📄 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার-পরিজন ও তাদের অধিকার সম্পর্কে, আর তার স্ত্রীগণ যে তারই পরিবার-পরিজনের মধ্যে গণ্য তার বর্ণনা
"আহলে বাইত” এর পরিচয়ঃ
আহলে বাইত (বা ঘরের লোক) বলতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশের ঐ পরিবারসমূহকে বুঝায় যাদের উপর সাদকা গ্রহণ করা হারাম। আর তারা হলোঃ আলী ইবনে আবি তালিবের বংশধর, জা'ফরের বংশধর, আব্বাসের বংশধর, হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর। অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ ও এর অন্তর্ভুক্ত।
"আহলে বাইত” এর ফযীলত বা মর্যাদার প্রমাণসমূহঃ
মহান আল্লাহর বাণীঃ
إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا له (الأحزاب : ٣٣) .
“হে নবী পরিবারের লোকেরা! আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে, আর তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”। [সূরা আল-আহযাবঃ ৩৩]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أذكركم الله في أهل بيتي)¹
"আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি”।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ আহলে বাইতের মধ্যে শামিল হওয়াঃ
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
ينِسَاءَ النَّبِي لَسْتُنَ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا * وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَتَبَرَجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصلوة وَاتِينَ الزَّكوةَ وَأَطِعْنَ اللهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا * وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللهِ وَالْحِكْمَةِ إِنَّ اللهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا (الأحزاب: ٣٢-٣٤).
“হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, সুতরাং তোমরা এমন কোমল কন্ঠে কথা বলো না যাতে করে যার অন্তরে রোগ রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে এবং তোমরা ন্যায় সংগত কথা বল। আর তোমরা নিজস্ব গৃহে অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহেলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িওনা। তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাক। হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা যা তোমাদের ঘরে পাঠ করা হয় তা তোমরা স্মরণ কর, অবশ্যই আল্লাহ অত্যন্ত সুক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত। [সূরা আল-আহযাবঃ ৩২-৩৪]
ইমাম ইবনে কাসীর রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ 'তারপর কুরআনের গবেষনাকারী নিঃসন্দেহে বলতে পারে যে, নবীর স্ত্রীগণ আল্লাহর বাণীঃ
إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا ﴾
“হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”, এ আয়াতের মধ্যে অবশ্যই শামিল হবে; কেননা এ বাক্যের পূর্বের কথা তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর এ জন্যই আল্লাহ এ সব কিছুর পর বলেনঃ
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللهِ وَالْحِكْمَةِ ﴾
“আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা যা তোমাদের ঘরে পাঠ করা হয় তা তোমরা স্মরণ কর”, অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঘরে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কুরআন ও সুন্নাহ হতে যা অবতীর্ণ করেছেন তার উপর তোমরা আমল কর। ক্বাতাদা এবং আরো অনেকে বলেনঃ 'সমস্ত নারী জাতি হতে তোমাদেরকে এই যে বিশেষ নেয়ামত প্রদান করা হয়েছে তা স্মরণ কর”¹。
আহলে বাইতের ব্যাপারে অসীয়তঃ
"আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি” এ হাদীসটি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং আহলে সুন্নাত তাদেরকে ভালবাসেন, সম্মান করেন, তাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসীয়ত স্মরণ করেন; কেননা তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসা ও সম্মান করার শামিল। তবে শর্ত হলো তারা সুন্নাতের অনুসারী, মিল্লাতে মুহাম্মাদীয়ার উপর অটল থাকতে হবে যেমনটি তাদের পূর্বপুরুষগণ ছিলেন, যেমনঃ আব্বাস ও তার সন্তানগণ, 'আলী ও তার সন্তানগণ। কিন্তু যে ব্যক্তি সুন্নার বিপরীত কাজ করবে এবং দ্বীনের উপর অটল থাকবে না তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা জায়েয হবে না, যদিও সে আহলে বাইতের লোক হয়ে থাকে।
সুতরাং আহলে বাইতের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হলো সাম্য ও ইনসাফের অবস্থান। তাদের মধ্যে যারা দ্বীনদার, দ্বীনের উপর অটল তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখে, তাদের থেকে যারা সুন্নাত বিরোধী কাজ করবে, দ্বীন থেকে সরে যাবে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, যদিও তারা আহলে বাইতের লোক হোন না কেন; কেননা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীনের উপর অটল না হবে তখন পর্যন্ত সে আহলে বাইত এবং রাসূলের আত্মীয় হওয়া কোন উপকার দিবে না। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরঃ
﴿وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ ﴾ (الشعراء: ٢١٤)
"আপনার নিকটস্থ জ্ঞাতি-গোষ্ঠিকে ভয় দেখান” [সূরা আশ্ শু'আরাঃ ২১৪] এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি বললেনঃ
(يا معشر قريش أو كلمة نحوها، اشتروا أنفسكم لا أغني عنكم من الله شيئاً، يا بني عبد مناف لا أغني عنكم من الله شيئاً، يا صفية عمة رسول الله لا أغني عنك من الله شيئاً، ويا فاطمة بنت محمد سليني ما شئت من مالي لا أغني عنك مِّنَ اللهِ شَيْئًا)¹
“হে কুরাইশ সম্প্রদায়! অথবা এ প্রকারের একটি শব্দ, তোমরা তোমাদের নিজেদের ক্রয় করে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য কোন কিছুই করতে পারবো না। হে আবদে মান্নাফের বংশধর! আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট কোন কাজে আসব না। হে রাসূলুল্লাহর ফুফি সাফিয়্যা! আমি তোমার জন্য আল্লাহর নিকট কোন উপকারে আসব না। হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা! আমার সম্পদ থেকে যা কিছু আছে চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমার জন্য কিছুর মালিক হব না”¹。
অন্য এক হাদীসেও এসেছেঃ
(مَنْ بَطَأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ)¹
“যার কর্মকান্ড তাকে দেরী করায় তার বংশ তাকে তাড়াতাড়ি করায় না”²。
হাদীসের শব্দ “মান বাত্তা’আ” এর অর্থ যাকে দেরী করায়, পিছনে ফেলে দেয়।
যারা কোন কোন আহলে বাইতের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে এবং তাদের জন্য নিষ্পাপ হওয়ার দাবী করে, আর যারা আহলে বাইতের মধ্যে দ্বীন ও সুন্নার উপর অটল তাদের প্রতি যারা বিদ্বেষ পোষণ করে তাদের মর্যাদায় আঘাত করে, অনুরূপভাবে বেদ'আতকারী, বাজে কর্মকান্ডে লিপ্ত লোকেরা যারা আহলে বাইতের লোকদের অসীলা ধরে এবং তাদেরকে আল্লাহ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ করে; আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত তাদের সাথে সম্পর্ক রাখে না।
সুতরাং এ ক্ষেত্রেও অন্যান্য ক্ষেত্রের মত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মধ্যম পন্থা ও সরল সোজা পথের উপর আছে যেখানে নেই কোন বাড়াবাড়ি, নেই কোন কমতি বা ঘাটতি।
টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৪০৮)。
¹ তাক্সীরে ইবনে কাসীর (৬/৪১১)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৭৭১), মুসলিম (হাদীস নং ২০৪)。
² মুসলিম (হাদীস নং ২৬৯৯)。
📄 খোলাফায়ে রাশেদা, তাদের ফযীলত ও তাদের প্রতি যা যা করণীয় এবং তাদের ক্রম নির্ধারণ
"খোলাফায়ে রাশেদীন” এর পরিচয়ঃ
খোলাফায়ে রাশেদীন হলেনঃ আবু বকর আসসিদ্দীক, উমর ইবনুল খাত্তাব (ফারুক), যুনূরাইন উসমান ইবনে আফফান এবং রাসূলের দু' নাতির পিতা 'আলী ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আরদাহুম।
তাদের মর্যাদা ও তাদের অনুসরণ করা ওয়াজিব হওয়ার বর্ণনাঃ
খোলাফায়ে রাশেদীন সাহাবাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ। আর তারাই ঐ সমস্ত খলীফা যারা সঠিক পথের দিশা প্রদানকারী, হেদায়াতপ্রাপ্ত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের আনুগত্য ও আদর্শ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেমন 'ইরবাদ ইবনে সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أوصيكم بالسمع والطاعة، فإنه من يعش منكم بعدي فسيرى اختلافاً كثيراً فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ، وإياكم ومحدثات الأمور، فإن كل بدعة ضلالة)¹
"তোমাদেরকে আমি শোনা ও মেনে নেয়ার অসীয়ত করছি, তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে তারা অনেক মত পার্থক্য দেখতে পাবে তখন তোমাদের করণীয় হবে আমার সুন্নাতের অনুসরণ করা এবং আমার পরে যে সমস্ত সঠিক পথের দিশা প্রদানকারী, হেদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাগণ আসবে তাদের সুন্নাকে অনুসরণ করা। তোমরা সেগুলো ধরে রাখবে, শক্ত ভাবে গোড়ালির দাঁতে কামড় দিয়ে ধরার মত আঁকড়ে থাকবে। আর নতুনভাবে আবিষ্কৃত যাবতীয় বিষয় থেকে সতর্ক থাকবে; কেননা প্রত্যেক বেদ'আত তথা দ্বীনের মধ্যে নতুন পন্থাসমূহ ভ্রষ্টতা”¹。
তাদের ফযীলতঃ
খলীফাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এ ব্যাপারে একমত যে, তাদের খিলাফতের ক্রমান্বয় অনুসারেই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত; তা যথাক্রমে আবু বকর, তারপর উমর, তারপর উসমান, তারপর আলী। তাদের প্রত্যেকের ফযীলত বর্ণনায় অনেক হাদীস এসেছে, তম্মধ্যে আমরা প্রত্যেকের জন্য একটি করে হাদীস উল্লেখ করব।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফযীলত বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মিম্বরে ছিলেন এমতাবস্থায় বললেনঃ
(لو كنت متخذاً من أهل الأرض خليلاً، لاتخذت أبا بكر خليلاً، لا يبقين في المسجد خوخة إلا سدت إلا خوخة أبي بكر)¹
"যদি আমি যমীনের কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু "খলীল” হিসাবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম, আবু বকরের আগমন পথ ব্যতীত এ মসজিদের সমস্ত গমন পথ বন্ধ করে দাও”।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফযীলত বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেনঃ
(قد كان في الأمم قبلكم محدثون، فإن يكن في أمتي أحد فإن عمر بن الخطاب منهم)²
"তোমাদের পূর্বেকার জাতিদের মধ্যে অনেকেই 'মুহাদ্দাস' ছিলেন, যদি এ জাতির মধ্যে কেউ থেকে থাকে তবে উমর ইবনুল খাত্তাব তাদের মধ্যে গণ্য হবে"²。
হাদীসে বর্ণিত 'মুহাদ্দাস' অর্থঃ মুলহাম তথা আল্লাহর পক্ষ থেকে যাদের মনে সঠিক সিদ্ধান্ত জাগিয়ে দেয়া হয় এমন ব্যক্তিত্ব।
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফযীলত বর্ণনায় 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আবু বকর প্রবেশ করলেন, তারপর উমর প্রবেশ করলেন, তারপর উসমান প্রবেশ করলেন; তাকে দেখার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসলেন এবং কাপড় চোপড় ঠিক করে নিলেন, 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ
(ألا أستحي من رجل تستحي منه الملائكة)¹
"আমি কি. এমন এক লোক থেকে লজ্জাবোধ করব না যাকে দেখে ফিরিস্তাগণও লজ্জাবোধ করে?"¹。
'আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফযীলত বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিমে সাহাল ইবনে সা'আদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের সন্ধ্যায় বললেনঃ
(لأعطين الراية غداً رجلاً يحب الله ورسوله، ويحبه الله ورسوله يفتح الله على يديه ... فقال : ادعوا لي علياً ... فدفع الراية إليه ففتح الله عليه)²
"আগামী দিন আমি এমন একজনকে ঝান্ডা দেব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে আর তাঁকেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালবাসে, তাঁর হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন"... তারপর বললেনঃ "আলীকে আমার কাছে ডেকে আন"... তারপর তাঁর হাতে ঝান্ডা দিলেন, ফলে আল্লাহ তাঁর হাতে বিজয় দিলেন'"²。
টিকাঃ
¹ হাদিসটি ইমাম আহমাদ (৪/১২৭-১২৯) তিরমিযী (৭/৪৩৮) বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৬৫৪)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৬৮৯), মুসলিম (হাদীস নং ২৩৯৮)。
¹সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৪০১)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৭০২), মুসলিম (হাদীস নং ২৪০৫)。
📄 জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন
পূর্বের আলোচনায় আমরা সাহাবাদের ফযীলত এবং তারা সবাই যে ন্যায়পরায়ণ সেটা জানতে পারলাম। আরো জানতে পারলাম যে, তারা রাসূলের সাহচর্যের দিক থেকে ফযীলতের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের। সর্বোৎকৃষ্ট সাহাবা হলেন ইসলাম গ্রহণে অগ্রণী প্রাথমিক পর্যায়ে হিজরতকারীগণ, তারপর আনসারগণ। তারপর বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, তারপর ওহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, তারপর আহযাব তথা খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, তারপর যারা “বাই'আতুর রিদওয়ান” বা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত বাই'আতে অংশগ্রহণ করেছেন তারা, তারপর মক্কা বিজয়ের পূর্বে হিজরতকারী ও জিহাদে অংশ গ্রহণকারীগণ ঐ সমস্ত লোকদের উপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী যারা হিজরতের পরে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে। মুলতঃ আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের জন্যেই প্রতিফল তথা জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সাহাবাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তিবর্গ হলেন খোলাফায়ে রাশেদীন যথাক্রমে আবু বকর আসিদ্দীক, উমর আল ফারূক, উসমান যুননুরাইন এবং রাসূলের দু' নাতির পিতা 'আলী ইবনে আলী তালিব। তারপর যাদের মর্যাদা তারা হলেন 'আব্দুর রাহমান ইবনে 'আউফ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য জীবন উৎসর্গকারী 'হাওয়ারী' যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম, অনুরূপভাবে সা'আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, আর এ উম্মাতের সবচেয়ে বড় আমানতদার ব্যক্তি বলে উপাধি প্রাপ্ত আবু 'উবাইদা ইবনুল জারাহ এবং সা'ঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে নুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহুম তাদের প্রত্যেকের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হউন।
তাদের ফযীলত বর্ণনায় সাধারণভাবে অনেক হাদীস এসেছে, আবার তাদের মাঝে কারো কারোর ব্যাপারে বিশেষ বিশেষ হাদীসও এসেছে। তাদের ফযীলত বর্ণনাকারী সাধারণ হাদীসসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইমাম আহমাদ ও আসহাবুসুনান তথা আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী এবং ইবনে মাজাহ কর্তৃক 'আব্দুর রাহমান ইবনে আখনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস। তিনি সা'ঈদ ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ
(عشرة في الجنة، النبي ﷺ في الجنة، وأبو بكر في الجنة، وعمر في الجنة، وعثمان في الجنة، وعلي في الجنة، وطلحة في الجنة، والزبير بن العوام في الجنة، وسعد بن مالك في الجنة، وعبد الرحمن بن عوف في الجنة)¹
"দশজন জান্নাতে যাবে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতে, আবু বকর জান্নাতে, উমর জান্নাতে, উসমান জান্নাতে, আলী জান্নাতে, ত্বালহা জান্নাতে, যুবাইর ইবনুল 'আওয়াম জান্নাতে, সা'দ ইবনে মালিক জান্নাতে এবং আব্দুর রহমান ইবনে 'আওফ জান্নাতে”।
'যদি তোমরা চাও তবে আমি দশম ব্যক্তির নামও বলে দিতে পারি, বর্ণনাকারী বলেনঃ তারপর তারা বললঃ কে সে? জবাবে তিনি চুপ থাকলেন, ফলে তারা আবার বললঃ কে সে? পরিশেষে তিনি বললেনঃ তিনি "সা'ঈদ ইবনে যায়েদ""।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দশজন ছাড়াও আরো অনেককে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন, যেমনঃ আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ, বিলাল ইবনে রাবাহ, 'উকাশা ইবনে মুহসিন, জা'ফর ইবনে আবি তালিব এবং আরো অনেক। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে যাদের নাম সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে তাদের ব্যাপারে জান্নাতে যাবার সাক্ষ্য দেয়; কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে তা এসেছে। তাদের ব্যতীত অন্যান্যদের ব্যাপারে কল্যাণের আশা রাখে; কেননা আল্লাহ তাদের জন্য সামগ্রিকভাবে জান্নাতের ওয়াদা করেছেন, যেমন আল্লাহ তা'আলা সাহাবাদের উল্লেখ করার পর তাদের কাউকে অপর কারোর উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানের কথা উল্লেখ করে বলেনঃ
وَكُلًّا وَعَدَ الله الحسنى (النساء: ٩٥).
"তাদের প্রত্যেকের জন্য আল্লাহ 'হুসনা' বা সবচেয়ে ভাল পরিণামের ওয়াদা করেছেন”। [সূরা আন-নিসাঃ৯৫] এখানে 'হুসনা' বলে জান্নাত বুঝানো হয়েছে।
অনুরূপভাবে সাধারণ মুসলমানদের কারোর জন্য অকাট্যভাবে জান্নাত বা জাহান্নাম কোনটার হুকুম না লাগানোই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা। তবে তারা তাদের নেক্কারদের জন্য সওয়াবের আশা করে, বদকারদের জন্য শাস্তির ভয় করে, যদিও তারা অকাট্যভাবে এটা বিশ্বাস করে যে, তাওহীদের উপর কারো মৃত্যু হলে সে চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নামে থাকবেনা; কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ (النساء : ١١٦).
"অবশ্যই আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করবেন না, এ ছাড়া যাবতীয় গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন”। [সূরা আনিসাঃ ১১৬]
টিকাঃ
¹হাদীসটি ইমাম আহমাদ (১/১৮৮) এবং সুনান গ্রন্থকারগণ সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন。