📄 ওহীর মূলকথা
ওহীর মাফহুম ও হাকীকতের উপর চিন্তা-গবেষণা করার জন্য প্রথমত জেনে রাখা আবশ্যক। وحی (ওহয়ন) ও ایحاء (ঈহাউন) আরবী ভাষার দু'টি শব্দ। শব্দ দু'টির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, দ্রুততার সাথে ইঙ্গিত করা। চাই সে ইঙ্গিত কোনো চিহ্নিত বস্তু দ্বারা হোক, চাই নিরর্থক ধ্বনি উচ্চারণ করার দ্বারা হোক, চাই কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করে হোক অথবা লিখিত কিংবা চিত্রাঙ্কণের মাধ্যমে হোক। প্রত্যেক অবস্থাতে আভিধানিকভাবে তার উপর এই শব্দ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়।
যেমন, পবিত্র আল-কুরআনে এই অর্থেই হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে- فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ مِنَ الْمِحْرَابِ فَأَوْحَى إِلَيْهِمْ أَن سَبِّحُوا بُكْرَةً وَعَشِيًّا অর্থ: 'অতঃপর সে কক্ষ হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট এলো এবং ইঙ্গিতে তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে বলল।'
এই আয়াতে أوحى ওহী শব্দের অর্থ করা হয়েছে "ইঙ্গিত" বা "ইশারা”। আর এটা স্পষ্ট যে, এ ধরনের ইশারা বা ইঙ্গিত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সম্বোধিত ব্যক্তির হৃদয়ে কোনো বিষয়ের জ্ঞান ঢেলে দেওয়া। এ জন্য ওহী ও ঈহাউন শব্দ দু'টি 'অন্তরে কোনো কিছু ঢেলে দেওয়া' বা 'আত্মস্থ' করার অর্থে ব্যবহার হতে থাকে। পবিত্র কুরআন মাজীদের বহু আয়াতে ওহী শব্দটিকে এই অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا 'তোমার প্রতিপালক মৌমাছির প্রতি এলহাম করেছেন যে, পাহাড়ে, বৃক্ষে আর উঁচু চালে বাসা তৈরি কর।'
এমনকি শয়তান অন্তরে যে ওয়াসওয়াসা বা কু-মন্ত্রণা দিয়ে থাকে তার জন্যও এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- وَكَذلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا شَيَاطِينَ الإِنْسِ وَالْجِنِّ يُوْحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ 'আর এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদেরকে, তারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ কথার কুমন্ত্রণা দেয়।'
পবিত্র কুরআন মাজীদে আরো ইরশাদ হয়েছে- وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُؤْحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ 'এবং শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্ররোচনা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদ করে।'
মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু ফেরেশতাদের প্রতি যে সম্বোধন করেন সেটাকেও ঈহাউন বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- اذْ يُوْحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ إِنِّي مَعَكُمْ 'আর যখন আপনার রব ফেরেশতাদেরকে এ সংবাদ দেন যে, আমি তোমাদের সাথে রয়েছি।'
নবী-রাসূল ব্যতীত অন্যান্য মানুষের অন্তরে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হয় সেটাকেও ওহী শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে- وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ 'আমি মূসার মায়ের অন্তরে ইঙ্গিতে নির্দেশ করলাম: শিশুটিকে তুমি স্তন্য দান করতে থাক।'
তবে ওহী শব্দের উপরোক্ত সবগুলো অর্থ আভিধানিক অর্থ। শরীয়তের পরিভাষায় এর সংজ্ঞা হলো- كلام الله المنزل على نبي من انبيائه “আল্লাহ প্রদত্ত এমন বার্তা, যা তাঁর কোনো নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।"
বস্তুত এখানে একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে, ওহী শব্দটি শরীয়তের পরিভাষায় এতই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কারো জন্য এখন আর তা প্রয়োগ করা বৈধ নয়। হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) বলেছেন, ওহী এবং ঈহাউন উভয়টি পৃথক পৃথক শব্দ। শব্দ দু'টির ব্যবহারের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ঈহাউন শব্দটির ব্যবহার আম বা ব্যাপক। নবী-রাসূল ছাড়াও অন্য কারো প্রতি ইশারা-ইঙ্গিত বা কারো অন্তরে কোনো কথা ঢেলে দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। কাজেই এই শব্দটি নবী ও অন্যান্য মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যবহার হয়। পক্ষান্তরে কেবল নবী-রাসূলগণের অন্তরে কোনো কথা ঢেলে দেওয়াকে ওহী বলা হয়। এ কারণেই পবিত্র কুরআনুল কারীমে ঈহাউন শব্দটি নবী-রাসূল ও সাধারণ মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। আর ওহী শব্দটি শুধু নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।
বস্তুত সারকথা হলো, "ওহী” এমন একটি মাধ্যম যার দ্বারা মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর কথা ও নির্দেশবাণী নিজের কোনো প্রিয় বান্দা ও রাসূলগণের প্রতি প্রেরণ করেন এবং সেই মনোনীত রাসূলের মাধ্যমে সমগ্র জাতির নিকট পৌঁছিয়ে দেন। আর ওহী যেহেতু মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু ও তাঁর বান্দার মধ্যবর্তী একটি ত্রুটিমুক্ত পবিত্র শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তা একমাত্র আম্বিয়ায়ে কেরামই শুধু প্রত্যক্ষ করে থাকেন, বিধায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ওহীর সঠিক হাকীকত অনুধাবন করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। অবশ্য ইহার প্রকারভেদ ও অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে এর সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। এখানে শুধু সেগুলোর উপরই আলোকপাত করা হবে।
টিকাঃ
১০. আয-যুবাইদী : "তাজুল আরূস" ১/৩৮৪, দারু লিবিয়া, বেনগাজি-১৩৮৬ হিজরী। আর-রাগিব (রহ.) রচিতঃ "আল-মুফরাদাত।"
৪. সূরা মারইয়াম: ১১
৫. সূরা নাহল: ৬৮
৬. সূরা আনআম: ১১২
৭. সূরা আনআম: ১২১
৮. সূরা আনফাল: ১২
৯. সূরা কাসাস: ৭
১০. "উমদাতুল কারী” ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৮, দারুত তাবাআ আল-আমেরা, ইস্তাম্বুল ১৩০৮ হিজরী। বদরুদ্দীন আল আইনী (রহ.) রচিত।
১১. হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) রচিত: "ফয়যুল বারী": ১/১৯, মাতবায়ে হিজাযী কায়রো ১৩৫৭ হিজরী।
📄 ওহীর শিক্ষা
মূলতঃ ওহীর মাধ্যমে বান্দাদেরকে ওইসব বিষয়ের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে যা তারা নিছক নিজেদের ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তির মাধ্যমে অর্জন করতে সক্ষম হয় না। সে বিষয়গুলো নিরেট যেমন ধর্মীয় বিধি-বিধান সংক্রান্ত হতে পারে, তেমনি হতে পারে পার্থিব প্রয়োজন সংক্রান্ত। নবী-রাসূলগণের প্রতি ওহী সাধারণত প্রথম প্রকারের হয়ে থাকে। তবে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী জাগতিক প্রয়োজনীয় বিষয়ও ওহীর মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। যেমন হযরত নূহ (আ.)-কে নৌযান তৈরির নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে- وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا 'আর তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার নির্দেশক্রমে নৌকা নির্মাণ কর।'
এর দ্বারা জানা গেল যে, তাঁকে পবিত্র ওহীর মাধ্যমে নৌযান তৈরির প্রকৌশলী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হযরত দাউদ (আ.)-কে লৌহবর্ম তৈরির প্রকৌশলী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। হযরত আদম (আ.)-কে বিশেষ বস্তুসমূহের জ্ঞানও ওহীর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এমনকি এক বর্ণনায় এমনও রয়েছে যে, সর্ব প্রথম চিকিৎসা বিজ্ঞানও ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে。
টিকাঃ
১২. সূরা হুদ: ৩৭
১৩. "আন-নিবরাস আলা শরহিল আকাইদ" পৃঃ ৪২৭-৪২৮, অমৃতস্বর ১৩১৮ হিজরী। আবদুল আযীয ফারহারী (রহ.) রচিত
📄 ওহী কাশফ ও ইলহাম প্রসঙ্গ
উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওহী একমাত্র নবী-রাসূলগণের সাথেই প্রযোজ্য। নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেউ আধ্যাত্মিকতার যত উঁচু মাকামেই অবস্থান করুক না কেন তাঁর কাছে কখনো ওহী আসতে পারে না। অবশ্য মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু কোনো কোনো সময় তাঁর খাছ খাছ বান্দাদেরকে বিশেষ পদ্ধতিতে কিছু কথা জানিয়ে থাকেন। এ পদ্ধতিকে ‘কাশ্ফ’ বা ‘ইলহাম’ বলা হয়। হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ.) কাশ্ফ ও ইলহামের মাঝে এই পার্থক্য নিরূপণ করেছেন যে, ‘কাশ্ফ’ ইন্দ্রিয় অনুভূতির সাথে সম্পর্ক রাখে। অর্থাৎ এর মাঝে কোনো বস্তু বা ঘটনা গোচরীভূত হওয়া। আর ‘ইলহাম’ সম্পর্ক রাখে অন্তরের সাথে। অর্থাৎ এতে কোনো বস্তু বা বিষয় গোচরীভূত হয় না। শুধু অন্তরে কোনো বিষয় প্রবিষ্ট করা হয়। এ কারণেই কাশফ অপেক্ষা ‘ইলহাম’ অধিক বিশুদ্ধ হয়ে থাকে।
প্রকাশ্যত ওহীর ষষ্ঠ প্রকার তথা 'অন্তরে ঢেলে দেওয়া' ইলহামের বেশি নিকটবর্তী। কারণ উভয়টার পদ্ধতি এক যে, অন্তরে কোনো কথা বা বিষয় ঢেলে দেওয়া হয়। তবে উভয়ের মাঝে প্রকৃত পার্থক্য এই যে, ওহী শুধুমাত্র নবী-রাসূলগণের নিকটই আসে এবং সাথে সাথে এ কথাও অবগত হয়ে যায় যে, কে এটাকে অন্তরে ঢেলে দিল? কেননা পূর্বে উল্লিখিত 'মুসতাদরাক হাকেমে'র বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, "রুহুল কুদ্দুস” [পবিত্র আত্মা] আমার অন্তরে এ কথা ঢেলে দিয়েছেন।”
পক্ষান্তরে ইলহামের মাঝে কে ঢেলে দিল তা নির্ণয় করা যায় না। ব্যস, শুধু এটুকু অনুভব হয় যে, অন্তরে এমন একটি কথা এসেছে যা ইতোপূর্বে ছিল না। এপ্রেক্ষিতে নবী-রাসূলগণের ওহী শতভাগ সুনিশ্চিত থাকে এবং তা অনুসরণ করা ফরয। পক্ষান্তরে আল্লাহর বিশেষ বান্দা বা বুযুর্গের ইলহাম ইয়াকীনযোগ্য নয়। তাই এটা যেমন দ্বীনি বিষয়ের কোনো দলীল হতে পারে না, তেমনি এর অনুসরণ করাও ফরয নয়। এমনকি কাশফ, ইলহাম বা স্বপ্নযোগে যদি এমন কোনো বিষয়ের জ্ঞান লাভ হয় যা কুরআন-সুন্নাহর প্রসিদ্ধ বিধান পরিপন্থী, তাহলে সে অনুযায়ী আমল করা কারো মতেই জায়েয নেই।
টিকাঃ
৪২. "ফয়যুল বারী": ১/১৯
৪৩. "আল-ওহীউল মুহাম্মাদী" পৃ: ৩৮, রশীদ রেজা রচিত: মাতবাআ আল-মানার, মিসর ১৩৫৪ হিজরী।
৪৪. আশ্-শাতেবীঃ "আল-ইতেসাম" ১/৩৫১, মাতবাআ আল-মানার, মিসর-১৩৩১ হিজরী।
📄 মাতলূ ও গাইরে মাতলূ ওহী
নবী কারীম (সা.)-এর উপর যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছে তা দুই প্রকারের ছিল। প্রথমতঃ পবিত্র কুরআনুল কারীমের আয়াত। যার শব্দ ও অর্থ উভয়ই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। যা সর্বকালের জন্য কুরআনুল কারীমে এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে এর একটি নোক্তা বা বিন্দু-বিসর্গও পরিবর্তন করা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং হবেও না। এই ওহীকে উলামায়ে কেরামের পরিভাষায় (وحی متلو) “ওহীয়ে মাতলু” বলা হয়। অর্থাৎ ওই ওহী, যা তেলাওয়াত বা পাঠ করা হয়। দ্বিতীয়তঃ ওই ওহী যা পবিত্র কুরআনুল কারীমের অংশ হয়নি; তবে এর মাধ্যমে রাসূলে আকরাম (আলাইহিস সালাম)-কে বহু হুকুম-আহকাম দেওয়া হয়েছে।
এই ওহীকে (وحی غیر متلو) "ওহীয়ে গাইরে মাতলু” বলা হয়। অর্থাৎ এমন ওহী যা কুরআনের ন্যায় পাঠ করা হয় না। সাধারণত ওহীয়ে মাতলুকে কুরআনুল কারীমে ইসলামী আকীদা বিষয়ক মূলনীতি ও বুনিয়াদী শিক্ষার ব্যাখ্যা প্রদানের উপর ক্ষান্ত করা হয়েছে। আর সেসব শিক্ষার বিস্তারিত বর্ণনা ও শাখাগত মাসআলা-মাসায়িল অধিকহারে ওহীয়ে গাইরে মাতলু দ্বারা প্রদান করা হয়েছে। তো এই ওহী অর্থাৎ “ওহীয়ে গাইরে মাতলু” যা বিশুদ্ধ হাদীসরূপে সংরক্ষিত আছে। এগুলোর মূল বিষয়টা রাসূলে খোদা (সা.)-এর উপর ওহীর মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছে। তবে তা ব্যক্ত করার জন্য যে শব্দচয়ন করা হয়েছে, তা তাঁর নিজস্ব। এক হাদীসে নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেন- أوتيت القرآن ومثله معه 'আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে এবং এর সাথে এর মতোই আরো দেওয়া হয়েছে।'
এখানে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সাথে যে "অন্যান্য শিক্ষা”-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এই 'ওহীয়ে গাইরে মাতলু।'
ইসলামী বিধি-বিধানের আংশিক ও শাখাগত বিষয়াবলীর বিস্তারিত বর্ণনা যেহেতু গাইরে মাতলু ওহীর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। তাই যারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করা সত্ত্বেও ইসলামী বিধি-বিধান উপেক্ষা করে স্বাধীন জীবন যাপন করতে আগ্রহী, তারা কিছু দিন থেকে এই সুর তুলেছে যে, 'ওহীয়ে গাইরে মাতলু' বলতে কিছু নেই। মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর উপর যত ওহী অবতীর্ণ হয়েছে সবগুলো পবিত্র কুরআনুল কারীমে সংরক্ষিত আছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের বাইরে যেসব বিধান রাসূলে আকরাম (সা.) দিয়েছেন, তা নিছক একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। যা শুধু সে যুগের মুসলমানদের জন্যই পালনীয় ছিল। বর্তমান যুগে তা পালন করা আবশ্যকীয় নয়! বস্তুতঃ এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও বাতিল।
স্বয়ং পবিত্র কুরআনুল কারীমের একাধিক আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মহান আল্লাহ পাক প্রদত্ত ওহী শুধু কুরআনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং কুরআনের আয়াতের বাইরেও ওহীর মাধ্যমে নবী কারীম (সা.)-কে অনেক বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ দাবীর সমর্থনে নিম্নে কুরআনে কারীমার আয়াত দলীল হিসেবে উপস্থাপন করা হলো-
وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ
'আর যে কিবলার উপর তুমি ছিলে, তাকে কেবল এ জন্যই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে আমি জেনে নেই যে, কে রাসূলকে অনুসরণ করে এবং কে তার পেছনে ফিরে যায়।'
প্রত্যেক মুসলমান এ কথা জানে যে, মদীনায় থাকা অবস্থায় নবী কারীম (সা.) নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত “বাইতুল মুকাদ্দাস”-এর দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছিলেন। অতঃপর যখন পুনরায় বাইতুল্লাহ'র দিকে মুখ করে সালাত আদায়ের বিধান আসল, তখন এই আয়াত নাযিল হয়। যার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, 'আমি বাইতুল মাকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায়ের নির্দেশ এ জন্যই দিয়েছিলাম, যাতে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কারা ওই নির্দেশ পালন করে আর কারা অস্বীকার করে?' এখানে দেখার বিষয় হলো, এ আয়াতে মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করার নির্দেশ দেওয়াটাকে নিজের দিকে সম্বন্ধ করেছেন। যার অর্থ হচ্ছে, এই নির্দেশটাও আমিই দিয়েছিলাম। এখন যদি পবিত্র কুরআনুল কারীমের ‘আল-হামদু’ থেকে শুরু করে ‘আন-নাস’ পর্যন্ত সবটুকু অধ্যয়ন করা হয়, তাহলে কোথাও এ নির্দেশ পাওয়া যাবে না যে, “তোমরা বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় কর।” এ থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু ঐ নির্দেশটি এমন ওহী দ্বারা দিয়েছেন, যা পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোথাও উল্লেখ নেই। আর সেই ওহীর নামই হচ্ছে, ওহীয়ে গাইরে মাতলু।
কালামে পাকের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে- فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَن بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنبَأَكَ هَذَا قَالَ نَبَّأَنِي الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ 'স্মরণ কর- যখন নবী তার স্ত্রীদের কোন একজনকে গোপনে একটি কথা বলেছিল। অতঃপর সে স্ত্রী যখন তা (অন্য একজনকে) জানিয়ে দিল, তখন আল্লাহ এ ব্যাপারটি নবীকে জানিয়ে দিলেন। তখন নবী (তার স্ত্রীর কাছে) কিছু কথার উল্লেখ করল আর কিছু কথা ছেড়ে দিল। নবী যখন তা তার স্ত্রীকে জানাল তখন সে বলল, 'আপনাকে এটা কে জানিয়ে দিল?" নবী বলল, "আমাকে জানিয়ে দিলেন যিনি সর্বজ্ঞাতা, ওয়াকিফহাল।"
এই আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো যে, নবী কারীম (সা.)-এর জনৈকা সহধর্মিনী একটি কথা রাসূলে খোদা (সা.)-এর থেকে গোপন করতে চেয়েছিলেন। মহান আল্লাহ পাক ওহীর মাধ্যমে নবীজীকে ওই কথাটি জানিয়ে দিলেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে এ কথাটা কে জানিয়ে দিল? তিনি বললেন, মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহই আমাকে কথাটি জানিয়ে দিয়েছেন। এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ওই গোপন বা লুকানো কথাটি আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন ওহীর মাধ্যমে রাসূলে আকরাম (সা.)-কে জানিয়ে দিয়েছেন। অথচ পুরো কুরআনুল কারীমের কোথাও তা উল্লেখ নেই। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এই সংবাদটা তাঁকে "ওহীয়ে গাইরে মাতলু”-এর মাধ্যমেই দেওয়া হয়েছিল।
পবিত্র কুরআনের আরো বহু আয়াত দ্বারা "ওহীয়ে গাইরে মাতলু”-এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে এখানে শুধু দু'টি আয়াতের উপরই ক্ষান্ত করা হলো। সত্যানুসন্ধানই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে এই দু'টি আয়াতই অনস্বীকার্যভাবে এ কথা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট যে, বস্তুত "ওহীয়ে গাইরে মাতলু”ও ওহীর আরেকটি প্রকার। ওহীয়ে মাতলু-এর ন্যায় তা সুনিশ্চিত এবং অনুসরণ করা ওয়াজিব।
টিকাঃ
৪৫. "আল ইতকান" : ১/৪৫
৪৬. সূরা বাকারা: ১৪৩
৪৭. সূরা তাহরীম: ৩