📘 উলুমুল কুরআন 📄 কুরআনুল কারীমের পর্যায়ক্রমিক অবতরণ

📄 কুরআনুল কারীমের পর্যায়ক্রমিক অবতরণ


ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, নবী কারীম (সা.)-এর উপর সম্পূর্ণ কুরআন একসাথে অবতীর্ণ হয়নি। বরং অল্প অল্প করে পর্যায়ক্রমে দীর্ঘ তেইশ বছরে নাযিল হয়েছে। কখনো কখনো জিবরাঈল আমীন (আ.) একে বারে ছোট্ট একটি আয়াত; এমনকি কখনো কখনো আয়াতের একটি অংশ নিয়েও আগমন করতেন। আবার কখনো কখনো একাধিক আয়াত একসাথে নিয়ে আসতেন। পবিত্র কুরআনুল কারীমের সবচেয়ে ছোট যে অংশ পৃথকভাবে অবতীর্ণ হয়েছে তা হলো- غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ যা দীর্ঘ একটি আয়াতের অংশ। আবার অন্য দিকে সূরা আনআম পুরোটা এক সাথেই অবতীর্ণ হয়েছে।

কেউ কেউ আল্লামা ইবনে আসাকির (রহ.)-এর একটি রেওয়ায়েত দ্বারা এই সন্দেহে পড়ে যান যে, জিবরাঈল (আ.) একসাথে পাঁচ আয়াতের বেশি নিয়ে আসেননি। কিন্তু আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) এই ধারণার অপনোদন করতে গিয়ে বলেন, পাঁচ আয়াতের বেশিও একসাথে অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন, ইফকের ঘটনা সম্পর্কিত দশটি আয়াত একসাথে অবতীর্ণ হওয়ার কথা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে। অবশ্য এমনটি হতো যে, জিবরাঈল আমীন (আ.) রাসূলে আকরাম (সা.)-কে একসাথে পাঁচ আয়াত করে মুখস্ত করাতেন। যখন পাঁচ আয়াত মুখস্ত হয়ে যেত, তখন আরো পাঁচ আয়াত শুনিয়ে মুখস্ত করাতেন। যেমন, ইমাম বায়হাকী (রহ.) হযরত আবুল আলীয়া (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন যে, 'পবিত্র কুরআনুল কারীমের পাঁচ আয়াত পাঁচ আয়াত করে শিখে নাও। কেননা, নবী কারীম (সা.)-কে জিবরাঈল (আ.) থেকে পাঁচ আয়াত পাঁচ আয়াত করে মুখস্ত করতেন।'

পবিত্র কুরআনুল কারীমের সম্পূর্ণটা একসাথে নাযিল না করে কেন অল্প অল্প করে পর্যায়ক্রমে নাযিল করা হলো? খোদ আরবের মুশরিকরাই রাসূলে খোদা (সা.)-কে এই প্রশ্ন করেছিল। কেননা তারা পুরো একটি কাসীদা (কবিতা) একই সাথে শুনে অভ্যস্ত ছিল। তাই কুরআনের এই ধীরগতির ও পর্যায়ক্রমিক অবতরণ তাদের জন্য একটি আশ্চর্য ও বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। উপরন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমের পূর্বে তাওরাত, যাবুর ও ইনজিল সম্পূর্ণটাই একসাথে অবতীর্ণ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে এ ধরনের পর্যায়ক্রমিক ধীর গতির পদ্ধতি ছিল না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই প্রশ্নের জবাব খোদ কুরআনের মাঝেই দিয়েছেন।

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا وَلَا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيرًا
'কাফিররা বলে- তার কাছে পুরো কুরআন এক সাথে অবতীর্ণ করা হল না কেন? আমি এভাবেই অবতীর্ণ করেছি। তোমার হৃদয়কে তা দ্বারা সুদৃঢ় করার জন্য আমি তোমার কাছে তা ধীরে ধীরে পরিকল্পিত স্তরে ক্রমশঃ আবৃত্তি করিয়েছি। তারা আপনার কাছে যে কোনো বিষয় নিয়েই আসুক না কেন, আমি এর সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।'

ইমাম রাযি (রহ.) এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনুল কারীমের পর্যায়ক্রমে নাযিল হবার যেসব হেকমত বর্ণনা করেছেন, এখানে সেগুলোর সারমর্ম উল্লেখিত করাই যথেষ্ট হবে। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনুল কারীম পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে নাযিল হবার কয়েকটি হেকমত ও সার্থকতা ছিল।
১. যেহেতু নবী কারীম (সা.) ছিলেন উম্মী বা নিরক্ষর। লেখাপড়া জানতেন না। তাই পুরো কুরআন যদি একসাথে অবতীর্ণ করা হতো, তাহলে তা স্মরণ রাখা এবং আত্মস্থ করা নবীজীর জন্য মুশকিল হয়ে যেত। পক্ষান্তরে হযরত মূসা (আ.) লেখাপড়া জানতেন। তাই তাঁর প্রতি একসঙ্গে গোটা তাওরাত অবতীর্ণ হয়েছে।
২. যদি গোটা কুরআন একসঙ্গে অবতীর্ণ হতো তাহলে সাথে সাথে এর সকল বিধানের প্রয়োগ করাও আবশ্যক হয়ে পড়তো। আর সেটা পর্যায়ক্রমিক অবতরণের হেকমত ও বিচক্ষণতা পরিপন্থী, শরীয়তে যার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
৩. নবী কারীম (সা.) প্রত্যহ বিভিন্ন ধরণের নতুন নতুন কষ্ট ও নির্যাতনের শিকার হতেন। হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর বার বার কুরআন নিয়ে আগমন করাটা সেসব কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করাকে সহজ করে দিত এবং তাঁর অন্তর দৃঢ় হবার কারণ হতো।
৪. পবিত্র কুরআনুল কারীমের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ মানুষের বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের জবাব এবং বিভিন্ন প্রকার ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। কাজেই সেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হবার পর অথবা ঘটনা সংঘটিত হবার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আয়াত অবতীর্ণ হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক ও যুক্তিযুক্ত। এতে এক দিকে যেমন উত্তরোত্তর মুমিনদের অন্তঃদৃষ্টি প্রসারিত হচ্ছিল, অপর দিকে সমকালীন বিভিন্ন ঘটনা প্রেক্ষিতে অগ্রিম সংবাদ প্রদানের ফলে কুরআনের সত্যতার বিষয়টি তাঁদের কাছে আরো অধিকতর উদ্ভাসিত হয়ে যেত।

টিকাঃ
৮২. সূরা নিসা: ৯৫
৮৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/১২২
৮৪. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: "আল-ইতকান": ১/৪৪
৮৫. সূরা ফুরকান: ৩২-৩৩
৮১. "আত-তাফসীরুল কাবীর" ইমাম রাযিঃ ৬/৩৩৬

📘 উলুমুল কুরআন 📄 কুরআন অবতীর্ণের বিন্যাস ও বর্তমান বিন্যাস

📄 কুরআন অবতীর্ণের বিন্যাস ও বর্তমান বিন্যাস


বর্তমানে পবিত্র কুরআনুল কারীম যে তারতীব বা বিন্যাস ধারায় আমাদের কাছে বিদ্যমান রয়েছে নবী কারীম (সা.)-এর উপর এই তারতীব ও বিন্যাস ধারায় অবতীর্ণ হয়নি। বরং প্রয়োজন ও অবস্থার প্রেক্ষিতে অবতরণের ক্রমধারা ছিল এর চেয়ে ভিন্ন। এমন হতো যে, যখনই কোনো আয়াত অবতীর্ণ হতো, তখন নবী কারীম (সা.) ওহী লেখকদের বলে দিতেন, এই আয়াতটিকে অমুক সূরার অমুক স্থানে লিপিবদ্ধ কর। ফলে তাঁর নির্দেশিত স্থানেই ওই আয়াত লেখা হতো। অবতীর্ণ আয়াতের তারতীব বা ক্রমধারা সংরক্ষণের চেষ্টা যেমন রাসূল (সা.) করেননি, তেমনি তাঁর সাহাবারাও করেননি।

তাই যখন কুরআন পরিপূর্ণ হয়ে গেল তখন মানুষের স্মরণই থাকল না যে, কোন আয়াত কোন তারতীব ও ক্রমধারায় অবতীর্ণ হয়েছে? এ জন্যই এখন আংশিকভাবে কোনো কোনো সূরা বা আয়াতের ব্যাপারে এ কথা জানা যায় যে, এর তারতীব কি ছিল? কিন্তু পূর্ণ কুরআন অবতরণের তারতীব ও ক্রমধারা নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করা যায় না।

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) “আল-ইতকান” গ্রন্থে কিছু কিছু রেওয়ায়েতের সাহায্যে সূরাগুলো অবতরণের ক্রমধারা বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই রেওয়ায়েতগুলো থেকে নিশ্চিতভাবে শুধু এতটুকু জানা যায় যে, কোন্ সূরাটি মাক্কী আর কোন্ সূরাটি মাদানী? বস্তুত অবতরণের ক্রমধারা এগুলো থেকে বিস্তারিত জানা যায় না। নিকট অতীতে কোনো কোনো প্রাচ্যবিশারদও অবতরণের ক্রমধারা নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। সর্বপ্রথম প্রাচ্যবিশারদ বিখ্যাত জার্মানী পন্ডিত নোলডেকে এ কাজের সূচনা করেন। তারপর বহু পাশ্চাত্য লেখকদের নিকট তা এক চিত্তাকর্ষক বিষয়ের রূপ লাভ করে। উইলিয়ম মূরও এ বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এমনকি জে, এম, রাডওয়েল পবিত্র কুরআনুল কারীমের যে ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশ করেছেন, তাতে সূরাগুলোর প্রসিদ্ধ ক্রমধারা বর্ণনা না করে "নোলডেকে”-এর সন্দেহপূর্ণ ঐতিহাসিক ক্রমধারা উল্লেখ করেছেন। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হার্টওইগ হার্শফোল্ড শুধু সূরাই নয়; বরং আয়াতগুলোরও ঐতিহাসিক ক্রমধারা নির্ধারণের চেষ্টা চালিয়েছেন। এ ছাড়াও রেজিস ব্লাশিয়ার তার ফ্রান্সিসী অনুবাদে এ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। রিচার্ড বিলও এ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য দুনিয়ায় বেশ সুনাম কামিয়েছেন। প্রাচ্যবিশারদদের এই চেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে। আর সম্ভবত তাদের এই গবেষণায় প্রভাবিত হয়েই কোনো কোনো মুসলমানও কুরআন অবতরণের ক্রমধারার গবেষণার কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে এ সকল চেষ্টা এমন এক কাজে নিজের সময় ক্ষেপণ করার নামান্তর, যার মাঝে কখনো নিশ্চিত সফলতা লাভ করা সম্ভব নয়। উপরোল্লিখিত প্রাচ্য বিশারদগণ যেসব চেষ্টা চালিয়েছেন, সেগুলোর বেশিরভাগই এবারতের ব্যাপারে তাদের ব্যক্তিগত অনুমানের উপর ভিত্তিশীল। আর একজনের অনুমান যেহেতু অন্যজনের অনুমানের চেয়ে ভিন্নরূপ হয়ে থাকে, তাই তাদের বর্ণিত ক্রমধারার মাঝেও পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও এ সব অনুমান থেকে বিশেষ কোনো কার্যকর ফায়দা অর্জন করা মুশকিল।

প্রকৃতপক্ষে প্রাচ্যবিশারদদের এ সব চেষ্টা-প্রচেষ্টার পেছনে বিশেষ এক ধরনের মানসিকতা কাজ করছে। তারা মনে করে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীম আজও বিন্যাসহীন রয়েছে। এর আসল তারতীব ও বিন্যাস সেটাই যে ক্রমধারায় তা অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে তা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার পরিবর্তে বিভিন্ন জিনিসে লিখা হতো, তাই সেই তারতীব ও ক্রমধারা সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

রাডওয়েল তার অনূদিত কুরআনের ভূমিকায় লিখেছেন, 'পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্তমান বিন্যাসের কারণ হচ্ছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)- তিনি যখন বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত আয়াতগুলো সংকলন করেন, তখন সে ক্রমধারায় যা পেয়েছেন সেভাবেই তা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাই এতে ইতিহাস নির্ভর কিংবা অর্থগত তারতীব ও বিন্যাসের প্রতি লক্ষ্য রাখা যায়নি।' অতএব, তার দৃষ্টিতে পবিত্র কুরআনুল কারীমের বর্তমান বিন্যাস সম্পূর্ণ মনগড়া (নাউযুবিল্লাহ)। যা তিনি নিজ ধারণা মতে 'গবেষণা'র মাধ্যমে দূর করতে চাচ্ছেন!!

অথচ বিভিন্ন ঘটনাবলীর এসব প্রতিচ্ছবি কেবল ধারণা-প্রসূতই নয়; বরং সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণাদির সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াতের এই তারতীব ও বিন্যাস ওহী দ্বারা প্রমাণিত।
হযরত উসমান (রা.)- বলেন, যখন নবী কারীম (সা.)-এর প্রতি কোনো আয়াত নাযিল হতো, তখন তিনি ওহী লেখকদেরকে তা লিখে নেওয়ার নির্দেশের সাথে সাথে এ কথা বলে দিতেন যে, এই আয়াতটিকে অমুক সূরার অমুক স্থানে লিপিবদ্ধ কর। আর সাহাবায়ে কেরামও নবী কারীম (সা.)-এর বাতানো ওই তারতীব ও ক্রমধারা অনুযায়ীই পবিত্র কুরআনুল কারীম মুখস্ত করেছিলেন। এ কথা বলা একেবারেই ভুল যে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত যে ক্রমধারায় আয়াতগুলো পেয়েছেন, সে অনুযায়ীই লিপিবদ্ধ করেছেন। কারণ যদি এমনটিই হতো তাহলে বর্তমান কুরআনের সর্বশেষ আয়াতটি হওয়া উচিত ছিল। কেননা, হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সর্বশেষে এই আয়াতটি পেয়েছিলেন। অথচ এই আয়াতটি সূরা আহযাবের সংযুক্ত রয়েছে। এ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, হযরত যায়েদ (রা.) ও তাঁর সাথীদের সামনে যখন কোনো আয়াত পেশ করা হতো, তখন তাঁরা আয়াতটিকে ওই স্থানেই লিপিবদ্ধ করতেন, যেখানে লিপিবদ্ধ করার জন্য স্বয়ং নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন। অবশ্য সূরাগুলোর তারতীব ও বিন্যাসের ব্যাপারে মুফাসসিরগণের দু'টি মত পরিলক্ষিত হয়। কারো কারো মতে এটাও ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ নিজেদের আলোচনা ও ইজতেহাদের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করেছেন। তবে অধিকতর সঠিক কথা এটাই মনে হয় যে, অনেকগুলো সূরার তারতীব ও ক্রমধারা তো ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর কোনো কোনো সূরার ব্যাপারে কোনো দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। যেমন সূরা তাওবা। সে বিধায় সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ নিজেদের ইজতেহাদের মাধ্যমে সূরা আনফালের পরে সূরা তওবাকে লিপিবদ্ধ করেছেন।

টিকাঃ
১৯৪. ইয়াকুব হাসান রচিত: 'কাশশাফুল হুদা' পৃঃ ১৭৫-১৮২।
১৯৫. Rodwell, J. M, The Koran (translated) London, 1953 p. 2.
৯৬. সুনানে আরবাআ ও মুসনাদে আহমদ গ্রন্থসমূহের উদ্ধৃতি দিয়ে ফাতহুল বারী: ৯/১৮
৯৭. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: ফাতহুল বারী: ৯/৩২-৩৫

📘 উলুমুল কুরআন 📄 শানে নুযূল বা অবতীর্ণ প্রেক্ষাপট

📄 শানে নুযূল বা অবতীর্ণ প্রেক্ষাপট


মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীমের আয়াতগুলো দু'ধরনের।
১. কিছু আয়াত এমন রয়েছে যেগুলো আল্লাহ তাআলা নিজেই নাযিল করেছেন। বিশেষ কোনো ঘটনা বা কারো কোনো প্রশ্ন এগুলো নাযিল হবার কারণ নয়।
২. আবার এমন কিছু আয়াত রয়েছে যেগুলো বিশেষ কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে কিংবা কারো কোনো প্রশ্নের জবাবে নাযিল হয়েছে। যেটাকে ওই আয়াতগুলোর প্রেক্ষাপট বলা হয়। এই প্রেক্ষাপটকেই মুফাসসিরগণের পরিভাষায় "আসবাবে নুযূল" বা "শানে নুযূল” বলা হয়। যেমন সূরা বাকারায় বর্ণিত হয়েছে-
وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ
'এবং মুশরিক নারীকে ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমরা বিয়ে করনা এবং নিশ্চয়ই মু'মিন কৃতদাসী মুশরিক মহিলা অপেক্ষা উত্তম যদিও সে তোমাদেরকে মোহিত করে।'

উক্ত আয়াতটি বিশেষ একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে। জাহেলী যুগে হযরত মারসাদ ইবনে আবী মারসাদ গানাবী (রা.)-এর সাথে 'ইনাক' নামী এক নারীর সম্পর্ক ছিল। ইসলাম গ্রহণ করার পর হযরত মারসাদ মদীনায় চলে আসলেন। ওই নারী মক্কায় থেকে গেল। একবার কোনো কাজে হযরত মারসাদ মক্কায় আসলে ইনাক তাঁকে পাপকর্মের প্রতি আহ্বান জানাল। হযরত মারসাদ তার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ইসলাম আমার মাঝে এবং তোমার মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য তুমি যদি চাও, তাহলে নবী কারীম (সা.)-এর অনুমতি ক্রমে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। মদীনায় পৌঁছে হযরত মারসাদ (রা.) নবী কারীম (সা.)-এর নিকট বিবাহের অনুমতি প্রার্থনা করলেন এবং নিজের পছন্দের কথা প্রকাশ করলেন। এ ঘটনার প্রেক্ষিতেই উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং তা মুশরিক নারীদের বিবাহ করতে নিষেধ করে দেয়। কাজেই এই ঘটনাটিই উপরোক্ত আয়াতের "সববে নুযূল" বা "শানে নুযূল।"

টিকাঃ
৯৮. সূরা বাকারা: ২২১
৯৯. "আসবাবুন নুযূল" পৃঃ ৩৮, আল-ওয়াহেদী : মুসতফা আল-বাবী, মিসর : ১৩৭৯ হিজরী।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 শানে নুযূলের গুরুত্ব ও উপকারিতা

📄 শানে নুযূলের গুরুত্ব ও উপকারিতা


ইলমে দ্বীনে অপরিপক্ক কিছু কিছু লোক শানে নুযূলের তাৎপর্য ও উপকারিতাকে অস্বীকার করতে গিয়ে বলে, 'পবিত্র কুরআনুল কারীম নিজেই এত স্পষ্ট ও উদ্ভাসিত যে, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য শানে নুযূল সম্পর্কে জানার কোনো প্রয়োজন নেই।' কিন্তু তাদের ধারণা একবারেই ভুল ও ভ্রান্ত। পবিত্র কুরআনুল কারীমের তাফসীরের জন্য শানে নুযূল সম্পর্কিত জ্ঞানার্জন এক আবশ্যকীয় শর্তের মর্যাদা রাখে। এর উপকারিতাও সীমাহীন ও অসংখ্য। নিম্নে সেগুলোর কয়েকটি আলোকপাত করা হচ্ছে-

১. আল্লামা যারকাশী (রহ.) বলেন, শানে নুযূল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রথম উপকারিতা হচ্ছে, এর দ্বারা আহকামের হেকমত তথা নিগূঢ় রহস্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করা যায় এবং এটা জানা যায় যে, মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু এই হুকুমটি কোন প্রেক্ষাপটে এবং কেন নাযিল করেছেন। যেমন, সূরা নিসায় বিবৃত হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَى
'হে মুমিনগণ! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না।' যদি শানে নুযুলের রেওয়ায়েত সামনে না থাকে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের সুস্পষ্ট প্রমাণ দ্বারা যখন মদ পান করা সম্পূর্ণ হারাম তখন এ কথা বলার কি প্রয়োজন আছে যে, ' তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকট যেয়ো না।'? এ প্রশ্নের জবাব কেবল শানে নুযূল থেকেই পাওয়া যাবে। এই আয়াতের শানে নুযুলের ব্যাপারে হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, মদপান করা হারাম হবার পূর্বে একবার হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) কয়েকজন সাহাবাকে নিমন্ত্রণ করলেন। সেখানে আহারান্তে মদ পান করা হলো। এমতাবস্থায় নামাযের সময় উপস্থিত হলো। তখন একজন সাহাবী নামাযের ইমামতি করলেন। নেশাগ্রস্ততার কারণে নামাযে কুরআন তেলাওয়াতে ভুল হয়ে গেল। এই প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করেই উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছে।

২. অনেক সময় শানে নুযূল ব্যতিরেকে আয়াতের সঠিক মর্ম উপলব্ধি করাই সম্ভবপর হয় না। যদি শানে নুযূল সামনে না থাকে তাহলে মানুষ আয়াতের সম্পূর্ণ ভুল অর্থ বুঝে নিতে পারে। কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
(১) সূরা বাকারায় মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَلِلَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ
'আর পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা যে দিকেই মুখ ফিরাও, সে দিকেই আল্লাহর চেহারা।' যদি এই আয়াতের শানে নুযূল সামনে না থাকে, তাহলে বাহ্যিকভাবে এর দ্বারা বুঝা যায় যে, নামাযে বিশেষ কোনো এক দিকে মুখ ফিরানো আবশ্যক নয়। পশ্চিম-পূর্ব সবই আল্লাহ তাআলার মালিকানায়। আর তিনি সবদিকেই আছেন। তাই যে দিকেই মুখ ফিরাবে নামায আদায় হয়ে যাবে। অথচ যুক্তিগতভাবেই এই ধারণাটি ভুল। স্বয়ং কুরআনই অন্য স্থানে কাবা শরীফের দিকে মুখ করার আবশ্যকতা বর্ণনা করেছে। এসকল জট একমাত্র শানে নুযূলের মাধ্যমেই খুলে থাকে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যখন মুসলমানদের কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে কাবা শরীফের দিকে পরিবর্তিত হলো, তখন ইহুদীরা এই প্রশ্ন তুলল যে, 'এ পরিবর্তনের হেতু কি?' তাদের এই প্রশ্নের জবাবেই উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছে। আয়াতের সারমর্ম হলো, সব দিকই মহান আল্লাহ তা'আলারই গড়া। আর আল্লাহ সব দিকেই আছেন। তাই তিনি যে দিকেই মুখ করতে নির্দেশ দিবেন সে দিকে মুখ ফিরানো ওয়াজিব। এখানে কেয়াস-অনুমান ও সংশয়-সন্দেহের দখল দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
(২) এ ভাবে সূরা মায়েদার এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে-
لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا إِذَا مَا اتَّقُوا وَآمَنُوا
'যারা ঈমান আনে আর সৎকর্ম করে তারা পূর্বে যা খেয়েছে তারা জন্য তাদের উপর কোন পাপ নেই যদি তারা (হারাম থেকে) বিরত থাকে, আর ঈমান আনে ও সৎকাজ করে,' যদি এই আয়াতের বাহ্যিক শব্দের দিকে লক্ষ্য করা হয় তাহলে এ কথা বলা যাবে যে, মুসলমানদের জন্য কোনো বস্তুই খাওয়া বা পান করা হারাম নয়। যদি অন্তরে ঈমান ও আল্লাহর ভয় থাকে এবং সৎকর্মশীল হয় তাহলে মানুষ যা চায় তাই পানাহার করতে পারবে। আর যেহেতু এই আয়াত মদ্যপান হারাম হবার পরপরই এসেছে তাই কেউ এ কথাও বলতে পারে যে, এ আয়াত ঈমানদার ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের জন্য (নাউযুবিল্লাহ) মদ্যপানের অনুমতিও প্রদান করেছে। আর এটা শুধু সন্দেহ বা সম্ভাবনা নয়; বরং কোনো কোনো সাহাবা (রা.) পর্যন্ত এই আয়াত থেকে ভুল বুঝের শিকার হয়েছেন এবং তাঁরা হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.)-এর সামনে গিয়ে নিজেদের স্বপক্ষে এই আয়াত দ্বারা দলীল নিয়ে এ খেয়াল পেশ করলেন যে, মদ্যপানকারী ব্যক্তি যদি অতীতে সৎকর্মশীল হয় এবং তার সাধারণ জীবন-যাপন যদি সৎকর্মের মাঝে অতিবাহিত হয়, তাহলে তার উপর শরঈ দন্ড-বিধি প্রয়োগ করা যাবে না। পরবর্তীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের শানে নুযূলের উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁদের এই ভুল ধারণার অবসান ঘটান। বস্তুত এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট হলো, যখন মদ্যপান ও জুয়া খেলা হারাম হওয়ার আয়াত নাযিল হলো, তখন কোন কোন সাহাবায়ে কেরাম এই প্রশ্ন করলেন যে, যেসব সাহাবায়ে কেরাম মদ্যপান ও জুয়া খেলা হারাম হবার পূর্বে ইন্তেকাল করেছেন, অথচ মদ্যপান ও জুয়া খেলায় তাদের জীবন অতিবাহিত হয়েছে, তাদের পরিণতি কি হবে? তাঁদের এই প্রশ্নের জবাবে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে যে, হারামের বিধান নাযিল হবার পূর্বে যে সকল মুমিন মদ্যপান করেছে বা জুয়ার সম্পদ ভোগ করেছে তাদের উপর কোনো আযাব হবে না। এই শর্তে যে, তারা মুমিন এবং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অন্যান্য আদেশ-নিষেধের উপর আনুগত্যশীল।
(৩) আরো একটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন। সূরা বাকারায় ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَائِرِ اللَّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَا
'নিশ্চয়ই 'সাফা' এবং 'মারওয়া' আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। কাজেই যে ব্যক্তি কাবাগৃহের হাজ্জ অথবা 'উমরাহ করবে, তখন এ দু'টোর সাঈ করাতে তাদের কোনই গুনাহ নেই।' এই আয়াতে 'তার উপর কোনো দোষ নেই' এ শব্দ কয়টি থেকে বাহ্যিকভাবে বুঝা যায় যে, হজ ও উমরার মাঝে সাফা ও মারওয়ায় প্রদক্ষিণ করা জায়েয মাত্র। ফরয-ওয়াজিব কিছু নয়। এমনকি হযরত উরওয়াহ ইবনে যুবাইর (রহ.) এ ভুল উপলব্দির শিকার ছিলেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) তাঁকে জানিয়ে দিলেন যে, প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, জাহেলী যুগ থেকেই এই পাহাড় দু'টিতে দু'টি প্রতিমা স্থাপিত ছিল। একটি নাম ছিল আসাফ আর অপরটির নাম ছিল নায়েলা। তাই সাহাবায়ে কেরামের এ সন্দেহ সৃষ্টি হলো যে, সাফা ও মারওয়ায় প্রতিমা স্থাপিত থাকার দরুণ এ দু'টি প্রদক্ষিণ করা নাজায়েয হবে না তো! তাঁদের এ সন্দেহ দূর করার জন্যই এই আয়াতে কারীমা নাযিল হয়েছে। এই উদাহরণগুলো শুধু উপমা স্বরূপ পেশ করা হলো। নতুবা এ ধরনের আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অনেক আয়াতের সঠিক অনুধাবন শানে নুযূল জানা ব্যতিরেকে সম্ভব নয়।

৩. অনেক সময় পবিত্র কুরআনুল কারীমে এমন শব্দের প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়, শানে নুযুলের সাথে যার গভীর সম্পর্ক থাকে। যদি সেই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সঠিক প্রেক্ষাপট জানা না থাকে, তাহলে সেই শব্দগুলো অনেক সময় নাঊযুবিল্লাহ অনর্থক, আবার কখনো অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়, যা থেকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের বাগ্মিতা ও অলঙ্কারীত্বের উপর আঘাত আসে। যেমন সূরা তালাকে ইরশাদ হয়েছে-
وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ
'তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস। আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত।' এই আয়াতের মধ্যে "যদি তোমাদের সন্দেহ হয় তাহলে যে, এই শব্দগুলো থেকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিশেষ কোনো উপকারিতা পরিলক্ষিত হয় না। এমনকি কোনো কোনো আহলে-জাহের এ শব্দগুলো দ্বারা এই অর্থ করেছেন যে, বয়োপ্রাপ্তা নারী, যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের গর্ভবতী হবার ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ না থাকে, তাহলে তাদের উপর ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব নয়।” কিন্তু শানে নুযূলই এই শব্দগুলোর প্রকৃত কারণ বাতলে দিচ্ছে। হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, যখন সূরা নিসায় মহিলাদের ইদ্দতের বর্ণনা দেওয়া হলো, তখন আমি নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আরয করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন কোন মহিলা এমন রয়েছে যাদের ইদ্দত কুরআনে বর্ণনা করা হয়নি। যেমন, ছোট বালিকা, যারা এখনো ঋতুস্রাবের বয়সে উপনীত হয়নি, বয়োপ্রাপ্তা মহিলা যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে এবং গর্ভবতী মহিলা।' হযরত উবাই ইবনে কা'আব (রা.)-এর এ প্রশ্নের জবাবে উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাতে তিনো ধরণের নারীরাই ইদ্দতের হুকুম বর্ণনা করা হয়েছে।
এ প্রকারের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে সূরা বাকারার নিম্নোক্ত আয়াত-
فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكُرِكُمْ آبَاءَكُمْ
'অতঃপর মহান হাজ্জের করণীয় কার্যাবলী সমাপ্ত করবে, তখন আল্লাহর স্মরণে মশগুল হও, যেমন তোমরা নিজেদের বাপ-দাদাদের স্মরণে মশগুল থাক।' যদি শানে নুযূল সামনে না থাকে তাহলে এই আয়াতের 'যেভাবে তোমরা স্মরণ করতে তোমাদের বাপ-দাদাদেরকে।'-এই অংশটিকে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়। কারণ এ কথা বুঝে আসে না যে, এই বিশেষ স্থানে আল্লাহর স্মরণকে বাপ-দাদার স্মরণের সাথে তুলনা করার উদ্দেশ্যটা কি? কিন্তু শানে নুযূল দ্বারা এ জট খুলে যায়। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, এখানে মুযদালিফায় অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। আর আরব মুশরিকদের প্রথা ছিল, তারা হজ্বের কার্য সম্পন্ন করার পর মুযদালিফায় এসে নিজেদের বাপ-দাদার গৌরবগাঁথা ও কীর্তিকলাপ বর্ণনা করত। উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বাপ-দাদার স্মরণের পরিবর্তে আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

৪. পবিত্র আল-কুরআনুল কারীমে এমন জায়গাও কম নয়, যেখানে বিশেষ কোনো ঘটনার প্রতি সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত ওই ঘটনাটি জানা না থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই আয়াতগুলোর উদ্দেশ্যই বোধগম্য হবে না। যেমন, পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
'আর আপনি (মাটির মুষ্টি) নিক্ষেপ করেননি যখন আপনি নিক্ষেপ করেছিলেন; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন।' মূলত এই আয়াতে বদর যুদ্ধের একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। নবী কারীম (সা.) কাফেরদের বেষ্টনীর সময় তাদের প্রতি একমুষ্টি মাটি নিক্ষেপ করেছিলেন। এতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, যদি এর শানে নুযূল মাথায় না থাকে, তাহলে আয়াতের মর্ম বুঝে আসবে কিভাবে? এখানে শানে নুযূলের সকল উপকারিতা বর্ণনা করা উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু উপরোল্লিখিত উদাহরণগুলো দ্বারা এ কথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের তাফসীরের ক্ষেত্রে শানে নুযূলে গুরুত্ব কতটুকু? একারণেই ইমাম ওয়াহেদী (রহ.) বলেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আয়াতের শানে নুযূল ও সংশ্লিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে অবগত না হওয়া যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আয়াতের মর্ম বর্ণনা করা সম্ভব নয়।'
অতএব, যে সকল লোক সর্বশেষ আসমানী কিতাব মহাগ্রন্থ পবিত্র আল-কুরআনের তাফসীর করার ক্ষেত্রে শানে নুযূলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেন, তারা হয়তো এ ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ। নতুবা শানে নুযূল থেকে মুক্ত হয়ে কুরআনে কারীমের বক্তব্যকে নিজের মনগড়া অর্থ প্রকাশ করার জন্যই এমনটি করে থাকেন।

টিকাঃ
১০০. "আল-বুরহান ফী উলূমীল কুরআন" ১/২২
১০১. সূরা নিসা: ৪৩
১০২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৫০০ মাতবায়া মুসতফা মুহাম্মদ: ১৩৫৬ হিজরী।
১০৩. সূরা বাকারা: ১১৫
১০৪. আল-ইতকান: ১/৩৩
১০৫. সূরা মায়েদা: ৯৩
১০৬. আল-কুরতুবীঃ আল-জামেউ লি আহকামিল কুরআন: ৬/২৯৭ কায়রো, মিসর ১৩৮৭ হিজরী।
১০৭. প্রাগুক্ত: ৬/২৯৪।
১০৮. সূরা বাকারা: ১৫৮
১০৯. মানাহিলুল ইরফান: ১/১০৪
১১০. সূরা তালাক : ৪
১১১. আল-ইতকান: ১/৩০
১১২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/৩৮১
১১৩. সূরা বাকারা: ২০০
১১৪. আসবাবুন নুযূল: পৃঃ ৩৪
১১৫. সূরা আনফাল: ১৭
১১৬. আসবাবুন নুযূল: পৃঃ ১৩৩
১১৭. আসবাবুন নুযূল: পৃঃ ৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px