📄 মাতলূ ও গাইরে মাতলূ ওহী
নবী কারীম (সা.)-এর উপর যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছে তা দুই প্রকারের ছিল। প্রথমতঃ পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াত। যার শব্দ ও অর্থ উভয়ই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। যা সর্বকালের জন্য কুরআনুল কারীমে এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে এর একটি নোক্তা বা বিন্দু-বিসর্গও পরিবর্তন করা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং হবেও না। এই ওহীকে উলামায়ে কেরামের পরিভাষায় (وحی متلو) “ওহীয়ে মাতলু” বলা হয়। অর্থাৎ ওই ওহী, যা তেলাওয়াত বা পাঠ করা হয়। দ্বিতীয়তঃ ওই ওহী যা পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশ হয়নি; তবে এর মাধ্যমে রাসূলে আকরাম (আলাইহিস সালাম)-কে বহু হুকুম-আহকাম দেওয়া হয়েছে।
এই ওহীকে (وحی غیر متلو) "ওহীয়ে গাইরে মাতলু” বলা হয়। অর্থাৎ এমন ওহী যা কুরআনের ন্যায় পাঠ করা হয় না। সাধারণত ওহীয়ে মাতলুকে কুরআনুল কারীমে ইসলামী আকীদা বিষয়ক মূলনীতি ও বুনিয়াদী শিক্ষার ব্যাখ্যা প্রদানের উপর ক্ষান্ত করা হয়েছে। আর সেসব শিক্ষার বিস্তারিত বর্ণনা ও শাখাগত মাসআলা-মাসায়িল অধিকহারে ওহীয়ে গাইরে মাতলু দ্বারা প্রদান করা হয়েছে। তো এই ওহী অর্থাৎ “ওহীয়ে গাইরে মাতলু” যা বিশুদ্ধ হাদীসরূপে সংরক্ষিত আছে। এগুলোর মূল বিষয়টা রাসূলে খোদা (সা.)-এর উপর ওহীর মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছে। তবে তা ব্যক্ত করার জন্য যে শব্দচয়ন করা হয়েছে, তা তাঁর নিজস্ব। এক হাদীসে নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেন- أوتيت القرآن ومثله معه 'আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে এবং এর সাথে এর মতোই আরো দেওয়া হয়েছে।'
এখানে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাথে যে "অন্যান্য শিক্ষা”-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই 'ওহীয়ে গাইরে মাতলু।'
ইসলামী বিধি-বিধানের আংশিক ও শাখাগত বিষয়াবলীর বিস্তারিত বর্ণনা যেহেতু গাইরে মাতলু ওহীর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। তাই যারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করা সত্ত্বেও ইসলামী বিধি-বিধান উপেক্ষা করে স্বাধীন জীবন যাপন করতে আগ্রহী, তারা কিছু দিন থেকে এই সুর তুলেছে যে, 'ওহীয়ে গাইরে মাতলু' বলতে কিছু নেই। মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর উপর যত ওহী অবতীর্ণ হয়েছে সবগুলো পবিত্র কুরআনুল কারীমে সংরক্ষিত আছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের বাইরে যেসব বিধান রাসূলে আকরাম (সা.) দিয়েছেন, তা নিছক একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। যা শুধু সে যুগের মুসলমানদের জন্যই পালনীয় ছিল। বর্তমান যুগে তা পালন করা আবশ্যকীয় নয়! বস্তুতঃ এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও বাতিল।
স্বয়ং পবিত্র কুরআনুল কারীমের একাধিক আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মহান আল্লাহ পাক প্রদত্ত ওহী শুধু কুরআনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং কুরআনের আয়াতের বাইরেও ওহীর মাধ্যমে নবী কারীম (সা.)-কে অনেক বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ দাবীর সমর্থনে নিম্নে কুরআনে কারীমার আয়াত দলীল হিসেবে উপস্থাপন করা হলো-
وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ
'আর যে কিবলার উপর তুমি ছিলে, তাকে কেবল এ জন্যই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে আমি জেনে নেই যে, কে রাসূলকে অনুসরণ করে এবং কে তার পেছনে ফিরে যায়।'
প্রত্যেক মুসলমান এ কথা জানে যে, মদীনায় থাকা অবস্থায় নবী কারীম (সা.) নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত “বাইতুল মুকাদ্দাস”-এর দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছিলেন। অতঃপর যখন পুনরায় বাইতুল্লাহ'র দিকে মুখ করে সালাত আদায়ের বিধান আসল, তখন এই আয়াত নাযিল হয়। যার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, 'আমি বাইতুল মাকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায়ের নির্দেশ এ জন্যই দিয়েছিলাম, যাতে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কারা ওই নির্দেশ পালন করে আর কারা অস্বীকার করে?' এখানে দেখার বিষয় হলো, এ আয়াতে মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করার নির্দেশ দেওয়াটাকে নিজের দিকে সম্বন্ধ করেছেন। যার অর্থ হচ্ছে, এই নির্দেশটাও আমিই দিয়েছিলাম। এখন যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের ‘আল-হামদু’ থেকে শুরু করে ‘আন-নাস’ পর্যন্ত সবটুকু অধ্যয়ন করা হয়, তাহলে কোথাও এ নির্দেশ পাওয়া যাবে না যে, “তোমরা বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় কর।” এ থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু ঐ নির্দেশটি এমন ওহী দ্বারা দিয়েছেন, যা পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোথাও উল্লেখ নেই। আর সেই ওহীর নামই হচ্ছে, ওহীয়ে গাইরে মাতলু।
কালামে পাকের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে- فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنبَأَكَ هَذَا قَالَ نَبَّأَنِي الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ 'স্মরণ কর- যখন নবী তার স্ত্রীদের কোন একজনকে গোপনে একটি কথা বলেছিল। অতঃপর সে স্ত্রী যখন তা (অন্য একজনকে) জানিয়ে দিল, তখন আল্লাহ এ ব্যাপারটি নবীকে জানিয়ে দিলেন। তখন নবী (তার স্ত্রীর কাছে) কিছু কথার উল্লেখ করল আর কিছু কথা ছেড়ে দিল। নবী যখন তা তার স্ত্রীকে জানাল তখন সে বলল, 'আপনাকে এটা কে জানিয়ে দিল?" নবী বলল, "আমাকে জানিয়ে দিলেন যিনি সর্বজ্ঞাতা, ওয়াকিফহাল।"
এই আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো যে, নবী কারীম (সা.)-এর জনৈকা সহধর্মিনী একটি কথা রাসূলে খোদা (সা.)-এর থেকে গোপন করতে চেয়েছিলেন। মহান আল্লাহ পাক ওহীর মাধ্যমে নবীজীকে ওই কথাটি জানিয়ে দিলেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে এ কথাটা কে জানিয়ে দিল? তিনি বললেন, মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহই আমাকে কথাটি জানিয়ে দিয়েছেন। এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ওই গোপন বা লুকানো কথাটি আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন ওহীর মাধ্যমে রাসূলে আকরাম (সা.)-কে জানিয়ে দিয়েছেন। অথচ পুরো কুরআনুল কারীমের কোথাও তা উল্লেখ নেই। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এই সংবাদটা তাঁকে "ওহীয়ে গাইরে মাতলু”-এর মাধ্যমেই দেওয়া হয়েছিল।
পবিত্র কুরআনের আরো বহু আয়াত দ্বারা "ওহীয়ে গাইরে মাতলু”-এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে এখানে শুধু দু'টি আয়াতের উপরই ক্ষান্ত করা হলো। সত্যানুসন্ধানই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে এই দু'টি আয়াতই অনস্বীকার্যভাবে এ কথা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে, বস্তুত "ওহীয়ে গাইরে মাতলু”ও ওহীর আরেকটি প্রকার। ওহীয়ে মাতলু-এর ন্যায় তা সুনিশ্চিত এবং অনুসরণ করা ওয়াজিব।
টিকাঃ
৪৫. "আল ইতকান" : ১/৪৫
৪৬. সূরা বাকারা: ১৪৩
৪৭. সূরা তাহরীম: ৩
📄 ওহীর উপর বুদ্ধিভিত্তিক সংশয়
প্রকাশ থাকে যে, উপরোক্ত আলোচনা ছিল ওহী এবং ওহীর হাকীকত সংক্রান্ত জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয় যা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আমরা শুরুতেই উল্লেখ করেছি যে, ওহী মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন পক্ষ হতে এমন সব বিষয়ের পথ-নির্দেশনার একটি রূপ, যার উপলব্ধি নিছক বিবেক-বুদ্ধি ও মেধাশক্তির দ্বারা সম্ভব নয়। আর ওহীর দর্শন যেহেতু আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) ব্যতীত আর কারো হয় না, তাই এর যথাযথ অনুধাবনও অন্যান্যদের জন্য সম্ভব নয়। এ কারণেই আজকের বিশ্ব, যা পশ্চিমা চিন্তা-চেতনার সর্বগ্রাসী সয়লাতে প্রভাবিত, তাদের কাছে ওহীভিত্তিক জ্ঞান অচেনা ও অপরিচিত বলে মনে হয় এবং তারা এটাকে সংশয় ও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। কিছু লোক তো খোলাখুলিভাবে ওহী ও ইলহামকে অস্বীকার করে (নাউযুবিল্লাহ) এগুলোকে কিচ্ছা-কাহিনী বলে আখ্যা দিয়েছে। আবার কেউ কেউ সরাসরি ওহীকে অস্বীকার না করলেও বিজ্ঞানের উন্নতির এ যুগে এর আলোচনা করতে লজ্জাবোধ তো অবশ্যই করে! তাই এখানে সংক্ষিপ্তাকারে জেনে নেওয়া হউক যে, নিরেট বিবেক ও যুক্তির আলোকে ওহীর অবস্থান কি?
আমাদের দৃষ্টিতে ওহীর বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য সর্বপ্রথম এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে যে, এ মহাবিশ্বের কোনো স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক আছেন, নাকি কারো সৃষ্টি করা ছাড়া এমনিতেই স্বয়ংক্রীয়ভাবে তা অস্তিত্ব লাভ করেছে? ওই সকল বস্তুবাদী লোক যারা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে, তাদের সাথে ওহীর বিষয়ে আলোচনা করা তো একদম নিরর্থক। যে নাস্তিক আল্লাহর অস্তিত্বকেই স্বীকার করে না, তার জন্য এটা সম্ভবই নয় যে সে ওহীর বাস্তবতার উপর গাম্ভীর্যপূর্ণভাবে চিন্তা-গবেষণা করে তা মনে-প্রাণে মেনে নিবে। তাই এমন ব্যক্তির সাথে তো সবকিছুর আগে মহান আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। থাকল ওই সকল লোক যারা মহান আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্বে বিশ্বাসী বা আস্তিক। এদের জন্য ওহীর যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাবনা ও বাস্তব অস্তিত্ব সম্পর্কে অনুধাবন করা কোনো কঠিন ব্যাপার নয়।
আপনি যদি এ কথার প্রতি বিশ্বাসী হন যে, এ মহা বিশ্ব ও তাতে যা রয়েছে সবই এক মহাশক্তিধর স্রষ্টার সৃষ্ট এবং তিনি তাঁর নিপুণ প্রজ্ঞার সাথে এ বিশ্ব প্রকৃতির সুদৃঢ় ও সুবিন্যস্ত নিয়ম-রীতির পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনিই কোনো এক বিশেষ উদ্দেশ্যে মানুষকে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন; তাহলে এটা কি করে সম্ভব যে, তিনি মানুষকে সৃষ্টি করে অন্ধকারে ছেড়ে দিয়েছেন! তাকে এটা বলে দেননি যে, কেন সে এ পৃথিবীতে আগমন করেছে? এখানে তার জিম্মায় কি কি দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে? তার গন্তব্যস্থল কোথায়? তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কি? কিভাবে সে তার জীবনের কাঙ্খিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হাসিল করবে? কোনো একজন সুস্থ বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি কি এমনটি করতে পারে যে, সে তার কোনো এক চাকরকে বিশেষ একটি উদ্দেশ্য নিয়ে সফরে পাঠাল, অথচ সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে না তাকে পাঠানোর সময় কিছু বলে দিল, না পরবর্তীতে কোনো লোক মারফত তাকে জানানো হলো যে, কি উদ্দেশ্যে তাকে পাঠানো হয়েছে? এবং সফরের সময় তার দায়িত্ব বা কর্তব্য কি?
যদি একজন সাধারণ বিবেকসম্পন্ন মানুষও এরূপ দায়িত্বহীন আচরণ না করতে পারে, তাহলে সে মহান পবিত্র সত্ত্বার ব্যাপারে এ ধারণা কিভাবে করা যেতে পারে, যার নিপুণ প্রজ্ঞার মাধ্যমে এ মহা বিশ্বের সকল নিয়ম-শৃংখলা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে? এটা কি করে সম্ভব যে, যে মহান সত্ত্বা আসমান, জমিন, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্রের ন্যায় এমন এমন বিস্ময়কর সুশৃঙ্খল নিয়ম চালু করেছেন, তিনি তাঁর বান্দাদের নিকট পয়গাম পাঠানোর জন্য এমন কোনো ব্যবস্থাপনাও করতে পারেন না, যার মাধ্যমে মানুষকে তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে? যদি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিপুণ প্রজ্ঞার প্রতি ঈমান থেকে থাকে তাহলে অবশ্যই এ কথাও মানতে হবে যে, তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে অন্ধকারে ছেড়ে দেননি। বরং তাদের দিক-নির্দেশনার জন্য নিয়মতান্ত্রিক কোনো ব্যবস্থাপনা অবশ্যই তৈরি করেছেন। বলা বাহুল্য, নিয়মতান্ত্রিক সেই ব্যবস্থাপনার নামই হলো, ওহী ও রিসালাত। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বোধগম্য হয় যে, ওহী শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের নাম নয়; বরং যুক্তিগতভাবেও এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যা অস্বীকার করা প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পরিপূর্ণ প্রজ্ঞাকেই অস্বীকার করার নামান্তর।
বাকি থাকল এই অভিযোগ যে, "উপরে ওহীর যে সব পদ্ধতির আলোচনা হয়েছে, তা আমাদের বোধগম্য নয় এবং আমরা তা প্রত্যক্ষ করিনি।” বস্তুত এটা ওহীকে না মানার জ্ঞানগত ও যুক্তিসম্পন্ন কোনো দলীল নয়। যুক্তিগতভাবেই যে বিষয়টি প্রয়োজনীয় এবং যার বাস্তবতা অনস্বীকার্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে সে বিষয়টিকে শুধু এ কথার ভিত্তিতে অস্বীকার করা যাবে না যে, আমরা তা প্রত্যক্ষ করিনি। আজ থেকে কয়েকশ' বছর পূর্বে যদি কারো সামনে এই আলোচনা করা হতো যে অচিরেই মানুষ উড়োজাহাজে চড়ে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব মাত্র কয়েক ঘণ্টায় অতিক্রম করবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে এটাকে রূপকথা হিসেবে আখ্যায়িত করতো। তবে কি তার অস্বীকার ও প্রত্যক্ষ না করার কারণে উড়োজাহাজের বাস্তবতা বিলীন হয়ে গেল? জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা এলাকার হাজার হাজার মানুষ আজও এমন রয়েছে যারা এ কথা বিশ্বাস করতে মোটেও প্রস্তুত নয় যে, মানুষ চাঁদে গিয়েছে! কিন্তু তাদের অস্বীকার করার কারণে কি এ ঘটনা ভুল প্রমাণিত হয়ে গেল? আধুনিক শিক্ষার ছোঁয়া লাগেনি এমন কোনো মফস্বলে তথা গ্রাম এলাকার কোনো মানুষের কাছে কম্পিউটার সিস্টেমের বিস্তারিত বর্ণনা দিন এবং তাকে বলুন, কীভাবে এ যন্ত্রটি মানব মস্তিষ্কের ন্যায় কাজ করে? শেষ পর্যন্ত সে আপনার বর্ণনায় সংশয় ও সন্দেহই প্রকাশ করতে থাকবে। তবে কি এ ব্যক্তির সংশয় ও সন্দেহের কারণে কম্পিউটারের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গেল? যদি না হয়ে থাকে এবং বাস্তবেই এমনটি হবে না, তাহলে ওই ওহী যুক্তির আলোকে যার প্রয়োজন স্বীকৃত এবং অনস্বীকার্য, যা প্রত্যক্ষ করেছেন দুনিয়ার একলক্ষ চব্বিশ হাজার মহা সত্যবাদী আম্বিয়ায়ে কেরাম; শুধু সংশয় ও সন্দেহের ভিত্তিতে সেই ওহীকে কিভাবে অস্বীকার করা যায়?
অবশেষে প্রশ্ন হলো, ওহীর এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে জ্ঞানগত ও যৌক্তিক দুর্বোধ্যতা কি? (নাঊযুবিল্লাহ) মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কি ওহীর এই পদ্ধতিগুলোর উপর সক্ষম নন? দুনিয়ার প্রযুক্তিবিদরা যদি তাদের সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধির মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণের জন্য টেলিফোন, তার, টেলিপ্রিন্টার, রেডিও ও টেলিভিশনের মতো কল্পনাতীত বিস্ময়কর যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করতে পারে, তাহলে (নাঊযুবিল্লাহ) মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কি এ শক্তি নেই যে, তিনি তাঁর বান্দাদের নিকট সংবাদ প্রেরণের জন্য এমন কোনো পদ্ধতি ও মাধ্যম অবলম্বন করবেন, যা উপরোক্ত যে কোনো মাধ্যম থেকে অধিকতর শক্তিশালী এবং গতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য হবে? ওহীর হাকীকতই হচ্ছে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় বাণী কোনো মাধ্যম বা মাধ্যম ছাড়াই তাঁর পয়গাম্বরগণের অন্তরে ঢেলে দেন।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এ কথাটিকে মেনে নিতে যুক্তিগ্রাহ্য আপত্তিটা কোথায়? ওহীর বাস্তবতা প্রমাণের জন্য কোনো মানুষের আবিষ্কৃত ও ব্যবহারিক উদাহরণ উপস্থাপন করতে কি আমরা দ্বিধাবোধ করি। তথাপি বিষয়টি বুঝার জন্য আমরা মানুষের ব্যবহারিক এমন একটি প্রক্রিয়া উদাহরণ হিসেবে পেশ করছি, যার মাঝে একজন মানুষ অপর একজন মানুষের মন-মস্তিষ্ক অনুগত ও অধীনস্ত করে তাতে যা ইচ্ছে তাই ঢেলে দিতে পারে? এই প্রক্রিয়াটিকে সুফিয়ায়ে কেরাম (আধ্যাত্মিক সাধকগণের)-এর পরিভাষায় “তাসাররুফে খেয়ালী” বলা হয়। সুফিয়ায়ে কেরামের আলোচনায় এর অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। যার মাধ্যমে এক ব্যক্তি তার নিজস্ব প্রক্রিয়াবলে অন্য ব্যক্তির মন-মস্তিষ্কের উপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, তাকে সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন বানিয়ে তাকে দিয়ে যা ইচ্ছা তা বাতলিয়ে নেয় বা করিয়ে নেয়। বস্তুবাদী লোকেরা বহু কাল যাবত তাসাররুফের এই শক্তিকে অস্বীকার করে আসছিল। আর এদের অনুসরণ ও দেখ-দেখায় বহু মুসলমানও বিষয়টিকে কল্প-কাহিনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
অবশেষে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত বিজ্ঞানী মেসমার (Mesmer)-এর আবির্ভাব ঘটে। তিনি মানুষের মস্তিষ্ককে নিজের গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নেন। ১৭৫৭ সালে তিনি তার এক গবেষণালব্ধ একটি প্রবন্ধে এ তথ্য প্রকাশ করেন যে, এক ধরনের সংবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণাধীন করা যায়। এ প্রক্রিয়াকে তিনি (Animal Magnetism) বা 'সংবেদন প্রক্রিয়া' বলে নামকরণ করেন। ফ্রান্সে অবস্থান করে তিনি এর সফল ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাও লাভ করেন। কিন্তু তিনি তার সমকালীন যুগের মানুষকে পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারেননি। অতঃপর ১৮৪২ সালে ইংল্যান্ডে জেম্স ব্রাইড (James Braid) নামে আরো এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে। যিনি মস্তিষ্ক অধীনস্তকরণ প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে নতুনভাবে করে এর নামকরণ করেন (Hypnotised) বা "সম্মোহন প্রক্রিয়া।"
প্রকাশ থাকে জেম্স ব্রাইডের আবিষ্কৃত এই সম্মোহন প্রক্রিয়ার বেশ কয়েকটি ধাপ রয়েছে। এর চূড়ান্ত ধাপ হচ্ছে, যে ব্যক্তির উপর এই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয় অর্থাৎ সম্মোহিত ব্যক্তির শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণ অচল ও অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে এবং এর ফলে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল ইন্দ্রিয়শক্তি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তবে এই প্রক্রিয়ার একটি মধ্যবর্তী ধাপ ও স্তর রয়েছে। যার মধ্যে দেহ অনুভূতি শূন্য হয় না; বরং নড়াচড়া করার শক্তি থাকে। এই স্তরের সম্পর্কে ওয়ার্লড ফ্যামিলী এনসাইক্লোপিডিয়াতে বর্ণিত হয়েছে- "সম্মোহন প্রক্রিয়া যদি কম মাত্রায় প্রয়োগ করা হয় তাহলে সম্মোহিত ব্যক্তি বিভিন্ন বস্তুর চিন্তা-ভাবনা করার উপযোগী থাকে। যেমন, এমতাবস্থায় তার জন্য এটা সম্ভব যে, সে (সম্মোহন প্রক্রিয়া প্রয়োগকারী ব্যক্তির নির্দেশনা অনুযায়ী) নিজেকে নিজে অন্য এক ব্যক্তিরূপে জ্ঞান করবে। বিশেষ কোনো বস্তু তার দৃষ্টিগোচর হবে (যা সেখানে উপস্থিত নেই)। অথবা অস্বাভাবিক কোনো ইন্দ্রিয়শক্তির নিজের মধ্যে অনুভব করতে শুরু করবে। এ সবের কারণটা হচ্ছে একটা যে, ওই সময় সম্মোহিত ব্যক্তি প্রক্রিয়া প্রয়োগকারী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে যায়।"
জেম্স ব্রাইডের গবেষণা ও সফল অভিজ্ঞতার পর "সম্মোহন প্রক্রিয়া"কে ওই সকল বস্তুবাদী লোকেরাও মেনে নিয়েছিল যারা প্রথমে তা অস্বীকার করতো। আর বর্তমানে তো এ প্রক্রিয়া জনসাধারণের জন্য চিত্তাকর্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটি কোটি শ্রমিক এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছে। রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এ প্রক্রিয়া দ্বারা কাজ নেওয়া হচ্ছে। আর সেই "তাসাররুফে খেয়ালী" মুসলমান সুফিয়ায়ে কেরামের মাঝে যা শত শত বছর পূর্ব থেকে চলে আসছে- যেটাকে মানুষ স্রেফ কল্পনাপূজা বলে উড়িয়ে দিত, এখন “সম্মোহন প্রক্রিয়া”-এর সত্যতা প্রমাণের পর তা এক বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে। এখন আমাদের যুগের 'যুক্তিবাদী' বুদ্ধিজীবিগণও এ সত্যকে মেনে নিয়েছেন, যাদের কাছে মুসলমানদের সকল অস্বাভাবিক বিষয়াবলীকে কল্পনাপূজা এবং পাশ্চাত্যের সকল গবেষণাকে বৈজ্ঞানিক সত্যতা বলে মনে হয়।
যা হোক উপস্থাপনার বিষয় ছিল, 'সংবেদন প্রক্রিয়া' হোক অথবা 'সম্মোহন প্রক্রিয়া'ই হোক এর হাকীকত তো এটাই যে, একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন বানিয়ে নিজের চিন্তাধারা ও কথাবার্তা তার মন-মস্তিষ্কে প্রবিষ্ট করিয়ে দেয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে মহান সত্ত্বা মানুষের তাসাররুফে খেয়ালী বা সংবেদন-সম্মোহন প্রক্রিয়ার এত শক্তি রেখেছেন যে, তারা সাধারণ থেকে সাধারণ উদ্দেশ্যে, এমনকি কখনো কখনো সম্পূর্ণ অনর্থক কাজে একে অপরের মন-মস্তিষ্ক অধীনস্ত করে নেয়। তাহলে কি স্বয়ং সে সত্ত্বা এ ব্যাপারে সক্ষম নন যে, মানবজাতির দিক-নির্দেশনার জন্য নবী-রাসূলগণের অন্তরকে তাঁর অধীনস্ত করে দিয়ে তাতে স্বীয় বাণী ঢেলে দিবেন? "আল্লাহ পবিত্র, মহান! এটাতো এক গুরুতর অপবাদ।" سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ
টিকাঃ
৪৮. তার পুরো নাম ফ্রেডরিক এন্টোন মেসমার (Friedrich Anton Mesmer) তিনি সুইজারল্যান্ডের একটি ঝিল কন্সেটন্সের অদূরে ১৭৩৩ ইং সনের মে মাসে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮১৫ ইং সনের মার্চ মাসে মীর সাম্বার্গ শহরে মৃত্যু বরণ করেন। তিনি প্রথমত চিকিৎসা শাস্ত্রকে নিজের থিসিস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মস্তিষ্কের সংবেদন প্রক্রিয়ার একজন বিশেষজ্ঞঃ বরং আবিষ্কারক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। [ওয়ার্লড ফ্যামিলি ইনসাইক্লোপেডিয়া, ১২ তম খণ্ড, ৩৪২৫ পৃষ্ঠা, মিশিগান আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ১৯৫৭] তার নামের দিকে সম্বন্ধ করে এ শাস্ত্রের নাম রাখা হয়েছে "মেসমারিজম।"
৪৯. The World Family Encyclopedia 1957 P. 3426 V. 12
📄 কুরআনের শুধু অর্থই কি ওহী?
উপরে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ওহী দুই প্রকার। প্রথমতঃ “ওহীয়ে মাতলু।" (পঠিত ওহী) অর্থাৎ কুরআনুল কারীম। দ্বিতীয়তঃ "ওহীয়ে গাইরে মাতলু।” (অপঠিত ওহী) এই দ্বিতীয় প্রকার ওহী সাধারণত এমন হয়েছে যে, এর বিষয়বস্তু মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে হতো আর তা ব্যক্ত করার জন্য শব্দ নির্বাচন করতেন হযরত জিবরাঈল (আ.) কিংবা নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। কিন্তু পবিত্র কুরআনুল কারীমের ব্যাপারটা এমন নয়। শব্দগত ও অর্থগত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে তা পুরোপুরি মহান আল্লাহ জাল্লা শানুর কালাম বা বাণী। এর বিষয়বস্তু যেমনিভাবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অবতীর্ণ, তেমনি এর শব্দও মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে নাযিলকৃত। কুরআনুল কারীমের শব্দ নির্বাচন, রচনাশৈলী ও স্তর বিন্যাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে না আছে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর কোনো দখল আর না আছে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কোনো দখল।
যারা ওহীর ব্যাপারে বস্তুবাদী লোকদের আপত্তি ও প্রশ্নবাণে প্রভাবিত হয়ে পড়েছে, আমাদের যুগে তাদের কেউ কেউ এ দাবী করেছে যে, 'কুরআনুল কারীমের শুধু মাফহুম (তথা মর্ম ও মূলকথা) ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। আর এর শব্দ নির্বাচন, রচনাশৈলী ও স্তর বিন্যাস ইত্যাদি সবকিছু হযরত জিবরাঈল (আ.) কিংবা নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ হতে হয়েছে।' তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, বাতিল এবং কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণের সম্পূর্ণ বিরোধী। পবিত্র কুরআনুল কারীমের বহু আয়াত এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দ ও অর্থ উভয় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। নিম্নে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হলো।
১. পবিত্র কুরআনুল কারীম বহু স্থানে নিজের একটি গুণ "আরবী" হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ এটাকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে। এখন এটা তো একেবারেই সুস্পষ্ট যে, যদি কুরআনের শুধু মাফহুম বা মর্ম ও অর্থই ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়ে থাকে তাহলে (আমি এটাকে আরবী কুরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি।)-এর কোনো অর্থই থাকে না। কারণ "আরবী" হওয়াটা শব্দের সিফাত বা গুণ, অর্থের নয়।
২. পবিত্র কুরআনুল কারীমের একাধিক জায়গায় নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিশেষ তিনটি দায়িত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে- رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ 'হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তাদের থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে আর তাদেরকে পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।'
এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর পৃথক পৃথক দু'টি দায়িত্ব ছিল। একটি হলো, তাদেরকে শুধু মহান আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত বা পাঠ করে শোনানো। অপরটি হলো, তাদেরকে সেগুলোর শিক্ষা দেওয়া। আর এটা তো পরিষ্কার কথা যে, তেলাওয়াত বা পাঠ করা শুধু শব্দেরই হয়ে থাকে; অর্থের নয়। কাজেই রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর অর্পিত সর্বপ্রথম দায়িত্ব পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দের সাথে, অর্থের সাথে নয়।
৩. পবিত্র কুরআনুল কারীম বিভিন্ন স্থানে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে "আল-কিতাব” শব্দটি ব্যবহার করেছে। আর বস্তুত, আত্মিক বিষয়াবলীর জন্য "কিতাব” শব্দের প্রয়োগ হয় না; বরং যখন সে বিষয়াবলীকে শব্দের ছাঁচে সাজানো হয় তখনই সেটাকে কিতাব বলা হয়। এর দ্বারাও সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়টি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অবতীর্ণ।
৪. সূরায়ে "কেয়ামাহ” থেকে বুঝা যায় যে, যখন হযরত জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আগমন করতেন, তখন রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটাকে আত্মস্থ করার জন্য তাড়াহুড়া করে একই শব্দ পুনঃপুনঃ উচ্চারণ করতেন। তখন মহান আল্লাহ তা'আলা এ ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন- لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ 'কুরআন তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে তুমি তোমার জিহবাকে দ্রুত সন্দোলিত করো না। ইহা সংরক্ষণ ও পাঠ করাইবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি উহা পাঠ করি তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর, অতঃপর ইহার বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমারই।'
এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) যে সমস্ত শব্দাবলী নিয়ে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করতেন, তা আল্লাহ তা'আলার কালাম (বাণী) ছিল। এ জন্যই রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এর শব্দাবলী আত্মস্থ করানো, এর তেলাওয়াত বা পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া এবং এর ব্যাখ্যা করা- এই তিনটি দায়িত্বই স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন স্বীয় জিম্মায় নিয়েছেন।
এই সুস্পষ্ট দলীলগুলোর আলোকে এ ধারণা একেবারেই বাতিল হয়ে যায় যে, 'পবিত্র কুরআন ওহীর মাধ্যমে নাযিল করা হয়নি।' এই বিষয়ের উপর আলোচনা করতে গিয়ে শায়েখ মুহাম্মদ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.) এক চমৎকার বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি লিখেন- "এই আলোচনার সারকথা হলো, পবিত্র কুরআনুল কারীমের শব্দ ও অর্থ উভয়ই সর্বসম্মতিক্রমে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। "হাদীসে কুদসী"-এর ব্যাপারেও প্রসিদ্ধ মত এটাই যে, এর শব্দাবলীও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে। অবশ্য নবী কারীম (সা.)-এর হাদীসগুলোর শুধু অর্থটাই ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। আর শব্দগুলো নবী কারীম (সা.)-এর নিজের। আর যে সকল হাদীস রাসূলে আকরাম (সা.) নিজে ইজতেহাদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন সেগুলোর শব্দ ও অর্থ উভয়ই তাঁর নিজস্ব।”
প্রকৃতপক্ষে যেসব লোক পবিত্র কুরআনের শব্দাবলী ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হওয়াকে অস্বীকার করেছে, তাদের এই ভুলের মূল উৎস হচ্ছে, ওহীর মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের শব্দাবলীর অবতরণ তাদের বোধগম্য নয়। কিন্তু ওহীর হাকীকত, যুক্তির আলোকে এর প্রয়োজনীতা এবং ওহীর ব্যাপারে সংশয়-সন্দেহের জবাবে উপরে যেসব কথা লিখা হয়েছে, সেগুলোকে সামনে রাখলে এই সন্দেহ স্বয়ংক্রীয়ভাবে দূরীভূত হয়ে যায়। ওহী যদি বাস্তবেই এক প্রয়োজনীয় বিষয় হয় এবং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর উপর সক্ষম হন, তাহলে এমন কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আছে যে, তিনি পবিত্র কুরআনের অর্থটা নবীর অন্তরে ঢেলে দিতে সক্ষম, আর ওহীর মূল বক্তব্য নবীজী আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিজস্ব (নাঊযুবিল্লাহ)।
কিন্তু আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, কুরআন, হাদীস এবং ইজমায়ে উম্মতের সুদৃঢ় দলীলের আলোকে তাদের এ বক্তব্যগুলো সম্পূর্ণ বাতিল। উল্লিখিত বুযুর্গদ্বয়ও এ বক্তব্যের প্রবক্তাদের কোনো উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেননি। বরং (তাদের কেউ কেউ বলেছেন) বলে তাদের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। আর আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তো সরাসরি এই বক্তব্যগুলো খণ্ডন করেছেন। একারণে এ সকল অভিমত বাতিল পন্থিদের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা যাবে না。
টিকাঃ
৫০. দেখুনঃ সূরা নাহল: ১০৩, সূরা শুআরা: ১৯৫, সূরা ইউসুফ: ২, সূরা ত্বহা: ১১৩, সূরা রাদ: ৩৯, সূরা যুমার: ২৮, সূরা হা-মীম সাজদা: ৩, সূরা শুরা: ৭, সূরা যুখরুফ: ৩ ইত্যাদি।
৫১. সূরা বাকারা: ১২৯
৫২. সূরা কেয়ামাহ: ১৬-১৯
"মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন": ১/৪৪, ঈসা আল-বাবী, মিসর ১৩৭২ হিজরী।
"আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন": ১/২২৯, "আল ইতকান": ১/৪৫।