📘 উলুমুল কুরআন 📄 ওহী ও উহার হাকীকত

📄 ওহী ও উহার হাকীকত


মহা পবিত্র আল-কুরআনুর কারীম যেহেতু দু'জাহানের সর্দার নবী কারীম (সা)-এর উপর ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই ওহী সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা অত্যাবশ্যকীয়।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 ওহী প্রয়োজনীয়তা

📄 ওহী প্রয়োজনীয়তা


প্রত্যেকটি মুসলমানই এ বিষয় সম্পর্কে সম্মক অবগত যে, মহান আল্লাহ তা'আলা মানুষকে পরীক্ষার জন্য এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তার উপর বিশেষ কিছু দায়িত্ব অর্পণ করে গোটা বিশ্বকে তার সেবায় নিয়োজিত করেছেন। তাই পৃথিবীতে আগমনের পর মানুষের জন্য দু'টি কাজ অবধারিত হয়ে যায়।

প্রথমতঃ তার চারপাশে এ বিশ্বের যা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। আর দ্বিতীয়তঃ এ বিশ্বের সৃষ্টরাজিকে ব্যবহার করতে গিয়ে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের বিধি-নিষেধকে সামনে রাখা। এবং এমন কোনো কাজ না করা, যা মহান আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আর উল্লেখিত দায়িত্ব দু'টি সম্পাদনের জন্য মানুষের জ্ঞান অর্জন করা অত্যাবশ্যক। কারণ এ বিশ্ব জগতের হাকীকত এবং এ সকল সৃষ্টরাজির কোন্টির কি বৈশিষ্ট্য ও এগুলো দ্বারা উপকৃত হবার পদ্ধতি কি? যতক্ষণ পর্যন্ত এ ব্যাপারে জ্ঞান লাভ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ পৃথিবীর কোনো বস্তুকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। অনুরূপভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এ কথা না জানবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি কোন্ পথে? তিনি কোন্ কাজটিকে পছন্দ করেন আর কোন্টিকে অপছন্দ করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি মোতাবেক কাজ করা অসম্ভব।

প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করার সাথে সাথে তার মধ্যে এমন তিনটি বস্তু দান করে দিয়েছেন যেগুলোর মাধ্যমে সে উপরোক্ত বিষয়গুলোর জ্ঞান লাভ করতে পারে। প্রথমত হচ্ছে: মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তি অর্থাৎ চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, নাসিকা ও ত্বক। দ্বিতীয়ত হচ্ছে: সকল মেধা শক্তি ও বিবেক। তৃতীয়ত হচ্ছে: ওহী। যেমন, মানুষ অনেক বিষয়ের জ্ঞান পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে অর্জন করে থাকে। আবার অনেক বিষয়ের জ্ঞান মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ করে থাকে। আর যে সকল বিষয়ের জ্ঞান এ মাধ্যম দু'টি দ্বারা অর্জন করা যায় না, সেগুলোর জ্ঞান ওহীর মাধ্যমে দান করা হয়।

বস্তুত জ্ঞান-অর্জনের উপরোক্ত তিনটির মাধ্যমের ক্রমধারা কিছুটা এমন যে, প্রত্যেকটির একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা ও বিশেষ পরিধি ও পরিমণ্ডল রয়েছে। এ সীমা ও পরিধির বাইরে মাধ্যমগুলো নিষ্ক্রিয়। যেমন, যেসকল বস্তুর জ্ঞান মানুষ পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা অর্জন করে থাকে নিছক মেধাশক্তি দ্বারা সেগুলোর জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, যেমন এ মুহূর্তে আমার সামনে একজন লোক বসে আছে। আমার দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি যে, সে একজন মানুষ। আমার চোখই আমাকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তার রঙ ফর্সা, কপাল প্রশস্ত, চুলগুলো কালো, ঠোঁট দু'টো হালকা এবং চেহারা সুন্দর। আর যদি এ বিষয়গুলোর জ্ঞান নিজের পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তি বাদ দিয়ে শুধু মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ করার চেষ্টা করা হয়, যেমন চোখ দু'টি বন্ধ করে ওই ব্যক্তির গায়ের রঙ, শারীরিক গঠন-প্রকৃতি ও সমগ্র দেহের কথা কল্পনা করা হয় তাহলে আদৌ সে এসব বিষয়ের জ্ঞান লাভ করতে পারবে না।

ঠিক একইভাবে যেসব বস্তুর জ্ঞান মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ হয়, সেগুলো নিছক পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। যেমন, আলোচিত ব্যক্তির ব্যাপারে আমার এ কথাও জানা আছে যে, তার কোনো না কোনো একজন "মা" অবশ্যই আছেন। সাথে সাথে এ কথাও আমার জানা আছে যে, তার একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। যদিও এ মুহূর্তে আমার সামনে না আছে তার মা আর না দেখি আমি তার সৃষ্টিকর্তাকে। কিন্তু আমার আকল ও মেধাশক্তি আমাকে বলে দিচ্ছে যে, এ ব্যক্তি নিজে নিজেই সৃষ্টি হতে পারে না। আমি যদি এখানে আমার বিবেক ও মেধাশক্তিকে বাদ দিয়ে নিজের চোখ বা দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে তার মা ও তার সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে বেড়াই, তাহলে এ বস্তুর জ্ঞান অর্জন করা কখনো করোপক্ষে সম্ভব হবে না। কেননা তাকে সৃষ্টি করার দৃশ্য এ মুহূর্তে আমার চোখের সামনে আসা সম্ভবপর নয়。

মোটকথা, যে পর্যন্ত পঞ্চইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক রয়েছে, সে পর্যন্ত বিবেক ও মেধাশক্তি কোনো দিক-নির্দেশনা দিবে না। যেখানে গিয়ে পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তি অক্ষম হয়ে পড়ে, সেখান থেকে বিবেক ও মেধাশক্তির কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু এই বিবেক ও মেধাশক্তির দিক-নির্দেশনা ও নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নয়। বরং নির্দিষ্ট একটি সীমায় গিয়ে সে থেমে যায়। আবার এমন অনেক বস্তু আছে যেগুলোর জ্ঞান না পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে অর্জন করা যায় আর না বিবেক ও মেধাশক্তি দ্বারা। যেমন, সেই আলোচিত ব্যক্তির ব্যাপারে আকল ও মেধাশক্তি তো বলে দিয়েছে যে তার একজন স্রষ্টা রয়েছেন, কিন্তু ওই ব্যক্তিকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ থেকে তার উপর কি কি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে? তার কোন্ কাজ মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পছন্দনীয় আর কোন্ কাজ তাঁর অপছন্দনীয়? ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তি যৌথভাবে প্রচেষ্টা চালালেও এসব প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না। মানুষকে এই প্রশ্নাবলীর জবাব দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহ জাল্লা শানু যে পন্থা অবলম্বন করেছেন তার নামই হলো “ওহী”।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ওহী হচ্ছে মানুষের জ্ঞান অর্জনের সর্বোচ্চ মাধ্যম। যা তার জীবনের সাথে সম্পৃক্ত সেসব প্রশ্নাবালীর জবাব দিয়ে থাকে, ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তির মাধ্যমে যেগুলো সমাধান সম্ভব হয় না। তাই ওহীর জ্ঞান অর্জন করা ছাড়া মানুষের কোনো বিকল্প নেই。

উল্লিখিত ব্যাখ্যা বিবরণ দ্বারা এ কথাও পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মানুষের দিক নির্দেশনার জন্য কেবল ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তিই যথেষ্ট নয়; বরং তার হেদায়াত ও দিক-নির্দেশনার জন্য মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রদত্ত ওহীর জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য। আর যেহেতু ওহীর দিক-নির্দেশনার সূচনাই হয় সেখান থেকে, যেখানে বিবেক ও মেধাশক্তি অকেজো, কাজেই ওহীর প্রত্যেকটি বিষয়ই বিবেক ও মেধাশক্তি দ্বারা উপলব্ধি করা যাবে এমনটি জরুরি নয়। যেভাবে কোনো বস্তুর রঙ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা বিবেক ও মেধাশক্তির কাজ নয়; বরং ইন্দ্রিয় শক্তিই তার জন্য যথেষ্ট। তদ্রূপ দ্বীনি আকীদাগত অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোর জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি শুধুমাত্র ওহীর উপর। কাজেই সেগুলো উপলব্ধি করার জন্য শুধু বিবেক ও মেধাশক্তির উপরই নির্ভর করা সমীচীন নয়。

টিকাঃ
৯. "তামহীদু আবী শাকুর সালেমী" পৃঃ ৬৮-৭২ এখানে ওহীর প্রয়োজনীয়তার উপর খুবই সংক্ষেপে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন- এবং মাওলানা শামসুল হক আফগানী (রহ.) রচিত "উলূমুল কুরআন" পৃ: ৩-১৮, প্রকাশনা বিভাগ, মাদরাসা ফারুকিয়া ভাওয়ালপুর, ১৩৮৯ হিজরী।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 ওহীর মূলকথা

📄 ওহীর মূলকথা


ওহীর মাফহুম ও হাকীকতের উপর চিন্তা-গবেষণা করার জন্য প্রথমত জেনে রাখা আবশ্যক। وحی (ওহয়ন) ও ایحاء (ঈহাউন) আরবী ভাষার দু'টি শব্দ। শব্দ দু'টির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, দ্রুততার সাথে ইঙ্গিত করা। চাই সে ইঙ্গিত কোনো চিহ্নিত বস্তু দ্বারা হোক, চাই নিরর্থক ধ্বনি উচ্চারণ করার দ্বারা হোক, চাই কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করে হোক অথবা লিখিত কিংবা চিত্রাঙ্কণের মাধ্যমে হোক। প্রত্যেক অবস্থাতে আভিধানিকভাবে তার উপর এই শব্দ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়।

যেমন, পবিত্র আল-কুরআনে এই অর্থেই হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে- فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ مِنَ الْمِحْرَابِ فَأَوْحَى إِلَيْهِمْ أَن سَبِّحُوا بُكْرَةً وَعَشِيًّا অর্থ: 'অতঃপর সে কক্ষ হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট এলো এবং ইঙ্গিতে তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে বলল।'

এই আয়াতে أوحى ওহী শব্দের অর্থ করা হয়েছে "ইঙ্গিত" বা "ইশারা”। আর এটা স্পষ্ট যে, এ ধরনের ইশারা বা ইঙ্গিত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সম্বোধিত ব্যক্তির হৃদয়ে কোনো বিষয়ের জ্ঞান ঢেলে দেওয়া। এ জন্য ওহী ও ঈহাউন শব্দ দু'টি 'অন্তরে কোনো কিছু ঢেলে দেওয়া' বা 'আত্মস্থ' করার অর্থে ব্যবহার হতে থাকে। পবিত্র কুরআন মাজীদের বহু আয়াতে ওহী শব্দটিকে এই অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا 'তোমার প্রতিপালক মৌমাছির প্রতি এলহাম করেছেন যে, পাহাড়ে, বৃক্ষে আর উঁচু চালে বাসা তৈরি কর।'

এমনকি শয়তান অন্তরে যে ওয়াসওয়াসা বা কু-মন্ত্রণা দিয়ে থাকে তার জন্যও এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- وَكَذلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا شَيَاطِينَ الإِنْسِ وَالْجِنِّ يُوْحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ 'আর এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদেরকে, তারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ কথার কুমন্ত্রণা দেয়।'

পবিত্র কুরআন মাজীদে আরো ইরশাদ হয়েছে- وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُؤْحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ 'এবং শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্ররোচনা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদ করে।'

মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু ফেরেশতাদের প্রতি যে সম্বোধন করেন সেটাকেও ঈহাউন বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- اذْ يُوْحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ إِنِّي مَعَكُمْ 'আর যখন আপনার রব ফেরেশতাদেরকে এ সংবাদ দেন যে, আমি তোমাদের সাথে রয়েছি।'

নবী-রাসূল ব্যতীত অন্যান্য মানুষের অন্তরে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে জ্ঞান ঢেলে দেওয়া হয় সেটাকেও ওহী শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে- وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ 'আমি মূসার মায়ের অন্তরে ইঙ্গিতে নির্দেশ করলাম: শিশুটিকে তুমি স্তন্য দান করতে থাক।'

তবে ওহী শব্দের উপরোক্ত সবগুলো অর্থ আভিধানিক অর্থ। শরীয়তের পরিভাষায় এর সংজ্ঞা হলো- كلام الله المنزل على نبي من انبيائه “আল্লাহ প্রদত্ত এমন বার্তা, যা তাঁর কোনো নবীর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।"

বস্তুত এখানে একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে, ওহী শব্দটি শরীয়তের পরিভাষায় এতই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কারো জন্য এখন আর তা প্রয়োগ করা বৈধ নয়। হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) বলেছেন, ওহী এবং ঈহাউন উভয়টি পৃথক পৃথক শব্দ। শব্দ দু'টির ব্যবহারের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ঈহাউন শব্দটির ব্যবহার আম বা ব্যাপক। নবী-রাসূল ছাড়াও অন্য কারো প্রতি ইশারা-ইঙ্গিত বা কারো অন্তরে কোনো কথা ঢেলে দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। কাজেই এই শব্দটি নবী ও অন্যান্য মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যবহার হয়। পক্ষান্তরে কেবল নবী-রাসূলগণের অন্তরে কোনো কথা ঢেলে দেওয়াকে ওহী বলা হয়। এ কারণেই পবিত্র কুরআনুল কারীমে ঈহাউন শব্দটি নবী-রাসূল ও সাধারণ মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। আর ওহী শব্দটি শুধু নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।

বস্তুত সারকথা হলো, "ওহী” এমন একটি মাধ্যম যার দ্বারা মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর কথা ও নির্দেশবাণী নিজের কোনো প্রিয় বান্দা ও রাসূলগণের প্রতি প্রেরণ করেন এবং সেই মনোনীত রাসূলের মাধ্যমে সমগ্র জাতির নিকট পৌঁছিয়ে দেন। আর ওহী যেহেতু মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু ও তাঁর বান্দার মধ্যবর্তী একটি ত্রুটিমুক্ত পবিত্র শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তা একমাত্র আম্বিয়ায়ে কেরামই শুধু প্রত্যক্ষ করে থাকেন, বিধায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ওহীর সঠিক হাকীকত অনুধাবন করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। অবশ্য ইহার প্রকারভেদ ও অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে এর সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। এখানে শুধু সেগুলোর উপরই আলোকপাত করা হবে।

টিকাঃ
১০. আয-যুবাইদী : "তাজুল আরূস" ১/৩৮৪, দারু লিবিয়া, বেনগাজি-১৩৮৬ হিজরী। আর-রাগিব (রহ.) রচিতঃ "আল-মুফরাদাত।"
৪. সূরা মারইয়াম: ১১
৫. সূরা নাহল: ৬৮
৬. সূরা আনআম: ১১২
৭. সূরা আনআম: ১২১
৮. সূরা আনফাল: ১২
৯. সূরা কাসাস: ৭
১০. "উমদাতুল কারী” ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৮, দারুত তাবাআ আল-আমেরা, ইস্তাম্বুল ১৩০৮ হিজরী। বদরুদ্দীন আল আইনী (রহ.) রচিত।
১১. হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) রচিত: "ফয়যুল বারী": ১/১৯, মাতবায়ে হিজাযী কায়রো ১৩৫৭ হিজরী।

📘 উলুমুল কুরআন 📄 ওহীর শিক্ষা

📄 ওহীর শিক্ষা


মূলতঃ ওহীর মাধ্যমে বান্দাদেরকে ওইসব বিষয়ের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে যা তারা নিছক নিজেদের ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তির মাধ্যমে অর্জন করতে সক্ষম হয় না। সে বিষয়গুলো নিরেট যেমন ধর্মীয় বিধি-বিধান সংক্রান্ত হতে পারে, তেমনি হতে পারে পার্থিব প্রয়োজন সংক্রান্ত। নবী-রাসূলগণের প্রতি ওহী সাধারণত প্রথম প্রকারের হয়ে থাকে। তবে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী জাগতিক প্রয়োজনীয় বিষয়ও ওহীর মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। যেমন হযরত নূহ (আ.)-কে নৌযান তৈরির নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে- وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا 'আর তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার নির্দেশক্রমে নৌকা নির্মাণ কর।'

এর দ্বারা জানা গেল যে, তাঁকে পবিত্র ওহীর মাধ্যমে নৌযান তৈরির প্রকৌশলী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হযরত দাউদ (আ.)-কে লৌহবর্ম তৈরির প্রকৌশলী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। হযরত আদম (আ.)-কে বিশেষ বস্তুসমূহের জ্ঞানও ওহীর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এমনকি এক বর্ণনায় এমনও রয়েছে যে, সর্ব প্রথম চিকিৎসা বিজ্ঞানও ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে。

টিকাঃ
১২. সূরা হুদ: ৩৭
১৩. "আন-নিবরাস আলা শরহিল আকাইদ" পৃঃ ৪২৭-৪২৮, অমৃতস্বর ১৩১৮ হিজরী। আবদুল আযীয ফারহারী (রহ.) রচিত

ফন্ট সাইজ
15px
17px