📄 কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার অর্থ ও তা ওয়াজিব হওয়ার উপর দলীল-প্রমাণাদি
আল্লাহ তা'আলা উম্মাতকে সম্মিলিতভাবে থাকা, কথা-বার্তায় ঐক্য বজায় রাখা এবং বিভিন্ন কাতারের মানুষের মধ্যে সমন্বয় সাধনের নির্দেশ দিয়েছেন, তবে শর্ত হচ্ছে এ একতার ভিত্তি হবে কুরআন ও সুন্নাহ। অনুরূপভাবে বিচ্ছিন্নতা থেকে নিষেধ করেছেন এবং উম্মাতের উপর বিচ্ছিন্নতার পরিণাম যে দুনিয়া ও আখেরাতে কি মারাত্মক হতে পারে তা বর্ণনা করেছেন। আর তা বাস্তবায়নের জন্যই আমাদেরকে দ্বীনের প্রধান মূলনীতি ও শাখা প্রশাখা তথা যাবতীয় ব্যাপারে মহান আল্লাহর কুরআনের কাছে ফয়সালার জন্য যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিচ্ছিন্নতার কারণ হয় এমন সবকিছু থেকে নিষেধ করেছেন।
সুতরাং মুক্তির সঠিক পথ হলোঃ মহান আল্লাহর কুরআন ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা; কেননা এ দু'টো মুলতঃ যাকে আল্লাহ তা'আলা তাওফীক দিয়েছেন তার জন্য দুর্ভেদ্য দূর্গ এবং মজবুত বর্ম। মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ﴾ (آل عمران : ۱۰۳).
“তোমরা সকলে আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নিকুন্ডের দ্বারপ্রান্তে ছিলে, তিনি তোমাদেরকে তা হতে রক্ষা করেছেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার”। [সূরা আলে- ইমরানঃ ১০৩]
মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর রশিকে মজবুতভাবে ধরে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর রশি হলোঃ মুফাসসিরদের মতেঃ আল্লাহর অঙ্গীকার বা কুরআন; কেননা مسلمانوں থেকে আল্লাহ যে অঙ্গীকার নিয়েছেন তা হলো কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা। আল্লাহ একতাবদ্ধ হয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, মতানৈক্য করা থেকে নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا ﴾ (الحشر: ٧)
"রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক”। [সূরা আল-হাশরঃ ৭]
আল্লাহর এ বাণী দ্বীনের প্রধান প্রধান মূলনীতি ও শাখা প্রশাখা, প্রকাশ্য ও গোপনীয় সব কিছুকেই শামিল করে। আরো বুঝা যায় যে, রাসূল যা নিয়ে এসেছেন বান্দাগণ তা গ্রহণ করতে ও সে অনুসারে চলতে বাধ্য, তার বিরোধিতা করা জায়েয হবে না। অনুরূপভাবে রাসূল যদি কোন বিষয়ের হুকুম বর্ণনা করেন তবে তা আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক বর্ণিত হুকুমের ন্যায়, ফলে তা ছাড়ার ব্যাপারে কারো কোন প্রকার ছাড় নেই, নেই কোন ওজর আপত্তি। তাঁর কথার উপর অন্য কারো কথাকে অগ্রাধিকার দেয়া যাবে না। মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنْتُمْ تَسْمَعُونَ ﴾ (الأنفال : ٢٠) .
“হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমরা যখন তাঁর কথা শোন তখন তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিও না"। [সূরা আল-আনফালঃ ২০]
আল্লাহ তা'আলা তাঁর মু'মিন বান্দাদেরকে তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁর বিরোধিতা করা ও তাঁর সাথে শত্রুতা পোষণকারী কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য রাখা থেকে সাবধান করেছেন, এ জন্যই বলেছেন: ﴿ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ ﴾ অর্থাৎ তোমরা তার আনুগত্য ছেড়ে দিবে, তার নির্দেশ পালনে ও নিষেধকৃত বস্তু ত্যাগ করতে পিছপা হবে।
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴾ (النساء: ٥٩)
"হে মু'মিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান এনে থাক তবে তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আর আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারীদের, তারপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ ঘটে তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের নিকট উপস্থাপন কর। এটা উত্তম ও পরিণামে প্রকৃষ্টতর”। [সূরা আন-নিসাঃ ৫৯]
হাফেয ইবনে কাসীর বলেনঃ 'আল্লাহর আনুগত্য কর' অর্থাৎ তাঁর কিতাবের অনুসরণ কর, আর 'রাসূলের আনুগত্য কর' অর্থাৎ তার সুন্নাহ আঁকড়ে ধর, এবং 'তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী' অর্থাৎ তারা তোমাদেরকে আল্লাহর আনুগত্যে যা কিছু নির্দেশ করে, কিন্তু আল্লাহর নাফরমানিতে নয়; কেননা আল্লাহর নাফরমানি করে সৃষ্টি জগতের কারো আনুগত্য নেই। আর আল্লাহর বাণী 'যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ ঘটে তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের নিকট উপস্থাপিত কর' এর অর্থ সম্পর্কে মুজাহিদ বলেনঃ অর্থাৎ 'আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নার দিকে'।
এটা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশ যে, দ্বীনের মৌলিক ও সাধারণ বিধি- বিধান যে কোন বিষয়েই মানুষের মধ্যে মতভেদ ঘটবে তাদেরকে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নার দিকে ফিরে যেতে হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
﴿وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِنْ شَيْ فَحُكْمُهُ إِلَى اللهِ ﴾ (الشورى: ١٠)
"তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর না কেন - তার মীমাংসা তো আল্লাহরই নিকট”। [সূরা আস শূরাঃ ১০]
সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহ যে বিষয়ে কোন হুকুম দিবে, আর কুরআন ও সুন্নাহ তা শুদ্ধ বলে মত দিবে তাই সত্য, সত্যের পরে পথভ্রষ্টতা ছাড়া আর কীই বা আছে? এজন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ 'যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান এনে থাক' অর্থাৎ দ্বন্দপূর্ণ ও অজ্ঞতা জনিত বিষয়ের ফয়সালা কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে দাও, আর তাদের মধ্যে যে এ দু'য়ের দিকে ফিরে আসবে না সে আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমানদার নয়। আর আল্লাহর বাণীঃ 'এটা উত্তম' অর্থাৎ মতভেদ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ থেকে বিচার-ফয়সালা নেয়া ও সেদিকে ফিরে আসা উত্তম, আর أَحْسَنُ تَأْوِيلًا এর অর্থঃ 'শেষফল ও পরিণামের দিক থেকে তা ভালো ও উৎকৃষ্ট'। সুদ্দী এরূপ বলেছেন, আর মুজাহিদ বলেনঃ (এর অর্থ) 'প্রতিফলের দিক থেকে তা উত্তম। আর এ মতটি অধিক নিকটবর্তী"¹। কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা এবং প্রত্যেক বিষয়ে কুরআন ও সুন্নার দিকে প্রত্যাবর্তন করার আবশ্যকতার ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবে বহু আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে।
অপর দিকে কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা ওয়াজিব হওয়ার উপর রাসূলের সুন্নাহ থেকেও অনেক প্রমাণাদি রয়েছে, তম্মধ্যেঃ ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
(إن الله يرضى لكم ثلاثاً ويسخط لكم ثلاثاً، يرضى لكم أن تعبدوه ولا تشركوا به شيئاً وأن تعتصموا بحبل الله جميعاً ولا تفرقوا، وأن تناصحوا من ولاه الله أمركم. ويسخط لكم ثلاثاً، قيل وقال، وكثرة السؤال، وإضاعة المال)¹
"অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের তিনটি বস্তুতে সন্তুষ্ট হন আর তোমাদের তিনটি বস্তুতে অসন্তুষ্ট হন, তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হন যদি তোমরা তাঁর ইবাদাত কর ও তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না কর, তোমরা সবাই আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হও, আর তোমাদের উপর আল্লাহ যাকে শাসক বানিয়েছেন তাকে নসীহত কর। তোমাদের উপর অসন্তুষ্ট তিনটি কাজে, কথাবার্তায় বাড়াবাড়ি করা, অধিক প্রশ্ন করা এবং সম্পদ নষ্ট করা”¹。
অনুরূপভাবে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(إني تارك فيكم ما إن تمسكتم به لن تضلوا بعدي كتاب الله وسنتي)²
"আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি যা আঁকড়ে থাকলে তোমরা আমার পরে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না, আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ
(تركتكم على البيضاء ليلها كنهارها لا يزيغ عنها بعد إلا هالك)¹
“আমি তোমাদেরকে শুভ্র আলোতে রেখে যাচ্ছি রাত্রি যেখানে দিনের মত, এরপর যার ধ্বংস অনিবার্য সে ব্যতীত কেউ তা থেকে বক্রতা অবলম্বন করে না”¹。
'ইরবাদ ইবনে সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ)²
“তোমাদের উপর ওয়াজিব আমার সুন্নাহ এবং আমার পরে সঠিক পথের দিশা প্রদানকারী, হেদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণ করা, তোমরা দাঁত চেপে তা আঁকড়ে ধরে রাখবে”²。
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতের মধ্যে যারা তার সুন্নাকে আঁকড়ে ধরে থাকবে তাদের ব্যাপারে এমন মহান সুসংবাদ ও উচ্চ মর্যাদার সুখবর দিয়েছেন যে, প্রত্যেক মু'মিন যার অন্তরে সামান্যতম ঈমান অবশিষ্ট আছে তা অর্জনে ও তার বাস্তবায়নে সদা তৎপর থাকবে, আর তা হলোঃ জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য। সে সুসংবাদটি এসেছে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى. قالوا ومن يأبى يا رسول الله؟ قال: من أطاعني دخل الجنة ومن عصاني فقد أبي)¹
"আমার প্রত্যেক উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে তবে যে অস্বীকার করল সে ব্যতীত”। সাহাবাগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! কে অস্বীকার করল? তিনি বললেনঃ "যে আমার আনুগত্য করল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হলো সে অস্বীকার করল"¹。
রাসূলের নির্দেশের বিরোধিতা করার চেয়ে বড় সুন্নাহকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করার কোন দিকে আছে কি? আর তা দ্বীনের মধ্যে নতুন পথ ও মত সৃষ্টি করার মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে থাকে।
জানা কথা যে, মুক্তিপ্রাপ্ত দল হলোঃ ঐ দল যারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাগণের পথে চলবে, আর সেটাই হলো আল-জামা'আত, বা সুনির্দিষ্ট দল। উবাই ইবনে কা'আব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ 'তোমাদের উপর ওয়াজিব সুনির্দিষ্ট সত্য পথ ও সুন্নার উপর চলা; কেননা কোন বান্দা সুনির্দিষ্ট সত্য পথ ও সুন্নার উপর অটল থেকে আল্লাহকে স্মরণ করে আল্লাহর ভয়ে তার চক্ষু সিক্ত হলে তাকে জাহান্নামের অগ্নি কক্ষনো স্পর্শ করবে না। সুনির্দিষ্ট সত্য পথ ও সুন্নার উপর মধ্যম পর্যায়ের আমল করা সুনির্দিষ্ট সত্য ও সুন্নার বিপরীতে অনেক আমল করার চেয়ে উত্তম'।
টিকাঃ
¹তাফসীরে ইবনে কাসীর (২/৩০৪)。
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৭১৫)。
² ইমাম মালিক তার মুয়াত্তায় (২/৮৯৯) হাদিসটি বর্ণনা করেন。
¹ সুনানে ইবনে মাজাহ (১/১৬), ভূমিকা, আলবানী সংকললিত সহীহ ইবনে মাজাহ (১/৬)。
² সুনানে আবি দাউদ (৫/১৩), তিরমিযী (৭/৪৩৮) তুহফাতুল আহওয়াজী সমেত。
¹সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭২৮০)。
📄 বেদ'আত থেকে সতর্কীকরণ
বেদ'আতের সংজ্ঞাঃ বেদ'আতের আভিধানিক অর্থঃ দ্বীনের মধ্যে পূর্ববর্তী কোন নজীর ছাড়াই কোন কিছুর উদ্ভব ঘটানো। এ অর্থই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে মহান আল্লাহর বাণীতেঃ
بَدِيعُ السَّمواتِ وَالْأَرْضِ (البقرة: ۱۱۷).
"আসমানসমূহ ও যমীনকে নতুনভাবে সৃষ্টিকারী”। [সূরা আল- বাকারাহঃ ১১৭]
শরীয়তের পরিভাষায় বেদ'আত বলতে বুঝায়ঃ দ্বীনের মধ্যে যে সকল নব উদ্ভাবিত ইবাদাত ও বিশ্বাস কুরআন, সুন্নাহ অথবা এ উম্মাতের সালাফ তথা সঠিকপন্থী ওলামাদের ঐক্যমতের বিরোধী হয়।
বেদ'আতের ভয়াবহতাঃ বেদ'আত ও দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিস্কার করার পরিণতি মারাত্মক। সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে তার প্রভাবও ভয়াবহ। বরং দ্বীনের সকল মূলনীতি ও শাখা- প্রশাখার উপরও তা খারাপ প্রভাব ফেলে। সুতরাং বেদ'আত হলোঃ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটানো, না জেনে আল্লাহর উপর কোন কথা আরোপ করা, আর দ্বীনের মধ্যে এমন বস্তুর প্রবর্তন করা যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। আমল কবুল না হওয়া এবং উম্মাতের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির কারণও বেদ'আত। বেদ'আতকারী যেমনিভাবে তার নিজের গুনাহ বহন করবে তেমনিভাবে যারা তার বেদ'আতের অনুসারী হবে তাদের সবার গুনাহ বহন করবে। অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'হাউযে'র পানি পান করা থেকে মাহরুম হওয়ার কারণও বেদ'আত। সাহল ইবনে সা'আদ আল-আনসারী এবং আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
أنا فَرَطكم على الحوض من مر علي شرب ومن شرب لا يظمأ أبداً ليردن عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُوْنَنِي ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ فَأَقُوْلُ إِنَّهُمْ مِنْ أُمَّتِيْ، فَيُقَالُ: إِنَّكَ لَا تَدْرِيْ مَا أَحْدَثُوْا بَعْدَكَ. فَأَقُوْلُ: سُحْقاً لِّمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي)¹
"আমি 'হাউযে'র কাছে তোমাদের 'ফারাত্ব' (অগ্রগামী ব্যক্তি) হব, যে আমার কাছ দিয়ে যাবে সে পান করবে, আর যে পান করবে সে কক্ষণো পিপাসার্ত হবে না। আমার কাছে কোন কোন জাতি এসে পৌঁছবে যাদেরকে আমি চিনি, আর তারাও আমাকে চিনে, তারপর তাদের ও আমার মাঝে বাধার সৃষ্টি করা হবে, তখন আমি বলবঃ অবশ্যই এরা আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত। তখন বলা হবেঃ আপনি জানেন না তারা আপনার পরে কী নতুন পদ্ধতির উদ্ভব ঘটিয়েছিল। তখন আমি বলবঃ “যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে তারা 'সুহকু' তথা দূর হও, বা তারা ধ্বংস হোক”।
হাদীসে উল্লেখিত 'ফারাত্ব' শব্দের অর্থঃ কাফেলার অগ্রগামী ব্যক্তি যিনি তাদের জন্য পানি তালাশ করতে যান। হাদীসে উল্লেখিত আরেকটি শব্দঃ 'সুহকু' যার অর্থঃ ধ্বংস অথবা রহমত থেকে দূরে সরে যাওয়া।
বেদ'আত দ্বীনকে বিভৎসকারী, এর বিভিন্ন নিদর্শনকে পরিবর্তনকারী। মোট কথাঃ مسلمانوں দ্বীন ও দুনিয়ার বিভিন্ন কর্মকান্ডে বেদ'আত অত্যন্ত ভয়াবহ।
বেদ'আতের কারণঃ
বেদ'আতের অনেক কারণ আছে, সবচেয়ে বড় কারণ হলোঃ মহান আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস এবং সালফে সালেহীন তথা উম্মাতের সঠিক পথের দিশা প্রাপ্ত পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল লোকদের আদর্শ থেকে দূরে অবস্থান করা, যা শরীয়তের উৎস সম্পর্কে অজ্ঞতায় নিপতিত করতে বাধ্য।
বেদ'আত প্রসার লাভের অন্যতম কারণ হচ্ছেঃ সন্দেহসুচক বিষয় নিয়ে পড়ে থাকা, শুধুমাত্র বিবেক-বুদ্ধি নির্ভর হওয়া, অসৎলোকদের সংসর্গ, দুর্বল ও বানোয়াট হাদীস-বেদ'আতীগণ যে গুলো দ্বারা তাদের বেদ'আতের উপর দলীল গ্রহণ করে থাকে- সেগুলোর উপর ভিত্তি করা, কাফেরদের অনুকরণ, পথভ্রষ্টদের অন্ধ অনুসরণ ইত্যাদি বিভিন্ন মারাত্মক কারণসমূহ।
বেদ'আতের ভয়াবহতাঃ
কুরআন ও সুন্নায় কেউ গবেষণা করলে দেখতে পাবে যে, দ্বীনের মধ্যে বেদ'আত করা হারাম আর তা বেদ'আতকারীর উপর পুনঃ প্রত্যাবর্তিত হবে। এখানে কোন বেদ'আত থেকে অন্য বেদ'আতকে ভিন্ন ভাবে দেখার ও তারতম্য করার সুযোগ নেই। যদিও বেদ'আতের আকৃতি প্রকৃতি হিসেবে তার হারামের মধ্যে বিভিন্ন স্তর আছে।
জানা কথা যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেদ'আতকে নিষেধ করে যা বলেছেন তা একভাবেই এসেছে, তিনি বলেছেনঃ
(إياكم ومحدثات الأمور فإن كل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة)¹
"তোমরা (দ্বীনের মধ্যে) নতুনভাবে উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকবে; কেননা (দ্বীনের মধ্যে) প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত পন্থাই বেদ'আত, আর প্রত্যেক বেদ'আতই ভ্রষ্টতা”¹。
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ
(من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد)²
"যে আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে এমন কিছুর উদ্ভব ঘটাবে যার অস্তিত্ব এখানে নেই তা প্রত্যাখ্যাত হবে”²。
এ দু'টি হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত হচ্ছে যে, দ্বীনের মধ্যে প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত পন্থাই বেদ'আত। আর প্রত্যেক বেদ'আতই ভ্রষ্টতা ও প্রত্যাখ্যাত। এর অর্থ দাঁড়ায়ঃ ইবাদাত ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বেদ'আত করা হারাম, তবে বেদ'আতের প্রকৃতি অনুসারে হারামেরও স্তর রয়েছে। তম্মধ্যে কোনটি স্পষ্ট কুফরী যেমনঃ কবরবাসীর নৈকট্যলাভের জন্য তার কবরের চারপাশে তাওয়াফ করা, কবরবাসীর জন্য যবেহ ও মানত করা, কবরবাসীকে কিছু চাওয়ার জন্য আহবান করা এবং বিপদে তাদের কাছে উদ্ধার কামনা করা।
আবার কোন কোন বেদ'আত শির্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যেমনঃ কবরের উপর ঘর তোলা, কবরের কাছে নামায ও দো'আ করা।
আবার কোন কোন বেদ'আত গুনাহ ও নাফরমানী যেমনঃ এমন কোন ঈদ বা পর্ব পালন করা যার অস্তিত্ব শরীয়তে নেই, বেদ'আতী যিকির আযকারসমূহ, বিয়ে না করা তথা বৈরাগ্য অবলম্বন, সূর্যের তাপে দাঁড়িয়ে থেকে রোযা রাখা।
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৫৮৩), (৬৫৮৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৯০)。
¹ হাদিসটি বর্ণনা করেন ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ (১/৪৩৫), দারমী তার সুনান (১/৭৮), হাকিম তার মুস্তাদরাকঃ (২/৩১৮) এবং সহীহ সনদ বলে মত পেশ করেছেন, ইমাম যাহাবীও তা সমর্থন করেছেন。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ২৬৯৭), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৭১৮)。
📄 বিচ্ছিন্নতা ও মতানৈক্যের নিন্দা
বিচ্ছিন্নতা নিন্দনীয় হওয়ার দলীলঃ
আল্লাহ তা'আলা বিচ্ছিন্নতাকে নিন্দা করেছেন এবং যে সমস্ত পথ ও কারণ বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয় তা থেকে নিষেধ করেছেন। বিচ্ছিন্নতা ও মতভেদ করা থেকে সাবধান করে, তার খারাপ পরিণাম নির্দেশ করে এবং তা যে দুনিয়াতে অসম্মানের অন্যতম বৃহৎ কারণ আর আখিরাতে শাস্তি, লজ্জাজনক পরিণতি এবং কালো চেহারা বিশিষ্ট হওয়ার কারণ তা বর্ণনা করে কুরআন ও সুন্নায় অনেক দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
۞ وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ * يَوْمَ تَبْيَضُ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ الْفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ * وَأَمَّا الَّذِينَ ابْيَضَتُ وُجُوهُهُمْ فَفِي رَحْمَةِ اللَّهِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ ﴾ (آل عمران : ۱۰۵-۱۰۷)
“তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করেছে। তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। সেদিন কিছু মুখ উজ্জল হবে এবং কিছু মুখ কালো হবে, যাদের মুখ কালো হবে (তাদের বলা হবে) তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফুরী করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তি ভোগ কর, যেহেতু তোমরা কুফুরী করতে। আর যাদের মুখ উজ্জল হবে তারা আল্লাহর অনুগ্রহে থাকবে, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে”। [সূরা আলে-ইমরানঃ ১০৫-১০৭]
ইবনে আব্বাস বলেনঃ "আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের' (তথা সুন্নাতের অনুসারী এবং এক মত ও পথে সুসংঘবদ্ধ যারা তাদের) চেহারা শুভ্র হবে, আর যারা বেদ'আত কারী এবং মতানৈক্যকারী তাদের চেহারা কালো হবে'।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
۞إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ (الأنعام: ১৫৯).
“যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন দায়িত্ব আপনার নয়, তাদের বিষয় আল্লাহর নিকট, তারপর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানাবেন”।
উপরোক্ত আয়াতসমূহ এ প্রমাণ বহণ করছে যে, বিচ্ছিন্নতা নিন্দনীয়, মুসলিম জাতির উপর দুনিয়া ও আখিরাতে এর পরিণতি ভয়াবহ এবং এ বিচ্ছিন্নতাই আহলে কিতাব তথা ইহুদী ও নাসারাদের ধ্বংসের কারণ। আর এটাই মানুষের মধ্যে ঘটে যাওয়া যাবতীয় বক্রতার কারণ।
রাসূলের সুন্নাহ থেকে এর প্রমাণঃ
বিচ্ছিন্নতাও মতানৈক্যের নিন্দায় এবং দলবদ্ধভাবে পরস্পর মিলেমিশে থাকার উপর উৎসাহিত করে অনেক হাদীস এসেছে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইমাম আহমাদ ও আবু দাউদ কর্তৃক মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি দাঁড়ালেন, তারপর বললেনঃ “সাবধান! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন তারপর বললেনঃ
ألا إن من قبلكم من أهل الكتاب افترقوا على اثنتين وسبعين ملة. وإن هذه الأمة ستتفرق على ثلاث وسبعين ملة اثنتان وسبعون في النار وواحدة في الجنة وهي الجماعة)¹
“সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাবগণ বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে আর এ উম্মাত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে, তম্মধ্যকার বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে, এক দল জান্নাতে যাবে, আর তাহচ্ছে 'আল জামা'আত'"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিয়েছেন যে, তার উম্মাত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে, বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে, নিঃসন্দেহে তারা ঐ সমস্ত লোক যারা তাদের পূর্ববর্তীদের মতই মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে যে বিভিন্ন মতে বিভক্ত হবে বলেছেন তা হতে পারে শুধু দ্বীনের ব্যাপারে, হতে পারে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়টির ব্যাপারে, যার শেষ পরিণতি দ্বীনের ব্যাপারে এসে ঠেকবে। আবার হতে পারে তা শুধু দুনিয়াবী ব্যাপারে। সে যাই হোক, এ উম্মাতের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও মতানৈক্য ঘটবেই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে সাবধান করে গেছেন যাতে করে আল্লাহ যাকে তা থেকে নিরাপদ রাখতে চান তিনি তা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।
মতানৈক্য ও বিচ্ছিন্নতা পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসের কারণঃ
আমরা যদি কুরআন ও সুন্নাহ নিয়ে চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাব, পূর্ববর্তী সমস্ত জাতির ধ্বংসের পিছনে যা কাজ করেছে তাহলো বিচ্ছিন্নতা এবং মতানৈক্যের আধিক্য, বিশেষ করে তাদের উপর অবতীর্ণ কিতাবের মধ্যে মতভেদে লিপ্ত হওয়া।
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন দেখতে পেলেন সিরিয়া ও ইরাকের অধিবাসীগণ কুরআনের বিভিন্ন হরফ নিয়ে এমন মতভেদে লিপ্ত হয়ে পড়ছে যা থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন, তখন তিনি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেনঃ “আপনি এ উম্মাতকে উদ্ধার করুন, তারা যেন পূর্ববর্তী উম্মাতদের মত কিতাবের মধ্যে বিভিন্ন মতে বিভক্ত না হয়ে পড়ে”। এ থেকে আমরা দুটি বিষয়ের শিক্ষা পাইঃ
একঃ এ ধরনের মতভেদ করা হারাম।
দুইঃ আমাদের পূর্ববর্তীদের থেকে শিক্ষা নেয়া, তাদের অনুরূপ হওয়া থেকে সাবধান থাকা। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿ ذَلِكَ بِأَنَّ اللهَ نَزَّلَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِي الْكِتَبِ لَفِي شَقَاقَ بَعِيدٍ ﴾ (البقرة : ١٧٦).
“সেটা এ জন্যই যে, আল্লাহ সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন আর যারা কিতাব সম্মন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করেছে অবশ্যই তারা সুদূর বিবাদে লিপ্ত”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৭৬]
এবং আল্লাহর বাণীঃ
﴿وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ الَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُم ﴾ (آل عمران: ۱۹)
"আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তারা পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ তাদের নিকট জ্ঞান আসার পর মতানৈক্য ঘটিয়েছিল”। [সূরা আলে-ইমরানঃ ১৯]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ থেকে এর দলীল, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
ذروني ما تركتكم فإنما هلك من كان قبلكم بكثرة سؤالهم واختلافهم على أنبيائهم فإذا نهيتكم عن شيء فاجتنبوه، وإذا أمرتكم بأمر فأتوا منه ما استطعتم)¹
“তোমাদেরকে আমি যতক্ষণ কোন কিছু বলা থেকে বিরত থাকি ততক্ষণ তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও; কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীগণ কেবলমাত্র তাদের নবীদেরকে বেশী প্রশ্ন করার ও মতভেদে লিপ্ত হওয়ার কারণে ধ্বংস হয়েছিল। সুতরাং তোমাদেরকে যখন আমি কোন বস্তু থেকে নিষেধ করি তখন তা পরিত্যাগ করবে, আর যখন কোন কাজ করতে আদেশ করি তখন তা যতটুকু সম্ভব পালন করবে”।
এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয়নি তা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন; কেননা পূর্ববর্তীদের ধ্বংশের কারণই ছিলো অধিকহারে প্রশ্ন উত্থাপন এবং নাফরমানী তথা তাদের নবীদের নির্দেশের বিরোধিতার মাধ্যমে তাদের সাথে মতভেদে লিপ্ত হওয়া।
মতানৈক্য কি রহমত স্বরূপ?
)اختلاف أمتي رحمة( "আমার উম্মাতের মতানৈক্য রহমত” এ বানোয়াট হাদীসের উপর ভিত্তি করে কিছু লোক দাবী করে যে, মতভেদ রহমত। এ কথা কুরআন, সুন্নাহ ও সুস্থ বিবেক দ্বারা প্রত্যাখ্যাত। আমরা ইতিপূর্বে বেশ কিছু আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করেছি যাতে বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হওয়ার নিন্দা করা হয়েছে। চিন্তাশীল ও গবেষকদের জন্য তাই যথেষ্ট।
বরং কুরআন প্রমাণ করছে যে, ভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হওয়ার সাথে রহমত একসাথে থাকতে পারে না বরং তার একটি অপরটির বিপরীত। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ * َّا مَنْ رَحِمَ رَبُّكَ (هود: ۱۱۸ ، ۱۱۹)
“তারা মতভেদ করতেই থাকবে তবে তারা নয় যাদেরকে আপনার প্রতিপালক রহমত করেন”। [সূরা হুদঃ ১১৮-১১৯]
যে হাদীসটি দিয়ে উপরোক্ত মতের দাবীদারগণ দলীল নিয়েছেন সে হাদীসটি বাতিল, কোন অবস্থায়ই শুদ্ধ হতে পারে না। হাদীসের কোন কিতাবেই এ ধরনের হাদীস পাওয়া যায় না। আর এটাই উপরোক্ত দাবী বাতিল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সর্বপরি তা সুস্থ বিবেকেরও বিরোধী; কেননা ছোট খাট মাসআলায় মতানৈক্য করার কারণে মানুষের মাঝে যে হিংসা, হানাহানি, সম্পর্কচ্যুতি, বরং অনেক সময় হত্যা ও যুদ্ধবিগ্রহের রূপ ধারণ করার মত মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা জানার পরে কোন বিবেকবান ব্যক্তি মত-পার্থক্যকে রাহমত হিসাবে কল্পনা করতে পারে না।
বিচ্ছিন্নতা ও মতানৈক্য থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ঃ
জানা কথা যে, মুক্তি প্রাপ্ত, সাহায্যপ্রাপ্ত দল হলোঃ আল জামা'আত। আর জামা'আত হলো ঐ সমস্ত লোকদের দল যারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবাদের আদর্শ অনুসরণ করে চলে। তারা এ পথ থেকে বিচ্যুত হয় না, এ পথ থেকে তারা ডানে বামে সামান্যও সরে যায় না।
শাত্বেবী রাহেমাহুল্লাহ তার 'ই'তিসাম' গ্রন্থে বলেনঃ 'জামা'আত হলোঃ যার উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবাগণ এবং সঠিকভাবে তাদের অনুসারীগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন'। সুতরাং মুক্তির পথ হলোঃ কথা, কাজ ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের পথের অনুসরণ করা। তাদের বিরোধিতা বা তাদের থেকে পৃথক মত ও পথ গ্রহণ না করা।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ﴾ (النساء: ١١٥)
"আর যে কেউ সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তাকে আমরা যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় সেদিকে ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করাব, আর তা কত মন্দ আবাস!”। [সূরা আন-নিসাঃ ১১৫]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿ وَأَنَّ هَٰذَا صِرَٰطِي مُسْتَقِيمًا فَٱتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُواْ ٱلسُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِۦ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴾ (الأنعام: ١٥٣)
"আর এ পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করবে এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে, এভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও। [সূরা আল-আন'আমঃ ১৫৩]
রাসূলের সুন্নায় এসেছে, যা তিরমিযী ও অন্যান্যগণ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
( لا تجتمع أمتي على ضلالة - أو قال: أمة محمد على ضلالة – ويد الله على الجماعة )¹
"আমার উম্মাত অথবা বলেছেনঃ "মুহাম্মাদের উম্মাত কোন ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যমতে পৌঁছবে না। আর আল-জামা'আতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে”।
আর এর মাধ্যমেই আমরা এ বইয়ের সমাপ্তি টানতে চাচ্ছি যে, মুক্তির পথ ও সৌভাগ্যের চাবিকাঠি হলোঃ আল্লাহর কিতাব তথা কুরআনুল কারীমকে আঁকড়ে ধরা। বস্তুতঃ এটা এমন এক কিতাব যার সামনে বা পিছনে কোন দিক দিয়ে বাতিল প্রবেশ করতে পারে না, সর্বপ্রশংসিত, ও সবচেয়ে বিজ্ঞ যিনি তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। অনুরূপভাবে মুক্তি ও সৌভাগ্য নির্ভর করছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে প্রমাণিত পবিত্র সহীহ সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মধ্যে, যিনি নিজ মনগড়া কোন কথা বলেন না, যা বলেন তা সবই তাঁর কাছে পাঠানো ওহী। কেননা ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস ও শরীয়তের একমাত্র উৎস হলো এ দু'টি অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ। সুতরাং এ পথ থেকে যে আদর্শ দূরে থাকবে সেটা হবে ক্ষতিকারক। তাই সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা মু'মিনদের পথ, সমস্ত জগতের প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের পথ, মজবুত দূর্গ। আর এ আদর্শ দ্বারাই আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতকে বেদ'আতকারীদের বেদ'আত, বাতিলপন্থীদের উদ্ভাবিত পন্থা, মূর্খদের অপব্যাখ্যা এবং সীমালংঘনকারীদের পরিবর্তন-পরিবর্ধন থেকে হেফাযত করবেন। এ পথেই ইসলামের প্রাথমিক যুগে এ জাতির অবস্থা সংশোধিত হয়েছিল। তাই এ আদর্শের দিকে প্রত্যাবর্তন ছাড়া আমাদের কোন শান্তিও নেই, সফলতাও নেই।
দারুল হিজরাহ তথা মদীনার ইমাম মালেক ইবনে আনাস রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ 'যা দ্বারা এ উম্মাতের প্রাথমিক যুগের লোকেরা সঠিক পথে সংশোধিত হয়েছিল কেবলমাত্র তা দিয়েই এর পরবর্তী যুগের লোকেরা সংশোধিত হবে'। এ উম্মাতের প্রাথমিক যুগের লোকেরা আল্লাহর কুরআন ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নার অনুসরণের মাধ্যমেই সংশোধিত হয়েছিল। এখানে আরেকটি বিষয় প্রত্যেক মুসলিম মাত্রই জানা জরুরী, তা'হলো কুরআন ও সুন্নার উপর আমল করা যেন সালফে সালেহীন তথা সৎকর্মশীল পূর্ববর্তী মনিষীদের বুঝ ও তাদের কর্মপন্থা অনুসারে হয়; কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنَصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا (النساء : ١١٥)
"আর যে কেউ সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মু'মিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তাকে আমরা যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় সেদিকে ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করাব, আর তা কত মন্দ আবাস!”। [সূরা আন-নিসাঃ ১১৫]
সুতরাং মু'মিনদের পথ তথা সাহাবা এবং সঠিকভাবে তাদের অনুসারী হেদায়াতপ্রাপ্ত ইমামগণের পথের অনুসরণই হচ্ছে মুক্তির পথ।
আমরা আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি তিনি যেন মুসলিম জাতিকে তাদের প্রভুর কিতাব কুরআনুল কারীম ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ এবং মু'মিনদের পথকে আঁকড়ে ধরার তাওফীক দান করেন।
আর সর্বশেষ আমাদের দো'আ থাকবে যে, সমস্ত সৃষ্টি জগতের প্রভু আল্লাহর জন্যই যাবতীয় প্রশংসা।
আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তার পরিবারবর্গ ও তার সমস্ত সাথীদের উপর সালাত পেশ করুন।
টিকাঃ
¹ হাদিসটি ইমাম আহমাদ (৪/১৫২), আবু দাউদ (৫/৫) ও অন্যান্যগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭২৮৮), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৩৩৭)。
¹ তিরমিযী হাদীসটি (৪/৪৬৬) বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন。