📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 পুনরুত্থান ও তার হাকীকত

📄 পুনরুত্থান ও তার হাকীকত


পুনরুত্থানের উপর ঈমান আনা এ দ্বীনের মহান মূলনীতিগুলোর অন্যতম। এ বিষয়ে কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত দলীল-প্রমাণাদি থেকে বুঝা যায় যে, এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি অনেক। আর তাই এখানে এ বিষয়টি বেশ কয়েকটি আলোচনার মাধ্যমে পেশ করা হবে যাতে করে তার হাকীকত, তার উপর ঈমানের গুরুত্ব এবং তার বিভিন্ন অবস্থা ও ঘটনার উপর কিভাবে ঈমান আনতে হবে তা স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায়।

প্রথম বিষয়: পুনরুত্থান ও তার হাকীকত

পুনরুত্থানকে আরবীতে বলা হয়: البعث আরবদের ভাষায় তার দু'টি অর্থ হয়:

প্রথম অর্থ: পাঠানো, এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে আল্লাহ বাণী:
﴿ ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ مُوسَى ﴾ (الأعراف: ۱۰۳)
"তারপর আমরা তাদের পরে মূসাকে প্রেরণ করেছি”। [সূরা আল-আ'রাফঃ ১০৩] অর্থাৎ আমি পাঠিয়েছি।

দ্বিতীয় অর্থ: উঠানো, নড়াচড়া করানো, বলা হয়ে থাকে :
بعثت البعير فانبعث
অর্থাৎ 'আমি উটকে উঠালাম তাতে সে উঠে পড়ল। আর এ অর্থেই বলা হয় 'মৃতদের উত্থান'; তাদেরকে তাদের কবর থেকে জীবিত করণ ও উঠানোর মাধ্যমে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿ ثُمَّ بَعَثْنَكُمْ مِنْ بَعْدِ مَوْتِكُمْ ﴾ (البقرة : ٥٦)
"তারপর আমরা তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করেছি তোমাদের মৃত্যুর পরে" [সূরা আল বাকারাহ: ৫৬] অর্থাৎ তোমাদেরকে জীবিত করেছি।

আর শরীয়তের পরিভাষায় البعث )পুনরুত্থান) বলা হয়: আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক মৃতদের জীবিতকরণ ও তাদেরকে তাদের কবর থেকে বের করা।

পুনরুত্থানের হাকীকত :

আল্লাহ তা'আলা কবরবাসীদের শরীরের নষ্ট হওয়া অংশ একত্রিত করবেন এবং তাঁর নিজস্ব ক্ষমতায় পূর্বের মত সেগুলোর পুনরাবর্তন ঘটাবেন। তারপর সেগুলোতে রূহ ফেরত দিবেন এবং তাদেরকে বিচার-ফয়সালার সম্মুখীন করার জন্য হাশরের মাঠের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবেন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَنَيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهيَ رَمِيمٌ * قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَاهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ ﴾ (يس: ۷۸، ۷۹)
"আর সে আমাদের সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়, সে বলে: 'কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন তা পঁচে গলে যাবে?' বলুন: 'তার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার তিনিই করবেন যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।' [সূরা ইয়াসীন: ৭৮-৭৯]

অনুরূপভাবে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(إن رجلاً حضره الموت لما أيس من الحياة أوصى أهله: إذا مت فاجمعوا لي حطباً كثيراً ثم أوروا ناراً حتى إذا أكلت لحمي وخلصت إلى عظمي فخذوها فاطحنوها فذروني في اليم في يوم حار أو راح فجمعه الله فقال: لم فعلت؟ قال: خشيتك، فغفر له)¹
"এক লোকের মৃত্যু আসন্ন হলে যখন সে তার জীবন সম্পর্কে নিরাশ হলো, তখন তার পরিবার-পরিজনকে এ বলে অসিয়ত করল: 'আমি মরে গেলে আমার জন্য অনেক কাঠ জোগাড় করবে তারপর আগুন লাগিয়ে দিবে, যখন আগুন আমার গোস্ত খেয়ে ফেলবে এবং শুধুমাত্র হাঁড় পর্যন্ত ঠেকবে তখন সেগুলোকে নিয়ে পিশে কোন এক গরম দিনে বা ঝড়ের দিনে সমুদ্রে ছিটিয়ে দিবে। তারপর আল্লাহ তা'আলা তা একত্রিত করে জিজ্ঞাসা করলেন: 'কেন তুমি এ রকম করেছ'? সে বলল : আপনার ভয়ে। ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন”।

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা এ শরীরেই পূনরাবর্তন ঘটাবেন এবং এর পঁচা নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশ একত্রিত করবেন, যাতে করে পূর্বে যেমন ছিল তেমন হয়ে যায়। তারপর তাতে তার রূহ ফেরত দিবেন। সুতরাং সে সত্তারই পবিত্রতা ঘোষণা করছি যাকে কোন কিছু অপারগ করতে পারে না, তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

রাসূলের সুন্নায় পুনরুত্থানের বিস্তারিত ধরন বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ যমীনের উপর পানি অবতীর্ণ করবেন, কবরবাসীগণ যার মাধ্যমে ঘাস যেভাবে উৎপন্ন হয় সেভাবে উৎপন্ন হবেন। এর প্রমাণ সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আবু হুরায়রার হাদীস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
(ما بين النفختين أربعون قال : أربعون يوماً. قال: أبيت، قال: أربعون شهراً؟ قال: أبيت قال أربعون سنة؟ قال: أبيت، قال: (ثم ينزل الله من السماء ماء فينبتون كما ينبت البقل ليس من الإنسان شيء إلا يبلى إلا عظماً واحداً، وهو عجب الذنب ومنه يركب الخلق يوم القيامة)¹
"দু'ফুৎকারের মাঝখানের সময় চল্লিশ”, (শ্রোতা) বলল: চল্লিশ দিন? তিনি বললেনঃ আমি তা বলতে অস্বীকার করছি। বলল: চল্লিশ মাস? তিনি বললেন: আমি তা বলতে অস্বীকার করছি। বলল: চল্লিশ বছর? তিনি বললেন: আমি তা বলতে অস্বীকার করছি। তিনি বললেন: “তারপর আল্লাহ আকাশ থেকে পানি অবতীর্ণ করবেন, যাতে তৃণ-লতা যেভাবে উৎপন্ন হয় তেমনি করে তারাও উৎপন্ন হবে। মানুষের শরীরের সবকিছুই নষ্ট হয়ে যায় তবে একটি হাড়, আর সেটা হলো মেরুদন্ডের নিম্নস্থিত হাড় বিশেষ। আর তার থেকেই ক্বিয়ামতের দিন সৃষ্টি জোড়া লাগবে"।

এ হাদীসে পূনরুত্থান কিভাবে হবে তার প্রমাণ পাওয়া যায় : কবরবাসীগণ দু'ফুৎকার তথা মৃত্যুর ফুৎকার ও পুনরুত্থানের ফুৎকার এ দু'য়ের মধ্যবর্তী সময় চল্লিশ পর্যন্ত তাদের কবরে অবস্থান করবে, চল্লিশ দ্বারা কি চল্লিশ দিন না চল্লিশ মাস নাকি চল্লিশ বছর বুঝানো হয়েছে এ সম্পর্কে হাদীসের বর্ণনাকারী সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে অস্বীকার করেছেন। যদিও কোন কোন বর্ণনায় তা চল্লিশ বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। তারপর আল্লাহ যখন তার সৃষ্টিকে পূণর্জ্জীবিত করার ইচ্ছা করবেন তখন তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি অবতীর্ণ করবেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, সে বৃষ্টি পুরুষের বীর্যের মত গাড় হবে, ফলে এ পানি থেকে কবরবাসীগণ তাদের শরীরের মেরুদন্ডের নীচের হাড় ব্যতীত বাকী সবকিছু পচে গলে মিশে যাবার পরে ঘাস যেভাবে উৎপন্ন হয় সেভাবে উৎপন্ন হবে। তবে এটা নবী-রাসূলদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; কারণ তাদের শরীর পঁচে না, যার বর্ণনা আগেই চলে গেছে। এ আলোচনা দ্বারা পুনরুত্থানের হাকীকত, তার সময় এবং তা কিভাবে হবে স্পষ্ট হয়ে গেল। আল্লাহ সবচেয়ে বেশী জানেন।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪৭৯)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৯৩৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৯৫৫)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 কুরআন, সুন্নাহ ও যুক্তির ভিত্তিতে পুনরুত্থানের প্রমাণ

📄 কুরআন, সুন্নাহ ও যুক্তির ভিত্তিতে পুনরুত্থানের প্রমাণ


কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা মৃতদের পুনরুত্থিত করবেন, কুরআন ও সুন্নার বহু স্থানে এ বিষয়টি প্রমাণসহ বর্ণনা করা হয়েছে।

কুরআন থেকে দলীল: মহান আল্লাহর বাণী ৪
﴿ثُمَّ بَعَثْنَكُمْ مِنْ بَعْدِ مَوْتِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ﴾ (البقرة : ٥٦).
"তারপর তোমাদের মৃত্যুর পর আমরা তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও”। [সূরা আল- বাকারাহঃ ৫৬]
﴿مَا خَلَقَكُمْ وَلَا بَعْتُكُمْ إِلَّا كَنَفْسٍ وَاحِدَةٍ إِنَّ اللهَ سَمِيعٌ بَصِيرُ﴾ (لقمان: ۲۸).
"তোমাদের সকলের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি আত্মার সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই অনুরূপ। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা”। [সূরা লুকমান: ২৮]
﴿زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثْنَ ثُمَّ لَتُنَبُونَ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللهِ يَسِيرُ﴾ (التغابن: ٧)
"কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনও পুনরুত্থিত হবে না, বলুন: অবশ্যই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ, তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে তারপর তোমরা যা করতে তা তোমাদেরকে অবশ্যই জানানো হবে, আর তা আল্লাহর পক্ষে সহজ”। [সূরা আত-তাগাবুন : ৭]

সুন্নাহ থেকে দলীল :

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেছেন :
لا تفضلوا بين أنبياء الله فإنه ينفخ في الصور فيصعق من في السموات ومن في الأرض إلا من شاء الله قال : ثم ينفخ فيه مرة أخرى فأكون أول من بعث أو في أول من بعث فإذا موسى آخذ بالعرش ..¹
“তোমরা আল্লাহর নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে ব্যস্ত হয়ো না; কেননা শিঙ্গায় যখন ফুঁ দেয়া হবে তখন যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা ব্যতীত আসমানে যা আছে, আর যমীনে যা আছে সব কিছুই মূর্ছিত হয়ে পড়বে, তারপর আবার তাতে ফুঁ দেয়া হবে তখন আমি সর্ব প্রথম উত্থিত হবো, অথবা বলেছেন: আমি প্রথম উত্থিতদের মধ্যে হবো, আমি তখন মূসাকে দেখতে পাব যে তিনি আরশ ধরে আছেন ...”।

অনুরূপভাবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত আবু সা'ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এসেছে :
فأكون أول من تنشق عنه الأرض²
“তারপর আমিই হবো সে ব্যক্তি সর্বপ্রথম যার জন্য যমীন বিদীর্ণ হবে”²。

এ হাদীসদ্বয় থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন মৃতদেরকে তাদের কবর থেকে পুনরুত্থিত করে হাশরের মাঠে জড়ো করবেন। এ দু' হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণিত হচ্ছে; কারণ তাকেই প্রথম পুনরুত্থিত করা হবে।

সঠিক যুক্তি দ্বারাও পুনরুত্থানকে সাব্যস্ত করা যায়; কারণ পুনরুত্থান হলো পূণঃসৃষ্টি। আর বিবেকবান মাত্রই এটা জানে যে, কোন বস্তু পূনরায় সৃষ্টি করা তাকে নতুনভাবে সৃষ্টি ও প্রথমবার তৈরী করা থেকে অনেক সহজ। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে মানুষকে প্রথমবার সৃষ্টি করা ও তাকে প্রথমবার তৈরী করার কথা উল্লেখ করে এবং যিনি প্রথম সৃষ্টি করতে সক্ষম তিনি যে পুনরাবৃত্তি ঘটাতে আরো উত্তমভাবে সক্ষম, সে কথা জানিয়ে দিয়ে পুনরুত্থান ও এর বাস্তবতাকে সাব্যস্ত করেছেন। যখন পুনরুত্থানের উপর আপত্তি উত্থাপনকারী বললঃ
مَنْ يُحي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيم (يس: ۷۸)
"কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন তা পঁচে গলে যাবে?" [সূরা ইয়াসীন: ৭৮]

আল্লাহ তা'আলা তার উত্তরে বলেন:
قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَاهَا أَوَّلَ مَرَّة (يس: ٧٩)
"বলুন : 'তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন”। [সূরা ইয়াসীন: ৭৯]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَأَهْوَنُ عَلَيْهِ (الروم: ٢٧)
"তিনি সৃষ্টিকে প্রথমবার সৃষ্টি করেন, তারপর তিনি তা পুনর্বার সৃষ্টি করবেন; আর তা তার জন্য অতি সহজ"। [সূরা আর-রূম: ২৭]

সুতরাং এ দলীলটি পবিত্র কুরআন থেকে পুনরুত্থানকে অস্বীকারকারী ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীর মতামত খন্ডনে শরীয়তের পক্ষ থেকে পেশকৃত দলীল হওয়ার সাথে সাথে বিবেকের দলীল হিসাবে ও গণ্য। এটা এমন এক দলীল যা খন্ডন করতে কেউ সমর্থ হবে না।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৩৭৩), এ ছাড়া অন্যান্যরাও এ হাদীস বর্ণনা করেছেন。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ২৪১২), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৭৮)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 হাশর

📄 হাশর


কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, পুনরুত্থানের পর বান্দাগণ হাশরের মাঠে খালি পা, উলঙ্গ, খৎনাবিহীন অবস্থায় জমায়েত হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَحَشَرْتُهُمْ فَلَمْ تُغَادِرُ مِنْهُمْ أَحَدًا (الكهف: ٤٧)
"আর আমরা তাদের সকলকে একত্র করব আর তাদের কাউকে ছাড়ব না।” [সূরা আল-কাহফঃ ৪৭]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ وَبَرَزُو اللهُ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ (إبراهيم: ٤٨)
"সেদিন এ যমীন পরিবর্তিত হয়ে অন্য যমীন হবে এবং আসমানও; এবং মানুষ পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে"। [সূরা ইব্রাহীমঃ৪৮]

অনুরূপভাবে 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ
يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! النِّسَاءُ وَالرِّجَالُ جَمِيعًا، يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ؟ قَالَ : (يَا عَائِشَةُ الْأَمْرُ أَشَدُّ مِنْ أَنْ يَنْظُرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ)
"কিয়ামতের দিন মানুষকে নগ্ন পা, উলঙ্গ, খৎনাবিহীন অবস্থায় একত্রিত করা হবে”। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! মহিলা পুরুষ একত্রে, একে অপরের দিকে তাকাবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ “হে আয়েশা! ব্যাপারটা একে অপরের দিকে তাকানোর চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক"¹。

এ হাশর বা একত্রিতকরণ সমস্ত সৃষ্টিকুলের উপর প্রযোজ্য। কুরআন ও হাদীস থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, সেখানে অন্য এক প্রকার হাশর আছে, হয় জান্নাতে নতুবা জাহান্নামে। মু'মিনদেরকে জান্নাতের দিকে দাঁড়ানো সওয়ারী অবস্থায় জমায়েত করা হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفُدًا (مريم : ٨٥)
"যেদিন দয়াময়ের নিকট মুত্তাকীদিগকে সম্মানিত মেহমান রূপে আমরা সমবেত করব। [সূরা মারইয়ামঃ ৮৫]

ত্বাবারী উল্লেখ করেন যে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর বাণীঃ
﴾ تَحْثِرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَقُدًا ﴿
এ আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ 'সাবধান! আল্লাহর শপথ করে বলছি, ওয়াফদ তথা প্রতিনিধি দলকে তাদের পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে না অনুরূপভাবে তাদেরকে জোর করে হাঁকিয়েও নেয়া হবে না। বরং তাদের জন্য এমন সব উট নিয়ে আসা হবে সৃষ্টিকুলের কেউ সেগুলোর মত কিছু দেখেনি। সেগুলোর উপর স্বর্ণের পাদানি আর যেগুলোর লাগাম হবে মুল্যবান যবর্জুদ পাথরের, জান্নাতের দরজায় পৌঁছা পর্যন্ত তাদেরকে এগুলোর উপর সওয়ার করানো হবে"¹。

পক্ষান্তরে কাফিরদেরকে জাহান্নামের দিকে তাদের মুখের উপর অন্ধ, বোবা, বধির অবস্থায় হাশর করানো হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
الَّذِينَ يُحْشَرُونَ عَلَى وُجُوهِهِمْ إِلَى جَهَنَّمَ أُولَئِكَ شَرِّ مَكَانَا وَأَضَلُّ سَبِيلًا ﴾ (الفرقان: ٣٤)
"যাদেরকে মুখের উপর ভর দিয়ে চলা অবস্থায় জাহান্নামের দিকে একত্র করা হবে, তারা স্থানের দিক থেকে অতি নিকৃষ্ট এবং অধিক পথভ্রষ্ট”। [সূরা আল- ফুরকানঃ ৩৪]

قِيمَةِ عَلَى وُجُوهِهِمْ عُمْيَا وَبُكْمَا وَصُمَّا (الإسراء: ٩٧)
وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ "আর ক্বিয়ামতের দিন আমরা তাদেরকে সমবেত করব তাদের মুখের উপর ভর দিয়ে চালিয়ে অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়”। [সূরা আল-ইস্রাঃ ৯৭]

টিকাঃ
¹ মুত্তাফাকুন আলাইহি, সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৫২৭), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৮৫৯)。
¹ তাফসীরে তাবারী (৮/৩৮০)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 হাউযের বর্ণনা ও তার দলীল

📄 হাউযের বর্ণনা ও তার দলীল


হাউয হলো এমন এক বিরাট পানির ধারা যা আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হাশরের মাঠে দান করেছেন, যেখানে তিনি এবং তার উম্মাত অবতরণ করবে। দলীল-প্রমাণাদি হতে বুঝা যায় যে, তা দুধের চেয়েও শুভ্র, বরফের চেয়েও ঠান্ডা, মধুর চেয়েও মিষ্টি, মিসকের চেয়েও অধিক সুঘ্রাণসম্পন্ন। যা অনেক প্রশস্ত, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে সমান, তার কোণ সমূহের প্রত্যেক কোণ এক মাসের রাস্তা, তার পানির মূল উৎস হলো জান্নাত। জান্নাত থেকে এমন দু'টি নলের মাধ্যমে তার সরবরাহ কাজ সমাধা হয়ে থাকে যার একটি স্বর্ণের অপরটি রৌপ্যের। তার পেয়ালা সমুহের সংখ্যা আকাশের তারকারাজীর মত।

হাউযের অস্তিত্ব ও বাস্তবতা অনেক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। কোন কোন অভিজ্ঞ আলেম উল্লেখ করেছেন যে, এ হাদীসগুলো মুতাওয়াতির। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ত্রিশ জনের বেশী সাহাবী এ সমস্ত হাদীস বর্ণনা করেছে। তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ

আনাস ইবনে মালিক বর্ণিত হাদীস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(إن قدر حوضي كما بين أيلة إلى صنعاء من اليمن وإن فيه من الأباريق كعدد نجوم السماء)¹
"আমার হাউযের পরিমাণ হচ্ছে 'আইলা' (বায়তুল মুকাদ্দাস) থেকে সান'আ পর্যন্ত, আর সেখানে পেয়ালার সংখ্যা আকাশের তারকার মত এত বেশী”।

অনুরূপভাবে আব্দুল্লাহ ইবনে 'আমর ইবনুল 'আস হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(حوضي مسيرة شهر وزواياه سواء ماؤه أبيض من اللبن، وريحه أطيب من المسك، وكيزانه كنجوم السماء من يشرب منها فلا يظمأ أبداً)²
"আমার হাউয এক মাসের রাস্তা, তার কোণসমূহ একই সমান, তার পানি দুধের চেয়েও সাদা, তার ঘ্রাণ মিসকের চেয়েও বেশী উত্তম, তার পেয়ালাসমূহ আকাশের তারকার মত বেশী, যে তা থেকে পান করবে সে আর কখনো পিপাসার্ত হবেনা”।

হাউযের অবস্থান হাশরের মাঠে, যার পানি কাউসার থেকে সরবরাহ করা হবে, যা অন্য আরেকটি স্রোতস্বিনী, যা আল্লাহ আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দান করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿إِنَّا أَعْطَيْنَكَ الْكَوْثَرَ (الكوثر : 1)
"আমরা তো আপনাকে দিয়েছি কাউসার" [সূরা আল-কাউসারঃ১]

মীযান ও হাউযের মধ্যে কোনটি আগে আর কোনটি পরে হবে এ ব্যাপারে আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ বলেনঃ মীযান আগে, আবার কেউ বলেনঃ হাউয আগে। তম্মধ্যে সঠিক মত হচ্ছেঃ হাউয আগে। কুরতুবী বলেনঃ যুক্তির চাহিদাও তাই; কেননা মানুষ তাদের কবর থেকে পিপাসার্ত হয়ে বের হবে।

টিকাঃ
¹ মুত্তাফাকুন আলাইহি, সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৫৮০), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৩০৩)。
² মুত্তাফাকুন আলাইহি, সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৫৭৯), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৯২)。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00