📄 সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াত
নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী প্রিয় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি সর্বপ্রথম কুরআনের যে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়, তা ছিল "সূরা আলাক'-এর প্রথম পাঁচ আয়াত। সহীহ বুখারীতে উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘটনা বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি 'ভারী স্বপ্নের' মাধ্যমে ওহীর সূচনা হয়। এরপর থেকেই তাঁর ভেতর নির্জনে ইবাদত করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
ওই সময়ে নবী কারীম হেরা গুহায় কয়েকটি রাত কাটিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে মাশগুল থাকতেন। এ অবস্থাতেই একদিন হেরা গুহায় নবী কারীম (সা.) নিকট আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতা আগমন করলেন এবং সর্বপ্রথম বললেন, ইকরা (অর্থাৎ আপনি পড়ুন)। নবী কারীম (সা.) জবাবে বললেন, 'আমি পড়তে জানি না।'
এর পরের ঘটনা রাসূলে খোদা (সা.) নিজেই বর্ণনা করেন যে, আমার জবাব শুনে ফেরেশতা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং এমনভাবে চাপ দিলেন যে, আমি চরম ক্লান্তি অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, ইকরা (আপনি পড়ুন।) আমি জবাবে আগের কথাই বললাম, 'আমি পড়তে জানি না।' ফেরেশতা আমাকে আবারও জড়িয়ে ধরলেন এবং পূর্বের ন্যায় এমন জোরে চাপ দিলেন যে, আমি চরম ক্লান্তি অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ইকরা (আপনি পড়ুন।) আমি জবাবে বললাম, আমি পড়তে জানি না। তিনি তৃতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং ভীষণ চাপ দিয়ে ছেড়ে দিলেন। তারপর বলতে লাগলেন--
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ {1} خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ {2} اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ {3}
'তুমি পাঠ কর তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট বাঁধা রক্ত থেকে। পড়ুন, আর আপনার পালনকর্তা অত্যন্ত অনুগ্রহশীল।'
নবী কারীম (সা.) এই আয়াতগুলো নিয়ে যখন ঘরে ফিরলেন তখন তাঁর পবিত্র অন্তর ভয়ে ধড়ফড় করছিল। তিনি হযরত খাদিজা (রা.)-এর নিকট গেলেন এবং বললেন- যাম্মেলুনী যাম্মেলুনী (আমাকে চাদরে আবৃত কর। আমাকে চাদরে আবৃত কর।) ঘরের লোকেরা তাঁকে চাদরাবৃত করে দিলেন। এভাবে তাঁর ভয় কেটে গেল। এই আয়াতগুলো ছিল তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হওয়া সর্বপ্রথম আয়াত। এরপর তিন বছর যাবৎকাল ওহী অবতরণ বন্ধ থাকে। এই সময়টাকে "ফাতরাতুল ওহী" বিরতিকাল বলা হয়। তারপর ওই ফেরেশতা যিনি হেরা গুহায় এসেছিলেন নবীজি তাঁকে আসমান ও জমিনের মাঝে পুনরায় দেখতে পেলেন। তিনি নবীজিকে "সূরা মুদ্দাসসির"-এর আয়াতসমূহ শুনিয়ে দিলেন। এই ঘটনাটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ছাড়াও হাদীসের প্রায় সবগুলো কিতাবেই বিশুদ্ধ সনদসূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এ জন্য সমস্ত উলামায়ে কেরামের নিকট বিশুদ্ধ মত হচ্ছে এটিই যে, প্রিয় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি কুরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম যে আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল তা ছিল 'সূরা আলাকে'র প্রথম দিকের আয়াতগুলো। এরপর সূরা মুদ্দাসসিরের আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে। অবশ্য এ ব্যাপারে আরো তিনটি মতামতও পরিলক্ষিত হয়। যেগুলোর উপর হালকা দৃষ্টি বুলিয়ে নেওয়া উচিত।
১. সহীহ বুখারীর "কিতাবুত তাফসীর"-এ উল্লিখিত হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত একটি বর্ণনার বাহ্যিক আলোচনা দ্বারা বুঝা যায় যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি সর্বপ্রথম সূরায়ে মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই হাদীসের উপর ভিত্তি করেই কোনো কোনো আলেম বয়ান দিয়েছেন যে, অবতীর্ণ হওয়ার দিক থেকে সূরা মুদ্দাসসির সূরা আলাকের আগে। কিন্তু হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই ভুল বোঝাবুঝির প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করে বলেছেন, বস্তুত বুখারী শরীফের "কিতাবুত তাফসীর”-এ হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়েতটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং এতে দু'টি বাক্য বর্ণনা করা হয়নি। অথচ এই রেওয়ায়েতটিই ইমাম বুখারী (রহ.) ইমাম যুহরীর সনদ সূত্রে “ওহীর সূচনা” শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। ওই বর্ণনায় হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সূরা মুদ্দাসসির অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে সুস্পষ্টভাবে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই কথাগুলো উল্লেখ করেছেন- فإذا الملك الذي جاءني بحراء جالسا على كرسي 'হঠাৎ (আমি দেখতে পেলাম) যে ফেরেশতা হেরাগুহায় আমার নিকট এসেছিলেন, তিনি তখন কুরসিতে বসে ছিলেন।'
এ থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, হেরা গুহায় সর্বপ্রথম সূরা ইকরা বা আলাক্বের আয়াতগুলোই নাযিল হয়েছিল। সূরা মুদ্দাসসির তারপর নাযিল হয়। অবশ্য এ কথা বলা যেতে পারে যে, "ফাতরাতুল ওহী"-র পর সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সূরা হলো "সূরা মুদ্দাসসির।” অতএব, যেসব রেওয়ায়েত হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হওয়া ওহী হলো يَا أَيُّهَا المُدَّثِرُ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটাও হতে পারে যে, “ফাতরাতুল ওহী" ওহী বিরতি কালীন সময়ে সময় পার হওয়ার পর এটাই ছিল সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী। অথবা এটাও বলা যেতে পারে যে, সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গভাবে যে সূরা নাযিল হয়েছে তা ছিল সূরা মুদ্দাসসির। কেননা সূরা ইকরা (আলাক্ব) পূর্ণাঙ্গরূপে একবারে নাযিল হয়নি।
২. ইমাম বায়হাকী (রহ.) “دلائل النبوة” গ্রন্থে হযরত আমর ইবনে হুবাইল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে মুরসাল সূত্রে একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বে তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কে বলতেন, "আমি যখনই নির্জনে অবস্থান করি, তখন কে যেন আমাকে 'হে মুহাম্মদ! হে মুহাম্মাদ!' বলে ডাকে। এভাবে একদিন আমি যখন নির্জনে অবস্থান করছিলাম তখন সে বলে উঠল- بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (1) الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3) এভাবে সম্পূর্ণ সূরা ফাতেহা পাঠ করে ফেললেন। আর এই রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে আল্লামা যমখশরী (রহ.) লিখেছেন যে, সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত হচ্ছে "সূরায়ে ফাতেহা।” এমনকি তিনি এ মতকে অধিকাংশ মুফাসসিরীনের বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হাফেজ ইবনে হাযার (রহ.) তাঁর এই মতকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, যমখশরী (রহ.)-এর এই মত সঠিক নয়। কেননা সূরায়ে ফাতেহাকে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী বলার প্রবক্তা খুবই কম। বরং অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মত হচ্ছে সূরা ইকরা (আলাক্ব)-ই সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী। ইমাম বায়হাকী (রহ.) উল্লিখিত যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন সেটার ব্যাপারে তিনি নিজেই বলেন যে, যদি এই রেওয়ায়েত সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সম্ভবত তা সূরা ইকরা ও সূরা মুদ্দাসসির নাযিল হওয়ার পরের ঘটনা।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, হতে পারে অন্যান্য আয়াতের ন্যায় সূরা ফাতেহাও দু'বার অবতীর্ণ হয়েছে। সূরা ইকরা অবতীর্ণ হবার পূর্বে একবার এবং এরপরে আরেকবার। তখন এ কথা মেনে নিতে হবে যে, সূরা ফাতেহা প্রথম বার কুরআনের অংশ হিসেবে অবতীর্ণ হয়নি; বরং একজন ফেরেশতা রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তা (সুসংবাদ হিসেবে) শুনিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে উপযুক্ত সময়ে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশের মর্যাদা নিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। যাই হোক, উপরোক্ত এই তিনটি রেওয়ায়েত ব্যতীত বাকী অধিকাংশ রেওয়ায়েত এ ব্যাপারে একমত যে, সূরা ইকরা [আলাক]-এর প্রাথমিক আয়াতগুলোই সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছিল। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) এ মতের সমর্থনে বহু রেওয়ায়েত উপস্থাপন করেছেন।
টিকাঃ
৬৩. সূরা আলাক: ১-৩
৬৪. "সহীহ বুখারী": হাদীস নং ৩, 'ওহীর সূচনা' অধ্যায়।
৬৫. "আল-ইতকান": ১/১৫
৬৬. আয-যমখশরী: "আল-কাশশাফ আন হাকায়িকী গাওয়ামিযিত তানযীল" ৪/৭৭৫, কায়রো-১৩৬৫ হিজরী।
৬৭. "ফাতহুল বারী": ৮/৫৮০, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ইকরা।
৬৮. "ফাতহুল বারী": ৮/৫৮০, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ইকরা।
৬৯. "ফয়যুল বারী": ১/২৫
৭০. "আল-ইতকান": ১/২৪
৮৫. সূরা ফুরকান: ৩২-৩৩
📄 মাক্কী ও মাদানী আয়াতসমূহ
আপনারা পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরাসমূহের শিরোনামে হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, কোনো সূরার সাথে 'মাক্কী' এবং কোনো সূরার সাথে 'মাদানী' লিখা রয়েছে। এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা থাকা আবশ্যক।
অধিকাংশ তাফসীর বিশারদদের পরিভাষা অনুযায়ী 'মাক্কী' আয়াত বলতে সেসব আয়াতকে বুঝায়, যা রাসূলে আকরাম (সা.)-এর হিজরতের উদ্দেশ্যে মদীনায় যাওয়ার পূর্বে নাযিল হয়েছে। কারো কারো মতে যেসব আয়াত মক্কা নগরীতে নাযিল হয়েছে সেগুলো 'মাক্কী।' আর যেগুলো মদীনা নগরীতে নাযিল হয়েছে সেগুলো 'মাদানী।' কিন্তু অধিকাংশ তাফসীর বিশারদদের পরিভাষা অনুযায়ী এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ এমন অনেক আয়াত রয়েছে যা মক্কা নগরীতে নাযিল হয়নি; কিন্তু হিজরতের পূর্বে নাযিল হবার কারণে মাক্কী আয়াতসমূহ এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি হিজরতের পথে মদীনা নগরীতে পৌঁছার পূর্বে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে সেগুলোকেও 'মাক্কী' বলা হয়।
অনুরূপভাবে বহু আয়াত এমনও রয়েছে যা মদীনা নগরীতে নাযিল হয়নি; অথচ সেগুলোকে 'মাদানী' বলা হয়। যেমন, হিজরতের পর নবী কারীম (সা.) বহু সফরে বের হয়েছেন, যেগুলো মদীনা থেকে শত শত মাইল দূরত্বের ছিল। সেসকল স্থানে অবতীর্ণ আয়াতসমূহকে 'মাদানী'ই বলা হয়। এমনকি যেসব আয়াত মক্কা বিজয়, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় স্বয়ং মক্কা নগরী বা তার আশপাশের এলাকায় অবর্তীর্ণ হয়েছে সেগুলোকেও 'মাদানী' বলা হয়। যেমন- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا এই আয়াতটিকে মাদানী বলা হয়; অথচ এটি মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ হয়েছে।
সারকথা, মাক্কী ও মাদানী'র বিভক্তিকরণ যদিও স্থানভিত্তিক বলে মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেগুলো কালভেদে বিভক্ত হয়েছে। হিজরত সম্পূর্ণ হবার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলো 'মাক্কী।' আর যা পরে অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলো 'মাদানী।'
যদিও নবী কারীম (সা.) থেকে সরাসরি এমন কোনো রেওয়ায়েত বর্ণিত নেই যার মধ্যে কোনো আয়াত বা সূরাকে তিনি মাক্কী বা মাদানী বলে চিহ্নিত করেছেন। তবে যেসব সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈন (রহ.) কুরআনুল কারীমের শব্দ ও অর্থ সংরক্ষণে নিজেদের জীবন ব্যয় করেছেন, তাঁরাই সূরা ও আয়াতের ব্যাপারে এ কথাটিও বলে দিয়েছেন যে, কোনটি মাক্কী ও কোনটি মাদানী? যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শপথ করে বলেন, 'সেই মহান সত্ত্বার শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি আয়াতের ব্যাপারে আমার এই জ্ঞান আছে যে, সেটি কোন্ প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে এবং কোথায় নাযিল হয়েছে?’ হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আল্লাহর কসম! আমি প্রতিটি আয়াতের ব্যাপারে জানি যে, সেটি রাতে অবতীর্ণ হয়েছে নাকি দিনে? উন্মুক্ত স্থানে অবতীর্ণ হয়েছে নাকি পাহাড়-পর্বতে?
পবিত্র কুরআনুল কারীমের অধিকাংশ সূরা ও আয়াতের ব্যাপারে সাধারণত সাহাবায়ে কেরামই বলে দিয়েছেন যে, তা মাক্কী না কি মাদানী? এতদ্ব্যতীত কোনো কোনো আয়াত বা সূরার ব্যাপারে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারাও মাক্কী বা মাদানী হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। যেমন, যেসব আয়াতে বদর যুদ্ধের আলোচনা করা হয়েছে, স্পষ্ট তো এটাই যে তা মাদানীই হবে। আর যেসব আয়াতে বিশেষভাবে মক্কার মুশরিকদের সম্বোধন করে কিছু বলা হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ মাক্কীই হবে। অতএব, কোনো কোনো সময় এ ধরনের কেয়াস ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেও কোনো আয়াতকে মাক্কী বা মাদানী বলে সাব্যস্ত করা যায়। আর কেয়াস যেহেতু অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে তাই কোনো কোনো আয়াতের ক্ষেত্রে মুফাসসিরগণের মাঝে মতপার্থক্যও পরিলক্ষিত হয়েছে। কারো নিকট মাক্কী আর কারো নিকট মাদানী।
আবার কোনো কোনো সূরার পুরোটাই মাক্কী অথবা পুরোটাই মাদানী। যেমন, সূরা মুদাস্সিরের পুরোটাই মাক্কী। আর সূরা আলে-ইমরানের পুরোটাই মাদানী। আবার কোনো কোনো সূরার তথাপিও মাক্কী বলা হয়, কিন্তু তার কয়েকটি আয়াত মাদানী। যেমন, সূরা আ'রাফ মাক্কী। وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ - وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ -এর শেষ পর্যন্ত কয়েকটি আয়াত মাদানী। আবার কখনো এর বিপরীত হয়ে থাকে অর্থাৎ পুরো সূরা মাদানী। কিন্তু তার কয়েকটি আয়াত মাক্কী। যেমন, সূরা হজ মাদানী। وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ وَلَا نَبِي إِلَّا إِذَا تَمَنَّى পর্যন্ত মাক্কী।
এ আলোচনা থেকে এটাও সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, কোনো সূরার মাক্কী বা মাদানী হওয়াটা সাধারণত তার আয়াতের আধিক্যের বিচারে হয়ে থাকে। আবার কখনো এমনও হয় যে, যে সূরার প্রাথমিক আয়াতসমূহ হিজরতের পূর্বে নাযিল হয়েছে সেটাকে মাক্কী বলে অভিহিত করা হয়েছে। যদিও তার পরবর্তী আয়াতসমূহ হিজরতের পরে নাযিল হয়েছে।
টিকাঃ
৭১. "আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন"; ১/১৮৮
৭২. "মানাহিলুল ইরফান": ১/১৮৮
৭৩. "আল-ইতকান": ১/৯
৭৪. প্রাগুক্ত: ২/১৮৭
৭৫. "মানাহিলুল ইরফান": ১/১৯২
📄 মাক্কী ও মাদানী আয়াতের বিশেষত্ব
মুফাস্সিরীনগণ মাক্কী ও মাদানী সূরা সমূহের উপর অনুসন্ধান চালিয়ে সেগুলোর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করেছেন, যেগুলোর আলোকে সামান্য দৃষ্টি বুলালে সহজেই বুঝা যায় যে, সূরাটি মাক্কী নাকি মাদানী? এ বৈশিষ্ট্যগুলোর কিছু হলো, কুল্লী স্বতঃসিদ্ধ মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত। আর কিছু হলো, আকছারী অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কুল্লী স্বতঃসিদ্ধ মূলনীতি সমূহ নিম্নে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করা হলোঃ
১. যে সকল সূরাতে کَلَّا (কক্ষনো নয়) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলোর মাক্কী। এই শব্দটি ১৫টি সূরায় ৩৩ বার ব্যবহার হয়েছে। আর এই সবগুলোই পবিত্র কুরআনুল কারীমের শেষ অর্ধাংশে রয়েছে। যেমন, আল্লামা দায়রানী (রহ.) রচিত একটি কবিতায় তা ফুটে উঠেছে- وَمَا نَزَلَتْ كَلَّا بِيَثْرِبَ فَاعْلَمَنْ وَلَمْ تَأْتِ فِي الْقُرْآنِ فِي نِصْفِهِ الْأَعْلَى অর্থাৎ 'জেনে রাখ, মদীনাতে کَلَّا নাযিল হয়নি এবং কুরআনের প্রথমাংশে তা ব্যবহারও হয়নি।'
২. যেসব সূরায় সিজদার আয়াত রয়েছে সেগুলো মাক্কী। (এই মূলনীতি হানাফী মাযহাব অনুযায়ী। কারণ তাঁদের নিকট 'সূরা হজ্বে' সিজদা নেই। কিন্তু ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী সূরা হজে সিজদা আছে এবং তা 'মাদানী।' তাই তা এ মূলনীতির আওতামুক্ত থাকবে।)
৩. সূরা বাকারা ব্যতীত অন্যান্য যেসব সূরায় হযরত আদম (আ.) ও ইবলীসের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলোকে মাক্কী।
৪. যেসব সূরায় জিহাদের অনুমতি বা বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো মাদানী।
৫. যেসব সূরায় মুনাফিকদের আলোচনা করা হয়েছে সেগুলো মাদানী। তবে কতক আলেম এই মূলনীতি থেকে 'সূরা আনকাবুত'কে আলাদা করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে আসল কথা হলো, সূরা আনকাবুত সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে মাক্কী। কিন্তু যেসব আয়াতে মুনাফিকদের আলোচনা করা হয়েছে সেগুলো মাদানী।
যেসকল বিশেষতগুলো আকছারী বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এখানে (সেসকল) মূলনীতিগুলো নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:
১. মাক্কী সূরাগুলোতে সাধারণত يَا أَيُّهَا النَّاسُ (হে লোক সকল!) বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আর মাদানী সূরাগুলোতে সাধারণত يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا (হে মুমিনগণ!) বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
২. মাক্কী আয়াত ও সূরাগুলো সাধারণত ছোট ছোট ও সংক্ষিপ্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে মাদানী সূরা ও আয়াতগুলো বড় বড় ও বিশদবিবৃত।
৩. মাক্কী সূরাগুলোতে বেশিরভাগ তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের প্রমাণ, হাশর-নশর ও শেষ বিচারের চিত্র বর্ণনা, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ধৈর্য ও সান্ত্বনা প্রদান এবং পূর্ববর্তী উম্মতদের ঘটনাবলী সম্বলিত। এবং এগুলোতে বিধি-বিধান খুব কম বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে মাদানী সূরাগুলোতে পারিবারিক, সামাজিক নিয়মনীতি-আইন-কানুন, জিহাদ ও কিতাবের বিধি-বিধান এবং রাষ্ট্রীয় বিচার-আচার ও বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
৪. মাক্কী সূরাগুলোতে বেশিরভাগ মূর্তিপূজারীদের মুকাবিলা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে মাদানী সূরাগুলোতে ইহুদী-খ্রিস্টান ও মুনাফিকদের মুকাবিলা করা হয়েছে।
৫. মাক্কী সূরা গুলোর বর্ণনা শৈলী বেশ অলঙ্কারপূর্ণ এবং এগুলোতে উদাহরণ-উপমা ও রূপক ব্যবহার অনেক বেশি। এমনকি শব্দ ভাণ্ডারের ব্যাপক সমাবেশও ঘটেছে এগুলোতে। পক্ষান্তরে মাদানী সূরাগুলোর বর্ণনাভঙ্গি তুলনামূলক বেশ সহজ-সরল।
mাক্কী ও মাদানী সূরা সমূহের বর্ণনাশৈলীর এ পার্থক্য প্রকৃতপক্ষে অবস্থা, পরিবেশ ও সম্বোধিত ব্যক্তিদের রুচির তারতম্যের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। মাক্কী জীবনের যেহেতু মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ছিল মূর্তিপূজক মুশরিকরা এবং 'ইসলামী কোনো রাষ্ট্র ব্যবস্থাও অস্তিত্ব লাভ করেনি, তাই তখনকার দিনে অবতীর্ণ আয়াতসমূহে আকাইদ বা ধর্মীয় বিশ্বাসের সংস্কার, নৈতিক চরিত্রের সংশোধন, মূর্তি পূজার দলীলভিত্তিক প্রত্যাখ্যান এবং কুরআনুল কারীমের অলৌকিকত্বের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। পক্ষান্তরে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা অস্তিত্ব লাভ করেছিল। মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়া তলে আশ্রয় নিচ্ছিল। আর অত্যন্ত জ্ঞানগত ও যুক্তিগ্রাহ্যভাবেই মূর্তিপূজা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। এবং সর্বোপরি আদর্শিক মোকাবিলাটা ছিল আহলে কিতাব বা ইহুদী-খ্রিস্টানদের সাথে। তাই এ সময়কার আয়াতসমূহে বিধি-বিধান, আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতির শিক্ষা এবং আহলে কিতাবদের ভ্রান্ত ধারণার যুক্তিপূর্ণ জবাব দানের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। আর বর্ণনাভঙ্গিটাও সেই অনুযায়ী অবলম্বন করা হয়েছে।
যে কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিই অবস্থার তারতম্যের আলোকে পবিত্র কুরআনুল কারীমের বিষয়বস্তু ও বর্ণনাভঙ্গির বিভিন্নতা সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু যেসব প্রাচ্যবিদদের অন্তরে ইসলাম শত্রুদের আগুন জ্বলতে থাকে তারা মাক্কী ও মাদানী সূরার বর্ণনাশৈলীর এই তারতম্যের ব্যাপারেও মনগড়া ফলাফল বের করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। যেমন, কোনো কোনো পাশ্চাত্য ধর্ম গবেষক এ থেকে এই মন্তব্য করেছেন যে, 'পবিত্র কুরআনুল কারীম স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা। আর একারণেই অবস্থা ও পরিবেশের ভিন্নতার কারণে তার বর্ণনাশৈলীরও রূপ পরিবর্তন হয়েছে। যদি তা মহান আল্লাহর কালামই হতো, তাহলে তো অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তা প্রভাবিত হতো না।' (নাঊযুবিল্লাহ)
কিন্তু যার অন্তরে সামান্যতম ইনসাফ ও বিবেকের ছোঁয়া লেগেছে, সে এই শত্রুতামূলক আপত্তির অসারতা সহজেই বুঝতে পারবে। ইলমে বালাগাত বা অলঙ্কার শাস্ত্রের মূলনীতি হচ্ছে, مقتضى الحال সম্বোধিত ব্যক্তি এবং অবস্থা ও পরিবেশ অনুযায়ী কালাম বা বাক্য প্রয়োগ করা। সব ধরনের ব্যক্তির সামনে, সব ধরনের পরিবেশে একই রীতিতে কথা বলা পুরানো যুগের স্বাদ-রুচিহীনতা এবং অলঙ্কার শাস্ত্রের মৌলিক রীতিনীতি সম্পর্কে বে-খবর থাকারই প্রমাণ বহন করে। আর মহান আল্লাহ পাকের কালামে এ ধরনের স্বাদহীনতা ও অনভিজ্ঞতার ছাপ ওই ব্যক্তিই খুঁজে পায়, যারা সমালোচনার জন্যই সমালোচনা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
টিকাঃ
৭৬. "মানাহিলুল ইরফান": ১/১৯১
📄 কুরআনুল কারীমের পর্যায়ক্রমিক অবতরণ
ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, নবী কারীম (সা.)-এর উপর সম্পূর্ণ কুরআন একসাথে অবতীর্ণ হয়নি। বরং অল্প অল্প করে পর্যায়ক্রমে দীর্ঘ তেইশ বছরে নাযিল হয়েছে। কখনো কখনো জিবরাঈল আমীন (আ.) একে বারে ছোট্ট একটি আয়াত; এমনকি কখনো কখনো আয়াতের একটি অংশ নিয়েও আগমন করতেন। আবার কখনো কখনো একাধিক আয়াত একসাথে নিয়ে আসতেন। পবিত্র কুরআনুল কারীমের সবচেয়ে ছোট যে অংশ পৃথকভাবে অবতীর্ণ হয়েছে তা হলো- غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ যা দীর্ঘ একটি আয়াতের অংশ। আবার অন্য দিকে সূরা আনআম পুরোটা এক সাথেই অবতীর্ণ হয়েছে।
কেউ কেউ আল্লামা ইবনে আসাকির (রহ.)-এর একটি রেওয়ায়েত দ্বারা এই সন্দেহে পড়ে যান যে, জিবরাঈল (আ.) একসাথে পাঁচ আয়াতের বেশি নিয়ে আসেননি। কিন্তু আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) এই ধারণার অপনোদন করতে গিয়ে বলেন, পাঁচ আয়াতের বেশিও একসাথে অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন, ইফকের ঘটনা সম্পর্কিত দশটি আয়াত একসাথে অবতীর্ণ হওয়ার কথা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে। অবশ্য এমনটি হতো যে, জিবরাঈল আমীন (আ.) রাসূলে আকরাম (সা.)-কে একসাথে পাঁচ আয়াত করে মুখস্ত করাতেন। যখন পাঁচ আয়াত মুখস্ত হয়ে যেত, তখন আরো পাঁচ আয়াত শুনিয়ে মুখস্ত করাতেন। যেমন, ইমাম বায়হাকী (রহ.) হযরত আবুল আলীয়া (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন যে, 'পবিত্র কুরআনুল কারীমের পাঁচ আয়াত পাঁচ আয়াত করে শিখে নাও। কেননা, নবী কারীম (সা.)-কে জিবরাঈল (আ.) থেকে পাঁচ আয়াত পাঁচ আয়াত করে মুখস্ত করতেন।'
পবিত্র কুরআনুল কারীমের সম্পূর্ণটা একসাথে নাযিল না করে কেন অল্প অল্প করে পর্যায়ক্রমে নাযিল করা হলো? খোদ আরবের মুশরিকরাই রাসূলে খোদা (সা.)-কে এই প্রশ্ন করেছিল। কেননা তারা পুরো একটি কাসীদা (কবিতা) একই সাথে শুনে অভ্যস্ত ছিল। তাই কুরআনের এই ধীরগতির ও পর্যায়ক্রমিক অবতরণ তাদের জন্য একটি আশ্চর্য ও বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। উপরন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমের পূর্বে তাওরাত, যাবুর ও ইনজিল সম্পূর্ণটাই একসাথে অবতীর্ণ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে এ ধরনের পর্যায়ক্রমিক ধীর গতির পদ্ধতি ছিল না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই প্রশ্নের জবাব খোদ কুরআনের মাঝেই দিয়েছেন।
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا وَلَا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيرًا
'কাফিররা বলে- তার কাছে পুরো কুরআন এক সাথে অবতীর্ণ করা হল না কেন? আমি এভাবেই অবতীর্ণ করেছি। তোমার হৃদয়কে তা দ্বারা সুদৃঢ় করার জন্য আমি তোমার কাছে তা ধীরে ধীরে পরিকল্পিত স্তরে ক্রমশঃ আবৃত্তি করিয়েছি। তারা আপনার কাছে যে কোনো বিষয় নিয়েই আসুক না কেন, আমি এর সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।'
ইমাম রাযি (রহ.) এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনুল কারীমের পর্যায়ক্রমে নাযিল হবার যেসব হেকমত বর্ণনা করেছেন, এখানে সেগুলোর সারমর্ম উল্লেখিত করাই যথেষ্ট হবে। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনুল কারীম পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে নাযিল হবার কয়েকটি হেকমত ও সার্থকতা ছিল।
১. যেহেতু নবী কারীম (সা.) ছিলেন উম্মী বা নিরক্ষর। লেখাপড়া জানতেন না। তাই পুরো কুরআন যদি একসাথে অবতীর্ণ করা হতো, তাহলে তা স্মরণ রাখা এবং আত্মস্থ করা নবীজীর জন্য মুশকিল হয়ে যেত। পক্ষান্তরে হযরত মূসা (আ.) লেখাপড়া জানতেন। তাই তাঁর প্রতি একসঙ্গে গোটা তাওরাত অবতীর্ণ হয়েছে।
২. যদি গোটা কুরআন একসঙ্গে অবতীর্ণ হতো তাহলে সাথে সাথে এর সকল বিধানের প্রয়োগ করাও আবশ্যক হয়ে পড়তো। আর সেটা পর্যায়ক্রমিক অবতরণের হেকমত ও বিচক্ষণতা পরিপন্থী, শরীয়তে যার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
৩. নবী কারীম (সা.) প্রত্যহ বিভিন্ন ধরণের নতুন নতুন কষ্ট ও নির্যাতনের শিকার হতেন। হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর বার বার কুরআন নিয়ে আগমন করাটা সেসব কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করাকে সহজ করে দিত এবং তাঁর অন্তর দৃঢ় হবার কারণ হতো।
৪. পবিত্র কুরআনুল কারীমের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ মানুষের বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের জবাব এবং বিভিন্ন প্রকার ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। কাজেই সেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হবার পর অথবা ঘটনা সংঘটিত হবার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আয়াত অবতীর্ণ হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক ও যুক্তিযুক্ত। এতে এক দিকে যেমন উত্তরোত্তর মুমিনদের অন্তঃদৃষ্টি প্রসারিত হচ্ছিল, অপর দিকে সমকালীন বিভিন্ন ঘটনা প্রেক্ষিতে অগ্রিম সংবাদ প্রদানের ফলে কুরআনের সত্যতার বিষয়টি তাঁদের কাছে আরো অধিকতর উদ্ভাসিত হয়ে যেত।
টিকাঃ
৮২. সূরা নিসা: ৯৫
৮৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/১২২
৮৪. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: "আল-ইতকান": ১/৪৪
৮৫. সূরা ফুরকান: ৩২-৩৩
৮১. "আত-তাফসীরুল কাবীর" ইমাম রাযিঃ ৬/৩৩৬