📄 কুরআন মাজীদের পরিচিতি
প্রথম পরিচ্ছেদ
কুরআন মাজীদের পরিচিতি : تعارف
📄 এ পরিচ্ছেদের সারাংশ
এ পরিচ্ছেদে দু'টো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এক, হাকীকত, দুই, সংশয় নিরসনকল্পে জবাব। প্রথমাংশের আলোচ্য বিষয় কোরআনের হাকীকত ও বিষয়বস্তু, তৎসম্পর্কিত নানান বিষয় ও ইতিহাস, দুর্বোধ্য কিছু বিষয়ালোচনা, কোরআনের সত্যতার ব্যাপারে অলৌকিক বৈশিষ্ট্য সমূহ ও আত্মপ্রশান্তিদায়ক বিষয়াদির উল্লেখ ও诟অপবাদের জবাব-প্রদান ইত্যাদি।
এতে আলোচনা করা হয়েছে কোরআনের নামসমূহ এবং সেগুলোর সার্থকতা নিয়ে। এতে কোরআনের নাম ৫৫ থেকে ৯০টি পর্যন্ত বর্ণিত হওয়ার হাকীকত/কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। তবে তার আসল নাম গিয়ে দাঁড়ায় মোট ৫টিতে, যথাঃ আল-কোরআন, আল-ফোরকান, আয-যিকর, আল-কিতাব, আত-তানযীল। পক্ষান্তরে গুণবাচক নামগুলোকে আসল নামের সাথে একত্রিত করায় সে সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় অতি উচ্চে।
অতঃপর তিনি কোরআন শব্দ-বিশ্লেষণের পাশাপাশি তার হেকমতও তুলে ধরেন। এই কিতাব হচ্ছে এমন, যাকে কখনও বাতিল দাবিয়ে রাখতে পারবে না। বরং শত বিরোধিতা সত্ত্বেও তা বারবার পঠিত হবে, যার দিকে ইঙ্গিত করে "আল-কোরআন" নামক শব্দটি।
অতঃপর আলোচনায় এসেছে ওহীর হাকীকত, বা পরিচয়, তার প্রয়োজনীয়তা ও শব্দের বিশ্লেষণ এবং তার শিক্ষা। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ওহী সাধারণত দ্বীনী প্রয়োজন মেটাতেই আগমন করে থাকে। তবে তা প্রয়োজনবোধে দুনিয়াবি অনেক কিছুও শিক্ষা দেয়।
তারপর আলোচনা করা হয়েছে ওহী ও তার প্রকার এবং তার নাযিলগত প্রকারভেদ নিয়ে। মূল ওহী তিন প্রকার, যথাঃ ১. আত্মিক ওহী। ২. সরাসরি আল্লাহর কালাম। ৩. ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রেরিত ওহী। এবং নাযিলের ক্ষেত্রে ওহীর প্রকারভেদ প্রকার, যথাঃ একঃ ঘণ্টাধ্বনির ন্যায়। দুইঃ মানবাকৃতিতে ফিরিশতার আগমন। তিনঃ স্বরূপ আকৃতিতে ফিরিশতা-আগমন। চারঃ সত্য স্বপ্ন। পাঁচঃ আল্লাহর কালাম। ছয়ঃ অন্তরে বার্তা প্রেরণ।
এর অধীনে তিনি ওহী এবং ইলহামের ব্যাপারে পার্থক্যকারী বক্তব্য রেখেছেন, যা অতি উপকারী। নবী-রাসূলগণের অন্তরে প্রেরিত পয়গামের ব্যাপারে তারা নিশ্চিত থাকেন কার পক্ষ থেকে এই কথা ঢালা হয়েছে, পক্ষান্তরে ওলী-আওলিয়ারা এটা নিশ্চিত হন না যে, এর প্রেরক কে। যার কারণে নবীগণের ইলহাম-পালন ফরজ হলেও ওলী আউলিয়াদেরটা সে পর্যায়ে পৌঁছে না।
এরপর তিনি আলোচনা করেন উম্মতের নিকট প্রেরণকৃত ওহীর দু'প্রকার নিয়ে, তথা মাতলু, বা পঠিত এবং গায়রে মাতলু, বা অপঠিত। অতঃপর তিনি সে সকল লোকদের বক্তব্য খণ্ডন করেছেন যারা গায়রে মাতলু ওহীকে শরীয়ত মানতে রাজী নয়। সেটিকে তারা কেবল একজন রাষ্ট্রপতির আদেশ-নিষেধ হিসেবে গণ্য করতে চান। সেই সম্প্রদায়ের দর্শন খণ্ডনে তিনি তুলে ধরেন হাদীসের প্রামাণিকতার দলীল-প্রমাণ। এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা নিয়ে আসেন।
অতঃপর পশ্চিমা ধারায় প্রভাবিত ব্যক্তিবর্গ ওহীর অনুধাবন নিজেদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে এতে সংশয় রাখেন, অথচ ওহী আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম) ব্যতীত পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা কারও পক্ষে সম্ভবও নয়! আবার কেহ কেহ সরাসরি একে কিচ্ছা-কাহিনী বলে উল্লেখ করে ফেলেন। এই আধুনিক বিজ্ঞানের এ যুগে তার আলোচনা করতে লজ্জাবোধ তো সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে (নাউজুবিল্লাহ)! এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে সংকলক যুক্তিনির্ভর আলোচনা এনে দিলের অস্থিরতা দূর করে দিতে চেষ্টা করেছেন।
বিশেষ করে আত্মিক ওহী, যার মধ্যে ইলহাম প্রবিষ্ট, সে ব্যাপারে আধুনিক বিজ্ঞান কর্তৃক আবিষ্কৃত Hypnotism এর উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোধগম্য করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষ যদি অন্য মানুষের অন্তরে নিজের কথা ঢেলে দিতে পারে, তবে মহান "রাব্ব” কি পারবেন না! অবশ্যই পারবেন। নিম্নে এ পরিচ্ছেদের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হলো:
📄 পবিত্র কুরআনুল কারীমের নাম ও নামকরণের তাৎপর্য
আল্লামা আবুল মাআলী (রহ.) তাঁর স্বীয় কিতাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমের ৫৫টি নাম উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ আবার পবিত্র কুরআনুল কারীমের নাম ৯০-এর চেয়েও অধিকের কথা বলেছেন। বস্তুত তাঁরা পবিত্র কুরআনুল কারীমের সিফাত বা গুণগত নামসমূহ যেমন- মাজীদ, কারীম, ইত্যাদিকেও আসল নাম গণনা করত এগুলোর সংখ্যা ৯০ পর্যন্ত দাঁড় করিয়েছেন। অন্যথায় প্রকৃত অর্থে পবিত্র কুরআনুল কারীমের নাম সর্বমোট ৫টি। যথা- ১. আল-কুরআন। ২. আল-ফুরকান। ৩. আয-যিক্র। ৪. আল-কিতাব। ৫. আত্-তানযীল।
কেননা পবিত্র কুরআনুল কারীম স্বয়ং ৫টি নামে নিজের পরিচয় দিয়েছে। এ সকল নামের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নাম হলো "আল কুরআন”। এমনকি স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনই একষট্টি স্থানে নিজের কালামকে এ নামেই পরিচয় দিয়েছেন।
মূলত উৎসগত দিক থেকে "কুরআন” শব্দটি قَرَأَ يَقْرَأُ থেকে নির্গত। যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে একত্রিত করা। পরবর্তীতে এ শব্দটি 'পাঠ করা' অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে। কেননা, পাঠ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অক্ষর ও শব্দমালাকে একত্রিত করতে হয়। قَرَأَ يَقْرَأُ এর মাসদার বা মূল উৎস কিরাআতুন ব্যতীত কুরআন শব্দেও ব্যবহৃত হয়। যেমন মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন- إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ 'নিশ্চয়ই এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমার দায়িত্বে।'
আর আরবী ভাষায় মাসদার কখনো কখনো ইসমে মাফউল (Past Participle) এর অর্থে ব্যবহার করা হয়। আর এই অর্থেই আল্লাহর কালামকে "কুরআন” বলা হয়। 'পঠিত কিতাব।'
পবিত্র কুরআনুল কারীমকে "কুরআন” বলে নামকরণের অনেকগুলো কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, মূলত আরবের কাফের সম্প্রদায়ের বক্তব্যকে প্রতিহত করার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এই গ্রন্থকে "কুরআন” বলে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা তারা বলত- لا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ 'কাফিরেরা বলেঃ তোমরা এই কুরআন শ্রবণ করনা এবং তা আবৃত্তি কালে শোরগোল সৃষ্টি কর যাতে তোমরা জয়ী হতে পার।'
এখানে কাফেরদের প্রত্যাখ্যানমূলক শব্দের বিপরীতে "কুরআন” নামকরণ করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পবিত্র কুরআনুল কারীমের দাওয়াতকে এই ধরণের হীন আওয়াজ দ্বারা দাবিয়ে রাখা যাবে না। বস্তুত এই কিতাব পাঠ করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত পাঠ করা হবে। আর একারণেই এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, সমগ্র বিশ্বে পবিত্র কুরআনুল কারীমই হচ্ছে সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ।
মহা পবিত্র আল-কুরআনুল কারীমের পারিভাষিক সংজ্ঞা এভাবে করা হয়ে থাকে- المنزل على الرسول المكتوب في المصاحف المنقول الينا نقلا منواترا بلا شبهة অর্থাৎ 'মহান আল্লাহর সেই মহাবাণী যা মুহাম্মদ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে, মাসাহিফের মধ্যে লিপিবদ্ধ রয়েছে, এবং সন্দেহাতীতভাবে ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের কাছে পৌঁছেছে।'
প্রকাশ থাকে যে, এ সংজ্ঞাটি সকল আহলে ইলমের সর্বসম্মত সংজ্ঞা। এতে কারো কোনো দ্বিমত নেই。
টিকাঃ
১. আবুল মাআলী হলো তাঁর উপনাম। পূর্ণনাম আযীযি ইবনে আবদুল মালিক। উপাধি 'শাইযালা'। তিনি হিজরী পঞ্চম শতকের শাফেঈ মাযহাব অনুসারী একজন বিজ্ঞ আলেম। তাঁর রচিত গ্রন্থ "আল-বুরহান ফী মুশকিলাতিল কুরআন" থেকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লামা যারকাশী (রহ.) ও আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনি ৪৯৪ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। ("ওফায়াতুল আইয়ান" ইবনে খাল্লিকান: ১/৩১৮)
২. দেখুন, "আল ইতকান ফী উলুমিল কুরআন" দ্রষ্টব্য। ১/৫১) আল্লামা সুয়ূতী রচিত মাতবাআ হিজাযী, কায়রো ১৩৬৮ হিজরী।
৩. "মানাহিলুল ইরফান।" ১/৮, আল্লামা যুরকানী (রহ.) রচিত মাতবাআ ঈসা আল বাব আল হালাবী ১৩৭২ হিজরী।
৪. 'আল-ফুরকান'-এর জন্য সূরা আলে ইমরানের ২য় আয়াত, وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ 'আয-যিক্র'-এর জন্য সূরা আলে ইমরানের ৫৮তম আয়াত وَالذِّكْرِ الْحَكِيمِ, সূরা হিযরের ৬ষ্ঠ আয়াত نُزِلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ এবং সোয়াদের ৮ম আয়াত ইত্যাদি فِي شَكٍّ مِنْ ذِكْرِي 'আল-কিতাব'-এর জন্য সূরা বাকারার ১ম আয়াত ذلكَ الْكِتَابُ নাহলের ৬৪তম وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابِ এবং ১৮৭ তম আয়াত, 'আত্-তানযীল'-এর জন্য সূরা ইয়াসীনের ৫তম আয়াত تَنْزِيلَ الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ ওয়াকিয়ার ৮তম আয়াত এবং আল-হাক্কার ৬৯তম আয়াত দেখুন।
৫. সূত্র: "ফাতহুর রহমান লিতালিবে আয়াতিল কুরআন" পৃ: ৩৫৮-৩৫৯, এর জন্য দেখুন, ইলমী যাদাহ আল-হাসানী: আল-মাকতাবাতুল আহলিয়া, বৈরুত, ১২২৩ হিজরী।
৬. "আল-মুফরাদ ফী গরীবিল কুরআন" পৃ: ৪১১ আর রাগীব আল ইসফাহানী (রহ.): আসাহহুল মাতাবি' করাচী ১৩৮০ হিজরী।
১. "আল ইতকান পৃঃ ৫২ ও "মানাহিলুল ইরফান" ১ম খণ্ড পৃঃ ৭) এই শব্দটির মূল ধাতু নিরূপণে আরো বেশ কয়েকটি মতামত রয়েছে। তবে কোনোটিই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
২. সূরা হা-মীম আস সিজদা: ২৬
৩. "আত-তালভীহ্ মাআত তাওযীহ্" ১/২৬, মাতবাআ মুস্তফা আল-বাবী, মিসর।
📄 ওহী ও উহার হাকীকত
মহা পবিত্র আল-কুরআনুর কারীম যেহেতু দু'জাহানের সর্দার নবী কারীম (সা)-এর উপর ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই ওহী সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা অত্যাবশ্যকীয়।