📄 ঘণ্টা ধ্বনি ন্যায়
ঘণ্টার প্রথম নিয়ম হচ্ছে নবী কারীম (সা.)-এর নিকট যখন ওহী আসত, তখন কোনো ঝনঝনানি শব্দের মতো আওয়াজ হতো, যেমন ঘণ্টার শব্দ হয়। হাদীসে শুধু এ টুকুই এসেছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বর্ণনা করা হয়নি। তাই নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে, ওহীর এই প্রকারকে কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকে ঘণ্টার ধ্বনির সাথে তুলনা করা হয়েছে। অবশ্য কোনো কোনো আলেম মত প্রকাশ করেছেন যে, ঘণ্টার আওয়াজের ন্যায় ধ্বনিটি মূলত ফেরেশতাদের আগমন ধ্বনি। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ফেরেশতাগণ ওহী নিয়ে আসার সময় নিজেদের ডানাগুলো গুটানোর ফড়ফড় শব্দ হয়, তাতেই এই আওয়াজ সৃষ্টি হতো।
আল্লামা খাত্তাবী (রহ.) এ মত প্রকাশ করেছেন যে, এখানে মূলত ওহীকে ঘণ্টার আওয়াজের সুর মূর্ছনার সাথে তুলনা করা হয়নি; বরং তুলনা করা হয়েছে তার ধারাবাহিকতার সাথে। অর্থাৎ যেমনিভাবে ঘণ্টার আওয়াজ বিরামহীনভাবে বাজতে থাকে, হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় না, ঠিক তেমনিভাবে ওহীর আওয়াজও বিরামহীনভাবে আসতে থাকে। কিন্তু এ কথা সুস্পষ্ট যে, এ মতামতগুলো কেবল ধারণা প্রসূত কেয়াসনির্ভর অনুমানমত, যেগুলোর উপর ভিত্তি করে নিশ্চিত কোনো কথা বলা যাবে না।
তবে এপ্রসঙ্গে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) শায়খে আকবর হযরত মুহিউদ্দীন ইবনে আরবী (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে ঘণ্টার আওয়াজের সাদৃশ্যের যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন সেটা উপরোক্ত ব্যাখ্যাবলী থেকে অধিক সূক্ষ্ম। তাঁর বক্তব্য হলো, এই সাদৃশ্য বা উপমা দুটি দিক লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমতঃ আওয়াজের লাগাতার বা বিরামহীনতার ভিত্তিতে, যেমনটি উপরে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ ঘণ্টা যখন লাগাতার বাজতে থাকে তখন সাধারণত শ্রোতার জন্য সে আওয়াজের দিক নির্ণয় করা মুশকিল হয়ে পড়ে। কারণ সে আওয়াজটা শ্রোতার কানে সবদিক থেকে আসছে বলে মনে হয়। আর মহান আল্লাহ পাক যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো দিক ও স্থানে অবস্থান করা হতে মুক্ত তাই মহান আল্লাহ তা'আলার বাণীর এই বৈশিষ্ট্য যে, তাঁর বাণীর আওয়াজ নির্দিষ্ট কোনো একদিক থেকে আসে না। বরং সবদিক থেকে আসে। এ পদ্ধতির যথাযথ উপলব্ধি প্রত্যক্ষ দর্শন ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মেধা ও বুঝশক্তির নিকটবর্তী করার জন্য রাসূলে আকরাম (সা.) বিষয়টাকে ঘণ্টার ধ্বনির সাথে তুলনা করেছেন।
বস্তুত সর্বোপরি ওহী অবতরণের এই পদ্ধতির সঠিক হাকীকত একমাত্র মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহুই জানেন অথবা তাঁর রাসূলে কারীম (সা.) ও জানেন। হাদীস থেকে শুধু এ টুকুই জানা যায় যে, তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার এই বিশেষ পদ্ধতিতে ঘণ্টার আওয়াজ আসতো। সাথে সাথে হাদীসে এ কথাও বলা হয়েছে যে, ওহী অবতরণের এই পদ্ধতিটি নবী কারীম (সা.)-এর জন্য সবচেয়ে কষ্টকর হতো।
হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) বলেন, "وَهُوَ أَشَدُّهُ عَلَيَّ" (এ পদ্ধতি আমার জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্টকর) বাক্যটি থেকে জানা যায়, এমনিতে ওহী অবতীর্ণ হবার প্রত্যেকটি পদ্ধতিই কষ্টকর ছিল। তবে ঘণ্টার আওয়াজের পদ্ধতিটি তুলনামূলক সবচেয়ে কষ্টকর হতো। কারণ বক্তা ও শ্রোতার মাঝে কোনো না কোনো সম্পর্ক ও সামঞ্জস্য সৃষ্টি হওয়া অপরিহার্য। এখন যদি ফেরেশতা মানবাকৃতিতে চলে আসতো, তাহলে রাসূলে কারীম (সা.)-এর উপর অস্বাভাবিক কোনো বোঝা চেপে আসতো না। শুধু মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের বাণীর জালালিয়্যাতের বোঝাটাই পতিত হতো। পক্ষান্তরে ফেরেশতা যখন মানবাকৃতিতে না আসে; বরং তার আওয়াজ সরাসরি মহান আল্লাহ পাকের বাণী শুনিয়ে দেয়, তাহলে তা অস্বাভাবিকভাবেই একটি অবস্থার সৃষ্টি হতো। সে বার্তা সম্পর্কে পরিচিত হতে এবং তা থেকে উপকৃত হতে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর জন্য বেশ কষ্টদায়ক হতো। যেমন উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন-
قَالَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا وَلَقَدْ رَأَيْتُهُ يَنْزِلُ عَلَيْهِ الْوَحْيُ فِي الْيَوْمِ الشَّدِيدِ الْبَرْدِ، فَيَفْسِمُ عَنِّي وَإِنَّ جَبِينَهُ لَيَتَفَصَّدُ عَرَقًا.
'আয়েশা (রা.) বলেন, আমি প্রচন্ড শীতের দিনে ওহী নাযিলরত অবস্থায় তাঁকে দেখেছি। ওহী শেষ হলেই তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত।'
ওহীর এই পদ্ধতিতে কখনো কখনো এমন কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হতো যে, রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই অবস্থায় যে জন্তুর উপর সওয়ার থাকতেন, তাঁর ভারে ক্লান্ত হয়ে ওই জন্তুটি বসে যেত। একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মাথা মুবারক হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর উরুর উপর রেখেছিলেন। এমতাবস্থায়ই ওহী নাযিল হতে লাগল। এতে হযরত যায়েদ (রা.) নিজের উরুর উপর এ পরিমাণ বোঝা অনুভব করলেন, যেন তা ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম। মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনায় নবীয়ে পাক (সা.) নিজেই বর্ণনা করেন, যখন এ প্রকারের ওহী অবতীর্ণ হয়, তখন আমার এই অনুভূতি হয় যেন আমার রূহ নিয়ে টানা-হেঁচড়া শুরু হচ্ছে। কোনো কোনো সময় এই প্রকারের ওহী অবতরণ কালে অন্যান্যরাও ক্ষীণ ক্ষীণ আওয়াজ শুনতে পেতেন। হযরত ওমর (রা.) বলেন, যখন রাসূলে খোদা (সা.)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হতো, তখন তাঁর নূরানী চেহারা মুবারকের কাছে মৌমাছির গুঞ্জনের ন্যায় শব্দ শোনা যেত।
টিকাঃ
২০. "ফয়যুল বারী": ১/১৯-২০
২১. "ফাতহুল বারী” ১/১৬
২২. সহীহ বুখারী: ১/২
২৩. "আল ইতকান"; ১/৪৬, কায়রো ১৩৬৮ হিজরী, ইবনে সাআদের উদ্ধৃতি সাথে।
২৪. আল-ফাতহুর রাব্বানী: ২০/২১১, হাদীস নং ৪২
২৫. আল-ফাতহুর রাব্বানী: ২০/২১২
📄 মানব রূপে ফেরেশতার আগমন
ওহীর দ্বিতীয় পদ্ধতি যা উল্লিখিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে তা হলো, ফেরেশতা কোনো মানবাকৃতিতে নবী কারীম (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে মহান আল্লাহ তা'আলার বাণী পৌঁছে দিতেন। এতে সাধারণত হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত দিহ্ইয়াতুল কালবী (রা.)-এর আকৃতিতে আগমন করতেন। আল্লামা আইনী (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে কেরামের মধ্য হতে হযরত দিইয়াতুল কালবী (রা.)-কে নির্বাচন করার সম্ভাব্য কারণ এই যে, তিনি তাঁর সময়ের সবচেয়ে সুন্দর ও সুদর্শন পুরুষ ছিলেন। এতটাই সুন্দর ছিলেন যে তিনি নিজ চেহারা ঢেকে চলতেন। অবশ্য কোনো কোনো সময় অন্যদের আকৃতিতেও হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর আগমন করার প্রমাণ রয়েছে। যেমন, হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.)-এর প্রসিদ্ধ বর্ণনায় হাদীসে জীব্রিলে তিনি সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্যক্তির আকৃতিতে আগমন করেছিলেন।
কেননা, সেখানে উদ্দেশ্যটাই ছিল নবী কারীম (সা.)-এর সাথে এক অপরিচিত ব্যক্তির এতটা অন্তরঙ্গ কথোপকথনে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে আশ্চর্যান্বিত করা। এবং সর্বোপরি এ কথার উপর সবাই একমত যে, যে ফেরেশতা নবী কারীম (সা.)-এর নিকট ওহী নিয়ে আসতেন, তিনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ.)। পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে- قُلْ مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِجِبْرِيلَ فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللَّهِ তুমি বল: যে ব্যক্তি জিবরাঈলের সাথে শত্রুতা রাখে এ জন্য যে, সে আল্লাহর হুকুমে এই কুরআনকে তোমার অন্তঃকরণ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে।
এই আয়াত দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, হযরত জিবরাঈল (আ.)-ই নবী কারীম (সা.)-এর নিকট ওহী নিয়ে আসতেন। অবশ্য ইমাম আহমদ (রহ.) ইমাম শা'বী (রহ.)-এর উদ্ধৃতি বর্ণনা করেছেন যে, নবুওয়াতের প্রথম দিকে তিন বছর পর্যন্ত হযরত ইসরাফীল (আ.) ওহী নিয়ে আগমন করতেন। তবে তাঁর মাধ্যমে পবিত্র কুরআনুল কারীম নাযিল করা হয়নি। সমগ্র কুরআন মাজীদ হযরত জিবরাঈল (আ.)-ই নিয়ে এসেছেন। তবে আল্লামা ওয়াকেদী (রহ.) সহ আরো অনেকেই এ মত প্রত্যাখ্যান করে বলেন, হযরত জিবরাঈল (আ.) ব্যতীত অন্য কোনো ফেরেশতা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট ওহী নিয়ে আগমন করেননি। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহ.)-এর অভিমতও এ দিকেই বুঝা যায়। উপরন্তু কোনো মারফু হাদীস কিংবা কোনো সাহাবীর উক্তিতেও এই বর্ণনার কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। অবশ্য হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই বর্ণনা গ্রহণ করার প্রতি অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এটাকে তিনি 'ফাতরাতে ওহী' বা ওহীর বিরতিকাল বলে উল্লেখ করেছেন।
মোটকথা, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার এই পদ্ধতিতে ফেরেশতা মানবাকৃতিতে আসতেন। আর ওহীর এই পদ্ধতিতে রাসূলে কারীম (সা.)-এর বিশেষ কোনো অসুবিধা হতো না। যেমন এপ্রসঙ্গে সহীহ আবু আওয়ানা-এর এক বর্ণনায় এসেছে, নবী কারীম (সা.) ওহীর এই প্রকারের কথা উল্লেখ করে ছিলেন- وَهُوَ أَهْوَنُهُ عَلَيَّ।
টিকাঃ
২৬. "উমদাতুল কারী": ১/৪৭ ইস্তাম্বুল ১৩০৮ হিজরী। আল আইনী (রহ.) রচিত।
২৭. দেখুন: "মিশকাতুল মাসাবীহ": ১/১১ আসাহহুল মাতাবি' করাচী।
২৮. সূরা বাকারা: ৯৭
২৯. "আল ইতকান" : ১/৪৬ এবং কাসতালানী: "ইরশাদুস সারী": ১/৫৯
৩০. "উমদাতুল কারী": ১/৪৭-৪৮
৩১. "ফাতহুল বারী": ১/২২-২৩
📄 আসলরূপে ফেরেশতার আগমন
ওহী অবতীর্ণের তৃতীয় পদ্ধতি ছিল এই যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) কোনো মানুষের আকৃতি ধারণ না করে নিজের প্রকৃত আকৃতি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে যেতেন। তবে তাঁর জীবনে মাত্র তিনবার ঘটেছিল। প্রথম বার যখন তিনি নিজেই হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে প্রকৃতরূপে প্রত্যক্ষ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। দ্বিতীয় বার মিরাজ বা ঊর্ধ্বজগত ভ্রমণের সময়। তৃতীয় বার নবুওয়াতের একেবারে সূচনাকালে মক্কা মুকাররমার "আজইযাদ” নামক স্থানে। প্রথম দু'টি ঘটনা তো সঠিক সনদ দ্বারা প্রমাণিত। তবে তৃতীয় ঘটনাটি সনদের দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল হবার কারণে সন্দেহের অবকাশ বিদ্যমান।
টিকাঃ
৩২. "আল-ইতকান": ১/৪৬
৩৩. "আল-মিনহাজ" আবু আবদুল্লাহ হুসাইন ইবনুল হাসান-আল হালিমী আল-জুরযানী রচিত।
৩৪. "ফাতহুল বারী": ১/১৬ হাফেয ইবনে হাযার আসকালানী।
📄 সত্য স্বপ্ন
ওহীর চতুর্থ পদ্ধতি ছিল এই যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্নযোগে যা কিছু প্রত্যক্ষ করতেন বাস্তবে তাই ঘটত। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহা) বলেন- (أول ما بدئ به رسول الله صلى الله عليه وسلم من الوحي الرؤيا الصالحة في النوم، فكان لا يرى رؤيا إلا جاءت مثل فلق الصبح 'ঘুমন্ত অবস্থায় সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হবার সূচনা হয়। ওই সময় তিনি স্বপ্নযোগে যা কিছু প্রত্যক্ষ করতেন, প্রত্যুষে তা উদ্ভাসিত প্রভার ন্যায় বাস্তবায়িত দেখতে পেতেন।'
এ ছাড়াও মদীনায়ে তৈয়েবাতে একবার এক মুনাফিক নবী কারীম (সা.)-এর উপর যাদু করেছিল। ওই যাদু সম্পর্কে অবগতি এবং তা প্রতিহত করার উপায়ও নবীজীকে স্বপ্নযোগে মহান আল্লাহর তরফ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
টিকাঃ
৩৫. "ফাতহুল বারী": ১/১৬ হাফেয ইবনে হাযার আসকালানী।
৩৬. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: "ফাতহুল বারী": ১/১৮-১৯
৩৭. সহীহ বুখারী: ১/২, হাদীস নং ৩।