📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 রিসালাতের ধারার পরিসমাপ্তি ও তার পরে যে আর কোন নবী নেই তার বর্ণনা

📄 রিসালাতের ধারার পরিসমাপ্তি ও তার পরে যে আর কোন নবী নেই তার বর্ণনা


উপরোক্ত বিষয়ের আলোচনা দলীল-প্রমাণ সহকারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় এবং তিনি যে সর্বশেষ নবী সে আলোচনার প্রাক্কালেই ইতিপূর্বে করা হয়েছে। মূলতঃ এখানে রিসালতের ধারা পরিসমাপ্তির আলোচনা করার উদ্দেশ্য হলো এর অন্য আরেকটি দিক তুলে ধরা; আর তা হলো মুসলমানদের দ্বীনের উপর রিসালত ও নবুওয়াতের ধারা সমাপ্তি এ আক্বীদা- বিশ্বাসের প্রভাব এবং তাদের উপর এ আক্বীদাকে স্বীকৃতি দানের ফলাফল কি তা বর্ণনা করা।

এর ফলাফলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ

১. এর মাধ্যমে উম্মাতের কাছে শরীয়তের স্থায়ীত্ব এবং দ্বীনের পূর্ণতা প্রকাশ পেয়েছে। আর উম্মাতের জীবনে এর বিরাট প্রভাব সুস্পষ্ট। তাই সে বিষয়টি উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতের উপর তাঁর দয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি বলেনঃ
﴿ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴾ (المائدة : ٣)
"আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাংগ করলাম ও তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৩]

এ আয়াতটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে বিদায় হজ্জে অবতীর্ণ হয়েছিল যখন আল্লাহ তার জন্য শরীয়তকে পূর্ণাংগ করে দিয়েছিলেন। আর তাই ইয়াহুদীগণ এ আয়াতের কারণে মুসলমানদের ঈর্ষা করত। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে এক ইয়াহুদী উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে বললঃ 'তোমাদের কিতাবে একটি আয়াত তোমরা পাঠ করে থাক, যদি তা আমাদের ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের উপর অবতীর্ণ হতো তবে আমরা সে দিনটিকে ঈদের দিনে পরিণত করতাম'। তিনি বললেনঃ সেটা কোন আয়াত? সে বললঃ
﴾ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ﴿
অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম¹。

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং রিসালাতের পরিসমাপ্তির বাস্তবতাকে একটি ব্যাহ্যিক রূপদানের মাধ্যমে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি তার পূর্ববর্তী রিসালাতসমূহকে এমন এক প্রাসাদের সাথে তুলনা করলেন যার দেয়াল পরিপূর্ণ ও সুন্দর করে তৈরী করা হলো অথচ সেখানে একটি ইট লাগানো হলো না। সুতরাং তাকে নবী হিসাবে প্রেরণ করা হলো সে স্থানে সে ইটটি বসিয়ে দেয়া, যার মাধ্যমে প্রাসাদ নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে গেল।

এর মাধ্যমে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, বিশেষভাবে এ দ্বীনের মধ্যে আর সার্বিকভাবে রিসালতের মধ্যে কোন প্রকার বর্ধিতকরণের সুযোগ নেই, যেমনিভাবে ঐ প্রাসাদ নির্মাণে পূর্ণতা লাভের পর সেখানে আর কিছু বর্ধিত করার সুযোগ নেই। পূর্ব পরিচ্ছেদে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় পূর্ণভাবে হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে, সুতরাং সেখানে দেখে নেয়ার অনুরোধ রইল¹。

২. উম্মাতের মধ্যে এ বিশ্বাসযোগ্যতার সৃষ্টি হবে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নিয়ে আসা এ দ্বীন ও শরীয়ত অন্য কোন নবী পাঠানোর মাধ্যমে রহিত হবার নয়।

'আর খাতমে নবুওয়াত তথা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের মাধ্যমে নবুওয়াতের ধারা শেষ হওয়ার অর্থ হলোঃ তার নবুওয়াত ও শরীয়তের পর আর কোন নবুওয়াতের শুরু হবে না, কোন শরীয়তের প্রবর্তন হবে না। 'ঈসা আলাইহিস সালামের অবতীর্ণ হওয়া এবং তিনি পূর্ব নবীর গুণে গুণান্বিত থাকা এর বিরোধী নয়; কেননা 'ঈসা আলাইহিস সালাম যখন অবতীর্ণ হবেন তখন তিনি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীয়তেরই অনুসারী হবেন। তার পূর্ববর্তী শরীয়তের নয়; কেননা তা রহিত হয়ে গেছে। সুতরাং তিনি শরীয়তের মৌলিক ও সাধারণ বিধি-বিধান সবকিছুতেই এ শরীয়ত অনুসারে ইবাদাত করবেন'।

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে যত নবুওয়াতের দাবীদার হবে তাদেরকে কোন প্রকার চিন্তা ও গবেষণা ব্যতীতই মিথ্যাবাদী বলে অকাট্যভাবে সাব্যস্ত করতে পারবে।

খাতমে নবুওয়াত তথা নবীদের ধারার পরিসমাপ্তি জনিত আক্বীদার উপর ঈমানের এটাই প্রত্যক্ষ ফলাফল যে, এর মাধ্যমে মিথ্যাবাদী দাজ্জালদের মধ্য হতে যারা নবুওয়াতের দাবী করবে তাদের অনুসরণ থেকে উম্মাতের জন্য নিরাপত্তা অর্জিত হবে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাতমে নবুওয়াতের আক্বীদা-বিশ্বাস বর্ণনার অন্যতম বড় উদ্দেশ্যও ছিল এ মহান বিষয়টির প্রতি সতর্কীকরণ। তাই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ উম্মাতের মধ্য থেকে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদী বের হবে যাদের প্রত্যেকে নবুওয়াতের দাবী করবে। তারপর তিনি উম্মাতকে এ সমস্ত মিথ্যাবাদী নবুওয়াতের দাবীদারদের অনুসরণ ও সত্যায়ন করা থেকে সাবধান করার জন্য তার পরে আর কোন নবী আসবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যেমনটি ফিতনার বর্ণনায় সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহুর মারফু' হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, যাতে এসেছেঃ
(... وإنه سيكون في أمتي ثلاثون كذابون كلهم يزعم أنه نبي وأنا خاتم النبيين لا نبي بعدي)
"... অবশ্যই আমার উম্মাতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী হবে তাদের প্রত্যেকে মনে করবে সে নবী। অথচ আমি শেষ নবী, আমার পরে আর কোন নবী নেই”¹。

৪. এ উম্মাতের আমীর ও আলেমদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাওয়া; যেহেতু উম্মাতের দ্বীন ও দুনিয়াবী তথা সার্বিক শাসন ক্ষমতা তাদের হাতেই অর্পিত হয়েছে। যা বনী ইসরাইলদের বিপরীত; কারণ তাদেরকে কেবল নবীগণই শাসন করত।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(كانت بنو إسرائيل تسوسهم الأنبياء كلما هلك نبي خلفه نبي، وإنه لا نبي بعدي، وستكون خلفاء تكش. قالوا : فما تأمرنا ؟ قال : (فُوا ببيعة الأول فالأول وأعطوهم حقهم فإن الله سائلهم عما استرعاهم)¹
"বনী ইসরাইলদেরকে নবীগণ শাসন করত, যখনই কোন নবী চলে যেতেন তখনই অন্য নবী তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোন নবী নেই, তবে খলীফা হবে যাদের সংখ্যা হবে অনেক” সাহাবাগণ বললেনঃ আপনি আমাদেরকে এ ব্যাপারে কি নির্দেশ দেন? তিনি বললেনঃ “তোমরা ক্রমান্বয়ে একের পর এক খলীফার বাইয়াতের দাবী পূরণ করবে এবং তাদের হক আদায় করবে; কেননা আল্লাহ তাদেরকে যাদের উপর দায়িত্বশীল করেছেন তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন”'।

সুতরাং মানুষের শাসন ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এ উম্মাতের খলীফাদের স্থান হলো বনী ইসরাঈলদের নবীদের স্থান।

অন্য হাদীসে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ
(إن الله يبعث لهذه الأمة على رأس كل مائة سنة من يجدد لها دينها)
“অবশ্যই আল্লাহ এ উম্মাতের জন্য প্রত্যেক শত বৎসরের শুরুতে এমন কাউকে পাঠাবেন যিনি উম্মাতের জন্য তাদের দ্বীনকে সংস্কার করবেন”²。

আর উম্মাতের বাস্তবতাও এর প্রমাণ বহন করছে, ফলে খলীফা, আমীর তথা ক্ষমতাসীন শাসক এবং আলেমদের মধ্যে যারা মানুষদেরকে শরীয়ত অনুসারে পরিচালনা করেছে তাদের মাধ্যমে দ্বীনের যাবতীয় কর্মকান্ড সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতের জন্য যুগে যুগে সংস্কারক ইমামদের মাধ্যমে দ্বীনের যে নিশানাসমূহ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তা নবায়ন করেন, যারা আল্লাহর কিতাব তথা কুরআন থেকে অতিরঞ্জনকারীদের পরিবর্তন-পরিবর্ধন, বাতিলপন্থীদের মনগড়া মতবাদ এবং মুর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে তাকে হিফাযত করেন। সুতরাং নবী প্রেরণের যুগ ও রিসালতের সুদীর্ঘ কাল ধরে তাদের দ্বারা আল্লাহর দ্বীন সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা এ উম্মাতের উপর আল্লাহর সাধারণ অনুগ্রহ, আর যাদেরকে এ কাজের জন্য চয়ন করেছেন তাদের উপর বিশেষ অনুগ্রহ।

যাই হোক, খাতমে নবুওয়াতের আক্বীদা ও দ্বীনের মধ্যে তার প্রভাব এ উম্মাতের স্পষ্ট বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত, যার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ তথা ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত এ উম্মাতকে তাঁর দ্বীনের উপর ঈমানী শক্তিতে দিয়েছে বলিষ্ঠতা, বিশ্বাসে দিয়েছে সততা আর তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পদযুগলে দিয়েছে দৃঢ়তা।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী, (হাদীস নং ৪৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৩০১৭)。
¹দেখুন পৃষ্টা নংঃ ২৩৪。
¹ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, সুনান তিরমিযী (৪/৪৯৯, হাদীস নং ২২১৯), এবং হাসান সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। অনুরূপভাবে আবু দাউদ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, সুনান আবু দাউদ (৪/৩২৯, হাদীস নং ৪৩৩৩-৪৩৩৪)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪৫৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৮৪২), শব্দ চয়ন মুসলিমের。
² হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, (৪/৩১৩, হাদীস নং ৪২৯১), অনুরূপভাবে হাকিম তার মুস্তাদরাকে (৪/৫২২) বর্ণনা করেছেন এবং বিশুদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন আর ইমাম যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসরা তথা রাত্রিভ্রমণের হাকীকত ও তার প্রমাণাদি

📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসরা তথা রাত্রিভ্রমণের হাকীকত ও তার প্রমাণাদি


'ইসরা'র আভিধানিক ও শরয়ী' অর্থ:

আভিধানিক অর্থে 'ইসরা':
শব্দটি আরবী السریশব্দ থেকে গৃহীত। যার অর্থ: রাতের ভ্রমণ বা রাতের অধিক অংশের ভ্রমণ। কেউ কেউ বলেন: সম্পূর্ণ রাত্রির ভ্রমণ।
বলা হয়ে থাকে : أسريت ও سریت অর্থাৎ : আমি রাতে ভ্রমণ করেছি। হাসান বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর কবিতায় এসেছে:
أَسْرَتْ إِلَيكَ وَلَمْ تَكُنْ تَسْرِي
অর্থাৎঃ রাতে সে তোমার কাছে ভ্রমণ করেছে, অথচ সে রাতে আসতো না।
শরীয়তের পরিভাষায় আল-ইসরা শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মক্কার মাসজিদুল হারাম থেকে 'ঈলিয়া' তথা ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত রাত্রিতে ভ্রমণ করানো, আবার রাত্রির মধ্যেই সেখান থেকে তার ফিরে আসা।

'ইসরা'র বাস্তবতা ও তার প্রমাণাদি: "ইসরা' এক মহা নিদর্শন যার দ্বারা আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হিজরতের পূর্বে শক্তি যুগিয়েছেন। তাকে নিয়ে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত বুরাকের উপর আরোহণ করে জিবরীলের সাহচর্যে রাত্রিতে ভ্রমণ করানো হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছলেন, তারপর তিনি বুরাককে মসজিদের দরজার একটি আংটার সাথে বাঁধার পর মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং নবীদের নিয়ে ইমাম হয়ে নামায পড়লেন। তারপর জিবরীল তার কাছে এক পেয়ালা মদ এবং এক পেয়ালা দুধ নিয়ে আসলেন, তিনি দুধকে মদের উপর প্রাধান্য দিলেন এবং দুধ পছন্দ করলেন। জিবরীল বললেন: আপনাকে ফিতরাত তথা স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন দ্বীনের প্রতি পথ প্রদর্শন করা হয়েছে।

কুরআন ও সুন্নাহ 'ইসরা'র উপর প্রমাণ বহন করছে:

মহান আল্লাহ বলেন:
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي برَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ أَيْتِنَا أَنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ (الإسراء : 1)
"কতইনা পবিত্র, মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিতে ভ্রমণ করিয়েছেন, মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত যার চতুষ্পার্শ আমরা বরকতময় করেছিলাম, তাকে আমাদের নিদর্শন দেখানোর জন্য। অবশ্যই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। সূরা আল-ইসরা: ১]

রাসূলের সুন্নাহ থেকে এর দলীল: আনাস ইবনে মালিক বর্ণিত হাদীস যা ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে সাবিত আল-বুনানীর মাধ্যমে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বললেন:
أتيت بالبراق وهو دابة أبيض طويل فوق الحمار ودون البغل يضع حافره عند منتهى طرفه قال فركبته حتى أتيت بيت المقدس. قال: فربطته بالحلقة التي يربط به الأنبياء، قال: ثم دخلت المسجد فصليت فيه ركعتين، ثم خرجت فجاءني جبريل عليه السلام بإناء من خمر وإناء من لبن فاخترت اللبن. فقال جبريل : اخترت الفطرة)¹
"আমার কাছে বুরাক নিয়ে আসা হলো” (আর তা ছিল একটি সাদা লম্বা জন্তু, গাধার চেয়ে উঁচু খচ্চরের চেয়ে নিচু, যতদুর দৃষ্টিশক্তি পৌঁছে ততদূর তার পায়ের খুর রাখে) বললেনঃ "তারপর আমি তাতে সওয়ার হয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত পৌঁছলাম", বললেনঃ "তারপর আমি নবীগণ যে আংটাতে বাঁধতেন তাতে তাকে বাঁধলাম”। বললেন: “তারপর আমি মসজিদে প্রবেশ করে দু'রাকাত নামায পড়লাম। তারপর বের হলাম। ইতিমধ্যে জিবরীল আমার কাছে এক পেয়ালা মদ ও এক পেয়ালা দুধ নিয়ে এলে আমি দুধ পছন্দ করলাম। তাতে জিবরীল বললেনঃ আপনি স্বভাবজাত দ্বীন পছন্দ করেছেন"।

তারপর তিনি হাদীসের বাকী অংশ এবং আকাশের দিকে আরোহণ করার কথা উল্লেখ করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে 'ইসরা' সংঘটিত হওয়ার উপর অনেক হাদীস এসেছে, তার মধ্যে কিছু বর্ণিত হয়েছে বুখারী ও মুসলিমে, আবার কিছু বর্ণিত হয়েছে সুনান ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থসমূহে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এক দল সাহাবা তা বর্ণনা করেছেন, যাদের সংখ্যা ত্রিশের মত, তারপর তাদের থেকে হাদীসের বর্ণনাকারী ও দ্বীনের ইমামদের এমন বেশী সংখ্যক লোক তা বর্ণনা করেছেন যাদের পরিসংখ্যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'ইসরা' বিশুদ্ধ হওয়া এবং তা যে সত্য তার উপর মুসলমানদের পূর্বাপর যাবতীয় আলেমগণ একমত হয়েছেন এবং তাদের ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাজী 'ইয়াদ তার গ্রন্থ 'শিফা' এবং সাফারীনী তার 'লাওয়ামি'য়ুল আনওয়ার' গ্রন্থে এর উপর ইজমা হয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'ইসরা' শরীর ও আত্মা উভয়ের মাধ্যমেই হয়েছিল, জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল, ঘুমন্ত অবস্থায় নয়। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তা-ই প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত সাহাবাগণ, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণ এবং সঠিক বিশ্লেষক আলেমগণ এ মতই পোষণ করেছেন।

ইবনে আবিল 'ইয্য আল হানাফী বলেন: 'ইসরা'র ব্যাপারে ভাষ্য হলো: সঠিক মতে তাকে স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত 'ইসরা' বা রাত্রি কালীন ভ্রমণ করানো হয়েছিল'।

আর সাহাবা ও তাদের পরবর্তী সমস্ত আলেমগণ সবাই যে এ মত পোষণ করতেন সে কথার স্বীকৃতি প্রদান করে কাজী ইয়াদ বলেন: 'সালফে সালেহীনের অধিকাংশ এবং মুসলমানগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, এ 'ইসরা' ছিল স্বশরীরে এবং জাগ্রত অবস্থায়। আর এটাই বাস্তব সত্য। ইবনে আব্বাস, জাবির, আনাস, হুজাইফা, উমর, আবু হুরায়রা, মালিক ইবনে সা'সা', আবু হাব্বাহ আল-বাদরী, ইবনে মাসউদ, দাহ্হাক, সা'ঈদ ইবনে যুবাইর, ক্বাতাদা, ইবনুল মুসাইয়্যেব, ইবনে শিহাব, ইবনে যায়েদ, হাসান, ইব্রাহীম, মাসরূক, মুজাহিদ, 'ইকরামা, ইবনে জুরাইজ এরা সবাই এ মত পোষণ করেছেন। এটা 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা দ্বারাও প্রমাণিত হয়। ত্বাবারী, ইবনে হাম্বাল সহ বিরাট সংখ্যক একদল মুসলমান এ মত পোষণ করেছেন। আর পরবর্তী অধিকাংশ ফকীহ, মুহাদ্দিস, মুতাকাল্লিম তথা কালামশাস্ত্রবিদ, মুফাসসিরের মতও তাই'।

যারা মনে করে 'ইসরা' দু'বার হয়েছিল তাদের মত খন্ডন করে একজন অদ্বিতীয় বিশ্লেষক বলেন: 'কুরআন ও হাদীসের ইমামগণের মত অনুসারে সঠিক মত হলো, 'ইসরা' শুধুমাত্র একবার ঘটেছিল, যা হয়েছিল নবী হিসাবে প্রেরণের পরে মক্কায় অবস্থান কালে। ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে আশ্চার্য না হয়ে পারা যায় না যারা মনে করে যে, 'ইসরা' কয়েকবার হয়েছিল; কেননা কিভাবে তারা ধারণা করতে পারে যে, প্রত্যেক বার তার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হতো। তারপর প্রত্যেক বার তিনি মূসা ও তাঁর প্রভুর মাঝে বারবার আসা যাওয়া করতেন, আর পাঁচ ওয়াক্ত করার পর আল্লাহ বলতেন: "আমি আমার ফরজ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছি এবং আমার বান্দাদের বোঝা লাঘব করে দিয়েছি”। তারপর আল্লাহ দ্বিতীয়বার সেটাকে পঞ্চাশ ওয়াক্তে রূপান্তরিত করতেন, তারপর দশ দশ করে ছাড় দিতেন। এটা কিভাবে হতে পারে?'।

মি'রাজ ও তার বাস্তবতাঃ

কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে ও আলেমদের আলোচনায় মি'রাজের কথা 'ইসরা'র সাথে সংশ্লিষ্ট। আর এজন্যই মি'রাজ সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা প্রয়োজন যাতে করে এ বিষয় থেকে পরিপূর্ণ ফায়দা হাসিল করা সহজ হয়।

মি'রাজঃ আরবী শব্দ العروج থেকে مفعّال এর সমপরিমাণ বর্ণে গঠিত শব্দ। অর্থাৎ যে যন্ত্রের সাহায্যে উপরে উঠা যায়, আরোহণ করা যায়। এটা দ্রুত চলন্ত সিঁড়ির মত তবে আমরা এর আকৃতি প্রকৃতি সম্পর্কে জানি না।

শরীয়তের পরিভাষায় মি'রাজ বললে যা বুঝায় তা'হলোঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরীলের সাহচর্যে বাইতুল মুকাদ্দাস হতে দুনিয়ার আকাশে আরোহণ করা, তারপর সেখান থেকে সমস্ত আসমান পেরিয়ে সপ্তম আকাশে পৌঁছা এবং নবীদের মর্যাদা ও স্থান অনুসারে আসমানের বিভিন্ন স্থানে তাদের সাথে সাক্ষাৎ ও তাদের সাথে সালাম বিনিময় এবং তাদের মাধ্যমে তাকে সাদর সম্ভাষণ জ্ঞাপন, তারপর 'সিদরাতুল মুনতাহা' পর্যন্ত আরোহণ করা এবং সেখানে জিবরীলকে আল্লাহ যে আসল রূপে সৃষ্টি করেছেন সে রূপে দেখা, তারপর আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করে দেয়া এবং আল্লাহর সাথে এ ব্যাপারে কথোপকথন, তারপর আবার যমীনে প্রত্যাবর্তন করা। সঠিক মতে 'ইসরা'র রাত্রিতেই মি'রাজ সংঘটিত হয়েছিল।

কুরআন ও সুন্নায় মি'রাজের অনেক দলীল-প্রমাণাদি রয়েছেঃ

মি'রাজের রাত্রিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সমস্ত মহা নিদর্শনসমূহ সংঘটিত হয়েছিল তার কিছু বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এসেছেঃ যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى * وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى * عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى * عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى * إِذْ يَغْشَى السَّدْرَةَ مَا يَغْشَى * مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى * لَقَدْ رَأَى مِنْ أَيْتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى﴾ (النجم: ۱۲-۱۸)
"সে যা দেখেছে তোমরা কি সে বিষয়ে তার সঙ্গে বিতর্ক করবে? নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, প্রান্তবর্তী বদরী বৃক্ষের নিকট, যার নিকট 'জান্নাতুল মাওয়া' অবস্থিত, যখন গাছটি, যা দ্বারা আচ্ছাদিত হবার তা দ্বারা ছিল আচ্ছাদিত, তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি, অবশ্যই সে তার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখেছিল"। [সূরা আন-নাজম: ১২-১৮]

আলোচ্য আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা তাঁর মহান নিদর্শনাবলী উল্লেখ করেছেন যেগুলো দ্বারা তিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মি'রাজের রাত্রিতে সম্মানিত করেছিলেন। তম্মধ্যে রয়েছে 'সিদরাতুল মুস্তাহা' তথা প্রান্তসীমায় অবস্থিত বদরী গাছের নিকট জিবরীল আলাইহিস সালামকে দর্শন, আল্লাহর নির্দেশে যা দ্বারা আচ্ছাদিত হবার তা দ্বারা আচ্ছাদিত অবস্থায় সিদরাতুল মুন্তাহা দেখা, ইবনে আব্বাস ও মাসরূক বলেন : 'স্বর্ণের পতঙ্গ দল দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল'।

রাসূলের সুন্নায় একাধিক হাদীসে মি'রাজের বিস্তারিত বিবরণ এসেছে, তম্মধ্যে পূর্বে 'ইসরা'র ঘটনায় বর্ণিত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস উল্লেখযোগ্য, যার মধ্য থেকে 'ইসরা'র সাথে সংশ্লিষ্ট অংশ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, তারপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
(ثم عرج بنا إلى السماء فاستفتح جبريل. فقيل: من أنت؟ قال: جبريل. قيل: ومن معك؟ قال: محمد قيل وقد بعث إليه؟ قال : قد بعث إليه. ففتح لنا فإذا أنا بآدم فرحب بي ودعا لي بخير. ثم ذكر عروجه إلى السموات وملاقاته الأنبياء إلى أن قال: ثم ذهب بي إلى سدرة المنتهى وإذا ورقها كآذان الفيلة، وإذا ثمارها كالقلال. قال: فلما غشيها من أمر الله ما غشيها تغيرت. فما أحد من خلق الله يستطيع أن نعتها من حسنها. فأوحى الله إلي ما أوحى. ففرض علي خمسين صلاة في كل يوم وليلة، فنزلت إلى موسى . فقال: ما فرض ربك على أمتك؟ قلت: خمسين صلاة. قال: ارجع إلى ربك فاسأله التخفيف فإن أمتك لا يطيقون ذلك، فإني قد بلوت بني إسرائيل وخبرتهم. قال: فرجعت إلى ربي. فقلت: يا رب خفف على أمتي. فحط عني خمساً. فرجعت إلى موسى. فقلت: حط عني خمساً. قال: إن أمتك لا يطيقون ذلك فارجع إلى ربك فاسأله التخفيف. قال: فلم أزل أرجع بين ربي تبارك وتعالى وبين موسى عليه السلام حتى قال: يا محمد إنهن خمس صلوات كل يوم وليلة لكل صلاة عشر فذلك خمسون صلاة ....
"তারপর আমাকে নিয়ে আকাশে আরোহণ করা হলো, জিবরীল খুলতে বললে তাকে বলা হলো: আপনি কে? তিনি উত্তর দিলেন: জিবরীল। বলা হলোঃ আপনার সাথে কে? তিনি বললেন: মুহাম্মাদ। তাকে বলা হলো: তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর করলেন: অবশ্যই তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তারপর আমাদের জন্য খোলা হলো, আমি আদমকে দেখলাম। তিনি আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন এবং আমার জন্য কল্যাণের দো'আ করলেন। (তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অন্যান্য আসমানে ভ্রমণ ও সেখানে নবীদের সাথে তার সাক্ষাতের বিবরণ দিয়ে শেষ পর্যন্ত বললেনঃ) তারপর আমাকে নিয়ে 'সিদরাতুল মুস্তাহা'র কাছে নিয়ে যাওয়া হলো, আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম এর পাতাগুলো হাতির কানের মত আর এর ফলগুলো বড় কলসীর মতো, তিনি বললেন: তারপর যখন আল্লাহর নির্দেশে যা ঢেকে রাখার তা তাকে ঢেকে ফেলল তখন তা এমন ভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেল যে, আল্লাহর সৃষ্টিজগতের কেউ তার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে সামর্থ হবে না, তারপর আল্লাহ আমার কাছে যা ওহী করার ছিল তা ওহী করে পাঠালেন, দিন ও রাত্রিতে আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। তারপর আমি মুসা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অবতরণ করলে তিনি বললেন : আপনার প্রভু আপনার উম্মাতের উপর কি ফরয করেছেন? আমি বললাম: পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন: আপনি আপনার প্রভুর কাছে ফিরে যান এবং কমাতে বলুন; কেননা আপনার উম্মাত তা করতে সামর্থ হবে না, কারণ আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তারপর আমি আমার প্রভুর কাছে ফিরে গিয়ে বললাম: হে প্রভু! আমার উম্মাতের উপর হালকা করে দিন। তিনি আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমালেন। আমি মূসার কাছে ফিরে গিয়ে বললাম : আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন: আপনার উম্মাত তাও করতে সামর্থ হবে না, আপনি আপনার প্রভুর কাছে ফিরে গিয়ে লাঘব করার দরখাস্ত করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: এভাবে আমি মূসা আলাইহিস সালাম এবং আমার মহান সম্মানিত প্রভুর দরবারে যাওয়া আসা করতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! এগুলো দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, প্রত্যেক সালাত দশগুণ বর্ধিত হয়ে পঞ্চাশ সালাত বিবেচিত হবে...'¹。

হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। মি'রাজের ঘটনা বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীসের গ্রন্থে মালেক ইবনে সা'সা'আহ, আবু যর এবং ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদীসে কাছাকাছি শব্দে বর্ণিত হয়েছে।

সতর্কীকরণ:

ইসরা ও মি'রাজ আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবীকে প্রদত্ত মহান নিদর্শনাবলীর অন্যতম। প্রত্যেক মুসলিমের উপর ওয়াজিব এতদুভয়ের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করা, এ সুমহান মর্যাদা আল্লাহ সমস্ত নবী-রাসূলের মধ্য হতে কেবলমাত্র আমাদের নবীকে প্রদান করেছেন। ইসরা ও মিরাজকে স্মরণ করে তা আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা কোন মুসলিমের জন্যই বৈধ নয়। অনুরূপভাবে এতদুভয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোন নামাযও বৈধ নয়, যেমনটি কোন কোন সাধারণ মুসলমান করে থাকে। বরং এগুলো গর্হিত বেদ'আত যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবর্তন করেননি, সালফে সালেহীনের কেউই তা করেননি। অনুসরণযোগ্য আলেমদের মধ্য থেকেও কেউ তা করতে বলেননি।

রজব মাসের সাতাশ তারিখের রাত্রির নামায ও অন্যান্য কর্মকান্ড সম্পর্কে সুন্নাতের অনুসারী আলেমগণ বলেন যে, 'এটা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে নতুনভাবে উদ্ভাবিত বেদ'আতের অন্তর্গত। ইসলামের ইমামদের ঐক্যমতে এ কাজ অবৈধ। মূর্খ ও বেদ'আতকারী ব্যতীত আর কেউ এমন কাজের প্রচলন ঘটায় না'। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد)
“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মাঝে এমন কিছুর আবির্ভাব ঘটাবে যা এ দ্বীনের মধ্যে নয় তা প্রত্যাখ্যাত হবে”¹। অর্থাৎ: তা তার উপরই প্রত্যাখ্যাত হবে।

টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম, (হাদীস নং ১৬২)。
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৬২)。
¹সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৬৯৭)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 নবীদের জীবিত থাকা সম্পর্কে

📄 নবীদের জীবিত থাকা সম্পর্কে


কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবীরা মারা গেছেন। অবশ্য যাদের জীবিত থাকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট দলীল এসেছে তারা ব্যতীত, যেমন 'ঈসা আলাইহিস সালাম; কেননা তিনি এখনো মারা যাননি বরং তাকে জীবিত অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার কাছে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে যার বর্ণনা অচিরেই আসবে।

নবীদের মৃত্যু হওয়ার প্রমাণাদির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: আল্লাহর বাণী:
أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ ﴾ (البقرة: ١٣٣)
"ইয়া'কুবের যখন মৃত্যু এসেছিল তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে?” [সূরা আল-বাকারাহ : ১৩৩]

মহান আল্লাহ আরো বলেন :
وَلَقَدْ جَاءَ كُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِمَّا جَاءَ كُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يَبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولًا ﴾ (غافر : ٣٤)
"ইতিপূর্বে তোমাদের নিকট ইউসুফ এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শনসহ; কিন্তু তোমরা তিনি তোমাদের নিকট যা নিয়ে এসেছিল তাতে সর্বদা সন্দেহে ছিলে। পরিশেষে যখন তার মৃত্যু হলো তখন তোমরা বলেছিলে, 'তার পরে আল্লাহ আর কোন রাসূল প্রেরণ করবেন না”। [সূরা গাফির : ৩৪]

আল্লাহ তা'আলা সুলাইমান আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন:
فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَأَتَهُ ﴾ (سبأ : ١٤)
“তারপর যখন আমরা সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম তখন জ্বিনদিগকে তার মৃত্যুর বিষয় জানাল কেবল মাটির পোকা, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। [সূরা সাবাঃ ১৪]

মহান আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
﴿ إِنَّكَ مَيِّتُ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ ﴾ (الزمر: ٣٠)
"আপনি তো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল"। [সূরা আয-যুমার : ৩০]

কোন কোন মুফাস্সির বলেন : এ আয়াত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর খবর দিল, সাথে সাথে তাদের মৃত্যুর ঘোষণাও দেয়া হলো। সুতরাং এ আয়াত সাহাবাদের জানিয়ে দিল যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা যাবেন।

অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক সৃষ্ট প্রাণীর মৃত্যুবরণ করতে হবে এ ঘোষণা দিয়ে বলেন :
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ (آل عمران : ١٨٥ والأنبياء: ٣٥، والعنكبوت: ٥٧)
"প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে"। [সূরা আলে-ইমরান : ১৮৫, আল- আম্বিয়া : ৩৫, আল-'আন্‌কাবুত : ৫৭]

এ আয়াতসমূহ নবীদের মৃত্যু প্রমাণ করে। আরো প্রমাণ করে যে, তাদের মৃত্যু অন্যান্য মানুষের মতই। তবে 'ঈসা আলাইহিস সালাম এর ব্যতিক্রম। মহান আল্লাহ তার সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন :
إِذْ قَالَ اللهُ يَعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَى وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا ﴾ (آل عمران : ٥٥)
"স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ বললেন, 'হে 'ঈসা! আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব এবং আমার নিকট আপনাকে উঠিয়ে নিব এবং যারা কুফরী করে তাদের মধ্য হতে আপনাকে পবিত্র করব'"। [সূরা আলে-ইমরান : ৫৫]

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা 'ঈসা আলাইহিস সালামকে তার শরীর ও রূহসহ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তার মৃত্যু হয়নি। আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর বাণী ﴿ مُتَوَفِّيكَ শব্দে বর্ণিত 'ওফাত' সম্পর্কে তাফসীরে এসেছে : 'তাকে ওফাত দেয়ার অর্থ : তাকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নেয়া'। ইবনে জারীর ত্বাবারী এ মত পোষণ করেছেন। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মতে উল্লেখিত 'ওফাত' দ্বারা ঘুম বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ اللهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ﴾ (الزمر: ٤٢)
"আল্লাহই আত্মাসমূহকে “ওফাত” প্রদান করেন মৃত্যুর সময় অনুরূপভাবে সেসব আত্মাকেও (ওফাত দেন) নিদ্রাবস্থায় যেগুলোর মৃত্যু হয়নি”। [সূরা আয-যুমার: ৪২]

সুতরাং এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, 'ঈসা আলাইহিস সালাম এখনো আসমানে জীবিত আছেন, তার মৃত্যু হয়নি। আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কিয়ামতের পূর্বে তার মৃত্যু হবে। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿ وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا ﴾ (النساء: ١٥٩)
"কিতাবী (ইয়াহুদী-নাসারা)দের মধ্যে প্রত্যেকে তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর ঈমান আনবেই আর ক্বিয়ামতের দিন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন”। [সূরা আন-নিসা: ১৫৯]

এখানে যে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে: তা হলো 'ঈসা আলাইহিস সালাম এর মৃত্যু, যখন তিনি শেষ জামানায় আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়ে ক্রুশ ধ্বংস করবেন, শুকর হত্যা করবেন এবং জিযিয়া তথা প্রাণরক্ষা কর রহিত করবেন। বহু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, 'ঈসা আলাইহিস সালাম শেষ জামানায় অবতীর্ণ হবেন। এ সমস্ত হাদীস সহীহ বুখারী ও মুসলিম সহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

আর যে সমস্ত নবীদের সম্পর্কে বলা হয় যে, তাদের মৃত্যু হয়নি তম্মধ্যে রয়েছেঃ ইদ্রীস আলাইহিস সালাম। অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন যে তার মৃত্যু হয়নি, বরং আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন যেমনিভাবে 'ঈসা আলাইহিস সালাম কে উঠিয়ে নিয়েছেন। তারা তাদের মতের সমর্থনে দলীল হিসাবে পেশ করেন আল্লাহর বাণী:
﴿وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا * وَرَفَعْنَهُ مَكَانًا عَلِيًّا﴾ (مريم : ٥٦-٥٧)
"আর স্মরণ কর এ কিতাবে ইদরীসের কথা, সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী, এবং আমরা তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়”। [সূরা মারইয়াম: ৫৬-৫৭]

মুজাহিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইদ্রীসকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে যেমনিভাবে 'ঈসাকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। সুতরাং তার মৃত্যু হয়নি। ইবনে আব্বাস বলেন: তাকে আসমানে উঠিয়ে নেয়ার পর মৃত্যু দেয়া হয়। অন্যরা বলেন: তাকে চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান আল্লাহর কাছেই। এখানে একথা বলাই উদ্দেশ্য যে, আলেমগণ ইদ্রীসের মৃত্যু হওয়া না হওয়া সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তবে একথা অকাট্যভাবে সুনির্দিষ্ট যে, তিনি যদি মারা না ও গিয়ে থাকেন তবুও মারা যাবেনই; আল্লাহ তা'আলার ব্যাপক ঘোষণার কারণে, তিনি বলেন: ﴾ كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ﴿ 'প্রত্যেক আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে'।

'ঈসা ও ইদ্রীস আলাইহিমাস সালাম ব্যতীত অন্যান্য রাসূলদের সম্পর্কে উম্মাতের গ্রহণযোগ্য কোন আলেমই তাদের জীবিত থাকার কথা বলেননি। এ ব্যাপারে পূর্ব বর্ণিত দলীল-প্রমাণাদির কারণে এবং বাস্তবিকই তাদের মৃত্যু চাক্ষুষ দেখতে পাওয়ার কারণে।

তবে এ বিষয়ে এমন কিছু দলীল আছে যে গুলো বুঝতে অনেকের কাছে খটকা লেগেছে যেমন: বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত মি'রাজের হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এসেছে যে, তিনি কোন কোন রাসূলকে আসমানে দেখতে পেয়েছেন এবং তাদের সাথে কথাবার্তা বলেছেন। সেখানে এসেছে:
(ثم عرج بنا إلى السماء فاستفتح جبريل فقيل: من أنت؟ قال جبريل. قيل: ومن معك؟ قال: محمد. قيل: وقد بعث إليه.. قال: قد بعث إليه، ففتح لنا. فإذا أنا بآدم فرحب بي ودعا لي بخير، ثم عرج بنا إلى السماء الثانية فاستفتح جبريل عليه السلام فقيل: من أنت؟ قال جبريل. قيل: ومن معك؟ قال: محمد. قيل: وقد بعث إليه.. قال: قد بعث إليه، ففتح لنا. فإذا أنا بابني الخالة عيسى ابن مريم ويحيى بن زكريا صلوات الله عليهما. فرحبا بي ودعوا لي بخير)¹
"তারপর আমাকে নিয়ে আকাশে আরোহণ করা হলো, জিবরীল খুলতে বললে তাকে বলা হলো: আপনি কে? তিনি উত্তর দিলেন: জিবরীল, বলা হলো: আপনার সাথে কে? তিনি বললেন: মুহাম্মাদ, বলা হলো: তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর করলেন: অবশ্যই তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তারপর আমাদের জন্য খোলা হলো, তৎক্ষনাৎ আমি আদমের সামনে উপস্থিত হলাম, তিনি আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন এবং আমার জন্য কল্যাণের দো'আ। করলেন। তারপর আমাদের নিয়ে দ্বিতীয় আসমানের দিকে আরোহণ করা হলো, জিবরীল খুলতে বললে তাকে বলা হলো : আপনি কে? তিনি উত্তর দিলেন : জিবরীল, বলা হলো : আপনার সাথে কে? তিনি বললেন : মুহাম্মাদ, বলা হলো : তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? বললেন : অবশ্যই তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তারপর আমাদের জন্য খোলা হলো, তৎক্ষনাৎ আমি দু' খালার সন্তান 'ঈসা ইবনে মারইয়াম এবং ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া -তাদের উপর রইল আল্লাহর পক্ষ থেকে যাবতীয় সালাত তাদের সামনে নীত হলাম। তারা দু'জন আমাকে স্বাগতম জানালেন এবং আমার জন্য কল্যাণের দো'আ করলেন"'।

তারপর হাদীসে বাকী অংশে এসেছে, যাতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি ইউসুফ কে তৃতীয় আসমানে দেখতে পেয়েছেন। আশ্চার্য যে, সৌন্দর্য্যের অর্ধেকই তাকে দেয়া হয়েছে। চতুর্থ আসমানে দেখলেন ইদ্রীসকে, পঞ্চম আসমানে দেখলেন হারূনকে, মূসাকে দেখলেন ষষ্ঠ আসমানে আর সপ্তম আসমানে ইব্রাহীমকে দেখলেন বাইতুল মা'মূরের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে আছেন। তারা প্রত্যেকেই তাকে শুভেচ্ছা জানালেন এবং তার জন্য কল্যাণের দো'আ করলেন।

অনুরূপভাবে বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন :
رأيت ليلة أسري بي موسى رجلاً آدم طوالاً كأنه من رجال شنوءة، ورأيت عيسى رجلاً مربوعاً مربوع الخلق إلى الحمرة والبياض سبط الرأس ...)²
"যে রাত্রিতে 'ইসরা' হয়েছিল সে রাত্রিতে আমি মূসাকে দেখলাম লম্বা, তামাটে একজন লোক, মনে হল যেন 'শানূয়া' সম্পদায়ের লোকদের মত। আর 'ঈসাকে দেখলাম মাঝারী গড়নের মানুষ, মাঝারী সৃষ্টি লাল ও সাদার সংমিশ্রনে, মাথার চুল অকোকড়ানো ...")。

কোন কোন লোক এ হাদীসসমূহ ও এ জাতীয় অন্যান্য প্রমাণাদি থেকে এ কথা বুঝেছেন যে, নবীদের মৃত্যু হয়নি, তারা এগুলো দ্বারা নবীদের জীবন অবশিষ্ট রয়েছে বলে তাদের বিশ্বাসের নেপথ্যে দলীল হিসাবে পেশ করেন। অথচ বাস্তব সত্য হলো যে, 'ঈসা আলাইহিস সালাম এবং ইদ্রীস আলাইহিস সালাম যার ব্যাপারে মত পার্থক্য রয়েছে এ দু'জন ব্যতীত অন্যান্য নবীগণ মারা গেছেন। এ দু'জন ব্যতীত অন্যন্য সবার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে অকাট্যভাবে তাদের মৃত্যু সাব্যস্ত হয়েছে। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। পূর্বেই এ ব্যাপারে দলীল-প্রমাণাদি উল্লেখিত হয়েছে।

তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাসূলদেরকে মি'রাজের রাত্রিতে দেখার যে খবর দিয়েছেন এবং এ জাতীয় অন্যান্য যে সমস্ত দলীল-প্রমাণাদি এসেছে সেগুলোও সত্য। এগুলোর মধ্যে কোন বিরোধ বা দ্বন্দ নেই; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা দেখেছেন তা ছিল রাসূলদের আত্মা যা তাদের শরীরের আকৃতিতে রূপান্তরিত করে দেখানো হয়েছিল। মুলত: যাদের উঠিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সরাসরি কুরআন বা সহীহ হাদীস থেকে দলীল-প্রমাণাদি এসেছে তারা ব্যতীত অন্যন্যদের শরীর যমীনেই রয়েছে। সুন্নাতের অনুসারী গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইমামগণ এ মতই পোষণ করেন।

একজন সুবিজ্ঞ জ্ঞানী ইমাম এ মাআলার বিশ্লেষণ করে বলেন: 'তিনি যে অন্যান্য নবীদের মি'রাজের রাত্রিতে আসমানে দেখতে পেলেন, যখন তিনি আদমকে দুনিয়ার আসমানে, ইয়াহইয়া ও 'ঈসাকে দ্বিতীয় আসমানে, ইউসুফকে তৃতীয় আসমানে, ইদ্রীসকে চতুর্থ আসমানে, হারুনকে পঞ্চম আসমানে, মূসাকে ষষ্ঠ আসমানে এবং ইব্রাহীমকে সপ্তম আসমানে অথবা তার বিপরীতে দেখতে পেলেন, এ দেখা মূলত: তিনি তাদের আত্মাকে তাদের শরীরের রূপে রূপান্তরিত অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন। কোন কোন লোক বলে থাকে যে, তিনি তাদের কবরে দাফনকৃত শরীরই দেখেছেন, এটা কোন মতই নয়। তবে 'ঈসা তার রূহ ও শরীর সহ আসমানে আরোহণ করেছেন অনুরূপভাবে ইদ্রীসের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু ইব্রাহীম, মূসা এবং অন্যান্যগণ তারা অবশ্যই যমীনে দাফনকৃত অবস্থায় আছে'।

অবশ্য এ কথার স্বীকৃতি দেয়া উচিত যে, যেভাবে আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলদের রূহ আসমানে উঠিয়ে তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তাদের রূহ সেখানে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী সুখ ভোগ করছে অনুরূপভাবে তিনি তাদের শরীরকেও জমীনের বুকে সংরক্ষণ করেছেন। এবং তাদের শরীরকে খাওয়া মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় আউস ইবনে আউস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ، فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَيَّ). فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ. وَكَيْفَ تُعْرَضُ صَلَاتُنَا عَلَيْكَ وَقَدْ أَرَمْتَ؟ قَالَ: يَقُولُ: بَلِيتَ. قَالَ: (إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ)¹
“তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুম'আর দিন, সুতরাং তোমরা তাতে আমার উপর বেশী বেশী দরূদ পড়; কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়”। সাহাবাগণ বললেন : হে আল্লাহর রাসূল! যখন আপনার শরীর পঁচে যাবে তখন কিভাবে আমাদের সালাত (দরূদ) আপনার কাছে পেশ করা হবে? বর্ণনাকারী বলেন : হাদীসে বর্ণিত (أَرَمْتَ) শব্দের অর্থ : (بلیت) বা পঁচে যাবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ “অবশ্যই মহান আল্লাহ নবীদের শরীরকে যমীনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন”'।

উক্ত আলোচনার মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক মত কি এবং একজন মুসলিমের জন্য এ ব্যাপারে কি বিশ্বাস করা ওয়াজিব তা স্পষ্ট হয়ে গেল।

মহান আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৫৭০), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৬২)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং (৩২৩৯), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৬৫)。
¹হাদীসটি বর্ণনা করেন যথাক্রমেঃ ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ (৪/৮), আবুদাউদ তার সুনান (১/৪৪৩), দারমী তার সুনান গ্রন্থে (১/৩০৭, হাদীস নং ১৫৮০)। ইমাম নববী বলেনঃ তার সনদ বিশুদ্ধ。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 নবীদের মু'জিযা এবং তার ও অলীদের কারামতের মধ্যে পার্থক্য

📄 নবীদের মু'জিযা এবং তার ও অলীদের কারামতের মধ্যে পার্থক্য


মু'জিয়ার সংজ্ঞা:

মু'জিযা শব্দটি আরবী العجز থেকে গৃহীত, যার অর্থ: অক্ষমতা।

আরবী অভিধান ক্বামূস গ্রন্থে এসেছে: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযা হলো যা দিয়ে তিনি বিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করে অপারগ করে দিয়েছেন। এখানে المعجزة শব্দের শেষে যে اءএ এসেছে তা আধিক্য বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

শরীয়তের পরিভাষায় মু'জিযা বলতে বুঝায়: নবীদের হাতে তাদের সত্যতা প্রমাণে কোন অস্বাভাবিক বিষয় প্রকাশ পাওয়া, যার মোকাবিলায় কিছু করা সম্ভব হয়না।

এখানে আমরা 'কোন অস্বাভাবিক বিষয়' বলে ঐ সমস্ত বিষয় বের করে দিয়েছি যে গুলো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। যেমন নবীদের যে সমস্ত কাজ ও অবস্থা স্বাভাবিক ভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে।

আর আমরা 'নবীদের হাতে' বলে ঐ সমস্ত অস্বাভাবিক বিষয় বের করে দিয়েছি যেগুলো অলীদের হাতে সংঘটিত হয়ে থাকে; কেননা সেগুলো মু'জিযা নয় বরং কারামত। যা নবীদের অনুসরণ-অনুকরণ করার কারণে তাদের অর্জিত হয়। যাদুকর ও গণকরা যে সমস্ত ভেলকি নিয়ে আসে তা পূর্বাহ্নেই এর আওতা বহির্ভূত হবে; কারণ এ গুলো সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টজীব থেকে সংঘটিত হয়ে থাকে।

আর 'তাদের সত্যতা প্রমাণে যার মোকাবেলায় কিছু করা সম্ভব হয়না' এ কথা দ্বারা আমরা ঐ সমস্ত অস্বাভাবিক বস্তু বের করে দিয়েছি যা নবুওয়াতের দাবীদার মিথ্যাবাদীগণ দাবী করে থাকে। অনুরূপভাবে যাদুকরগণ দেখিয়ে থাকে; কেননা সেগুলো তাদের মত অন্যান্য যাদুকরগণ নিয়ে আসতে পারে। কারণ সেগুলো মূলত: যাদু ও ভেলকি জাতীয়।

নবীদের মু'জিযার কিছু উদাহরণ:

নবীদের মু'জিযা অনেক ঃ
সালেহ আলাইহিস সালাম এর অন্যতম মু'জিযা হলো: তার জাতি তার কাছে সুনির্দিষ্ট এক পাথর থেকে উষ্ট্রী বের করে দিতে বলল। তারপর উটের কি কি গুণ থাকতে হবে তাও নির্ধারণ করে দিল। তিনি এজন্য আল্লাহকে ডাকলেন। আল্লাহ ঐ পাথরকে নির্দেশ দিলেন যেন তা ফেটে তার থেকে যে রকম তারা চেয়েছে সে রকম প্রকান্ড উষ্ট্রী বের করে দেয়¹। আল্লাহ তা'আলা এ প্রসংগে বলেনঃ
﴿وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَلِحًا قَالَ يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلهِ غَيْرُهُ قَدْ جَاءَتْكُمْ بَيِّنَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ هَذِهِ نَاقَةُ اللهِ لَكُمْ آيَةً فَذَرُوهَا تَأْكُلْ فِي أَرْضِ اللهِ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ﴾ (الأعراف: ۷۳)
"সামূদ জাতির নিকট তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর 'ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর এ উষ্ট্রী তোমাদের জন্য এক নিদর্শন। সুতরাং তোমরা তাকে আল্লাহর যমীনে চরে খেতে দাও এবং তাকে কোন কষ্ট দিওনা, দিলে মর্মন্তুদ শাস্তি তোমাদের উপর এসে পড়বে”। [সূরা আল-আ'রাফ: ৭৩]

ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: তার জাতি তাকে শাস্তি ও ধ্বংস করার জন্য যে আগুন প্রজ্জলিত করেছিল তারপর তাকে সেখানে নিক্ষেপ করেছিল আল্লাহ তা'আলা সে আগুনকে তার জন্য ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانْصُرُوا الهَتَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ فَعِلِينَ * قُلْنَا يُنَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى ابراهيم * وَأَرَادُوا بِهِ كَيْدًا فَجَعَلْتُهُمُ الْأَخْسَرِينَ ﴾ (الأنبياء: ٦٨-٧٠)
"তারা বলল: 'তাকে পুড়িয়ে ফেল, সাহায্য কর তোমাদের দেবতাদের, তোমরা যদি কিছু করতে চাও'। আমরা বললাম: 'হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও'। তারা তার ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু আমরা তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম"। [সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৮-৭০]

মূসা আলাইহিস সালাম এর মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: তার লাঠি যা যমীনে রাখার সাথে সাথে মহা সাপে পরিণত হয়ে যেত। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَمَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَمُوسى * قَالَ هِيَ عَصَاىَ أَتَوَكَّوْا عَلَيْهَا وَأَهْشَ بِهَا عَلَى غَيْنِي وَلِي فِيهَا مَارِبُ أخرى * قَالَ الْقِهَا يَمُوسى * فَالْقَهَا فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَى * قَالَ خُذْهَا وَلَا تَخَفْ سَنُعِيدُهَا سيرتها الأولى (طه: ۱۷-۲۱)
""হে মূসা! আপনার ডান হাতে সেটা কি'? বললেন: এটা আমার লাঠি; আমি এতে ভর দেই এবং এর দ্বারা আঘাত করে আমার মেষ পালের জন্য গাছের পাতা ফেলে থাকি আর এটা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে'। তিনি বললেন : 'হে মূসা! আপনি তা নিক্ষেপ করুন'। তারপর তিনি তা নিক্ষেপ করলে সংগে সংগে তা সাপ হয়ে ছুটতে লাগল। তিনি বললেন : 'আপনি তাকে ধরুন, ভয় করবেন না, আমরা তাকে তার পূর্ব রূপ ফিরিয়ে দেব'"। [সূরা ত্বা-হাঃ ১৭-২১]

মূসা আলাইহিস সালাম এর মু'জিযার মধ্যে আরো ছিল: তিনি তার জামার বগলে হাত ঢুকিয়ে বের করার পর তা' কোন প্রকার রোগ ব্যাধি ছাড়াই সাদা ধবধবে চাঁদের মত চিকচিক করত। মহান আল্লাহ বলেন:
وَادْمُهُ يَدَكَ إِلَى جَنَاحِكَ تَخْرُجُ بَيْضَاء مِنْ غَيْرِ سُوءٍ آيَةً أُخْرَى (طه: ۲۲)
"এবং আপনার হাত আপনার বগলের সাথে মিলিত করুন, তা আরেক নিদর্শন স্বরূপ নির্মল উজ্জল হয়ে বের হবে”। [সূরা ত্বা-হাঃ ২২]

'ঈসা আলাইহিস সালাম এর মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: তিনি মাটি দিয়ে পাখির মত আকৃতি বানাতেন তারপর সেগুলোতে ফুঁ দিতেন, তাতেই সেগুলো আল্লাহর হুকুমে পাখী হয়ে উড়ে যেত। তিনি দৃষ্টি শক্তিহীন অর্থাৎ অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীর উপর হাত বুলিয়ে দিতেন, তাতেই তারা আল্লাহর নির্দেশে সুস্থ হয়ে যেত। তিনি মৃতদেরকে তাদের কবর থেকে ডাকতেন, তাতেই তারা আল্লাহর অনুমতি ক্রমে তার ডাকে সাড়া দিত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطَّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ بِإِذْنِ فَتَنْفُحُ فِيهَا فَتَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِي وَ تُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ بِإِذْنِي وَإِذْ تَخْرِجُ الْمَوْلَى بِإِذْنِي (المائدة : ١١٠)
"আরো স্মরণ করুন যখন আপনি কাদামাটি দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখির মত আকৃতি গঠন করতেন এবং তাতে ফুঁ দিতেন, ফলে আমার অনুমতিক্রমে তা পাখি হয়ে যেত, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আপনি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করতেন এবং আমার অনুমতিক্রমে আপনি মৃতকে জীবিত করতেন”। [সূরা আল- মায়িদাহ: ১১০]

আর আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযার মধ্যে অন্যতম হলো: মহা কুরআন। যা সমস্ত রাসূলদের মু'জিযার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَدِقِينَ ﴾ (البقرة : ٢٣)
"আমরা আমাদের বান্দার উপর যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা এর অনুরূপ কোন সূরা অনয়ন কর এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সকল সাক্ষী-সাহায্যকারীকে আহবান কর”। [সূরা আল-বাকারাহ: ২৩]

আরো বলেনঃ
﴿قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لبعض ظهيرا ﴾ (الإسراء: ۸۸)
"বলুন : 'যদি কুরআনের অনুরূপ নিয়ে আসার জন্য মানুষ ও জ্বিন একত্রিত হয় এবং যদি তারা পরস্পরকে সাহায্যও করে তবুও তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না”। [সূরা আল-ইসরা : ৮৮]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযার মধ্যে অন্যতম আরেকটি মু'জিযা হলো চাঁদ ফেটে যাওয়া, মক্কাবাসীগণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একটি নিদর্শন দেখাতে বলল। তখন চাঁদ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, মক্কাবাসী ও অন্যান্যরা তা দেখতে পেল। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ * وَإِن يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَ يَقُولُوا سِحْرُ مُّسْتَمِرٌّ (القمر : ١-٢)
"কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে, আর চাঁদ ফেটে গেছে। তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে: এ তো চিরাচরিত যাদু [সূরা আল-কামার: ১-২]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযার মধ্যে অন্যতম আরেকটি মু'জিযা হলো : 'ইসরা ও মি'রাজ'। মহান আল্লাহ বলেন :
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصاهُ (الإسراء: 1)
"কতইনা পবিত্র ঐ সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত”। [সূরা আল-ইসরা : ১]

রাসূলদের মু'জিযা অনেক, বিশেষ করে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযা; কেননা আল্লাহ তাকে এমন অনেক নির্দশনাবলী ও অনেক দলীল-প্রমাণাদি দিয়ে সাহায্য করেছেন পূর্ববর্তী কোন নবীর কাছে যার সমারোহ ঘটেনি। আমি এখানে যা বর্ণনা করেছি তা কেবলমাত্র উদাহরণ পেশের নিমিত্তে।

কারামাতের সংজ্ঞা:

কারামাত হলো : নবুওয়াতের দাবী বা দাবীর প্রারম্ভিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে কোন ব্যাহ্যিক সৎপরায়ণ সঠিক আক্বীদা সম্পন্ন নেক আমলকারী ব্যক্তির কাছ থেকে অস্বাভাবিক কর্মকান্ড প্রকাশ পাওয়া।

এখানে আমরা 'অস্বাভাবিক কর্মকান্ড' বলে ঐ সমস্ত বিষয় এর থেকে বের করে দিয়েছি যে সমস্ত কর্মকান্ড স্বভাবিক ভাবে ঘটে থাকে।

আর 'নবুওয়াতের দাবীর সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে' এ কথার মাধ্যমে নবীদের মু'জিযাসমূহ এর গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে।

অনুরূপভাবে 'নবুওয়াতের দাবীর প্রারম্ভিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে' এ কথা দ্বারা 'ইরহাস' তথা নবুওয়াতের পূর্বে যে সমস্ত অস্বাভাবিক কর্মকান্ড প্রকাশ পায় সে সমস্ত বস্তুও এ সংজ্ঞা থেকে বের হয়ে যাবে।

তদ্রূপ 'কোন ব্যাহ্যিক সৎপরায়ণ সঠিক আক্বীদা সম্পন্ন নেক আমলকারী' এ কথা দ্বারা যে সমস্ত কর্মকান্ড যাদুকর এবং গণকদের দ্বারা সংঘটিত হয় সেগুলো এ সংজ্ঞার আওতা বহির্ভূত হয়ে যাবে; কেননা তা যাদু ও ভেলকি হিসাবে গণ্য হবে।

অলীদের কারামাত অনেক। তম্মধ্যে এমন কিছু কারামাত আছে যেগুলো পূর্ববর্তী জাতি সমূহের নেককার লোকদের হাতে ঘটেছিল।

তম্মধ্যে আল্লাহ মারইয়াম আলাইহাস সালাম সম্পর্কে জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يَمَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا قَالَتْ هُوَ مِنْ عِندِ اللهِ (آل عمران: ۳۷)
“যখনই যাকারিয়া তার কক্ষে প্রবেশ করত তখনই তার নিকট খাদ্য-সামগ্রী দেখতে পেত। তিনি বলতেনঃ 'হে মারইয়াম! এ সব তুমি কোথায় পেলে'? মারইয়াম বলতেন: 'তা আল্লাহর নিকট হতে'। [সূরা আলে ইমরান: ৩৭]

অনুরূপভাবে আসহাবে কাহাফ তথা গর্তের অধিবাসীদের ঘটনা আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে বর্ণনা করেছেন।

এ উম্মাতের অলীদের যে সমস্ত কারামাত সংঘটিত হয়েছিল তম্মধ্যে রয়েছে: প্রখ্যাত সাহাবী উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা। তিনি সূরা কাহাফ পড়ছিলেন, তখন আকাশ থেকে ছায়ার মত অবতীর্ণ হচ্ছিল যাতে ছিল চেরাগের আলোর সমাহার। মূলত: তারা ছিল ফিরিস্তা, তারা তার পড়া শুনতে অবতীর্ণ হয়েছিল।

অনুরূপভাবে ফিরিশতাগণ ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সালাম জানাতেন।

সালমান ও আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কোন এক প্লেটে খাবার খাচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় তাদের প্লেট তাসবীহ পাঠ করেছিল অথবা তাদের প্লেটে যা ছিল সেগুলো তাসবীহ পাঠ করেছিল।

খুবাইব ইবনে আদী রাদিয়াল্লাহু আনহু পবিত্র মক্কার মুশরিকদের নিকট বন্দী ছিলেন, তার কাছে আঙুর আসত আর তা তিনি খেতেন অথচ মক্কায় তখন কোন আঙুরই ছিলনা।

আল'আলা আল-হাদরামী রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাবাহিনী নিয়ে সাগরের উপর তাদের ঘোড়া সহ পার হয়ে গেলেন অথচ তাদের ঘোড়ার লাগামও ভিজলনা।

আসওয়াদ আল-আনাসী যখন নবুওয়াতের দাবী করেছিল তখন আবু মুসলিম আল-খাওলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার হাতে বন্দী হয়েছিলেন। সে তাকে বলল: তুমি কি আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে সাক্ষ্য দিবে? তিনি বললেন : আমি শুনিনা। সে বলল: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ হাঁ। তখন সে আগুন জালানোর নির্দেশ দিল, তারপর তাকে সে আগুনে নিক্ষেপ করল, কিন্তু তারা তাকে দেখতে পেল যে, সে আগুনের মাঝে নামায পড়ছে। সে আগুন তার জন্য শীতল ও আরামদায়ক বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এ ছাড়াও জীবনী গ্রন্থ ও ইতিহাস গ্রন্থে এ ধরণের আরো অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

মু'জিযা ও কারামাতের মধ্যে পার্থক্য:

মু'জিযা ও কারামাতের মধ্যে পার্থক্য হলো: মু'জিয়ার সাথে নবুওয়াতের দাবী সংশ্লিষ্ট থাকবে। অপর পক্ষে কারামাতের অধিকারী ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবী করবেনা, বরং তার কারামত অর্জনের কারণই হচ্ছে নবীর অনুসরণ ও তার শরীয়তের উপর অটল থাকা। সুতরাং মু'জিযা হলো নবীর, আর কারামাত হলো অলীর। তবে দু'টোর মধ্যেই অস্বাভাবিক কর্মকান্ড আছে।

আলেমদের কোন কোন ইমাম মত প্রকাশ করেছেন যে, মূলত অলীদের কারামাত নবীর মু'জিযার অন্তর্ভুক্ত; কেননা অলী কেবলমাত্র রাসূলের অনুসরণের কারণেই কারামাত লাভ করেছে, সুতরাং প্রত্যেক অলীর কারামাত ঐ নবীর মু'জিযা হিসাবে ধরা হবে যার শরীয়তের উপর সে আল্লাহর ইবাদাত করে।

এ থেকে একথা স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে, নবীদের অস্বাভাবিক কর্মকান্ডকে মু'জিযা বলা আর অলীদের অস্বাভাবিক কর্মকান্ডকে কারামাত বলা, এ দুটি মূলত পারিভাষিক অর্থ, কুরআন ও সুন্নায় তার অস্তিত্ব নেই। বরং আলেমগণ পরবর্তীকালে এ দু'টি পরিভাষা নির্ধারণ করে নিয়েছেন। যদিও এগুলোর মূলদাবী কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত দলীলসমূহের দিকেই ফিরে যায় যা বাস্তব সত্য হিসাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত।

মু'জিযা ও কারামাতের উপর ঈমান আনার হুকুম : নবীদের মু'জিযা এবং অলীদের কারামাতের উপর ঈমান আনা ঈমানের মূলনীতিগুলোর মধ্য হতে একটি মূলনীতি। যা কুরআন হাদীসের দলীল দ্বারা প্রমাণিত, আর বাস্তবেও তা দেখা যায়। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উপর এগুলোর বিশুদ্ধতা এবং এগুলো যে বাস্তব তা বিশ্বাস করা ওয়াজিব। অন্যথায় এগুলোর কোন কিছু মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হলে অথবা এগুলোর কোন কিছু অস্বীকার করলে কুরআন ও হাদীসের দলীলসমূহকে পরিত্যাগ করা হয়, বাস্তবের সাথে সংঘর্ষ তৈরী হয় এবং এ ক্ষেত্রে দ্বীনের ইমাম ও মুসলমানদের আলেমগণ যে আদর্শের উপর ছিলেন সে আদর্শ থেকে বড় ধরণের বিচ্যুতি ঘটে। আল্লাহ তা'আলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
¹ তাক্সীরে ইবনে কাসীর (৩/৪৩৬)。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00