📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 সাহাবা কারা? তাদেরকে ভালবাসা ও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা

📄 সাহাবা কারা? তাদেরকে ভালবাসা ও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা


সাহাবীর পরিচয়ঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যে কেউ মুসলমান হিসাবে সাক্ষাৎ করবে এবং তার উপর তার মৃত্যু হবে সেই সাহাবী।

সাহাবাদের ভালবাসা ও তাদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক রাখাঃ সাহাবাগণ সর্বোত্তম প্রজন্ম, এ উম্মাতের বাছাই করা মানুষ। এ উম্মাতের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা, তাদেরকে ভালবাসা, তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকা, তাদেরকে তাদের জন্য নির্ধারিত মর্যাদায় অভিষিক্ত করা ওয়াজিব; কেননা তাদেরকে ভালবাসা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব, তাদেরকে ভালবাসা দ্বীন ও ঈমান বলে স্বীকৃত এবং রাহমান (আল্লাহ)-এর নৈকট্য লাভের উপায়। তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা কুফরী ও সীমালংঘন; কেননা তারা এ দ্বীনের ধারক বাহক, তাই তাদের উপর কোন প্রকার অপবাদ দেয়া সমস্ত দ্বীনের উপর অপবাদ দেয়ার নামান্তর; কারণ এ দ্বীন আমাদের কাছে তাদের মাধ্যমেই এসে পৌঁছেছে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে সরাসরি তাজা- টাটকা এ দ্বীন গ্রহণ করেছেন এবং আমাদের কাছে আমানত ও নিষ্ঠার সাথে বর্ণনা করেছেন। সমগ্র পৃথিবীর বুকে এক যুগের এক চতুর্থাংশেরও কম সময়ের মধ্যে এ দ্বীনকে প্রচার-প্রসার করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের হাতে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের বিজয় দিয়েছেন। ফলে দলে দলে লোক আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করেছে।

কুরআন ও সুন্নাহ প্রমাণ করছে যে, সাহাবাদের সাথে সম্পর্ক রাখা ও তাদেরকে ভালবাসা ওয়াজিব। মুলতঃ এটা কোন মানুষের ঈমানের সত্যতার উপর প্রমাণবহ। কুরআন থেকে দলীল, মহান আল্লাহর বাণীঃ
﴿وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ﴾ (التوبة: ٧١)
"আর মু'মিন নর-নারীগণ একে অপরের বন্ধু”। [সূরা আত্ তাওবাহঃ ৭১]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের ঈমান যখন অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো, বরং তারা ঈমানদারদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এজন্য যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের 'তাকিয়া' (প্রশংসা) করেছেন, তখন তাদের সাথে আন্তরিক সুসম্পর্ক রাখা ও তাদেরকে ভালবাসা ঐ ব্যক্তির ঈমানের পরিচায়ক, যার কাছে এ গুণ পাওয়া যাবে।

রাসূলের সুন্নাত থেকে এর প্রমাণঃ আনাসের হাদীস, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ
(آية الإيمان حب الأنصار وآية النفاق بغض الأنصار)¹
"ঈমানের নিদর্শন হলো আনসারদের ভালবাসা আর নিফাকের নিদর্শন হলো আনসারদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ"¹。

এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে অনেক দলীল-প্রমাণ এসেছে, এখানে এ সবের উল্লেখ করলে স্থান সংকুলান সম্ভব হবে না। তবে একটি বিষয়ে এখানে দৃষ্টি আকর্ষণ করা অত্যন্ত জরুরী, আর তা হলোঃ সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের সাথে আন্তরিক সুসম্পর্ক থাকলে দুনিয়া ও আখিরাতে যে ভাল পরিণাম রয়েছে তা জানলে তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার জন্য প্রচেষ্টা বহুগুণ বর্ধিত হবে।

দুনিয়াবী যে কল্যাণ অর্জিত হবে তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সফলতা অর্জন, বিজয় ও সাহায্য লাভ, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يَتَوَل اللهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللهِ هُمُ الْغُلِبُونَ ﴾ (المائدة : ٥٦)
"কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মু'মিনদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে আল্লাহর দল তো বিজয়ী হবেই”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৫৬]

ইবনে কাসীর বলেনঃ 'যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং ঈমানদারদের সাথে বন্ধুত্বে সন্তুষ্ট হবে, সে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হবে, দুনিয়া ও আখিরাতে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে'।

তাদের ভালবাসার কারণে আখিরাতের যে কল্যাণ অর্জিত হবে তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- তাদেরকে ভালবাসার কারণে তাদের সাথে হাশর হওয়ার আশা করা যায়; কারণ আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক লোক এসে বললেনঃ 'হে আল্লাহর রাসূল! কোন লোক যদি কোন জাতিকে ভালবাসে কিন্তু তাদের সাথে মিশলো না তার সম্পর্কে আপনার কি অভিমত? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেনঃ
(المرء مع من أحب)¹
"মানুষ যাকে ভালোবাসে তার সাথে সে থাকবে”¹。

আর এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাগণ আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে ভালবাসার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চাইত, আর এটাকে তাদের শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর নিকট বেশী আশাব্যঞ্জক কাজের মধ্যে গণ্য করত। ইমাম বুখারী আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণনা করেন যে, এক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ক্বিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে বললোঃ কখন ক্বিয়ামত হবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "তুমি তার জন্য কি প্রস্তুত করেছ"? লোকটি বললঃ কিছুই না, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেনঃ
(أنت مع من أحببت)
"তুমি যাকে ভালবেসেছ তার সাথে থাকবে”।

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ "তুমি যাকে ভালবেসেছ তার সাথে থাকবে” এ কথার চেয়ে অন্য কোন কথায় এত খুশি হইনি। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ 'আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি, আরো ভালবাসি আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে, আর আমি আশা করি তাদেরকে ভালবাসার কারণে তাদের সাথে থাকব যদিও আমি তাদের মত কাজ করতে পারিনি।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১৭)。
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৬১৬৮)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 তাদের ফযীলত ও ন্যায়পরায়ণতার উপর বিশ্বাস করা ওয়াজিব, আর তাদের মধ্যে যা ঘটেছিল সে ব্যাপারে শরীয়তের দলীল-প্রমাণাদির আলোকে চুপ থাকা

📄 তাদের ফযীলত ও ন্যায়পরায়ণতার উপর বিশ্বাস করা ওয়াজিব, আর তাদের মধ্যে যা ঘটেছিল সে ব্যাপারে শরীয়তের দলীল-প্রমাণাদির আলোকে চুপ থাকা


তাদের ফযীলতঃ
আল্লাহ তা'আলা সাহাবাদের প্রশংসা করেছেন, তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাদের জন্য উত্তম প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ
وَالسّٰبِقُونَ الْاَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِیْنَ وَالْاَنْصَارِ وَالَّذِیْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِاِحْسَانٍ رَّضِیَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ وَاَعَدَّ لَهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ تَحْتَهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا اَبَدًا ذٰلِکَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ (التوبة: ١٠٠)
"মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী, এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও তাঁর উপর সন্তুষ্ট। আর তিনি তাদের জন্য তৈরী করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে, এ তো মহা সাফল্য”। [সূরা আত-তাওবাহঃ ১০০]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
لَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ (الفتح : ١٨)
"অবশ্যই আল্লাহ মু'মিনদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন গাছের নিচে তারা আপনার কাছে বাই'আত নিচ্ছিলেন”। [সূরা আল- ফাত্‌হঃ ১৮]

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ * وَالَّذِينَ تَبَوَّءُ وَالدَّارَ وَ الْإِنْسَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ * وَالَّذِينَ جَاءُوْ مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَالقَوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا عَلَا لِلَّذِينَ آمَنُوارَ بَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رحیم (الحشر: ۸-۱۰)¹。
“(এ সম্পদ) অভাবগ্রস্ত মুহাজিরগণের জন্য যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই তো সত্যবাদী। আর যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে, তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে কোন আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও। যাদের অন্তর কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম। আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং মু'মিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু'। [সূরা আল- হাশরঃ ৮-১০]

এ সম্মানিত আয়াতসমূহ সমস্ত সাহাবা তথা মুহাজির, আনসার, বদরের যুদ্ধ এবং বাই'আতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী যারা গাছের নিচে শপথ করেছিল, আর যারাই তাঁর সাহচর্যে ধন্য হয়েছে, প্রত্যেক সাহাবীর ফযীলত ও তাদের প্রশংসার উপর প্রমাণ বহন করছে। আর তাদের পরে যারা এসেছে তাদের গুণ বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে যে, তারা তাদের পূর্বে যে সমস্ত সাহাবা চলে গেছেন তাদের জন্য তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আল্লাহর কাছে দো'আ করে তিনি যেন ঈমানদারদের জন্য তাদের মনে কোন বিদ্বেষ না রাখেন।

এ আয়াতসমূহ ও এ জাতীয় অসংখ্য আয়াতে তাদের জন্য আল্লাহর সন্তোষ, জান্নাতের সুসংবাদ, মহা সাফল্যের অধিকারী হওয়া এবং প্রশংসা করা হয়েছে, অনুরূপভাবে তাদের কিছু গুণাগুণ যেমন ভালবাসা, অপরকে প্রাধান্য দেয়া, দান ও বদান্যতা, মুসলিম ভাইদের ভালবাসা এবং আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করা ইত্যাদি এমন মহৎ গুণাবলী ও সুন্দর স্মরণের উল্লেখ এসেছে তারা যেগুলোর যথাযথ অধিকারী।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বহু হাদীসে তাদের প্রশংসা করেছেন, তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ যা ইমাম মুসলিম জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
لا يدخل النار أحد بايع تحت الشجرة¹
“যারা গাছের নীচে বাই'আত করেছে তাদের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না”¹。

আরো কিছু হাদীস এসেছে যেগুলোতে সমস্ত সাহাবার ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে, অন্য কিছু হাদীসে শুধু বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাদের ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে, আবার কিছু হাদীসে বিশেষ বিশেষ সাহাবীর ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।

সুতরাং এ দলীলসমূহের চাহিদা অনুসারে সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের সাথে আন্তরিক সুসম্পর্ক স্থাপন, তাদেরকে ভালবাসা, আল্লাহর সন্তোষ লাভের দো'আ করা, যাবতীয় সুন্দর শব্দে তাদেরকে উল্লেখ করা, তাদের অনুসরণ-অনুকরণ করা, তাদের প্রদর্শিত পথে চলা সমস্ত মুসলিমের উপর ওয়াজিব।

সাহাবাদের মধ্যে যা ঘটেছে সে ব্যাপারে নিরব থাকার অপরিহার্যতা এবং তাদেরকে গালি দেয়ার হুকুমঃ

আমরা বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহর রাসূলের সাহাবাগণ আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে এ উম্মাতের মনোনীত সবচেয়ে পছন্দনীয় ব্যক্তিত্ব। তারা ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী, হেদায়াতের মহান ব্যক্তিবর্গ, অন্ধকারের আলো, তারাই আল্লাহর পথে প্রকৃত জিহাদকারী এবং ইসলামের উপর আপতিত যাবতীয় বাধা-বিপত্তি প্রতিরোধে তারা ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনকারী। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা তাদের হাতেই এ দ্বীনকে যমীনের বুকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

সুতরাং যে কেউ তাদের মর্যাদাহানি করবে বা তাদের গালি দেবে অথবা তাদের কাউকে কথা বা কাজে আক্রমণ করবে সে সৃষ্টির অধম ব্যক্তি বলে বিবেচিত হবে; কেননা তার এ কাজ সমস্ত দ্বীনের উপর আক্রমণ করার নামান্তর। আর যে কেউ তাদেরকে কাফির বলবে অথবা এ বিশ্বাস করবে যে, তারা দ্বীন থেকে বের হয়ে গেছে সে নিজেই কাফির ও দ্বীন থেকে বের হয়ে মুরতাদ হওয়ার অধিক উপযুক্ত।

সাহাবাদের পরে যত বড় আমলকারীই হোক না কেন সে তাদের সামান্যতম ফযীলতের কাছেও পৌঁছতে পারবে না। বুখারী ও মুসলিমে আবু সা'ঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(لا تسبوا أحداً من أصحابي، فإن أحدكم لو أنفق مثل أحد ذهباً ما أدرك مُدَّ أحدهم ولا نصيفه)¹
“তোমরা আমার সাহাবীদের কাউকে গালি দিও না; কেননা তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড়ের মত স্বর্ণও ব্যয় কর তাদের এক মুদ পরিমাণ বা তার অর্ধেক ব্যয়ের কাছাকাছি পৌঁছতে পারবে না”¹。

এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের গালি দেয়া হারাম, আর এ বিষয় তাগিদ হচ্ছে যে, যত সৎকাজই কেউ করুক না কেন তাদের মর্যাদায় কেউ পৌঁছতে পারবে না।

সুতরাং তাদের ন্যায়পরায়ণতার উপর বিশ্বাস স্থাপন, তাদের জন্য সন্তোষের দো'আ করা, তাদের মধ্যে যা ঘটেছে সে ব্যাপারে চুপ থাকা, তাদের মধ্যে যে মতবিরোধ হয়েছে সেগুলো ঘাঁটাঘাঁটি না করা এবং তাদের গোপন ব্যাপারসমূহ আল্লাহর হাতে ন্যস্ত করা সমস্ত মুসলিমের উপর ওয়াজিব। উমর ইবনে আব্দুল আযীয রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ 'তারা এমন এক সম্প্রদায় আল্লাহ আমাদের হাতকে তাদের রক্ত থেকে পবিত্র রেখেছেন, সুতরাং আমরা যেন আমাদের জিহবাকে তাদের সম্মান ক্ষুন্ন করা থেকে পবিত্র রাখি'।

মোট কথাঃ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত সমস্ত সাহাবার সাথে আন্তরিক সুসম্পর্ক রাখে, ইনসাফ ও সাম্যের ভিত্তিতে তাদের প্রত্যেকের যে যে মর্যাদা প্রাপ্য তাদেরকে সেখানে প্রতিষ্ঠা করে, কোন প্রকার গোড়ামী বা প্রবৃত্তির বশে নয়; কেননা এ গুলো অতিরঞ্জিতকরণ যা সীমালংঘনের শামিল।

টিকাঃ
¹ মূল আরবীতে আয়াতটি হবেঃ
وَالَّذِينَ جَاءُوْ مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৪৯৬)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৬৭৩), সহীহ মুসলিম, কিভাবুল ফাদায়িল (হাদীস নং ২৫৪০, ২৫৪১)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার-পরিজন ও তাদের অধিকার সম্পর্কে, আর তার স্ত্রীগণ যে তারই পরিবার-পরিজনের মধ্যে গণ্য তার বর্ণনা

📄 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার-পরিজন ও তাদের অধিকার সম্পর্কে, আর তার স্ত্রীগণ যে তারই পরিবার-পরিজনের মধ্যে গণ্য তার বর্ণনা


"আহলে বাইত” এর পরিচয়ঃ
আহলে বাইত (বা ঘরের লোক) বলতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশের ঐ পরিবারসমূহকে বুঝায় যাদের উপর সাদকা গ্রহণ করা হারাম। আর তারা হলোঃ আলী ইবনে আবি তালিবের বংশধর, জা'ফরের বংশধর, আব্বাসের বংশধর, হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর। অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ ও এর অন্তর্ভুক্ত।

"আহলে বাইত” এর ফযীলত বা মর্যাদার প্রমাণসমূহঃ
মহান আল্লাহর বাণীঃ
إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا له (الأحزاب : ٣٣) .
“হে নবী পরিবারের লোকেরা! আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে, আর তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”। [সূরা আল-আহযাবঃ ৩৩]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أذكركم الله في أهل بيتي)¹
"আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি”।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ আহলে বাইতের মধ্যে শামিল হওয়াঃ
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
ينِسَاءَ النَّبِي لَسْتُنَ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا * وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَتَبَرَجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصلوة وَاتِينَ الزَّكوةَ وَأَطِعْنَ اللهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا * وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللهِ وَالْحِكْمَةِ إِنَّ اللهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا (الأحزاب: ٣٢-٣٤).
“হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, সুতরাং তোমরা এমন কোমল কন্ঠে কথা বলো না যাতে করে যার অন্তরে রোগ রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে এবং তোমরা ন্যায় সংগত কথা বল। আর তোমরা নিজস্ব গৃহে অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহেলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িওনা। তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাক। হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা যা তোমাদের ঘরে পাঠ করা হয় তা তোমরা স্মরণ কর, অবশ্যই আল্লাহ অত্যন্ত সুক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে অবহিত। [সূরা আল-আহযাবঃ ৩২-৩৪]

ইমাম ইবনে কাসীর রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ 'তারপর কুরআনের গবেষনাকারী নিঃসন্দেহে বলতে পারে যে, নবীর স্ত্রীগণ আল্লাহর বাণীঃ
إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا ﴾
“হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”, এ আয়াতের মধ্যে অবশ্যই শামিল হবে; কেননা এ বাক্যের পূর্বের কথা তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর এ জন্যই আল্লাহ এ সব কিছুর পর বলেনঃ
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللهِ وَالْحِكْمَةِ ﴾
“আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা যা তোমাদের ঘরে পাঠ করা হয় তা তোমরা স্মরণ কর”, অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঘরে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কুরআন ও সুন্নাহ হতে যা অবতীর্ণ করেছেন তার উপর তোমরা আমল কর। ক্বাতাদা এবং আরো অনেকে বলেনঃ 'সমস্ত নারী জাতি হতে তোমাদেরকে এই যে বিশেষ নেয়ামত প্রদান করা হয়েছে তা স্মরণ কর”¹。

আহলে বাইতের ব্যাপারে অসীয়তঃ

"আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি” এ হাদীসটি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং আহলে সুন্নাত তাদেরকে ভালবাসেন, সম্মান করেন, তাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসীয়ত স্মরণ করেন; কেননা তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসা ও সম্মান করার শামিল। তবে শর্ত হলো তারা সুন্নাতের অনুসারী, মিল্লাতে মুহাম্মাদীয়ার উপর অটল থাকতে হবে যেমনটি তাদের পূর্বপুরুষগণ ছিলেন, যেমনঃ আব্বাস ও তার সন্তানগণ, 'আলী ও তার সন্তানগণ। কিন্তু যে ব্যক্তি সুন্নার বিপরীত কাজ করবে এবং দ্বীনের উপর অটল থাকবে না তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা জায়েয হবে না, যদিও সে আহলে বাইতের লোক হয়ে থাকে।

সুতরাং আহলে বাইতের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হলো সাম্য ও ইনসাফের অবস্থান। তাদের মধ্যে যারা দ্বীনদার, দ্বীনের উপর অটল তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখে, তাদের থেকে যারা সুন্নাত বিরোধী কাজ করবে, দ্বীন থেকে সরে যাবে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, যদিও তারা আহলে বাইতের লোক হোন না কেন; কেননা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীনের উপর অটল না হবে তখন পর্যন্ত সে আহলে বাইত এবং রাসূলের আত্মীয় হওয়া কোন উপকার দিবে না। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরঃ
﴿وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ ﴾ (الشعراء: ٢١٤)
"আপনার নিকটস্থ জ্ঞাতি-গোষ্ঠিকে ভয় দেখান” [সূরা আশ্ শু'আরাঃ ২১৪] এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি বললেনঃ
(يا معشر قريش أو كلمة نحوها، اشتروا أنفسكم لا أغني عنكم من الله شيئاً، يا بني عبد مناف لا أغني عنكم من الله شيئاً، يا صفية عمة رسول الله لا أغني عنك من الله شيئاً، ويا فاطمة بنت محمد سليني ما شئت من مالي لا أغني عنك مِّنَ اللهِ شَيْئًا)¹
“হে কুরাইশ সম্প্রদায়! অথবা এ প্রকারের একটি শব্দ, তোমরা তোমাদের নিজেদের ক্রয় করে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য কোন কিছুই করতে পারবো না। হে আবদে মান্নাফের বংশধর! আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট কোন কাজে আসব না। হে রাসূলুল্লাহর ফুফি সাফিয়‍্যা! আমি তোমার জন্য আল্লাহর নিকট কোন উপকারে আসব না। হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা! আমার সম্পদ থেকে যা কিছু আছে চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমার জন্য কিছুর মালিক হব না”¹。

অন্য এক হাদীসেও এসেছেঃ
(مَنْ بَطَأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ)¹
“যার কর্মকান্ড তাকে দেরী করায় তার বংশ তাকে তাড়াতাড়ি করায় না”²。

হাদীসের শব্দ “মান বাত্তা’আ” এর অর্থ যাকে দেরী করায়, পিছনে ফেলে দেয়।

যারা কোন কোন আহলে বাইতের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে এবং তাদের জন্য নিষ্পাপ হওয়ার দাবী করে, আর যারা আহলে বাইতের মধ্যে দ্বীন ও সুন্নার উপর অটল তাদের প্রতি যারা বিদ্বেষ পোষণ করে তাদের মর্যাদায় আঘাত করে, অনুরূপভাবে বেদ'আতকারী, বাজে কর্মকান্ডে লিপ্ত লোকেরা যারা আহলে বাইতের লোকদের অসীলা ধরে এবং তাদেরকে আল্লাহ ব্যতীত রব হিসাবে গ্রহণ করে; আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত তাদের সাথে সম্পর্ক রাখে না।

সুতরাং এ ক্ষেত্রেও অন্যান্য ক্ষেত্রের মত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মধ্যম পন্থা ও সরল সোজা পথের উপর আছে যেখানে নেই কোন বাড়াবাড়ি, নেই কোন কমতি বা ঘাটতি।

টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৪০৮)。
¹ তাক্সীরে ইবনে কাসীর (৬/৪১১)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৭৭১), মুসলিম (হাদীস নং ২০৪)。
² মুসলিম (হাদীস নং ২৬৯৯)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 খোলাফায়ে রাশেদা, তাদের ফযীলত ও তাদের প্রতি যা যা করণীয় এবং তাদের ক্রম নির্ধারণ

📄 খোলাফায়ে রাশেদা, তাদের ফযীলত ও তাদের প্রতি যা যা করণীয় এবং তাদের ক্রম নির্ধারণ


"খোলাফায়ে রাশেদীন” এর পরিচয়ঃ

খোলাফায়ে রাশেদীন হলেনঃ আবু বকর আসসিদ্দীক, উমর ইবনুল খাত্তাব (ফারুক), যুনূরাইন উসমান ইবনে আফফান এবং রাসূলের দু' নাতির পিতা 'আলী ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আরদাহুম।

তাদের মর্যাদা ও তাদের অনুসরণ করা ওয়াজিব হওয়ার বর্ণনাঃ

খোলাফায়ে রাশেদীন সাহাবাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ। আর তারাই ঐ সমস্ত খলীফা যারা সঠিক পথের দিশা প্রদানকারী, হেদায়াতপ্রাপ্ত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের আনুগত্য ও আদর্শ অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেমন 'ইরবাদ ইবনে সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أوصيكم بالسمع والطاعة، فإنه من يعش منكم بعدي فسيرى اختلافاً كثيراً فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ، وإياكم ومحدثات الأمور، فإن كل بدعة ضلالة)¹
"তোমাদেরকে আমি শোনা ও মেনে নেয়ার অসীয়ত করছি, তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে তারা অনেক মত পার্থক্য দেখতে পাবে তখন তোমাদের করণীয় হবে আমার সুন্নাতের অনুসরণ করা এবং আমার পরে যে সমস্ত সঠিক পথের দিশা প্রদানকারী, হেদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাগণ আসবে তাদের সুন্নাকে অনুসরণ করা। তোমরা সেগুলো ধরে রাখবে, শক্ত ভাবে গোড়ালির দাঁতে কামড় দিয়ে ধরার মত আঁকড়ে থাকবে। আর নতুনভাবে আবিষ্কৃত যাবতীয় বিষয় থেকে সতর্ক থাকবে; কেননা প্রত্যেক বেদ'আত তথা দ্বীনের মধ্যে নতুন পন্থাসমূহ ভ্রষ্টতা”¹。

তাদের ফযীলতঃ

খলীফাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এ ব্যাপারে একমত যে, তাদের খিলাফতের ক্রমান্বয় অনুসারেই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত; তা যথাক্রমে আবু বকর, তারপর উমর, তারপর উসমান, তারপর আলী। তাদের প্রত্যেকের ফযীলত বর্ণনায় অনেক হাদীস এসেছে, তম্মধ্যে আমরা প্রত্যেকের জন্য একটি করে হাদীস উল্লেখ করব।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফযীলত বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মিম্বরে ছিলেন এমতাবস্থায় বললেনঃ
(لو كنت متخذاً من أهل الأرض خليلاً، لاتخذت أبا بكر خليلاً، لا يبقين في المسجد خوخة إلا سدت إلا خوخة أبي بكر)¹
"যদি আমি যমীনের কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু "খলীল” হিসাবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম, আবু বকরের আগমন পথ ব্যতীত এ মসজিদের সমস্ত গমন পথ বন্ধ করে দাও”।

উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফযীলত বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেনঃ
(قد كان في الأمم قبلكم محدثون، فإن يكن في أمتي أحد فإن عمر بن الخطاب منهم)²
"তোমাদের পূর্বেকার জাতিদের মধ্যে অনেকেই 'মুহাদ্দাস' ছিলেন, যদি এ জাতির মধ্যে কেউ থেকে থাকে তবে উমর ইবনুল খাত্তাব তাদের মধ্যে গণ্য হবে"²。

হাদীসে বর্ণিত 'মুহাদ্দাস' অর্থঃ মুলহাম তথা আল্লাহর পক্ষ থেকে যাদের মনে সঠিক সিদ্ধান্ত জাগিয়ে দেয়া হয় এমন ব্যক্তিত্ব।

উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফযীলত বর্ণনায় 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আবু বকর প্রবেশ করলেন, তারপর উমর প্রবেশ করলেন, তারপর উসমান প্রবেশ করলেন; তাকে দেখার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসলেন এবং কাপড় চোপড় ঠিক করে নিলেন, 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ
(ألا أستحي من رجل تستحي منه الملائكة)¹
"আমি কি. এমন এক লোক থেকে লজ্জাবোধ করব না যাকে দেখে ফিরিস্তাগণও লজ্জাবোধ করে?"¹。

'আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফযীলত বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিমে সাহাল ইবনে সা'আদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের সন্ধ্যায় বললেনঃ
(لأعطين الراية غداً رجلاً يحب الله ورسوله، ويحبه الله ورسوله يفتح الله على يديه ... فقال : ادعوا لي علياً ... فدفع الراية إليه ففتح الله عليه)²
"আগামী দিন আমি এমন একজনকে ঝান্ডা দেব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে আর তাঁকেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালবাসে, তাঁর হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন"... তারপর বললেনঃ "আলীকে আমার কাছে ডেকে আন"... তারপর তাঁর হাতে ঝান্ডা দিলেন, ফলে আল্লাহ তাঁর হাতে বিজয় দিলেন'"²。

টিকাঃ
¹ হাদিসটি ইমাম আহমাদ (৪/১২৭-১২৯) তিরমিযী (৭/৪৩৮) বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৬৫৪)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৬৮৯), মুসলিম (হাদীস নং ২৩৯৮)。
¹সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৪০১)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৭০২), মুসলিম (হাদীস নং ২৪০৫)。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00