📄 কুরআনের শুধু অর্থই কি ওহী?
উপরে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ওহী দুই প্রকার। প্রথমতঃ “ওহীয়ে মাতলু।" (পঠিত ওহী) অর্থাৎ কুরআনুল কারীম। দ্বিতীয়তঃ "ওহীয়ে গাইরে মাতলু।” (অপঠিত ওহী) এই দ্বিতীয় প্রকার ওহী সাধারণত এমন হয়েছে যে, এর বিষয়বস্তু মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে হতো আর তা ব্যক্ত করার জন্য শব্দ নির্বাচন করতেন হযরত জিবরাঈল (আ.) কিংবা নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমের ব্যাপারটা এমন নয়। শব্দগত ও অর্থগত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে তা পুরোপুরি মহান আল্লাহ জাল্লা শানুর কালাম বা বাণী। এর বিষয়বস্তু যেমনিভাবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অবতীর্ণ, তেমনি এর শব্দও মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে নাযিলকৃত। কুরআনুল কারীমের শব্দ নির্বাচন, রচনাশৈলী ও স্তর বিন্যাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে না আছে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর কোনো দখল আর না আছে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কোনো দখল।
যারা ওহীর ব্যাপারে বস্তুবাদী লোকদের আপত্তি ও প্রশ্নবাণে প্রভাবিত হয়ে পড়েছে, আমাদের যুগে তাদের কেউ কেউ এ দাবী করেছে যে, 'কুরআনুল কারীমের শুধু মাফহুম (তথা মর্ম ও মূলকথা) ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। আর এর শব্দ নির্বাচন, রচনাশৈলী ও স্তর বিন্যাস ইত্যাদি সবকিছু হযরত জিবরাঈল (আ.) কিংবা নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ হতে হয়েছে।' তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, বাতিল এবং কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণের সম্পূর্ণ বিরোধী। পবিত্র কুরআনুল কারীমের বহু আয়াত এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দ ও অর্থ উভয় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। নিম্নে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হলো।
১. পবিত্র কুরআনুল কারীম বহু স্থানে নিজের একটি গুণ "আরবী" হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ এটাকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে। এখন এটা তো একেবারেই সুস্পষ্ট যে, যদি কুরআনের শুধু মাফহুম বা মর্ম ও অর্থই ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়ে থাকে তাহলে (আমি এটাকে আরবী কুরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি।)-এর কোনো অর্থই থাকে না। কারণ "আরবী" হওয়াটা শব্দের সিফাত বা গুণ, অর্থের নয়।
২. পবিত্র কুরআনুল কারীমের একাধিক জায়গায় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিশেষ তিনটি দায়িত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে- رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ 'হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তাদের থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে আর তাদেরকে পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।'
এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর পৃথক পৃথক দু'টি দায়িত্ব ছিল। একটি হলো, তাদেরকে শুধু মহান আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত বা পাঠ করে শোনানো। অপরটি হলো, তাদেরকে সেগুলোর শিক্ষা দেওয়া। আর এটা তো পরিষ্কার কথা যে, তেলাওয়াত বা পাঠ করা শুধু শব্দেরই হয়ে থাকে; অর্থের নয়। কাজেই রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর অর্পিত সর্বপ্রথম দায়িত্ব পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দের সাথে, অর্থের সাথে নয়।
৩. পবিত্র কুরআনুল কারীম বিভিন্ন স্থানে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে "আল-কিতাব” শব্দটি ব্যবহার করেছে। আর বস্তুত, আত্মিক বিষয়াবলীর জন্য "কিতাব” শব্দের প্রয়োগ হয় না; বরং যখন সে বিষয়াবলীকে শব্দের ছাঁচে সাজানো হয় তখনই সেটাকে কিতাব বলা হয়। এর দ্বারাও সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়টি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অবতীর্ণ।
৪. সূরায়ে "কেয়ামাহ” থেকে বুঝা যায় যে, যখন হযরত জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আগমন করতেন, তখন রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটাকে আত্মস্থ করার জন্য তাড়াহুড়া করে একই শব্দ পুনঃপুনঃ উচ্চারণ করতেন। তখন মহান আল্লাহ তা'আলা এ ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন- لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ 'কুরআন তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে তুমি তোমার জিহবাকে দ্রুত সন্দোলিত করো না। ইহা সংরক্ষণ ও পাঠ করাইবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি উহা পাঠ করি তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর, অতঃপর ইহার বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমারই।'
এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) যে সমস্ত শব্দাবলী নিয়ে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করতেন, তা আল্লাহ তা'আলার কালাম (বাণী) ছিল। এ জন্যই রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এর শব্দাবলী আত্মস্থ করানো, এর তেলাওয়াত বা পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া এবং এর ব্যাখ্যা করা- এই তিনটি দায়িত্বই স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন স্বীয় জিম্মায় নিয়েছেন।
এই সুস্পষ্ট দলীলগুলোর আলোকে এ ধারণা একেবারেই বাতিল হয়ে যায় যে, 'পবিত্র কুরআন ওহীর মাধ্যমে নাযিল করা হয়নি।' এই বিষয়ের উপর আলোচনা করতে গিয়ে শায়েখ মুহাম্মদ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.) এক চমৎকার বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি লিখেন- "এই আলোচনার সারকথা হলো, পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দ ও অর্থ উভয়ই সর্বসম্মতিক্রমে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। "হাদীসে কুদসী"-এর ব্যাপারেও প্রসিদ্ধ মত এটাই যে, এর শব্দাবলীও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে। অবশ্য নবী কারীম (সা.)-এর হাদীসগুলোর শুধু অর্থটাই ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। আর শব্দগুলো নবী কারীম (সা.)-এর নিজের। আর যে সকল হাদীস রাসূলে আকরাম (সা.) নিজে ইজতেহাদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন সেগুলোর শব্দ ও অর্থ উভয়ই তাঁর নিজস্ব।”
প্রকৃতপক্ষে যেসব লোক পবিত্র কুরআনের শব্দাবলী ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হওয়াকে অস্বীকার করেছে, তাদের এই ভুলের মূল উৎস হচ্ছে, ওহীর মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের শব্দাবলীর অবতরণ তাদের বোধগম্য নয়। কিন্তু ওহীর হাকীকত, যুক্তির আলোকে এর প্রয়োজনীতা এবং ওহীর ব্যাপারে সংশয়-সন্দেহের জবাবে উপরে যেসব কথা লিখা হয়েছে, সেগুলোকে সামনে রাখলে এই সন্দেহ স্বয়ংক্রীয়ভাবে দূরীভূত হয়ে যায়। ওহী যদি বাস্তবেই এক প্রয়োজনীয় বিষয় হয় এবং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর উপর সক্ষম হন, তাহলে এমন কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আছে যে, তিনি পবিত্র কুরআনের অর্থটা নবীর অন্তরে ঢেলে দিতে সক্ষম, আর ওহীর মূল বক্তব্য নবীজী আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিজস্ব (নাঊযুবিল্লাহ)।
কিন্তু আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, কুরআন, হাদীস এবং ইজমায়ে উম্মতের সুদৃঢ় দলীলের আলোকে তাদের এ বক্তব্যগুলো সম্পূর্ণ বাতিল। উল্লিখিত বুযুর্গদ্বয়ও এ বক্তব্যের প্রবক্তাদের কোনো উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেননি। বরং (তাদের কেউ কেউ বলেছেন) বলে তাদের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। আর আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তো সরাসরি এই বক্তব্যগুলো খণ্ডন করেছেন। একারণে এ সকল অভিমত বাতিল পন্থিদের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা যাবে না。
টিকাঃ
৫০. দেখুনঃ সূরা নাহল: ১০৩, সূরা শুআরা: ১৯৫, সূরা ইউসুফ: ২, সূরা ত্বহা: ১১৩, সূরা রাদ: ৩৯, সূরা যুমার: ২৮, সূরা হা-মীম সাজদা: ৩, সূরা শুরা: ৭, সূরা যুখরুফ: ৩ ইত্যাদি।
৫১. সূরা বাকারা: ১২৯
৫২. সূরা কেয়ামাহ: ১৬-১৯
"মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন": ১/৪৪, ঈসা আল-বাবী, মিসর ১৩৭২ হিজরী।
"আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন": ১/২২৯, "আল ইতকান": ১/৪৫।