📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 ইসলামে অলী ও বেলায়াত

📄 ইসলামে অলী ও বেলায়াত


অলী ও বেলায়াতের সংজ্ঞা:
বেলায়াত : শব্দটি আরবী الولاية শব্দ থেকে গৃহীত। যা العداوة শব্দের বিপরীত শব্দ। الولاية বা বেলায়াতের মূল হলো: ভালবাসা ও নৈকট্য। আর العداوة এর মূল হলো: ঘৃণা ও দূরত্ব।

শরীয়তের পরিভাষায় বেলায়াত বলতে বুঝায়: আল্লাহর কাছে তার আনুগত্যের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ।

আর শরীয়তের পরিভাষায় অলী বলতে বুঝায়: যার মধ্যে দু'টি গুণ আছে: ঈমান এবং তাকওয়া। মহান আল্লাহ বলেন:
الا ان أو لِيَاءَ اللهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ * الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (يونس: ৬২-৬৩)
"জেনে রাখ! আল্লাহর অলী তথা বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেনা, যারা ঈমান আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে”। [সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩]

অলীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের তারতম্য: যদি আল্লাহর অলী বলতে ঈমানদার ও মুত্তাকীদের বুঝায় তাহলে বান্দার ঈমান ও তাকওয়া অনুসারে আল্লাহর কাছে তার বেলায়াত তথা বন্ধুত্ব নির্ধারিত হবে। সুতরাং যার ঈমান ও তাকওয়া সবচেয়ে বেশী পূর্ণ, তার বেলায়াত তথা আল্লাহর বন্ধুত্ব সবচেয়ে বেশী হবে। ফলে মানুষের মধ্যে তাদের ঈমান ও তাকওয়ার ভিত্তিতে আল্লাহর বেলায়াতের মধ্যেও তারতম্য হবে।

আল্লাহর নবীরা তার সর্বশ্রেষ্ঠ অলী হিসাবে স্বীকৃত। নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন তার রাসূলগণ। রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন: দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ তথা নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, 'ঈসা এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আর সমস্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- যার আলোচনা পূর্বে চলে গেছে- তারপর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তারপর বাকী তিনজনের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নির্ধারণে আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে।

আল্লাহর অলীদের প্রকারভেদ:
আল্লাহর অলীগণ দু'শ্রেণীতে বিভক্ত:

প্রথম শ্রেণী: যারা অগ্রবর্তী ও নৈকট্যপ্রাপ্ত।

দ্বিতীয় শ্রেণী: যারা ডান ও মধ্যম পন্থী।

আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাদের উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
إِذَا وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ * لَيْسَ لِوَقْعَتِهَا كَاذِبَةٌ * خَافِضَةٌ رَافِعَةٌ * إِذَا رَجَتِ الْأَرْضُ رَجَا* وَبُسَتِ الْجِبَالُ بَنَا * فَكَانَتْ هَبَاء مُنْبَنَا وَكُنتُمْ أَزْوَاجًا تَلَتَهُ * فَأَصْحَبُ الْيَمَنَةِ مَا أَصْحَبُ الْيَمَنَةِ * وَأَصْحَبُ الْمَشْمَةِ مَا أَصْحَبُ المَشْمَةِ * وَالسَّبِقُونَ السَّبقُونَ * أُولَئِكَ الْمُقَرَّبُونَ * فِي جَنْتِ النَّعِيمِ (الواقعة: ١-١٢)
“যখন যা ঘটা অবশ্যম্ভাবী (কিয়ামত) তা ঘটবে, তখন তার সংঘটনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কেউ থাকবে না। তা কাউকে নীচ করবে, কাউকে সমুন্নত করবে। যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে যমীন। পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। ফলে তা উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পর্যবসিত হবে। এবং তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে- ডান দিকের দল; ডান দিকের দলের কি মর্যাদা। আর বাম দিকের দল; বাম দিকের দলের কি অসম্মান! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী। তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত- নেয়ামত পূর্ণ জান্নাতে। [সূরা আল-ওয়াকি'আহঃ ১-১২]

এখানে তিন শ্রেণীর লোকের উল্লেখ করা হয়েছে: যাদের একদল জাহান্নামের, তাদেরকে বামদিকের দল বলা হয়েছে। আর বাকী দু'দল জান্নাতের, তারা হলেন: ডানদিকের দল এবং অগ্রবর্তী ও নৈকট্যপ্রাপ্তগণ। তাদেরকে আবার এ সূরা আল-ওয়াকি'আরই শেষে আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করে বলেছেন:
فَأَمَّا إِن كَانَ مِنَ الْمُقَرَّبِينَ * فَرَوْحُ وَ رَيْحَانَ وَجَنَّتُ نَعِيمٍ وَأَنَّا أَنْ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ * فَسَلَامٌ لَكَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ (الواقعة: ۸۸ - ۹۱)
“তারপর যদি সে নৈকট্যপ্রাপ্তদের একজন হয় তবে তার জন্য রয়েছে আরাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও নেয়ামত পূর্ণ জান্নাত। আর যদি সে ডান দিকের একজন হয় তবে তোমার জন্য সালাম ও শান্তি; কারণ সে ডান পন্থীদের মধ্যে”। [সূরা আল- ওয়াকি'আহঃ ৮৮-৯১]

অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অলীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিখ্যাত হাদীসে এ দু'দলের বর্ণনা দিয়েছেন। হাদীসটি হাদীসে কুদসী যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় প্রভু আল্লাহর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করছেন: তিনি বলেন:
(إن الله تعالى قال: من عادى لي ولياً فقد آذنته بالحرب، وما تقرب إلى عبدي بشيء أحب إلي مما افترضت عليه، وما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها ورجله التي يمشي بها، وإن سألني لأعطينه ولئن استعاذني لأعيذنه)¹
"মহান আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আমার কোন অলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আমার বান্দার উপর যা আমি ফরয করেছি তা ছাড়া আমার কাছে অন্য কোন প্রিয় বস্তু নেই যার মাধ্যমে সে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে। আমার বান্দা আমার কাছে নফল কাজসমূহ দ্বারা নৈকট্য অর্জন করতেই থাকে, শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ভালবাসি। তারপর যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যাই যার দ্বারা সে শুনে, তার দৃষ্টি শক্তি হয়ে যাই যার দ্বারা সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যার দ্বারা সে ধারণ করে আর তার পা হয়ে যাই যার দ্বারা সে চলে। তখন আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা অবশ্যই দেব, আমার কাছে আশ্রয় চাইলে আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দেব”।

সুতরাং নেককার লোকেরা হলো: ডান দিকের দল, যারা আল্লাহর কাছে ফরজ আদায়ের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করে। তারা আল্লাহ তাদের উপর যা ওয়াজিব করেছেন তা আদায় করে, আর যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করে। তারা নফল কাজে নিজেদের কষ্ট দেয় না, বাড়তি হালাল কর্মকান্ড থেকেও দুরে থাকে না। কিন্তু যারা অগ্রবর্তী নৈকট্যপ্রাপ্ত দল তারা আল্লাহর কাছে ফরজ আদায়ের পর নফলের মাধ্যমে নৈকট্য লাভে রত হয়। ফলে তারা ওয়াজিব, মুস্তাহাব আদায় করে, হারাম ও মাকরূহ বস্তু ত্যাগ করে। তারপর যখন তারা তাদের ক্ষমতা অনুসারে তাদের প্রিয় বস্তুর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হয়, তাদের প্রভুও তখন তাদেরকে পরিপূর্ণভাবে ভালবাসেন এবং তাদেরকে গুনাহের কাজ থেকে হেফাজত করেন, তাদের দো'আ কবুল করেন। যেমনটি আল্লাহ এ হাদীসে বলেছেন যে, “আমার বান্দা আমার কাছে নফল কাজসমূহ দ্বারা নৈকট্য অর্জন করতেই থাকে, শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ভালবাসি...”।

আল্লাহর অলীগণ কোন পোষাক বা বিশেষ কোন আকৃতির সাথে সুনির্দিষ্ট নন:

সুন্নাতের অনুসারী আলেম ও বিশেষজ্ঞদের নিকট একথা স্বীকৃত যে, আল্লাহর অলীগণ অন্যান্য মানুষদের থেকে প্রকাশ্যে কোন পোষাক বা কোন বেশ-ভূষা দ্বারা বিশেষভাবে পরিচিত হন না।

অলীদের সম্পর্কে গ্রন্থ রচনাকারী কোন এক ইমাম বলেছেন: 'আল্লাহর অলীগণ সাধারণ মানুষ থেকে প্রকাশ্যে কোন বৈধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন না। সুতরাং তারা হালাল কোন পোষাক ছেড়ে অন্য কোন পোষাকের মাধ্যমে পরিচিত হন না। তেমনিভাবে তারা চুল কামানো বা খাটো করা বা গোছা করা ইত্যাদি হালাল কোন কাজের মাধ্যমেও পরিচিত হন না। যেমন বলা হয়ে থাকে: সাধারণ পোষাকে অনেক বন্ধু আছে, আলখেল্লা গায়ে অনেক যিন্দীক তথা গোপন কাফের রয়েছে। বরং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মাতের মধ্যে প্রকাশ্য বেদ'আতকারী ও অন্যায়কারী ছাড়া সর্বস্তরে আল্লাহর অলীগণের অস্তিত্ব বিদ্যমান। সুতরাং তাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায় কুরআনের ধারক-বাহকদের মাঝে, জ্ঞানী-আলেমদের মাঝে, যেমনিভাবে তাদের অস্তিত্ব রয়েছে জিহাদকারী ও তরবারী-ধারকদের মাঝে, অনুরূপভাবে তাদেরকে পাওয়া যাবে ব্যবসায়ী, কারিগর ও কৃষকের মাঝে।

অলীদের ব্যাপারে যে সমস্ত অতিরঞ্জিত বিশ্বাস বিদ্যমান তার খন্ডন: আল্লাহর অলীগণ নিষ্পাপ নন, তারা গায়েবও জানেন না, সৃষ্টি বা রিযিক প্রদানে তাদের কোন প্রভাবও নেই। তারা নিজেদেরকে সম্মান করতে অথবা কোন ধন-সম্পদ তাদের উদ্দেশ্যে ব্যয় করতে মানুষদেরকে আহবান করেন না।

যদি কেউ এমন কিছু করে তাহলে সে আল্লাহর ওলী হতে পারে না, বরং মিথ্যাবাদী, অপবাদ আরোপকারী, শয়তানের ওলী হিসাবে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে ভাল জানেন।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী, (হাদীস নং ৬৫০২)。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00