📄 এ পরিচ্ছেদের সারাংশ
এ পরিচ্ছেদে দু'টো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এক, হাকীকত, দুই, সংশয় নিরসনকল্পে জবাব। প্রথমাংশের আলোচ্য বিষয় কোরআনের হাকীকত ও বিষয়বস্তু, তৎসম্পর্কিত নানান বিষয় ও ইতিহাস, দুর্বোধ্য কিছু বিষয়ালোচনা, কোরআনের সত্যতার ব্যাপারে অলৌকিক বৈশিষ্ট্য সমূহ ও আত্মপ্রশান্তিদায়ক বিষয়াদির উল্লেখ ও诟অপবাদের জবাব-প্রদান ইত্যাদি।
এতে আলোচনা করা হয়েছে কোরআনের নামসমূহ এবং সেগুলোর সার্থকতা নিয়ে। এতে কোরআনের নাম ৫৫ থেকে ৯০টি পর্যন্ত বর্ণিত হওয়ার হাকীকত/কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। তবে তার আসল নাম গিয়ে দাঁড়ায় মোট ৫টিতে, যথাঃ আল-কোরআন, আল-ফোরকান, আয-যিকর, আল-কিতাব, আত-তানযীল। পক্ষান্তরে গুণবাচক নামগুলোকে আসল নামের সাথে একত্রিত করায় সে সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় অতি উচ্চে।
অতঃপর তিনি কোরআন শব্দ-বিশ্লেষণের পাশাপাশি তার হেকমতও তুলে ধরেন। এই কিতাব হচ্ছে এমন, যাকে কখনও বাতিল দাবিয়ে রাখতে পারবে না। বরং শত বিরোধিতা সত্ত্বেও তা বারবার পঠিত হবে, যার দিকে ইঙ্গিত করে "আল-কোরআন" নামক শব্দটি।
অতঃপর আলোচনায় এসেছে ওহীর হাকীকত, বা পরিচয়, তার প্রয়োজনীয়তা ও শব্দের বিশ্লেষণ এবং তার শিক্ষা। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ওহী সাধারণত দ্বীনী প্রয়োজন মেটাতেই আগমন করে থাকে। তবে তা প্রয়োজনবোধে দুনিয়াবি অনেক কিছুও শিক্ষা দেয়।
তারপর আলোচনা করা হয়েছে ওহী ও তার প্রকার এবং তার নাযিলগত প্রকারভেদ নিয়ে। মূল ওহী তিন প্রকার, যথাঃ ১. আত্মিক ওহী। ২. সরাসরি আল্লাহর কালাম। ৩. ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রেরিত ওহী। এবং নাযিলের ক্ষেত্রে ওহীর প্রকারভেদ প্রকার, যথাঃ একঃ ঘণ্টাধ্বনির ন্যায়। দুইঃ মানবাকৃতিতে ফিরিশতার আগমন। তিনঃ স্বরূপ আকৃতিতে ফিরিশতা-আগমন। চারঃ সত্য স্বপ্ন। পাঁচঃ আল্লাহর কালাম। ছয়ঃ অন্তরে বার্তা প্রেরণ।
এর অধীনে তিনি ওহী এবং ইলহামের ব্যাপারে পার্থক্যকারী বক্তব্য রেখেছেন, যা অতি উপকারী। নবী-রাসূলগণের অন্তরে প্রেরিত পয়গামের ব্যাপারে তারা নিশ্চিত থাকেন কার পক্ষ থেকে এই কথা ঢালা হয়েছে, পক্ষান্তরে ওলী-আওলিয়ারা এটা নিশ্চিত হন না যে, এর প্রেরক কে। যার কারণে নবীগণের ইলহাম-পালন ফরজ হলেও ওলী আউলিয়াদেরটা সে পর্যায়ে পৌঁছে না।
এরপর তিনি আলোচনা করেন উম্মতের নিকট প্রেরণকৃত ওহীর দু'প্রকার নিয়ে, তথা মাতলু, বা পঠিত এবং গায়রে মাতলু, বা অপঠিত। অতঃপর তিনি সে সকল লোকদের বক্তব্য খণ্ডন করেছেন যারা গায়রে মাতলু ওহীকে শরীয়ত মানতে রাজী নয়। সেটিকে তারা কেবল একজন রাষ্ট্রপতির আদেশ-নিষেধ হিসেবে গণ্য করতে চান। সেই সম্প্রদায়ের দর্শন খণ্ডনে তিনি তুলে ধরেন হাদীসের প্রামাণিকতার দলীল-প্রমাণ। এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা নিয়ে আসেন।
অতঃপর পশ্চিমা ধারায় প্রভাবিত ব্যক্তিবর্গ ওহীর অনুধাবন নিজেদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে এতে সংশয় রাখেন, অথচ ওহী আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম) ব্যতীত পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা কারও পক্ষে সম্ভবও নয়! আবার কেহ কেহ সরাসরি একে কিচ্ছা-কাহিনী বলে উল্লেখ করে ফেলেন। এই আধুনিক বিজ্ঞানের এ যুগে তার আলোচনা করতে লজ্জাবোধ তো সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে (নাউজুবিল্লাহ)! এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে সংকলক যুক্তিনির্ভর আলোচনা এনে দিলের অস্থিরতা দূর করে দিতে চেষ্টা করেছেন।
বিশেষ করে আত্মিক ওহী, যার মধ্যে ইলহাম প্রবিষ্ট, সে ব্যাপারে আধুনিক বিজ্ঞান কর্তৃক আবিষ্কৃত Hypnotism এর উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোধগম্য করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষ যদি অন্য মানুষের অন্তরে নিজের কথা ঢেলে দিতে পারে, তবে মহান "রাব্ব” কি পারবেন না! অবশ্যই পারবেন। নিম্নে এ পরিচ্ছেদের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হলো:
📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমের নাম ও নামকরণের তাৎপর্য
আল্লামা আবুল মাআলী (রহ.) তাঁর স্বীয় কিতাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমের ৫৫টি নাম উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ আবার পবিত্র কুরআনুল কারীমের নাম ৯০-এর চেয়েও অধিকের কথা বলেছেন। বস্তুত তাঁরা পবিত্র কুরআনুল কারীমের সিফাত বা গুণগত নামসমূহ যেমন- মাজীদ, কারীম, ইত্যাদিকেও আসল নাম গণনা করত এগুলোর সংখ্যা ৯০ পর্যন্ত দাঁড় করিয়েছেন। অন্যথায় প্রকৃত অর্থে পবিত্র কুরআনুল কারীমের নাম সর্বমোট ৫টি। যথা- ১. আল-কুরআন। ২. আল-ফুরকান। ৩. আয-যিক্র। ৪. আল-কিতাব। ৫. আত্-তানযীল।
কেননা পবিত্র কুরআনুল কারীম স্বয়ং ৫টি নামে নিজের পরিচয় দিয়েছে। এ সকল নামের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নাম হলো "আল কুরআন”। এমনকি স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনই একষট্টি স্থানে নিজের কালামকে এ নামেই পরিচয় দিয়েছেন।
মূলত উৎসগত দিক থেকে "কুরআন” শব্দটি قَرَأَ يَقْرَأُ থেকে নির্গত। যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে একত্রিত করা। পরবর্তীতে এ শব্দটি 'পাঠ করা' অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে। কেননা, পাঠ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অক্ষর ও শব্দমালাকে একত্রিত করতে হয়। قَرَأَ يَقْرَأُ এর মাসদার বা মূল উৎস কিরাআতুন ব্যতীত কুরআন শব্দেও ব্যবহৃত হয়। যেমন মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন- إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ 'নিশ্চয়ই এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমার দায়িত্বে।'
আর আরবী ভাষায় মাসদার কখনো কখনো ইসমে মাফউল (Past Participle) এর অর্থে ব্যবহার করা হয়। আর এই অর্থেই আল্লাহর কালামকে "কুরআন” বলা হয়। 'পঠিত কিতাব।'
পবিত্র কুরআনুল কারীমকে "কুরআন” বলে নামকরণের অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, মূলত আরবের কাফের সম্প্রদায়ের বক্তব্যকে প্রতিহত করার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এই গ্রন্থকে "কুরআন” বলে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা তারা বলত- لا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ 'কাফিরেরা বলেঃ তোমরা এই কুরআন শ্রবণ করনা এবং তা আবৃত্তি কালে শোরগোল সৃষ্টি কর যাতে তোমরা জয়ী হতে পার।'
এখানে কাফেরদের প্রত্যাখ্যানমূলক শব্দের বিপরীতে "কুরআন” নামকরণ করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের দাওয়াতকে এই ধরণের হীন আওয়াজ দ্বারা দাবিয়ে রাখা যাবে না। বস্তুত এই কিতাব পাঠ করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত পাঠ করা হবে। আর একারণেই এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, সমগ্র বিশ্বে পবিত্র কুরআনুল কারীমই হচ্ছে সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ।
মহা পবিত্র আল-কুরআনুল কারীমের পারিভাষিক সংজ্ঞা এভাবে করা হয়ে থাকে- المنزل على الرسول المكتوب في المصاحف المنقول الينا نقلا منواترا بلا شبهة অর্থাৎ 'মহান আল্লাহর সেই মহাবাণী যা মুহাম্মদ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে, মাসাহিফের মধ্যে লিপিবদ্ধ রয়েছে, এবং সন্দেহাতীতভাবে ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের কাছে পৌঁছেছে।'
প্রকাশ থাকে যে, এ সংজ্ঞাটি সকল আহলে ইলমের সর্বসম্মত সংজ্ঞা। এতে কারো কোনো দ্বিমত নেই。
টিকাঃ
১. আবুল মাআলী হলো তাঁর উপনাম। পূর্ণনাম আযীযি ইবনে আবদুল মালিক। উপাধি 'শাইযালা'। তিনি হিজরী পঞ্চম শতকের শাফেঈ মাযহাব অনুসারী একজন বিজ্ঞ আলেম। তাঁর রচিত গ্রন্থ "আল-বুরহান ফী মুশকিলাতিল কুরআন" থেকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লামা যারকাশী (রহ.) ও আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনি ৪৯৪ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। ("ওফায়াতুল আইয়ান" ইবনে খাল্লিকান: ১/৩১৮)
২. দেখুন, "আল ইতকান ফী উলুমিল কুরআন" দ্রষ্টব্য। ১/৫১) আল্লামা সুয়ূতী রচিত মাতবাআ হিজাযী, কায়রো ১৩৬৮ হিজরী।
৩. "মানাহিলুল ইরফান।" ১/৮, আল্লামা যুরকানী (রহ.) রচিত মাতবাআ ঈসা আল বাব আল হালাবী ১৩৭২ হিজরী।
৪. 'আল-ফুরকান'-এর জন্য সূরা আলে ইমরানের ২য় আয়াত, وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ 'আয-যিক্র'-এর জন্য সূরা আলে ইমরানের ৫৮তম আয়াত وَالذِّكْرِ الْحَكِيمِ, সূরা হিযরের ৬ষ্ঠ আয়াত نُزِلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ এবং সোয়াদের ৮ম আয়াত ইত্যাদি فِي شَكٍّ مِنْ ذِكْرِي 'আল-কিতাব'-এর জন্য সূরা বাকারার ১ম আয়াত ذلكَ الْكِتَابُ নাহলের ৬৪তম وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابِ এবং ১৮৭ তম আয়াত, 'আত্-তানযীল'-এর জন্য সূরা ইয়াসীনের ৫তম আয়াত تَنْزِيلَ الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ ওয়াকিয়ার ৮তম আয়াত এবং আল-হাক্কার ৬৯তম আয়াত দেখুন।
৫. সূত্র: "ফাতহুর রহমান লিতালিবে আয়াতিল কুরআন" পৃ: ৩৫৮-৩৫৯, এর জন্য দেখুন, ইলমী যাদাহ আল-হাসানী: আল-মাকতাবাতুল আহলিয়া, বৈরুত, ১২২৩ হিজরী।
৬. "আল-মুফরাদ ফী গরীবিল কুরআন" পৃ: ৪১১ আর রাগীব আল ইসফাহানী (রহ.): আসাহহুল মাতাবি' করাচী ১৩৮০ হিজরী।
১. "আল ইতকান পৃঃ ৫২ ও "মানাহিলুল ইরফান" ১ম খণ্ড পৃঃ ৭) এই শব্দটির মূল ধাতু নিরূপণে আরো বেশ কয়েকটি মতামত রয়েছে। তবে কোনোটিই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
২. সূরা হা-মীম আস সিজদা: ২৬
৩. "আত-তালভীহ্ মাআত তাওযীহ্" ১/২৬, মাতবাআ মুস্তফা আল-বাবী, মিসর।
📄 ওহী ও উহার হাকীকত
মহা পবিত্র আল-কুরআনুর কারীম যেহেতু দু'জাহানের সর্দার নবী কারীম (সা)-এর উপর ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই ওহী সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা অত্যাবশ্যকীয়।
📄 ওহী প্রয়োজনীয়তা
প্রত্যেকটি মুসলমানই এ বিষয় সম্পর্কে সম্মক অবগত যে, মহান আল্লাহ তা'আলা মানুষকে পরীক্ষার জন্য এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তার উপর বিশেষ কিছু দায়িত্ব অর্পণ করে গোটা বিশ্বকে তার সেবায় নিয়োজিত করেছেন। তাই পৃথিবীতে আগমনের পর মানুষের জন্য দু'টি কাজ অবধারিত হয়ে যায়।
প্রথমতঃ তার চারপাশে এ বিশ্বের যা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। আর দ্বিতীয়তঃ এ বিশ্বের সৃষ্টরাজিকে ব্যবহার করতে গিয়ে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের বিধি-নিষেধকে সামনে রাখা। এবং এমন কোনো কাজ না করা, যা মহান আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আর উল্লেখিত দায়িত্ব দু'টি সম্পাদনের জন্য মানুষের জ্ঞান অর্জন করা অত্যাবশ্যক। কারণ এ বিশ্ব জগতের হাকীকত এবং এ সকল সৃষ্টরাজির কোন্টির কি বৈশিষ্ট্য ও এগুলো দ্বারা উপকৃত হবার পদ্ধতি কি? যতক্ষণ পর্যন্ত এ ব্যাপারে জ্ঞান লাভ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ পৃথিবীর কোনো বস্তুকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। অনুরূপভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এ কথা না জানবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি কোন্ পথে? তিনি কোন্ কাজটিকে পছন্দ করেন আর কোন্টিকে অপছন্দ করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি মোতাবেক কাজ করা অসম্ভব।
প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করার সাথে সাথে তার মধ্যে এমন তিনটি বস্তু দান করে দিয়েছেন যেগুলোর মাধ্যমে সে উপরোক্ত বিষয়গুলোর জ্ঞান লাভ করতে পারে। প্রথমত হচ্ছে: মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তি অর্থাৎ চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, নাসিকা ও ত্বক। দ্বিতীয়ত হচ্ছে: সকল মেধা শক্তি ও বিবেক। তৃতীয়ত হচ্ছে: ওহী। যেমন, মানুষ অনেক বিষয়ের জ্ঞান পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে অর্জন করে থাকে। আবার অনেক বিষয়ের জ্ঞান মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ করে থাকে। আর যে সকল বিষয়ের জ্ঞান এ মাধ্যম দু'টি দ্বারা অর্জন করা যায় না, সেগুলোর জ্ঞান ওহীর মাধ্যমে দান করা হয়।
বস্তুত জ্ঞান-অর্জনের উপরোক্ত তিনটির মাধ্যমের ক্রমধারা কিছুটা এমন যে, প্রত্যেকটির একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা ও বিশেষ পরিধি ও পরিমণ্ডল রয়েছে। এ সীমা ও পরিধির বাইরে মাধ্যমগুলো নিষ্ক্রিয়। যেমন, যেসকল বস্তুর জ্ঞান মানুষ পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা অর্জন করে থাকে নিছক মেধাশক্তি দ্বারা সেগুলোর জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, যেমন এ মুহূর্তে আমার সামনে একজন লোক বসে আছে। আমার দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি যে, সে একজন মানুষ। আমার চোখই আমাকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তার রঙ ফর্সা, কপাল প্রশস্ত, চুলগুলো কালো, ঠোঁট দু'টো হালকা এবং চেহারা সুন্দর। আর যদি এ বিষয়গুলোর জ্ঞান নিজের পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তি বাদ দিয়ে শুধু মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ করার চেষ্টা করা হয়, যেমন চোখ দু'টি বন্ধ করে ওই ব্যক্তির গায়ের রঙ, শারীরিক গঠন-প্রকৃতি ও সমগ্র দেহের কথা কল্পনা করা হয় তাহলে আদৌ সে এসব বিষয়ের জ্ঞান লাভ করতে পারবে না।
ঠিক একইভাবে যেসব বস্তুর জ্ঞান মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ হয়, সেগুলো নিছক পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। যেমন, আলোচিত ব্যক্তির ব্যাপারে আমার এ কথাও জানা আছে যে, তার কোনো না কোনো একজন "মা" অবশ্যই আছেন। সাথে সাথে এ কথাও আমার জানা আছে যে, তার একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। যদিও এ মুহূর্তে আমার সামনে না আছে তার মা আর না দেখি আমি তার সৃষ্টিকর্তাকে। কিন্তু আমার আকল ও মেধাশক্তি আমাকে বলে দিচ্ছে যে, এ ব্যক্তি নিজে নিজেই সৃষ্টি হতে পারে না। আমি যদি এখানে আমার বিবেক ও মেধাশক্তিকে বাদ দিয়ে নিজের চোখ বা দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে তার মা ও তার সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে বেড়াই, তাহলে এ বস্তুর জ্ঞান অর্জন করা কখনো করোপক্ষে সম্ভব হবে না। কেননা তাকে সৃষ্টি করার দৃশ্য এ মুহূর্তে আমার চোখের সামনে আসা সম্ভবপর নয়。
মোটকথা, যে পর্যন্ত পঞ্চইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক রয়েছে, সে পর্যন্ত বিবেক ও মেধাশক্তি কোনো দিক-নির্দেশনা দিবে না। যেখানে গিয়ে পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তি অক্ষম হয়ে পড়ে, সেখান থেকে বিবেক ও মেধাশক্তির কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু এই বিবেক ও মেধাশক্তির দিক-নির্দেশনা ও নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নয়। বরং নির্দিষ্ট একটি সীমায় গিয়ে সে থেমে যায়। আবার এমন অনেক বস্তু আছে যেগুলোর জ্ঞান না পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে অর্জন করা যায় আর না বিবেক ও মেধাশক্তি দ্বারা। যেমন, সেই আলোচিত ব্যক্তির ব্যাপারে আকল ও মেধাশক্তি তো বলে দিয়েছে যে তার একজন স্রষ্টা রয়েছেন, কিন্তু ওই ব্যক্তিকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ থেকে তার উপর কি কি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে? তার কোন্ কাজ মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পছন্দনীয় আর কোন্ কাজ তাঁর অপছন্দনীয়? ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তি যৌথভাবে প্রচেষ্টা চালালেও এসব প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না। মানুষকে এই প্রশ্নাবলীর জবাব দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহ জাল্লা শানু যে পন্থা অবলম্বন করেছেন তার নামই হলো “ওহী”।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ওহী হচ্ছে মানুষের জ্ঞান অর্জনের সর্বোচ্চ মাধ্যম। যা তার জীবনের সাথে সম্পৃক্ত সেসব প্রশ্নাবালীর জবাব দিয়ে থাকে, ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তির মাধ্যমে যেগুলো সমাধান সম্ভব হয় না। তাই ওহীর জ্ঞান অর্জন করা ছাড়া মানুষের কোনো বিকল্প নেই。
উল্লিখিত ব্যাখ্যা বিবরণ দ্বারা এ কথাও পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মানুষের দিক নির্দেশনার জন্য কেবল ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তিই যথেষ্ট নয়; বরং তার হেদায়াত ও দিক-নির্দেশনার জন্য মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রদত্ত ওহীর জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য। আর যেহেতু ওহীর দিক-নির্দেশনার সূচনাই হয় সেখান থেকে, যেখানে বিবেক ও মেধাশক্তি অকেজো, কাজেই ওহীর প্রত্যেকটি বিষয়ই বিবেক ও মেধাশক্তি দ্বারা উপলব্ধি করা যাবে এমনটি জরুরি নয়। যেভাবে কোনো বস্তুর রঙ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা বিবেক ও মেধাশক্তির কাজ নয়; বরং ইন্দ্রিয় শক্তিই তার জন্য যথেষ্ট। তদ্রূপ দ্বীনি আকীদাগত অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোর জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি শুধুমাত্র ওহীর উপর। কাজেই সেগুলো উপলব্ধি করার জন্য শুধু বিবেক ও মেধাশক্তির উপরই নির্ভর করা সমীচীন নয়。
টিকাঃ
৯. "তামহীদু আবী শাকুর সালেমী" পৃঃ ৬৮-৭২ এখানে ওহীর প্রয়োজনীয়তার উপর খুবই সংক্ষেপে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন- এবং মাওলানা শামসুল হক আফগানী (রহ.) রচিত "উলূমুল কুরআন" পৃ: ৩-১৮, প্রকাশনা বিভাগ, মাদরাসা ফারুকিয়া ভাওয়ালপুর, ১৩৮৯ হিজরী।