📄 শাফা'আতের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও তার প্রমাণাদি
শাফা'আত শব্দের আভিধানিক অর্থঃ অসীলা ও চাওয়া।
প্রচলিত অর্থঃ অপরের কল্যাণ চাওয়া।
আল্লাহর নিকট শাফা'আত হলোঃ আল্লাহর কাছে অন্যের জন্য গোনাহ ও পাপ ক্ষমা করে দেয়ার প্রার্থনা করা।
শাফা'আতের হাকীকত হলোঃ আল্লাহ তা'আলা তাঁর আপন দয়া ও মেহেরবাণীতে কিয়ামতের দিন তাঁর সৃষ্টিকুলের কোন কোন নেক বান্দা তথা ফিরিস্তা, নবী-রাসূল এবং মু'মিনদেরকে তাঁর তাওহীদ বাস্তবায়ন করেছে এমন কোন কোন গুনাহগারদের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান করবেন সুপারিশকারীর সম্মান প্রকাশ আর সুপারিশকৃতদের জন্য তাঁর রহমতের প্রতিফলন স্বরূপ।
দু'টি শর্ত পূরণ না করলে মহান আল্লাহর কাছে সুপারিশ করা যাবে না
প্রথম শর্তঃ সুপারিশকারীকে আল্লাহ তা'আলা সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান করতে হবে। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণীঃ
mَّn ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِndَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ﴾ (البقرة: ٢٥٥)
“কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?”। [সূরা আল- বাকারাহঃ ২৫৫]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ ﴾ (سبا:۲۳)
“যাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে সে ব্যতীত আল্লাহর নিকট কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না”। [সূরা সাবাঃ ২৩]
দ্বিতীয় শর্তঃ যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে সুপারিশ করতে দেয়া। এ শর্তের স্বপক্ষে প্রমাণ, মহান আল্লাহর বাণীঃ
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى ﴾ (الأنبياء : ۲۸)
“তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্য যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট”। [সূরা আল- আম্বিয়াঃ ২৮]
কুরআন ও হাদীস থেকে এ কথা প্রমাণিত যে, তাওহীদ তথা (আল্লাহর প্রভুত্বে, নাম ও গুণে এবং তাঁর ইবাদাতে) একত্ববাদ প্রতিষ্ঠাকারীদের জন্য শাফা'আত করতেই শুধু আল্লাহ রাজী হবেন। সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(لكل نبي دعوة مستجابة فتعجل كل نبي دعوته وإني اختبأت دعوتي شفاعة لأمتي يوم القيامة فهي نائلة إن شاء الله من مات من أمتي لا يشرك بالله شيئاً)¹
“প্রত্যেক নবীর একটি মাকবুল বা গ্রহণীয় দো'আ আছে, নবীরা প্রত্যেকেই তাদের সে দো'আ তাড়াতাড়ি করে ফেলেছেন, কিন্তু আমি আমার দো'আ ক্বিয়ামতের দিন আমার উম্মাতের জন্য শাফা'আত হিসাবে গোপন করে রেখেছি। আল্লাহ চাহেত আমার উম্মাতের মধ্যে আল্লাহর সাথে শরীক না করা অবস্থায় যারাই মারা যাবে, তারাই এ দো'আর ভাগী হবে”।
আর আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সম্পর্কে বলেছেনঃ
﴿فَمَا تَنْفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّفِعِينَ ﴾ (المدثر : ٤٨)
"ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না”। [সূরা আল-মুদ্দাছছিরঃ ৪৮]
ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে শাফা'আত সাব্যস্ত করার ব্যাপারটি কুরআন ও সুন্নার বিভিন্ন দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। তম্মধ্যে কুরআন থেকে কিছু দলীল-প্রমাণ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলের সুন্নার মধ্যে শাফা'আতের স্বপক্ষে অনেক হাদীস এসেছে। তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ
আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(... فيقول الله تبارك وتعالى شفعت الملائكة وشفع النبيون وشفع المؤمنون ولم يبق إلا أرحم الراحمين فيقبض قبضة من النار فيخرج منها قوماً لم يعملوا خيراً قط)¹
"... তারপর মহান ও বরকতময় আল্লাহ বলবেনঃ ফেরেশতাগণ সুপারিশ করেছে, নবীরা সুপারিশ করেছে, মু'মিনগণও সুপারিশ করেছে, সমস্ত দয়াশীলের থেকে যিনি বেশী দয়াবান তিনিই শুধু বাকী আছেন। তারপর তিনি জাহান্নাম থেকে এক মুষ্টি পরিমাণ এমন লোকদের বের করে আনবেন যারা সামান্যতম ভাল কাজও করেনি”।
শাফা'আতের স্বপক্ষে হাদীসের সংখ্যা অনেক বেশী। অভিজ্ঞ আলেমগণ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এগুলো মুতাওয়াতির ও মাশহুর হাদীস বলে সহীহ (তথা বিশুদ্ধ হাদীস সঙ্কলনের গ্রন্থসমূহে) এবং মাসানীদ (তথা প্রত্যেক বর্ণনাকারীর বর্ণনাকৃত হাদীসসমূহ যে সব গ্রন্থে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে সে সব হাদীসের) গ্রন্থে স্বীকৃত।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছেঃ
يُخرج من النار من كان في قلبه حبة من خردل من إيمان)¹
“যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানও অবশিষ্ট থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে”।
শাফা'আতের প্রকারভেদঃ
গ্রহণ হওয়া না হওয়ার দিক থেকে শাফা'আত দু'ভাগে বিভক্তঃ
অগ্রহণযোগ্য শাফা'আতঃ আর তা' হলোঃ যাতে পূর্ব বর্ণিত শাফা'আতের শর্তদ্বয়ের কোন একটি থাকবেনা।
গ্রহণযোগ্য শাফা'আতঃ আর তা'হলো যাতে পূর্বে বর্ণিত শাফা'আত কবুল হওয়ার শর্তসমূহ পাওয়া যাবে।
আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য আট প্রকার শাফা'আত সাব্যস্ত। তা' হলোঃ
১. মহাশাফা'আত বা সবচেয়ে বড় সুপারিশ। আর তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করবেন হাশরের মাঠে অবস্থানকারীদের জন্য, যাতে করে আল্লাহ তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করে দেন। আর এরই নাম "মাকামে মাহমুদ” তথা প্রশংসনীয় স্থান। এ শাফা'আত সমস্ত নবী রাসূলদের মধ্য থেকে কেবলমাত্র আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রদান করে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়েছে।
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু লোককে জান্নাত দেয়ার জন্য শাফা'আত করবেন যাদের সৎকর্ম ও অসৎকর্ম সমান সমান হয়ে গেছে।
৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু লোক যারা জাহান্নামে যাবার উপযুক্ত হয়ে গেছে তাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য শাফা'আত করবেন।
৪. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতবাসীদের জান্নাতের মধ্যে তাদের পদমর্যাদা বৃদ্ধির জন্যও শাফা'আত করবেন।
৫. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে দেয়ার জন্য শাফা'আত করবেন।
৬. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহান্নামের কোন কোন জাহান্নামীর শাস্তি হাল্কা করার জন্য শাফা'আত করবেন, যেমন তার চাচা আবু তালেবের জন্য তিনি শাফা'আত করলে তার শাস্তি হাল্কা হবে।
৭. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতবাসীদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার জন্যও শাফা'আত করবেন।
৮. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মাতের মধ্যে কবীরা গুনাহ করার কারণে যারা জাহান্নামে প্রবেশ করেছে তাদেরকে সেখান থেকে বের করে আনার জন্য শাফা'আত করবেন।
উপরোক্ত প্রকারসমূহের সমর্থনে কুরআন ও সুন্নায় বহু দলীল-প্রমাণাদি এসেছে, সুন্নার গ্রন্থসমূহ এবং আক্বীদার বইসমূহে সেগুলোর বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। শাফা'আতের উপরোক্ত প্রকারসমূহের কোন কোনটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য সুনির্দিষ্ট যেমনঃ বড় শাফা'আত, তার চাচার জন্য শাফা'আত, জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে প্রবেশের জন্য শাফা'আত। আবার এ শাফা'আতগুলোর কোন কোনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে অন্যান্য নবী ও নেক বান্দাও শরীক হবেন, যেমনঃ কবীরা গুনাহ করার কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে এমন লোকদের জন্য সুপারিশ। এ ছাড়া অন্যান্য প্রকারসমূহ কি রাসূলের সাথে সুনির্দিষ্ট না তা সবার জন্য উন্মুক্ত, এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। আল্লাহ সবচেয়ে বেশী জানেন।
টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৯৯)。
¹ ইমাম আহমাদ এ হাদীস বর্ণনা করেছেন মুসনাদে (৩/৯৪), আব্দুর রায্যাক মুসান্নাফে (১১/৪১০, হাদীস নং ২০৮৫৭)。
¹সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭৪৩৯), এক দীর্ঘ হাদীসের অংশ। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং (১৮৪)。
📄 সিরাত, তার বর্ণনা ও প্রমাণাদি
সিরাত শব্দের আভিধানিক অর্থঃ স্পষ্ট রাস্তা।
আর শরীয়তের পরিভাষায় সিরাত বলতে বুঝায়ঃ এমন এক পুল, যা জাহান্নামের পৃষ্ঠদেশের উপর প্রলম্বিত, যার উপর দিয়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবাই পার হতে হবে, যা হাশরের মাঠের লোকদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের রাস্তা। সিরাতের বাস্তবতার স্বপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বহু দলীল-প্রমাণাদি এসেছেঃ
মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا * ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّلِمِينَ فيها جنيا (مريم: ۷۱، ۷۲)
“আর তোমাদের প্রত্যেকেই তার (জাহান্নামের) উপর দিয়ে অতিক্রম করবে, এটা আপনার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। পরে আমরা মুত্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং যালিমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব”। [সূরা মারইয়ামঃ ৭১-৭২]
অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে এখানে 'জাহান্নামের উপর দিয়ে অতিক্রম' দ্বারা তার উপরস্থিত সিরাতের উপর দিয়ে পার হওয়াই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। আর এটাই ইবনে আব্বাস, ইবনে মাস'উদ এবং কা'ব আল-আহবার প্রমূখ মুফাসসিরদের থেকে বর্ণিত।
বুখারী ও মুসলিমে আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত দীর্ঘ এক হাদীস যাতে আল্লাহর দীদার তথা আল্লাহকে দেখা এবং শাফা'আতের কথা আলোচিত হয়েছে, তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ
.. ثم يؤتى بالجسر فيجعل بين ظهري جهنم قلنا يا رسول الله وما الجسر؟ قال: مدحضة مزلة عليه خطاطيف وكلاليب وحسكة مفلطحة لها شوكة عقيفاء تكون بنجد يقال لها السعدان المؤمن عليها كالطرف وكالبرق وكالريح وكأجاويد الخيل والركاب فناج مسلم وناج مخدوش ومكدوس في نار جهنم يمر آخرهم يسحب سحباً)¹
".. 'তারপর পুল নিয়ে আসা হবে, এবং তা জাহান্নামের উপর স্থাপন করা হবে', আমরা বললামঃ হে আল্লাহ রাসূলঃ 'পুল' কি? তিনি বললেনঃ "তা পদস্খলনকারী, পিচ্ছিল, যার উপর লোহার হুক ও বর্শি এবং চওড়া ও বাঁকা কাটা থাকবে, যা নাজদের সা'দান গাছের কাঁটার মত। মু'মিনগণ তার উপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎগতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও অন্যান্য বাহনের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ সহীহ সালামতে বেঁচে যাবে, আবার কেউ এমনভাবে পার হয়ে আসবে যে, তার দেহ জাহান্নামের আগুনে জ্বলসে যাবে। এমন কি সর্বশেষ ব্যক্তি টেনে-হেঁচড়ে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনরকম অতিক্রম করবে”।
বহু হাদীসে সিরাতের গুণাগুণ বর্ণিত হয়েছে। সংক্ষেপে তার মূল কথা হলোঃ
সিরাত চুলের চেয়েও সরু, তরবারীর চেয়েও ধারাল, পিচ্ছিল, পদস্खলনকারী, আল্লাহ যাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চান সে ব্যতীত কারো পা তাতে স্থায়ী হবে না।
অন্ধকারে তা স্থাপন করা হবে, মানুষকে তাদের ঈমানের পরিমাণ আলো দেয়া হবে, তাদের ঈমান অনুপাতে তারা এর উপর দিয়ে পার হবে। যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হাদীসে এসেছে।
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭৪৩৯), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৮৩)。 শব্দ চয়ন ইমাম বোখারীর。
📄 জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা, এতদুভয়ের উপর ঈমান আনার পদ্ধতি ও তার প্রমাণাদি
যে সমস্ত বিষয়ের উপর বিশ্বাস করা ও ঈমান আনা ওয়াজিব তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জান্নাত ও জাহান্নাম।
জান্নাত হলোঃ যারা আল্লাহর আনুগত্য করে তাদের জন্য প্রতিফল স্থান। তার অবস্থানঃ সপ্তম আসমানে 'সিদরাতুল মুস্তাহা'র নিকট। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَلَقَدْ رَاهُ نَزْلَةً أُخْرَى * عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهى * عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَاوَى (النجم: ١٣ - ١٥)
"নিশ্চয়ই তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন, প্রান্তবর্তী বদরি গাছের নিকট, যার নিকটেই রয়েছে জান্নাতুল মা'ওয়া”। [সূরা আন-নাজমঃ ১৩-১৫]
জান্নাতে একশত মর্যাদাপূর্ণ স্তর রয়েছে, যার একটি থেকে আরেকটির দুরত্ব আসমান ও যমীনের মধ্যখানের দূরত্বের ন্যায়। সহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
إن في الجنة مائة درجة أعدها الله للمجاهدين في سبيل الله، ما بين الدرجتين كما بين السماء والأرض¹
"অবশ্যই জান্নাতে একশত স্তর রয়েছে যা আল্লাহ প্রস্তুত করেছেন তাঁর রাস্তায় জ্বিহাদকারীদের জন্য। দু'স্তরের মাঝখানের দূরত্ব আসমান ও যমীনের মাঝখানের দূরত্বের মত"।
সর্বোচ্চ জান্নাত হলোঃ সুউচ্চ ফিরদাউস। তার উপরই আরশ অবস্থিত। আর সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত। যেমন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত পূর্ব হাদীসটিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এসেছে, তিনি বলেছেনঃ
(فإذا سألتم الله فسلوه الفردوس فإنه أوسط الجنة وأعلى الجنة وفوقه عرش الرحمن ومنه تفجر أنهار الجنة)
“যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে, তখন তার কাছে ফিরদাউস চাও; কেননা তা সবচেয়ে মধ্যখানের জান্নাত, আবার সর্বোচ্চ জান্নাত। আর তার উপরই দয়াময়ের আরশ অবস্থিত। আর সেখান থেকেই জান্নাতের নালাসমূহ প্রবাহিত"¹。
জান্নাতের দরজা হলো আটটি। সহীহ বুখারীতে সাহল ইবনে সা'আদ বর্ণিত হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ
(في الجنة ثمانية أبواب فيها باب يسمى الريان لا يدخله إلا الصائمون)
"জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে, তম্মধ্যে একটি দরজার নাম 'রাইয়ান' যা দিয়ে শুধুমাত্র রোযাদারগণই প্রবেশ করবে"¹。
আল্লাহ জান্নাতবাসীদের জন্য জান্নাতে এমন সব নেয়ামত রেখেছেন যা কোন চক্ষু কোনদিন দেখেনি, কোন কানও কোনদিন শুনেনি আর কোন মানুষের অন্তরেও জাগেনি।
আর জাহান্নাম হলোঃ কাফির, মুশরিক এবং বিশ্বাসগত মুনাফিকদের চিরস্থায়ী শাস্তির আবাসস্থল। এছাড়াও তাওহীদ পন্থী গুনাহগারদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন তাদের গুনাহ অনুপাতে তাদেরকে সেখানে বাস করতে হবে। তারপর তাদের শেষ ঠিকানা হবে জান্নাত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ﴾ (النساء: ٤٨)
"অবশ্যই আল্লাহ তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা ক্ষমা করেন না, তা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন”। [সূরা আন-নিসাঃ ৪৮]
জাহান্নামের অবস্থানঃ সপ্তম যমীনে, ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে এমনটিই বর্ণিত হয়েছে।
জাহান্নামের বিভিন্ন স্তর রয়েছে, একটির নীচে অপরটি। আব্দুর রহমান ইবনে আসলাম বলেনঃ 'জান্নাতের স্তরসমূহ উপরের দিকে যায়, আর জাহান্নামের স্তরসমূহ নীচের দিকে যায়'।
সবচেয়ে নীচের স্তর হলো মুনাফিকদের বাসস্থান। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
إِنَّ الْمُنْفِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ) (النساء: ١٤٥)
"মুনাফিকগণ তো জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকবে”। [সূরা আন-নিসাঃ ১৪৫]
জাহান্নামের সাতটি দরজা রয়েছেঃ মহান আল্লাহ বলেনঃ
لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ لِكُلِّ بَابٍ مِنْهُمْ جُزْ مَقْسُومٌ (الحجر: ٤٤)
"তার সাতটি দরজা রয়েছে। প্রত্যেক দরজার জন্য পৃথক পৃথক স্থান রয়েছে”। [সূরা আল-হিজরঃ৪৪]
দুনিয়ার আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের একভাগ। ইমাম বুখারী ও মুসলিম আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
(ناركم جزء من سبعين جزءاً من نار جهنم)
"তোমাদের এ আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ”¹。
জান্নাত ও জাহান্নামের উপর ঈমান পূর্ণ হতে হলে তিনটি বিষয় প্রয়োজনঃ
একঃ এটা অকাট্য বিশ্বাস থাকতে হবে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম হক্ব বা বাস্তব। জান্নাত মুত্তাকীদের বাসস্থান, পক্ষান্তরে জাহান্নাম কাফির ও মুনাফিকদের আবাসস্থল। মহান আল্লাহ বলেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُ وا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلَتْهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا * وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خَلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا لَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجُ مُطَهَّرَةٌ وَنُدْخِلْهُمْ ظِلًّا ظَلِيلًا ﴾ (النساء: ٥٦ ، ٥٧)
“যারা আমার আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে আমি তাদেরকে আগুনে পোড়াবই। যখনি তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তখনি তার স্থলে নূতন চামড়া বদলিয়ে দেব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আর যারা ঈমান আনে এবং ভাল কাজ করে, তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার পাদদেশে নদী-নালাসমূহ প্রবাহিত; যেখানে তারা চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। সেখানে তাদের জন্য পবিত্র স্ত্রীসমূহ থাকবে, এবং তাদেরকে চির স্নিগ্ধ ছায়ায় দাখিল করাব”। [সূরা আন-নিসাঃ ৫৬ - ৫৭]
দুইঃ জান্নাত ও জাহান্নাম এখনো বিদ্যমান বলে বিশ্বাস করা। আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সম্পর্কে বলেনঃ
(آل عمران : ১৩৩)
﴿أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ ﴾
“মুত্তাকীদের জন্য তৈরী করা হয়েছে”। [সূরা আলে-ইমরানঃ ১৩৩]
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম সম্পর্কে বলেনঃ
(البقرة : ٢٤)
﴿أُعِدَّتْ لِلْكَفِرِينَ ﴾
“কাফিরদের জন্য তৈরী করা হয়েছে”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৪]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে সাহাবী 'ইমরান ইবনে হুসাইনের বর্ণিত হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ
(اطلعت في الجنة فرأيت أكثر أهلها الفقراء، واطلعت في النار فرأيت أكثر أهلها النساء)¹
"আমি জান্নাতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তাতে তার অধিবাসীদের অধিকাংশকেই গরীব শ্রেণীর দেখতে পেলাম, আর আমি জাহান্নামের দিকে তাকালাম তাতে দেখলাম তার অধিকাংশ অধিবাসীরাই মহিলা”।
তিনঃ একথা বিশ্বাস করা যে, জান্নাত ও জাহান্নাম চিরস্থায়ী, চিরন্তন। কোনদিন সেগুলো ধ্বংস হবে না আর এ গুলোর অধিবাসীরাও কোনদিন বিলীন হয়ে যাবে না। আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সম্পর্কে বলেনঃ
(النساء : ١٣)
خُلِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
"তারা সেখানে স্থায়ী হবে। আর এটাই হলো মহা সাফল্য" [সূরা আন-নিসাঃ ১৩]
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম সম্পর্কে বলেনঃ
وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ دَارَ جَهَنَّمَ خَلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ﴾ (الجن : ٢٣)
"যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সর্বদা চিরস্থায়ীভাবে সে সেখানে থাকবে”। [সূরা আল-জ্বিনঃ ২৩]
জাহান্নামে অবস্থান করাকে চিরস্থায়ী বলে তাগিদ দেয়ার কারণে বুঝা যাচ্ছে এখানে অবাধ্যতা দ্বারা কুফরী বুঝানো হয়েছে। কুরতুবী বলেনঃ 'আল্লাহর বাণী أبداً বলা দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এখানে অবাধ্যতা দ্বারা শির্ক বুঝানো হয়েছে”¹。
অনুরূপভাবে বুখারী ও মুসলিম 'আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
يدخل الله أهل الجنة الجنة، وأهل النار النار، ثم يقوم مؤذن بينهم فيقول: يا أهل الجنة لا موت ويا أهل النار لا موت كل خالد فيما هو فيه²
"আল্লাহ জান্নাতবাসীদেরকে জান্নাতে এবং জাহান্নামবাসীদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। তারপর তাদের মাঝে একজন আহবানকারী দাঁড়িয়ে বলবেনঃ 'হে জান্নাতবাসী! কোন মৃত্যু নেই, আর হে জাহান্নামবাসী! কোন মৃত্যু নেই, যে যেখানে আছে সেখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে”²。
শেষ দিবসের উপর ঈমানের ফলাফলঃ
মু'মিনের জীবনে পরকালের উপর ঈমানের অনেক বিরাট ফলাফল রয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ
১. সেদিনের সওয়াবের আশায় আল্লাহর আনুগত্য করতে সদা সচেষ্ট থাকা। আর সেদিনের শান্তির ভয়ে তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা।
২. যখন দুনিয়ার কোন নেয়ামত ও উপকরণ মু'মিনের হাতছাড়া হয়ে যায়, তখন সে আখেরাতের নেয়ামت ও সওয়াবের আশায় শান্তনা লাভ করে।
৩. মহান আল্লাহর পূর্ণ ইনসাফের অনুভূতি জাগ্রত হওয়া; কারণ তিনি বান্দাদের প্রতি দয়াশীল হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যেককে তার আমল বা কার্য অনুসারে প্রতিফল দিবেন।
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ২৭৯০)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩২৫৭)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩২৬৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৮৭১)。
¹সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩২৪১), একই অর্থে সংক্ষিপ্তাকারে সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২738), শব্দ চয়ন ইমাম বুখারীর。
¹ তাফসীর কুরতুবী (১৯/২৭), তাফসীরে ফাতহুল কাদীর (৫/৩০৭)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৫৪৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৮৫০)。 শব্দ চয়ন ইমাম মুসলিমের。