম্ভাবনা নয়; বরং কোনো কোনো সাহাবা (রা.) পর্যন্ত এই আয়াত থেকে ভুল বুঝের শিকার হয়েছেন এবং তাঁরা হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.)-এর সামনে গিয়ে নিজেদের স্বপক্ষে এই আয়াত দ্বারা দলীল নিয়ে এ খেয়াল পেশ করলেন যে, মদ্যপানকারী ব্যক্তি যদি অতীতে সৎকর্মশীল হয় এবং তার সাধারণ জীবন-যাপন যদি সৎকর্মের মাঝে অতিবাহিত হয়, তাহলে তার উপর শরঈ দন্ড-বিধি প্রয়োগ করা যাবে না। পরবর্তীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের শানে নুযূলের উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁদের এই ভুল ধারণার অবসান ঘটান। বস্তুত এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট হলো, যখন মদ্যপান ও জুয়া খেলা হারাম হওয়ার আয়াত নাযিল হলো, তখন কোন কোন সাহাবায়ে কেরাম এই প্রশ্ন করলেন যে, যেসব সাহাবায়ে কেরাম মদ্যপান ও জুয়া খেলা হারাম হবার পূর্বে ইন্তেকাল করেছেন, অথচ মদ্যপান ও জুয়া খেলায় তাদের জীবন অতিবাহিত হয়েছে, তাদের পরিণতি কি হবে? তাঁদের এই প্রশ্নের জবাবে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে যে, হারামের বিধান নাযিল হবার পূর্বে যে সকল মুমিন মদ্যপান করেছে বা জুয়ার সম্পদ ভোগ করেছে তাদের উপর কোনো আযাব হবে না। এই শর্তে যে, তারা মুমিন এবং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অন্যান্য আদেশ-নিষেধের উপর আনুগত্যশীল।
(৩) আরো একটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন। সূরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَائِرِ اللَّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَا
'নিশ্চয়ই 'সাফা' এবং 'মারওয়া' আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। কাজেই যে ব্যক্তি কাবাগৃহের হাজ্জ অথবা 'উমরাহ করবে, তখন এ দু'টোর সাঈ করাতে তাদের কোনই গুনাহ নেই।' এই আয়াতে 'তার উপর কোনো দোষ নেই' এ শব্দ কয়টি থেকে বাহ্যিকভাবে বুঝা যায় যে, হজ ও উমরার মাঝে সাফা ও মারওয়ায় প্রদক্ষিণ করা জায়েয মাত্র। ফরয-ওয়াজিব কিছু নয়। এমনকি হযরত উরওয়াহ ইবনে যুবাইর (রহ.) এ ভুল উপলব্দির শিকার ছিলেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) তাঁকে জানিয়ে দিলেন যে, প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, জাহেলী যুগ থেকেই এই পাহাড় দু'টিতে দু'টি প্রতিমা স্থাপিত ছিল। একটি নাম ছিল আসাফ আর অপরটির নাম ছিল নায়েলা। তাই সাহাবায়ে কেরামের এ সন্দেহ সৃষ্টি হলো যে, সাফা ও মারওয়ায় প্রতিমা স্থাপিত থাকার দরুণ এ দু'টি প্রদক্ষিণ করা নাজায়েয হবে না তো! তাঁদের এ সন্দেহ দূর করার জন্যই এই আয়াতে কারীমা নাযিল হয়েছে। এই উদাহরণগুলো শুধু উপমা স্বরূপ পেশ করা হলো। নতুবা এ ধরনের আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অনেক আয়াতের সঠিক অনুধাবন শানে নুযূল জানা ব্যতিরেকে সম্ভব নয়।
৩. অনেক সময় পবিত্র কুরআনুল কারীমে এমন শব্দের প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়, শানে নুযুলের সাথে যার গভীর সম্পর্ক থাকে। যদি সেই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সঠিক প্রেক্ষাপট জানা না থাকে, তাহলে সেই শব্দগুলো অনেক সময় নাঊযুবিল্লাহ অনর্থক, আবার কখনো অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়, যা থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের বাগ্মিতা ও অলঙ্কারীত্বের উপর আঘাত আসে। যেমন সূরা তালাকে ইরশাদ হয়েছে-
وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ
'তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস। আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত।' এই আয়াতের মধ্যে "যদি তোমাদের সন্দেহ হয় তাহলে যে, এই শব্দগুলো থেকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিশেষ কোনো উপকারিতা পরিলক্ষিত হয় না। এমনকি কোনো কোনো আহলে-জাহের এ শব্দগুলো দ্বারা এই অর্থ করেছেন যে, বয়োপ্রাপ্তা নারী, যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের গর্ভবতী হবার ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ না থাকে, তাহলে তাদের উপর ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব নয়।” কিন্তু শানে নুযূলই এই শব্দগুলোর প্রকৃত কারণ বাতলে দিচ্ছে। হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, যখন সূরা নিসায় মহিলাদের ইদ্দতের বর্ণনা দেওয়া হলো, তখন আমি নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আরয করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন কোন মহিলা এমন রয়েছে যাদের ইদ্দত কুরআনে বর্ণনা করা হয়নি। যেমন, ছোট বালিকা, যারা এখনো ঋতুস্রাবের বয়সে উপনীত হয়নি, বয়োপ্রাপ্তা মহিলা যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে এবং গর্ভবতী মহিলা।' হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রা.)-এর এ প্রশ্নের জবাবে উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাতে তিনো ধরণের নারীরাই ইদ্দতের হুকুম বর্ণনা করা হয়েছে।
এ প্রকারের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে সূরা বাকারার নিম্নোক্ত আয়াত-
فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكُرِكُمْ آبَاءَكُمْ
'অতঃপর মহান হাজ্জের করণীয় কার্যাবলী সমাপ্ত করবে, তখন আল্লাহর স্মরণে মশগুল হও, যেমন তোমরা নিজেদের বাপ-দাদাদের স্মরণে মশগুল থাক।' যদি শানে নুযূল সামনে না থাকে তাহলে এই আয়াতের 'যেভাবে তোমরা স্মরণ করতে তোমাদের বাপ-দাদাদেরকে।'-এই অংশটিকে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়। কারণ এ কথা বুঝে আসে না যে, এই বিশেষ স্থানে আল্লাহর স্মরণকে বাপ-দাদার স্মরণের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্যটা কি? কিন্তু শানে নুযূল দ্বারা এ জট খুলে যায়। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, এখানে মুযদালিফায় অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। আর আরব মুশরিকদের প্রথা ছিল, তারা হজ্বের কার্য সম্পন্ন করার পর মুযদালিফায় এসে নিজেদের বাপ-দাদার গৌরবগাঁথা ও কীর্তিকলাপ বর্ণনা করত। উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বাপ-দাদার স্মরণের পরিবর্তে আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
৪. পবিত্র আল-কুরআনুল কারীমে এমন জায়গাও কম নয়, যেখানে বিশেষ কোনো ঘটনার প্রতি সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত ওই ঘটনাটি জানা না থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই আয়াতগুলোর উদ্দেশ্যই বোধগম্য হবে না। যেমন, পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
'আর আপনি (মাটির মুষ্টি) নিক্ষেপ করেননি যখন আপনি নিক্ষেপ করেছিলেন; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন।' মূলত এই আয়াতে বদর যুদ্ধের একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। নবী কারীম (সা.) কাফেরদের বেষ্টনীর সময় তাদের প্রতি একমুষ্টি মাটি নিক্ষেপ করেছিলেন। এতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, যদি এর শানে নুযূল মাথায় না থাকে, তাহলে আয়াতের মর্ম বুঝে আসবে কিভাবে? এখানে শানে নুযূলের সকল উপকারিতা বর্ণনা করা উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু উপরোল্লিখিত উদাহরণগুলো দ্বারা এ কথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের তাফসীরের ক্ষেত্রে শানে নুযূলে গুরুত্ব কতটুকু? একারণেই ইমাম ওয়াহেদী (রহ.) বলেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আয়াতের শানে নুযূল ও সংশ্লিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে অবগত না হওয়া যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আয়াতের মর্ম বর্ণনা করা সম্ভব নয়।'
অতএব, যে সকল লোক সর্বশেষ আসমানী কিতাব মহাগ্রন্থ পবিত্র আল-কুরআনের তাফসীর করার ক্ষেত্রে শানে নুযূলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেন, তারা হয়তো এ ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ। নতুবা শানে নুযূল থেকে মুক্ত হয়ে কুরআনে কারীমের বক্তব্যকে নিজের মনগড়া অর্থ প্রকাশ করার জন্যই এমনটি করে থাকেন।
টিকাঃ
১০০. "আল-বুরহান ফী উলূমীল কুরআন" ১/২২
১০১. সূরা নিসা: ৪৩
১০২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৫০০ মাতবায়া মুসতফা মুহাম্মদ: ১৩৫৬ হিজরী।
১০৩. সূরা বাকারা: ১১৫
১০৪. আল-ইতকান: ১/৩৩
১০৫. সূরা মায়েদা: ৯৩
১০৬. আল-কুরতুবীঃ আল-জামেউ লি আহকামিল কুরআন: ৬/২৯৭ কায়রো, মিসর ১৩৮৭ হিজরী।
১০৭. প্রাগুক্ত: ৬/২৯৪।
১০৮. সূরা বাকারা: ১৫৮
১০৯. মানাহিলুল ইরফান: ১/১০৪
১১০. সূরা তালাক : ৪
১১১. আল-ইতকান: ১/৩০
১১২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/৩৮১
১১৩. সূরা বাকারা: ২০০
১১৪. আসবাবুন নুযূল: পৃঃ ৩৪
১১৫. সূরা আনফাল: ১৭
১১৬. আসবাবুন নুযূল: পৃঃ ১৩৩
১১৭. আসবাবুন নুযূল: পৃঃ ৪
📄 আসবাবে নুযূল ও শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.) এর আলোচনা
হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) তাঁর রচিত "আল-ফাউযুল কাবীর” গ্রন্থে শানে নুযূলের উপর যে গবেষণালব্ধ আলোচনা করেছেন, কিছু লোক সেটাকে সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হয়নি। তাই তারা এ কথা বলতে শুরু করেছে যে, হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.) তাফসীরের ক্ষেত্রে শানে নুযূলের কোনো গুরুত্ব দেননি। অথবা এর গুরুত্বকে ছোট করে দেখেছেন। মূলত এ ধারণাটি হযরত শাহ সাহেবের আলোচনার মর্মার্থ না বুঝারই ফল। কিন্তু প্রকৃত কথা হচ্ছে, জমহুর উলামায়ে কেরামের ন্যায় তিনিও পবিত্র কুরআনুল কারীমের তাফসীরের জন্য শানে নুযূলের জ্ঞানার্জনকে আবশ্যকীয় শর্তরূপে নির্ধারণ করেছেন। দেখুন তিনি তার গ্রন্থে যে কথা লিখেছেন তা তুলে ধরা হলো।
ويذكر المحدثون في ذيل الآيات القرآنية كثيرا من الأشياء ليست من قسم سبب النزول في الحقيقة مثل: استشهاد الصحابة رضي الله عنهم في مناظراتهم بآية أو تلاوته صلى الله عليه وسلم آية الاستشهاد في كلامه الشريف أو رواية حديث وافق الآية في أصل الغرض أو تعين موضع النزول أو تعيين أسماء المذكورين بطريق الإبهام أو بطريق التلفظ بكلمة قرآنية أو فضل سورة وآيات من القرآن أو صورة امتثاله صلى الله عليه وسلم بأمر من أوامر القرآن ونحو ذلك وليس شيء من هذا في الحقيقة من أسباب النزول.
(এর সারকথা হচ্ছে, তাফসীরের কিতাবগুলো মুহাদ্দিসগণ কখনো কখনো একটি আয়াতের আওতায় অনেকগুলো বর্ণনা উল্লেখ করেন, যেগুলো শানে নুযূলের সাথে সম্পর্ক রাখে না)। বরং সে বর্ণনাগুলোতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো শামিল হয়ে যায়।
১. অনেক সময় কোনো সাহাবী কোনো ইলমী আলোচনায় আয়াতটিকে দলীল হিসেবে পেশ করেছিলেন। অথচ মুফাসসিরগণ সামান্য সামঞ্জস্যের কারণে এই আয়াতের অধীনে ওই ঘটনাটি উল্লেখ করে থাকেন।
২. কোনো কোনো সময় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আয়াতটিকে কোনো ক্ষেত্রে দলীল হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। মুফাসসিরগণ সেটাকেও এই আয়াতের অধীনে উল্লেখ করে থাকেন।
৩. যে কথা কোনো আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে, হুবহু সে কথাটিই নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো হাদীসেও বর্ণনা করেছেন, তাফসীরের কিতাবগুলোতে সেই হাদীসটিকেও এই আয়াতের অধীনে উল্লেখ করে দেওয়া হয়।
৪. কখনো কখনো মুফাসসিরগণ কোনো ‘রেওয়ায়েত’ শুধু এ কথা বলার জন্য উল্লেখ করেন যে, আয়াতটি কোন্ স্থানে নাযিল হয়েছে। পরবর্তীতে এই রেওয়ায়েতটিও তাফসীরের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।
৫. কোনো কোনো সময় পবিত্র কুরআনুল কারীম কিছু লোকের নাম উল্লেখ না করে অনির্দিষ্টভাবে তাদের আলোচনা করে। মুফাসসিরগণ রেওয়ায়েতের মাধ্যমে তাদের নাম নির্দিষ্ট করে থাকেন।
৬. কখনো কখনো কোনো রেওয়ায়েত থেকে এটা জানা যায় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের অমুক শব্দটির সঠিক উচ্চারণ কি? তাফসীরের কিতাবে এ ধরনের রেওয়ায়েতও সন্নিবেশ করা হয়ে থাকে।
৭. কোনো কোনো হাদীসে এবং আয়াতে পবিত্র কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন সূরা বা আয়াতের ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। মুফাসসিরগণ এ সমস্ত রেওয়ায়েতকেও সংশ্লিষ্ট স্থানে সংযোজন করে থাকেন।
৮. কোনো স্থানে এমন হাদীসও তাফসীর হিসেবে বর্ণিত আছে যেগুলো দ্বারা জানা যায় যে, পবিত্র কুরআনের এই হুকুমের উপর নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিভাবে আমল করেছেন।
হযরত শাহ সাহেব বলেন, এ জাতীয় বর্ণনাগুলো না তো শানে নুযূলের বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত আর না তাফসীরকারদের জন্য এ সকল বর্ণনার ব্যাপারে ওয়াকিফহাল থাকা আবশ্যক। অবশ্য যেসব বর্ণনা বাস্তবেই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে স্বীকৃত, সেগুলো সম্পর্কে অবগত হওয়া মুফাসসীরদের জন্য অত্যন্ত জরুরী এবং এগুলো জানা ব্যতীত ইলমে তাফসীরে হস্তক্ষেপ করা জায়েয নেই। যেমন, সামনে গিয়ে শাহ সাহেব নিজেই বলেন-
إنما شرط المفسر أمران: الأول ما تعرض به الآيات من القصص فلا يتيسر فهم الإيماء بتلك الآيات إلا بمعرفة تلك القصص والثاني ما يخصص العام من القصة أو مثل ذلك من وجود صرف الكلام عن الظاهر فلا يتيسر فهم المقصود من الآيات بدونها
'মুফাসসিরের জন্য দু'টি বিষয়ে অবগত হওয়া আবশ্যকীয় শর্ত। প্রথমতঃ আয়াতে ইঙ্গিত বহনকারী ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ। যতক্ষণ পর্যন্ত ঘটনার বিবরণ অজ্ঞাত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আয়াতের ইশারা-ইঙ্গিত বুঝা সহজ হবে না। দ্বিতীয়তঃ কোনো কোনো ঘটনায় কখনো কখনো শব্দের ব্যাপকতা বিদ্যমান থাকে, কিন্তু শানে নুযূলের মাধ্যমে শব্দটি ব্যাপকতা থেকে বিশেষরূপ ধারণ করে। অথবা বাক্যের বাহ্যিক মর্ম এক রকম থাকে কিন্তু শানে নুযূল অন্য কোনো মর্ম নির্ধারণ করে, এ জাতীয় রেওয়ায়েতসমূহের জ্ঞান লাভ করা ব্যতীত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বুঝা ও তাফসীর করা দুঃসাধ্য বা অসম্ভব ব্যাপার।'
টিকাঃ
১১৮. الفوز الكبير : ص : ২০-২২
১১৯. الفوز الكبير : ص: ২০
১২০. আল-ফাউযুল কাবীর: পৃঃ ২৩
📄 শানে নুযূল এবং আহকামের উমুম ও খুসুস
পবিত্র কুরআনুল কারীমের যে সকল আয়াত কোনো শানে নুযূল বা ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে, সেগুলো উমূম-খুসূস বা ব্যাপকত্ব ও বিশেষত্বের দিক থেকে ৪ প্রকার।
১. ওই সকল আয়াত যেগুলোতে নির্দিষ্টভাবে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আয়াতের বিষয়বস্তু ওই ব্যক্তির সাথেই সংশ্লিষ্ট। এ সব আয়াতের ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম একমত যে, ওই আয়াতের বিষয়বস্তু সেই বিশেষ ব্যক্তির সাথেই সীমিত থাকবে। অন্য কোনো ব্যক্তি এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। যেমন- পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, 'ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দু'হাত (تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ) এই আয়াতের শানে নুযূল একেবারে প্রসিদ্ধ যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশের লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন তখন আবু লাহাব বলেছিল- تَبَّاً لَكَ أَلِهَذَا دَعَوْتَنَا 'ধ্বংস হোক তোমার, এ জন্যই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছ?' এর উপর ভিত্তি করে এই আয়াত নাযিল হয়েছে। এতে বিশেষভাবে আবু লাহাবের নাম নিয়ে তার ধ্বংসের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ ধমকি ও ধ্বংস তার জন্যই প্রযোজ্য হবে।
২. ওই সকল আয়াত যেগুলোতে বিশেষ কোনো ব্যক্তি, সম্প্রদায় কিংবা কোনো বস্তুর নাম উল্লেখ না করে বরং তার কিছু গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে এবং সে গুণাবলীর উপর কোনো হুকুম লাগানো হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য দলীল, প্রমাণ দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত আছে যে, এর দ্বারা অমুক নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায় কিংবা নির্দিষ্ট বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। এ ধরনের আয়াতের ব্যাপারেও উলামায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেন যে, এ আয়াতের বিষয়বস্তু বা হুকুম বিশেষভাবে শুধু ওই ব্যক্তি বা সম্প্রদায় কিংবা বস্তুর সাথেই নির্দিষ্ট থাকবে, যা কুরআনের উদ্দেশ্য। অন্য কেউ এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। চাই এসব গুণাবলী তার মাঝেও পাওয়া যায়। যেমন সূরা 'লাইল'-এ ইরশাদ হয়েছে- وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى الَّذِي يُؤْتِي مَا لَهُ يَتَزَكَّى 'অর্থাৎ তা থেকে দূরে রাখা হবে এমন ব্যক্তিকে যে আল্লাহকে খুব বেশি ভয় করে, যে পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশে নিজের ধন-সম্পদ দান করে'।
সমস্ত উলামায়ে কেরাম এই ব্যাপারে একমত যে, এই আয়াত হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। যিনি দরিদ্র দাস-দাসীদের ক্রয় করে মুক্ত করে দিতেন। এখানে যদিও হযরত আবু বকরের নাম উল্লেখ নেই। তবে গুণাবলী তাঁরই বর্ণনা করা হয়েছে। আর হাদীসের বর্ণনা থেকেও প্রমাণিত যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হযরত আবু বকর (রা.)। কাজেই এই আয়াতের ফযীলত প্রাপ্ত একমাত্র তিনিই। অন্য কেউ তাতে শরীক নেই। এ জন্য ইমাম রাযি (রহ.) এই আয়াতের মাধ্যমে দলীল পেশ করেন যে, আম্বিয়ায়ে কেরামের পরে হযরত আবু বকর (রা.) সমগ্র মানব জাতির মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান। কেননা, এই আয়াতে তাঁকে الْأَتْقَى (অধিকতর মুত্তাকী) বলা হয়েছে।
অন্য এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে- إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ 'তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন।' সর্বোপরি এখানে হযরত আবু বকরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এতদসত্ত্বেও সমস্ত মুফাসসিরীন এই আয়াতকে বিশেষ করে তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট করেছেন। কারণ এখানে ব্যাপকতা থেকে ব্যক্তি বিশেষের প্রতি নির্দিষ্ট করার পক্ষে দু'টি দলীল রয়েছে। একটি হলো أَتْقَاكُمْ শব্দের আলিফ-লামটি আহ্দী। অর্থাৎ শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। দ্বিতীয় দলীল হলো, হাদীসের বর্ণনা তাঁকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। অতএব, যদি অন্য কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাহে নিজের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে তার বিনিময়ে সে যত সওয়াবের অধিকারীই হোক না কেন, উল্লিখিত আয়াতে বর্ণিত মর্যাদার অধিকারী সে কখনো হতে পারবে না।
৩. ওই সকল আয়াত যা বিশেষ কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে। তবে এর শব্দগুলো আম বা ব্যাপক। আয়াতের বাহ্যিক শব্দাবলী কিংবা বহিরাগত কোনো দলীলের মাধ্যমে এটা জানা যায় যে, আয়াতের হুকুম শুধু এ ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এ জাতীয় সকল ঘটনার ক্ষেত্রেই এই হুকুম প্রযোজ্য। এ প্রকারের আয়াতের ব্যাপারেও সকল উলামা একমত যে, এ ক্ষেত্রে আয়াতের হুকুম তার শব্দগুলোর অনুগামী হয়ে ব্যাপকত্ব লাভ করবে। এর হুকুম শুধু শানে নুযূলের ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যেমন, সূরা 'মুজাদালাহ'-এর প্রাথমিক আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে এ কথা সাব্যস্ত আছে যে, হযরত খাওলা (রা.)-এর ব্যাপারে তা নাযিল হয়েছিল। তাঁর স্বামী তাঁকে বলেছিল (أنت علي كظهر أمي) (তুমি আমার উপর আমার মায়ের পিঠের মতো)। কিন্তু আয়াতে যে শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে হুকুম বর্ণনা করা হয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে এ কথার বর্ণনা দেয় যে, এ হুকুম শুধু খাওলা (রা.)-এর স্বামীর জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং প্রত্যেক ওই ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য যে তার স্ত্রীর সাথে 'যিহার' করবে অর্থাৎ উপরেল্লিখিত শব্দগুলো বলবে। (এ সমস্ত লোকদের উপর ওয়াজিব হলো, তারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সহবাসের পূর্বেই একটি গোলাম আযাদ করবে অথবা ষাটটি রোযা রাখবে কিংবা ষাটজন মিসকীনকে আহার করাবে।)
৪. ওই সকল আয়াত যা বিশেষ কোনো ঘটনা প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। কিন্তু তার শব্দমালা ব্যবহার করা হয়েছে আম বা ব্যাপক। আর আয়াত বা বহিরাগত কোনো দলীলের মাধ্যমে এটা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না যে, এই আয়াতের হুকুম বা বিষয়বস্তু এ আয়াতের সাথেই নির্দিষ্ট নাকি এ ধরনের প্রত্যেক ঘটনার সাথে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য? এ ধরনের আয়াতের ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের মাঝে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। কারো কারো বক্তব্য হলো, এ ক্ষেত্রে আয়াতকে শুধু তার শানে নুযূলের সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ রাখা হবে। কিন্তু জমহুর উলামা ও ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত এর বিপরীত। তাঁদের বক্তব্য হলো, এ ক্ষেত্রে শানে নুযুলের বিশেষ ঘটনার পরিবর্তে শব্দমালা উমুম বা ব্যাপকত্ব ধর্তব্য হবে এবং আয়াতের শব্দমালার ব্যাপকতা যেসব ক্ষেত্রকে শামিল করবে, সেসব ক্ষেত্রকে ও আয়াতের হুকুমটি প্রযোজ্য হবে। এই মূলনীতির জন্যই উসূলে ফিকাহ ও উসূলে তাফসীর বিশারদদের নিকট এ কথাটি খুবই প্রসিদ্ধ আছে-
العبرة لعموم اللفظ لا بخصوص السبب 'শব্দের ব্যাপকতাই ধর্তব্য, শানে নুযুলের নির্দিষ্ট ঘটনা নয়।'
কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এই মতপার্থক্য আপন আপন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। অন্যথায় কার্যক্ষেত্রে এর বিশেষ কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। কারণ যারা কুরআনের আয়াতকে তার শানে নুযূলের ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ রাখেন, কার্যক্ষেত্রে তাঁরাও এই আয়াতের হুকুমকে এ ধরনের অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে থাকেন। তবে পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, জমহুর উলামায়ে কেরামের মতানুযায়ী হুকুমের উৎস হচ্ছে, ওই আয়াত। আর এরা অন্য কোনো শরঈ দলীল যেমন- হাদীস, ইজমা বা কেয়াসকে হুকুমের উৎস হিসেবে নিরূপণ করেছেন।
পরিষ্কারভাবে বুঝার জন্য একটি উদাহরণ দেখুন। সূরা বাকারায় বর্ণিত হয়েছে-
وَإِن كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ 'যদি সে (ঋণ গ্রহণকারী) দরিদ্র হয়, তবে স্বচ্ছল অবস্থা আসা পর্যন্ত অবকাশ দিবে।'
এই আয়াতের শানে নুযূল হলো, বনু আমর ইবনে উমাইরের কাছ থেকে বনু মুগীরা কিছু ঋণ গ্রহণ করেছিল। যখন শরীয়তে সুদ হারাম হয়ে গেল, তখন বনূ আমর বনূ মুগীরাকে বলল, আমরা সুদ তো বর্জন করেছি, তবে আসল ঋণ ফেরত দাও। তখন বনূ মুগীরা বলল, এ মুহূর্তে আমরা চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত। তাই আমাদেরকে কিছু অবকাশ দাও। বনূ আমর অবকাশ দিতে সম্মত হলো না। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।
এই আয়াতের বিধান এখন সর্বসম্মতিক্রমে আম বা ব্যাপক। প্রত্যেক ঋণদাতার জন্য উত্তম হলো, ঋণগ্রহীতাকে অসচ্ছল দেখলে সচ্ছলতা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিবে। তবে পার্থক্য এতটুকু যে, জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে হুকুমের এই ব্যাপকতা এ আয়াত থেকেই সাব্যস্ত হয়েছে। আর যারা আয়াতকে শানে নুযূলের ঘটনার সাথেই সীমাবদ্ধ রাখেন তারা বলেন, আয়াতের বিধান তো শুধু বনূ আমরের জন্য ছিল। তবে অন্যান্য মুসলমানদের জন্য এ হুকুম ওই সকল হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়েছে, যেগুলোতে ঋণদাতাকে অবকাশ দেওয়ার ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, কার্যত এ মতবিরোধের মধ্যে বিশেষ কোনো ফলাফল পরিলক্ষিত হয় না।
টিকাঃ
১২১. সূরা লাহাব: ১
১২২. আসবাবুন নুযূল : পৃঃ ২৬১
১২৩. সূরা লাইল: ১৭-১৮
১২৪. প্রাগুক্ত: পৃ: ২৫৫
১২৫. সূরা হুযুরাত: ১৩
১২৬. এ প্রকারের আরো বিশদ বর্ণনা ও উদাহরণের জন্য দেখুন, "আল-ইতকান" ১/৩০
১২৭. আসবাবুন নুযূল: পৃঃ ২৩১
১২৮. সূরা বাকারা: ২৮০
১২৯. আসবাবুন নুযূল: ৫১
১৩০. এখানে এই মাসআলাটির সারকথা অত্যন্ত সংক্ষেপে পেশ করা হলো। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আল্লামা যারকাশী (রহ.) রচিত "আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন" ১/২৪, আল-ইতকান: ১/৩০, মানাহিলুল ইরফান: ১/১১৮-১২৭।
📄 শানে নুযূল ও বর্ণনার বিভিন্নতা
পবিত্র কুরআনুল কারীমের তাফসীরের ক্ষেত্রে শানে নুযূলের ধারাবাহিকতায় অনেক বড় একটি সমস্যা হলো এই যে, একই আয়াতের শানে নুযূল একাধিক ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। যে ব্যক্তি তাফসীরের মূলনীতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নয়, সে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও বিভিন্ন প্রকার সংশয় ও সন্দেহে নিপতিত হয়ে যায়। তাই এখানে বর্ণনার বিভিন্নতার হাকীকত সম্পর্কে জেনে নেওয়া অপরিহার্য। উসূলে তাফসীর ও উসূলে ফিকাহ-এর বিশেষজ্ঞগণ এ ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা বর্ণনা করেছেন। এখানে সেগুলোর সারাংশ পেশ করা হচ্ছে।
১. সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ এবং তাবেঈন (রহ.)-গণের অভ্যাস ছিল যে, তাঁরা কোনো আয়াতের তাফসীরের ক্ষেত্রে نَزَلَتِ الْآيَةُ فِي كَذَا (এ আয়াত অমুক মাসআলা বা অমুক ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে) শব্দগুলো ব্যবহার করতেন। এই শব্দগুলো দ্বারা বাহ্যিকভাবে এ ধোঁকার সম্ভাবনা দেখা দেয় যে, এর দ্বারা তাঁরা আয়াতের শানে নুযূল বর্ণনা করছেন। অথচ এর দ্বারা সব সময় শানে নুযূল বর্ণনা করা তাঁদের উদ্দেশ্য হয় না। বরং অধিকাংশ সময় এর দ্বারা তাঁদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে যে, অমুক মাসআলা বা অমুক বিষয়টি এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সূরা নিসায় মহান আল্লাহ পাক ইবলীসের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন-
وَلَأُمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ
'আর আমি তাদেরকে (মানুষকে) নির্দেশ প্রদান করব। ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করে দিবে।'
এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) এবং ইকরিমা (রা.) সহ অন্যান্যদের থেকে বর্ণিত আছে যে, আয়াতটি খাসী (অন্ডকোষ বের করে ফেলা) হওয়ার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে কেউ অন্ড-কোষ ছেঁটে খাসী হয়ে গেছে এবং ওই ঘটনাটি এই আয়াতের শানে নুযূল হয়েছে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, 'খাসী হওয়া' ওই সকল শয়তানী কর্মকান্ডের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোকে শয়তান (আল্লাহসৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন) করার দ্বারা ব্যক্ত করেছে। অন্যথায় এই আয়াতের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, "আল্লাহ সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন" কেবল খাসী হওয়ার মধ্যেই সীমিত। বরং এর আরো অনেক প্রকার হতে পারে। যেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা তাফসীরের কিতাবসমূহে বর্ণিত আছে। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ এবং তাবেঈন (রহ.)-গণের বর্ণনাশৈলী দ্বারা শানে নুযূলের ক্ষেত্রে দু'টি মূলনীতি স্পষ্ট হয়ে যায়।
(ক) যদি কোনো একটি আয়াতের তাফসীরে ভিন্ন ভিন্ন দু'টি বর্ণনা থাকে এবং উভয় বর্ণনায় (نَزَلَتِ الْآيَةُ فِي كَذَا) শব্দমালা ব্যবহার করা হয়, তবে বর্ণনা দু'টিতে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের কথা উল্লেখ থাকে, তাহলে বাস্তবে এই দুই বর্ণনার মাঝে কোনো বৈপরীত্য নেই। বরং নিজ নিজ স্থানে উভয় বর্ণনাই সঠিক। কারণ উভয় বর্ণনার মধ্য হতে কোনোটি দ্বারা এই উদ্দেশ্য হয় না যে, এ ব্যাপারটি আয়াতের শানে নুযূল। বরং উদ্দেশ্য হলো এ কথা বুঝানো যে, এ বিষয়টি আয়াতের মর্মার্থ ও হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন নিজের নেক বান্দাদের আলোচনা করতে গিয়ে পবিত্র কুরআন মাজীদে বলেছেন- تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ 'তাঁদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে পৃথক থাকে।' এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, যে সকল সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়টা নফল পড়ে কাটাতেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে এই আয়াত নাযিল হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় তাঁর থেকেই বর্ণিত আছে যে, এই আয়াত ওই সকল সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে, যারা ইশার নামাযের অপেক্ষায় জাগ্রত থাকতেন। আবার কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরামের মতে এই আয়াত তাহাজ্জুদগুজার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে। এখন বাহ্যিকভাবে এই মতানৈক্য শানে নুযূলের মতানৈক্য বলে মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলো আয়াতের বিভিন্ন উদ্দেশ্য। আর এ সবগুলো নেক আমল আয়াতের মর্মার্থের মধ্যে শামিল।
(খ) দ্বিতীয় মূলনীতি হলো, যদি কোনো একটি আয়াতের তাফসীরে দু'টি বর্ণনা পাওয়া যায়, একটির মধ্যে نَزَلَتِ الْآيَةُ فِي كَذَا শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় বর্ণনায় সরাসরি কোনো ঘটনাকে আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলে শানে নুযূলের জন্য এখানে দ্বিতীয় বর্ণনাটিই নির্ভরশীল। আর প্রথম বর্ণনা যেহেতু সরাসরি শানে নুযূলের মর্মার্থের অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই সেটাকে বর্ণনাকারীর নিজের ইজতেহাদ বা গবেষণা হিসেবে প্রযোজ্য হবে। যেমন, পবিত্র কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে- نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ 'তোমাদের স্ত্রী তোমাদের ফসলক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা যেভাবে চাও তোমাদের ফসলক্ষেত্রে গমন কর।' এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী (রহ.) ইবনে ওমর (রা.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃতি করে বলেন- أُنْزِلَتْ فِي إِتْيَانِ النِّسَاءِ فِي أَدْبَارِهِنَّ (স্ত্রীর সাথে পশ্চাৎপথে সহবাস করার ব্যাপারে এই আয়াত নাযিল হয়েছে)। অথচ হযরত জাবের (রা.) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু)-সহ প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ সুস্পষ্টভাবে এর শানে নুযূল বর্ণনা করেন এই যে, ইহুদীদের ধারণা ছিল, 'যদি পশ্চাৎ দিক থেকে সম্মুখের অংশেই স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হয় তাহলে সন্তান বিকলাঙ্গ হয়।' তাদের এই ভ্রান্ত ধারণাকে নির্মূলের উদ্দেশে এই আয়াত নাযিল হয়েছে। আর এই আয়াত এটা স্পষ্ট করে দিল যে, সহবাসের স্থান ওই একটাই। অর্থাৎ সম্মুখের অংশ, যে পথ দিয়ে সন্তান জন্ম নেয়। তবে পথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। উপরোক্ত দু'টি বর্ণনার মাঝে যেহেতু হযরত জাবের (রা.) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট, তাই এটাই অগ্রাধিকার পাবে। পক্ষান্তরে হযরত ইবনে ওমর (রা.)-এর বক্তব্যকে তাঁর ইজতেহাদ ও গবেষণা বলে গণ্য করা হবে। আর মূলত এই আয়াতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, এই আয়াতের আলোকে পশ্চাৎ পথ দিয়ে সহবাস জায়েয। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এই আয়াতের আলোকে নারীদের সাথে সমকামিতা হারাম প্রমাণিত হয়।
২. শানে নুযূল নির্ধারণ করার দ্বিতীয় মূলনীতি হচ্ছে, যদি দু'টি বর্ণনার মধ্য হতে একটি বর্ণনার সনদ সহীহ হয় আর দ্বিতীয় বর্ণনার সনদ দুর্বল বা অসম্পূর্ণ হয়, তাহলে সহীহ সনদ সম্বলিত বর্ণনাটি গ্রহণ করে দুর্বল সনদ সম্বলিত বর্ণনাটি বর্জন করতে হবে। যেমন, সূরা দোহা'র প্রাথমিক আয়াতগুলো- وَالضُّحَى (1) وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَى (2) مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى (3) 'সকালের উজ্জ্বল আলোর শপথ, রাতের শপথ যখন তা হয় শান্ত-নিঝুম, তোমার প্রতিপালক তোমাকে কক্ষনো পরিত্যাগ করেননি, আর তিনি অসন্তুষ্টও নন।'
এই আয়াতের শানে নুযূলে ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহ.) হযরত জুনদুব (রা.)-এর এই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন যে, একবার শারীরিক কোনো কষ্টের কারণে নবী কারীম (সা.) এক বা দু'রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়তে পারেননি। এতে এক কাফের মহিলা এই অপবাদ দিল যে, (নাউযুবিল্লাহ) 'মনে হচ্ছে তোমার শয়তান তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে।' এ ঘটনা প্রসঙ্গে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে। অপর দিকে ইমাম তবারানী (রহ.) ও ইবনে আবী শাইবা (রহ.) হাফস ইবনে মাইসারা (রহ.)-এর খালা হযরত খাওলা (রা.) থেকে এই রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, একবার একটি কুকুর ছানা নবী কারীম (সা.)-এর ঘরে এসে খাটের নিচে বসে গেল এবং ওখানেই সেটা মরে গেল। এ ঘটনার পর চার দিন পর্যন্ত তাঁর প্রতি কোনো ওহী নাযিল হয়নি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসূলের ঘরে এমন কি ঘটনা ঘটল যে, জিবরাঈল আমার নিকট আসছে না? আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার উচিত ঝাড়ু দিয়ে ঘরটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। আমি যখন ঝাড়ু দিয়ে খাটের নিচ পরিষ্কার করছিলাম তখনই ঝাড়ুর আঘাতে কুকুর ছানাটি বেরিয়ে এল। এ ঘটনা প্রসঙ্গে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে। তবে এই দ্বিতীয় বর্ণনাটি সনদের বিচারে সহীহ নয়। যেমন, হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) বলেন, 'এর সনদে কোনো কোনো বর্ণনাকারী মাজহুল (অপরিচিত)। কাজেই গ্রহণযোগ্য শানে নুযূল সেটাই, যা সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে।
৩. কখনো কখনো শানে নুযুলের ব্যাপারে বর্ণিত দু'টি বর্ণনার উভয়টিই সনদের দিক থেকে বিশুদ্ধ হয়ে থাকে। তবে একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দেওয়ার কোনো কারণ বিদ্যমান থাকে। যেমন, একটির সনদ অপরটির তুলনায় অধিক শক্তিশালী। অথবা একটি রেওয়ায়েতের বর্ণনাকারী এমন যে ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত ছিল। আর অন্য রেওয়ায়েতের বর্ণনাকারী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না। এ ক্ষেত্রে ওই রেওয়ায়েতকেই গ্রহণ করা হবে যে রেওয়ায়েতের পক্ষে অগ্রাধিকারের কারণ পাওয়া যাবে। এ প্রকারের উদাহরণ হলো সূরা 'ইসরা'র নিম্নোক্ত আয়াত- وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا (85) 'তোমাকে তারা রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল, 'রূহ হচ্ছে আমার প্রতিপালকের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত (একটি হুকুম)। এ সম্পর্কে তোমাকে অতি সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।'
এই আয়াতের শানে নুযূলের ক্ষেত্রে ইমাম বুখারী (রহ.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি মদীনা তাইয়্যেবায় রাসূলে কারীম (সা.)-এর সাথে যাচ্ছিলাম। তিনি খেজুর গাছের একটি ডালে ভর দিয়ে চলছিলেন। চলার এক পর্যায়ে আমরা ইহুদীদের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। তখন তারা পরস্পর বলছিল, আমাদের উচিত তাঁকে অর্থাৎ, নবী কারীম (সা.)-কে কিছু প্রশ্ন করা। এভাবে তারা এসে নবী কারীম (সা.)-কে বলল, আমাদেরকে "রূহ” সম্পর্কে অবগত করুন। এতে তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ পর মাথা মুবারক তুললেন। আমি বুঝতে পারলাম যে, তাঁর প্রতি ওহী নাযিল হচ্ছে। তারপর তিনি তেলাওয়াত করলেন- قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي। ইমাম তিরমিযী (রহ.) হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে অপর একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, একবার মক্কার কুরাইশরা ইহুদীদেরকে বলল, আমাদেরকে এমন একটি বিষয় বলে দিন যা আমরা তাঁকে [রাসূল (সা.)] কে জিজ্ঞেস করবো। তখন ইহুদীরা বলল, তাঁকে গিয়ে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন কর। এ প্রসঙ্গে আয়াতটি নাযিল হয়েছে। প্রথম রেওয়ায়েতটি থেকে জানা যায় যে, আয়াতটি পবিত্র মদীনা নগরীতে নাযিল হয়েছে। আর দ্বিতীয় রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায় যে, আয়াতটি মক্কা নগরীতে নাযিল হয়েছে। সনদের দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় রেওয়ায়েতই বিশুদ্ধ। কিন্তু প্রথম রেওয়ায়েতে অগ্রাধিকারের এই কারণ বিদ্যমান রয়েছে যে, বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজে সশরীরে ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন। পক্ষান্তরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর রেওয়ায়েত থেকে এটা বুঝা যায় না যে, তিনি স্বয়ং এ ঘটনার সময়ে উপস্থিত ছিলেন। কাজেই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর রেওয়ায়েতই অগ্রাধিকার পাবে।
৪. কখনো কখনো একই আয়াতের একাধিক শানে নুযূলও থাকে। অর্থাৎ পরপর এক জাতীয় কয়েকটি ঘটনা সংঘটিত হবার পর আয়াত নাযিল হয়। এখন কোনো বর্ণনাকারী এই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে একটি ঘটনাকে উল্লেখ করেন। আবার অন্য বর্ণনাকারী অন্য কোনো ঘটনা উল্লেখ করেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এগুলোর মাঝে বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ, উভয় ঘটনাই আয়াতের শানে নুযূল। যেমন, সূরা 'নূর'-এ লে'আনের আয়াতের ব্যাপারে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে ইমাম বুখারী (রহ.) রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যে, হেলাল ইবনে উমাইয়্যা (রা.) নবী কারীম (সা.)-এর দরবারে এসে নিজের স্ত্রীর উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করেন। এ প্রসঙ্গে এই আয়াত নাযিল হয়- وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمُ الخ. অপর দিকে ইমাম বুখারী (রহ.)-ই হযরত সাহল ইবনে সা'দ থেকে অন্য একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যে, হযরত উওয়াইমির (রা.) রাসূলে আকরাম (সা.)-কে এ প্রশ্ন করিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে অপর কোনো ব্যক্তির সাথে সঙ্গম অবস্থায় দেখতে পায় এবং সে তাকে হত্যা করে, তাহলে কি তার কাছ থেকে পূর্ণ কেসাস বা বদলা নেওয়া হবে? এ ধরনের ব্যক্তিকে কি করা উচিত? এর উত্তরে নবী কারীম (সা.) বললেন, তোমাদের ব্যাপারে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর এই আয়াতটিই তিনি তেলাওয়াত করে শুনিয়ে দিলেন। তৃতীয় আরেকটি রেওয়ায়েত 'মুসনাদে বায্যার'-এ হযরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এ ধরনের প্রশ্ন-উত্তর হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)-এর মাঝে হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আয়াতটি নাযিল হয়েছে। প্রকৃত কথা হচ্ছে, এই তিনটি ঘটনাই আয়াত অবতীর্ণ হবার পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। তাই এর প্রত্যেকটিকেই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে ধরা যায়।
৫. আবার কখনো কখনো এর বিপরীত এ রকম হয়ে থাকে যে, ঘটনা একটিই ঘটে থাকে, কিন্তু এর আওতায় কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হয়ে থাকে। এখন একজন বর্ণনাকারী এই ঘটনাকে উল্লেখ করে বলেন যে, এ ঘটনা প্রসঙ্গে অমুক আয়াতটি নাযিল হয়েছে। আবার অন্য এক বর্ণনাকারী এই ঘটনাটি বর্ণনা করে অন্য এক আয়াত উদ্ধৃত করেন। এর দ্বারা বাহ্যিকভাবে বর্ণনা দু'টিতে বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো বৈপরীত্য নেই। এ প্রকারের উদাহরণ হলো, ইমাম তিরমিযী (রহ.) ও ইমাম হাকেম (রহ.) হযরত উম্মে সালামা (রা.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন যে, আমি একবার নবী কারীম (সা.)-এর নিকট আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! হিজরত ইত্যাদি প্রসঙ্গে নারীদের কোনো আলোচনা আমি কুরআনে কারীমে দেখতে পাই না। তখন এই আয়াত নাযিল হয়েছে- فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى 'তখন তাদের প্রতিপালক তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বললেন, তোমাদের মধ্যে পুরুষ হোক কিংবা নারীই হোক কোন কর্মীরই কর্মফল আমি নষ্ট করি না।' আবার হাকেম (রহ.) উম্মে সালামা (রা.) থেকেই রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, আমি নবী কারীম (সা.)-এর নিকট আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! পবিত্র কুরআনুল কারীমে কেবল পুরুষদেরই আলোচনা করা হয়েছে। নারীদের কোনো আলোচনা নেই। তখন এ প্রসঙ্গে إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ আয়াতটি নাযিল হয় এবং এটাও নাযিল হয়- أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى।
টিকাঃ
১৩১. ইবনে তাইমিয়া: মুকাদ্দামাহ ফী উসুলিস তাফসীর, পৃ: ৯।
১৩২. সূরা নিসা: ১১৯
১৩৩. সুয়ূতী: আদ দুররুল মানসুর: ২/২২৩
১৩৪. সূরা সাজদা: ১৬
১৩৫. তাফসীরে জামেউল বয়ান : ২১/৫৭-৫৮ ইবনে জারীর
১৩৬. সূরা বাকারা : ২২৩
১৩৭. আসবাবুন নুযূল : পৃঃ ৪০-৪১
১৩৮. আল-ইতকান : ১/৩২
১৩৯. মানাহিলুল ইরফান: ১/১০৮
১৪০. সূরা দুহা: ১-৩
১৪১. আল-ইতকান: ১/৩৩
১৪২. সূরা ইসরা: ৮৫
১৪৩. আল-ইতকান: ১/৩৪
১৪৪. সূরা নূর, আয়াত নং-৬
১৪৫. আল-ইতকান: ১/৩৪
১৪৬. সূরা আলে-ইমরান: ১৯৫
১৪৭. এখানে সূরা আহযাবের ৩৫ নং আয়াত। এখানে অনেক নেক আমলের কথা আলোচনা করতে গিয়ে আলাদা আলাদাভাবে পুরুষ ও নারীর নাম উল্লেখ করেছেন।
১৪৮. আল-ইতকান: ১/৩৫