📄 তাকদীরের পর্যায়সমূহ
তাকদীরের চারটি স্তর রয়েছে, যার উপর কুরআন ও সুন্নায় অসংখ্য দলীল- প্রমাণাদি এসেছে আর আলেমগণও তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। তা হলোঃ
প্রথম স্তর : অস্তিত্বসম্পন্ন, অস্তিত্বহীন, সম্ভব এবং অসম্ভব সবকিছু সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞান থাকা এবং এ সবকিছু তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত থাকা। সুতরাং তিনি যা ছিল এবং যা হবে, আর যা হয়নি যদি হত তাহলে কিরকম হতো তাও জানেন। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণীঃ
﴿لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا ﴾ (الطلاق: ١٢)
"যাতে তোমরা বুঝতে পার যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং জ্ঞানে আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন”। [সূরা আত্বালাকঃ১২]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীসে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মুশরিকদের সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেনঃ
(الله أعلم بما كانوا عاملين)¹
"তারা কি কাজ করত (জীবিত থাকলে) তা আল্লাহই ভাল জানেন"¹。
দ্বিতীয় স্তর : ক্বিয়ামত পর্যন্ত যত কিছু ঘটবে সে সব কিছু মহান আল্লাহ কর্তৃক লিখে রাখা। মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ ﴾ (الحج: ٧٠)
"আপনি কি জানেন না যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন। এসবই এক কিতাবে আছে; নিশ্চয়ই তা আল্লাহর নিকট সহজ। [সূরা আল- হাজ্জঃ৭০]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
﴿وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَهُ فِي إِمَامٍ مُّبِينٍ﴾ (يس: ١٢)
"আমরা তো প্রত্যেক জিনিস এক স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত করেছি”। [সূরা ইয়াসীনঃ১২]
সুন্নাহ থেকে দলীলঃ
পূর্বে বর্ণিত 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'আমর ইবনুল 'আসের হাদীস, যাতে বলা হয়েছে আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি জগতের তাকদীর লিখে রেখেছেন।
তৃতীয় স্তরঃ আল্লাহর ইচ্ছাঃ তিনি যা চান তা হয়, আর যা চান না তা হয়না। মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَن يَقُولَ لَهُ كُن فَيَكُونُ﴾ (يس: ٨٢)
"তাঁর ব্যাপার শুধু এতটুকুই যে, তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন, তিনি তখন তাকে বলেনঃ 'হও', ফলে তা হয়ে যায়”। [সূরা ইয়াসীনঃ ৮২]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَلَمِينَ ﴾ (التكوير : ٢٩)
"সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত তোমরা কোন ইচ্ছাই করতে পার না”। [সূরা আত-তাকওয়ীরঃ ২৯]
ইমাম বুখারী ও মুসলিম আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ
لا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمُ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي إِنْ شِئْتَ اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي إِنْ شِئْتَ لِيَعْزِمْ فِي الدُّعَاءِ فَإِنَّ اللَّهَ صَانِعٌ مَا شَاءَ لَا مُكْرِةٌ لَهُ)¹
"তোমাদের কেউ যেন একথা কখনো না বলে যে, হে আল্লাহ! যদি তুমি চাও আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ! যদি তুমি চাও আমাকে দয়া কর, বরং দো'আ করার সময় দৃঢ়ভাবে কর; কেননা আল্লাহ যা ইচ্ছা তা'ই করেন, তাঁকে জোর করার কেউ নেই”।
চতুর্থ স্তরঃ আল্লাহ কর্তৃক যাবতীয় বস্তু সৃষ্টি করা ও অস্তিত্বে আনা এবং এ ব্যাপারে তাঁর পূর্ণ ক্ষমতা থাকা। কেননা তিনিই সে পবিত্র সত্তা যিনি সমস্ত কর্মী ও তার কর্ম, প্রত্যেক নড়াচড়াকারী ও তার নড়াচড়া, এবং যাবতীয় স্থিরিকৃত বস্তু ও তার স্থিরতার সৃষ্টিকারক। মহান আল্লাহ বলেনঃ
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ (الزمر: ٦٢)
"আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর কর্মবিধায়ক”। [সূরা আয-যুমারঃ৬২]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ (الصافات:٩٦)
"আর আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা কর তাও”। [সূরা আস-সাফফাতঃ ৯৬]
ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে 'ইমরান ইবনে হুসাইনের হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেনঃ
(.. كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ غَيْرَهُ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ وَكَتَبَ فِي الذِّكْرِ كُلَّ شَيْءٍ وَخَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ)¹
“একমাত্র আল্লাহ ছিলেন, তিনি ব্যতীত আর কোন বস্তু ছিলনা, আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর এবং তিনি সবকিছু লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন, আর আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন”।
তাই তাকদীরের উপর ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য এ চারটি স্তরের উপর ঈমান আনা ওয়াজিব। যে কেউ তার সামান্যও অস্বীকার করে তাকদীরের উপর তার ঈমান পূর্ণ হবে না। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশী জানেন।
তাকদীরের উপর ঈমানের ফলাফলঃ
তাকদীরের উপর ঈমান যথার্থ হলে মু'মিনের জীবনের উপর তার যে বিরাট প্রভাব ও হিতকর ফলাফল অর্জিত হয়, তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ
১. কার্যোদ্ধারের জন্য কোন উপায় বা কৌশল অবলম্বন করলেও কেবলমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা করবে; কেননা তিনিই যাবতীয় কৌশল ও কৌশলকারীর নিয়ন্তা।
২. যখন বান্দা এ কথা সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে পারবে যে, সবকিছুই আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীর অনুসারেই হয় তখন তার আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক প্রসন্নতা অর্জিত হয়।
৩. উদ্দেশ্য সাধিত হলে নিজের মন থেকে আত্মম্ভরিতা দূর করা সম্ভব হয়। কেননা আল্লাহ তার জন্য উক্ত কল্যাণ ও সফলতার উপকরণ নির্ধারণ করে দেয়ার কারণেই তার পক্ষে এ নেয়ামত অর্জন করা সম্ভব হয়েছে, তাই সে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ হবে এবং আত্মম্ভরিতা পরিত্যাগ করবে।
৪. উদ্দেশ্য সাধিত না হলে বা অপছন্দনীয় কিছু ঘটে গেলে মন থেকে অশান্তি ও পেরেশানীভাব দুর করা (তাকদীরে ঈমানের কারণে) সম্ভব হয়; কেননা এটা আল্লাহর ফয়সালা আর তাঁরই তাকদীরের ভিত্তিতে হয়েছে। সুতরাং সে ধৈর্য ধারণ করবে এবং সওয়াবের আশা করবে।
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১৩৮৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৬৫৫)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৩৩৯), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৬৭৯), শব্দ চয়ন ইমাম মুসলিমের。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩১৯১)。