📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ

📄 দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ


দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূল বলতে বুঝায়ঃ অত্যন্ত সাবধানী ও ধৈর্য্যশীল রাসূলদেরকে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُوا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ (الأحقاف: ٣٥).
"সুতরাং আপনি ধৈর্য্য ধারণ করুন যেমনটি ধৈর্য্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ”। [সূরা আল-আক্বাফঃ ৩৫]

দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলতে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ কেউ বলেনঃ এখানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূল বলতে সমস্ত রাসূলগণকেই বুঝানো হয়েছে। আর তখন مِنَ الرُّسُلِ শব্দদ্বয়ের (من) দ্বারা কিছু সংখ্যক না বুঝিয়ে শ্রেণী বুঝানো উদ্দেশ্য হবে। ইবনে যায়েদ বলেনঃ 'সমস্ত রাসূলই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন, আল্লাহ তা'আলা কেবলমাত্র দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, অত্যন্ত সাবধানী, বুদ্ধিসম্পন্ন এবং পূর্ণ বিবেকবান লোকদেরকেই নবী হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন'।

কেউ কেউ বলেনঃ তারা পাঁচজনঃ নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, 'ঈসা এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিম ওয়া সাল্লাম। ইবনে আব্বাস বলেনঃ 'দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূল হলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নূহ, ইব্রাহীম, মূসা ও 'ঈসা'। মুজাহিদ, 'আতা আল খোরাসানী ও এ মত পোষণ করেন আর পরবর্তী অনেক আলেম এ মত গ্রহণ করেছেন।

আল্লাহ এ পাঁচজনকে কুরআনের দু'টি স্থানে এক সাথে উল্লেখ করেছেন। উপরোক্ত মতের সমর্থনে এর দ্বারাই দলীল নেয়া হয়ে থাকে। প্রথমটি সূরা আল-আহযাবে, মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّنَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِينَا فَا غَلِيظًا (الأحزاب : ٧)
"আর স্মরণ করুন যখন আমরা নবীদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার থেকেও এবং নূহ, ইব্রাহীম, মূসা ও মারইয়াম পুত্র 'ঈসা থেকেও, আর তাদের নিকট থেকে আমরা গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার। [সূরা আল-আহযাবঃ ৭]

দ্বিতীয়টি সূরা আশ-শুরায়, মহান আল্লাহ বলেনঃ
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَطَى بِهِ نُوحًا وَ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ﴾ (الشورى: ۱۳)
"তিনি তোমাদের জন্য শরীয়ত হিসাবে প্রবর্তন করেছেন এমন এক দ্বীন যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে, আর যা আমি আপনার নিকট ওহী করে পাঠিয়েছি, এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও 'ঈসাকে এ বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর, এতে মতভেদ করোনা। [সূরা আশ-শুরাঃ ১৩]

কোন কোন মুফাস্সির বলেনঃ 'তাদেরকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলোঃ এ কথা জানিয়ে দেয়া যে, তাদের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে কারণ তারা বিখ্যাত শরীয়তসমূহের ধারক বাহক, আর তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলদের অন্তর্গত।

আর এ পাঁচ জনই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাসূল এবং বনী আদমের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তিত্ব। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ "আদম সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন পাঁচ জনঃ নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, 'ঈসা, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিম ওয়া সাল্লাম, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন মুহাম্মাদ, আল্লাহ তার উপর দরূদ ও সালাম পাঠ করুন, অনুরূপভাবে তাদের সবার উপরও দরূদ ও সালাম পাঠ করুন"¹。

তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এর প্রমাণ ইমাম বুখারী কর্তৃক আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أنا سيد ولد آدم يوم القيامة وأول من ينشق عنه القبر وأول شافع وأول مشفع)
“আমিই ক্বিয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তানের নেতা, আর আমার কবরই প্রথম বিদীর্ণ হবে, আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং আমিই ঐ সর্বপ্রথম ব্যক্তি যার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে”¹。

টিকাঃ
¹ ইমাম বায্যার হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, দেখুনঃ কাশফুল আসতার (৩/১১৪), ইমাম হাইছামী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ (৮/২৫৫), এবং বলেনঃ এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সহীহ হাদীসের বর্ণনা কারী। ইমাম হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ বিশুদ্ধ সনদে, ইমাম যাহাবী তাঁর মত সমর্থন করেছেন, মুসতাদরাকঃ হাকিম (২/৫৪৬)。
¹ ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেন (হাদীস নং ২২৭৮), আবু দাউদ (৫/৩৮ হাদীস নং ৪৬৭৩)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্যসমূহ, উম্মতের উপর তার অধিকারসমূহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখা যে হক তার বর্ণনা

📄 আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্যসমূহ, উম্মতের উপর তার অধিকারসমূহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখা যে হক তার বর্ণনা


প্রথমতঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্যসমূহঃ

মহান আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনেক বৈশিষ্ট্য ও সম্মানে বিশেষিত করে অন্যান্য রাসূলদের উপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সমস্ত সৃষ্টিজগত থেকে স্বতন্ত্র করেছেন। তম্মধ্যে রয়েছেঃ

১. তার রিসালাত জ্বিন ও মানব সবার জন্য; সুতরাং তাদের কারো পক্ষে তার অনুসরণ ও তার রিসালতের উপর ঈমান আনা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿وَمَا أَرْسَلْنَكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا ﴾ (سبا: ২৮)
"আমরা তো আপনাকে সমস্ত লোকের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি”। [সূরা সাবা'ঃ ২৮]

তিনি আরো বলেনঃ
﴿تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَلَمِينَ نَذِيرًا ﴾ (الفرقان : ١)
"বরকতময় তিনি যিনি তার বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যাতে তিনি সৃষ্টি জগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন”। [সূরা আল- ফুরকানঃ ১]

ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেনঃ এ আয়াতে )العالمين( 'আলআলামীন' দ্বারা জ্বিন ও মানবকে বুঝানো হয়েছে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ
فضلت على الأنبياء بست أعطيت جوامع الكلم، ونصرت بالرعب، وأحلت لي الغنائم، وجعلت لي الأرض طهوراً ومسجداً، وأرسلت إلى الخلق كافة، وختم بي النبيون)¹
“আমাকে নবীদের উপর ছয়টি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে, আমাকে ব্যাপকার্থ বোধক পূর্ণ বাক্যসমূহ প্রদান করা হয়েছে, আমাকে (শত্রুদের মনে) ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে সাহায্য করা হয়েছে, আমার জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হালাল করা হয়েছে, আমার জন্য যমীনকে পবিত্র ও মসজিদ বানিয়ে দেয়া হয়েছে, আমাকে সমস্ত সৃষ্টি জগতের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমার দ্বারা নবীদের ধারার পরিসমাপ্তি করা হয়েছে”।

ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ
(والذي نفس محمد بيده لا يسمع بي أحد من هذه الأمة يهودي ولا نصراني، ثم يموت ولم يؤمن بالذي أرسلت به إلا كان من أصحاب النار)²
‘যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ করে বলছি, এ উম্মাতের যে কেউ চাই সে ইয়াহুদী হোক বা নাছারা হোক আমার কথা শুনবে তারপর আমাকে যা দিয়ে পাঠানো হয়েছে তার উপর ঈমান না আনা অবস্থায় মারা যাবে সে অবশ্যই জাহান্নামের অধিবাসী হবে।

২. কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসূল, মহান আল্লাহ বলেনঃ
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِينَ (الأحزاب: ٤٠)
"মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী”। (সূরা আল-আহযাবঃ ৪০]

বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ
إن مثلي ومثل الأنبياء من قبلي كمثل رجل بني بيتاً فأحسنه وأجمله، إلا موضع لبنة من زاوية، فجعل الناس يطوفون به ويعجبون له ويقولون: هلا وضعت هذه اللبنة؟ قال: فأنا اللبنة وأنا خاتم النبيين)¹
'আমার এবং আমার পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীদের উদাহরণ হলো এমন লোকের মত যে একটি ঘর বানিয়ে তাকে সুন্দর পরিপাটি করেছে, এর এক কোণে এক ইট পরিমাণ স্থান ব্যতীত। ফলে মানুষ এ ঘরের পাশে ঘুরাফিরা করতে শুরু করল, এবং এ ব্যাপারে তাদের বিস্ময় প্রকাশ করে বলতে লাগলঃ কেন এ ইটটি রাখা হলোনা? তিনি বললেনঃ আমিই সে ইট, আর আমিই শেষ নবী'।

এ সমস্ত কুরআন ও হাদীসের দলীল প্রমাণাদির উপর ভিত্তি করে এ বিশ্বাসের উপর উম্মাতের পূর্বাপর সবার ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনুরূপভাবে তারা এ ব্যাপারেও একমত হয়েছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে যে কেউ নবুওয়াতের দাবী করবে সে কাফের বলে বিবেচিত হবে। যদি সে তার দাবীর উপর অটল থাকে, তবে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হবে। আলুসী বলেনঃ 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নবী হওয়ার ব্যাপারে কুরআন সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে, রাসূলের হাদীসে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে এবং এর উপর উম্মাতের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং এর বিপরীত দাবীদার কাফির বলে পরিগণিত হবে, যদি এর উপর অটল থাকে তাকে হত্যা করা হবে'।

৩. আল্লাহ তা'আলা তাকে সবচেয়ে বড় মু'জিযা ও সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে সাহায্য করেছেন, আর তা হচ্ছে মহান কুরআন, যা আল্লাহর বাণী, যাবতীয় পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত, যতদিন উঠে যাওয়ার জন্য আল্লাহর নির্দেশ না হবে ততদিন তা এ উম্মতের মধ্যে বাকী থাকবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
قُل لين اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنِّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهيرا (الإسراء: ۸۸)
"বলুন, যদি এ কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জ্বিন পরস্পর সমবেত হয় এবং যদিও তারা একে অপরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না”। (সূরা আল- ইসরা'ঃ ৮৮)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
۞أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ يُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَىٰ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ (আল-আনকাবুত: ৫১)
“এটা কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, আমরা আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যা তাদের নিকট পাঠ করা হয়, এতে অবশ্যই অনুগ্রহ ও উপদেশ রয়েছে সে জাতির জন্য যারা ঈমান আনে”। [সূরা আল-আনকাবুতঃ ৫১]

বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
(ما من الأنبياء نبي إلا أعطي من الآيات ما مثله آمن عليه البشر، وإنما كان الذي أوتيته وحياً أوحاه الله إلي، فأرجو أن أكون أكثرهم تابعاً يوم القيامة)
'প্রত্যেক নবীকেই এমন সব নিদর্শন দেয়া হয়েছে যার উপর মানুষ ঈমান এনেছে, আমাকে যা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে আল্লাহ আমার কাছে যে বাণী পাঠিয়েছেন সে বাণী সম্বলিত ওহী, সুতরাং আমি আশা করি ক্বিয়ামতের দিন তাদের সবার থেকে বেশী অনুসারীর অধিকারী হব'¹。

৪. তার উম্মাত সমস্ত উম্মাত হতে শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বেশী জান্নাতের অধিবাসী। মহান আল্লাহ বলেনঃ
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ ۗ ﴿آل عمران: ١١٠﴾
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে, তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান করবে, অসৎকার্যে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে”। [সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০]

অনুরূপভাবে মুয়াবিয়া ইবনে হাইদাহ আল-কুশাইরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর বাণীঃ
وَ كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ 1
এ আয়াত সম্পর্কে বলতে শুনেছিঃ
(إنكم تتمون سبعين أمة أنتم خيرها وأكرمها على الله)
“তোমরা সত্তরটি জাতিকে পূর্ণ করবে, তাদের সবার মধ্যে তোমরাই আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম ও বেশী সম্মানিত”¹。

বুখারী ও মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একটি গম্বুজের নীচে ছিলাম ইত্যবসরে তিনি বললেনঃ
(أترضون أن تكونوا ربع أهل الجنة). قلنا : نعم. قال: (أترضون أن تكونوا ثلث أهل الجنة). قلنا نعم. قال: (أترضون أن تكونوا شطر أهل الجنة). قلنا: نعم. قال: (والذي نفس محمد بيده إني لأرجو أن تكونوا نصف أهل الجنة وذلك أن الجنة لا يدخلها إلا نفس مسلمة وما أنتم في أهل الشرك إلا كالشعرة البيضاء في جلد الثور الأسود، أو كالشعرة السوداء في جلد الثور الأحمر)
“তোমরা জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হলে কি সন্তুষ্ট হবে?” আমরা বললামঃ হাঁ, তিনি বললেনঃ “তোমরা জান্নাতের এক তৃতীয়াংশ হলে কি সন্তুষ্ট হবে?” আমরা বললামঃ হাঁ, তিনি বললেনঃ "তোমরা জান্নাতের অর্ধেক হলে কি সন্তুষ্ট হবে?” আমরা বললামঃ হাঁ, তিনি বললেনঃ "যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ করে বলছিঃ অবশ্যই আমি আশা করি তোমরা জান্নাতের অর্ধেক হবে; আর সেটা এজন্যই যে, জান্নাতে কেবলমাত্র মুসলিম ব্যক্তিই প্রবেশ করবে, শির্ককারীদের সাথে তোমাদের অনুপাত হবে কালো ষাঁড়ের চামড়ায় একটি সাদা চুলের মত, অথবা লাল ষাঁড়ের চামড়ায় কালো চুলের মত"²。

৫. ক্বিয়ামতের দিন তিনি সমস্ত বনী আদমের সর্দার; আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أنا سيد ولد أدم يوم القيامة وأول من ينشق عنه القبر وأول شافع وأول مشفع)
"আমি কিয়ামতের দিন সমস্ত বনী আদমের সর্দার, আমার কবরই প্রথম বিদীর্ণ হবে (হাশরের মাঠে যাওয়ার জন্য), আমিই প্রথম সুপারিশকারী আর আমার সুপারিশই প্রথম কবুল করা হবে"¹。

৬. তিনি মহাসুপারিশের অধিকারী। আর তাহলো যখন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাসূলগণ সুপারিশ করা থেকে নিজেদের অপারগতা পেশ করবেন তখন তিনি হাশরের মাঠে অবস্থানকারীদের মধ্যে বিচার ফয়সালা করার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। মহান আল্লাহর বাণীঃ
عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا (الإسراء: ٧٩)
"আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে”। [সূরা আল-ইসরাঃ৭৯]

এখানে “মাকামে মাহমুদ তথা প্রশংসিত স্থান" বলতে এ বড় সুপারিশের কথাই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। হুযাইফা, সালমান, আনাস, আবু হুরায়রা, ইবনে মাস'উদ, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ, ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, ক্বাতাদা প্রমূখ সাহাবা, তাবেয়ীদের একাংশ "মাকামে মাহমুদ” তথা প্রশংসিত স্থানের তাফসীর করেছেন বড় সুপারিশ। ক্বাতাদা বলেনঃ 'কিয়ামতের দিন তার সুপারিশকে 'আলেমগণ মাকামে মাহমুদ বলে মত প্রকাশ করতেন'।

রাসূলের সুন্নাহ দিয়েও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বিয়ামতের মাঠে অবস্থানকারীদের জন্য সুপারিশ করবেন; যেমনটি শাফা'আতের বড় হাদীসে এসেছে, যা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আদম তারপর নূহ তারপর ইব্রাহীম তারপর মূসা তারপর 'ঈসা সুপারিশ করার অনুরোধ কবুল করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন এবং প্রত্যেকেই বলবেনঃ "আমি এ কাজের জন্য নই”, শেষ পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ
فَيَأْتُونِي فَأَنْطَلِقُ، فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي فَيُؤْذَنُ لِي عَلَيْهِ، فَإِذَا رَأَيْتُ رَبِّي وَقَعْتُ لَهُ سَاجِدًا فَيَدَعُنِي مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَدَعَنِي، ثُمَّ يُقَالُ لِي: اِرْفَعْ مُحَمَّدُ، قُلْ يُسْمَعْ، وَسَلْ تُعْطَهْ، وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَحْمَدُ رَبِّي بِمَحَامِدَ عَلَّمَنِيهَا ثُمَّ أَشْفَعُ ...
“তারপর তারা আমার কাছে আসার পরে আমি যাব এবং আমার প্রভুর কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইব, তখন আমাকে অনুমতি দেয়া হবে, আমি আমার প্রভুকে দেখা মাত্রই সিজদায় পড়ে যাব, তারপর যতক্ষণ আল্লাহর ইচ্ছা আমাকে এ অবস্থায় থাকতে দিবেন। তারপর আমাকে বলা হবেঃ মুহাম্মাদ উঠুন, আপনি বলুন, আপনার কথা শুনা হবে, আপনি চান আপনাকে দেয়া হবে, আর আপনি সুপারিশ করুন আপনার সুপারিশ কবুল করা হবে। তারপর আমার প্রভু আমাকে যে প্রশংসা শিক্ষা দিয়েছেন তা দিয়ে আমি তার প্রশংসা করব, তারপর সুপারিশ করব...'¹。

৭. তিনি প্রশংসার ঝান্ডার অধিকারী। সেটা এক বাস্তব ঝান্ডা, কিয়ামতের দিন তিনি তা বহন করার বিশেষত্ব পাবেন। আর সমস্ত মানুষ তার অনুসারী হবে, তার ঝান্ডার নীচে থাকবে।

কোন কোন আলেম বলেনঃ তাকে এ ঝান্ডা দিয়ে বিশেষভাবে সম্মানিত করার কারণ হলোঃ তিনি আল্লাহর এমন প্রশংসা করবেন তিনি ব্যতীত আর কেউ তাকে তেমন প্রশংসা করতে সক্ষম হবে না। রাসূলের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি এ মহান সম্মানে ভূষিত হওয়ার বৈশিষ্ট্য অর্জন করবেন। আবু সা'ঈদ আল- খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أنا سيد ولد آدم يوم القيامة، وبيدي لواء الحمد ولا فخر، وما من نبي يومئذ آدم فمن سواه، إلا تحت لوائي، وأنا أول من تنشق عنه الأرض ولا فخر)
"আমি কিয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তানের সর্দার, আমার হাতে থাকবে প্রশংসার ঝান্ডা, আর আমি তা গর্ব করে বলছিনা, আদম ও অন্যান্য সকল নবীই আমার ঝান্ডার নীচে থাকবে, আমিই প্রথম যার জন্য যমীন বিদীর্ণ হবে। আমি তা গর্ব করে বলছি না”¹。

৮. তিনিই অসীলার অধিকারী, আর তা হলো জান্নাতের এক উচ্চাসন, যা কেবলমাত্র একজনের জন্যই নির্ধারিত। তা জান্নাতের সর্বোচ্চ সোপান।

আব্দুল্লাহ ইবনে 'আমর ইবনুল 'আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ
(إذا سمعتم المؤذن فقولوا مثل ما يقول ثم صلوا عليّ، فإنه من صلى علي صلاة صلى عليه الله بها عشراً، ثم سلوا الله لي الوسيلة، فإنها منزلة في الجنة لا تنبغي إلا لعبد من عباد الله، وأرجو أن أكون أنا هو فمن سأل لي الوسيلة حلت له الشفاعة)
"যখন তোমরা মুআজ্জিনের আজান শুনতে পাও তখন সে যে রকম বলে সেরকম বলো। তারপর আমার উপর দরূদ পাঠ করিও; কেননা যে আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তার বিনিময়ে তার উপর দশবার দরূদ পাঠ করেন, তারপর তোমরা আমার জন্য অসীলার দো'আ করো; কেননা তা জান্নাতের এমন এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানের নাম যা কেবল আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এক বান্দার জন্যই সমীচিন হবে, আর আমি আশা করি সে ব্যক্তিটি আমিই হবো, সুতরাং যে কেউ আমার জন্য অসীলার প্রার্থনা করবে তার জন্য আমার সুপারিশ হালাল হয়ে যাবে”²。

এ ছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যান্য আরো অনেক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মহান মর্যাদা রয়েছে, যেগুলো প্রমাণ করছে যে, তিনি তার প্রভুর কাছে অনেক সম্মানিত আর দুনিয়া ও আখেরাতে অধিক উচ্চাসন সম্পন্ন।

দ্বিতীয়তঃ উম্মাতের উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিকারসমূহঃ

উম্মাতের উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক অধিকার রয়েছে। ইতিপূর্বে সমস্ত রাসূলদের প্রতি উম্মাতের অবশ্য পালনীয় যে সাধারণ অধিকার রয়েছে, সেগুলো আলোচনার সময় তার কিছু উল্লেখ করা হয়েছে। নীচে উম্মাতের উপর তার যে বিশেষ হক্ক রয়েছে তার কিছু পেশ করা হচ্ছেঃ

১. তার নবুওয়াত ও রিসালতের উপর বিস্তারিত ঈমান আনয়ন করা, আর এ কথা বিশ্বাস করা যে, তার রিসালত পূর্ববর্তী সমস্ত রিসালতকে রহিত করে দিয়েছে, যার অর্থ হচ্ছেঃ তিনি যা কিছু সম্পর্কে খবর দিয়েছেন তা বিশ্বাস করা, যা নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা, যা থেকে নিষেধ ও সাবধান করেছেন তা পরিত্যাগ করা এবং তার প্রদর্শিত পদ্ধতি ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদাত না করা।

এর উপর কুরআন ও সুন্নায় অনেক দলীল-প্রমাণাদী রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
فَامِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَالنُّورِ الَّذِي أَنْزَلْنَا (التغابن : ٨).
"সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ও যে জ্যোতি আমরা অবতীর্ণ করেছি তার উপর ঈমান আনয়ন কর"। [সূরা আত-তাগাবুনঃ ৮]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
فَامِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللهِ وَكَلِمَتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمُ تَهْتَدُونَ (الأعراف: ١٥٨)
"অতএব তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর বার্তাবাহক উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তার বাণীতে ঈমান আনেন এবং তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা সঠিক পথ পাও”। [সূরা আল-আ'রাফঃ১৫৮]

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَمَا انْتَكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا (الحشر:7)
"আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক”। [সূরা আল-হাশরঃ ৭]

অনুরূপভাবে ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إله إلا الله، وأن محمداً رسول الله، ويقيموا الصلاة ويؤتوا الزكاة، فإذا فعلوا ذلك عصموا مني دماءهم وأموالهم إلا بحق الإسلام وحسابهم على الله)¹
"আমাকে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ সাক্ষ্য দেয়া পর্যন্ত যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে। যদি তারা তা করে তখন আমার থেকে তারা তাদের রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ রাখবে, ইসলামের হক্ক ব্যতীত, আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর"।

২. এ কথার উপর ঈমান আনা ওয়াজিব যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিসালাতের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করেছেন, তার উপর অর্পিত আমানত আদায় করেছেন, উম্মাতকে সংশোধন করনের নিমিত্তে নসীহত করেছেন।

সুতরাং তিনি যাবতীয় ভাল বিষয়ই উম্মাতকে দেখিয়ে গেছেন এবং করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। আর যা কিছু খারাপ আছে তা থেকে উম্মাতকে নিষেধ করে গেছেন এবং সাবধান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴾ (المائدة : ٣)
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাংগ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৩]

অনুরূপভাবে আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
... وأيم الله لقد تركتكم على مثل البيضاء، ليلها ونهارها سواء)
"...আর আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমাদেরকে এমন স্বচ্ছ শুভ্রতার মধ্যে রেখে যাচ্ছি যার দিন ও রাত্রি স্বচ্ছতার দিক দিয়ে একই রকম”²。

আর সাহাবায়ে কিরাম নবীর প্রচার কার্যের পক্ষে সবচেয়ে বড় সম্মেলনে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যখন তিনি বিদায় হজ্জের দিন তার যুগান্তকারী মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়েছিলেন এবং তাদের উপর আল্লাহ কি ওয়াজিব করেছেন ও কি হারাম করেছেন তা বর্ণনা করেছেন, আর তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে অসীয়ত করেছেন। সবশেষে বললেনঃ
(وأنتم تسألون عني فما أنتم قائلون). قالوا: نشهد أنك قد بلغت وأديت ونصحت. فقال بإصبعه السبابة يرفعها إلى السماء وينكتها إلى الناس: (اللهم اشهد اللهم اشهد ثلاث مرات)¹
"তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। তখন তোমরা কি বলবে?” তারা বললঃ আমরা সাক্ষ্য দেব যে, অবশ্যই আপনি প্রচার করেছেন, আদায় করেছেন এবং নসীহত করেছেন। তারপর তিনি তার শাহাদত অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠালেন এবং মানুষের দিকে নামিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষ্য থাক, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষ্য থাক, তিন বার”।

আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এমন অবস্থায় রেখে গেছেন যে, আকাশে কোন পাখি তার দু' ডানা মেলে নড়াচড়া করলে তার সম্পর্কেও তিনি আমাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন”²。

এ ব্যাপারে সলফে সালেহীনদের থেকে অনেক বাণী রয়েছে।

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসা, তার ভালবাসাকে নিজের এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতের ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেয়া। যদিও সমস্ত নবী ও রাসূলদের ভালবাসা ওয়াজিব, তবুও আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য এ ভালবাসার বিশেষত্ব রয়েছে। আর সে জন্যই তার ভালবাসা সমস্ত মানুষের ভালবাসা তথা সন্তান-সন্ততি, পিতামাতা ও অন্যান্য যাবতীয় আত্মীয় স্বজন বরং নিজকে ভালবাসার উপরও প্রাধান্য দেয়া ওয়াজিব। মহান আল্লাহ বলেনঃ
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادِ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ (التوبة : ٢٤).
"বলুনঃ তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জ্বিহাদ করা অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয় তোমাদের পিতৃবর্গ, তোমাদের সন্তানগণ, তোমাদের ভ্রাতাগণ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করছো, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। বস্তুত আল্লাহ দূরাচারী সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না”। [সূরা আত-তাওবাহঃ২৪]

এখানে মহান আল্লাহ তাঁর ভালবাসার সাথে তাঁর রাসূলের ভালবাসাকে একসাথে উল্লেখ করেছেন এবং যার কাছে তার সম্পদ, পরিবার-পরিজন, সন্তান- সন্ততি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে বেশি প্রিয় হয় তাকে ধমক দিয়ে বলছেনঃ "তবে অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত, বস্তুত আল্লাহ দূরাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না"।

অনুরূপভাবে বুখারী ও মুসলিমে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده وولده والناس أجمعين)¹
"তোমাদের কেউই মু'মিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার কাছে আমি তার পিতা মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয় না হব”।

অনুরূপভাবে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার কাছে আমার নিজেকে ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে বেশী প্রিয়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ
لا والذي نفسي بيده حتى أكون أحب إليك من نفسك. فقال له عمر: فإنه الآن والله لأنت أحب إلى من نفسي. فقال النبي ﷺ: (الآن يا عمر).¹
"না, যার হাতে আমার জান তার শপথ করে বলছি, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার কাছে তোমার নিজের চেয়েও বেশী প্রিয় না হব ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না"। তারপর উমর বললেনঃ "এখন অবশ্যই আপনি আমার কাছে আমার নিজের চেয়েও বেশী প্রিয়”। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "এখন হে উমর” (অর্থাৎ এখন তোমার ঈমান পূর্ণ হয়েছে)।

৪. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মান করা, তাকে মর্যাদা দেয়া এবং শ্রদ্ধা করা; কেননা এটা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সে প্রাপ্ত অধিকারসমূহের অন্তর্গত, যা আল্লাহ স্বীয় গ্রন্থে শিরোধার্য করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ ﴾ (الفتح : ٩)
"যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং তাকে সাহায্য- সহযোগিতা ও সম্মান কর”। [সূরা আল-ফাতহঃ ৯]

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ এখানে تعزروه অর্থঃ তাকে তোমরা শ্রদ্ধা কর, আর توقروه অর্থঃ তাকে তোমরা সম্মান কর। ক্বাতাদা বলেনঃ تعزروه অর্থঃ তাকে সাহায্য কর, আর توقروه দ্বারা আল্লাহ তাকে তাদের সর্দার বা নেতা বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।

অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللهِ وَرَسُولِهِ ﴾ (الحجرات: 1)
"হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে (কোন বিষয়ে) অগ্রণী হয়ো না”। [সূরা আল-হুজরাতঃ১]

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿ لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءَ بَعْضِكُمْ بَعْضًا ﴾ (النور: ٦٣)
"তোমরা রাসূলের আহবানকে তোমাদের একে অপরের প্রতি আহবানের মত গণ্য করো না। [সূরা আন-নূরঃ ৬৩]

মুজাহিদ বলেনঃ 'তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা তাকে নম্র ও ভদ্রভাবে ডাকবেঃ হে আল্লাহর রাসূল!, কঠোর ভাবে হে মুহাম্মাদ! বলবেনা'। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মানের ব্যাপারে সবচেয়ে চমৎকার নজীর সৃষ্টি করেছিলেন। উসামা ইবনে শারীক বলেনঃ 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলাম, তিনি সাহাবা বেষ্টিত ছিলেন, মনে হলো যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে' (অর্থাৎ কোন প্রকার নড়া চড়া নেই)।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার জীবিতাবস্থার মত মৃত্যুর পরেও সম্মান করা ওয়াজিব। ক্বাজী 'ইয়াদ বলেনঃ 'মনে রাখবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর তাকে সম্মান করা, শ্রদ্ধা করা এবং উঁচু মর্যাদা দেয়া অবশ্য কর্তব্য যেমনিভাবে তার জীবদ্দশায় ছিল। আর তা করতে হবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উল্লেখ করার সময়, তার হাদীস ও সুন্নাহ বর্ণনা করার সময়, তার নাম ও চরিত শুনার সময়, তার স্বজন ও বংশধরদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবাদের সম্মান করার সময়'।

৫. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত ও সালাম পাঠ করা। আর তা বেশী বেশী করা; যেমনটি আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (الأحزاب: ٥٦)
"অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর ফিরিস্তাগণ নবীর উপর সালাত পাঠ করেন, হে মু'মিনগণ তোমরা তার উপর সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম দাও”। [সূরা আল-আহযাবঃ ৫৬]

মুবাররাদ বলেনঃ 'সালাত শব্দের আসল অর্থ হলোঃ রহমত করা, সুতরাং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত, ফিরিস্তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে করুণা ও রহমত চাওয়া'।

অনুরূপভাবে আব্দুল্লাহ ইবনে 'আমর ইবনে 'আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
‎(من صلى علي صلاة صلى الله عليه بها عشراً)‎
"যে আমার উপর একবার সালাত পাঠ করবে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার উপর দশবার সালাত পাঠ করবেন"¹。

আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ
‎(البخيل الذي من ذكرت عنده فلم يصل علي)‎
"বড় কৃপণ হলো ঐ ব্যক্তি যার কাছে আমার উল্লেখ করা হলো তারপর সে আমার উপর দরূদ পাঠ করলোনা"²。

যদিও সমস্ত নবী-রাসূলগণের উপরই সালাত ও সালাম দেয়া বৈধ, যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষেত্রে খুব বেশী তাগিদ দেয়া হয়েছে। আর সেটা উম্মাতের উপর তার মহান দাবীসমূহের অন্যতম। তাই তা তাদের উপর ওয়াজিব। আর এজন্যই আমরা এখানে উম্মাতের উপর তার যে বিশেষ বিশেষ হক্ব বা অধিকারসমূহ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখ করলাম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ পড়া যে ওয়াজিব তা আলেমগণ সুস্পষ্টভাবে বলে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আবার এ ব্যাপারে উম্মাতের ইজমা' তথা ঐক্যমত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন। ক্বাজী 'ইয়াদ বলেনঃ 'জেনে রাখ যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কোন সময়ের সাথে নির্দিষ্ট না করে দরূদ পড়া সার্বিকভাবে ফরয; কেননা আল্লাহ তা'আলা তার উপর দরূদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইমাম ও আলেমগণ তা ওয়াজিব বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং এর উপর তারা একমত হয়েছেন'।

৬. ইতিপূর্বে প্রথম পরিচ্ছেদের শুরুতে বর্ণিত তার ব্যাপারে যে সমস্ত মহান গুণাবলী, সুমহান বৈশিষ্ট্য, সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা সাব্যস্ত হয়েছে ও এতদ্ব্যতীত আরো যা কিছু কুরআন ও সুন্নার দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলির স্বীকৃতি প্রদান করা, এ সবগুলোর উপর বিশ্বাস করা, এগুলো দিয়ে তার প্রশংসা করা, মানুষের কাছে প্রচার ও প্রসার করা, ছোটদেরকে তা শিক্ষা দেয়া এবং তাকে ভালবাসা, সম্মান করা এবং মহান আল্লাহর কাছে তার যে বিশেষ উচ্চ মর্যাদা রয়েছে সেগুলো তাদেরকে জানানোর মাধ্যমে তাদেরকে গড়ে তোলা।

৭. উপরোক্ত মর্যাদা ও সম্মানের বর্ণনায় বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন না করা এবং তা থেকে সাবধান থাকা; কেননা এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে উম্মাতের উদ্দেশ্যে এ ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যে,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا (الكهف : ١١٠).
"বলুনঃ আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই, আমার প্রতি ওহী আসে যে, তোমাদের মা'বুদ মাত্র একজন, সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের 'ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে”। [সূরা আল- কাহফঃ১১০]

আরো নির্দেশ দিয়েছেন যে,
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكُ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ ۚ (الأنعام: ٥٠).
"বলুনঃ আমি তোমাদেরকে এটা বলিনা যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, গায়েব সম্পর্কেও আমি অবগত নই আর তোমাদেরকে এটাও বলিনা যে, আমি ফেরেস্তা, আমার প্রতি যা ওহী আসে আমি শুধু তারই অনুসরণ করি"। [সূরা আল-আন'আমঃ ৫০]

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার উম্মাতের প্রতি এ কথার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল, রবুবীয়্যাহ তথা প্রভুত্ব জনিত গুণাগুণের কিছুই তার মধ্যে নেই। আবার তিনি ফিরিস্তাও নন, তিনি তো কেবলমাত্র তার প্রভুর নির্দেশ ও ওহীর অনুসরণ করেন। অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তার উম্মাতকে তার ব্যাপারে অতিরঞ্জন এবং তার প্রশংসা ও মান মর্যাদা নির্ধারণে সীমালংঘন করার ব্যাপারে সাবধান করে গেছেন; সহীহ বুখারীতে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
(لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم فإنما أنا عبده، فقولوا: عبدالله ورسوله)
"নাসারাগণ যেমন করে ইবনে মারইয়াম ('ঈসা)র অতিরিক্ত প্রশংসা করে সীমালংঘন করেছে তেমনিভাবে তোমরা আমার অতিরিক্ত প্রশংসা করে সীমালংঘন করো না; কেননা আমি তো তাঁর বান্দা। সুতরাং তোমরা বলঃ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল"¹。

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সীমাতিরিক্ত প্রশংসা বুঝাতে যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা হলোঃ الإطراء যার অর্থ বর্ণনায় ইবনুল আসীর বলেনঃ 'মিথ্যা প্রশংসা এবং প্রশংসায় সীমালংঘন করা'।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসল, তারপর তার সাথে কথাবার্তার এক পর্যায়ে বললঃ 'যা আল্লাহ চেয়েছেন এবং আপনি চেয়েছেন'! উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ
(أجعلتني الله نداً بل ما شاء الله وحده)
"তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়েছ? বরং (সঠিক হলো) একমাত্র আল্লাহ যা চেয়েছেন”²。

সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে অতিরঞ্জন ও তাকে তার সুনির্দিষ্ট মর্যাদার উপরে এমন স্থান দেয়া যা মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য নির্দিষ্ট, তা থেকে সাবধান করে গেছেন। এর মাধ্যমে তিনি উল্লেখিত বিষয়াদি ছাড়া অন্যান্য যাবতীয় সীমালংঘন জনিত বিষয়সমূহের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন; কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সীমালংঘন বা অতিরঞ্জনই হারাম।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট যে সমস্ত অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি শির্কের পর্যায়ে পৌঁছে দেয় তন্মধ্যে রয়েছেঃ তার কাছে দো'আ করা, এভাবে বলা যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমায় এরকম এরকম করে দিন; কেননা এটা দো'আ, আর দো'আ হলো ইবাদাত যা আল্লাহ ব্যতীত অপর কারো উদ্দেশ্যে করা জায়েয নেই।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট, সে সমস্ত অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ির মধ্যে আরো কিছু উদাহরণ হলোঃ তার উদ্দেশ্যে যবেহ করা, তার জন্য মানত করা, তার কবরের তাওয়াফ করা, তার কবরকে সালাত বা ইবাদাতের জন্য ক্বিবলা হিসাবে নির্ধারণ করা, সুতরাং এ সবগুলিই হারাম; কেননা তা ইবাদাত, আর আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি জগতের কারো উদ্দেশ্যে কোন প্রকার ইবাদাত করতে নিষেধ করেছেন, মহান আল্লাহ বলেনঃ
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ * لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ ﴾ (الأنعام: ١٦٢، ١٦٣).
"বলুনঃ আমার সালাত, আমার ইবাদাত (কুরবানী ও হজ্জ), আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশ্যেই, তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমি এর জন্যই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম মুসলমান”। [সূরা আল-আন'আমঃ ১৬২-১৬৩]

৮. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিকারসমূহের অন্যতম হচ্ছে তার সাহাবীগণকে ভালবাসা, তার পরিবার-পরিজন ও স্ত্রীগণকে শ্রদ্ধা করা, তাদেরকে বন্ধু ও মিত্র বলে মেনে নেয়া। তাদেরকে অসম্মানিত করা, গালি-গালাজ করা বা তাদের কারোর প্রতি কটাক্ষ করা থেকে দুরে থাকা।

কেননা মহান আল্লাহ এ উম্মাতের উপর তাঁর নবীর সাহাবীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ওয়াজিব করে দিয়েছেন এবং যারা তাদের পরে আসবে তাদের উপর সাহাবাদের জন্য ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করার এবং সাহাবাদের ব্যাপারে তাদের অন্তরে কোন প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ না রাখার জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করার আহবান জানিয়েছেন। তাই তিনি মুহাজির ও আনসারদের কথা উল্লেখ করার পর বললেনঃ
وَالَّذِينَ جَاءُو مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا عَلَالِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ ﴾ (الحشر : ١٠)
"আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর এবং মু'মিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রেখোনা। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি অত্যন্ত দয়ালু, রহমতকারী'"। [সূরা আল-হাশরঃ ১০]

আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার-পরিজনদের অধিকার সম্পর্কে আরো বলেনঃ
قُلْ لَا أَسْلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى (الشورى:۲۳)
"বলুনঃ আমি এর বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে আত্মীয়দের প্রতি সৌহার্দ্য ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাইনা”। [সূরা আশ-শূরাঃ ২৩]

এ আয়াতের তাফসীরে এসেছেঃ 'আপনার অনুসরণ করে এমন মু'মিনদের বলুনঃ আমি তোমাদের কাছে যা নিয়ে এসেছি তার বিনিময়ে কোন প্রতিদান চাইনা তবে তোমাদের কাছে আমার আত্মীয়দের জন্য ভালবাসা চাইব'।

সহীহ মুসলিমে যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মাঝে ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে বললেনঃ
(أما بعد ألا أيها الناس فإنما أنا بشر يوشك أن يأتي رسول ربي فأجيب وأنا تارك فيكم ثقلين: أولهما كتاب فيه الهدى والنور. فخذوا بكتاب الله واستمسكوا به. فحث على كتاب الله ورغب فيه ثم قال: (وأهل بيتي أذكركم الله في أهل بيتي. أذكركم الله في أهل بيتي، أذكركم الله في أهل بيتي)¹
"তারপর, সাবধান হে মানব সম্প্রদায়! আমি তো কেবলমাত্র একজন মানুষ, অচিরেই আমার কাছে আমার প্রভুর কাছ থেকে দূত আসলে তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যাব। কিন্তু আমি তোমাদের মাঝে দু'টি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছিঃ তার একটি হলোঃ কুরআন যাতে রয়েছে হিদায়াত এবং আলো। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ করবে এবং দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকবে"। তার পর তিনি আল্লাহর কিতাব তথা কুরআনের উপর জোর দিলেন এবং এ ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করলেন, তারপর বললেনঃ "আর আমার পরিবার-পরিজন, আমি তোমাদেরকে আমার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমি তোমাদেরকে আমার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমি তোমাদেরকে আমার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি”।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার পরিবার-পরিজনের নিকটতম সম্পর্ক থাকায় ও তাদের সম্মানের কারণে তিনি তাদের সাথে ইহসান তথা সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার এবং তাদের সম্মান, মান-মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে জানার নির্দেশ দিয়েছেন।

অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাদেরকে গালি-গালাজ এবং তাদের সম্মানহানি করা থেকে নিষেধ করেছেন। আবু সা'ঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
(لا تسبوا أصحابي فلو أن أحدكم أنفق مثل أحد ذهبا ما بلغ مد أحدهم ولا نصيفه).
"তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিওনা; কেননা তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড়ের পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় কর তাহলেও তা তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক ব্যয় করার মত হবে না"²। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

আর এজন্যই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সবচেয়ে বড় মূলনীতি-যার উপর তাদের ঐক্যমত সাব্যস্ত হয়েছে- তা হচ্ছেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদেরকে, তার আত্মীয় স্বজন ও পরিবার পরিজনদেরকে ভালবাসা। তারা তাদের ব্যাপারে কোন প্রকার কটাক্ষ করাকে কেবলমাত্র বক্রতা ও ভ্রষ্টতা বলে গণ্য করে।

আবু যুর'আহ্ বলেনঃ 'যখন তুমি কোন লোককে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন সাহাবী সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতে দেখবে তখন তুমি বুঝতে পারবে যে সে একজন যিন্দীক।

ইমাম আহমাদ বলেনঃ 'যখন তুমি কোন লোককে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন সাহাবী সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করতে দেখবে তখন তার ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ কর'।

উম্মাতের উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সকল অধিকার রয়েছে তার কিছু অংশ অত্যন্ত সংক্ষেপে বর্ণিত হলো। আল্লাহ তা'আলা আমাদের এবং আমাদের অন্যান্য ভাইদেরকে এগুলো আদায় করার ও এগুলোর উপর আমল করার জন্য সঠিক পথ দেখান এ দো'আই করি।

তৃতীয়তঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখা যে সত্য তার বর্ণনাঃ
রাসূলের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখা সম্ভব এবং যে তাকে স্বপ্নে দেখল সে বাস্তবিকই তাকে দেখল (অন্য কাউকে নয়)।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(من رآني في المنام فقد رآني. فإن الشيطان لا يتمثل بي)
“যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল সে অবশ্যই আমাকে দেখেছে; কেননা শয়তান আমার মত রূপ ধারণ করতে সক্ষম নয়”¹। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

ইমাম বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে অন্য শব্দে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এসেছে, তিনি বলেছেনঃ
(من رآني في المنام فسيراني في اليقظة، ولا يتمثل الشيطان بي)¹
"যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল সে অবশ্যই আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পাবে; আর শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না'। বুখারী বলেনঃ ইবনে সীরীন বলেছেনঃ তার অর্থ 'যদি তাঁকে তার নিজস্ব আকৃতিতে দেখতে পায়'।

অনুরূপভাবে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
(من رآني في النوم فقد رآني فإنه لا ينبغي للشيطان أن يتشبه بي)
"যে আমাকে স্বপ্নে দেখবে সে অবশ্যই আমাকে দেখতে পেল; কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে সক্ষম নয়”²। ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেন।

এ সমস্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্বপ্নে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখা সঠিক এবং তাকে দেখতে পেলে তার দেখা বাস্তব; কেননা শয়তান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আকৃতি গ্রহণ করতে পারে না। তবে এ ব্যাপারে অবশ্যই সাবধান হতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখা ঐ সময়ে বিশুদ্ধ বলে পরিগণিত হবে, যখন সে রাসূলের বাস্তব যে সমস্ত গুণাগুণ বর্ণিত হয়েছে তদনুযায়ী তাকে দেখতে পাবে। যেমনটি পূর্বে সহীহ বুখারী থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। আর এ জন্যই ইমাম বুখারী হাদীসটি উল্লেখের পর রাসূলকে কিভাবে দেখলে বাস্তবিক তাকে দেখেছে বলে সাব্যস্ত হবে তার ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে সীরীনের ভাষ্য উল্লেখ করেছিলেন। এর সমর্থন পাওয়া যায় 'আসেম ইবনে কুলাইবের বর্ণনায় হাকিম কর্তৃক চয়নকৃত হাদীসে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ আমি ইবনে আব্বাসকে বললামঃ আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছি, তিনি বললেনঃ তুমি তাকে কি রকম দেখেছ তা বর্ণনা কর, তিনি বললেনঃ আমি হাসান ইবনে আলীর উল্লেখ করে বললামঃ তার মত দেখেছি, তিনি বললেনঃ অবশ্যই হাসান ইবনে আলী রাসূলের আকৃতি সম্পন্ন ছিল"³। ইবনে হাজার বলেনঃ এর সনদ উত্তম।

আইয়ূব বলেনঃ 'মুহাম্মাদ অর্থাৎ ইবনে সীরীনের কাছে যখন কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি বলে দাবী করত, তিনি তাকে বলতেনঃ যাকে দেখেছ তার বর্ণনা দাও, যদি সে লোক তাকে অপরিচিত কোন গুণে বর্ণনা করত তিনি বলতেনঃ তুমি তাকে দেখনি'। ইবনে হাজার তার ফাতহুলবারীতে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেনঃ এর সনদ বিশুদ্ধ।

তবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ
(من رآني في المنام فسيراني في اليقظة)
“যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল সে অবশ্যই আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পাবে” এ হাদীসে বর্ণিত জাগ্রত অবস্থার ব্যাখ্যায় আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তম্মধ্যে তিনটি মত বেশী বিখ্যাতঃ

একঃ এটা উপমা ও উদাহরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা হতে এক বর্ণনায় এসেছে "ধারণা করুক যেন সে আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পেল” এর প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ্য।

দুইঃ এটা তার যুগের লোকদের যারা তাকে দেখার আগে তার উপর ঈমান এনেছিল তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট।

তিনঃ সে দেখা ক্বিয়ামতের দিন সম্পন্ন হবে। সুতরাং কেউ তাকে স্বপ্নে দেখলে তা তার জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিবেচিত হবে তাদের উপর যারা তাকে স্বপ্নে দেখতে পায়নি। আর আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

টিকাঃ
¹ ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেন (হাদীস নং ৫২৩)。
² ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন (হাদীস নং ১৫৩)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৫৩৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৮৬), শব্দ চয়ন বুখারী থেকে。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৯৮১), মুসলিম (হাদীস নং ১৫২)。
¹ হাদীসটি ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেন (৪/৪৪৭), তিরমিযী (৫/২২৬), এবং বলেছেন হাদীসটি হাসান। হাকিমও তার মুস্তাদরাকে বর্ণনা করে সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন, আর ইমাম যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৫২৮), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২১)。
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৭৮)। পূর্বেও এ হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, পৃঃ নং ২৩১。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৩৪০), মুসলিম (হাদীস নং ১৯৩)。
¹হাদীসটি তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, হাসান সহীহ, (৫/৫৮৭ হাদীস নং ৩৬১৪), ইমাম আহমাদ তার মুসনাদের (৩/২) ও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন。
²মুসলিম (হাদীস নং ৩৮৪)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ২৫), মুসলিম (হাদীস নং ২২)。
² সুনান ইবনে মাজাহ, মুকাদ্দিমাহঃ (১/৪, হাদীস নং ৫)。
¹ হাদীসটি ইমাম মুসলিম জাবির ইবনে عبدالله থেকে বর্ণিত বিদায় হজ্জের বর্ণনায় উল্লেখ করেন (হাদীস নং ১২১৮)。
² হাদীসটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে (৫/১৫৩) বর্ণনা করেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১৫), মুসলিম (হাদীস নং ৪৪)。
¹ হাদীসটি ইমাম বুখারী উবাইদুল্লাহ ইবনে হিশামের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেন। (হাদীস নং ৬৬৩২)。
¹ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন (হাদীস নং ৩৮৪)。
² হাদীসটি ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেন, (৫/৫৫১, হাদীস নং ৩৫৪৬) এবং হাসান সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। অনুরূপভাবে ইমাম আহমাদও হাদীসটি তার মুসনাদে (১/২০১) এ বর্ণনা করেছেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪৪৫), অনুরূপভাবে ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে (১/২৩) ও উল্লেখ করেছেন。
² হাদীসটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ (১/২১৪) বর্ণনা করেছেন, ইবনে মাজাহ্ তার সুনানেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন (হাদীস নং ২১১৭)。
¹ সহীh মুসলিম (হাদীস নং ২৪০৮)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৬৭৩), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৫৪১)। তবে শব্দ চয়ন ইমাম বুখারীর。
¹সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৬৬)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৯৯৩), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৬৬)。
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৬৮)。
³ আল মুস্তাদরাক (৪/৩৯৩), তিনি তা বিশুদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন, আর ইমাম যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 রিসালাতের ধারার পরিসমাপ্তি ও তার পরে যে আর কোন নবী নেই তার বর্ণনা

📄 রিসালাতের ধারার পরিসমাপ্তি ও তার পরে যে আর কোন নবী নেই তার বর্ণনা


উপরোক্ত বিষয়ের আলোচনা দলীল-প্রমাণ সহকারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় এবং তিনি যে সর্বশেষ নবী সে আলোচনার প্রাক্কালেই ইতিপূর্বে করা হয়েছে। মূলতঃ এখানে রিসালতের ধারা পরিসমাপ্তির আলোচনা করার উদ্দেশ্য হলো এর অন্য আরেকটি দিক তুলে ধরা; আর তা হলো মুসলমানদের দ্বীনের উপর রিসালত ও নবুওয়াতের ধারা সমাপ্তি এ আক্বীদা- বিশ্বাসের প্রভাব এবং তাদের উপর এ আক্বীদাকে স্বীকৃতি দানের ফলাফল কি তা বর্ণনা করা।

এর ফলাফলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ

১. এর মাধ্যমে উম্মাতের কাছে শরীয়তের স্থায়ীত্ব এবং দ্বীনের পূর্ণতা প্রকাশ পেয়েছে। আর উম্মাতের জীবনে এর বিরাট প্রভাব সুস্পষ্ট। তাই সে বিষয়টি উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতের উপর তাঁর দয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি বলেনঃ
﴿ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴾ (المائدة : ٣)
"আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাংগ করলাম ও তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৩]

এ আয়াতটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে বিদায় হজ্জে অবতীর্ণ হয়েছিল যখন আল্লাহ তার জন্য শরীয়তকে পূর্ণাংগ করে দিয়েছিলেন। আর তাই ইয়াহুদীগণ এ আয়াতের কারণে মুসলমানদের ঈর্ষা করত। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে এক ইয়াহুদী উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে বললঃ 'তোমাদের কিতাবে একটি আয়াত তোমরা পাঠ করে থাক, যদি তা আমাদের ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের উপর অবতীর্ণ হতো তবে আমরা সে দিনটিকে ঈদের দিনে পরিণত করতাম'। তিনি বললেনঃ সেটা কোন আয়াত? সে বললঃ
﴾ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ﴿
অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম¹。

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং রিসালাতের পরিসমাপ্তির বাস্তবতাকে একটি ব্যাহ্যিক রূপদানের মাধ্যমে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি তার পূর্ববর্তী রিসালাতসমূহকে এমন এক প্রাসাদের সাথে তুলনা করলেন যার দেয়াল পরিপূর্ণ ও সুন্দর করে তৈরী করা হলো অথচ সেখানে একটি ইট লাগানো হলো না। সুতরাং তাকে নবী হিসাবে প্রেরণ করা হলো সে স্থানে সে ইটটি বসিয়ে দেয়া, যার মাধ্যমে প্রাসাদ নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে গেল।

এর মাধ্যমে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, বিশেষভাবে এ দ্বীনের মধ্যে আর সার্বিকভাবে রিসালতের মধ্যে কোন প্রকার বর্ধিতকরণের সুযোগ নেই, যেমনিভাবে ঐ প্রাসাদ নির্মাণে পূর্ণতা লাভের পর সেখানে আর কিছু বর্ধিত করার সুযোগ নেই। পূর্ব পরিচ্ছেদে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় পূর্ণভাবে হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে, সুতরাং সেখানে দেখে নেয়ার অনুরোধ রইল¹。

২. উম্মাতের মধ্যে এ বিশ্বাসযোগ্যতার সৃষ্টি হবে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নিয়ে আসা এ দ্বীন ও শরীয়ত অন্য কোন নবী পাঠানোর মাধ্যমে রহিত হবার নয়।

'আর খাতমে নবুওয়াত তথা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের মাধ্যমে নবুওয়াতের ধারা শেষ হওয়ার অর্থ হলোঃ তার নবুওয়াত ও শরীয়তের পর আর কোন নবুওয়াতের শুরু হবে না, কোন শরীয়তের প্রবর্তন হবে না। 'ঈসা আলাইহিস সালামের অবতীর্ণ হওয়া এবং তিনি পূর্ব নবীর গুণে গুণান্বিত থাকা এর বিরোধী নয়; কেননা 'ঈসা আলাইহিস সালাম যখন অবতীর্ণ হবেন তখন তিনি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীয়তেরই অনুসারী হবেন। তার পূর্ববর্তী শরীয়তের নয়; কেননা তা রহিত হয়ে গেছে। সুতরাং তিনি শরীয়তের মৌলিক ও সাধারণ বিধি-বিধান সবকিছুতেই এ শরীয়ত অনুসারে ইবাদাত করবেন'।

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে যত নবুওয়াতের দাবীদার হবে তাদেরকে কোন প্রকার চিন্তা ও গবেষণা ব্যতীতই মিথ্যাবাদী বলে অকাট্যভাবে সাব্যস্ত করতে পারবে।

খাতমে নবুওয়াত তথা নবীদের ধারার পরিসমাপ্তি জনিত আক্বীদার উপর ঈমানের এটাই প্রত্যক্ষ ফলাফল যে, এর মাধ্যমে মিথ্যাবাদী দাজ্জালদের মধ্য হতে যারা নবুওয়াতের দাবী করবে তাদের অনুসরণ থেকে উম্মাতের জন্য নিরাপত্তা অর্জিত হবে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাতমে নবুওয়াতের আক্বীদা-বিশ্বাস বর্ণনার অন্যতম বড় উদ্দেশ্যও ছিল এ মহান বিষয়টির প্রতি সতর্কীকরণ। তাই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ উম্মাতের মধ্য থেকে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদী বের হবে যাদের প্রত্যেকে নবুওয়াতের দাবী করবে। তারপর তিনি উম্মাতকে এ সমস্ত মিথ্যাবাদী নবুওয়াতের দাবীদারদের অনুসরণ ও সত্যায়ন করা থেকে সাবধান করার জন্য তার পরে আর কোন নবী আসবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যেমনটি ফিতনার বর্ণনায় সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহুর মারফু' হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, যাতে এসেছেঃ
(... وإنه سيكون في أمتي ثلاثون كذابون كلهم يزعم أنه نبي وأنا خاتم النبيين لا نبي بعدي)
"... অবশ্যই আমার উম্মাতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী হবে তাদের প্রত্যেকে মনে করবে সে নবী। অথচ আমি শেষ নবী, আমার পরে আর কোন নবী নেই”¹。

৪. এ উম্মাতের আমীর ও আলেমদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাওয়া; যেহেতু উম্মাতের দ্বীন ও দুনিয়াবী তথা সার্বিক শাসন ক্ষমতা তাদের হাতেই অর্পিত হয়েছে। যা বনী ইসরাইলদের বিপরীত; কারণ তাদেরকে কেবল নবীগণই শাসন করত।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(كانت بنو إسرائيل تسوسهم الأنبياء كلما هلك نبي خلفه نبي، وإنه لا نبي بعدي، وستكون خلفاء تكش. قالوا : فما تأمرنا ؟ قال : (فُوا ببيعة الأول فالأول وأعطوهم حقهم فإن الله سائلهم عما استرعاهم)¹
"বনী ইসরাইলদেরকে নবীগণ শাসন করত, যখনই কোন নবী চলে যেতেন তখনই অন্য নবী তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোন নবী নেই, তবে খলীফা হবে যাদের সংখ্যা হবে অনেক” সাহাবাগণ বললেনঃ আপনি আমাদেরকে এ ব্যাপারে কি নির্দেশ দেন? তিনি বললেনঃ “তোমরা ক্রমান্বয়ে একের পর এক খলীফার বাইয়াতের দাবী পূরণ করবে এবং তাদের হক আদায় করবে; কেননা আল্লাহ তাদেরকে যাদের উপর দায়িত্বশীল করেছেন তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন”'।

সুতরাং মানুষের শাসন ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এ উম্মাতের খলীফাদের স্থান হলো বনী ইসরাঈলদের নবীদের স্থান।

অন্য হাদীসে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেনঃ
(إن الله يبعث لهذه الأمة على رأس كل مائة سنة من يجدد لها دينها)
“অবশ্যই আল্লাহ এ উম্মাতের জন্য প্রত্যেক শত বৎসরের শুরুতে এমন কাউকে পাঠাবেন যিনি উম্মাতের জন্য তাদের দ্বীনকে সংস্কার করবেন”²。

আর উম্মাতের বাস্তবতাও এর প্রমাণ বহন করছে, ফলে খলীফা, আমীর তথা ক্ষমতাসীন শাসক এবং আলেমদের মধ্যে যারা মানুষদেরকে শরীয়ত অনুসারে পরিচালনা করেছে তাদের মাধ্যমে দ্বীনের যাবতীয় কর্মকান্ড সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতের জন্য যুগে যুগে সংস্কারক ইমামদের মাধ্যমে দ্বীনের যে নিশানাসমূহ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তা নবায়ন করেন, যারা আল্লাহর কিতাব তথা কুরআন থেকে অতিরঞ্জনকারীদের পরিবর্তন-পরিবর্ধন, বাতিলপন্থীদের মনগড়া মতবাদ এবং মুর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে তাকে হিফাযত করেন। সুতরাং নবী প্রেরণের যুগ ও রিসালতের সুদীর্ঘ কাল ধরে তাদের দ্বারা আল্লাহর দ্বীন সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা এ উম্মাতের উপর আল্লাহর সাধারণ অনুগ্রহ, আর যাদেরকে এ কাজের জন্য চয়ন করেছেন তাদের উপর বিশেষ অনুগ্রহ।

যাই হোক, খাতমে নবুওয়াতের আক্বীদা ও দ্বীনের মধ্যে তার প্রভাব এ উম্মাতের স্পষ্ট বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত, যার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ তথা ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত এ উম্মাতকে তাঁর দ্বীনের উপর ঈমানী শক্তিতে দিয়েছে বলিষ্ঠতা, বিশ্বাসে দিয়েছে সততা আর তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পদযুগলে দিয়েছে দৃঢ়তা।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী, (হাদীস নং ৪৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৩০১৭)。
¹দেখুন পৃষ্টা নংঃ ২৩৪。
¹ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, সুনান তিরমিযী (৪/৪৯৯, হাদীস নং ২২১৯), এবং হাসান সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। অনুরূপভাবে আবু দাউদ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, সুনান আবু দাউদ (৪/৩২৯, হাদীস নং ৪৩৩৩-৪৩৩৪)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪৫৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৮৪২), শব্দ চয়ন মুসলিমের。
² হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, (৪/৩১৩, হাদীস নং ৪২৯১), অনুরূপভাবে হাকিম তার মুস্তাদরাকে (৪/৫২২) বর্ণনা করেছেন এবং বিশুদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন আর ইমাম যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসরা তথা রাত্রিভ্রমণের হাকীকত ও তার প্রমাণাদি

📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসরা তথা রাত্রিভ্রমণের হাকীকত ও তার প্রমাণাদি


'ইসরা'র আভিধানিক ও শরয়ী' অর্থ:

আভিধানিক অর্থে 'ইসরা':
শব্দটি আরবী السریশব্দ থেকে গৃহীত। যার অর্থ: রাতের ভ্রমণ বা রাতের অধিক অংশের ভ্রমণ। কেউ কেউ বলেন: সম্পূর্ণ রাত্রির ভ্রমণ।
বলা হয়ে থাকে : أسريت ও سریت অর্থাৎ : আমি রাতে ভ্রমণ করেছি। হাসান বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর কবিতায় এসেছে:
أَسْرَتْ إِلَيكَ وَلَمْ تَكُنْ تَسْرِي
অর্থাৎঃ রাতে সে তোমার কাছে ভ্রমণ করেছে, অথচ সে রাতে আসতো না।
শরীয়তের পরিভাষায় আল-ইসরা শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মক্কার মাসজিদুল হারাম থেকে 'ঈলিয়া' তথা ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত রাত্রিতে ভ্রমণ করানো, আবার রাত্রির মধ্যেই সেখান থেকে তার ফিরে আসা।

'ইসরা'র বাস্তবতা ও তার প্রমাণাদি: "ইসরা' এক মহা নিদর্শন যার দ্বারা আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হিজরতের পূর্বে শক্তি যুগিয়েছেন। তাকে নিয়ে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত বুরাকের উপর আরোহণ করে জিবরীলের সাহচর্যে রাত্রিতে ভ্রমণ করানো হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছলেন, তারপর তিনি বুরাককে মসজিদের দরজার একটি আংটার সাথে বাঁধার পর মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং নবীদের নিয়ে ইমাম হয়ে নামায পড়লেন। তারপর জিবরীল তার কাছে এক পেয়ালা মদ এবং এক পেয়ালা দুধ নিয়ে আসলেন, তিনি দুধকে মদের উপর প্রাধান্য দিলেন এবং দুধ পছন্দ করলেন। জিবরীল বললেন: আপনাকে ফিতরাত তথা স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন দ্বীনের প্রতি পথ প্রদর্শন করা হয়েছে।

কুরআন ও সুন্নাহ 'ইসরা'র উপর প্রমাণ বহন করছে:

মহান আল্লাহ বলেন:
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي برَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ أَيْتِنَا أَنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ (الإسراء : 1)
"কতইনা পবিত্র, মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিতে ভ্রমণ করিয়েছেন, মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত যার চতুষ্পার্শ আমরা বরকতময় করেছিলাম, তাকে আমাদের নিদর্শন দেখানোর জন্য। অবশ্যই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। সূরা আল-ইসরা: ১]

রাসূলের সুন্নাহ থেকে এর দলীল: আনাস ইবনে মালিক বর্ণিত হাদীস যা ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে সাবিত আল-বুনানীর মাধ্যমে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বললেন:
أتيت بالبراق وهو دابة أبيض طويل فوق الحمار ودون البغل يضع حافره عند منتهى طرفه قال فركبته حتى أتيت بيت المقدس. قال: فربطته بالحلقة التي يربط به الأنبياء، قال: ثم دخلت المسجد فصليت فيه ركعتين، ثم خرجت فجاءني جبريل عليه السلام بإناء من خمر وإناء من لبن فاخترت اللبن. فقال جبريل : اخترت الفطرة)¹
"আমার কাছে বুরাক নিয়ে আসা হলো” (আর তা ছিল একটি সাদা লম্বা জন্তু, গাধার চেয়ে উঁচু খচ্চরের চেয়ে নিচু, যতদুর দৃষ্টিশক্তি পৌঁছে ততদূর তার পায়ের খুর রাখে) বললেনঃ "তারপর আমি তাতে সওয়ার হয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত পৌঁছলাম", বললেনঃ "তারপর আমি নবীগণ যে আংটাতে বাঁধতেন তাতে তাকে বাঁধলাম”। বললেন: “তারপর আমি মসজিদে প্রবেশ করে দু'রাকাত নামায পড়লাম। তারপর বের হলাম। ইতিমধ্যে জিবরীল আমার কাছে এক পেয়ালা মদ ও এক পেয়ালা দুধ নিয়ে এলে আমি দুধ পছন্দ করলাম। তাতে জিবরীল বললেনঃ আপনি স্বভাবজাত দ্বীন পছন্দ করেছেন"।

তারপর তিনি হাদীসের বাকী অংশ এবং আকাশের দিকে আরোহণ করার কথা উল্লেখ করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে 'ইসরা' সংঘটিত হওয়ার উপর অনেক হাদীস এসেছে, তার মধ্যে কিছু বর্ণিত হয়েছে বুখারী ও মুসলিমে, আবার কিছু বর্ণিত হয়েছে সুনান ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থসমূহে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এক দল সাহাবা তা বর্ণনা করেছেন, যাদের সংখ্যা ত্রিশের মত, তারপর তাদের থেকে হাদীসের বর্ণনাকারী ও দ্বীনের ইমামদের এমন বেশী সংখ্যক লোক তা বর্ণনা করেছেন যাদের পরিসংখ্যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'ইসরা' বিশুদ্ধ হওয়া এবং তা যে সত্য তার উপর মুসলমানদের পূর্বাপর যাবতীয় আলেমগণ একমত হয়েছেন এবং তাদের ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাজী 'ইয়াদ তার গ্রন্থ 'শিফা' এবং সাফারীনী তার 'লাওয়ামি'য়ুল আনওয়ার' গ্রন্থে এর উপর ইজমা হয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'ইসরা' শরীর ও আত্মা উভয়ের মাধ্যমেই হয়েছিল, জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল, ঘুমন্ত অবস্থায় নয়। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তা-ই প্রমাণিত হচ্ছে। সমস্ত সাহাবাগণ, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণ এবং সঠিক বিশ্লেষক আলেমগণ এ মতই পোষণ করেছেন।

ইবনে আবিল 'ইয্য আল হানাফী বলেন: 'ইসরা'র ব্যাপারে ভাষ্য হলো: সঠিক মতে তাকে স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত 'ইসরা' বা রাত্রি কালীন ভ্রমণ করানো হয়েছিল'।

আর সাহাবা ও তাদের পরবর্তী সমস্ত আলেমগণ সবাই যে এ মত পোষণ করতেন সে কথার স্বীকৃতি প্রদান করে কাজী ইয়াদ বলেন: 'সালফে সালেহীনের অধিকাংশ এবং মুসলমানগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, এ 'ইসরা' ছিল স্বশরীরে এবং জাগ্রত অবস্থায়। আর এটাই বাস্তব সত্য। ইবনে আব্বাস, জাবির, আনাস, হুজাইফা, উমর, আবু হুরায়রা, মালিক ইবনে সা'সা', আবু হাব্বাহ আল-বাদরী, ইবনে মাসউদ, দাহ্হাক, সা'ঈদ ইবনে যুবাইর, ক্বাতাদা, ইবনুল মুসাইয়্যেব, ইবনে শিহাব, ইবনে যায়েদ, হাসান, ইব্রাহীম, মাসরূক, মুজাহিদ, 'ইকরামা, ইবনে জুরাইজ এরা সবাই এ মত পোষণ করেছেন। এটা 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা দ্বারাও প্রমাণিত হয়। ত্বাবারী, ইবনে হাম্বাল সহ বিরাট সংখ্যক একদল মুসলমান এ মত পোষণ করেছেন। আর পরবর্তী অধিকাংশ ফকীহ, মুহাদ্দিস, মুতাকাল্লিম তথা কালামশাস্ত্রবিদ, মুফাসসিরের মতও তাই'।

যারা মনে করে 'ইসরা' দু'বার হয়েছিল তাদের মত খন্ডন করে একজন অদ্বিতীয় বিশ্লেষক বলেন: 'কুরআন ও হাদীসের ইমামগণের মত অনুসারে সঠিক মত হলো, 'ইসরা' শুধুমাত্র একবার ঘটেছিল, যা হয়েছিল নবী হিসাবে প্রেরণের পরে মক্কায় অবস্থান কালে। ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে আশ্চার্য না হয়ে পারা যায় না যারা মনে করে যে, 'ইসরা' কয়েকবার হয়েছিল; কেননা কিভাবে তারা ধারণা করতে পারে যে, প্রত্যেক বার তার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হতো। তারপর প্রত্যেক বার তিনি মূসা ও তাঁর প্রভুর মাঝে বারবার আসা যাওয়া করতেন, আর পাঁচ ওয়াক্ত করার পর আল্লাহ বলতেন: "আমি আমার ফরজ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছি এবং আমার বান্দাদের বোঝা লাঘব করে দিয়েছি”। তারপর আল্লাহ দ্বিতীয়বার সেটাকে পঞ্চাশ ওয়াক্তে রূপান্তরিত করতেন, তারপর দশ দশ করে ছাড় দিতেন। এটা কিভাবে হতে পারে?'।

মি'রাজ ও তার বাস্তবতাঃ

কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যে ও আলেমদের আলোচনায় মি'রাজের কথা 'ইসরা'র সাথে সংশ্লিষ্ট। আর এজন্যই মি'রাজ সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা প্রয়োজন যাতে করে এ বিষয় থেকে পরিপূর্ণ ফায়দা হাসিল করা সহজ হয়।

মি'রাজঃ আরবী শব্দ العروج থেকে مفعّال এর সমপরিমাণ বর্ণে গঠিত শব্দ। অর্থাৎ যে যন্ত্রের সাহায্যে উপরে উঠা যায়, আরোহণ করা যায়। এটা দ্রুত চলন্ত সিঁড়ির মত তবে আমরা এর আকৃতি প্রকৃতি সম্পর্কে জানি না।

শরীয়তের পরিভাষায় মি'রাজ বললে যা বুঝায় তা'হলোঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরীলের সাহচর্যে বাইতুল মুকাদ্দাস হতে দুনিয়ার আকাশে আরোহণ করা, তারপর সেখান থেকে সমস্ত আসমান পেরিয়ে সপ্তম আকাশে পৌঁছা এবং নবীদের মর্যাদা ও স্থান অনুসারে আসমানের বিভিন্ন স্থানে তাদের সাথে সাক্ষাৎ ও তাদের সাথে সালাম বিনিময় এবং তাদের মাধ্যমে তাকে সাদর সম্ভাষণ জ্ঞাপন, তারপর 'সিদরাতুল মুনতাহা' পর্যন্ত আরোহণ করা এবং সেখানে জিবরীলকে আল্লাহ যে আসল রূপে সৃষ্টি করেছেন সে রূপে দেখা, তারপর আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করে দেয়া এবং আল্লাহর সাথে এ ব্যাপারে কথোপকথন, তারপর আবার যমীনে প্রত্যাবর্তন করা। সঠিক মতে 'ইসরা'র রাত্রিতেই মি'রাজ সংঘটিত হয়েছিল।

কুরআন ও সুন্নায় মি'রাজের অনেক দলীল-প্রমাণাদি রয়েছেঃ

মি'রাজের রাত্রিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সমস্ত মহা নিদর্শনসমূহ সংঘটিত হয়েছিল তার কিছু বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এসেছেঃ যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى * وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى * عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى * عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى * إِذْ يَغْشَى السَّدْرَةَ مَا يَغْشَى * مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى * لَقَدْ رَأَى مِنْ أَيْتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى﴾ (النجم: ۱۲-۱۸)
"সে যা দেখেছে তোমরা কি সে বিষয়ে তার সঙ্গে বিতর্ক করবে? নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, প্রান্তবর্তী বদরী বৃক্ষের নিকট, যার নিকট 'জান্নাতুল মাওয়া' অবস্থিত, যখন গাছটি, যা দ্বারা আচ্ছাদিত হবার তা দ্বারা ছিল আচ্ছাদিত, তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি, অবশ্যই সে তার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখেছিল"। [সূরা আন-নাজম: ১২-১৮]

আলোচ্য আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা তাঁর মহান নিদর্শনাবলী উল্লেখ করেছেন যেগুলো দ্বারা তিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মি'রাজের রাত্রিতে সম্মানিত করেছিলেন। তম্মধ্যে রয়েছে 'সিদরাতুল মুস্তাহা' তথা প্রান্তসীমায় অবস্থিত বদরী গাছের নিকট জিবরীল আলাইহিস সালামকে দর্শন, আল্লাহর নির্দেশে যা দ্বারা আচ্ছাদিত হবার তা দ্বারা আচ্ছাদিত অবস্থায় সিদরাতুল মুন্তাহা দেখা, ইবনে আব্বাস ও মাসরূক বলেন : 'স্বর্ণের পতঙ্গ দল দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল'।

রাসূলের সুন্নায় একাধিক হাদীসে মি'রাজের বিস্তারিত বিবরণ এসেছে, তম্মধ্যে পূর্বে 'ইসরা'র ঘটনায় বর্ণিত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস উল্লেখযোগ্য, যার মধ্য থেকে 'ইসরা'র সাথে সংশ্লিষ্ট অংশ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, তারপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
(ثم عرج بنا إلى السماء فاستفتح جبريل. فقيل: من أنت؟ قال: جبريل. قيل: ومن معك؟ قال: محمد قيل وقد بعث إليه؟ قال : قد بعث إليه. ففتح لنا فإذا أنا بآدم فرحب بي ودعا لي بخير. ثم ذكر عروجه إلى السموات وملاقاته الأنبياء إلى أن قال: ثم ذهب بي إلى سدرة المنتهى وإذا ورقها كآذان الفيلة، وإذا ثمارها كالقلال. قال: فلما غشيها من أمر الله ما غشيها تغيرت. فما أحد من خلق الله يستطيع أن نعتها من حسنها. فأوحى الله إلي ما أوحى. ففرض علي خمسين صلاة في كل يوم وليلة، فنزلت إلى موسى . فقال: ما فرض ربك على أمتك؟ قلت: خمسين صلاة. قال: ارجع إلى ربك فاسأله التخفيف فإن أمتك لا يطيقون ذلك، فإني قد بلوت بني إسرائيل وخبرتهم. قال: فرجعت إلى ربي. فقلت: يا رب خفف على أمتي. فحط عني خمساً. فرجعت إلى موسى. فقلت: حط عني خمساً. قال: إن أمتك لا يطيقون ذلك فارجع إلى ربك فاسأله التخفيف. قال: فلم أزل أرجع بين ربي تبارك وتعالى وبين موسى عليه السلام حتى قال: يا محمد إنهن خمس صلوات كل يوم وليلة لكل صلاة عشر فذلك خمسون صلاة ....
"তারপর আমাকে নিয়ে আকাশে আরোহণ করা হলো, জিবরীল খুলতে বললে তাকে বলা হলো: আপনি কে? তিনি উত্তর দিলেন: জিবরীল। বলা হলোঃ আপনার সাথে কে? তিনি বললেন: মুহাম্মাদ। তাকে বলা হলো: তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর করলেন: অবশ্যই তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তারপর আমাদের জন্য খোলা হলো, আমি আদমকে দেখলাম। তিনি আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন এবং আমার জন্য কল্যাণের দো'আ করলেন। (তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অন্যান্য আসমানে ভ্রমণ ও সেখানে নবীদের সাথে তার সাক্ষাতের বিবরণ দিয়ে শেষ পর্যন্ত বললেনঃ) তারপর আমাকে নিয়ে 'সিদরাতুল মুস্তাহা'র কাছে নিয়ে যাওয়া হলো, আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম এর পাতাগুলো হাতির কানের মত আর এর ফলগুলো বড় কলসীর মতো, তিনি বললেন: তারপর যখন আল্লাহর নির্দেশে যা ঢেকে রাখার তা তাকে ঢেকে ফেলল তখন তা এমন ভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেল যে, আল্লাহর সৃষ্টিজগতের কেউ তার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে সামর্থ হবে না, তারপর আল্লাহ আমার কাছে যা ওহী করার ছিল তা ওহী করে পাঠালেন, দিন ও রাত্রিতে আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। তারপর আমি মুসা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অবতরণ করলে তিনি বললেন : আপনার প্রভু আপনার উম্মাতের উপর কি ফরয করেছেন? আমি বললাম: পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন: আপনি আপনার প্রভুর কাছে ফিরে যান এবং কমাতে বলুন; কেননা আপনার উম্মাত তা করতে সামর্থ হবে না, কারণ আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তারপর আমি আমার প্রভুর কাছে ফিরে গিয়ে বললাম: হে প্রভু! আমার উম্মাতের উপর হালকা করে দিন। তিনি আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমালেন। আমি মূসার কাছে ফিরে গিয়ে বললাম : আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন: আপনার উম্মাত তাও করতে সামর্থ হবে না, আপনি আপনার প্রভুর কাছে ফিরে গিয়ে লাঘব করার দরখাস্ত করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: এভাবে আমি মূসা আলাইহিস সালাম এবং আমার মহান সম্মানিত প্রভুর দরবারে যাওয়া আসা করতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! এগুলো দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, প্রত্যেক সালাত দশগুণ বর্ধিত হয়ে পঞ্চাশ সালাত বিবেচিত হবে...'¹。

হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। মি'রাজের ঘটনা বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীসের গ্রন্থে মালেক ইবনে সা'সা'আহ, আবু যর এবং ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদীসে কাছাকাছি শব্দে বর্ণিত হয়েছে।

সতর্কীকরণ:

ইসরা ও মি'রাজ আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবীকে প্রদত্ত মহান নিদর্শনাবলীর অন্যতম। প্রত্যেক মুসলিমের উপর ওয়াজিব এতদুভয়ের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করা, এ সুমহান মর্যাদা আল্লাহ সমস্ত নবী-রাসূলের মধ্য হতে কেবলমাত্র আমাদের নবীকে প্রদান করেছেন। ইসরা ও মিরাজকে স্মরণ করে তা আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা কোন মুসলিমের জন্যই বৈধ নয়। অনুরূপভাবে এতদুভয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোন নামাযও বৈধ নয়, যেমনটি কোন কোন সাধারণ মুসলমান করে থাকে। বরং এগুলো গর্হিত বেদ'আত যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবর্তন করেননি, সালফে সালেহীনের কেউই তা করেননি। অনুসরণযোগ্য আলেমদের মধ্য থেকেও কেউ তা করতে বলেননি।

রজব মাসের সাতাশ তারিখের রাত্রির নামায ও অন্যান্য কর্মকান্ড সম্পর্কে সুন্নাতের অনুসারী আলেমগণ বলেন যে, 'এটা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে নতুনভাবে উদ্ভাবিত বেদ'আতের অন্তর্গত। ইসলামের ইমামদের ঐক্যমতে এ কাজ অবৈধ। মূর্খ ও বেদ'আতকারী ব্যতীত আর কেউ এমন কাজের প্রচলন ঘটায় না'। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد)
“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মাঝে এমন কিছুর আবির্ভাব ঘটাবে যা এ দ্বীনের মধ্যে নয় তা প্রত্যাখ্যাত হবে”¹। অর্থাৎ: তা তার উপরই প্রত্যাখ্যাত হবে।

টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম, (হাদীস নং ১৬২)。
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৬২)。
¹সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৬৯৭)。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00