📘 উলুমুল কুরআন 📄 এ পরিচ্ছেদের সারাংশ

📄 এ পরিচ্ছেদের সারাংশ


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
কুরআন নাযিলের ইতিহাস এ পরিচ্ছেদের সারাংশ :

এ পরিচ্ছেদে এতে আলোচনা করা হয়েছে কোরআন “লওহে মাহফুজ” থেকে দুনিয়ায় অবতরণের পদ্ধতিগত বর্ণনা। এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে আল-কোরআনে অতিমাত্রায় ব্যবহৃত শব্দদয় “ইনযাল” এবং “তানযীল”-এর মধ্যে কী পার্থক্য! অতঃপর ওহীকে নাযিলের অবস্থানগত দিক দিয়ে দু'টি পর্যায়ে বিভক্তকরণ, যথাঃ একঃ কোরআন কারীম "লওহে মাহফুজ” থেকে দুনিয়ার আসমান "বাইতুল ইজ্জত” নামক স্থানে অবতীর্ণ হওয়া, পাশাপাশি বর্ণনা করা হয়েছে তার হিকমত। দুইঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর অবতীর্ণ হওয়ার ধারাবাহিকতা। অতঃপর সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত ও তৎসংশ্লিষ্ট ঘটনা উল্লেখ, মাক্কী ও মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ, যেমনঃ "কাল্লা (কক্ষনো নয়!)" শব্দ ও সিজদার আয়াত থাকা, আদম (আলাইহিস সালাম) ও ইবলিসের ঘটনা বর্ণিত হওয়া ইত্যাদি মাক্কী সূরার বৈশিষ্ট্য, অন্যদিকে জিহাদ সংক্রান্ত আয়াত, মুনাফিকদের ব্যাপারে বর্ণনা ইত্যাদি মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্য, এছাড়াও আরও কতক উসূলী বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে, যদ্বারা মাক্কী-মাদানী সূরার পৃথকীকরণ সহজ হয়, পাশাপাশি সূরাসমূহের মধ্যে ভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্য থাকায় কতকের এই মতও খণ্ডন করা হয়েছে যে, "যেমন পরিবেশের মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়া কোরআন মানব রচিত হওয়ার দিকে ইঙ্গিত প্রদান করে" এধরণের বক্তব্য নিয়ে (নাউজুবিল্লাহ)।

এছাড়াও এতে আলোচনায় এসেছে কুরআন নাযিলের কাল ও স্থানগত বর্ণনা, যথাঃ “নাহারী, লাইলী (রাত্রিকালীন), সয়ফী, শীতায়ী, ফেরাশী, নাওমী, সামাভী, ফেযায়ী আয়াত, কোরআন অবতরণকালীন ও বর্তমানের বিন্যাস এবং এতে প্রাচ্যবিদদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও তার ফলাফল, আসবাবে (শানে) নুযুলের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করে, কোরআনের আয়াতের প্রকারভেদ, তার প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা, যেমনঃ আহকামের নিগূঢ় রহস্য সম্বন্ধে অবগতিলাভ, মর্ম উপলব্ধির জন্য আবশ্যকতা, কোরআনের উপর অসঙ্গত ধারণার অপনোদন ইত্যাদি, পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে একই আয়াতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন "শানে নুযুল” বর্ণিত হওয়ার প্রকৃত কারণ।

পাশাপাশি শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাপারে কতকের মনের ভ্রান্তি-অপনোদন করা হয়েছে। এবং যে তার কথার অর্থ শানে নুযূলের অবহেলা নয়, বরং বিভিন্নতার হাকীকত বর্ণনা করা।

পরবর্তীতে "শানে নুযূল ও বর্ণনার বিভিন্নতা" নামক শিরোনামে সাহাবায়ে কেরাম থেকে একই আয়াতের বিভিন্ন "শানে নুযূল" বর্ণিত হওয়ার কিছু উদাহরণ ও কারণ বর্ণনার পাশাপাশি "তারজীহ” দেয়ার মূলনীতি-বিবরণ প্রদান করা হয়েছে। বিষয়টি তাফসীর শাস্ত্রে আগ্রহী তালেবে ইলম ভাইদের জন্য বেশ উপকারী। যেমন:
১. সাহাবা এবং তাবিয়ীনে কেরাম কোনো মাসআলার অন্তর্ভুক্তি বুঝাতে আয়াত উল্লেখ করার পর বলতেন, “নাযালাতিল আয়াতু ফি কাযা” আয়াতটি এই বিষয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ এর মাধ্যমে ধোকায় পড়ে যেতে হয় যে, আয়াতটির "শানে নুযূল” এই ঘটনা/বিষয়। এর জটিলতা নিরসনকল্পে উদাহরণসহ উসূলীমূলক আলোচনা করা হয়েছে।
২. "শানে নুযুল” নির্ধারণের ক্ষেত্রে হাদীসের দুর্বলতা ও সবলতার প্রতি খেয়াল রাখা হবে।
৩. হাদীস সমমানের হলে অন্যান্য "করীনাহ"র দিকে নজর দিতে হবে।
৪. আবার কখনো একই আয়াতের একাধিক "শানে নুযূল”ও হতে পারে। যেমন "লিআন” সংক্রান্ত আয়াত।
৫. কখনো একই ঘটনার প্রেক্ষিতে একাধিক আয়াতও নাযিল হয়ে থাকে। কিন্তু বিভিন্নজন অংশবিশেষ করে বর্ণনা করায় তাতে দোদুল্যমানতা জাগে।
৬. আবার কখনো একাধিক ঘটনার জন্যে একই আয়াতও কয়েকবার নাযিল হয়ে থাকে।

আরও আলোচিত হয়েছে "শানে নুযূল” বিশিষ্ট আয়াতসমূহের প্রকারভেদ, যথাঃ
১. নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেন্দ্রিক নাযিলকৃত আয়াতের "মিসদাক” কেবল সেই হবে। যেমন আবু লাহাব।
২. অনির্দিষ্টভাবে গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে, তবে অন্য দলীলের মাধ্যমে তার পরিচয় পাওয়া গেছে, সেক্ষেত্রেও "ইত্তিফাক” যে, তার হুকুম কেবল উক্ত ব্যক্তির উপরই প্রযোজ্য হবে।
৩. বিশেষ কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে, তবে তার শব্দগুলো ব্যাপক, পাশাপাশি কোনো দলীলের মাধ্যমে জানা যায় যে, আয়াতটি উক্ত ঘটনার সাথে নির্দিষ্ট নয়। এক্ষেত্রে সমস্ত উম্মতই এর আওতাভুক্ত হবে। উদাহরণস্বরূপ আনা হয়েছে "যিহার” এর আয়াত।
৪. বিশেষ কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে, তার শব্দগুলোও ব্যাপক, এবং কোনো দলীলের মাধ্যমে জানা যায় না যে, আয়াতটি উক্ত ঘটনার সাথে নির্দিষ্ট কি-না। এক্ষেত্রে উলামায়ে উম্মতের ইখতিলাফ, পাশাপাশি ফলপ্রসু সমাধানও নিয়ে আসা হয়েছে।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 প্রথম ধাপে অবতীর্ণ

📄 প্রথম ধাপে অবতীর্ণ


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা থেকে এত টুকু জানা যায় যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের প্রথম পর্যায়ের নাযিল লাওহে মাহফুয থেকে দুনিয়ার আসমানে “বাইতুল ইজ্জত” নামক স্থানে হয়েছে। তবে এই বাইতুল ইজ্জতে কুরআন কিভাবে নাযিল হয়েছে? আর সেখানে নাযিলের তাৎপর্য ছিল কি? এ ব্যাপারে সুনিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। অবশ্য কোনো কোনো আলেম এর বিভিন্ন হেকমত বা তাৎপর্য বর্ণনা করেছেন।

যেমন আল্লামা আবু শামাহ (রহ.) এর তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “এর দ্বারা কুরআনুল কারীমের উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করাই ছিল উদ্দেশ্য। আর ফেরেশতাগণকেও এ কথা জানিয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল যে, এটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সর্বশেষ কিতাব। যা জগৎবাসীর হেদায়াতের জন্য নাযিল করা হচ্ছে।”

আল্লামা যুরকানী (রহ.) এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, এভাবে দু'পর্যায়ে পবিত্র কুরআনুল কারীম নাযিল করে এ কথা বুঝানো হয়েছে যে, এ কিতাব সর্বপ্রকার সংশয় ও সন্দেহের ঊর্ধ্বে। উপরন্তু নবী কারীম (সা.)-এর পবিত্র বক্ষদেশ ছাড়াও আরো দুই স্থানে তা সুরক্ষিত রয়েছে। একটি হলো, লাওহে মাহফুয ও আরেকটি হলো, "বাইতুল ইজ্জত।”

প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হেকমত ও নিগূঢ় রহস্যাবলী জানার সাধ্য কার? এর মাঝে আরো কি কি রহস্য লুকায়িত আছে তা একমাত্র তিনিই জানেন। আর আমাদেরকে সেগুলোর পেছনে পড়ার কোনো প্রয়োজনও নেই। তবে আমাদেরকে এ টুকু সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পবিত্র লাইলাতুল কদরের রজনীতে প্রথম “ধাপে নাযিল” হয়েছিল।

টিকাঃ
৫৯. মানাহিলুল ইরফান: ১/৩৯

📘 উলুমুল কুরআন 📄 দ্বিতীয় ধাপে অবতীর্ণ

📄 দ্বিতীয় ধাপে অবতীর্ণ


এ ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত যে, প্রিয় নবী কারীম (সা.)-এর প্রতি দ্বিতীয় পর্যায়ের অল্প অল্প করে পর্যায়ক্রমিক অবতরণ তখন থেকে আরম্ভ হয়েছিল, যখন নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বয়স চল্লিশ বছর ছিল। বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে এই অবতরণও শুরু হয়েছিল লাইলাতুল কদর থেকেই। আর এটা ছিল সেই ঐতিহাসিক দিন, যে দিনের (এগারো বছর পর) বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে- وَمَا أَنزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ 'আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি তার প্রতি, যেদিন দু'টি দল মুখোমুখি হয়েছে।'

এভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অবতরণের সূচনালগ্নের ব্যাপারে স্বয়ং আল-কুরআন থেকেই নিম্নোক্ত তথ্যগুলো পাওয়া যায়।
১. অবতরণের সূচনা রমযান মাস থেকে হয়েছে।
২. শবে কদরে অবতরণের প্রথম সূচনা হয়েছিল।
৩. ওই তারিখে প্রথম নাযিল হয়েছিল, যে তারিখে পরবর্তীতে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

তবে সেই রাতটি রমযানের কোন তারিখ ছিল? এ ব্যাপারে সুনিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। কোনো কোনো বর্ণনা থেকে জানা যায়, তা ছিল রমযানের সতের তারিখ। কোনো বর্ণনায় উনিশতম তারিখ। আবার কোনো কোনো বর্ণনা মতে সাতাশতম তারিখ।

টিকাঃ
৬০. প্রসিদ্ধ আছে যে, রাসূল (সা.) রবিউল আউয়াল মাসে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন। আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) এর যথাযথ ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, রবিউল আউয়াল মাসে রাসূল (সা.)-এর প্রতি সত্য স্বপ্নের আগমন শুরু হয়েছিল। ছয় মাস পর্যন্ত লাগাতার এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। অতঃপর রমযান মাসে কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ হতে শুরু করে। "আল ইতকান": ১/৪২
৬১. সূরা আনফাল: ৪১
৬২. দেখুন, "তাফসীরে জামেউল বয়ান": ১০/৭ মিসর। ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) রচিত

📘 উলুমুল কুরআন 📄 সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াত

📄 সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াত


নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী প্রিয় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি সর্বপ্রথম কুরআনের যে আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়, তা ছিল "সূরা আলাক'-এর প্রথম পাঁচ আয়াত। সহীহ বুখারীতে উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘটনা বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি 'ভারী স্বপ্নের' মাধ্যমে ওহীর সূচনা হয়। এরপর থেকেই তাঁর ভেতর নির্জনে ইবাদত করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

ওই সময়ে নবী কারীম হেরা গুহায় কয়েকটি রাত কাটিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে মাশগুল থাকতেন। এ অবস্থাতেই একদিন হেরা গুহায় নবী কারীম (সা.) নিকট আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ হতে ফেরেশতা আগমন করলেন এবং সর্বপ্রথম বললেন, ইকরা (অর্থাৎ আপনি পড়ুন)। নবী কারীম (সা.) জবাবে বললেন, 'আমি পড়তে জানি না।'

এর পরের ঘটনা রাসূলে খোদা (সা.) নিজেই বর্ণনা করেন যে, আমার জবাব শুনে ফেরেশতা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং এমনভাবে চাপ দিলেন যে, আমি চরম ক্লান্তি অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, ইকরা (আপনি পড়ুন।) আমি জবাবে আগের কথাই বললাম, 'আমি পড়তে জানি না।' ফেরেশতা আমাকে আবারও জড়িয়ে ধরলেন এবং পূর্বের ন্যায় এমন জোরে চাপ দিলেন যে, আমি চরম ক্লান্তি অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ইকরা (আপনি পড়ুন।) আমি জবাবে বললাম, আমি পড়তে জানি না। তিনি তৃতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং ভীষণ চাপ দিয়ে ছেড়ে দিলেন। তারপর বলতে লাগলেন--
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ {1} خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ {2} اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ {3}
'তুমি পাঠ কর তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট বাঁধা রক্ত থেকে। পড়ুন, আর আপনার পালনকর্তা অত্যন্ত অনুগ্রহশীল।'

নবী কারীম (সা.) এই আয়াতগুলো নিয়ে যখন ঘরে ফিরলেন তখন তাঁর পবিত্র অন্তর ভয়ে ধড়ফড় করছিল। তিনি হযরত খাদিজা (রা.)-এর নিকট গেলেন এবং বললেন- যাম্মেলুনী যাম্মেলুনী (আমাকে চাদরে আবৃত কর। আমাকে চাদরে আবৃত কর।) ঘরের লোকেরা তাঁকে চাদরাবৃত করে দিলেন। এভাবে তাঁর ভয় কেটে গেল। এই আয়াতগুলো ছিল তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হওয়া সর্বপ্রথম আয়াত। এরপর তিন বছর যাবৎকাল ওহী অবতরণ বন্ধ থাকে। এই সময়টাকে "ফাতরাতুল ওহী" বিরতিকাল বলা হয়। তারপর ওই ফেরেশতা যিনি হেরা গুহায় এসেছিলেন নবীজি তাঁকে আসমান ও জমিনের মাঝে পুনরায় দেখতে পেলেন। তিনি নবীজিকে "সূরা মুদ্দাসসির"-এর আয়াতসমূহ শুনিয়ে দিলেন। এই ঘটনাটি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ছাড়াও হাদীসের প্রায় সবগুলো কিতাবেই বিশুদ্ধ সনদসূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এ জন্য সমস্ত উলামায়ে কেরামের নিকট বিশুদ্ধ মত হচ্ছে এটিই যে, প্রিয় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি কুরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম যে আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল তা ছিল 'সূরা আলাকে'র প্রথম দিকের আয়াতগুলো। এরপর সূরা মুদ্দাসসিরের আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে। অবশ্য এ ব্যাপারে আরো তিনটি মতামতও পরিলক্ষিত হয়। যেগুলোর উপর হালকা দৃষ্টি বুলিয়ে নেওয়া উচিত।

১. সহীহ বুখারীর "কিতাবুত তাফসীর"-এ উল্লিখিত হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত একটি বর্ণনার বাহ্যিক আলোচনা দ্বারা বুঝা যায় যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি সর্বপ্রথম সূরায়ে মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এই হাদীসের উপর ভিত্তি করেই কোনো কোনো আলেম বয়ান দিয়েছেন যে, অবতীর্ণ হওয়ার দিক থেকে সূরা মুদ্দাসসির সূরা আলাকের আগে। কিন্তু হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই ভুল বোঝাবুঝির প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করে বলেছেন, বস্তুত বুখারী শরীফের "কিতাবুত তাফসীর”-এ হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়েতটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং এতে দু'টি বাক্য বর্ণনা করা হয়নি। অথচ এই রেওয়ায়েতটিই ইমাম বুখারী (রহ.) ইমাম যুহরীর সনদ সূত্রে “ওহীর সূচনা” শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। ওই বর্ণনায় হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সূরা মুদ্দাসসির অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে সুস্পষ্টভাবে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই কথাগুলো উল্লেখ করেছেন- فإذا الملك الذي جاءني بحراء جالسا على كرسي 'হঠাৎ (আমি দেখতে পেলাম) যে ফেরেশতা হেরাগুহায় আমার নিকট এসেছিলেন, তিনি তখন কুরসিতে বসে ছিলেন।'

এ থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, হেরা গুহায় সর্বপ্রথম সূরা ইকরা বা আলাক্বের আয়াতগুলোই নাযিল হয়েছিল। সূরা মুদ্দাসসির তারপর নাযিল হয়। অবশ্য এ কথা বলা যেতে পারে যে, "ফাতরাতুল ওহী"-র পর সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সূরা হলো "সূরা মুদ্দাসসির।” অতএব, যেসব রেওয়ায়েত হযরত জাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হওয়া ওহী হলো يَا أَيُّهَا المُدَّثِرُ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটাও হতে পারে যে, “ফাতরাতুল ওহী" ওহী বিরতি কালীন সময়ে সময় পার হওয়ার পর এটাই ছিল সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী। অথবা এটাও বলা যেতে পারে যে, সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গভাবে যে সূরা নাযিল হয়েছে তা ছিল সূরা মুদ্দাসসির। কেননা সূরা ইকরা (আলাক্ব) পূর্ণাঙ্গরূপে একবারে নাযিল হয়নি।

২. ইমাম বায়হাকী (রহ.) “دلائل النبوة” গ্রন্থে হযরত আমর ইবনে হুবাইল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে মুরসাল সূত্রে একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বে তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কে বলতেন, "আমি যখনই নির্জনে অবস্থান করি, তখন কে যেন আমাকে 'হে মুহাম্মদ! হে মুহাম্মাদ!' বলে ডাকে। এভাবে একদিন আমি যখন নির্জনে অবস্থান করছিলাম তখন সে বলে উঠল- بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (1) الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3) এভাবে সম্পূর্ণ সূরা ফাতেহা পাঠ করে ফেললেন। আর এই রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে আল্লামা যমখশরী (রহ.) লিখেছেন যে, সর্বপ্রথম অবতীর্ণ আয়াত হচ্ছে "সূরায়ে ফাতেহা।” এমনকি তিনি এ মতকে অধিকাংশ মুফাসসিরীনের বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হাফেজ ইবনে হাযার (রহ.) তাঁর এই মতকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, যমখশরী (রহ.)-এর এই মত সঠিক নয়। কেননা সূরায়ে ফাতেহাকে সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী বলার প্রবক্তা খুবই কম। বরং অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মত হচ্ছে সূরা ইকরা (আলাক্ব)-ই সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহী। ইমাম বায়হাকী (রহ.) উল্লিখিত যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন সেটার ব্যাপারে তিনি নিজেই বলেন যে, যদি এই রেওয়ায়েত সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সম্ভবত তা সূরা ইকরা ও সূরা মুদ্দাসসির নাযিল হওয়ার পরের ঘটনা।

আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, হতে পারে অন্যান্য আয়াতের ন্যায় সূরা ফাতেহাও দু'বার অবতীর্ণ হয়েছে। সূরা ইকরা অবতীর্ণ হবার পূর্বে একবার এবং এরপরে আরেকবার। তখন এ কথা মেনে নিতে হবে যে, সূরা ফাতেহা প্রথম বার কুরআনের অংশ হিসেবে অবতীর্ণ হয়নি; বরং একজন ফেরেশতা রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তা (সুসংবাদ হিসেবে) শুনিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে উপযুক্ত সময়ে পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশের মর্যাদা নিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। যাই হোক, উপরোক্ত এই তিনটি রেওয়ায়েত ব্যতীত বাকী অধিকাংশ রেওয়ায়েত এ ব্যাপারে একমত যে, সূরা ইকরা [আলাক]-এর প্রাথমিক আয়াতগুলোই সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছিল। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) এ মতের সমর্থনে বহু রেওয়ায়েত উপস্থাপন করেছেন।

টিকাঃ
৬৩. সূরা আলাক: ১-৩
৬৪. "সহীহ বুখারী": হাদীস নং ৩, 'ওহীর সূচনা' অধ্যায়।
৬৫. "আল-ইতকান": ১/১৫
৬৬. আয-যমখশরী: "আল-কাশশাফ আন হাকায়িকী গাওয়ামিযিত তানযীল" ৪/৭৭৫, কায়রো-১৩৬৫ হিজরী।
৬৭. "ফাতহুল বারী": ৮/৫৮০, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ইকরা।
৬৮. "ফাতহুল বারী": ৮/৫৮০, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ইকরা।
৬৯. "ফয়যুল বারী": ১/২৫
৭০. "আল-ইতকান": ১/২৪
৮৫. সূরা ফুরকান: ৩২-৩৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px