📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 নবীদের জীবিত থাকা সম্পর্কে

📄 নবীদের জীবিত থাকা সম্পর্কে


কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবীরা মারা গেছেন। অবশ্য যাদের জীবিত থাকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট দলীল এসেছে তারা ব্যতীত, যেমন 'ঈসা আলাইহিস সালাম; কেননা তিনি এখনো মারা যাননি বরং তাকে জীবিত অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার কাছে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে যার বর্ণনা অচিরেই আসবে।

নবীদের মৃত্যু হওয়ার প্রমাণাদির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: আল্লাহর বাণী:
أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ ﴾ (البقرة: ١٣٣)
"ইয়া'কুবের যখন মৃত্যু এসেছিল তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে?” [সূরা আল-বাকারাহ : ১৩৩]

মহান আল্লাহ আরো বলেন :
وَلَقَدْ جَاءَ كُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِمَّا جَاءَ كُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يَبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولًا ﴾ (غافر : ٣٤)
"ইতিপূর্বে তোমাদের নিকট ইউসুফ এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শনসহ; কিন্তু তোমরা তিনি তোমাদের নিকট যা নিয়ে এসেছিল তাতে সর্বদা সন্দেহে ছিলে। পরিশেষে যখন তার মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলে, 'তার পরে আল্লাহ আর কোন রাসূল প্রেরণ করবেন না”। [সূরা গাফির : ৩৪]

আল্লাহ তা'আলা সুলাইমান আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন:
فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَأَتَهُ ﴾ (سبأ : ١٤)
“তারপর যখন আমরা সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম তখন জ্বিনদিগকে তার মৃত্যুর বিষয় জানাল কেবল মাটির পোকা, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। [সূরা সাবাঃ ১৪]

মহান আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
﴿ إِنَّكَ مَيِّتُ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ ﴾ (الزمر: ٣٠)
"আপনি তো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল"। [সূরা আয-যুমার : ৩০]

কোন কোন মুফাস্সির বলেন : এ আয়াত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর খবর দিল, সাথে সাথে তাদের মৃত্যুর ঘোষণাও দেয়া হলো। সুতরাং এ আয়াত সাহাবাদের জানিয়ে দিল যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা যাবেন।

অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক সৃষ্ট প্রাণীর মৃত্যুবরণ করতে হবে এ ঘোষণা দিয়ে বলেন :
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ (آل عمران : ١٨٥ والأنبياء: ٣٥، والعنكبوت: ٥٧)
"প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে"। [সূরা আলে-ইমরান : ১৮৫, আল- আম্বিয়া : ৩৫, আল-'আন্‌কাবুত : ৫৭]

এ আয়াতসমূহ নবীদের মৃত্যু প্রমাণ করে। আরো প্রমাণ করে যে, তাদের মৃত্যু অন্যান্য মানুষের মতই। তবে 'ঈসা আলাইহিস সালাম এর ব্যতিক্রম। মহান আল্লাহ তার সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন :
إِذْ قَالَ اللهُ يَعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَى وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا ﴾ (آل عمران : ٥٥)
"স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ বললেন, 'হে 'ঈসা! আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব এবং আমার নিকট আপনাকে উঠিয়ে নিব এবং যারা কুফরী করে তাদের মধ্য হতে আপনাকে পবিত্র করব'"। [সূরা আলে-ইমরান : ৫৫]

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা 'ঈসা আলাইহিস সালামকে তার শরীর ও রূহসহ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তার মৃত্যু হয়নি। আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর বাণী ﴿ مُتَوَفِّيكَ শব্দে বর্ণিত 'ওফাত' সম্পর্কে তাফসীরে এসেছে : 'তাকে ওফাত দেয়ার অর্থ : তাকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নেয়া'। ইবনে জারীর ত্বাবারী এ মত পোষণ করেছেন। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মতে উল্লেখিত 'ওফাত' দ্বারা ঘুম বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ اللهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ﴾ (الزمر: ٤٢)
"আল্লাহই আত্মাসমূহকে “ওফাত” প্রদান করেন মৃত্যুর সময় অনুরূপভাবে সেসব আত্মাকেও (ওফাত দেন) নিদ্রাবস্থায় যেগুলোর মৃত্যু হয়নি”। [সূরা আয-যুমার: ৪২]

সুতরাং এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, 'ঈসা আলাইহিস সালাম এখনো আসমানে জীবিত আছেন, তার মৃত্যু হয়নি। আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কিয়ামতের পূর্বে তার মৃত্যু হবে। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿ وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا ﴾ (النساء: ١٥٩)
"কিতাবী (ইয়াহুদী-নাসারা)দের মধ্যে প্রত্যেকে তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর ঈমান আনবেই আর ক্বিয়ামতের দিন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন”। [সূরা আন-নিসা: ১৫৯]

এখানে যে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে: তা হলো 'ঈসা আলাইহিস সালাম এর মৃত্যু, যখন তিনি শেষ জামানায় আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়ে ক্রুশ ধ্বংস করবেন, শুকর হত্যা করবেন এবং জিযিয়া তথা প্রাণরক্ষা কর রহিত করবেন। বহু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, 'ঈসা আলাইহিস সালাম শেষ জামানায় অবতীর্ণ হবেন। এ সমস্ত হাদীস সহীহ বুখারী ও মুসলিম সহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

আর যে সমস্ত নবীদের সম্পর্কে বলা হয় যে, তাদের মৃত্যু হয়নি তম্মধ্যে রয়েছেঃ ইদ্রীস আলাইহিস সালাম। অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন যে তার মৃত্যু হয়নি, বরং আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন যেমনিভাবে 'ঈসা আলাইহিস সালাম কে উঠিয়ে নিয়েছেন। তারা তাদের মতের সমর্থনে দলীল হিসাবে পেশ করেন আল্লাহর বাণী:
﴿وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا * وَرَفَعْنَهُ مَكَانًا عَلِيًّا﴾ (مريم : ٥٦-٥٧)
"আর স্মরণ কর এ কিতাবে ইদরীসের কথা, সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী, এবং আমরা তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়”। [সূরা মারইয়াম: ৫৬-৫৭]

মুজাহিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইদ্রীসকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে যেমনিভাবে 'ঈসাকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। সুতরাং তার মৃত্যু হয়নি। ইবনে আব্বাস বলেন: তাকে আসমানে উঠিয়ে নেয়ার পর মৃত্যু দেয়া হয়। অন্যরা বলেন: তাকে চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান আল্লাহর কাছেই। এখানে একথা বলাই উদ্দেশ্য যে, আলেমগণ ইদ্রীসের মৃত্যু হওয়া না হওয়া সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তবে একথা অকাট্যভাবে সুনির্দিষ্ট যে, তিনি যদি মারা না ও গিয়ে থাকেন তবুও মারা যাবেনই; আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ঘোষণার কারণে, তিনি বলেন: ﴾ كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ﴿ 'প্রত্যেক আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে'।

'ঈসা ও ইদ্রীস আলাইহিমাস সালাম ব্যতীত অন্যান্য রাসূলদের সম্পর্কে উম্মাতের গ্রহণযোগ্য কোন আলেমই তাদের জীবিত থাকার কথা বলেননি। এ ব্যাপারে পূর্ব বর্ণিত দলীল-প্রমাণাদির কারণে এবং বাস্তবিকই তাদের মৃত্যু চাক্ষুষ দেখতে পাওয়ার কারণে।

তবে এ বিষয়ে এমন কিছু দলীল আছে যে গুলো বুঝতে অনেকের কাছে খটকা লেগেছে যেমন: বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত মি'রাজের হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এসেছে যে, তিনি কোন কোন রাসূলকে আসমানে দেখতে পেয়েছেন এবং তাদের সাথে কথাবার্তা বলেছেন। সেখানে এসেছে:
(ثم عرج بنا إلى السماء فاستفتح جبريل فقيل: من أنت؟ قال جبريل. قيل: ومن معك؟ قال: محمد. قيل: وقد بعث إليه.. قال: قد بعث إليه، ففتح لنا. فإذا أنا بآدم فرحب بي ودعا لي بخير، ثم عرج بنا إلى السماء الثانية فاستفتح جبريل عليه السلام فقيل: من أنت؟ قال جبريل. قيل: ومن معك؟ قال: محمد. قيل: وقد بعث إليه.. قال: قد بعث إليه، ففتح لنا. فإذا أنا بابني الخالة عيسى ابن مريم ويحيى بن زكريا صلوات الله عليهما. فرحبا بي ودعوا لي بخير)¹
"তারপর আমাকে নিয়ে আকাশে আরোহণ করা হলো, জিবরীল খুলতে বললে তাকে বলা হলো: আপনি কে? তিনি উত্তর দিলেন: জিবরীল, বলা হলো: আপনার সাথে কে? তিনি বললেন: মুহাম্মাদ, বলা হলো: তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর করলেন: অবশ্যই তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তারপর আমাদের জন্য খোলা হলো, তৎক্ষনাৎ আমি আদমের সামনে উপস্থিত হলাম, তিনি আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন এবং আমার জন্য কল্যাণের দো'আ। করলেন। তারপর আমাদের নিয়ে দ্বিতীয় আসমানের দিকে আরোহণ করা হলো, জিবরীল খুলতে বললে তাকে বলা হলো : আপনি কে? তিনি উত্তর দিলেন : জিবরীল, বলা হলো : আপনার সাথে কে? তিনি বললেন : মুহাম্মাদ, বলা হলো : তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? বললেন : অবশ্যই তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তারপর আমাদের জন্য খোলা হলো, তৎক্ষনাৎ আমি দু' খালার সন্তান 'ঈসা ইবনে মারইয়াম এবং ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া -তাদের উপর রইল আল্লাহর পক্ষ থেকে যাবতীয় সালাত তাদের সামনে নীত হলাম। তারা দু'জন আমাকে স্বাগতম জানালেন এবং আমার জন্য কল্যাণের দো'আ করলেন"'।

তারপর হাদীসে বাকী অংশে এসেছে, যাতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি ইউসুফ কে তৃতীয় আসমানে দেখতে পেয়েছেন। আশ্চার্য যে, সৌন্দর্য্যের অর্ধেকই তাকে দেয়া হয়েছে। চতুর্থ আসমানে দেখলেন ইদ্রীসকে, পঞ্চম আসমানে দেখলেন হারূনকে, মূসাকে দেখলেন ষষ্ঠ আসমানে আর সপ্তম আসমানে ইব্রাহীমকে দেখলেন বাইতুল মা'মূরের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে আছেন। তারা প্রত্যেকেই তাকে শুভেচ্ছা জানালেন এবং তার জন্য কল্যাণের দো'আ করলেন।

অনুরূপভাবে বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন :
رأيت ليلة أسري بي موسى رجلاً آدم طوالاً كأنه من رجال شنوءة، ورأيت عيسى رجلاً مربوعاً مربوع الخلق إلى الحمرة والبياض سبط الرأس ...)²
"যে রাত্রিতে 'ইসরা' হয়েছিল সে রাত্রিতে আমি মূসাকে দেখলাম লম্বা, তামাটে একজন লোক, মনে হল যেন 'শানূয়া' সম্পদায়ের লোকদের মত। আর 'ঈসাকে দেখলাম মাঝারী গড়নের মানুষ, মাঝারী সৃষ্টি লাল ও সাদার সংমিশ্রনে, মাথার চুল অকোকড়ানো ...")。

কোন কোন লোক এ হাদীসসমূহ ও এ জাতীয় অন্যান্য প্রমাণাদি থেকে এ কথা বুঝেছেন যে, নবীদের মৃত্যু হয়নি, তারা এগুলো দ্বারা নবীদের জীবন অবশিষ্ট রয়েছে বলে তাদের বিশ্বাসের নেপথ্যে দলীল হিসাবে পেশ করেন। অথচ বাস্তব সত্য হলো যে, 'ঈসা আলাইহিস সালাম এবং ইদ্রীস আলাইহিস সালাম যার ব্যাপারে মত পার্থক্য রয়েছে এ দু'জন ব্যতীত অন্যান্য নবীগণ মারা গেছেন। এ দু'জন ব্যতীত অন্যন্য সবার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে অকাট্যভাবে তাদের মৃত্যু সাব্যস্ত হয়েছে। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। পূর্বেই এ ব্যাপারে দলীল-প্রমাণাদি উল্লেখিত হয়েছে।

তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাসূলদেরকে মি'রাজের রাত্রিতে দেখার যে খবর দিয়েছেন এবং এ জাতীয় অন্যান্য যে সমস্ত দলীল-প্রমাণাদি এসেছে সেগুলোও সত্য। এগুলোর মধ্যে কোন বিরোধ বা দ্বন্দ নেই; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা দেখেছেন তা ছিল রাসূলদের আত্মা যা তাদের শরীরের আকৃতিতে রূপান্তরিত করে দেখানো হয়েছিল। মুলত: যাদের উঠিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সরাসরি কুরআন বা সহীহ হাদীস থেকে দলীল-প্রমাণাদি এসেছে তারা ব্যতীত অন্যন্যদের শরীর যমীনেই রয়েছে। সুন্নাতের অনুসারী গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইমামগণ এ মতই পোষণ করেন।

একজন সুবিজ্ঞ জ্ঞানী ইমাম এ মাআলার বিশ্লেষণ করে বলেন: 'তিনি যে অন্যান্য নবীদের মি'রাজের রাত্রিতে আসমানে দেখতে পেলেন, যখন তিনি আদমকে দুনিয়ার আসমানে, ইয়াহইয়া ও 'ঈসাকে দ্বিতীয় আসমানে, ইউসুফকে তৃতীয় আসমানে, ইদ্রীসকে চতুর্থ আসমানে, হারুনকে পঞ্চম আসমানে, মূসাকে ষষ্ঠ আসমানে এবং ইব্রাহীমকে সপ্তম আসমানে অথবা তার বিপরীতে দেখতে পেলেন, এ দেখা মূলত: তিনি তাদের আত্মাকে তাদের শরীরের রূপে রূপান্তরিত অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন। কোন কোন লোক বলে থাকে যে, তিনি তাদের কবরে দাফনকৃত শরীরই দেখেছেন, এটা কোন মতই নয়। তবে 'ঈসা তার রূহ ও শরীর সহ আসমানে আরোহণ করেছেন অনুরূপভাবে ইদ্রীসের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু ইব্রাহীম, মূসা এবং অন্যান্যগণ তারা অবশ্যই যমীনে দাফনকৃত অবস্থায় আছে'।

অবশ্য এ কথার স্বীকৃতি দেয়া উচিত যে, যেভাবে আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলদের রূহ আসমানে উঠিয়ে তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তাদের রূহ সেখানে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী সুখ ভোগ করছে অনুরূপভাবে তিনি তাদের শরীরকেও জমীনের বুকে সংরক্ষণ করেছেন। এবং তাদের শরীরকে খাওয়া মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় আউস ইবনে আউস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَيَّ). فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ. وَكَيْفَ تُعْرَضُ صَلَاتُنَا عَلَيْكَ وَقَدْ أَرَمْتَ؟ قَالَ: يَقُولُ: بَلِيتَ. قَالَ: (إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ)¹
“তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুম'আর দিন, সুতরাং তোমরা তাতে আমার উপর বেশী বেশী দরূদ পড়; কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়”। সাহাবাগণ বললেন : হে আল্লাহর রাসূল! যখন আপনার শরীর পঁচে যাবে তখন কিভাবে আমাদের সালাত (দরূদ) আপনার কাছে পেশ করা হবে? বর্ণনাকারী বলেন : হাদীসে বর্ণিত (أَرَمْتَ) শব্দের অর্থ : (بلیت) বা পঁচে যাবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ “অবশ্যই মহান আল্লাহ নবীদের শরীরকে যমীনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন”'।

উক্ত আলোচনার মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক মত কি এবং একজন মুসলিমের জন্য এ ব্যাপারে কি বিশ্বাস করা ওয়াজিব তা স্পষ্ট হয়ে গেল।

মহান আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৫৭০), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৬২)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং (৩২৩৯), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৬৫)。
¹হাদীসটি বর্ণনা করেন যথাক্রমেঃ ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ (৪/৮), আবুদাউদ তার সুনান (১/৪৪৩), দারমী তার সুনান গ্রন্থে (১/৩০৭, হাদীস নং ১৫৮০)। ইমাম নববী বলেনঃ তার সনদ বিশুদ্ধ。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 নবীদের মু'জিযা এবং তার ও অলীদের কারামতের মধ্যে পার্থক্য

📄 নবীদের মু'জিযা এবং তার ও অলীদের কারামতের মধ্যে পার্থক্য


মু'জিয়ার সংজ্ঞা:

মু'জিযা শব্দটি আরবী العجز থেকে গৃহীত, যার অর্থ: অক্ষমতা।

আরবী অভিধান ক্বামূস গ্রন্থে এসেছে: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযা হলো যা দিয়ে তিনি বিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করে অপারগ করে দিয়েছেন। এখানে المعجزة শব্দের শেষে যে اءএ এসেছে তা আধিক্য বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

শরীয়তের পরিভাষায় মু'জিযা বলতে বুঝায়: নবীদের হাতে তাদের সত্যতা প্রমাণে কোন অস্বাভাবিক বিষয় প্রকাশ পাওয়া, যার মোকাবিলায় কিছু করা সম্ভব হয়না।

এখানে আমরা 'কোন অস্বাভাবিক বিষয়' বলে ঐ সমস্ত বিষয় বের করে দিয়েছি যে গুলো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। যেমন নবীদের যে সমস্ত কাজ ও অবস্থা স্বাভাবিক ভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে।

আর আমরা 'নবীদের হাতে' বলে ঐ সমস্ত অস্বাভাবিক বিষয় বের করে দিয়েছি যেগুলো অলীদের হাতে সংঘটিত হয়ে থাকে; কেননা সেগুলো মু'জিযা নয় বরং কারামত। যা নবীদের অনুসরণ-অনুকরণ করার কারণে তাদের অর্জিত হয়। যাদুকর ও গণকরা যে সমস্ত ভেলকি নিয়ে আসে তা পূর্বাহ্নেই এর আওতা বহির্ভূত হবে; কারণ এ গুলো সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টজীব থেকে সংঘটিত হয়ে থাকে।

আর 'তাদের সত্যতা প্রমাণে যার মোকাবেলায় কিছু করা সম্ভব হয়না' এ কথা দ্বারা আমরা ঐ সমস্ত অস্বাভাবিক বস্তু বের করে দিয়েছি যা নবুওয়াতের দাবীদার মিথ্যাবাদীগণ দাবী করে থাকে। অনুরূপভাবে যাদুকরগণ দেখিয়ে থাকে; কেননা সেগুলো তাদের মত অন্যান্য যাদুকরগণ নিয়ে আসতে পারে। কারণ সেগুলো মূলত: যাদু ও ভেলকি জাতীয়।

নবীদের মু'জিযার কিছু উদাহরণ:

নবীদের মু'জিযা অনেক ঃ
সালেহ আলাইহিস সালাম এর অন্যতম মু'জিযা হলো: তার জাতি তার কাছে সুনির্দিষ্ট এক পাথর থেকে উষ্ট্রী বের করে দিতে বলল। তারপর উটের কি কি গুণ থাকতে হবে তাও নির্ধারণ করে দিল। তিনি এজন্য আল্লাহকে ডাকলেন। আল্লাহ ঐ পাথরকে নির্দেশ দিলেন যেন তা ফেটে তার থেকে যে রকম তারা চেয়েছে সে রকম প্রকান্ড উষ্ট্রী বের করে দেয়¹। আল্লাহ তা'আলা এ প্রসংগে বলেনঃ
﴿وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَلِحًا قَالَ يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلهِ غَيْرُهُ قَدْ جَاءَتْكُمْ بَيِّنَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ هَذِهِ نَاقَةُ اللهِ لَكُمْ آيَةً فَذَرُوهَا تَأْكُلْ فِي أَرْضِ اللهِ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴾ (الأعراف: ۷۳)
"সামূদ জাতির নিকট তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর 'ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর এ উষ্ট্রী তোমাদের জন্য এক নিদর্শন। সুতরাং তোমরা তাকে আল্লাহর যমীনে চরে খেতে দাও এবং তাকে কোন কষ্ট দিওনা, দিলে মর্মন্তুদ শাস্তি তোমাদের উপর এসে পড়বে”। [সূরা আল-আ'রাফ: ৭৩]

ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: তার জাতি তাকে শাস্তি ও ধ্বংস করার জন্য যে আগুন প্রজ্জলিত করেছিল তারপর তাকে সেখানে নিক্ষেপ করেছিল আল্লাহ তা'আলা সে আগুনকে তার জন্য ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانْصُرُوا الهَتَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ فَعِلِينَ * قُلْنَا يُنَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى ابراهيم * وَأَرَادُوا بِهِ كَيْدًا فَجَعَلْتُهُمُ الْأَخْسَرِينَ ﴾ (الأنبياء: ٦٨-٧٠)
"তারা বলল: 'তাকে পুড়িয়ে ফেল, সাহায্য কর তোমাদের দেবতাদের, তোমরা যদি কিছু করতে চাও'। আমরা বললাম: 'হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও'। তারা তার ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু আমরা তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম"। [সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৮-৭০]

মূসা আলাইহিস সালাম এর মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: তার লাঠি যা যমীনে রাখার সাথে সাথে মহা সাপে পরিণত হয়ে যেত। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَمَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَمُوسى * قَالَ هِيَ عَصَاىَ أَتَوَكَّوْا عَلَيْهَا وَأَهْشَ بِهَا عَلَى غَيْنِي وَلِي فِيهَا مَارِبُ أخرى * قَالَ الْقِهَا يَمُوسى * فَالْقَهَا فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَى * قَالَ خُذْهَا وَلَا تَخَفْ سَنُعِيدُهَا سيرتها الأولى (طه: ۱۷-۲۱)
""হে মূসা! আপনার ডান হাতে সেটা কি'? বললেন: এটা আমার লাঠি; আমি এতে ভর দেই এবং এর দ্বারা আঘাত করে আমার মেষ পালের জন্য গাছের পাতা ফেলে থাকি আর এটা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে'। তিনি বললেন : 'হে মূসা! আপনি তা নিক্ষেপ করুন'। তারপর তিনি তা নিক্ষেপ করলে সংগে সংগে তা সাপ হয়ে ছুটতে লাগল। তিনি বললেন : 'আপনি তাকে ধরুন, ভয় করবেন না, আমরা তাকে তার পূর্ব রূপ ফিরিয়ে দেব'"। [সূরা ত্বা-হাঃ ১৭-২১]

মূসা আলাইহিস সালাম এর মু'জিযার মধ্যে আরো ছিল: তিনি তার জামার বগলে হাত ঢুকিয়ে বের করার পর তা' কোন প্রকার রোগ ব্যাধি ছাড়াই সাদা ধবধবে চাঁদের মত চিকচিক করত। মহান আল্লাহ বলেন:
وَادْمُهُ يَدَكَ إِلَى جَنَاحِكَ تَخْرُجُ بَيْضَاء مِنْ غَيْرِ سُوءٍ آيَةً أُخْرَى (طه: ۲۲)
"এবং আপনার হাত আপনার বগলের সাথে মিলিত করুন, তা আরেক নিদর্শন স্বরূপ নির্মল উজ্জল হয়ে বের হবে”। [সূরা ত্বা-হাঃ ২২]

'ঈসা আলাইহিস সালাম এর মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: তিনি মাটি দিয়ে পাখির মত আকৃতি বানাতেন তারপর সেগুলোতে ফুঁ দিতেন, তাতেই সেগুলো আল্লাহর হুকুমে পাখী হয়ে উড়ে যেত। তিনি দৃষ্টি শক্তিহীন অর্থাৎ অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীর উপর হাত বুলিয়ে দিতেন, তাতেই তারা আল্লাহর নির্দেশে সুস্থ হয়ে যেত। তিনি মৃতদেরকে তাদের কবর থেকে ডাকতেন, তাতেই তারা আল্লাহর অনুমতি ক্রমে তার ডাকে সাড়া দিত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطَّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ بِإِذْنِ فَتَنْفُحُ فِيهَا فَتَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِي وَ تُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ بِإِذْنِي وَإِذْ تَخْرِجُ الْمَوْلَى بِإِذْنِي (المائدة : ١١٠)
"আরো স্মরণ করুন যখন আপনি কাদামাটি দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখির মত আকৃতি গঠন করতেন এবং তাতে ফুঁ দিতেন, ফলে আমার অনুমতিক্রমে তা পাখি হয়ে যেত, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আপনি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করতেন এবং আমার অনুমতিক্রমে আপনি মৃতকে জীবিত করতেন”। [সূরা আল- মায়িদাহ: ১১০]

আর আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হলো: মহা কুরআন। যা সমস্ত রাসূলদের মু'জিযার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَدِقِينَ ﴾ (البقرة : ٢٣)
"আমরা আমাদের বান্দার উপর যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা এর অনুরূপ কোন সূরা অনয়ন কর এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সকল সাক্ষী-সাহায্যকারীকে আহবান কর”। [সূরা আল-বাকারাহ: ২৩]

আরো বলেনঃ
﴿قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لبعض ظهيرا ﴾ (الإسراء: ۸۸)
"বলুন : 'যদি কুরআনের অনুরূপ নিয়ে আসার জন্য মানুষ ও জ্বিন একত্রিত হয় এবং যদি তারা পরস্পরকে সাহায্যও করে তবুও তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না”। [সূরা আল-ইসরা : ৮৮]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযার মধ্যে অন্যতম আরেকটি মু'জিযা হলো চাঁদ ফেটে যাওয়া, মক্কাবাসীগণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একটি নিদর্শন দেখাতে বলল। তখন চাঁদ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, মক্কাবাসী ও অন্যান্যরা তা দেখতে পেল। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ * وَإِن يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَ يَقُولُوا سِحْرُ مُّسْتَمِرٌّ (القمر : ١-٢)
"কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে, আর চাঁদ ফেটে গেছে। তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে: এ তো চিরাচরিত যাদু [সূরা আল-কামার: ১-২]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযার মধ্যে অন্যতম আরেকটি মু'জিযা হলো : 'ইসরা ও মি'রাজ'। মহান আল্লাহ বলেন :
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصاهُ (الإسراء: 1)
"কতইনা পবিত্র ঐ সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত”। [সূরা আল-ইসরা : ১]

রাসূলদের মু'জিযা অনেক, বিশেষ করে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযা; কেননা আল্লাহ তাকে এমন অনেক নির্দশনাবলী ও অনেক দলীল-প্রমাণাদি দিয়ে সাহায্য করেছেন পূর্ববর্তী কোন নবীর কাছে যার সমারোহ ঘটেনি। আমি এখানে যা বর্ণনা করেছি তা কেবলমাত্র উদাহরণ পেশের নিমিত্তে।

কারামাতের সংজ্ঞা:

কারামাত হলো : নবুওয়াতের দাবী বা দাবীর প্রারম্ভিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে কোন ব্যাহ্যিক সৎপরায়ণ সঠিক আক্বীদা সম্পন্ন নেক আমলকারী ব্যক্তির কাছ থেকে অস্বাভাবিক কর্মকান্ড প্রকাশ পাওয়া।

এখানে আমরা 'অস্বাভাবিক কর্মকান্ড' বলে ঐ সমস্ত বিষয় এর থেকে বের করে দিয়েছি যে সমস্ত কর্মকান্ড স্বভাবিক ভাবে ঘটে থাকে।

আর 'নবুওয়াতের দাবীর সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে' এ কথার মাধ্যমে নবীদের মু'জিযাসমূহ এর গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে।

অনুরূপভাবে 'নবুওয়াতের দাবীর প্রারম্ভিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে' এ কথা দ্বারা 'ইরহাস' তথা নবুওয়াতের পূর্বে যে সমস্ত অস্বাভাবিক কর্মকান্ড প্রকাশ পায় সে সমস্ত বস্তুও এ সংজ্ঞা থেকে বের হয়ে যাবে।

তদ্রূপ 'কোন ব্যাহ্যিক সৎপরায়ণ সঠিক আক্বীদা সম্পন্ন নেক আমলকারী' এ কথা দ্বারা যে সমস্ত কর্মকান্ড যাদুকর এবং গণকদের দ্বারা সংঘটিত হয় সেগুলো এ সংজ্ঞার আওতা বহির্ভূত হয়ে যাবে; কেননা তা যাদু ও ভেলকি হিসাবে গণ্য হবে।

অলীদের কারামাত অনেক। তম্মধ্যে এমন কিছু কারামাত আছে যেগুলো পূর্ববর্তী জাতি সমূহের নেককার লোকদের হাতে ঘটেছিল।

তম্মধ্যে আল্লাহ মারইয়াম আলাইহাস সালাম সম্পর্কে জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يَمَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا قَالَتْ هُوَ مِنْ عِندِ اللهِ (آل عمران: ۳۷)
“যখনই যাকারিয়া তার কক্ষে প্রবেশ করত তখনই তার নিকট খাদ্য-সামগ্রী দেখতে পেত। তিনি বলতেনঃ 'হে মারইয়াম! এ সব তুমি কোথায় পেলে'? মারইয়াম বলতেন: 'তা আল্লাহর নিকট হতে'। [সূরা আলে ইমরান: ৩৭]

অনুরূপভাবে আসহাবে কাহাফ তথা গর্তের অধিবাসীদের ঘটনা আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে বর্ণনা করেছেন।

এ উম্মাতের অলীদের যে সমস্ত কারামাত সংঘটিত হয়েছিল তম্মধ্যে রয়েছে: প্রখ্যাত সাহাবী উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা। তিনি সূরা কাহাফ পড়ছিলেন, তখন আকাশ থেকে ছায়ার মত অবতীর্ণ হচ্ছিল যাতে ছিল চেরাগের আলোর সমাহার। মূলত: তারা ছিল ফিরিস্তা, তারা তার পড়া শুনতে অবতীর্ণ হয়েছিল।

অনুরূপভাবে ফিরিশতাগণ ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সালাম জানাতেন।

সালমান ও আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কোন এক প্লেটে খাবার খাচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় তাদের প্লেট তাসবীহ পাঠ করেছিল অথবা তাদের প্লেটে যা ছিল সেগুলো তাসবীহ পাঠ করেছিল।

খুবাইব ইবনে আদী রাদিয়াল্লাহু আনহু পবিত্র মক্কার মুশরিকদের নিকট বন্দী ছিলেন, তার কাছে আঙুর আসত আর তা তিনি খেতেন অথচ মক্কায় তখন কোন আঙুরই ছিলনা।

আল'আলা আল-হাদরামী রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাবাহিনী নিয়ে সাগরের উপর তাদের ঘোড়া সহ পার হয়ে গেলেন অথচ তাদের ঘোড়ার লাগামও ভিজলনা।

আসওয়াদ আল-আনাসী যখন নবুওয়াতের দাবী করেছিল তখন আবু মুসলিম আল-খাওলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার হাতে বন্দী হয়েছিলেন। সে তাকে বলল: তুমি কি আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে সাক্ষ্য দিবে? তিনি বললেন : আমি শুনিনা। সে বলল: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ হাঁ। তখন সে আগুন জালানোর নির্দেশ দিল, তারপর তাকে সে আগুনে নিক্ষেপ করল, কিন্তু তারা তাকে দেখতে পেল যে, সে আগুনের মাঝে নামায পড়ছে। সে আগুন তার জন্য শীতল ও আরামদায়ক বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এ ছাড়াও জীবনী গ্রন্থ ও ইতিহাস গ্রন্থে এ ধরণের আরো অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

মু'জিযা ও কারামাতের মধ্যে পার্থক্য:

মু'জিযা ও কারামাতের মধ্যে পার্থক্য হলো: মু'জিয়ার সাথে নবুওয়াতের দাবী সংশ্লিষ্ট থাকবে। অপর পক্ষে কারামাতের অধিকারী ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবী করবেনা, বরং তার কারামত অর্জনের কারণই হচ্ছে নবীর অনুসরণ ও তার শরীয়তের উপর অটল থাকা। সুতরাং মু'জিযা হলো নবীর, আর কারামাত হলো অলীর। তবে দু'টোর মধ্যেই অস্বাভাবিক কর্মকান্ড আছে।

আলেমদের কোন কোন ইমাম মত প্রকাশ করেছেন যে, মূলত অলীদের কারামাত নবীর মু'জিযার অন্তর্ভুক্ত; কেননা অলী কেবলমাত্র রাসূলের অনুসরণের কারণেই কারামাত লাভ করেছে, সুতরাং প্রত্যেক অলীর কারামাত ঐ নবীর মু'জিযা হিসাবে ধরা হবে যার শরীয়তের উপর সে আল্লাহর ইবাদাত করে।

এ থেকে একথা স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে, নবীদের অস্বাভাবিক কর্মকান্ডকে মু'জিযা বলা আর অলীদের অস্বাভাবিক কর্মকান্ডকে কারামাত বলা, এ দুটি মূলত পারিভাষিক অর্থ, কুরআন ও সুন্নায় তার অস্তিত্ব নেই। বরং আলেমগণ পরবর্তীকালে এ দু'টি পরিভাষা নির্ধারণ করে নিয়েছেন। যদিও এগুলোর মূলদাবী কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত দলীলসমূহের দিকেই ফিরে যায় যা বাস্তব সত্য হিসাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত।

মু'জিযা ও কারামাতের উপর ঈমান আনার হুকুম : নবীদের মু'জিযা এবং অলীদের কারামাতের উপর ঈমান আনা ঈমানের মূলনীতিগুলোর মধ্য হতে একটি মূলনীতি। যা কুরআন হাদীসের দলীল দ্বারা প্রমাণিত, আর বাস্তবেও তা দেখা যায়। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উপর এগুলোর বিশুদ্ধতা এবং এগুলো যে বাস্তব তা বিশ্বাস করা ওয়াজিব। অন্যথায় এগুলোর কোন কিছু মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হলে অথবা এগুলোর কোন কিছু অস্বীকার করলে কুরআন ও হাদীসের দলীলসমূহকে পরিত্যাগ করা হয়, বাস্তবের সাথে সংঘর্ষ তৈরী হয় এবং এ ক্ষেত্রে দ্বীনের ইমাম ও মুসলমানদের আলেমগণ যে আদর্শের উপর ছিলেন সে আদর্শ থেকে বড় ধরণের বিচ্যুতি ঘটে। আল্লাহ তা'আলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
¹ তাক্সীরে ইবনে কাসীর (৩/৪৩৬)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 ইসলামে অলী ও বেলায়াত

📄 ইসলামে অলী ও বেলায়াত


অলী ও বেলায়াতের সংজ্ঞা:
বেলায়াত : শব্দটি আরবী الولاية শব্দ থেকে গৃহীত। যা العداوة শব্দের বিপরীত শব্দ। الولاية বা বেলায়াতের মূল হলো: ভালবাসা ও নৈকট্য। আর العداوة এর মূল হলো: ঘৃণা ও দূরত্ব।

শরীয়তের পরিভাষায় বেলায়াত বলতে বুঝায়: আল্লাহর কাছে তার আনুগত্যের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ।

আর শরীয়তের পরিভাষায় অলী বলতে বুঝায়: যার মধ্যে দু'টি গুণ আছে: ঈমান এবং তাকওয়া। মহান আল্লাহ বলেন:
الا ان أو لِيَاءَ اللهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ * الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (يونس: ৬২-৬৩)
"জেনে রাখ! আল্লাহর অলী তথা বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেনা, যারা ঈমান আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে”। [সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩]

অলীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের তারতম্য: যদি আল্লাহর অলী বলতে ঈমানদার ও মুত্তাকীদের বুঝায় তাহলে বান্দার ঈমান ও তাকওয়া অনুসারে আল্লাহর কাছে তার বেলায়াত তথা বন্ধুত্ব নির্ধারিত হবে। সুতরাং যার ঈমান ও তাকওয়া সবচেয়ে বেশী পূর্ণ, তার বেলায়াত তথা আল্লাহর বন্ধুত্ব সবচেয়ে বেশী হবে। ফলে মানুষের মধ্যে তাদের ঈমান ও তাকওয়ার ভিত্তিতে আল্লাহর বেলায়াতের মধ্যেও তারতম্য হবে।

আল্লাহর নবীরা তার সর্বশ্রেষ্ঠ অলী হিসাবে স্বীকৃত। নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন তার রাসূলগণ। রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন: দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ তথা নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, 'ঈসা এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আর সমস্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- যার আলোচনা পূর্বে চলে গেছে- তারপর ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তারপর বাকী তিনজনের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নির্ধারণে আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে।

আল্লাহর অলীদের প্রকারভেদ:
আল্লাহর অলীগণ দু'শ্রেণীতে বিভক্ত:

প্রথম শ্রেণী: যারা অগ্রবর্তী ও নৈকট্যপ্রাপ্ত।

দ্বিতীয় শ্রেণী: যারা ডান ও মধ্যম পন্থী।

আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাদের উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
إِذَا وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ * لَيْسَ لِوَقْعَتِهَا كَاذِبَةٌ * خَافِضَةٌ رَافِعَةٌ * إِذَا رَجَتِ الْأَرْضُ رَجَا* وَبُسَتِ الْجِبَالُ بَنَا * فَكَانَتْ هَبَاء مُنْبَنَا وَكُنتُمْ أَزْوَاجًا تَلَتَهُ * فَأَصْحَبُ الْيَمَنَةِ مَا أَصْحَبُ الْيَمَنَةِ * وَأَصْحَبُ الْمَشْمَةِ مَا أَصْحَبُ المَشْمَةِ * وَالسَّبِقُونَ السَّبقُونَ * أُولَئِكَ الْمُقَرَّبُونَ * فِي جَنْتِ النَّعِيمِ (الواقعة: ١-١٢)
“যখন যা ঘটা অবশ্যম্ভাবী (কিয়ামত) তা ঘটবে, তখন তার সংঘটনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কেউ থাকবে না। তা কাউকে নীচ করবে, কাউকে সমুন্নত করবে। যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে যমীন। পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে। ফলে তা উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পর্যবসিত হবে। এবং তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণীতে- ডান দিকের দল; ডান দিকের দলের কি মর্যাদা। আর বাম দিকের দল; বাম দিকের দলের কি অসম্মান! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী। তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত- নেয়ামত পূর্ণ জান্নাতে। [সূরা আল-ওয়াকি'আহঃ ১-১২]

এখানে তিন শ্রেণীর লোকের উল্লেখ করা হয়েছে: যাদের একদল জাহান্নামের, তাদেরকে বামদিকের দল বলা হয়েছে। আর বাকী দু'দল জান্নাতের, তারা হলেন: ডানদিকের দল এবং অগ্রবর্তী ও নৈকট্যপ্রাপ্তগণ। তাদেরকে আবার এ সূরা আল-ওয়াকি'আরই শেষে আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করে বলেছেন:
فَأَمَّا إِن كَانَ مِنَ الْمُقَرَّبِينَ * فَرَوْحُ وَ رَيْحَانَ وَجَنَّتُ نَعِيمٍ وَأَنَّا أَنْ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ * فَسَلَامٌ لَكَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ (الواقعة: ۸۸ - ۹۱)
“তারপর যদি সে নৈকট্যপ্রাপ্তদের একজন হয় তবে তার জন্য রয়েছে আরাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও নেয়ামত পূর্ণ জান্নাত। আর যদি সে ডান দিকের একজন হয় তবে তোমার জন্য সালাম ও শান্তি; কারণ সে ডান পন্থীদের মধ্যে”। [সূরা আল- ওয়াকি'আহঃ ৮৮-৯১]

অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অলীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিখ্যাত হাদীসে এ দু'দলের বর্ণনা দিয়েছেন। হাদীসটি হাদীসে কুদসী যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় প্রভু আল্লাহর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করছেন: তিনি বলেন:
(إن الله تعالى قال: من عادى لي ولياً فقد آذنته بالحرب، وما تقرب إلى عبدي بشيء أحب إلي مما افترضت عليه، وما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها ورجله التي يمشي بها، وإن سألني لأعطينه ولئن استعاذني لأعيذنه)¹
"মহান আল্লাহ বলেন: যে ব্যক্তি আমার কোন অলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আমার বান্দার উপর যা আমি ফরয করেছি তা ছাড়া আমার কাছে অন্য কোন প্রিয় বস্তু নেই যার মাধ্যমে সে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে। আমার বান্দা আমার কাছে নফল কাজসমূহ দ্বারা নৈকট্য অর্জন করতেই থাকে, শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ভালবাসি। তারপর যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যাই যার দ্বারা সে শুনে, তার দৃষ্টি শক্তি হয়ে যাই যার দ্বারা সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যার দ্বারা সে ধারণ করে আর তার পা হয়ে যাই যার দ্বারা সে চলে। তখন আমার কাছে কিছু চাইলে আমি তাকে তা অবশ্যই দেব, আমার কাছে আশ্রয় চাইলে আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দেব”।

সুতরাং নেককার লোকেরা হলো: ডান দিকের দল, যারা আল্লাহর কাছে ফরজ আদায়ের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করে। তারা আল্লাহ তাদের উপর যা ওয়াজিব করেছেন তা আদায় করে, আর যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করে। তারা নফল কাজে নিজেদের কষ্ট দেয় না, বাড়তি হালাল কর্মকান্ড থেকেও দুরে থাকে না। কিন্তু যারা অগ্রবর্তী নৈকট্যপ্রাপ্ত দল তারা আল্লাহর কাছে ফরজ আদায়ের পর নফলের মাধ্যমে নৈকট্য লাভে রত হয়। ফলে তারা ওয়াজিব, মুস্তাহাব আদায় করে, হারাম ও মাকরূহ বস্তু ত্যাগ করে। তারপর যখন তারা তাদের ক্ষমতা অনুসারে তাদের প্রিয় বস্তুর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হয়, তাদের প্রভুও তখন তাদেরকে পরিপূর্ণভাবে ভালবাসেন এবং তাদেরকে গুনাহের কাজ থেকে হেফাজত করেন, তাদের দো'আ কবুল করেন। যেমনটি আল্লাহ এ হাদীসে বলেছেন যে, “আমার বান্দা আমার কাছে নফল কাজসমূহ দ্বারা নৈকট্য অর্জন করতেই থাকে, শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ভালবাসি...”।

আল্লাহর অলীগণ কোন পোষাক বা বিশেষ কোন আকৃতির সাথে সুনির্দিষ্ট নন:

সুন্নাতের অনুসারী আলেম ও বিশেষজ্ঞদের নিকট একথা স্বীকৃত যে, আল্লাহর অলীগণ অন্যান্য মানুষদের থেকে প্রকাশ্যে কোন পোষাক বা কোন বেশ-ভূষা দ্বারা বিশেষভাবে পরিচিত হন না।

অলীদের সম্পর্কে গ্রন্থ রচনাকারী কোন এক ইমাম বলেছেন: 'আল্লাহর অলীগণ সাধারণ মানুষ থেকে প্রকাশ্যে কোন বৈধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন না। সুতরাং তারা হালাল কোন পোষাক ছেড়ে অন্য কোন পোষাকের মাধ্যমে পরিচিত হন না। তেমনিভাবে তারা চুল কামানো বা খাটো করা বা গোছা করা ইত্যাদি হালাল কোন কাজের মাধ্যমেও পরিচিত হন না। যেমন বলা হয়ে থাকে: সাধারণ পোষাকে অনেক বন্ধু আছে, আলখেল্লা গায়ে অনেক যিন্দীক তথা গোপন কাফের রয়েছে। বরং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মাতের মধ্যে প্রকাশ্য বেদ'আতকারী ও অন্যায়কারী ছাড়া সর্বস্তরে আল্লাহর অলীগণের অস্তিত্ব বিদ্যমান। সুতরাং তাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায় কুরআনের ধারক-বাহকদের মাঝে, জ্ঞানী-আলেমদের মাঝে, যেমনিভাবে তাদের অস্তিত্ব রয়েছে জিহাদকারী ও তরবারী-ধারকদের মাঝে, অনুরূপভাবে তাদেরকে পাওয়া যাবে ব্যবসায়ী, কারিগর ও কৃষকের মাঝে।

অলীদের ব্যাপারে যে সমস্ত অতিরঞ্জিত বিশ্বাস বিদ্যমান তার খন্ডন: আল্লাহর অলীগণ নিষ্পাপ নন, তারা গায়েবও জানেন না, সৃষ্টি বা রিযিক প্রদানে তাদের কোন প্রভাবও নেই। তারা নিজেদেরকে সম্মান করতে অথবা কোন ধন-সম্পদ তাদের উদ্দেশ্যে ব্যয় করতে মানুষদেরকে আহবান করেন না।

যদি কেউ এমন কিছু করে তাহলে সে আল্লাহর ওলী হতে পারে না, বরং মিথ্যাবাদী, অপবাদ আরোপকারী, শয়তানের ওলী হিসাবে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে ভাল জানেন।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী, (হাদীস নং ৬৫০২)。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00