📄 মু'সলমানদের ইমাম বা শাসকের প্রতি, এবং সাধারণ মানুষের প্রতি করণীয় এবং তাদের দলভূক্ত থাকা
ইমাম মুসলিম আবু রুকাইয়া তামীমুদ্দারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(الدين النصيحة، الدين النصيحة، الدين النصيحة، قلنا: لمن يا رسول الله؟ قال: الله ولرسوله ولكتابه ولأئمة المسلمين وعامتهم)
“দ্বীন হলো নসীহত, দ্বীন হলো নসীহত, দ্বীন হলো নসীহত”, আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! নসীহত কাদের জন্য? তিনি বললেনঃ “আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, মুসলমানদের ইমামের জন্য এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য”¹。
আল্লাহর জন্য নসীহত বলতে বুঝায়ঃ একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করা, তাঁকে সম্মান করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর কাছেই কোন কিছু কামনা করা, তাঁকেই ভালবাসা, তাঁর আদেশ মান্য করা এবং তাঁর নিষিদ্ধ বস্তু পরিত্যাগ করা।
তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য নসীহত হলোঃ তিনি যে সমস্ত বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন তার উপর বিশ্বাস স্থাপন, তিনি যে নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলো পালন করা, তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ, তাঁর আদর্শ ও ভালবাসা অনুসারে পথ চলা এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন শুধুমাত্র সে অনুসারে আল্লাহর ইবাদাত করা।
মুসলমানদের ইমামের জন্য নসীহত বলতে বুঝায়ঃ তাদের জন্য দো'আ করা, তাদের ভালবাসা এবং আল্লাহর নির্দেশের গন্ডির ভিতরে তাদের আনুগত্য করা।
আর সাধারণ مسلمانوں জন্য নসীহত বলতে বুঝায়ঃ তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করা, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা, যেমনিভাবে আমরা আমাদের নিজেদের জন্য শুভ কামনা করি তেমনিভাবে তাদেরও কল্যাণ কামনা করা, আমাদের সাধ্য অনুযায়ী তাদের জন্য যা কল্যাণকর হবে তা ব্যয় করা ও তাদের সহযোগিতা করা।
শাসকদের প্রতি আমাদের করণীয়ঃ
কুরআন, সুন্নাহ এবং এ উম্মাতের সালফে সালেহীন তথা সঠিক পথের দিশারী আলেমগণের ঐক্যমত প্রমাণ করছে যে, আল্লাহর নির্দেশের গন্ডির ভিতরে থেকে শাসকের আনুগত্য করা ওয়াজিব, যদিও তারা অত্যাচার করে, যতক্ষণ তিনি গুনাহর কাজের নির্দেশ না দিবেন। যদি গুনাহর কাজের নির্দেশ দেন তখন স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে সৃষ্টি জগতের কারোরই আনুগত্য করা যাবেনা। তাদের পিছনে নামায পড়া ওয়াজিব, তাদের সাথে হজ্জ ও জিহাদ করা ওয়াজিব। যে সমস্ত মাসআলার মধ্যে ইজতেহাদ বা দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করার অধিকার রয়েছে সে সমস্ত মাসআলাতে তার আনুগত্য করতে হবে। ইজতেহাদী বিষয়ে শাসকের উপর তার অনুসারীদের আনুগত্য করা ওয়াজিব নয়, বরং তারা সেগুলোতে শাসকের অনুসরণ করবে, তার মতের বিপরীত মত পরিত্যাগ করবে; কেননা সর্বসাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণ, তাদেরকে একত্রিতকরণ এবং বিচ্ছিন্নতা ও মতভেদ থেকে বেঁচে থাকা বিশেষ স্বার্থের চেয়ে অনেক বড়। অনুরূপভাবে শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে তাকে নসীহত করা, তার আনুগত্য ত্যাগ করার চেষ্টা পরিত্যাগ করা, এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা ওয়াজিব।
ইমাম ত্বাহাবী রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ 'আমরা আমাদের ইমাম ও শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পক্ষে মত দেই না, যদিও তারা অত্যাচার করুক। আমরা তাদের উপর বদদো'আ করিনা, তাদের আনুগত্য ত্যাগ করিনা, আমাদের মতে যতক্ষণ তারা কোন গোনাহ বা অন্যায় কাজের নির্দেশ না দিবেন ততক্ষণ তাদের আনুগত্য করা ফরয, মহান আল্লাহর আনুগত্যের শামিল। আমরা তাদের সঠিক পথ লাভ ও নিরাপত্তার জন্য দো'আ করি।
কুরআন ও সুন্নায় এর উপর অনেক দলীল-প্রমাণাদি রয়েছে, তম্মধ্যে কুরআন থেকে প্রমাণ আল্লাহর বাণীঃ
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ (النساء : ٥٩).
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর আরো আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের”। [সূরা আন-নিসাঃ ৫৯]
হাদীস থেকে প্রমাণঃ ابو হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
(من أطاعني فقد أطاع الله، ومن عصاني فقد عصى الله، ومن يطع الأمير فقد أطاعني، ومن يعص الأمير فقد عصاني)¹
"যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল, যে আমার অবাধ্য হলো সে আল্লাহর অবাধ্য হলো, অনুরূপভাবে যে আমীর তথা শাসকের আনুগত্য করল সে আমার আনুগত্য করল, আর যে আমীরের অবাধ্য হলো সে আমার অবাধ্য হলো”¹。
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(على المرء المسلم السمع والطاعة فيما أحب وكره إلا أن يؤمر بمعصية، فإذا أمر بمعصية فلا سمع ولا طاعة)²
"গুনাহের কাজের নির্দেশ দেয়া ছাড়া পছন্দ অপছন্দ সর্বাবস্থায় তাদের কথা শোনা ও মানা প্রত্যেক মুসলিমের উপরই ওয়াজিব, যখন গুনাহের কাজের নির্দেশ দিবে তখন তা শোনাও যাবে না, মানাও যাবে না”²。
যাবতীয় বিশৃংখলা ও ভীতিমূলক পদ্ধতি ব্যবহার থেকে দূরে অবস্থান করে ইমামকে গোপনে নসীহত করা হচ্ছে রাসূলের নীতি বা আদর্শ। এর প্রমাণ হলোঃ ইমাম ইবনে আবী 'আসিম এবং অন্যান্যগণ কর্তৃক বর্ণিত 'ইয়াদ ইবনে গাম রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(من أراد أن ينصح لذي سلطان فلا يبده علانية، وليأخذ بيده فإن سمع منه فذاك، وإلا أدى الذي عليه)¹
"যদি কেউ ক্ষমতাধর কাউকে নসীহত করতে চায় সে যেন তা প্রকাশ্যে না করে, বরং সে যেন তার হাত ধরে (অর্থাৎ গোপনে বলে) যদি সে তা গ্রহণ করল তবে তার কাজে আসল, আর যদি গ্রহণ না করল তাহলে সে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব আদায় করল”¹。
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উপস্থাপিত এ দলীল-প্রমাণগুলি গুনাহের কাজ ছাড়া অন্যান্য যাবতীয় ব্যাপারে ইমাম ও শাসকগোষ্ঠির আনুগত্য করার নির্দেশ দিচ্ছে, আমরা তার সার-সংক্ষেপ হিসাবে বলতে পারিঃ
১. গুনাহর কাজ ছাড়া সর্বাবস্থায় শোনা ও মানা ওয়াজিব।
২. শাসকগোষ্ঠী যদি নসীহত কবুল না করে তারপরও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা।
৩. যে কেউ শরীয়ত সমর্থিত পদ্ধতিতে শাসকগোষ্ঠীকে নসীহত করল এবং তাদের কর্মকান্ডের সমালোচনা করল সে গুনাহ থেকে মুক্তি পেল।
৪. ফিৎনা ফাসাদ সৃষ্টি করা নিষেধ অনুরূপভাবে যে সমস্ত কারণে ফিতনা বা অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে তা করাও নিষেধ।
৫. যতক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমতাশীলদের থেকে এমন কোন সুস্পষ্ট কুফুরী প্রকাশ না পাবে যা কুফুরী হওয়ার ব্যাপারে কোন প্রকার দ্বিমত থাকবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবেনা।
৬. কথা, কাজ ও বিশ্বাসে কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শে পরিচালিত মুসলমানদের জামা'আতকে আঁকড়ে ধরে থাকা ওয়াজিব, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে, তাদের পথে চলতে হবে, হক ও ন্যায়ের পথে তাদের কথা এক রাখার ব্যাপারে আগ্রহ থাকতে হবে। তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না বা তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করা যাবেনা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ﴾ (النساء : ١١٥)
"কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মু'মিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সেদিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস”। [সূরা আন-নিসাঃ ১১৫]
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(عليكم بالجماعة فإن يد الله مع الجماعة، ومن شذ شذ في النار)
"তোমাদের উপর ওয়াজিব একতাবদ্ধ থাকা; কেননা একতাবদ্ধ লোকদের সাথে আল্লাহর হাত রয়েছে, আর যারা তাদের থেকে বের হয়ে ভিন্ন হয়ে যাবে, ভিন্নভাবে সে জাহান্নামে যাবে”¹。
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
(من رأى من أميره شيئاً يكرهه فليصبر، فإنه من فارق الجماعة شبراً فمات فميتته جاهلية)
"কেউ তার আমীরের অপছন্দনীয় কোন কিছু দেখলে সে যেন তার উপর ধৈর্য্যধারণ করে; কেননা مسلمانوں দল থেকে এক বিঘত পরিমাণ বিচ্যুত হবার পরে কারো মৃত্যু হলে তার মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু বলে বিবেচিত হবে”²。
কুরআন ও হাদীসের এ সমস্ত বাণী প্রমাণ করছে যে, মুসলিম জামা'আতের সাথে থাকা, ক্ষমতাশীলদের ক্ষমতা নিয়ে টানাটানি না করা ওয়াজিব। যারা এর বিরোধিতা করবে তাদের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে; কেননা জামা'আত তথা একতাবদ্ধ থাকার মধ্যে রহমত রয়েছে পক্ষান্তরে বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে শাস্তি।
টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৫৫)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭১৩৭)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭১৪৪)。
¹ হাদীসটি ইবনে আবি আসিম তার সুন্নাহ গ্রন্থে (২/৫০৭) বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন。
¹তিরমিযী (হাদীস নং ২১৬৭), ইবনে আবি 'আসিম: সুন্নাহ (হাদীস নং ৮০)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭১৪৩)。