📘 উলুমুল কুরআন 📄 প্রথম ধাপে অবতীর্ণ

📄 প্রথম ধাপে অবতীর্ণ


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা থেকে এত টুকু জানা যায় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের প্রথম পর্যায়ের নাযিল লাওহে মাহফুয থেকে দুনিয়ার আসমানে “বাইতুল ইজ্জত” নামক স্থানে হয়েছে। তবে এই বাইতুল ইজ্জতে কুরআন কিভাবে নাযিল হয়েছে? আর সেখানে নাযিলের তাৎপর্য ছিল কি? এ ব্যাপারে সুনিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। অবশ্য কোনো কোনো আলেম এর বিভিন্ন হেকমত বা তাৎপর্য বর্ণনা করেছেন।

যেমন আল্লামা আবু শামাহ (রহ.) এর তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “এর দ্বারা কুরআনুল কারীমের উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করাই ছিল উদ্দেশ্য। আর ফেরেশতাগণকেও এ কথা জানিয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল যে, এটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সর্বশেষ কিতাব। যা জগৎবাসীর হেদায়াতের জন্য নাযিল করা হচ্ছে।”

আল্লামা যুরকানী (রহ.) এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, এভাবে দু'পর্যায়ে পবিত্র কুরআনুল কারীম নাযিল করে এ কথা বুঝানো হয়েছে যে, এ কিতাব সর্বপ্রকার সংশয় ও সন্দেহের ঊর্ধ্বে। উপরন্তু নবী কারীম (সা.)-এর পবিত্র বক্ষদেশ ছাড়াও আরো দুই স্থানে তা সুরক্ষিত রয়েছে। একটি হলো, লাওহে মাহফুয ও আরেকটি হলো, "বাইতুল ইজ্জত।”

প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হেকমত ও নিগূঢ় রহস্যাবলী জানার সাধ্য কার? এর মাঝে আরো কি কি রহস্য লুকায়িত আছে তা একমাত্র তিনিই জানেন। আর আমাদেরকে সেগুলোর পেছনে পড়ার কোনো প্রয়োজনও নেই। তবে আমাদেরকে এ টুকু সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পবিত্র লাইলাতুল কদরের রজনীতে প্রথম “ধাপে নাযিল” হয়েছিল।

টিকাঃ
৫৯. মানাহিলুল ইরফান: ১/৩৯

📘 উলুমুল কুরআন 📄 দ্বিতীয় ধাপে অবতীর্ণ

📄 দ্বিতীয় ধাপে অবতীর্ণ


এ ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত যে, প্রিয় নবী কারীম (সা.)-এর প্রতি দ্বিতীয় পর্যায়ের অল্প অল্প করে পর্যায়ক্রমিক অবতরণ তখন থেকে আরম্ভ হয়েছিল, যখন নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বয়স চল্লিশ বছর ছিল। বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে এই অবতরণও শুরু হয়েছিল লাইলাতুল কদর থেকেই। আর এটা ছিল সেই ঐতিহাসিক দিন, যে দিনের (এগারো বছর পর) বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে- وَمَا أَنزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ 'আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি তার প্রতি, যেদিন দু'টি দল মুখোমুখি হয়েছে।'

এভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অবতরণের সূচনালগ্নের ব্যাপারে স্বয়ং আল-কুরআন থেকেই নিম্নোক্ত তথ্যগুলো পাওয়া যায়।
১. অবতরণের সূচনা রমযান মাস থেকে হয়েছে।
২. শবে কদরে অবতরণের প্রথম সূচনা হয়েছিল।
৩. ওই তারিখে প্রথম নাযিল হয়েছিল, যে তারিখে পরবর্তীতে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

তবে সেই রাতটি রমযানের কোন তারিখ ছিল? এ ব্যাপারে সুনিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। কোনো কোনো বর্ণনা থেকে জানা যায়, তা ছিল রমযানের সতের তারিখ। কোনো বর্ণনায় উনিশতম তারিখ। আবার কোনো কোনো বর্ণনা মতে সাতাশতম তারিখ।

টিকাঃ
৬০. প্রসিদ্ধ আছে যে, রাসূল (সা.) রবিউল আউয়াল মাসে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন। আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) এর যথাযথ ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, রবিউল আউয়াল মাসে রাসূল (সা.)-এর প্রতি সত্য স্বপ্নের আগমন শুরু হয়েছিল। ছয় মাস পর্যন্ত লাগাতার এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। অতঃপর রমযান মাসে কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ হতে শুরু করে। "আল ইতকান": ১/৪২
৬১. সূরা আনফাল: ৪১
৬২. দেখুন, "তাফসীরে জামেউল বয়ান": ১০/৭ মিসর। ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) রচিত

📘 উলুমুল কুরআন 📄 সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াত

📄 সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াত


নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী প্রিয় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি সর্বপ্রথম কুরআনের যে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়, তা ছিল "সূরা আলাক'-এর প্রথম পাঁচ আয়াত। সহীহ বুখারীতে উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘটনা বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি 'ভারী স্বপ্নের' মাধ্যমে ওহীর সূচনা হয়। এরপর থেকেই তাঁর ভেতর নির্জনে ইবাদত করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

ওই সময়ে নবী কারীম হেরা গুহায় কয়েকটি রাত কাটিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে মাশগুল থাকতেন। এ অবস্থাতেই একদিন হেরা গুহায় নবী কারীম (সা.) নিকট আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতা আগমন করলেন এবং সর্বপ্রথম বললেন, ইকরা (অর্থাৎ আপনি পড়ুন)। নবী কারীম (সা.) জবাবে বললেন, 'আমি পড়তে জানি না।'

এর পরের ঘটনা রাসূলে খোদা (সা.) নিজেই বর্ণনা করেন যে, আমার জবাব শুনে ফেরেশতা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং এমনভাবে চাপ দিলেন যে, আমি চরম ক্লান্তি অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, ইকরা (আপনি পড়ুন।) আমি জবাবে আগের কথাই বললাম, 'আমি পড়তে জানি না।' ফেরেশতা আমাকে আবারও জড়িয়ে ধরলেন এবং পূর্বের ন্যায় এমন জোরে চাপ দিলেন যে, আমি চরম ক্লান্তি অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ইকরা (আপনি পড়ুন।) আমি জবাবে বললাম, আমি পড়তে জানি না। তিনি তৃতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং ভীষণ চাপ দিয়ে ছেড়ে দিলেন। তারপর বলতে লাগলেন--
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ {1} خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ {2} اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ {3}
'তুমি পাঠ কর তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট বাঁধা রক্ত থেকে। পড়ুন, আর আপনার পালনকর্তা অত্যন্ত অনুগ্রহশীল।'

নবী কারীম (সা.) এই আয়াতগুলো নিয়ে যখন ঘরে ফিরলেন তখন তাঁর পবিত্র অন্তর ভয়ে ধড়ফড় করছিল। তিনি হযরত খাদিজা (রা.)-এর নিকট গেলেন এবং বললেন- যাম্মেলুনী যাম্মেলুনী (আমাকে চাদরে আবৃত কর। আমাকে চাদরে আবৃত কর।) ঘরের লোকেরা তাঁকে চাদরাবৃত করে দিলেন। এভাবে তাঁর ভয় কেটে গেল। এই আয়াতগুলো ছিল তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হওয়া সর্বপ্রথম আয়াত। এরপর তিন বছর যাবৎকাল ওহী অবতরণ বন্ধ থাকে। এই সময়টাকে "ফাতরাতুল ওহী" বিরতিকাল বলা হয়। তারপর ওই ফেরেশতা যিনি হেরা গুহায় এসেছিলেন নবীজি তাঁকে আসমান ও জমিনের মাঝে পুনরায় দেখতে পেলেন। তিনি নবীজিকে "সূরা মুদ্দাসসির"-এর আয়াতসমূহ শুনিয়ে দিলেন। এই ঘটনাটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ছাড়াও হাদীসের প্রায় সবগুলো কিতাবেই বিশুদ্ধ সনদসূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এ জন্য সমস্ত উলামায়ে কেরামের নিকট বিশুদ্ধ মত হচ্ছে এটিই যে, প্রিয় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি কুরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম যে আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল তা ছিল 'সূরা আলাকে'র প্রথম দিকের আয়াতগুলো। এরপর সূরা মুদ্দাসসিরের আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে। অবশ্য এ ব্যাপারে আরো তিনটি মতামতও পরিলক্ষিত হয়। যেগুলোর উপর হালকা দৃষ্টি বুলিয়ে নেওয়া উচিত।

১. সহীহ বুখারীর "কিতাবুত তাফসীর"-এ উল্লিখিত হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত একটি বর্ণনার বাহ্যিক আলোচনা দ্বারা বুঝা যায় যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি সর্বপ্রথম সূরায়ে মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই হাদীসের উপর ভিত্তি করেই কোনো কোনো আলেম বয়ান দিয়েছেন যে, অবতীর্ণ হওয়ার দিক থেকে সূরা মুদ্দাসসির সূরা আলাকের আগে। কিন্তু হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই ভুল বোঝাবুঝির প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করে বলেছেন, বস্তুত বুখারী শরীফের "কিতাবুত তাফসীর”-এ হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়েতটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং এতে দু'টি বাক্য বর্ণনা করা হয়নি। অথচ এই রেওয়ায়েতটিই ইমাম বুখারী (রহ.) ইমাম যুহরীর সনদ সূত্রে “ওহীর সূচনা” শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। ওই বর্ণনায় হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সূরা মুদ্দাসসির অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে সুস্পষ্টভাবে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই কথাগুলো উল্লেখ করেছেন- فإذا الملك الذي جاءني بحراء جالسا على كرسي 'হঠাৎ (আমি দেখতে পেলাম) যে ফেরেশতা হেরাগুহায় আমার নিকট এসেছিলেন, তিনি তখন কুরসিতে বসে ছিলেন।'

এ থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, হেরা গুহায় সর্বপ্রথম সূরা ইকরা বা আলাক্বের আয়াতগুলোই নাযিল হয়েছিল। সূরা মুদ্দাসসির তারপর নাযিল হয়। অবশ্য এ কথা বলা যেতে পারে যে, "ফাতরাতুল ওহী"-র পর সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সূরা হলো "সূরা মুদ্দাসসির।” অতএব, যেসব রেওয়ায়েত হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হওয়া ওহী হলো يَا أَيُّهَا المُدَّثِرُ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটাও হতে পারে যে, “ফাতরাতুল ওহী" ওহী বিরতি কালীন সময়ে সময় পার হওয়ার পর এটাই ছিল সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী। অথবা এটাও বলা যেতে পারে যে, সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গভাবে যে সূরা নাযিল হয়েছে তা ছিল সূরা মুদ্দাসসির। কেননা সূরা ইকরা (আলাক্ব) পূর্ণাঙ্গরূপে একবারে নাযিল হয়নি।

২. ইমাম বায়হাকী (রহ.) “دلائل النبوة” গ্রন্থে হযরত আমর ইবনে হুবাইল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে মুরসাল সূত্রে একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বে তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কে বলতেন, "আমি যখনই নির্জনে অবস্থান করি, তখন কে যেন আমাকে 'হে মুহাম্মদ! হে মুহাম্মাদ!' বলে ডাকে। এভাবে একদিন আমি যখন নির্জনে অবস্থান করছিলাম তখন সে বলে উঠল- بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (1) الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3) এভাবে সম্পূর্ণ সূরা ফাতেহা পাঠ করে ফেললেন। আর এই রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে আল্লামা যমখশরী (রহ.) লিখেছেন যে, সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত হচ্ছে "সূরায়ে ফাতেহা।” এমনকি তিনি এ মতকে অধিকাংশ মুফাসসিরীনের বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হাফেজ ইবনে হাযার (রহ.) তাঁর এই মতকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, যমখশরী (রহ.)-এর এই মত সঠিক নয়। কেননা সূরায়ে ফাতেহাকে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী বলার প্রবক্তা খুবই কম। বরং অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মত হচ্ছে সূরা ইকরা (আলাক্ব)-ই সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী। ইমাম বায়হাকী (রহ.) উল্লিখিত যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন সেটার ব্যাপারে তিনি নিজেই বলেন যে, যদি এই রেওয়ায়েত সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সম্ভবত তা সূরা ইকরা ও সূরা মুদ্দাসসির নাযিল হওয়ার পরের ঘটনা।

আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, হতে পারে অন্যান্য আয়াতের ন্যায় সূরা ফাতেহাও দু'বার অবতীর্ণ হয়েছে। সূরা ইকরা অবতীর্ণ হবার পূর্বে একবার এবং এরপরে আরেকবার। তখন এ কথা মেনে নিতে হবে যে, সূরা ফাতেহা প্রথম বার কুরআনের অংশ হিসেবে অবতীর্ণ হয়নি; বরং একজন ফেরেশতা রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তা (সুসংবাদ হিসেবে) শুনিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে উপযুক্ত সময়ে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশের মর্যাদা নিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। যাই হোক, উপরোক্ত এই তিনটি রেওয়ায়েত ব্যতীত বাকী অধিকাংশ রেওয়ায়েত এ ব্যাপারে একমত যে, সূরা ইকরা [আলাক]-এর প্রাথমিক আয়াতগুলোই সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছিল। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) এ মতের সমর্থনে বহু রেওয়ায়েত উপস্থাপন করেছেন।

টিকাঃ
৬৩. সূরা আলাক: ১-৩
৬৪. "সহীহ বুখারী": হাদীস নং ৩, 'ওহীর সূচনা' অধ্যায়।
৬৫. "আল-ইতকান": ১/১৫
৬৬. আয-যমখশরী: "আল-কাশশাফ আন হাকায়িকী গাওয়ামিযিত তানযীল" ৪/৭৭৫, কায়রো-১৩৬৫ হিজরী।
৬৭. "ফাতহুল বারী": ৮/৫৮০, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ইকরা।
৬৮. "ফাতহুল বারী": ৮/৫৮০, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ইকরা।
৬৯. "ফয়যুল বারী": ১/২৫
৭০. "আল-ইতকান": ১/২৪
৮৫. সূরা ফুরকান: ৩২-৩৩

📘 উলুমুল কুরআন 📄 মাক্কী ও মাদানী আয়াতসমূহ

📄 মাক্কী ও মাদানী আয়াতসমূহ


আপনারা পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরাসমূহের শিরোনামে হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, কোনো সূরার সাথে 'মাক্কী' এবং কোনো সূরার সাথে 'মাদানী' লিখা রয়েছে। এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা থাকা আবশ্যক।

অধিকাংশ তাফসীর বিশারদদের পরিভাষা অনুযায়ী 'মাক্কী' আয়াত বলতে সেসব আয়াতকে বুঝায়, যা রাসূলে আকরাম (সা.)-এর হিজরতের উদ্দেশ্যে মদীনায় যাওয়ার পূর্বে নাযিল হয়েছে। কারো কারো মতে যেসব আয়াত মক্কা নগরীতে নাযিল হয়েছে সেগুলো 'মাক্কী।' আর যেগুলো মদীনা নগরীতে নাযিল হয়েছে সেগুলো 'মাদানী।' কিন্তু অধিকাংশ তাফসীর বিশারদদের পরিভাষা অনুযায়ী এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ এমন অনেক আয়াত রয়েছে যা মক্কা নগরীতে নাযিল হয়নি; কিন্তু হিজরতের পূর্বে নাযিল হবার কারণে মাক্কী আয়াতসমূহ এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি হিজরতের পথে মদীনা নগরীতে পৌঁছার পূর্বে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে সেগুলোকেও 'মাক্কী' বলা হয়।

অনুরূপভাবে বহু আয়াত এমনও রয়েছে যা মদীনা নগরীতে নাযিল হয়নি; অথচ সেগুলোকে 'মাদানী' বলা হয়। যেমন, হিজরতের পর নবী কারীম (সা.) বহু সফরে বের হয়েছেন, যেগুলো মদীনা থেকে শত শত মাইল দূরত্বের ছিল। সেসকল স্থানে অবতীর্ণ আয়াতসমূহকে 'মাদানী'ই বলা হয়। এমনকি যেসব আয়াত মক্কা বিজয়, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় স্বয়ং মক্কা নগরী বা তার আশপাশের এলাকায় অবর্তীর্ণ হয়েছে সেগুলোকেও 'মাদানী' বলা হয়। যেমন- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا এই আয়াতটিকে মাদানী বলা হয়; অথচ এটি মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ হয়েছে।

সারকথা, মাক্কী ও মাদানী'র বিভক্তিকরণ যদিও স্থানভিত্তিক বলে মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেগুলো কালভেদে বিভক্ত হয়েছে। হিজরত সম্পূর্ণ হবার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলো 'মাক্কী।' আর যা পরে অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলো 'মাদানী।'

যদিও নবী কারীম (সা.) থেকে সরাসরি এমন কোনো রেওয়ায়েত বর্ণিত নেই যার মধ্যে কোনো আয়াত বা সূরাকে তিনি মাক্কী বা মাদানী বলে চিহ্নিত করেছেন। তবে যেসব সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈন (রহ.) কুরআনুল কারীমের শব্দ ও অর্থ সংরক্ষণে নিজেদের জীবন ব্যয় করেছেন, তাঁরাই সূরা ও আয়াতের ব্যাপারে এ কথাটিও বলে দিয়েছেন যে, কোনটি মাক্কী ও কোনটি মাদানী? যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শপথ করে বলেন, 'সেই মহান সত্ত্বার শপথ! যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি আয়াতের ব্যাপারে আমার এই জ্ঞান আছে যে, সেটি কোন্ প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে এবং কোথায় নাযিল হয়েছে?’ হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আল্লাহর কসম! আমি প্রতিটি আয়াতের ব্যাপারে জানি যে, সেটি রাতে অবতীর্ণ হয়েছে নাকি দিনে? উন্মুক্ত স্থানে অবতীর্ণ হয়েছে নাকি পাহাড়-পর্বতে?

পবিত্র কুরআনুল কারীমের অধিকাংশ সূরা ও আয়াতের ব্যাপারে সাধারণত সাহাবায়ে কেরামই বলে দিয়েছেন যে, তা মাক্কী না কি মাদানী? এতদ্ব্যতীত কোনো কোনো আয়াত বা সূরার ব্যাপারে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারাও মাক্কী বা মাদানী হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। যেমন, যেসব আয়াতে বদর যুদ্ধের আলোচনা করা হয়েছে, স্পষ্ট তো এটাই যে তা মাদানীই হবে। আর যেসব আয়াতে বিশেষভাবে মক্কার মুশরিকদের সম্বোধন করে কিছু বলা হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ মাক্কীই হবে। অতএব, কোনো কোনো সময় এ ধরনের কেয়াস ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেও কোনো আয়াতকে মাক্কী বা মাদানী বলে সাব্যস্ত করা যায়। আর কেয়াস যেহেতু অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে তাই কোনো কোনো আয়াতের ক্ষেত্রে মুফাসসিরগণের মাঝে মতপার্থক্যও পরিলক্ষিত হয়েছে। কারো নিকট মাক্কী আর কারো নিকট মাদানী।

আবার কোনো কোনো সূরার পুরোটাই মাক্কী অথবা পুরোটাই মাদানী। যেমন, সূরা মুদাস্সিরের পুরোটাই মাক্কী। আর সূরা আলে-ইমরানের পুরোটাই মাদানী। আবার কোনো কোনো সূরার তথাপিও মাক্কী বলা হয়, কিন্তু তার কয়েকটি আয়াত মাদানী। যেমন, সূরা আ'রাফ মাক্কী। وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ - وَاسْأَلْهُمْ عَنِ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ -এর শেষ পর্যন্ত কয়েকটি আয়াত মাদানী। আবার কখনো এর বিপরীত হয়ে থাকে অর্থাৎ পুরো সূরা মাদানী। কিন্তু তার কয়েকটি আয়াত মাক্কী। যেমন, সূরা হজ মাদানী। وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ وَلَا نَبِي إِلَّا إِذَا تَمَنَّى পর্যন্ত মাক্কী।

এ আলোচনা থেকে এটাও সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, কোনো সূরার মাক্কী বা মাদানী হওয়াটা সাধারণত তার আয়াতের আধিক্যের বিচারে হয়ে থাকে। আবার কখনো এমনও হয় যে, যে সূরার প্রাথমিক আয়াতসমূহ হিজরতের পূর্বে নাযিল হয়েছে সেটাকে মাক্কী বলে অভিহিত করা হয়েছে। যদিও তার পরবর্তী আয়াতসমূহ হিজরতের পরে নাযিল হয়েছে।

টিকাঃ
৭১. "আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন"; ১/১৮৮
৭২. "মানাহিলুল ইরফান": ১/১৮৮
৭৩. "আল-ইতকান": ১/৯
৭৪. প্রাগুক্ত: ২/১৮৭
৭৫. "মানাহিলুল ইরফান": ১/১৯২

ফন্ট সাইজ
15px
17px