📄 বিচ্ছিন্নতা ও মতানৈক্যের নিন্দা
বিচ্ছিন্নতা নিন্দনীয় হওয়ার দলীলঃ
আল্লাহ তা'আলা বিচ্ছিন্নতাকে নিন্দা করেছেন এবং যে সমস্ত পথ ও কারণ বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয় তা থেকে নিষেধ করেছেন। বিচ্ছিন্নতা ও মতভেদ করা থেকে সাবধান করে, তার খারাপ পরিণাম নির্দেশ করে এবং তা যে দুনিয়াতে অসম্মানের অন্যতম বৃহৎ কারণ আর আখিরাতে শাস্তি, লজ্জাজনক পরিণতি এবং কালো চেহারা বিশিষ্ট হওয়ার কারণ তা বর্ণনা করে কুরআন ও সুন্নায় অনেক দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
۞ وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ * يَوْمَ تَبْيَضُ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ الْفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ * وَأَمَّا الَّذِينَ ابْيَضَتُ وُجُوهُهُمْ فَفِي رَحْمَةِ اللَّهِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ ﴾ (آل عمران : ۱۰۵-۱۰۷)
“তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করেছে। তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। সেদিন কিছু মুখ উজ্জল হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে, যাদের মুখ কালো হবে (তাদের বলা হবে) তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফুরী করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তি ভোগ কর, যেহেতু তোমরা কুফুরী করতে। আর যাদের মুখ উজ্জল হবে তারা আল্লাহর অনুগ্রহে থাকবে, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে”। [সূরা আলে-ইমরানঃ ১০৫-১০৭]
ইবনে আব্বাস বলেনঃ "আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের' (তথা সুন্নাতের অনুসারী এবং এক মত ও পথে সুসংঘবদ্ধ যারা তাদের) চেহারা শুভ্র হবে, আর যারা বেদ'আত কারী এবং মতানৈক্যকারী তাদের চেহারা কালো হবে'।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
۞إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ (الأنعام: ১৫৯).
“যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন দায়িত্ব আপনার নয়, তাদের বিষয় আল্লাহর নিকট, তারপর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানাবেন”।
উপরোক্ত আয়াতসমূহ এ প্রমাণ বহণ করছে যে, বিচ্ছিন্নতা নিন্দনীয়, মুসলিম জাতির উপর দুনিয়া ও আখিরাতে এর পরিণতি ভয়াবহ এবং এ বিচ্ছিন্নতাই আহলে কিতাব তথা ইহুদী ও নাসারাদের ধ্বংসের কারণ। আর এটাই মানুষের মধ্যে ঘটে যাওয়া যাবতীয় বক্রতার কারণ।
রাসূলের সুন্নাহ থেকে এর প্রমাণঃ
বিচ্ছিন্নতাও মতানৈক্যের নিন্দায় এবং দলবদ্ধভাবে পরস্পর মিলেমিশে থাকার উপর উৎসাহিত করে অনেক হাদীস এসেছে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইমাম আহমাদ ও আবু দাউদ কর্তৃক মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি দাঁড়ালেন, তারপর বললেনঃ “সাবধান! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন তারপর বললেনঃ
ألا إن من قبلكم من أهل الكتاب افترقوا على اثنتين وسبعين ملة. وإن هذه الأمة ستتفرق على ثلاث وسبعين ملة اثنتان وسبعون في النار وواحدة في الجنة وهي الجماعة)¹
“সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাবগণ বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে আর এ উম্মাত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে, তম্মধ্যকার বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে, এক দল জান্নাতে যাবে, আর তাহচ্ছে 'আল জামা'আত'"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিয়েছেন যে, তার উম্মাত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে, বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে, নিঃসন্দেহে তারা ঐ সমস্ত লোক যারা তাদের পূর্ববর্তীদের মতই মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে যে বিভিন্ন মতে বিভক্ত হবে বলেছেন তা হতে পারে শুধু দ্বীনের ব্যাপারে, হতে পারে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়টির ব্যাপারে, যার শেষ পরিণতি দ্বীনের ব্যাপারে এসে ঠেকবে। আবার হতে পারে তা শুধু দুনিয়াবী ব্যাপারে। সে যাই হোক, এ উম্মাতের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও মতানৈক্য ঘটবেই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে সাবধান করে গেছেন যাতে করে আল্লাহ যাকে তা থেকে নিরাপদ রাখতে চান তিনি তা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।
মতানৈক্য ও বিচ্ছিন্নতা পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসের কারণঃ
আমরা যদি কুরআন ও সুন্নাহ নিয়ে চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাব, পূর্ববর্তী সমস্ত জাতির ধ্বংসের পিছনে যা কাজ করেছে তাহলো বিচ্ছিন্নতা এবং মতানৈক্যের আধিক্য, বিশেষ করে তাদের উপর অবতীর্ণ কিতাবের মধ্যে মতভেদে লিপ্ত হওয়া।
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন দেখতে পেলেন সিরিয়া ও ইরাকের অধিবাসীগণ কুরআনের বিভিন্ন হরফ নিয়ে এমন মতভেদে লিপ্ত হয়ে পড়ছে যা থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন, তখন তিনি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেনঃ “আপনি এ উম্মাতকে উদ্ধার করুন, তারা যেন পূর্ববর্তী উম্মাতদের মত কিতাবের মধ্যে বিভিন্ন মতে বিভক্ত না হয়ে পড়ে”। এ থেকে আমরা দুটি বিষয়ের শিক্ষা পাইঃ
একঃ এ ধরনের মতভেদ করা হারাম।
দুইঃ আমাদের পূর্ববর্তীদের থেকে শিক্ষা নেয়া, তাদের অনুরূপ হওয়া থেকে সাবধান থাকা। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿ ذَلِكَ بِأَنَّ اللهَ نَزَّلَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِي الْكِتَبِ لَفِي شَقَاقَ بَعِيدٍ ﴾ (البقرة : ١٧٦).
“সেটা এ জন্যই যে, আল্লাহ সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন আর যারা কিতাব সম্মন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করেছে অবশ্যই তারা সুদূর বিবাদে লিপ্ত”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৭৬]
এবং আল্লাহর বাণীঃ
﴿وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ الَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُم ﴾ (آل عمران: ۱۹)
"আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তারা পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ তাদের নিকট জ্ঞান আসার পর মতানৈক্য ঘটিয়েছিল”। [সূরা আলে-ইমরানঃ ১৯]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ থেকে এর দলীল, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
ذروني ما تركتكم فإنما هلك من كان قبلكم بكثرة سؤالهم واختلافهم على أنبيائهم فإذا نهيتكم عن شيء فاجتنبوه، وإذا أمرتكم بأمر فأتوا منه ما استطعتم)¹
“তোমাদেরকে আমি যতক্ষণ কোন কিছু বলা থেকে বিরত থাকি ততক্ষণ তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও; কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীগণ কেবলমাত্র তাদের নবীদেরকে বেশী প্রশ্ন করার ও মতভেদে লিপ্ত হওয়ার কারণে ধ্বংস হয়েছিল। সুতরাং তোমাদেরকে যখন আমি কোন বস্তু থেকে নিষেধ করি তখন তা পরিত্যাগ করবে, আর যখন কোন কাজ করতে আদেশ করি তখন তা যতটুকু সম্ভব পালন করবে”।
এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয়নি তা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন; কেননা পূর্ববর্তীদের ধ্বংশের কারণই ছিলো অধিকহারে প্রশ্ন উত্থাপন এবং নাফরমানী তথা তাদের নবীদের নির্দেশের বিরোধিতার মাধ্যমে তাদের সাথে মতভেদে লিপ্ত হওয়া।
মতানৈক্য কি রহমত স্বরূপ?
)اختلاف أمتي رحمة( "আমার উম্মাতের মতানৈক্য রহমত” এ বানোয়াট হাদীসের উপর ভিত্তি করে কিছু লোক দাবী করে যে, মতভেদ রহমত। এ কথা কুরআন, সুন্নাহ ও সুস্থ বিবেক দ্বারা প্রত্যাখ্যাত। আমরা ইতিপূর্বে বেশ কিছু আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করেছি যাতে বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হওয়ার নিন্দা করা হয়েছে। চিন্তাশীল ও গবেষকদের জন্য তাই যথেষ্ট।
বরং কুরআন প্রমাণ করছে যে, ভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হওয়ার সাথে রহমত একসাথে থাকতে পারে না বরং তার একটি অপরটির বিপরীত। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ * َّا مَنْ رَحِمَ رَبُّكَ (هود: ۱۱۸ ، ۱۱۹)
“তারা মতভেদ করতেই থাকবে তবে তারা নয় যাদেরকে আপনার প্রতিপালক রহমত করেন”। [সূরা হুদঃ ১১৮-১১৯]
যে হাদীসটি দিয়ে উপরোক্ত মতের দাবীদারগণ দলীল নিয়েছেন সে হাদীসটি বাতিল, কোন অবস্থায়ই শুদ্ধ হতে পারে না। হাদীসের কোন কিতাবেই এ ধরনের হাদীস পাওয়া যায় না। আর এটাই উপরোক্ত দাবী বাতিল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সর্বপরি তা সুস্থ বিবেকেরও বিরোধী; কেননা ছোট খাট মাসআলায় মতানৈক্য করার কারণে মানুষের মাঝে যে হিংসা, হানাহানি, সম্পর্কচ্যুতি, বরং অনেক সময় হত্যা ও যুদ্ধবিগ্রহের রূপ ধারণ করার মত মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা জানার পরে কোন বিবেকবান ব্যক্তি মত-পার্থক্যকে রাহমত হিসাবে কল্পনা করতে পারে না।
বিচ্ছিন্নতা ও মতানৈক্য থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ঃ
জানা কথা যে, মুক্তি প্রাপ্ত, সাহায্যপ্রাপ্ত দল হলোঃ আল জামা'আত। আর জামা'আত হলো ঐ সমস্ত লোকদের দল যারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবাদের আদর্শ অনুসরণ করে চলে। তারা এ পথ থেকে বিচ্যুত হয় না, এ পথ থেকে তারা ডানে বামে সামান্যও সরে যায় না।
শাত্বেবী রাহেমাহুল্লাহ তার 'ই'তিসাম' গ্রন্থে বলেনঃ 'জামা'আত হলোঃ যার উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবাগণ এবং সঠিকভাবে তাদের অনুসারীগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন'। সুতরাং মুক্তির পথ হলোঃ কথা, কাজ ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের পথের অনুসরণ করা। তাদের বিরোধিতা বা তাদের থেকে পৃথক মত ও পথ গ্রহণ না করা।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ﴾ (النساء: ١١٥)
"আর যে কেউ সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তাকে আমরা যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় সেদিকে ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করাব, আর তা কত মন্দ আবাস!”। [সূরা আন-নিসাঃ ১১৫]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿ وَأَنَّ هَٰذَا صِرَٰطِي مُسْتَقِيمًا فَٱتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُواْ ٱلسُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِۦ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴾ (الأنعام: ١٥٣)
"আর এ পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করবে এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে, এভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও। [সূরা আল-আন'আমঃ ১৫৩]
রাসূলের সুন্নায় এসেছে, যা তিরমিযী ও অন্যান্যগণ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
( لا تجتمع أمتي على ضلالة - أو قال: أمة محمد على ضلالة – ويد الله على الجماعة )¹
"আমার উম্মাত অথবা বলেছেনঃ "মুহাম্মাদের উম্মাত কোন ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যমতে পৌঁছবে না। আর আল-জামা'আতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে”।
আর এর মাধ্যমেই আমরা এ বইয়ের সমাপ্তি টানতে চাচ্ছি যে, মুক্তির পথ ও সৌভাগ্যের চাবিকাঠি হলোঃ আল্লাহর কিতাব তথা কুরআনুল কারীমকে আঁকড়ে ধরা। বস্তুতঃ এটা এমন এক কিতাব যার সামনে বা পিছনে কোন দিক দিয়ে বাতিল প্রবেশ করতে পারে না, সর্বপ্রশংসিত, ও সবচেয়ে বিজ্ঞ যিনি তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে মুক্তি ও সৌভাগ্য নির্ভর করছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে প্রমাণিত পবিত্র সহীহ সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মধ্যে, যিনি নিজ মনগড়া কোন কথা বলেন না, যা বলেন তা সবই তাঁর কাছে পাঠানো ওহী। কেননা ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস ও শরীয়তের একমাত্র উৎস হলো এ দু'টি অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ। সুতরাং এ পথ থেকে যে আদর্শ দূরে থাকবে সেটা হবে ক্ষতিকারক। তাই সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা মু'মিনদের পথ, সমস্ত জগতের প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের পথ, মজবুত দূর্গ। আর এ আদর্শ দ্বারাই আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতকে বেদ'আতকারীদের বেদ'আত, বাতিলপন্থীদের উদ্ভাবিত পন্থা, মূর্খদের অপব্যাখ্যা এবং সীমালংঘনকারীদের পরিবর্তন-পরিবর্ধন থেকে হেফাযত করবেন। এ পথেই ইসলামের প্রাথমিক যুগে এ জাতির অবস্থা সংশোধিত হয়েছিল। তাই এ আদর্শের দিকে প্রত্যাবর্তন ছাড়া আমাদের কোন শান্তিও নেই, সফলতাও নেই।
দারুল হিজরাহ তথা মদীনার ইমাম মালেক ইবনে আনাস রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ 'যা দ্বারা এ উম্মাতের প্রাথমিক যুগের লোকেরা সঠিক পথে সংশোধিত হয়েছিল কেবলমাত্র তা দিয়েই এর পরবর্তী যুগের লোকেরা সংশোধিত হবে'। এ উম্মাতের প্রাথমিক যুগের লোকেরা আল্লাহর কুরআন ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নার অনুসরণের মাধ্যমেই সংশোধিত হয়েছিল। এখানে আরেকটি বিষয় প্রত্যেক মুসলিম মাত্রই জানা জরুরী, তা'হলো কুরআন ও সুন্নার উপর আমল করা যেন সালফে সালেহীন তথা সৎকর্মশীল পূর্ববর্তী মনিষীদের বুঝ ও তাদের কর্মপন্থা অনুসারে হয়; কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنَصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا (النساء : ١١٥)
"আর যে কেউ সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তাকে আমরা যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় সেদিকে ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করাব, আর তা কত মন্দ আবাস!”। [সূরা আন-নিসাঃ ১১৫]
সুতরাং মু'মিনদের পথ তথা সাহাবা এবং সঠিকভাবে তাদের অনুসারী হেদায়াতপ্রাপ্ত ইমামগণের পথের অনুসরণই হচ্ছে মুক্তির পথ।
আমরা আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি তিনি যেন মুসলিম জাতিকে তাদের প্রভুর কিতাব কুরআনুল কারীম ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ এবং মু'মিনদের পথকে আঁকড়ে ধরার তাওফীক দান করেন।
আর সর্বশেষ আমাদের দো'আ থাকবে যে, সমস্ত সৃষ্টি জগতের প্রভু আল্লাহর জন্যই যাবতীয় প্রশংসা।
আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তার পরিবারবর্গ ও তার সমস্ত সাথীদের উপর সালাত পেশ করুন।
টিকাঃ
¹ হাদিসটি ইমাম আহমাদ (৪/১৫২), আবু দাউদ (৫/৫) ও অন্যান্যগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭২৮৮), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৩৩৭)。
¹ তিরমিযী হাদীসটি (৪/৪৬৬) বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন。